Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২১

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২১

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২১
রাফিয়া জান্নাত রিফা

সকালের নরম আলোয় করিডোর ভেসে আছে হালকা নিস্তব্ধতায়। বিথী ধীর পায়ে হাঁটছিল সেই পথে। হঠাৎই দির্শকের কক্ষের ভেতর থেকে ভেসে এলো এক অচেনা শব্দ , মেয়েলি কন্ঠস্বর বোধহয়, কিন্তু ভালোভাবে বুঝতে পারল না সে।এক মুহূর্তেই থেমে গেল তার পা। দরজাটা আধখোলা, ভেতরের রহস্যভেদের উঁকি দিতে আহ্বান জানাচ্ছে বিথী কে। কৌতূহলে বিথী গলা বাড়িয়ে তাকাল, কিন্তু কিছুই স্পষ্ট দেখা গেল না।
দ্বিধা ও আশঙ্কার মাঝামাঝি কোথাও নিজেকে সামলে, সে নিঃশব্দে পা রাখল দির্শকের ঘরে। প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল দির্শক জানালার দিকে মুখ করে ফোনে তীব্র রাগে কথা বলছে। তার গায়ে নেই কিছুই, শুধু একটি প্যান্ট। হঠাৎ এই দৃশ্যের মুখোমুখি হয়ে বিথীর মুখ শুকিয়ে গেল। অনাহূত অতিথির মতো বুঝতে পারল, ভুল জায়গায় এসে পড়েছে।অপ্রস্তুত লজ্জায় তার দেহ কেঁপে উঠল। তড়িঘড়ি ঘুরে দাঁড়িয়ে,রুম ত্যাগ করার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনি চিরচেনা দির্শকের হাক এলো,,,

__ স্টপ বিথী।
বিথীর পা থেমে গেল,দির্শক তখন ফোনেরই কথা বলছিল, ওপাশে মুখ রেখেই বিথীর উপস্থিত টের পেয়েছিল।ফোন হাত থেকে নামিয়ে বিছানায় ছুড়ে মারলো দির্শক,এক পা দু পা করে এগিয়ে এলো বিথীর দিকে,বিথী এখন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়েই রেখেছে,দির্শক কিছু একটা ভেবে তৎখানাৎ নিজের উদম গাঁয়ের দিকে তাকালো এবং পরক্ষণেই বিছানায় থেকে সাদা শার্ট খানা নিয়ে পড়ল।আবার বিথী কে বলল,,,
__ লুক এ্যাট মি।
বিথী এক আঙ্গুল দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে দির্শকের দিকে ঘুরে দাঁড়াল, দির্শকের দিকে তাকানোর সাহস পেল না মনে হলো হয়তো এখনো নগ্ন শরীরেই আছে দির্শক,তাই মাথা নিচু করেই রইল,দির্শক তা বুঝতে পেরে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,,,

__ আমি শার্ট পড়ে নিয়েছি বিথী,লুক এ্যাট মি।মাথা নিচু করে থাকা একদমই তোমাকে মানায় না, ইটস্ ডোন্ট সুট ইউ।
বিথী মাথা তুলে দির্শকের পানে তাকালো, কিন্তু হুট করে দৃষ্টি দির্শকের বক্ষে চোখ আটকে গেল, শার্টের তিনটে বোতাম খুলা থাকায়,বুকের মাঝ বরাবর গভীর শুকনো ক্ষতটা স্পষ্ট আকারে জলজল করছে বিথীর চোখে, বিথী সে ক্ষতের দিকে তাকিয়েই দির্শক কে বলল,,,
__ এএটা কিসের ক্ষত?
দির্শক তার বক্ষে তাকালো মুহূর্তেই শার্টের দুটো বোতাম লাগিয়ে বলে,,,
__ তেমন কিছু না?
__ না না,ওটা তো কোন গুলির ক্ষতের মতো মনে হলো?
দির্শক ধস করে কাউচে গা এলিয়ে দিয়ে বলে,,,
__ বাববাহ, গুলির ক্ষত ও চিনো দেখছি? গুড ভেরি গুড?
বিথী দুপা এগিয়ে যায় দির্শকের দিকে, এবং বলে,,,

