Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৭

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৭

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৭
রাফিয়া জান্নাত রিফা

শীতের ভোর। আজ আকাশজোড়া কুয়াশার চাদরে মোড়া। কাঁচের জানালার ওপারে ধোঁয়াটে রোদের রাঙা আভা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, তার কোমল উষ্ণতায় সোনালি পর্দাগুলো আরও হালকা দীপ্তিতে জেগে উঠেছে। আজ শীত যেন ধরনীকে দু’হাতে টেনে নিজের কাছে পেতে চায় হাড় কাঁপানো, নীরব, তীক্ষ্ণ শীত।
এই শীতজড়ানো সকালে আলবান ও ইতি এখনো গভীর নিদ্রায়, কম্ফোর্টারের ভিতরে জমে থাকা উষ্ণ আবেশে দু’জন ঠিকঠাক গুটিয়ে আছে। বাইরে যতই ঠান্ডার কামড় হোক, তাদের শেয়ার করা উষ্ণতা একটা নির্ঘুম মানুষকেও যে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারে তা বোঝা যায় তাদের শান্ত, নিঃশব্দ ঘুমের ভাঁজ দেখে।
শীতের সকালের এই নিস্তব্ধতায়, পৃথিবী যখন কুয়াশার স্তরে স্তরে ডুবে আছে, তখন আলবান আর ইতি তলিয়ে আছে এক স্নিগ্ধ, মিষ্টি ঘুমে।

ইতির এক অদ্ভুত সকাল-স্বভাব আছে ।ভোরের প্রথম আলো চোখে পড়তেই সে গা চাড়া দিয়ে উঠে বসে ও নড়াচড়া করে, আর পাশে যেই থাকুক না কেন, অকারণে এক ঝটকা লাথি মেরে তাকে বিছানা থেকে ছুঁড়ে ফেলা এ কারণে প্রায়ই সকালে ইতির “অপ্রত্যাশিত প্রহারের” শিকার হয় বিথী। নিধি তো সেই ভয়েই ইতির পাশে শোয়াই না তার ভাষায়, “ইতি মানেই ভোরবেলার ভূমিকম্প।”
বিথীর কোমর এখনো সেই লাথির ব্যথায় চমকে ওঠে মাঝে মাঝে। গতকাল ভোরেও একবার সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল।

সে যাই হোক আজকের সকালটা অন্যরকম।আজ ইতি ঘুমাচ্ছে আলবানের পাশে, আর বিছানার নিচে কে পড়বে, সেই রোমাঞ্চকর রহস্যের অপেক্ষায় পুরো ঘর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আছে।
এখন দেখার পালা ইতির সেই কিংবদন্তি লাথি কি আলবানের ভাগ্যেও লেখা আছে, নাকি আজকের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল একটু দয়া করবে আলবানকে?
ইতি হালকা করে নড়ে উঠছে ঘুমের ভেতরেই তার পরিচিত সেই সকালের নড়াচড়া। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আজ আলবানের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়ার বিন্দুমাত্র আভাস নেই। সে বালিশে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, এক হাত আলতো করে জড়িয়ে রেখেছে ইতির পেটের উপর। দু’জনের দেহের মাঝে যেন বাতাস ঢোকারও জায়গা নেই এক ইঞ্চি ব্যবধানও নেই তাদের উষ্ণতার মধ্যে।
ইতি ঘুমের ভেতরেই নড়ে উঠল। পেটে হালকা ভার কিছু অনুভব করলেও তার ঘুমন্ত মন তাতে কোনো ভাবান্তর দেখাল না। আজ তাকে জড়িয়ে ধরেছে বিথী বা নিধি নয়। বরং আলবান এ সত্যিটা তার আধো-অচেতন মস্তিষ্ক ধরতেই পারল না।

