তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৭
রাফিয়া জান্নাত রিফা
নিধি তালুকদার নিবাসের বিশাল লোহার গেটের পাশে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাল ফুলিয়ে রেখেছে সে, মুখে অভিমানের ছায়া, অথচ সে অভিমানের পেছনে কোনো যুক্তি নেই শুধু এক অদ্ভুত অধীর অপেক্ষা।
বারবার চোখ তুলে তাকাচ্ছে গেটের দিকে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পদধ্বনি তারই প্রতীক্ষার মানুষটির আগমনের ইঙ্গিত বয়ে আনবে। কিন্তু না কোথায় সে? কোথায় সেই নিধি জাঙ্গিয়া ম্যান? তবে কি সে ভুলে গেছে এই নিধিকে?
নিধির ভ্রু কুঁচকে উঠল, ঠোঁট উল্টে নিলো শিশুর মতো। রাগ, অভিমান, আর অজানা আকুলতার মিশেলে বুক ভরে উঠছে। কেন সে এমন করে ব্যাকুল হয় ঐ মানুষটার জন্য? কেন তার মুখ না দেখলে কান্না পায়? চোখে জল টলমল করে উঠছে,। গেটের দিকে তার দৃষ্টি স্থির অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
অবশেষে, দূর থেকে ভেসে এলো তাড়াহুড়োর পদধ্বনি আর্দ্র আসছে হনহনিয়ে,সেও নিধিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল এতক্ষণ ধরেই। গেটের বাইরে পা রাখতেই নিধির চোখে পড়ল তাকে। মুহূর্তেই অভিমানের জোয়ারে তার রাগ আরও বেড়ে গেল।
সে-ও তখন হনহনিয়ে সোজা পথে এগিয়ে গেল, যেন মুখোমুখি হওয়াটাই হবে তার জন্য আত্মঘাতী। অথবা হয়তো, তার প্রতীক্ষার শেষ।
আর্দ্র চারদিকে চোখ বুলিয়ে একবার ডানে, একবার বাঁয়ে তাকাল। অবশেষে সে পেল নিধিকে অভিমানভরা মুখে হনহনিয়ে হাঁটছে সে, এমনভাবে হাঁটছে যেন , এই বুঝি পড়ে যাবে। নিধিকে এভাবে হাঁটতে দেখে আর্দ্রর বুক ধকধক করে উঠল। আর দেরি না করে সে ছুটে গেল তার পিছু পিছু, দৌড়াতে দৌড়াতে হাত উঁচিয়ে ডেকে উঠল,,
— নিধি! স্পট! দ্বারা ও, কতক্ষণ ধরে খুজছি তোমার?
কিন্তু নিধি থামল না। মুখ ভার করে, ঠোঁট কামড়ে সমানে বিরবির করে চলেছে ,তার ক্ষীণস্বরে বলা কথাগুলো কেবল নিজেরই শোনা ।আর্দ্র আবার হাঁপাতে হাঁপাতে ডাকল,,
— নিধি! স্পট! থামো বলছি, দৌড়াতে পারছি না আর!
তবুও নিধি থামল না। এবার আরও জোরে বিরবির করে বলল,,
— থামব না আমি! কিছুতেই না! হাজারবার ডাকলেও না!পিছু পিছু আসলেও থামবো না।
আর্দ্র এবার বুঝল এই মেয়েকে চিৎকারে, অনুরোধে থামানো যাবে না। তাই সে নিজেই থেমে গেল। নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়ল ঠিক সেখানেই। মুখে এক স্নিগ্ধ, মৃদু হাসি ফুটিয়ে তুলল, চোখে দৃঢ় এক বিশ্বাসের ঝিলিক।
তারপর ধীরে ধীরে আঙুল তুলে কাউন্ট শুরু করল,,
এক…
দুই…
তিন…
চার…
নিধি শুনতে পাচ্ছিল না ঠিকমতো, তবু কিছু একটা ভেবে যেন থমকে গেল।আচমকা নিস্তব্ধতা না কোনো ডাক, না কোনো শব্দ। তাই থেমে গেল পায়ের গতি। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। কিছুটা ইতস্তত করে, আস্তে আস্তে পিছন ফিরে তাকাল।
ঠিক তখনই আর্দ্র শেষ কাউন্ট এ বলল,,
পাঁচ…
তার বিশ্বাস অটল ছিল যে পাঁচ বলাতেই নিধি ঘুরে তাকাবে, তাকাতেই হবে।
আর সে ঘুরলও ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন আর্দ্রর চোখে ছিল একরাশ প্রশান্তি আর ভালোবাসার ঝিলিক।সেই হাঁসি বেশি ক্ষন রাখলো না আর্দ্র, এখন হাসলে চলবে, মুহূর্তেই মুখ খানা কে অসহায় করে কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে আর্দ্র বলে,,
__ আমায় রেখে চলে যাচ্ছো?
নিধির মুখ কুঁচকে উঠল, ভ্রু দু’টো কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে জোড়া হলো। ঠোঁটের কোণে একটুখানি বিরক্তির রেখা, তারপরই মুখ ভেংচে সে অন্য দিকে ফিরল। একটিও শব্দ উচ্চারণ করল না।
আর্দ্র স্নিগ্ধ, স্নেহভরা চোখে নিধির সাজসজ্জা নিরবে পরখ করে নিল। চোখে মৃদু বিস্ময়, ঠোঁট ফসকে শব্দ বেরিয়ে এল,,
— মাশাআল্লাহ!