__ কথা এড়িয়ে যাবেন না স্যার?
দির্শক কাউচে হেলান দিয়ে এক হাত দিয়ে চোখ ঢেকে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,,
__ এ রুমে কেন এসেছ?
বিথী দুহাত বুকে গুজে বলে,,,
__ গোয়েন্দা গিরি করতে?
দির্শক চোখ থেকে হাত সরিয়ে বিথীর দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত হেসে বলে,,,
__ সত্যিই, তোমার সাথে গোয়েন্দা গিরিটা ভালোই যায়।
__ হুম জানি?
আবার মুচকি হেসে দির্শক বলে,,
__ আচ্ছা তুমি গোয়েন্দা পুলিশ নাকি, পুলিশ গোয়েন্দা?
বিথী এবার মনে মনে ভাবলো,,,
__ আসলেই তো,আমি গোয়েন্দা পুলিশ, নাকি পুলিশ গোয়েন্দা।
বিথী সাদা দেওয়ালের পানে এক ধেয়ে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো, কিন্তু কিছুই মাথায় আসছে না।দির্শক দু হাত দিয়ে নিজের চুল ব্যাক ব্রাশ করতে করতে বলে,,,

__ কি হলো বলো?
ভ্যাবলা পড়া হাঁসি দিয়ে বিথী বলে,,,
__ আরো আমি তো পুলিশ, সিআইডি, গোয়েন্দা,ডিবি সব,মানে বলতে গেলে আমি হলাম পু, সী, গো,ডি ।এটাই আমার সংকট আইডেন্টি, বুঝলেন।
দির্শক হো হো করে জোরে জোরে হাসতে লাগলো,তা দেখে বিথী মুখ কুঁচকে বলে,,,
__ ওমন পাগলের মতো হাসছেন কেন?
হাঁসি থামিয়ে দির্শক বলে,,,
__ আমি ঠিক কি বলেছি বলোতো?
একটা ভ্রু উপরে তুলে বিথী বলে,,,
__ আপনিই তো বললেন আমি গোয়েন্দা পুলিশ নাকি পুলিশ গোয়েন্দা…
থমকে গেল বিথী,বিরাট ভুল করেছে তা বুঝতে আর সময় লাগলো না, দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরলো, পরক্ষণেই ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে,,,

__ আপনি আমাকে বোকা বানালেন দুষ্শমন স্যার?
__ তুমি তো বোকাই?
__ একদম নয়।
তখনি বিথীর চোখ যায় অদুরে বেড সাইডে হেলা দিয়ে রাখা লালচে গিটারের দিকে, সেদিকে তাকিয়েই বিথী বলে,,,
__ স্যার আপনি গিটার দিয়ে গান করেন বুঝি?
দির্শকের চোখে স্পষ্ট জলজল করতে লাগলো বিথীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা গিটারটাকে দেখে চোখে মুখে এক উজ্জ্বল চওড়া হাসি ফুটে আছে,সেটাকে ছোঁয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখা গেল সেই মুখে,তা বুঝতে সময় লাগলো না দির্শকে,,,
__ হ্যাঁ, দেখতে পারো?
দির্শকের বলতে দেরি হলো কিন্তু সেটা দৌড়ে গিয়ে হাতে নিতে দেরি হলো না। বিথী মুখে হাসি ছেয়ে আছে,যা দির্শক মনোযোগ সহকারে দেখছে,। বিথী গিটারটাকে হাতে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু ধরবে কি করে তা বুঝতে পারছে না, গিটারের দিকেই দৃষ্টি রেখেই দির্শক কাছে আসলো বিথী,মুখে অসহায় ভঙ্গিমা স্পষ্ট,,,

__ এটা কিভাবে চালায়,আপনি একটু টুংটাং করুন না প্লিজ।
এই বলে দির্শকের দিকে গিটারটা এগিয়ে দিলো,দির্শক তা হতে নিয়ে, বিথীকে বলল,,,
__ আমার পাশে বসতে কি কোন সমস্যা হবে?
বিথী দির্শকের পাশে বেশ দুরুত্ব রেখেই বসে পড়লো,দির্শক গিটারকে বক্ষে রেখে হাত দিয়ে ধরে বলে,,,
__ গান বলবো।
বিথী খুশিতে আটখানা হলো, বিথীর অনেক দিনের শখ এমন ভাবে কেউ গিটারে গান করবে ও বিথী তা শুনবে, এবং নিজেও গিটার বাজানো শিখবে। খুশিতে আপ্লুত হয়ে বিথী বলে,,,
__ হ্যাঁ তবে তো আরো ভালো হয়?
দির্শক গিটার খানা টুংটাং করে গান ধরলো,,,,

