তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৩
রাফিয়া জান্নাত রিফা
দু হাত মেলে দিয়ে দির্শককে ঢেকে নিলো বিথী এবং আগের ন্যায় দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,
__ উনাকে টাচ করার দুঃসাহস ও দেখাবি না সে তুই যে বালই হ না কেন?আর একবার এনাকে টাচ করতে এলে হাত কেটে দিবো, বাজে নজরে তাকাবি তো চোখ উপড়ে নিবো,মুখ দিয়ে ভালোবাসার কথা বলবি তো জিভ টেনে ছিঁড়ে নিবো, পরিশেষে খুন করে ফেলবো।
কথা গুলো কিছু তো ছিলো সে কথায় দির্শক ও নাতাশা ও কেঁপে উঠল।
রাগে দাউদাউ করে উঠল নাতাশা। ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে সে বিথীর দিকে ধেয়ে এলো, গালে চড় বসানোর উদ্দেশ্যে হাত উঁচিয়ে তুলল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বিথী তার হাতটি শক্ত করে ধরে ফেলল। অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে নাতাশার দিকে তাকিয়ে থেকে এক ঝটকায় হাতটি ঝেড়ে ফেলে দিল সে। পরক্ষণেই, জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণে বিথীর হাত নাতাশার গালে সজোরে আছড়ে পড়ল। প্রবল আঘাতে নাতাশা আবারও ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
এবার আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না বিথী।ক্রোধে কণ্ঠ কাঁপিয়ে সে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল,,
__ দূরে থাকবি তুই,দুরে থাকবি,তোকে দির্শক স্যারের আশে পাশে দেখলে খুন করে ফেলবো খুন।
বিথীর রাগ ক্রমেই তিরতির করে বাড়তে লাগল। প্রচণ্ড ক্রোধে তার সারা শরীর কাঁপছিল, রাগে গা জ্বলে উঠেছে। নিজের অবস্থাই তার কাছে অচেনা লাগছিল মনে হচ্ছিল সে ধীরে ধীরে পাগলামির কিনারায় পৌঁছে যাচ্ছে। ক্রুদ্ধ মন নিয়েই সে আবার নাতাশার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দির্শক এগিয়ে এসে বিথীর হাত টেনে ধরে ফেলল। গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সে চোখ বন্ধ করল, নিজেকে স্থির করল। তারপর শান্ত, সংযত কণ্ঠে সে বলল
__ বিথী স্টপ।
বিথী ধীরে দির্শকের দিকে তাকাল। তার চোখে আবারও অসহায়ত্বের ছায়া ফুটে উঠল এক গভীর, নীরব আর্তি তা সেখানে জমে আছে। দির্শক সেই দৃষ্টির ভার সহ্য করতে পারল না এক মুহূর্তও নিজের চোখ তার চোখে স্থির রাখতে পারল না সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিথীর হাত ছেড়ে দিয়ে সে নাতাশার দিকে এগিয়ে গেল।
নাতাশার হাত ধরে তাকে মাটি থেকে উঠিয়ে দিল দির্শক। বিথী অনুভূতিশূন্য হয়ে সেই দৃশ্য দেখল না রাগ, না কষ্ট, না বিস্ময় সব অনুভূতি মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেছে তার ভেতরে।