শব্দটি নিধির কানে পৌঁছাল, যদিও অস্পষ্টভাবে। কিন্তু নিধি তো সহজে গলে যাওয়ার মেয়ে নয়। সাম্প্রতিককালে এই মানুষটা যেন তার প্রতিটি মুহূর্তে ছায়া ফেলে রেখেছে।খাওয়ার টেবিলে সেই তার মুখ, বইয়ের পাতায় ও সেই মুখ, এমনকি আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বেও এখন আর নিজের মুখটি স্পষ্ট দেখা যায় না সেখানেও জায়গা জুড়ে থাকে আর্দ্রর মুখ। নিধির জন্য তা একেবারেই অসহনীয়, জ্বালাময়ী এক অভিশাপ যেন।
আর্দ্র ধীরে ধীরে নিধির কাছে এগিয়ে এল। নিধি তখনও মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। আর্দ্রর প্রবল ইচ্ছে হলো, নিধির থুতনিটা আলতো করে হাতে তুলে নিজের দিকে ফেরায়। কিন্তু সেটি করা যে নিষিদ্ধ, তা তো ভালো করেই জানে। তাই মুখে মায়াময় হাসি এনে বলল,,
— কি হলো? মুখ ফুলিয়ে রেখেছ কেন? মেজো মায়ের বকুনি খেয়েছ বুঝি?
কথাটা শেষ হতেই নিধির রাগ যেন আরও তীব্র হলো।মুখের প্রতিটি ভাঁজে রাগের আগুন ছড়িয়ে পড়ল। কী করবে বুঝে উঠতে না পেরে সে কিছুক্ষণ কটমট চোখে আর্দ্রর দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু রাগ তো থামছে না! শেষমেশ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে, আর্দ্রর হাতে থাকা ফোনটা কেড়ে নিয়ে জোরে ছুড়ে ফেললো মাটিতে ।
আর্দ্র দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে এক মুহূর্তের জন্য অবাক হওয়ার ভান করলো, সত্যি তো একটুও আবাক হয়নি। তারপর ধীরে মাটিতে ঝুঁকে পড়ে থাকা ফোনটা তুলে নিলো। মাটিতে পড়ায় তেমন কিছুই হয়নি, তবে ভেঙে গেলেও তাতে আর্দ্রর বিশেষ কিছু যেত-আসত না। বরং এমন হাজারটা ফোন নিধির হাতে তুলে দিয়ে সে আর বলত,
“নাও, যত খুশি আচার মেরে ভাঙো, তবুও রাগটা কমুক তোমার।”
পকেট থেকে রুমাল বের করে ফোনটা আলতো করে মুছে নিধির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,,
— এই যে, ধরো। এবার আবার একটা আচার মারো। তবে এবার জোরে,এমন জোরে যেন একেবারে চুরমার হয়ে যায়, আচ্ছা?
নিধির রাগ বোধহয় খানিকটা হলেও কমে এল। নিজেও যেন বুঝতে পারছিল না, এত রাগটা কেন হচ্ছিল! মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অভিমানের সুরে বলল,,
— ভাঙবো না! আপনি চলে যান।
আর্দ্র অসহায় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,,
— কোথায় যাবো,সেটা তো বলো?
নিধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্ত হয়ে বলল,,
— যেখানে খুশি যান।
এই বলে মুখটা ঘুরিয়ে নিলো নিধি।
আর্দ্র এক পা এগিয়ে এসে নিধির কাঁধের উপর ছড়িয়ে থাকা আঁচলের এক কোণা আলতো করে নিজের হাতে পেঁচিয়ে ধরে বলল,,
— এই যে, ম্যাডাম, অনুমতি বিহীন আপনার আঁচল ধরলাম আর ছাড়ছি না কিন্তু। কী অনুমতি দিলেন তো?”
নিমিষেই নিধির সমস্ত রাগ, অভিমান গলে জল হয়ে গেল। মুখে ফুটে উঠল প্রশস্ত এক হাসি এমন হাসি, আবার কোথাও লজ্জার হালকা রেশও ছুঁয়ে গেল তার মনে।
এই বলে হাসতে হাসতে নিধি সামনে চলতে লাগল। তার পিছু পিছু শাড়ির আঁচল ধরে আর্দ্রও ঢলে ঢলে হাঁটতে লাগল।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে ইতি, বিথী আর সুহানা অবাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। তাদের ঠিক পেছনে আলবানও যেন কোনো নীরব দর্শকের মতো মনোযোগ দিয়ে দেখছিল আর্দ্র ও নিধির নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রকাশ।
সুহানার চোখের কোণে টলমল করা জল, মুখে কৌতুকমাখা আকুলতা,,
— আল্লাহ, আমার শাড়ির আঁচল ধরার মতো কাউরে পাঠাও, আর যদি না পারো পাঠাইতে, তাহলে এমন শাড়ির আঁচলরে ঠাডা দিয়া মাইরা লও!
তার কথা শুনে ইতি আর বিথী নিজেদের ফাঁকা আঁচলের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ঠোঁট বেঁকিয়ে নিজেদের ভাগ্যকেই যেন উপহাস করল।
বিথী একটু মুচকি হেসে ইতির দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল,,
— শাড়ির আঁচল ধরা এটাও ছেলেদের কাজ রে ইতি?