🎶🎶🎶🎶………
Tu hi armaan, tu hi sach hai
Keh rahi deewaniyat hai
Main yeh dil pe likh chuka hoon
Tu mera hai, tu mera hai
Tere aage zindagi ki
Khaakh jitni ahmiyat hai
Faisla main kar chuka hoon
Tu mera, main bhi hoon bas tera
🎶🎶🎶🎶🎶🎶………

গান গাওয়ার সময় দির্শকের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল বিথীর দিকে। সেই চোখের গভীরতা কথা বলছিল নীরবে, অথচ স্পষ্টভাবে। বিথী চাইলেও সেই দৃষ্টিকে দীর্ঘক্ষণ ধারণ করতে পারল না এক অজানা জড়তা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মধুর কণ্ঠে এত সুরেলা গান শোনার পর বিথী নিস্তব্ধ হয়ে গেল, যেন মুহূর্তটিই তাকে স্থির করে রেখেছে অচেনা এক অনুভবে, অবাক এক মোহে। মেয়েটা মুহূর্তেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো, কাউচের উপরের নড়েচড়ে আর একটা দির্শকের দিকে এগিয়ে গেল, উজ্জ্বল হাসি দিয়ে বলল,,,
__ অনেক সুন্দর কন্ঠ আপনার,কি দারুন গাইলেন মাইরি।
দির্শক গিটারটা ট্রি টেবিলে রেখে বলে,,,
__ বিকস এ্যাম এ রকস্টার।
মুহূর্তেই বিথীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল,মুখছ স্পষ্ট স্বরে বের হলো,,,
__ সিরিয়াসলি?
__ ইয়েস?
__ কই আমার তো জানা নেই?
দির্শক কিছু একটা ভেবে রুষ্ট কন্ঠে আবার বলে,,,

__ বিথী ঘরে যাও?
বিথী মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানিয়ে চলে যেতে ধরলে দির্শক গলা উঁচিয়ে আবার বলে,,,
__ একটা সময় আসবে বিথী,তখন আমায় তুমি খুবই ভুল বুঝবে?
বিথী চোখ মুখ কুঁচকে দির্শকের পানে তাকিয়ে বলে,,
__ কেন?
প্রত্যুত্তরে দির্শক কিছু বললো না শুধু হাসলো, পরক্ষণেই বিথী আবার বলে,,,
__ ওহহ বুঝছি, আপনার ঘর থেকে যে ওই রোমান্টিক বইটা চুরি করে নিয়ে গেছি,ওটাই মাকে বলে দিবেন তাই তো?প্যারা নিয়েন না এতে আপনাকে ভুল বুঝবো না আমি।
দির্শক দুই ভ্রু উপরে তুলে বলে,,,

__ বইটা তাহলে তুমিই নিয়ে গেছো?
__ হ্যাঁ?
__ কি কি পড়লে এক্সপ্লেইন করো?
__ ধ্যাত ওসব ইংরেজি বইয়ের মানে ফানে বুঝি নাকি, কিন্তু কিছু ছবি দেখছি নায়ুজুবিল্লাহ,আস্তাগফিরুল্লাহ মার্কা ছবি। মেয়েটার ইয়া বড় বড় ঠ্যাং তায় আবার ছেলেটা ধরে চুমু খাচ্ছে,মেয়েটা ছেলেটার মুখে চুমু খাচ্ছে তো ছেলেটা মেয়ের মুখে,সে কি অশ্লীলতা সেই ছবিতে বাবাগো,আমি আরো ভাবলাম বইটাতে আরো কি না কি আছে,ওই জন্য নিয়ে গেছিলাম।
বিথী দির্শকের পানে তাকিয়ে বুঝতে পেলো সে বেশি বেশিই বলে ফেলছে,দির্শক তো ড্যাবড্যাব করে বিথীকেই দেখছে, দির্শকের পানে তাকিয়ে টেনেটুনে হেঁসে বিথী কথা ঘুরিয়ে বলে,,,