দির্শক নাতাশার দিকে তাকিয়ে বলল,,
__ আর ইউ ওকে?
নাতাশা কিছুই বলল না। রাগে জ্বলতে থাকা চোখে সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিথীর দিকে। তার মনেও তীব্রভাবে জেগে উঠল বিথীকে সজোরে এক চড় বসানোর ইচ্ছে, কিন্তু বহু কষ্টে সে নিজেকে সংযত রাখল।
দির্শক এবার বিথীর দিকে তাকাল। বিথীর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গিয়ে চোখের জলের সঙ্গে গালের ওপর লেপ্টে আছে। সেই দৃশ্য দির্শকের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক টান সৃষ্টি করল। তার প্রবল ইচ্ছে হলো নিজের হাত বাড়িয়ে সেই এলোমেলো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে, গালের ওপর জমে থাকা অশ্রুগুলো মুছে নিতে। কিন্তু সে পারল না। কিছু অদৃশ্য দেয়াল যেন তাকে আটকে রাখল।
দির্শক কোনোদিন কল্পনাও করেনি, বিথী তাকে এত গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলবে এতটাই যে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়েও সে মুখে খুন করা শব্দটা পর্যন্ত উচ্চারণ করবে।
বিথীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা দির্শকের জন্য ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছিল। সেই দৃষ্টি তার ভেতরটা এলোমেলো করে দিচ্ছিল। হঠাৎ সে নাতাশার বাহু শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল, কণ্ঠ কঠিন করে বলল,,
__ সি ইজ মাই গার্লফ্রেন্ড,এটাই সত্য আর কি জানতে চাও তুমি।
বিথীর মাথাটা একপাশে এলিয়ে এলো। কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই তার ভেতরটা যেন মুহূর্তে তোলপাড় হয়ে উঠল। বুকের গভীর থেকে ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইল এক অসহ্য আর্তনাদ চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করল, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে রইল। সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল, নিঃশব্দে ভাঙতে ভাঙতে।
দির্শক আবার বলল,,
__তুমি আমায় ভালোবাসো, তাই তো? কিন্তু আমি তোমায় ভালোবাসি না। তোমার সঙ্গে এই তিন দিনের প্রেমসবটাই ছিল অভিনয়,এটা তুমি ও জানো। না, এটা প্রতিশোধের অংশ ছিল না। আগেও বলেছি, তোমার প্রতি আমার কিছু অনুভূতি জন্মেছিল সেই অনুভূতিগুলোকে দমন করা, রপ্ত করা জরুরি ছিল বলেই এই এই তিন দিনের প্রেম ছিল।
এই তালুকদার বাড়িতে আমার আসার একটাই উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ। আমার মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ। কিন্তু আমি সেটা নিতে পারিনি। কারণ এখানে এসে আমি দেখেছি এই পরিবারের মানুষগুলো একে অপরকে কতটা গভীরভাবে ভালোবাসে,কতটা মিল বন্ধন তাদের।
আলিফা বেগমের ভেতর আমি আমার মাকেই খুঁজে পেয়েছি। যেদিন জ্বরে পড়ে ছিলাম, যিনি মায়ের মতো করে আমার সেবা করেছেন, যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছেন সেই মানুষটার কাছ থেকেই তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে কেড়ে নিয়ে তার চোখের পানি দেখতে আমি পারবো না। একলিস্ট… আমি এতটাও পাষাণ হতে পারি না।”
কান্নারত হেঁসে দির্শক ফের বলে,,
__ প্রতিশোধ নিতে এসে সবার মায়ায় পড়ে গেলাম আমি।
বিথী অসহায় ভঙ্গিতে ব্যস্ত হয়ে বলে,,
__ আর আমার মায়ায় পড়েন নি।
বিথীর কথাগুলো দির্শকের কানে পৌঁছাতেই সেগুলো বুকের গভীরে এসে তীরের মতো বিদ্ধ হলো। প্রতিটি শব্দ যেন নিঃশ্বাস আটকে দেওয়ার মতো ভারী। অথচ সেই কঠিন প্রশ্নের কোনো উত্তরই খুঁজে পেল না দির্শক। প্রস্তুত ছিল না সে না মন থেকে, না বিবেক থেকে।
কথা বলতে গিয়ে জিহ্বা জড়িয়ে এলো তার। চোখ এড়িয়ে, কণ্ঠ কাঁপিয়ে, আমতা-আমতা করে সে বলল,,,
__ হয়তো।
দির্শক আবারো বলল,,
__জানো, বিথী… মানুষ কখন যে নিজেরই অজান্তে সবচেয়ে বড় মিথ্যেটার ভেতর ঢুকে পড়ে,তা নিজেও টের পায় না। আমি ভেবেছিলাম আমি শক্ত, আমি নিষ্ঠুর। ভেবেছিলাম প্রতিশোধই আমার একমাত্র সত্য।
কিন্তু তোমার চোখে তাকালেই সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। তোমার নীরব ভালোবাসা আমাকে ও প্রতিদিন একটু একটু করে দুর্বল করে দিয়েছে।