ইতি আর্দ্র ও নিধির পানে তাকিয়ে হেসে বলল,,
— হ্যাঁ, একদম তাই।
বিথী সঙ্গে সঙ্গেই হেসে যোগ করল,,
— আমার ভবিষ্যৎ গোলামের পুতরে দিয়ে এমনিতেই তো কাপড় কাচা, রান্না-বান্না, ঝাড়ু দেওয়া, শপিং করা, খাওয়ানো সব করাবো। আবার শাড়ির আঁচলটাও ধরাবো? এতো কাজে বেচারা মরে টরে যেতে পারে, থাক দরকার নেই।
এই বলে নিজেই নিজের যুক্তিতে সান্ত্বনা পেয়ে মুখ নামিয়ে হাসল বিথী।তার সেই কথা শুনে ইতি আর সুহানা হো হো করে হেসে উঠল। মুহূর্তেই তারা একে অপরের হাত ধরে সরল পথ ধরে হাঁটতে লাগল মেলায় কী কিনবে, কী খাবে, কী করবে সেই নিয়েই গল্পে মেতে উঠল তিনজন।
তাদের কিছুটা পেছনে, আলবান আর দির্শক হাঁটতে লাগলো।
নিধির আঁচল এখনও আর্দ্রর আঙুলে জড়ানো, বাতাসে দোল খাচ্ছে তাদের হাসির ছায়া।
মেলার উজ্জ্বল প্রভাতে, শুভ্র সমুজ্জ্বল মুন্ড লুঙ্গিতে সজ্জিত নাজিম তালুকদার, নাঈম তালুকদার, নাজির তালুকদার ও সুহানার পিতা সাফিন তালুকদার একত্রে হাটছেন ও ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করছেন। তারাই মেলার আয়োজনের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
তাদের ঠিক পেছনে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন আলিফা বেগম, সিদ্দিকী বেগম, মিলি বেগম, নিলা বেগম ও মাইশা বেগম। সাদা দীপ্তিময় শাড়িতে তাদের রূপ যেন সকালবেলার আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পরস্পরের কথোপকথনে তারা মগ্ন, চোখেমুখে প্রশান্ত হাসির আভা।
আরও কিছুটা পিছনে, আছিয়া বেগম ও সাহিদা বেগম। একে অপরের হাত দৃঢ়ভাবে ধরে হাঁটছেন তারা। কানে কানে স্বামীদের নিয়ে গোপন ফিসফাসে তাদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে চিরচেনা নারীর মৃদু দুষ্টুমি ও দীর্ঘ জীবনের বন্ধুত্বের কোমলতা।
সবশেষে, দৃশ্যপটে দেখাআ গেল মুহিন ও পিকি। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুইদিনে তাদের মধ্যে অনেক ভালো বন্ধুত্ব পূর্ণ ঘনিষ্ঠতা জন্মেছে।মিল হবে না আবার, তালুকদার মঞ্জিল তো পিকি আর মুহিনকে এক সাথেই রাতে ঘুমোতে হয়, তাদের দুজনের জন্য একটা রুম বরাধ্য। এদের এতো অটুট বন্ধন হয়েছে যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এখন প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় তাদের একসাথে, হাস্যরসে ভরপুর মুহূর্তে। মুহিনের পরনে লুঙ্গি ও শার্ট কিন্তু আহা! এই লুঙ্গিই যেন তার পরীক্ষার কারণ। অন্তত পাঁচবার পড়ে গিয়েছিল সে, আর প্রতিবারই পিকি ছুটে এসে তাকে আকারে ধরেছিল, রোমান্সের রঙে আঁকা সিনেমার ফ্রেম যেন,সে কি রোমান্টিক চিএ। এ নিয়ে কতবার যে তাদের চোখাচোখি হলো তা বলা বাহুল্য।ভালোবাসা টালোবাসা নয় কিন্তু ?ওই একটু ক্ষণস্থায়ী থ্রিলার আর কি ।
ফ্যাশন ডিজাইনের পিকির ড্রেস মানে অসাধারণ, নিজের হাতে তৈরিকৃত বলে কথা, অনন্যা সৌন্দর্য তো থাকবেই।সব থেকে ইউনিক সাজ পিকির,হাতা কাটা শার্ট দারুন কারুকাজে ভরা। শার্টের কোনাকুনি গুলো চুপকি দিয়ে ভরা, গলায় মালা ও আছে? ঠোঁটে লাল লিপস্টিক ভরা,আজ মেকআপে ডিপ ভিবস, হাইলাইটার এমন চকচক করছে যে, পিকির মুখ দেখেই মেলা মাঠে বিদ্যুৎ চমকাবেই,আইম শিওর।রেম্প ওর্য়াকের মতো সুন্দর করে হাঁটছে পিকি,আর কি সব ভেবে যাচ্ছে, পরক্ষণেই মুহিন কে বলল,,
__ মুহিন টুমি কিন্তু মেলায় এদিকে ওদিকে যেয়ো না,হাড়িয়ে যেটে পারো।
মুহিন গাল ফুলিয়ে বলে,,,
__ আমাকে কি তোমার ছোট মনে হয় পিকি?
পিকি হেসে বলে,,
__ টুমি তো ছোটোই?
__ মোটেও না।
__ মোটেও হ্যাঁ মুহিন?
মুহিন যেই আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি, পায়ের সাথে লুঙ্গি প্যাঁচ খেয়ে নিচু হয়ে পিকির কোমর আঁকড়ে ধরলো মুহিন।
এবং ভুলবসত পিকির লুঙ্গির গোছটা হাত দিয়ে ধরলো,যার ফলে পিকির লুঙ্গির ভাঁজ খুলে আসার উপক্রম।আৎমিক এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে গেলো পিকি,লাল লাল অধর জোরা দুদিকে সরে গিয়ে ফাক আকার হলো।
মুহিন এখনো পিকির কোমর আঁকড়ে ধরে আছে। এদিকে বেচারা পিকির লুঙ্গির এক পাশ মাটিতে লুটিয়ে আছে।হুস আসতেই ধরফরিয়ে উঠে কোন রকমের নিজের ইজ্জতটা বাচায় পিকি,দুহাত দিয়ে লুঙ্গি পেটে চেপে রাখলো।
মুহিন ও আর সময় বিলম্ব না করে নিজের লুঙ্গি গোছটা আলতো করে ধরে উঠে দাঁড়াল। মুমিনের তো জানাই নেই যে সে পিকির ইজ্জতের ফালুদা বানিয়েছে।মুহিন বেশ রয়ে সহে নিজের লুঙ্গির ধুলো ঝাড়তে লাগলো।
পিকি একবার নিজের লুঙ্গির দিকে তাকলো, সব ভাজ ও গোছ এলোমেলো হয়ে গেছে,কেমনটা লাগে?এই মাঝরাস্তায় এ কি বিপদে পড়লো মুহিন?ইসস কি কষ্ট করে এই লুঙ্গি খানা পড়েছিল,সেই সকাল ছয়টা থেকে এই লুঙ্গি পড়া শুরু করেছিল।এখন?এখন এটা কি হলো?এখন কি করবে পিকি?এই মাঝ রাস্তায় মানুষ তাকে এভাবে দেখলে হাসবে?ছি এটি বড্ডো অপমান জনক? অসহায় কন্ঠে পিকি বলে,,,