__ এখন ঝটপট বলুন তো কেন আপনাকে ভুল বুঝবো আমি?
নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দির্শক উওর দেয়,,,
__ তোমার কিছু কাছে মানুষের জন্য?
__ কেন তারা কি থাকবে না?
__ কিছু সংখ্যক থাকবে না?
বিথী দির্শকের কোন কথাই বুঝতে পারছে না, সেজন্যই চরম বিরক্ত লাগলো বিথীর,,,
__ ধ্যাত এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলেন কেন? সোজাসুজি বললেই তো হয়,।
__ এর বেশি বুঝে লাভ নেই বিথী,এটা স্পায়লার দিলাম, পরবর্তীতে ট্রেলার দেখতে পাবে।
বিথী চোখ মুখে এবার রাগ উপছে পড়ছে, এখানে থাকা মানে মেজাজ চরম পর্যায়ে যাওয়া, গট গট পায়ে চলে যেতে যেতে সন্দিহান কন্ঠে বলে,,,
__ কে এই দির্শক প্রধান। জানতেই হবে?
দির্শকে কানে কথা খানা ভালো ভাবেই পৌঁছাল, এবং আনমনে গেয়ে উঠলো,,,

🎶🎶🎶🎶….
mama I’m in love with a criminal
And this type of love isn’t rational, it’s physical
Mama please don’t cry, I will be alright
All reason aside I just can’t deny, I love the guy
🎶🎶🎶🎶🎶…….

তিন বোনের কারও রেজাল্ট নিয়ে বিশেষ চিন্তা নেই ভালো না হোক, পাশ করলেই তো অনেক। সকাল দশটা ত্রিশে ফল প্রকাশ হবে, তাই তিনজনেই নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসেছে। মুখে নিশ্চিন্ত ভাব, কিন্তু শরীর যেন মানতে নারাজ হাত-পা কাঁপছে অনবরত।
বিথী ঘরজুড়ে অস্থিরভাবে পায়চারি করছে, আর ইতি ও নিধি বিছানায় গালে হাত রেখে নিশ্চুপ বসে আছে। ঘড়ির কাঁটা যখন দশটা ছুঁলো, তিনজনেরই বুক ধকধক করে উঠল, কাঁপন যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল অদ্ভুত এক উত্তেজনা আর আশঙ্কার মিশ্র অনুভূতিতে থমকে রইল পুরো ঘরটা।
তিনজনই কাঁপা কাঁপা হাতে ওয়েবসাইটে ঢুকে রেজাল্টের যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ করে সাবমিট করলো। প্রথমে রেজাল্ট আসলো ইতির “4.72” ইতি মুখে হাসি ফুটলো, পরক্ষণেই নিধির রেজাল্ট আসলো”4.71″ নিধির মুখেও হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু বিথীর এখনো আসছে না, বিথীর অবস্থা বেজায় খারাপ হলো,কাপাকাপি চারগুনে রুপান্তর হলো। কিছুক্ষণ বিথীর রেজাল্ট আসলো বিথী দেখেই থমকে গেল “ফেইল” এসেছে কিন্তু কিভাবে, মুহূর্তেই কান্নারা সব দলা পেকে আসলো।ইতি তড়িৎ বেগে বিথীর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল, বিথী নিধি কে জাপটে ধরে জোরে শব্দ করেই কাঁদতে লাগলো।ইতি বিথীর ফোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে জোরে বিথীর বাহুতে থাপ্পড় মেরে বলে,,,

__ বলদি চুপ কর??
নিধি ও বলে,,
__ বিথী শান্ত হ।
বিথী হিচকি টেনে বলে,,,
__আমার আর বিয়েটা হলো না রে, আল্লাহ কেন আমার সাথে এমটা করলো, এখন এই ফেইল করা অভাগীরে বিয়ে করবে কে?কে করবে?
ইতি এবার আবার দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,,
__ বাল,চুপপি তুই,ডংমারানি, রোল নাম্বার ভুল দিসোছ,রোলের শেষে তোর ৫ আর এখানে দিয়েছিস ৬ এটা অন্য কোন মেয়ে।
মুহূর্তেই বিথী আশার আলো দেখতে পেল, হকচকিয়ে নিধির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,,,
__ দেখি দেখি?
এই বলে ইতির হাত থেকে ফোন নিয়ে দেখে বলে,,,
__ আসলেই তো?

