তাকদীর পর্ব ৭
নিরুর কল্পনারাজ্য
অসুস্থ জুনায়েদকে দেখতে এসে এমন একজন অনাকাঙ্ক্ষিত রমণীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটবে তা আয়ান ভাবতে পারেনি। তার বোধহয় ইগো হার্ট-ই হলো। যা-হোক! সে মেয়েটা তো বিবাহিত। তার কী! সে বিরক্তি ঝেড়ে কেবিন নাম্বার ৪০৩ এ ঢুকলো। সেখানে জুনায়েদ তখন ব্যস্ত ছিলো কথোপকথনে। হৃদ, রুদ্র সাথে রাফির সাথে। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো তাদের সন্নিকটে। এগিয়ে গিয়ে ফুলের বুকেই টা রাখলো বেড এর পাশে থাকা কর্ণারের টেবিলে। অতঃপর সে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুঁজলো। ভ্রুকুটি করে কঠিন স্বরে শুধালো,
— হোয়াট হ্যাপেন্ড?
জুনায়েদ এক পলক আয়ানের পানে নজর ঘোরালো। পরমুহূর্তেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলো। তাদের গ্রুপে জুনায়েদ এবং আয়ান ছিলো সবচেয়ে সাহসী পুরুষ। তবে আয়ানের মেয়েলি কোনো কান্ড নেই। তার মতে, জীবনকে শান্তিতে রাখার জন্য মেয়ে হতে দূরে থাকা অত্যাবশ্যকীয়। রাফি এবার মুখ খোলে,
— ব্রো, বলিস না আর। আমি ওকে নিয়ে রেড লাইন এরিয়াতে গিয়েছিলাম। ওখানে ও অসুস্থ হয়ে পড়লো। সো আই টোল্ড হিম টু গো হসপিটাল উইথ মি। বাট হি ডিডন্ট। নাও সি দ্যা ফা*কিং রেজাল্ট।
[গল্পের স্বার্থে স্ল্যাং ওয়ার্ড ব্যবহৃত হয়েছে।]
জুনায়েদ বিরক্তিবোধ করলো অসম্ভব। ছেলেটা তার লেকপুল করছে। সম্মানহানি করছে। জুনায়েদ তিক্ত হয়ে ওঠা আদলে ধমকায় তাকে,
— শাট আপ, রাফি!
রাফি দাঁত কেলিয়ে হাসে। হৃদ তাদের দেখে দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে তাদের কর্মকান্ড দেখে হতাশ হয়। বলে,
— হসপিটালে এসে অন্তত ঝগড়া করিস না তোরা!
— যাই-হোক, এখন কেমন আছিস?
আয়ান চিন্তিত আদলে প্রশ্ন ছুঁড়লো। জুনায়েদ তার পানে তাকালো এবারে। নীল সায়রের ন্যায় আঁখিদুটো সম্পূর্ণ শান্ত। আয়ান উৎসুক হয়ে তার পানে তাকিয়ে। জুনায়েদ দাঁত পিষিয়ে জবাব দেয়,
— দেখতেই পাচ্ছিস ক্যানুলা হাতে, অবশ্যই খারাপ আছি তাই-তো এখনো এখানে তাইনা?
— আগের থেকে ভালো আছিস কিনা তা আস্ক করেছি।
জুনায়েদ ওপর-নিচ মাথা নাড়ায়। হুট করে হৃদের মনে পড়ে কিছু একটা। ত্বরিত গতিতে শুধায়,
— হেই, তাহলে আমাদের যে বাইক রেইসিং এর প্ল্যান টা হয়েছিলো? ইশ, সেটা তো আর হচ্ছে না!
জুনায়েদ ভাবুক হয়। ভাবতে ভাবতেই প্রশ্ন করে,
— আজ কত তারিখ?
তাকে জবাব দেওয়া হলো,
— জুনের ছয় তারিখ বৎস!
— ক্যান্সেল না করে দু’চারদিন পিঁছিয়ে দে।
হৃদ চমকে ওঠে।
— তুই পারবি?