__ এটা কি করলে মুহিন?
মুহিন পিকির পানে মাথা তুলে তাকাতে তাকাতে বলে,,
__ কি করলাম….
তখনি স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেল পিকি কে ,যে কিনা লুঙ্গি পেটে জরিয়ে ধরে জড়োসড়ো হয়ে আছে,দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কেউ জোর করে তার লুঙ্গি হয়তো খুলে দিয়েছিল। কিন্তু মুহিন বুঝলো অন্যকিছু,মুখে দু হাত চেপে আবাক হয়ে বলল,,,
__ক কে এমন করল?তুমি ঠিক আছো তো?
পিকি এবার খুব জোরে কান্না পেল,,,
__ আমি ঠিক নেই মুহিন?আমার ইজ্জত বাচাও?
চোখ বড় বড় করে মুহিন বলে,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন,কে এমন জঘন্য কাজটা করলো?
পিকি এই বুঝি কেঁদেই দেয়,পিকি সভাবতই এমন তার পোশাক ছিটেফোঁটাও কিছু হলে, কান্না করে দেয় যদিও তা প্রকাশ পায় না,বড্ডো ইমোশনাল জরিয়ে আছে ফ্যাশনে। কিন্তু এখন?এখন মুহিনই এমনটা করলো, মুহিন কে তো কিছু বলতেও পাবে না পিকি,মুহিনকে বড্ড সেহ্ন করে, কিন্তু মুহিন তো নিজেই এমন করলো,তাও কেন সে বুঝছে না। কাঁদো কাঁদো স্বরে পিকি বলে,,,
__ আচ্ছা এসব বাদ দেও এখন,এখন এটা ঠিক করবো কি করে তাই বলো।
মুহিন কিছুক্ষণ আকাশপানে তাকিয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবলো,তারপর বললো,,,
__ ওই বটগাছটার পিছনে চলুন?
একটু দুরেই বড় একটা বটগাছ দেখা যাচ্ছে, সেদিকে পিকি হতভম্ব হয়ে দৌড়ে গেল, মুহিন ও গেল।পিকি বটগাছে সামনে দাঁড়িয়ে বলল,,
__ এখন কি করবো?
মুহিন বলে,,
__ পিছনে চলুন?
পিকি তড়াৎ করে বটগাছে পিছনে গেল, মুহিন যাবে কিনা এ নিয়ে পড়লো মহা বিপাকে,তখনি পিকি হাক ছেড়ে ডাকলো,,
__ মুহিন আসো?
মুহিন কিছুটা ইতস্তত বোধ করে গেল,পিকি লুঙ্গির একমাথা মুহিন কে ধরতে দিলো,চোখ জোড়া বন্ধ করে লুঙ্গি এক মাথা ধরলো, পিকি কিছুতেই আর আগের মতো করে লুঙ্গি পড়তে পাচ্ছে না,হচ্ছেই না, লুঙ্গির মাথা এপাশ থেকে ওপাশে করলো,এপাশে এনে গেটালো তাও হচ্ছে না সব এলো মেলো হয়ে গেল আরো। এদিকে ঠাড় চোখ বন্ধ করে আছে মুহিন,তা দেখে পিকির একটু রাগ হলোই বৈকি,,,
__ ওভাবে চোখ বন্ধ করে আছো কেন মুহিন, তলে আমার থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট আছে দেখছো না?
মুহিন পিট পিট করে চোখ মেলে তাকাল পিকি পায়ের পানে, মোটামোটা পায়ে কোন লোমকূপ ও নেই,থাকবেই বা কি করে?সে যাই হোক।
এদিকে হঠাৎ করে এক লোক ধান ক্ষেতের ভিতরের মাল্লি দিয়ে সোজা পিকিদের দিকে এসে, ঝাপানোর মতো করে বলে,,
__ নষ্টামী, নষ্টামী হচ্ছে,ছি ছি ,কেই গো কে কোথায় আছো গো,দেইখা যাও আমগো গ্রামে নষ্টামী চলছে?
এই ভদ্রলোক মূলত অনেক ক্ষন ধরেই পিকি ও মুহিন কে পর্যবেক্ষণ করছিল,ব্যাস এখন এসে বোম বাস্ট করলো। নষ্টামী বলতে কি বুঝলো তা আল্লাহ মাবুদ জানে,তবে ওই যে মুহিন চোখ বন্ধ করে পিকির লুঙ্গির একপাশ ধরে রাখছিল, ব্যাস এতেই যা বোঝার বুঝে গেছে ওই ভদ্রলোক।
পিকি মুখ কুঁচকে বলে,,
__ হোয়াট নষ্টামী?
ভদ্রলোক বলে,,,
__ ওই যে দেখা দেখি করছেইন ওইডাই নষ্টামী?
__ ওহহ আচ্ছা এটা ভালো না খারাপ?
__ অবশ্যই খারাপ।
পিকি এবার মুহিনের দিকে তাকায়, মুহিনের মুখ খানা চুপছে গেছে।
কিছু লোক ও সেখানে এসে জড়ো হলো,তারা নানান ধরনের কথা বলতে লাগলো। মুহিন নিজের মধ্যে কথা বলার প্রবল জোর আনলো,গলা তুলে বলল,,,
__ ক ক কি সমস্যা কি আপনাদের? আ আমরা কেন কোন নষ্টামী করতে যাবো?
সেখানে জোড়ো হওয়া কিছু লোকের মধ্যে একজন মহিলা খুব সুক্ষ্ম করে পিকি কে পরখ করে বলে,,,
__ ও মলো যা,এই ছেলে না মেয়ে গা?কিছুই বুইঝা উঠতে পাচ্ছি না,এ কেমন পোশাক।
অন্য একজন বলে,,,
__ আরেহ যাই হোক, বিয়ে দিয়ে দিন।
মুহিন চুক্ষু চড়াক গাছে, লোকগুলোর নিশ্চিত মাথামোটা?না হলে এমন কথা বলে কি করে। শেষে কিনা এভাবে কট খেলো তাও আবার এক হিজরার সাথে। না,না এটা কি করে হয়, মুহিনের তো খুব শখ ছিলো কোন এক অচেনা সুন্দরী মেয়ের সাথে কট খেয়ে বিয়ে করা?শখ খানা পূরন হলো তবে এভাবে না হলেও পারতো। মুহিন এবার রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ কি বলছেন আপনার জানেন,চিনেন আমাদের? জানেন আমরা কে?