এই বলে আবার সঠিক রোল নম্বর দেয়,আবার কিছুক্ষণ পর রেজাল্ট আসলো “4.73” তিন বোনই আর কই থাকে,ব্যাস এক সাথেই উল্লাসে মেতে উঠলো, বিছানায় উপরে উঠে নাচানাচি শুরু করে দিল, হঠাৎ দরজা ধাক্কানোর শব্দ থেমে যায় তিন বোনেই,দরজা খুলে দেয় দেখে তার মা ও সাথে সুহানা,পিকি,মুহিন, নিঝুম,আলবান,দির্শক আর্দ্র,আলবানের বাবা, মুহিনের বাবা, তাদের বাবা,আলিফা বেগম। একসাথে এত লোকজনকে দেখে চক্ষু চড়কগাছে উঠে যায় তিন বোনেরই। সুহানা A+ পেয়েছে এজন্য ভীষণ খুশি সে।ইতি, বিথী, নীধির বাবা নাইম তালুকদার বলে,,,

__ চুপ করে আছো কেন? রেজাল্ট শুনার জন্যই তো এসেছি?
ভ্রম থেকে বের হয় তিন বোনেই, প্রথমে ইতি বলে,,
__ 4.72
বিথী বুক ফুলানো ভাব নিয়ে বলে,,
__ 4.73
নিধি বলে,,,
__ 4.71
আলবানের বাবা নাজিম তালুকদার খুশি হয়ে বলেন,,,
__ আলহামদুলিল্লাহ ভালো রেজাল্ট?
নিধি বেশ খুশিতে আর্দ্রের পাশে যায়। হুট করে আর্দ্রের হাত ধরে বলে,,,
__ পাদরো ভাই,এটা কিন্তু অনেক ভালো রেজাল্ট,এমন রেজাল্ট আমরা করবো তা আশা করি নি।আমাকে ট্রিট দিবে তো,কি ট্রিট দেবেন? বলেন ? বলেন?
আর্দ্র সবার দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিধির দিকে কিছু বলতে যাচ্ছিল,ঠিক সেই মুহূর্তেই এক প্রচণ্ড গতিতে শক্তপোক্ত হাতের ভারী থাপ্পড় এসে আছড়ে পড়ল নিধির গালে। আঘাতের জোরে নিধি হেলে পড়তে গিয়েও পুরোপুরি পড়ে গেল না, তার আগেই বিথী ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল।

এমন আকস্মিক আঘাতে নিধি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না কে মারল, কেন মারল? সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাতেই চোখে পড়ল তার বাবার লালচে, ক্রোধে জ্বলন্ত দৃষ্টি।
মুহূর্তেই নিধির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। অবিশ্বাস ভরা চোখে তাকিয়ে রইল সে এই মানুষটি কি তারই বাবা? যিনি এতদিন একটিবারও ফুলের টোকা পর্যন্ত দেননি, তিনিই আজ এমন নির্মমভাবে আঘাত করলেন?চোখ দিয়ে পানি স্রোত প্রবাহিত হতে লাগলো।গালটা এখনো ঝিমঝিম করে জ্বলছে নিধি।
চারপাশে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ। আর আর্দ্রর অন্তর্গত ক্রোধের আগুন যেন দু’জনার নীরব আর্তনাদ মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।এমন হুটহাট সবার সামনে নিধি কে চড় মারা যা মোটেও পছন্দ হয় নি আর্দ্রের দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে রাগে, চোখে সেই রাগ স্পষ্ট।তখনি চোখ গেল, বিথীর লালচে গালে পাঁচ আঙুল বসে গিয়েছে মেয়েটার গালে। মুহূর্তেই আর্দ্র দৃষ্টি ছলছল করে উঠলো।
তখনি ক্রুদ্ধ কন্ঠে আওয়াজ ছাড়লেন আলবানের বাবা,,,

__ নাঈম মারলি কেন নিধি মামুনিকে?
নাঈম তালুকদার নিধির থেকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি সরিয়ে বলেন,,
__ দুঃখিত ভাইজান, কিন্তু এ বিষয়ে আপনাকে কিছু বলতে পরবো না।
এই বলে গটগট পায়ে জায়গা ত্যাগ করে চলে যায়,আলবান গলা উঁচিয়ে বলে,,,,
__ মেয়ে বড় হয়েছে,এভাবে থাপ্পড় মারাটা কি ঠিক করলেন মেজোবাবা।
নাঈম তালুকদার থেমে যায়,আলবানের দিকে না তাকিয়েই বলে,,,
__ এটা নিয়ে বেশি বারাবাড়ি না করাই ভালো,তাই তুমিও বারাবারি করো না।
এই বলে গটগট পায়ে চলে গেলেন।
আলবান চোখ ইশারা করে আর্দ্রকে শান্ত হতে বলে।নিধি আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না দৌড়ে রুমে চলে গেল,ইতি, বিথী তার পিছনে গেল,ইতি সিদ্দিকী বেগমের চোখ অশ্রুতে ভরা দেখে বলল,,