প্রথমে সে হাত দুটোকে ধীরে ধীরে চাড়া দিয়ে উপরে তুলল। তারপর ধপ করে, কোনো সতর্কতা ছাড়াই, পা দুটো ছুঁড়ে দিল এক পা আলবানের উরুতে, আরেক পা তার পেটে। আর সেই অঘোষিত সকালবেলার হামলায় আলবানকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে ইতি নিজে আরাম করে উপুড় হয়ে শুয়ে রইল।
বিছানার একদম প্রান্তে ছিল আলবানের আশ্রয়। ইতির সেই আকস্মিক আঘাতে বেচারা আলবান খই ঝরে পড়ার মতো কম্ফোর্টারসহ গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। কম্ফোর্টার থাকায় খুব ব্যথা পায়নি ঠিকই, কিন্তু এমন আচমকা পড়ে যাওয়ায় মস্তিষ্কে যেন একধরনের দপদপে ধাঁধা তৈরি হলো— কেন পড়লাম আমি?
চোখ-মুখ কুঁচকে, অর্ধেক ঘুমে পিটপিট করতে করতে চোখ খুলল সে। চোখে এখনো কাঁচা ঘুমের রেশ। এমন করে ঘুম ভাঙায় বিরক্তির ঢেউ তার মুখে স্পষ্ট। নিজের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করতে করতে হাতের ওপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল।

চোখ মুখ কচলাতে লাগল, তারপর দুই হাত মাটিতে ভর দিয়ে গভীর একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিল।
পরক্ষণেই বিছানার দিকে চোখ পড়তেই আলবানের চক্ষু চড়কগাছ!মুহূর্তেই ঘুম উধাও।সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাই বারবার চোখ কচলাতে লাগল।
চোখ বড় বড় করে, মাথা উঁচিয়ে, আবার নিচু করে, আবার ঝুঁকে প্রায় তিন কোণ থেকে পরখ করতে লাগল বিছানাটাকে।আর তখনই সত্যিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল তার বিছানায় এক মেয়ে শুয়ে আছে!একেবারে বিশ্রীভাবে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, আলবান আচমকা চমকে উঠে দাঁড়াল।
মেয়েটির মুখ ঢাকা, ভুতুড়ে কাপড় গোটা মাথাটা ঢেকে রেখেছে যে কারণে আলবান কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, আসলে কে এই অদ্ভুত অতিথি।
তবু একটা জিনিস চোখ এড়াল না,তা হলো ইতির পা।মেয়েদের পায়ের গড়ন আলবানের অচেনা নয়, আর এই দুটো পায়ে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু এটা যে ইতি তা মস্তিষ্ক ঠাহর করতে পারলো না।নিশ্চিতই যে এটা কোনো মেয়ে।

_কিন্তু কে?
_কেন?
_কীভাবে তার বিছানায়?
ইতির সোয়ার ধরন দেখে আলবানের চোখ-মুখ একেবারে কুঁচকে গেল।বিছানার ওপর সে এমনভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে যেন পৃথিবীর সব জায়গা ফুরিয়ে গেছে, আর শেষ আশ্রয় শুধু এই ছোট্ট খাট।
দুই পা বিছানার দুই প্রান্তে ছুঁয়ে আছে একেবারে রাজসিক বিস্তারে।দুই হাত দুদিকে ছড়ানো ।
তার লেপ-কম্বল, বালিশ, এমনকি পোশাকের অবস্থাও করুণ।জামার এক পাশ গুটিয়ে গেছে, চুল এলোমেলো, কম্ফোর্টার অর্ধেক টেনে নিয়ে নিজের ওপর ফেলে রেখেছে, বাকি অর্ধেক মেঝেতে ঝুলে আছে।দৃশ্যটা দেখলে মনে হয়”এ মানুষের আকৃতিতে এক দাপুটে ঘুমের ঝড়!”