পিকি থ লেগে দেখছে সব,মুহিনের সাথে হবে তার বিয়ে বিয়ে,এই কথাটাই পিকির মনে আগুন লাগানোর জন্য সেরা রেহহহহহহহহ।কি হাস্যকর লাঞ্ছনা?ছ্যা।
ভদ্রলোক মুহিনের প্রশ্নে বলে,,,,
__ কে তা জেনে লাভ নাই আমগো, নষ্টামী করছো মানে,এখন তার প্রতিদান দিতে হইবো ।
মুহিন গলার খাদ নামিয়ে আমতা আমতা করে বলে,,,
__ ক কি প্রতিদানের কথা বলছেন?
__ বিয়ে?
__ কিইইইই?মাথা গেছে আপনাদের।
__ ওমন নষ্টামী করে ধরা পরলে, আমগো গ্রামে নিয়ম অনুযায়ী তাগো বিয়া দেই।
__ আরেহহ সেটা তো মেয়ে ছেলে ধরা পড়লে বিয়ে দেন, কিন্তু পিকি আর আমি তো,…
ভদ্রলোক বেশ দৃঢ়ভাবে টানটান হয়ে বলে,,,
__ এই নিয়ম সবার জন্যই সমান সমান।
লে হালুয়া,কাউয়ার ঘরে চিলার ডাক,এ কেমন নিয়ম লো? মুহিন ও পিকি দুজনেই দুজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো।
__ কি হয়েছে এখানে?
হঠাৎ পুরুষালী গম্ভীর কন্ঠে হাক ছাড়লো আলবান,দির্শক ও তার পাশে দাঁড়িয়ে।দির্শক মুহিন ও পিকির দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ তোমরা এইখানে?
আলবান পিকির লুঙ্গি পেটে চেপে ধরে থাকা দেখে বলে,,
__ লুঙ্গি খুললো কি করে?
পিকি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি ভদ্রলোক বলে,,,
__হাতে নাতে ধরেছি?
দির্শক বলে,,
__ কি ধরেছেন?
__ আরেহ নষ্টামী করছিল, তারপর আমি এসে হাতে নাতে করি?
বেশ ভাব ভঙ্গি নিয়ে কথা খানা বলল ভদ্রলোক।
দির্শক ও আলবানের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, দু’জনেই দু’জনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো, পরক্ষণেই আলবান গর্জে বললো,,,
__ এ্যাত চুপেন মিয়া,যান এখান থেকে?
আলবানকে ভদ্রলোক চিনলো না ,চিনির কথাও না, অনেক বছর পর গ্রামে এসেছে, সেক্ষেত্রে আলবান কে কেউ চিনতে পারলো না।
দির্শক বেশ মজা করেই বলে,,,
__ আচ্ছা বলেন দেখি,কি নষ্টামী করেছ,মানে সংঙ্গা টা দিন।
ভদ্রলোক থমথমে খেয়ে গেল কিন্তু তাও দমে যায় না আমতা আমতা করে বলে।,,
__ ইয়ে মানে, লুঙ্গি পুরোটাই খুলেছিল,আর এই ছেলেটা তা দেখছিলো?একা অবশ্যই নষ্টামী।
আলবান ও দির্শক এতে হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারছে না,এটাও আবার নষ্ঠামী নাকি,নাহ মোটেও এটা কান্না করা কথা নয়?, অবশ্যই এটা হাঁসির কথা। কিন্তু তারা হাসলো,আবার এঁকে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে আলবান ও বেশ মজা করে ভদ্রলোককে বললো,,,
__ আপনি কি কিছু দেখেছেন ?
__ না না একদম না, ছ্যাঁ আমি ওসব কেন দেখতে যাবো,আমার চরিত্রে ফুলের মতো পবিত্র।
দির্শক ঠোঁট কামড়ে হাঁসি আটকে বলে,,,
__ ওহহহহ,এখুনি বুঝলাম।
দির্শক এবার পিকির দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ তা পিকি লুঙ্গি টা খুলে দেখাও ওনাদের,ওনারা দেখতে চাচ্ছে?দেখাও?
পিকি ও দির্শকের কথা মতো লুঙ্গি খুলতে যাবে এমন সময় ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে বলে,,,
__ আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউযুবিল্লাহ সি সি আমি ওসব দেখতে চাই না,আমি কট খেয়ে ওনারে বিয়ে কইততে চাই না,আমি ভালা মানুষ,আমার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র।
আশেপাশে জড়ো হওয়া লোকগুলো এমন কথা শুনে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে,চলে গেল নিজ গন্তব্যে।
এবার আলবান বলে,,,
__ পিকি দির্শক যেটা বললো সেটা কর?
পিকি এবার সত্যি লুঙ্গি দু প্রান্তে ধরলো, ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করেই আছে,তা দেখে দির্শক বলে,,,
__ চোখ খুলুন, ট্রেলার দেখুন।
ভদ্রলোক পিটপিট করে চোখ খুলল,দেখলো হাঁটু পর্যন্ত থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়েছে,কই এখানে তো কোন কিছু দেখার ছিটেফোঁটাও নেই,তবে কি দেখলো ভদ্রলোক। মুহূর্তেই মুখ আমুট চামুট করতে লাগলো,চোখ এদিক ওদিক ঘুরাতে লাগলো।পিকি এবার হাসতে হাসতেই বলে,,,