মাঝখান হতে আয়ান হেসে ওঠে। গর্বের সহিত প্রত্যুত্তর করে,
— আরে, ও আমাদের জুনায়েদ। ও পারেনা এমন কিছুই দুনিয়াতে এক্সিস্ট করেনা।
জুনায়েদ তা শুনে বক্র হাসে। অতঃপর রাফি তার গুণগুলোর ফর্দসমেত বলতে আরম্ভ করলো,
— আরে সম্ভব ভাই। ওর দ্বারা সবই সম্ভব। আমাদের জুনায়েদ ব্রো কি-না পারে? যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার– যে কিনা বক্সিং-এ এক্সপার্ট, একাডেমিকে সবসময় টপ রেজাল্ট ছিলো, একজন দেশসেরা বাইক রেইসার, একজন গুড ফাইটার, আর মেয়েদের হার্টথ্রোব। আর কী লাগে ভাই?
এবারে হৃদ বিস্ফোরণ ঘটালো তাদের মাঝে,
— জুনায়েদ, তোর ওয়াইফ কোথায়? তোকে দেখতে আসেনি?
মুহূর্তেই রাফি হেসে আটখানা হলো। রুদ্রও হেসে ফেললো এ’পর্যায়ে। রাফি চঞ্চল প্রকৃতির।তার মুখে কথা আটকায় না। হাসলোনা কেবল গম্ভীর আয়ান। জুনায়েদের মতিগতি সে বোঝার চেষ্টা করলো। মেয়েটার কথা কর্ণকুহর হতেই আপাতত যার আদলে কাঠিন্যতার ছাপ ভেসে উঠেছে। রাফি হাসতে হাসতেই বলে ফেললো,
— ওই মেয়েটা? ওইযে যার একটা বাচ্চা আছে? বোধহয় ও একটা ভদ্রমহিলাকে বিয়ে করেছে রে। জুনায়েদ, তোর গার্লফ্রেন্ডের কানে যদি এই খবর যায় কী হবে বুঝতে পারছিস? শেষে কিনা মোস্ট হ্যান্ডসাম গায়(guy) জুনায়েদ বিয়ে করেছে কাকে? একটা এক বাচ্চার মাকে!
জুনায়েদের এবার অশান্ত অনুভব হলো। সে ওই মেয়েটার জন্য আজ বন্ধুদের কাছে মজার পাত্র হয়ে গেলো? তার মেনে নিতে কষ্ট হলো বৈকি! ঠিক-ই তো। সেই মেয়েটা তো এক বাচ্চার মা-ই। জুনায়েদের তো তাকে কষ্ট দেওয়ার কথা। অবহেলা করার কথা। এমনকি আমিরার সাথেও না মেশার কথা। অথচ তার মনে হচ্ছে মেয়েটা তার কত কাছের। এবারে তার মেজাজ বিগড়ে গেলো। সে কপালটা নিজের তর্জনী এবং বৃদ্ধা আঙুলের সাহায্যে স্লাইড করতে করতে চোখদুটো বুজে নিলো। তাদের বললো,
— এখন যা তোরা, আমার ভালো লাগছেনা। একটু রেস্ট নিতে চাই।
আয়ান বোধহয় বুঝলো। বোঝার-ই কথা। জুনায়েদের সাথে তার বন্ধুত্ব বহু পুরনো। আয়ান সকলকে আদেশ দিলো,
— বয়েজ, চল আমরা বেরিয়ে যাই। এমনিতেও অনেক সময় হয়ে এসেছে।
রুদ্র মাঝখান থেকে গম্ভীর স্বরে বললো,
— তোরা যা, জুনায়েদের সাথে আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।
আয়ান ভ্রু কুঁচকালো। দ্বিধান্বিত স্বরে শুধালো,
— কী এমন ইম্পর্ট্যান্ট কথা যা পরে বলা যায় না?
রুদ্র শক্ত চোয়ালে তাকায়। প্রত্যত্তরে বলে,
— আছে, তোরা যা!
আয়ান পরিস্থিতি বুঝে সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো কেভিন হতে। রুদ্র এবার জুনায়েদের কাছে গেলো। নিচুস্বরে তাক ডাকলো,
— জুনায়েদ?
জুনায়েদ চোখ বুঁজে রাখা অবস্থাতেই জবাব দিলো,
— বল!
— তোর গার্লফ্রেন্ড আমাকে অনবরত টেক্সটস এন্ড কলস দিচ্ছে। কী করবো?
— অরিনকে বল সামলে নিতে।
জুনায়েদের শান্ত স্বর। রুদ্র’র ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হয়ে গেলো। রাশভারী কন্ঠে জবাব দিলো,
— অরিন কেনো?