আলবান দাঁড়িয়ে রইল, বিছানার দিকে তাকিয়ে একদিকে বিস্ময়, অন্যদিকে হতবাক বিরক্তি, আর তার মাঝখানে লুকিয়ে থাকা সামান্য অবিশ্বাস।
এমন শুভ্র সাদা পোশাকে কাউকে বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে প্রথমেই আলবান একটু ভড়কে গেল।
অচেনা এক অনুভূতি বুকের ভেতর উঠানামা করল ভৌতিক? অস্বস্তিকর? নাকি নিছকই অবিশ্বাস সে ঠিক বুঝতেই পারল না।
সে বিছানার চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল, মুখে বিরক্তির ভাঁজ, চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা।এটা আবার কে?
হঠাৎই তার নজর গেল মেয়েটির হাতে কব্জিতে ছোট্ট, পরিচিত সেই কালো তিলটা!এক নিমিষে সব রহস্যের পর্দা সরে গেল তার চোখের সামনে,
এটা যে “ইতি!” তা বুঝতে আর বাকি রইল না।আর বোঝার সেই মুহূর্তটাই যেন আলবানের কপালে একসাথে দশটা ভাঁজ ফেলে দিল।মুখে বিরক্তির রেশ টেনে, ঠোঁটের কোণে ক্ষুদ্র এক তর্জন-ভঙ্গি নিয়ে সে বিড়বিড় করে বলল,,

__এ আমার রুমে কেন?
আলবান ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ইতির মুখের উপর ঢেকে থাকা সাদা লম্বা ভুতুড়ে কাপড়টা সরিয়ে নিল।কাপড় নিচে নামতেই ইতির মুখটা পুরোপুরি দৃশ্যমান হলো নরম, শান্ত, ঘুমে ডুবে থাকা ইতির মুখ।
মুহূর্তেই আলবানের চোখের তাপ কমে এল, দৃষ্টিতে নেমে এলো এক অদ্ভুত শীতলতা।
অটোমেটিকভাবে ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
ইতি মুখ হা করে নরম শ্বাস নিচ্ছে,কখনো ঠোঁট কেঁপে হালকা হাসছে,আবার কখনো বিরক্তির ভঙ্গিতে যেন নড়ে উঠছে।সব মিলিয়ে একদম নিরীহ শিশু লাগছে ইতিকে।
আলবান লক্ষ্য করল,ইতির মুখজুড়ে এলোমেলো চুলগুলো বারবার তাকে অস্বস্তি দিচ্ছে।ইতির ছোট্ট ভ্রু কুঁচকে উঠছে টের পেয়ে আলবানের তা ভালো লাগল না।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে বসলো ইতির মাথা কাছে ।
অত্যন্ত আলতো, নিঃশব্দ ভঙ্গিতে সে ইতির মুখে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল।
চুলগুলো ঠিক করার পর আলবান ইতির মুখের খুব কাছে এসে কোমলভাবে ফু দিল।ইতি তাতেই শান্তি পেল বোধহয় মুখটা একটু শিথিল হলো, ঠোঁটে ঘুমঘুম হাসির টান ফিরে এলো।
আলবান আরও কাছে ঝুঁকে, একেবারে কানের পাশে, নিঃশ্বাসের উষ্ণতা ছুঁই ছুঁই করে ফিসফিসিয়ে বলল,,

__ তুই আমার কাছে নিজেই ধরা দিলি তবে?তবে চল,আজ একটু অন্যকিছুতে মত্ত হই।
এই বলে আলবান মেঝে থেকে কম্ফোটারটা তুলে ইতি এবং তার গা ঢেকে নিলো।ইতি পা দুটো সোজা করে নিজের পায়ের নিচে রাখলো,ইতির হাত দুটো নিজের মাথা জড়ানোর মতো করে রাখলো।এবার আলবান মুখ নিয়ে গেল ইতি উদাম গলায় মুখ ডুবিয়ে দীর্ঘ শ্বাস নিলো।ইতি ঘুমেই তলিয়ে, কিন্তু বোধ করতে পারছে যে কেউ তার শরীর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে, গলায় খোঁচাখুঁচি মতো কিছু অনুভব করছে ইতি।
আলবানের গলা থেকে মুখ সরিয়ে নিলো,কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেনা,ইতির এমন বেঘোর ঘুম শান্তি দিচ্ছে না আলবানকে।এতে ডিস্টার্ব ফিল করলো আলবান,ইতির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগলো আলবান,,
__ কি রে,চোখ খোল দেখ কোথায় তুই । তুই যে ইচ্ছা করে আমার বিছানায় আছিস নি তা আমি ভালো করেই জানি, এখন চোখ খোল দেখ আমায়,শক্ট খা,নাকি অন্যকিছু করলে চোখ খুলবি।বাজে ভাবে ছুঁয়ে দিবো কিন্তু ইতি,চোখ খোল বলছি।
ইতি ঘুমের ঘোরেই বিরক্তিকর রাশভারী কন্ঠ নিয়ে বলল,,