আমি চেয়েছিলাম নির্দয় হতে, কিন্তু পারিনি। চেয়েছিলাম তোমাকে দূরে রাখতে, অথচ অজান্তেই তোমার কাছে টেনে নিয়েছি নিজেকে। এই হাসিটা এই কান্নাভেজা হাসিটাই তার প্রমাণ… আমি হেরে গেছি, বিথী। নিজের কাছেই হেরে গেছি।তাই ভাবলাম এই অনুভূতি নিয়ে তিনদিন প্রেম করাই যায়।
কিন্তু তাও ভালোবাসতে চাই না তোমায়।
এসব কথা বলেই দির্শক নাতাশার হাত ধরে সেখান থেকে চলে গেলেন। বিথী বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে সেই দিকেই তাকিয়ে রইল।
ইতিমধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ইতি বিথীকে খুঁজে ফিরছে, অথচ কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছে না। পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজার পরও বিথীর দেখা মেলেনি। শেষমেশ খোঁজের আশায় সে বাগানের দিকে এলো। বাগানে এসে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বিথীকে খুঁজতে খুঁজতে সামনে তাকাতেই তার দৃষ্টি পড়ল বিথীর পেছন দিকে। দৃশ্যটি দেখে ইতির মনে সামান্য বিরক্তির সঞ্চার হলো। ধীর পায়ে সে বিথীর দিকে এগিয়ে গেল এবং পেছন থেকেই তাকে উদ্দেশ করে বলল,,
__ কি রে সে কখন থেকে খুঁজছি,চল খাবি।
বিথী ইতির দিকে তাকালো না দেখে ইতি বিথী সামনে গেল, বিথীর চোখ মুখের অবস্থা দেখে অবাক হলো ইতি, আঁতকে উঠলো ইতি,সে কখনো বিথীকে এমন ভাঙ্গা অবস্থায় দেখে নি যে,ইতি বেশ হকচকিয়ে বিথীর মুখে হাত দিয়ে বললো,,
__ কি হয়ে তোর?এমন এলোমেলো লাগছে কেন তোকে?
বিথী ইতির দিকে ফিরে তাকাল না। এতে ইতির মনে আরও অস্বস্তি জন্মাল। সে এগিয়ে গিয়ে বিথীর সামনে দাঁড়াল। বিথীর চোখ-মুখের অবস্থা দেখে ইতি মুহূর্তেই হতবাক হয়ে গেল। এক অজানা আতঙ্কে সে আঁতকে উঠল। জীবনে এই প্রথম সে বিথীকে এতটা ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখছে যেন সমস্ত শক্তি, সমস্ত আলো তার মুখ থেকে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
হকচকিয়ে গিয়ে ইতি ধীরে হাতে বিথীর মুখ ছুঁয়ে দিয়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,,
__ এই বোন কি হয়েছে তোর,বলদি কথা বল,এমন লাগছে কেন
বিথী নিষ্পলক ভঙ্গিতে ইতির দিকে তাকাল। কিন্তু ইতিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ ভিজে উঠল। ঝাপিয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল বিথী। ইতিকে আঁকড়ে ধরে সে ছটফট করতে লাগল, যেন নিজের সমস্ত যন্ত্রণা এবং বিষাদ প্রকাশ করতে চাইছে।
এমন অচেনা, হাহাকারপূর্ণ কান্না দেখে ইতির চোখও ভিজে গেল। বিথী হু হু করে কেঁদে কেঁদে চিৎকার করে বলল,,
“ইতি, আমার বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে… আমি ঠকে গেছি ইতি! দির্শক স্যার আমাকে ঠকালো রে… এখন আমি কী করব ইতি? আমার তো খুব কষ্ট হচ্ছে!”
বিথী হালকা করে পিট নেড়ে বলল,
“কি করেছে?”
পুনরায় আরও জোরে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বিথী বলল,
“আমাকে ভালোবাসেনি দির্শক স্যার। তিন দিন শুধু অভিনয় করেছে আমার সঙ্গে।”
ইতি কিছুটা সন্দিহীন ভাবেই বলল,
“একদিন তো তুই আমায় বলেছিলি, যে তুই নাকি তিন দিনের প্রেম করছিস।”
বিথী কাঁদতে কাঁদতে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তো ওটা সত্যি সত্যি বলিনি। ভেবেছিলাম দির্শক স্যার আমার সঙ্গে এ বিষয়ে মজা করছেন।
পুনরায় হু হু করে কান্না করতে করতে বিথী ছটফট করল। ইতির মনে হলো বিথীর শরীরটা হঠাৎই হালকা হয়ে এসেছে। সে ধীরে ধীরে বিথীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,,,
“এসব নিয়ে পরে কথা বলি। আগে কিছু খেতে যাও। কাল থেকে তো তুই কিছুই খাসনি।”
বিথী দুবার হেঁচকি তুলে কান্না করলেও ইতির দিকে ঝাপিয়ে ধরে। ইতির মনে হলো, বিথী যেন তার বুকে চেপে ধরায় সব ব্যথা কিছুটা হালকা হয়ে এসেছে। সে আবার বলল,
“কি রে, চল?”