জুনায়েদ এবার হাত সরায় চোখ হতে। বলে,
— এতোদিন এসব কেইস তো অরিন-ই দেখে এসেছে।
রুদ্র কিছু বলতে পারেনা। ওপর-নিচ মাথা নাড়িয়ে বেরিয়ে যায়। বেরিয়েই দেখতে পায় অরিন দাঁড়িয়ে বেজার মুখ করে। রুদ্র চেয়ে থাকে তার পানে। চোখে কী ছিলো? হয়তো একরাশ যন্ত্রণা!
জুনায়েদের বন্ধুরা যাওয়ার পরপরই সৈয়দ রুহানি এবং আয়রা ভেতরে প্রবেশ করলো। জুনায়েদ তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত প্রায় দশটা। হসপিটালে রাতে কে থাকবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আয়রা মিহি স্বরে বললো,
— আম্মু, আমি পারবো? আপনিও থাকুন নাহয়।
সৈয়দ রুহানি তা মানতে নারাজ।
— না, তুমিই থাকো। তাছাড়া আমার বয়স হয়েছে। এখন তো দৌড়াদৌড়িও করতে পারবোনা। রাতে কোনো বিশেষ প্রয়োজন হলে তুমি নাহয় আমাকে ডেকে নিও?
আয়রা নিরুপায় হয়ে মাথা নাড়ে। কী বিড়ম্বনায় পড়লো সে? সৈয়দ রুহানিকে সে বিদায় দিলো,
— ঠিকাছে আম্মু, আমি চেষ্টা করবো। ফি আমানিল্লাহ্!
সাবধানে যাবেন আপনারা দু’জন।
অতঃপর রুহানি সৈয়দ এবং এহমাদ শাহরিয়ার বেরিয়ে গেলেন। যেতে যেতে এহমাদ শাহরিয়ার স্ত্রীকে শুধালেন,
— কাজ টা কী সঠিক হলো?
সৈয়দ রুহানির স্বল্প শব্দে জবাব,
— একদম উচিত হলো!
জুনায়েদ সেই যে সন্ধ্যায় ঘুমালো তার সেই ঘুম ভাঙলো মধ্যরাতে। তখন আয়রা আমিরাকে সেখানে থাকা একটি সোফায় ঘুম পাড়িয়েছে। আমিরার মাথাখানা নিজের কোলে রেখেছে সে। সোফায় হাত রেখে মাথায় হাত ঠেকিয়েছিলো সে। কখন যে চোখদুটো লেগে গেলো টের পেলোনা সে। জুনায়েদ ঘুম থেকে ওঠার পর বেমালুম তার মস্তিষ্ক ভুলেই গিয়েছিলো যে সে অসুস্থ এবং সে হসপিটালে। ক্যানুলাযুক্ত হাতটি ফিরিয়ে নিতেই সে হাতে টান খেয়ে সে ব্যাথা পেলো। ফলস্বরূপ তার কন্ঠ ব্যথিত স্বর তুললো,
— আউচ!
তার এই ছোট্ট স্বরে ঘুম ভেঙে গেলো আয়রার। সে দেখতে পেলো জুনায়েদের হাতে থাকা ক্যানুলাটি স্যালাইন টানার পরিবর্তে তার রক্ত টানছে। আয়রা ভীত হলো। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অবচেতনে জুনায়েদের বা’হাতখানা নিজের তুলোর ন্যায় হাতের মাঝে নিয়ে নিলো। সাথে রোলার ক্র্যাম্পটি ঠিক করতে করতে সে সেই পরিস্থিতি হতে নাজাত পাওয়ার চেষ্টা করলো। অপরপার্শ্বে জুনায়েদ সম্পূর্ণ হতভম্ব এবং হতচকিত হয়ে রইলো। আকস্মিক আয়রার এমন আগমন সে বুঝে উঠতে পারেনি। জুনায়েদের মনে হলো তার দেহ থেকে বুঝি রুহটা এক্ষুণি পালিয়ে যাবে। কেমন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ব্যক্তির ন্যায় সে হাওয়ার বেগে হাত সরিয়ে নেয়। আয়রা চমকে যায়। জুনায়েদ বড় বড় শ্বাস নেয়। আয়রা ব্যস্ত কন্ঠে বলে,
— আমাকে মাফ করবেন, আমি মোটেই আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি। রক্ত উঠে যাওয়ার দরুণ আমি তা কেবল ঠিক করতে চেয়েছি…