__ নিধি সর তো, রোমান্স আমার সাথে প্রাকটিস করা লাগবে না,যা বিথীর কাছে যা।উফফ কবে যে তোর বিয়েটা হবে আর্দ্র ভাইয়ের সাথে,সর ঘুমাতে দে, এমনিই কাল অনেক ধকল গেছে।
এই বলে ও পিট ঘুরে ঘুমালো,আলবান চোখ মুখ কুঁচকে মনে মনে বলে,,
__ এরা কি এসব ও প্রাকটিস করে নাকি?
কিছুক্ষণ ভেবে আলবান মাথা ঝাঁকালো, পরপরই আবার ইতির গলার দিকে সড়ে গিয়ে পা দিয়ে ইতির গায়ে কম্ফোটার জড়িয়ে দিয়ে,ইতিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনলো এক ঝটকায়,ইতি বিরক্তিতে আরো চোখ মুখ কুঁচকে নিলো,চোখ বন্ধ রেখেই চিৎকার করে বলে উঠলো,,

__ বলদিইইইইই,ভালো হচ্ছে না কিন্তু।
আলবান চুপ রইল, তারপর আবার নিজের হাত বিচরণ করতে লাগলো ইতি মুখে,এক আঙ্গুলের সহিত কপাল থেকে থুতনি পর্যন্ত নরম স্পর্শে হাত এগোতে লাগলো, আঙ্গুল খানা ইতির গোলাপি অধরে এসে থেমে গেল, আঙ্গুল অবাধ্য ভাবে চলতে লাগলো ইতির ঠোঁটের সব কোণায়।আলবানের শরীর এক প্রকার ঝাকুনিতে শিহরিত হলো,মনে অন্য এক আশা জাগ্রত হলো,ঢোক গিলতে লাগলো আলবান।

ইতি এবার বিরক্তির সহিত চোখ রাগ নিয়ে চোখ খুলল।চোখ খুলেই চোখের সামনে আলবান কে দেখতে পেয়ে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না বরং আবার চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলো, নিজের মন কে বোঝালো যে সে ভুল দেখেছে, সেভাবেই আবার চোখ খুলল, কিন্তু আবার ও আলবানে মুখ খানা দেখতে পেল তাও আবার এত কাছে,ভুত দেখার মতো ইতি প্রতিক্রিয়া দেখালো এবার,আলবানে নিঃশ্বাস এসে ইতির নাকে মুখে আঁচড়ে পড়ছে,মাএাতিক্ত বড় বড় চোখ হলো ইতি,এবার ঠাহর করতে পেলো আলবানের হাতের বিচরণ,যা কোমড় আঁকড়ে ধরে আছে। আস্তে আস্তে মনে পড়ে গেল কাল রাতের দৌড়াদৌড়ির ঘটনা।ভয়ে, লজ্জায় লাল হয়ে ওঠলো ইতির মুখশ্রী।শুকনো ঢোঁক গিলতে লাগলো। নিঃশব্দের আলবানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা চালাতে লাগলো, কিন্তু আলবানের হাতকে এক চুল ও নড়াতে পারলো না,আলবানের এমন চাহনিতে ইতি ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে, অস্তিত্বে পড়ছে।ইতি এবার বাধ্য হয়ে গলার খাদ নামিয়ে কান্না ভারাক্রান্ত গলায় আলবানকে বলতে লাগলো,,,