বিথীর কোনো উত্তর এলো না। ইতির ধৈর্য হারানো কণ্ঠে আবার হাত বুলিয়ে বলল,
“কি রে, চল।
আবারও কোনো উত্তর এলো না বিথীর। হকচকিয়ে ইতির চোখে ভেসে এলো উদ্বেগ। ধীরে ধীরে সে বিথীর মাথা নিজের দিকে টানল ততক্ষণে বিথী হেলে পড়ে যেতে বসেছে। ইতির শরীর যেনো সব কাঁটা দিয়ে উঠে গেল।
বিথী অজ্ঞান হয়ে গেছে, তা বুঝতেই ইতির চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। আতঙ্ক ও দুঃখে তিনি বিথীকে কোলে তুলে নিয়ে সেখানেই বসে পড়লেন। বিথীকে কোলে শুয়ে দিয়ে ইতি বিচলিত কণ্ঠে বলল,
“এই বিথী… বোন, এই বলছি ওঠ, কিরে, ওঠ। তাকাও।”
কিন্তু বিথী আর কোনো সাড়া দেয়নি। হতাশা, আতঙ্ক এবং দুঃখের ঢেউয়ে ইতির কণ্ঠ জোরে জোরে কেঁদে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে চারপাশে সবাইকে ডাকতে শুরু করল, যেন সাহায্যের আশায় তার কান্নার সুর আরও জোরে হয়ে উঠছে।
একটি পরিত্যক্ত বাড়ি, যেখানে দিনের আলো সত্ত্বেও গা ছমছমে লাগে। চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় নাতাশার মুখে কস টেপ লাগানো। তার পাশের চেয়ারে, মুখ বাঁধা ও হাতে দড়ি বেঁধে রাখা হয়েছে ডাক্তার বাবু, অর্থাৎ বিথীকে যে ডাক্তার ভালোবাসতো, তার নাম ডঃ মুশতাক চৌধুরী। মুশতাক চৌধুরীকে বিগত পাঁচ দিন ধরে এই পরিত্যক্ত বাড়িতেই বন্দী রাখা হয়েছে।
নাতাশার সামনে অলস ভঙ্গিতে চেয়ারে বসে আছে দির্শক, হাতে ছুরি। এক হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রেখেছে সে। বন্ধ চোখের পেছনেও বারবার ভেসে ওঠে বিথীর কান্নাভেজা মায়াবী মুখ। সেই ভাবেই সে মুচকি হাসছে।
এদিকে চেয়ারে বাঁধা নাতাশা অল্প অল্প নড়াচড়া ও কাইকুই শব্দ করতে লাগল। শব্দগুলো দির্শক শুনতে পেতেই তার কানে বিরক্তি ঢুকল। কুঁচকে চোখে সে নাতাশার দিকে তাকাল এবং দ্রুত তার মুখ থেকে টেপটি খুলে দিল।
নাতাশা গড়গড় করে বলল,,
“তুমি আমাকে বেঁধে রেখেছো কেন, ডিকে? হাত খুলে দাও। তুমি আমার সঙ্গে এমনটা করতে পারো না।”
নাতাশার পাশে চেয়ারে নেতিয়ে পড়ে থাকা ডঃ মুশতাক চৌধুরীর দিকে একবার তাকিয়ে সে দির্শকের দিকে ফিরে বলল,,
“এনি কে?”
দির্শক কোনো উত্তর দিল না। নাতাশা আবার নিজের বাঁধা হাত খুলতে চেষ্টা করতে করতে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,,
“দির্শক, লুজ়েন দ্য বন্ড… খুলে দাও।”
কিন্তু দির্শক নাতাশার কোনো কথারই তোয়াক্কা করল না। সে মাথা খানিক উঁচিয়ে অলস অথচ কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে ডাক দিল,,
“নিথেক্স।”
মুহূর্তের মধ্যেই হাতে পানির বোতল নিয়ে নিথেক্স সেখানে উপস্থিত হলো।
“হ্যাঁ, ভাই?”