__ মা তুমি বাবার কাছে যাও, নিধির কাছে আমরা আছি?
এই বলে তাদের রুমের দরজাটা লাগিয়ে দেয়, সিদ্দিকী বেগমের কাঁধে হাত রেখে আলিফা বেগম বলেন,,,
__ হঠাৎ করে নাঈমের কি হলো?
সিদ্দিকী বেগমের কাছেও এসব একদমই আচমকা অপ্রত্যাশিত লাগছে, কিছুতে বুঝে উঠতে পারছে না কেন এভাবে নিধিকে থাপ্পড় মারলো।যে মেয়েদের সিদ্দিকী বেগম সামান্য একটু উল্টা পাল্টা বকলেই তাকে শাসায় আজ তিনিই কিভাবে তার মেয়ের গায়ে হাত তুললেন।,,
__ আমি জানি না বুবু জান?
__ তুই বরং নাঈমের কাছে যা,গিয়ে শুদা।
এক এক করে ইতি, বিথী, নীধি ঘরের সামন থেকে সবাই চলে গেলেন।

পিকি, মুহিন,আলবান,দির্শক সবাই বসে আছে আর্দ্রের ঘরে সোফায় বসে আছে। আর্দ্রের চোখ মুখের ধরণ বদলে গেছে,বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে নিধি গালের লালচে পাঁচ আঙুলের ছাফ খানা তাতেই বাববার হৃদয়ে বেতারক যন্ত্রণা এসে হানা দিচ্ছে আর্দ্রের হৃদয়,অসহ্য লাগছে,এর জন্য নিজেকেই কঠোর কোন, শাস্তি বা পদক্ষেপ নিতে ইচ্ছে করছে।
আলবান ইতির সাথে মেসেজ করছিল,আলবানের মেজাজ এতে আরো খারাপ মানেই এই মেয়ে বাস্তবে বকবক করে এটা মানা যায় কিন্তু মেসেজ এ ও এতো কথা বলার কি দরকার, এখানে আলবান ইতির বড় একটা ঝগড়া লাগলো,ইতির সাথে তো মেসেজ করে পেরেই উঠছে না আলবান। তারপর বিরক্ত হয়ে আর ইতির কোন মেসেজের রিপ্লাই দিলো না,ইতি মেসেজ দিতেই থাকলো।ফোন পকেটে রেখে আর্দ্র কে বলে,,,

__ আর্দ্র চল?
দির্শক আগে থেকেই অবগত যে আলবান আর্দ্রকে নিয়ে কোথায় যাবে তাই সে ও আর্দ্রের পিটে থাপ্পড় মেরে বলে,,,
__ নিধি কে ভালোবাসিস তো প্রোপোচ করবি না?
আর্দ্র বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,,,
__ এখন এসব বলার কি মানে?
আলবান বলে,,,
__ বেশি কথা না বলে চল,নিধিকে কে কোথাও নিয়ে গেলে ওর মনটাও ভালো হবে,তোর প্রাপোচ করাটাও হয়ে যাবে?
আমি ইতিকে মেসেজে বলে দিয়েছি ও নিধি বিথী কে নিয়ে আসছে।
আর্দ্র বলে,,,

__ মেজবাবা রাগ হবে।
__ ওটা আমার উপর ছেড়ে দে।
দির্শক পিকির দিকে তাকিয়ে বলে,,,
__ পিকি ফাস্ট রেডি হয়ে নাও, তোমার কিন্তু রেডি হতে অনেক সময় লাগে।
পিকি তো খুশিতে আটখানা,নিধিকে নিয়ে কোথাও ঘুরে আসার প্লানটা পিকি মাথায় ও এসেছিল কিন্তু তার আগেই তা আলবান বলে ফেললো।
মুহিন পিকি দুজনেই উঠে দাড়ালো ব্যাস দুজনেই দুজনের সাথে বুক বরাবর ধাক্কা খেয়ে কাউচের উপরেই পড়ে গেল,পিকির শরীরের উপরে লম্বা লম্বি ভাবে পড়লো মুহিন।সে কি রোমান্টিক দৃশ্য,আলবান, আর্দ্র, দির্শক চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে, আলবান মজা অর্থে হেসেই বলে,,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২০

__ আমি তোদের একদিন বিয়ে দিয়েই দিবো দেখিস।
ব্যাস দুজনেরই ভ্রম কেটে গেল তড়িৎ বেগে এমন ভাবে উঠে দাড়ালো যেন কোন ছেলে মেয়ে এঁকে অপরের গায়ে পড়েছিল।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২২