__ ছাড়ুন দাড়ানল ভাই?কাল ভুল করে এসে গেছি এখানে?আর আসবো না?
আলবান একটু নড়েচড়ে ভালো করে জড়িয়ে নিলো ইতিকে পরপর কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,,
__ এসেছিস তোর ইচ্ছায়, এখন যাবি আমার ইচ্ছায়।
ইতি খুব খারাপ লাগলো আলবানের এত কাছে আসায়,কাল রাতে তো আলবান অপ্রত্যাশিত ভাবে ঘুমের ঘোরেই জড়িয়ে ধরেছিল কিন্তু এখন,এখন তো ইচ্ছে করেই এভাবে জাড়িয়ে ধরে আছে ইতিকে।মুখের আদল পরিবর্তন হলো ইতির।ইতির যে অস্তিত্ব হচ্ছে তা ভালো করেই বুঝলো আলবান, পরক্ষণেই নিজের কপালের সাথে ইতির কপাল ঠেকিয়ে আলতো চাপ দিয়ে বলে,,

__ তোর বোঝা উচিত ছিল ইতি যে তুই একটা ছেলের বেডে সেধে এসেছিস, এন্ড তোর বৈধ পুরুষের কাছেই এসেছিস, ডোন্ট ওয়ারি।
এহেন কথায় ইতির লজ্জায় সাথে সাথে মেজাজটা খারাপ হতে লাগলো, এবার বেশ বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,,
__ আপনি আমার জন্য বৈধ পুরুষ না?
__ বৈধ্য না?
__ না?
__ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলা,চোখ খোল?
ইতি চোখ মুখ আরো খিচে বলল,,
__ আমার বিরক্ত লাগছে দাবানল ভাই ছাড়েন?
__ ছাড়ারা কোন প্রশ্নই উঠছে না, কারণ আমার ভালো লাগছে ?
ইতি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলতে লাগলো,,
__ আমি চিৎকার করবো কিন্তু?
__ কর?
__ সত্যি বলছি?
__ আমি ও সত্যি বলছি?
__ আপনি কি চাইছেন?
__ আপাতত আমি ঘুমাবো?
__ ঠিক আছে আমায় যেতে দিন?
__ এভাবেই তোকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো?
__ আমি কি আপনার ব.
পরের শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো না,আলবান বলল,,
__ বল বল ?
মুখ ভার করে ইতি বলে,,
__ কিছু না?
__ তুই মানিস বা না মানিস ওটা কিন্তু সত্য আর আমার অধিকারটাও।
__ মানি না আমি?
__ কেন?
ইতি রাগে তেতে উঠল,,

__ কারণ খুনি আপনি?
ব্যাস আলবানের রোমান্টিক মুডের দিল বারোটা বাজিয়ে।রাগ তিরতির করে ধেয়ে আসতে লাগলো নিজের দিকে।আলবানের সবচেয়ে অসহ্যকর ব্যাপার হলো তার অতীতকে নিজের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা, যেটা ইতি একবার নয় বারবার করে এটাই আলবানের বিরক্তির বিষয়ে পরে। তা একপ্রকার কন্ট্রোলেস রাগে পরিনত হয়। মুহুর্তেই আলবানের চোখ বড় রাগি লাল চোখে পরিণত হলো,ইতির কোমড় থেকে হাত সড়িয়ে নিল,ইতির কাছ থেকে দুরুত্ব তৈরি করে নিলো আলবান।রাগে নিজেকে সংযত করতে না পেরে বিছানায় সোয়া অবস্থাতেই ইতির কোমড় বরাবর পা দিয়ে ধাক্কা দিল আলবান। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে বিছানা থেকে পড়ে গেল ইতি। কোমড়ে বেশ ব্যাথা পেল ইতি,চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নিল।আলবান গম্ভীর কন্ঠে বলল,,