দির্শক ঠান্ডা গলায় বলল,,
“ডাক্তার বাবুর ঘুম ভাঙা।”
নিথেক্স এগিয়ে গিয়ে মুশতাক চৌধুরীর মুখে পানি ছিটিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর চেয়ারে হেলে থাকা মুশতাক পিটপিট করে চোখ খুলল। চারপাশটা কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দেখে নিয়ে সে দির্শকের দিকে তাকাল। ভয়ে কাঁপা, আকুতিভরা কণ্ঠে বল,,
“প্লিজ… আমাকে যেতে দিন। আমি আর কখনো এমন করব না।”
দির্শক ঠোঁটের কোণে ঠাণ্ডা হাসি ফুটিয়ে বলল,,
“অবশেষে তোর বাবার পেশাটাই তুই নিলি, তাই না?”
মুশতাক অস্ফুট কণ্ঠে বলল,,
“লোভে পড়ে করে ফেলেছি…”
দির্শকের চোখ দুটো আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“কিন্তু তুই ভুল জায়গায় হাত বাড়িয়েছিলি।”
ভয়ে গলা শুকিয়ে আসা মুশতাক চৌধুরী কাঁপতে কাঁপতে বলল,,
“আমার… আমার ভুল হয়ে গেছে।”
দির্শক ধীরে ধীরে মুশতাকের দিকে ঝুঁকে পড়ে ঠান্ডা হিমশীতল কণ্ঠে বলতে লাগল,,
“যখন নিষ্পাপ মানুষগুলোর কিডনি, লিভার, রক্ত নিতে
তখন একবারও মনে হয়নি যে এসব করা ভুল?”
মুশতাক মাথা নিচু করে নিল। দির্শক হেসে উঠল, সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই।
“তোর ভুল একটাই তুই একই ভুল বিথীর সঙ্গেও করতে যাচ্ছিলি।”
বিথীর নাম শুনতেই মুশতাক হঠাৎ মাথা তুলে দির্শকের দিকে তাকাল। কাঁপা গলায় বলল,,
“বিথীকে আমি ভালো…”
কথাটা শেষ করার আগেই দির্শক বিদ্যুৎগতিতে ছুরি চালাল। মুশতাকের হাতের পিঠ বরাবর ছুরিটা গেঁথে রইল, খাড়া অবস্থায়। মুহূর্তেই মুশতাকের গগনভেদী চিৎকারে পরিত্যক্ত বাড়িটা কেঁপে উঠল। সে ছটফট করতে লাগল।
দির্শক শব্দ করে হেসে বলল,,
“ওই একটা কথাও উচ্চারণ করবি না।”
ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মুশতাক বলল,,
“সত্যি… আমি তাকে ভালোবাসি।
এরপর দির্শক আবারও অন্য বাঁধা হাতের ওপর ছুরিটা খাড়া অবস্থায় গেঁথে দিল। আবারও মুশতাকের আর্তচিৎকার। এই দৃশ্য দেখে নাতাশা ভয়ে কাঁপতে লাগল।
দির্শক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মুশতাকের মুখের কাছে ঝুঁকে চিৎকার করে বলল,,
“বললাম না, ওই কথা উচ্চারণও করবি না?”
সে মুশতাকের চুল মুঠো করে ধরে বলল,,
“বল, কেন বিথীকে কিডন্যাপ করতে চাইছিলি?”
অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যেই মুশতাক কাঁপা গলায় বলল,,
“ভালোবাসার কথা বলতে…”
এই কথা শেষ হতেই দির্শক সপাটে মুশতাকের গালে থাপ্পড় বসাল।
“মিথ্যা বলছিস তুই। বিথীর কিডনি নেওয়ার জন্যই তাকে কিডন্যাপ করতে চেয়েছিলি।”
মুশতাক ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে বলল,,
“প্রথমে চেয়েছিলাম বিথীর স্যাম্পল নিতে… কিন্তু পরে মত পাল্টে ফেলি। কারণ বিথীকে আমি মন থেকে ভালোবেসে ফেলেছি।”
দির্শক আবারও থাপ্পড় মেরে চিৎকার করে উঠল,,,,
“বললাম না, ভালোবাসি শব্দটা ব্যবহার করবি না! কথা কানে যায় না তোর? বিথী শুধু আমাকেই ভালোবাসে। ও সারাজীবন আমাকেই ভালোবেসে যাবে শুধু আমাকেই।”
মুশতাক ব্যথায় নিষ্পলক চোখে শুধু দির্শকের দিকে তাকিয়ে রইল।
ওদিকে নাতাশা কাঁপতে কাঁপতে বলল,,
“দির্শক… তুমি তো বলেছিলে তুমি ওই মেয়েটাকে ভালোবাসো না।
দির্শক লালচে চোখে নাতাশার দিকে তাকাতেই নাতাশা ভয়ে আঁতকে উঠে মাথা নিচু করে নিল। দির্শক ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে নাতাশার মুখের সামনে ছুরিটা নাড়াতে নাড়াতে বলল,,,
“ওই মেয়ে কাকে বলছিস? সে আমার প্রেম… না-পাওয়া প্রেম,জনমের পর জনম সে আমার প্রেম হয়ে থেকে যাবে।”
হঠাৎ করেই দির্শকের ভেতরটা যেন ভেঙে পড়ল। নিজের মাথার চুল দু’হাতে আঁকড়ে ধরে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল সে। কাঁপতে থাকা কণ্ঠে একের পর এক শব্দ ছিটকে বেরিয়ে এলো,,
— আমি দির্শক প্রধান… বিথীকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। সে-ই আমার প্রথম প্রেম। আমি তাকে চাই মনপ্রাণ দিয়ে চাই। কিন্তু সে আমার সাধ্যের বাইরে।
একটু থেমে রুদ্ধশ্বাসে ফের বলে উঠল,,
— আই লাভ ইউ, বিথী।
প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে দির্শকের গলা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণায় কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হতে লাগল।
কিছুক্ষণ দৃষ্টি মাটিতে স্থির রেখে হঠাৎই সে মুশতাকের দিকে তাকাল। চোখে তখন উন্মত্ততার আগুন। দাঁত চেপে হুংকার দিয়ে বলল,,
— এই জীবনে বিথী দির্শকের না হলেও অন্য কারোও হবে না। বিথী শুধু আমাকেই ভালোবাসবে ,শুধু আমাকে। তার আশেপাশে ঘেঁষবিও না। না হলে তোর বাবার মতোই নির্মমভাবে তোকে মারবো। এমন মৃত্যু দেব, যা কল্পনাও করতেও বুক কাঁপবে।
এরপর সে ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল নাতাশার দিকে। কণ্ঠে এবার ছিল শীতল নিষ্ঠুরতা,,
— তোকে আগেই বলে রাখছি এই জন্মে তো দূরের কথা, সাত জন্মেও আমাকে পাবি না। কারণ আমি আমার প্রেম, আমার বিথীতেই আবদ্ধ। জন্মের পর জন্ম আমি তারই হয়ে থাকবো।
একটু থেমে আরও কঠোর স্বরে যোগ করল,,
— বিথীর থেকে দূরে থাকবি। আমি না থাকলে তুই ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করবি এই জন্যই তোকে ওয়ার্নিং দিচ্ছি। বিথীর গায়ে একটা আঁচড়ও যেন না লাগে। যদি লাগে, সেদিনই হবে তোর জীবনের শেষ দিন।
নাতাশার চোখ দু’টো কান্নায় ভিজে উঠল। গলা ভেঙে সে বলল,,,
— সাত বছর ধরে তোমায় ভালোবেসেছি, ডিকে। এরই প্রতিদান দিলে তুমি?
দির্শক কোনো আবেগ না দেখিয়ে ঠান্ডা স্বরে উত্তর দিল,,
— আমি তোকে কখনো বলিনি আমাকে ভালোবাসতে। মুখে ভালোবাসার কথা বললেই হয় না, নাতাশা। তোর কাজে তো সেই ভালোবাসার কোনো প্রমাণ আমি কখনো পাই নি বা দেখিনি।
দির্শকের কথা শেষ হতে না হতেই চারদিক হঠাৎ করে পুলিশের গাড়ির সাইরেনের তীক্ষ্ণ সংকেতে মুখরিত হয়ে উঠল। একের পর এক সাইরেনের শব্দ চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
নিথেক্স হকচকিয়ে উঠে ভাঙা জানালার দিকে ছুটে গেল। বাইরে তাকিয়েই তার বুক কেঁপে উঠল পরিত্যক্ত বাড়িটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে পুলিশ। লাল-নীল আলো ছায়ার মতো দেয়ালে নাচতে লাগল।
ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া গলায় ঢোক গিলে সে কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪২
— ভাই… পু-পুলিশ! পালাতে হবে… চলো ভাই, উঠো!
দির্শকের মধ্য তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না, ওদিকে নাতাশা ও মুশতাক চৌধুরী পুলিশের ভয়ে কাঁপতে লাগলো।