__ লুঙ্গি খুলে যাবে বলেই তো এত বড় প্যান্ট পড়েছি,?
বলেই হো হো করে হাসতে লাগলো পিকি, মুহিন তো মুখে কুলুপ এঁটেছে,মুখে কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া নেই,তার সাথেই কেন এমন হয়? কেন তাকেই পিকির সাথে জরিয়ে হনোতনো করা হয়?নাহ আর পারছে না মুহিন, মুহিন খুবই হতাশ।
দির্শক আলবান মুখে হাত ভাঁজ করে হাসছে, পরক্ষণেই আলবান পিকির লুঙ্গি ঠিকঠাক করে পড়িয়ে দিলো। ব্যাস লুঙ্গি ম্যাটার ক্লোজ।
দির্শক মুহিনের ওমন থমথমে মুখ দেখে, নিজের হাঁসিকে সংযত রেখে বললো,,
__ মুহিন কি হয়েছে?
মুহিন টেনেটুনে হেঁসে বলে,,,
__ কিছু না দির্শক স্যার।
__ আমি তোমার স্যার হই কিভাবে?
__ মা বলেছে বাড়িতে গিয়ে আপনি আমাকেও রোজ পড়াবেন?
দির্শক মুহিনের কথায় হাসলো।
সবার অবস্থা এখন মেলায়।তালুকদার বাড়ির সবাই বসেছে মেলার বড় প্যান্ডেলের চকচকে চেয়ারগুলোয়। চারদিক জুড়ে উৎসবের রঙিন ছোঁয়া আকাশে দোল খাচ্ছে কাগজের ফানুস, বাতাসে ঝুলছে রঙিন কাগজের মালা। প্যান্ডেলের চারপাশে বাঁশের খুঁটিতে জড়ানো ঝলমলে রঙিন কাগজ গুলো ঝলমল করছে।
দোকানের সারি যেন এক রঙের মিছিল কেউ বিক্রি করছে মাটির হাঁড়ি, কেউ বেতের ঝুড়ি, আবার কারও দোকানে সাজানো আছে রঙচঙে খেলনা, কাঠের ঘোড়া আর কাচের বালা। বাতাসে ভেসে আসছে গুড়ের জিলাপি আর ভাজার তেলের মিষ্টি গন্ধ। দূরে নাগরদোলা ঘুরছে ধীরে ধীরে।মেলার পাশেই একটা ছোট নদী তাতে স্পীড বোর্ড টাকা দিয়ে নদী ঘুরাছে মানুষ জন।
মেলার এই আলো-হাওয়ায় গ্রামের মানুষ যেন নতুন প্রাণ পেয়েছে। হাসির ঝলকানি, গল্পের আড্ডা আর শিশুর উল্লাসে চারদিক ভরে উঠেছে। সেখানে ইতি, বিথী, নীধি মোটেও বসে থাকতে ইচ্ছুক নয়,বাবা,বড় বাবাদের ভয়ে সেখানে বসে থাকতে বাধ্য। বিথী সমানে তার মায়ের বাহু গুঁতাগুঁতি করছে আর বলছে,,
__ মা বাবা,বড় বাবাকে বলো না,একটু ঘুরে আসি,এই যাবো আর এই আসবো।
সিদ্দিকী বেগম বিরক্তি রেশ টেনে বলে,,,
__ এতো এতো লোকের ভিরে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই,পড়ে একসাথে যাবো।
এবার ইতি বলে,,
__ এমন কেন করছো মা, প্লিজ বলো প্লিজ প্লিজ প্লিজ।
এবার নিধি ও কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,,,
__ মা আমরা এক যাবো না তো , আর্দ্র ভাই,আলবান ভাই, দু্ষ্শমন স্যার আরো সবাই যাবে আমাদের সাথে।
মহা বিরক্ত হলেন সিদ্দিকী বেগম,এদের সাথে আর পেরে উঠলো না,ইতি বিথী নীধি বাবা কানে কানে কথা খানা বললেন সিদ্দিকী বেগম,তিনিও মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলে,তা দেখে তড়িৎ বেগে তিন বোনেই চেয়ার থেকে উঠে চলতে লাগলো। সিদ্দিকী বেগম পাশে ফিরে দেখেন তার মেয়ে তার কিছু বলার আগেই চলে গেছে।
তিনি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে স্টেজে দিকে মনোযোগ দিলেন।
ওদিকে নিধি আলবান ও আর্দ্রকে তাদের সাথে যাওয়ার জন্য অনেক আকুতি মিনতি করলো,যদিও তারা যেতে নারাজ,কিন্তু নিধি এমন আ্যকুল নিবেদন রাজি হয়েই গেল। তাদের একটু সামনে দাঁড়িয়েই ইতি, বিথী দেখলো সব কিন্তু এক পা ও সেখান থেকে নড়লো না, বুকে হাত গুজে সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল। আর্দ্র তখন থেকেই নিধিকে বলেই যাচ্ছে,,,
__ ওই শালাদের লাগবে না,তোমরা আমার সাথে চলো।
কিন্তু নিধি তা শুনলে তো।যাই হোক পিকি, মুহিন, নিঝুম, সুন্দর,আলবান, আর্দ্র,দির্শক,বিথি,নিধি ,ইতি, সুহানা আসল মেলার দিকে চলতে লাগলো।
সুন্দর তখন থেকেই নিঝুমকে পরখ করছে, কিন্তু শালির বোন একবার ও সুন্দরের পানে তাকালো ও না,এতে সুন্দরের অনেক রাগ হলো। অথচ নিঝুম সুন্দর সাথে অর্থাৎ পাশাপাশিই হাঁটছে।মনে মনে সুন্দর বলে,,,
__ শালার জিন্দেগি,কাল কততো কষ্ট কইরা শার্ট খানা আইরোন করলাম যাতে সুন্দর লাগে, এদিকে শার্টে ভাঁজ পইরা গেল তাও শালির বোনের দেখার কোন নাম মাএ নেই।যা হ দেখা লাগবো না তোরে,ধুর বাবা অন্য কোন মেয়েও দেখে না কেন রে বাল?