__ আমাকে যেভাবে খাট থেকে ফেলে দিয়েছিস, ঠিক সেভাবে তোকেও ফেলে দিলাম,যা এখন বিদায় হ আমার রুম থেকে।
ইতি কোমড়ে হাত দিয়ে টেনে টুনে দাঁড় হলো,রাগি লুকে আলবানের দিকে তাকালো, আলবান পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে আরাম আয়েশে,ইতি সেদিকে তাকিয়ে আলবানের দিকে বালিশ ছুঁড়ে দিলো।আলবানের মুখে বালিশটা পড়লো।ইতি চলে যেতে যেতে হুমকি স্বরুপ বলতে লাগলো,,

__ আপনাকে আমি পড়ে দেখে নেবো?
আলবান আলসে ভাব নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে উওর দিলো,,
__ বেডে আছিস তবে?
ইতি আর কোন না বাড়িয়ে আলবানের দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলো কেউ আসছে নাকি,দেখলো আলিফা বেগম সিঁড়ি বেয়ে আলবানের রুমের দিকেই আসছে,ইতি হকচকিয়ে আবার আলবানের কাছে গিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে হাত দুটো লাফাতে লাফাতে বলতে লাগলো,,

__ দাঁবালন ভাই বড় আসছে আপনার রুমে,এখন কি করি,দেখে ফেললে কেলেংকারি হবে?
আলবান ব্যঙ্গ সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,,
__ হ্যাঁ, সত্যিই?
ইতি লাফাতে ঝাফাতে বলতে লাগলো,,
__ হ্যাঁ হ্যাঁ?
আলবান তার গায়ে কম্ফোটার টা উচু করে উঁচিয়ে বলে,,,
__ আয় আয় তাড়াতাড়ি আয় এখানে লুকা, শক্ত ধরে জড়িয়ে ধরবি আমাকে,যেনো মা বুঝতে পারে কম্ফোটারের ভিতরে শুধু আমিই আছি।
ইতি কাঁপাকাপি দিগুন হাড়ে বেরে গেল,আর কিছু না ভেবে আলবানের কম্ফোটারের ভিতরে চলে গলো,আবার ও মিশে গেল আলবানের শরীরের সাথে,ইতি অনবরত কাঁপছে তা উপলব্ধি করতে পারলো আলবান,,

__ ধরা পড়ার এত ভয় ইতি? একদিন তো সব প্রকাশ্যে আসবেই তখন কি করবি?
ইতি কোন উওর করলো না, এদিকে আলিফা বেগম ছেলের রুমের দরজা খোলা পেয়ে রুমে ডুকে পড়লো আলিফা বেগম, বিছানার পাশে এসে ঘুমান্ত আলবানকে ডাকতে লাগলো,,
__ আলবান ও আলবান?ওঠ বাবা?
আলবান পিটপিট করে চোখ খুলতে লাগলো এবং বলল,,
__ কি হয়েছে মা?
__ তোর মেজো বাবা নিধি ও আর্দ্রের বিয়েতে রাজি হয়েছে,সে নিয়েই তোর বাবার সাথে কথা বলছে তোর মেজো বাবা,তুই ওঠ আর্দ্রের কাছে যাহহ,ছেলেটা কাল থেকে না খেয়ে আছে,দরজাটাও বন্ধ।যা ওর কাছে।
আলবান কিছুটা অবাক হয়েই বলতে লাগলো,,