ততক্ষণে রক্ত ওঠা বন্ধ হয়ে স্যালাইন পরতে আরম্ভ করেছে। সে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দিলোনা। আর না-তো পরবর্তীতে। আয়রা তার জবাবের অপেক্ষায় রইলো কিছুক্ষণ। অতঃপর তার জবাব না পেয়ে সে দেয়াল ঘড়ির পানে তাকালো। তখন প্রায় রাত তিনটার কাছাকাছি। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সৈয়দ রুহানির দিয়ে যাওয়া জায়ানামাজখানা বের করলো। অযু করে এসে তাহাজ্জুদে বসে পড়লো। তাহাজ্জুদ– যা ফজরের আগে এবং এশারের নামাজের মধ্যকার সময়ে পড়া হয়। তাহাজ্জুদের সময় মধ্যরাত। এসময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যরাতের এই নফল সালাত আদায় করাটা অতি প্রশান্তিদায়ক। রাতের নির্জনতায় আল্লাহর ইবাদত করলে তাতে মহান আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করার সম্ভাবনা থাকে অধিক মাত্রায়। তাছাড়া, তাহাজ্জুদের এই নামাজে দোয়া এবং তওবা উভয়-ই কবুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে বহুগুণে। তাহাজ্জুদের এই নামাজ মানবমনে প্রশান্তির হাওয়া বইয়ে দেয়। আর এই লাফজগুলো আয়রা খুব করে মানে। তার অশান্ত মন কেবলমাত্র আল্লাহতায়ালার নৈকট্যেই সঠিক
হতে পারে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। আয়রা তাহাজ্জুদের নামাজে বসে পড়লো। আর জুনায়েদ তার দিকে অপলক দৃষ্টে চেয়ে রইলো। সময়টা যেনো থমকে গেলো। রাফির বলা সেই কথাটা তার মনে হলো– সে বলেছিলো আয়রা এক বাচ্চার মা বলে কোনো ভদ্রমহিলা হবে হয়তো। জুনায়েদের কী তখন তাকে উত্তর দেওয়া উচিত ছিলোনা? বলা উচিত ছিলোনা যে– ঠিক কতটা অপরূপ এই রমণী?
আয়রা জানতে পারলোনা তার স্বামী তার পানে চেয়ে রয়েছে মুগ্ধতার দৃষ্টিতে। সে কেবল নামাজ শেষে দোয়া চাওয়ার বেলাতে অনেকখানি করে তার জন্য দোয়া চায়লো। যেমন-ই হোক, যতই হোক–জুনায়েদ তার স্বামী। এবং স্বামীর সেবা করা স্ত্রীর ধর্ম। অতীত নিয়ে সে কেবল শুকরিয়া আদায় করলো। কোনো নালিশ নয়। নালিশ করলে কী তার খোদ আল্লাহতায়ালার সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হতে পারে না? মনে প্রাণে তার ভরসা রয়েছে নিজের রবের ওপর। সেহেতু, অহেতুক নালিশ না ছুঁড়ে তা কেবল সে আল্লাহতায়ালার এক পরীক্ষা হিসেবে ভেবে নিলো। ভারী হয়ে আসা হৃদয় ও মুহূর্তেই প্রশান্ত হলো। তার কান্নাগুলো উগড়ে আসার পূর্বেই নিজেকে সে সামলে নিলো।
তাকদীর পর্ব ৬
সময় যেনো সেখানেই থমকে গেলো। জুনায়েদ চেয়ে রইলো জায়ানামাজে বসে থাকা রমণীটির পানে। সে চোখ ফেরাতে পারলোনা চেয়েও। এটা কী দোয়ার আছর হতে পারে? নারীদের অর্ধনগ্ন পোশাক দেখতে দেখতে যে অভ্যস্ত সেখানে তার মতো পুরুষ তাকিয়ে রয়েছে তার দ্বীনদার স্ত্রীর পানে। হয়তো একারণেই ইসলামে বিয়েকে এতোটা পবিত্রস্থানে রাখা হয়েছে। যা একে অপরের প্রতি প্রবলমাত্রায় টান সৃষ্টি করে। অন্যরকম এক ভালোলাগা উৎপন্ন করে। জুনায়েদের ক্ষেত্রেও বোধহয় তা-ই হচ্ছে!