এই বলে বিরক্তির সহিত এক পা উপরে তুলে আবার জোরে মাটিতে পা ফেলায়,রাগ প্রকাশ করলো,এমন করে উপর থেকে পা ফেলায় তা সুন্দরের ভোলাভালা বন্ধু নিন্দুকের পায়ে লাগলো,বেচার পায়ে এতো জোরে লাগলো যে , বেচারা পায়ের তালা হাতে নিয়ে সেখানেই ঘুরতে লাগলো আর বলতে লাগলো,,,
__’ ও মা গোওওও
মুহূর্তেই সবাই পিছোন ঘুরে তাকালো, সুন্দর এবার নিন্দুকের পিটে জোরে থাপ্পড় মেরে বলে,,,
__ আববে হালা চুপ রয়।
নিন্দুক আর টু শব্দটাও করলো না,মুখে হাত চেপে ব্যাথা সহ্য করে নিল, কিছুক্ষণ পর নিন্দুক পা নিচে নামিয়ে বলে,,,
__ আর একটু হইলেও পা টা জাগতো আমার, ভাগ্যিস বোড জুতো জোরা পরিস নি,ওহহ বাবাহহহহ।
বিথীর হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে নিচু হিল পড়ে বারবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় যায় অবস্থা,দির্শক বুঝতে পেরে বিথীকে বলে,,,
__ এ্যানি প্রবলেম বিথী?
বিথী কিছুক্ষণ দির্শকের পানে তাকালো তারপর কিছু একটা ভেবে পায়ের হিল জোরা খুলে হাতে নিল।তারপর দির্শকের হাতে জুতো জোরা দিয়ে বলল,,
__ স্যার আপনার হাতে রাখেন,পরে নাহয় পড়ে নিব।খুব সমস্যা করছে এই জুতো জোরা।
দির্শক থমথমে খেয়ে গেল, নিজেকেই এবার দোষারোপ করতে লাগলো যে কেন এই মেয়েকে বলতে আসলাম “এ্যানি প্রবলেম বিথী”যাই হোক কি আর করার এই মেয়ে উপর কথা শুনে বলা মানে আর এক প্রকার বিশ্ব যুদ্ধ করা।মুখ তো নয় যেনো কারেন্টে ১০০০ ভোল্টে চলা রোবোট। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জুতো জোরা হাতে রেখেই হাঁটতে লাগলো।না এতো দির্শকে একটুও অপমান বোধ হয় নি?কেন হয় নি তা অজানা?তবে জুতো জোরা বহন করায় দির্শকের ভালোই লাগছে,মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল দির্শকের,,,
__ যেখানে শাড়ির আঁচল ধরে হাঁটা দরকার, সেখানে তার জুতো নিয়ে হাঁটছি,আসলেই আমি ভাগ্যবান।হা হা।
হুট করে কোথ থেকে যেনো হুড়মুড়িয়ে আসলো সুহানা পায়ের সাথে পা জড়িয়ে দির্শকের বুকে পড়ে এই বুঝি,তখনি বিথী সুহানা হাত ধরে দির্শকের সামনে দ্বারায় কোন মতেই দির্শকের বুকে পড়তে দিলো না সুহানাকে।ফলবসত সুহানা বিথীর গায়ে পড়লো।
আৎমিক এমন ঘটনা দির্শক থেমে গেল,
সুহানা বিথী কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,,
__ পায়ে সাথে পা জড়িয়ে গেছিলো রে।
বিথী কিছু বলে না মুখ কুঁচকেই তাকিয়ে রইল সুহানার দিকে।মুলত বিথীর মোটেও ভালো লাগেনি এটা, জান্তা ভাবে হোক বা অজান্তেই হোক মোটেও ভালো হয় নি বিথী।আর একটু হলেই তো দির্শকের বুকে পড়ে যেতো, তখন কি হতো?
সুহানা দির্শকের পানে তাকিয়ে হেসে বলে,,
__ এই যে স্যার,আমার জুতো জোরা ও হাতে নিন আমার পা ব্যাথা করছে।
দির্শক হাসলো, কারণ টা হলো বিথী এখনকার প্রশ্নটার উত্তর কেমন হবে,ব্যাস বিথী ও বলে উঠলো,,,
__ তোর জুতো ধরবে কেন ওনি?
__ তোর জোরা ও নিলো তো?
__ তার কারণ আছে?
__ তবে আমার ও কারণ আছে?
__ কি কারণ, এক্সপ্লেইন কর।
সুহানা আমতা আমাতা করতে থাকে কিন্তু কিছু বলতে পারলো না,কথা ঘুরিয়ে আবার বিথী কে বলে,,,
__ তো কি কারণ?
বিথী ফোঁস ফোঁস উঠছে রাগে ,তাও নিজেকে সংযত করলো,,
__ আমার জুতো বহন করার জন্য ওনাকে,মাসে মাসে ১কোটি বাহাত্তর হাজার চারশো তিন টাকা দেই।
সুহানা দির্শকের চোখ বড় বড় হয়ে গেল, সুহানার তো কথা বলার আর কোন জো রইল না,যদিও জানে মিথ্যা কথা তবুও কারণ তো , সুহানা দির্শকের দিকে তাকিয়ে বলে,,
__ সত্যিই স্যার আপনাকে এত টাকা দেয়।
দির্শকের নির্বিকার উওর,,,
__ হ্যা দেয় তো, কিন্তু আবার একটাকার কম বেশি একটি টাকাও নেই না,মহান মানুষ তো,হিসাব নিকাশেও বেশ পরিপাটি আমি।
বিথী মাথা ঘুরিয়ে দির্শকের পানে তাকালো, নিঃশব্দে হাসলো তা শুধু দির্শক বুঝলো।
সুহানা আর সেখানে রইল না,চলে গেল।
এদিকে ইতি ও আলবানের সে কি ঝগড়া ঝগড়ার মেন কোন পয়েন্ট নেই, ইতির মতে সে এখন চুরি ,দুল কিনতে বাম পাশে যাবে,আলবানের মতে সে এখন বই কিনতে ডান দিকে যাবে। দুজনের সে কি হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে ঝগড়া,,,