__ এত তাড়াতাড়ি কিভাবে রাজি হলো মেজো বাবা?
ইতি কম্বোটারের ভিতরেই মুখে হাত চেপে খিলখিল করে হাসছে।
আলবান আবার তার মাকে বলে,,
__ তুমি যাও মা আমি যাচ্ছি?
আলিফা বেগম চলে গেলেন,ইতি তড়িৎ বেগে কম্ফোটার এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। আলবান বলে,,
__ কি হলো?
ইতি ব্যঙ্গ করে বলতে লাগলো,,
__ আপনার গাঁয়ে গন্ধ?
__ যা ভাগ?
__ উুয়াক থু?
আলবান এবার তেড়ে আসে ইতিকে মারতে ইতি বিছানার বালিশ আবার আলবানের মুখে মেরে ভৌ দৌড় লাগায় নিজের রুমের দিকে।
আলবান বিছানার ধুম করে শুয়ে পড়ে , অজান্তেই ঠোঁটের কোনে এক স্নিগ্ধ ধরা হাসি খেলা করতে লাগলো।

সুন্দর,পিকি, মুহিন একসাথে ঘুমিয়েছে মুহিনের ঘরে। গতকাল রাতের সেই এলোমেলো দৌড়ের পর তিনজনেরই ঠাই হয়েছে মুহিনের ঘরে পরে আর দাদিমা ভয়ে এই ঘর পার হয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার মতো সৎ সাহস হয়নি সুন্দরের,তাই এখানেই ঘুমিয়ে পড়লো।
সুন্দরের ঘুম আর হলো কই মুহিন ও পিকি মধ্যে খানে বেচারা সুন্দর অবস্থান।দুদিক দিয়ে দুজনেই জরিয়ে চেপে ধরে আছে। সুন্দর সোনা মতো চকচকে ঘুম খানা গেলো ভেঙ্গে এতো চিপায় থাকার ফলে।
কথা তো সেটা নয়,কথা হলো এটা যে পিকি কেন ঘুমের ঘোরে সুন্দরকে চুমু খাচ্ছে, সুন্দর নাক মুখ ছিটকিয়ে নিচ্ছে এতে।হাত দিয়ে পিকিকে সরাতেও পাচ্ছে না কারণ পিকি একদম আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে আছে, সুন্দরের বিরক্তি সীমা অতিক্রম হয়ে গেল,মনে মনে বলতে লাগলো,,

__ এ কি আমারে তার পার্সোনাল নারী মনে করে নাকি?
এতক্ষণ যাবৎ থেমে থেমে চুমু খাচ্ছিল পিকি কিন্তু এখন সুন্দরের গালে এঁকের পর এক চুমু খাওয়ার তোড় বাড়তে লাগলো পিকির। এদিকে মুহিন তো হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছে, সুন্দর পিকির এমন ফালতু চুমু সহ্য করতে না পেরে জোরেই বলতে লাগলো,,
__ এর তো যৌবন উতলে উঠছে দেখছি এই লোকের,এ লোক করে কি?মানছি বউ নেই আমার?তাই বলে এনাকে বউয়ের কাজকাম করতে কইছে কেটা?
ফের পিকি সুন্দরের গালে চুমু দিলো, আবার ও বিরক্ত হয়ে সুন্দর বলে,,

__ আরে সরো তো পিকি ভাই থুক্কু বইন না ভাই আরে না বোন,ধুর বাল এই লোকেরে ডাকমু কি কইয়া।
পিকির চুমু থামলো না,এতে সুন্দরের খুবই রাগ হলো বেচারা রাগের বশে দুহাতের কনুই দিয়ে দুদিকে দুজকেই ধাক্কা দিলো,পিকি মুহিন দুজনেই দুদিকে পড়ে গেল। সুন্দর বিছানা থেকে নেমে লুঙ্গিটা ঠিকঠাক করে অনবরত গাল মুছতে মুছতে,পা দাপাতে দাপাতে বলতে লাগলো,,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৬

__ ছ্যাঁ,গালটাকে খেয়ে দিলো রেয়য়য়।
পিকি, মুহিন মেঝেতে বসেই সমানে মাথা চুলকাচ্ছে। কাঁচা মুখ ভাঙ্গা দুজনেই মুখ আমুট চুমুট করছে।
এই বলে সুন্দর বড় বড় পা ফেলে রুম ত্যাগ করলো।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ২৮