__ আমি বলছি মানে বই কিনতে যাবো,কথা শেষ?
__ তো যান না ,কে বারণ করছে,যান যান,আমি এদিকে যাবো চুরি,দুল কিনতে।
__ ইতিইইই রাগ উঠাইস না।
__ আপনার রাগ দেখে আমার বাল হলো?
তখনি আলবান ইতির দিকে তেড়ে আসতে ধরে,সে সময় আর্দ্র এসে আলবানের হাত চেপে বলে,,,
__ আলবান স্টপ।কি করছিস টা কি।
আলবান রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ ছাড় আমায় ছাড়া বলছি,ওরে আজ মজা দেখাবো। বেয়াদব হয়ে গেছে।
আর্দ্র হিসহিসিয়ে বলে,,,
__ মানুষ দেখছে আলবান।
__ দেখুক।
__ এখন চল মেয়েদের যা যাবতীয় লাগে সেগুলো কিনে নেই,আমরা নাহয় পরে বইয়ের দোকানে যাবো।আই রিকুয়েস্ট ইউ।
আলবানের রাগ কিছুতেই থামছে না ইচ্ছে করে ইতি গালে ঠাঁটিয়ে থাপ্পড় মেরে অবাধ্য হওয়া ও মুখে মুখে কথা বলা বের করাতে। কিন্তু পারছে আর কই।
আলবান আর কিছু বললো যথাসম্ভব নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রনে আনলো আলবান।
তারপর সবাই চুরি,ও দুলের দোকানেই ঢুকলো।ইতি,নিধি, সুহানা, নিঝুম কিছু না পছন্দ করেই তা প্যাক করে নিচ্ছে, কিন্তু বিথীর এতো এতো রঙবে রঙের চুরি দুল দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে,সব দেখেই যাচ্ছে কিন্তু চয়েজ করে নিতে পারছে না,তা দেখলো দির্শক, হঠাৎ এক গোছা নিল রঙের চুরি নিয়ে বিথী হাতে পড়িয়ে দিয়ে বলে,,,
__ নাও পারফেক্ট।
বিথী দির্শকের পানে একবার আবার চুরির পানে একবার তাকালো, কিছু বললো না বিথী,কি বা বলবে?
দির্শক চুরির টাকাটা দিয়ে দিলো।তা দেখে বিথী বলে,,,
__ টাকা আছে তো আমার কাছে?
বিথী দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দির্শক বলে,,
__ এতটুকু সামর্থ আছে আমার?
কিছু বললো না বিথী তবে কথা টায় বড্ড অধিকারবোধের হয়ে গেল ?এটাই ভাবছে বিথী,ভাবতে ভাবতে চুরির দিকে তাকিয়ে হাঁটছে।
আর্দ্র আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো কতো প্রমিক প্রমিকা , স্বামী স্ত্রী এখানে,তারা নানা ধরনের চুরি দুল নিয়ে তাদের প্রেয়সীদের পড়িয়ে দিচ্ছে কত খুশি হয়ে?এমন ভালোবাসা দেখতোও ভালো লাগে? পরক্ষণেই নিধির কথা মাথায় আসলো আর্দ্র, চোখ নিধিকে খুঁজতে লাগলো, কিন্তু নিধি তো বুকে হাত গুজে রাগি মুখে আর্দ্র দিকেই তাকিয়ে ছিল,তা দেখে আর্দ্র আলবানকে বলে,,,
__ বোম বাস্ট হয় বলে,থাক আমি ওদিকটা সামাল দিয়ে আসি।
দৌড়ে যায় নিধি কাছে।কি সব ভুজুং ভাজুং বুঝাতে লাগলো নিধি কে বুঝেও গেল, তারপর দুজনেই হাসাহাসি করে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো চুরি,দুল দেখতে।
আলবান ও চোখ মুখ কুঁচকে সারি সারি রেখে দেওয়া চুরি দুল গুলো দেখতে লাগলো,মনে হচ্ছে বারবার তার ও কিছু কেন উচিত? আবার মনে হচ্ছে,কার জন্য কিনবে সে?ওই কালনাগিনীর জন্য?কখনো না?কিছুতেই না। পরক্ষণেই খুব মন চাইলো কিছু কিনতে,কেনা উচিত?আলবান তো আর ওই কালনাগিনী মতো না,।তাই কেনা উচিত।
এসব ভেবেই চুরি দেখতে লাগলো,সব রঙই ভালো লাগছে,যেটা যেটা ভালো লাগলো সেটা সেটাই কিনে নিলো, পাতলা শপিং ব্যাগ খানা ভর্তি হয়ে গেল চুরি ও দুলে।
সবার চুরি,দুল কেন শেষ এখন অন্য পাশে যাবে বলে হাঁটছে, ইতির হঠাৎ চোখ যায় আলাবনে হাতে থাকা ভর্তি ব্যাগের দিকে, তৎক্ষণাৎ ইতি আলবানের কাছে গিয়ে আবাক হয়ে বলে,,,
__ এ মা এতো চুরি ও দুল নিয়ে আপনি করবেনটা কি।
আলবান কোন উওর দিলো না সে নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনে তাকিয়ে হাঁটতে লাগলো,ইতি আবার কিছুক্ষণ ভেবে আলবানের আর একটু কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,,,
__ এই দাবানল ভাই চুরি টুরি করেননি তো ,এ আল্লাহ ওখানে তো সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে,আমি দেখছি।
আলবান এবার দাঁড়িয়ে যায়,ইতিও থেমে যায়,আলবান চোখ শীতল রেখে ইতির হাতে ব্যাগটা গুজে দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ১৬
__ তোর মানে তো তোদের জন্য এনেছি?
এই বলে হনহনিয়ে চলে যায় আলবান,ইতি অবাক হয়ে আলবানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে,কি হলো এটা? আদৌও সত্যি কি?আলবান ভাই তাকে এতো চুরি,দুল দিলো?
আর কিছু ভাবলো না ইতি ভেবেই বা কি করবে?এখন তো খুশিতে আটখানা ইতি,এতো এতো সুন্দর সুন্দর চুরি,দুল পেয়ে।
