তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৫
রাফিয়া জান্নাত রিফা
নাঈম তালুকদারের কর্কশ কণ্ঠস্বর কানে আসলেও দির্শক বিথীকে ছাড়ল না। তার চিৎকার শুনে একে একে নাজিম তালুকদার, আলিফা বেগম, নাফিস তালুকদার, মিলি বেগম, আলবান, ইতি, আর্দ্র, নিধি, মুহিন, পিকি, নিঝুম ও সুন্দর সবাই বিথীর ঘরে প্রবেশ করল।
ঘরে ঢুকেই সবাই দেখল দির্শক ও বিথী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। পরিবারের সবার মুখের দিকে তাকাল বিথী। কেউ লজ্জায় মাথা নত করে আছে, কেউ বা থমথমে হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিথী বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। অস্তিত্বের এক ভয়ংকর সংকটে পড়ে গেল সে। অথচ দির্শকের তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। উপস্থিত সবাই দির্শকের শরীরের রক্ত দেখে ভীষণভাবে ঘাবড়ে গেল।
নাঈম তালুকদারের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি দির্শকের গুলিবিদ্ধ হাতটা ধরে হেঁচকা টানে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। ব্যথায় দির্শক চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাঈম তালুকদার সজোরে তার গালে থাপ্পড় বসালেন। দির্শক হেলে পড়ল।
বিথী ছুটে এসে দির্শকের সামনে দাঁড়িয়ে রাগে চিৎকার করে উঠল,,
“বাবা!
এক মুহূর্তের বিস্ময়ের পর আরও কঠোর দৃষ্টিতে নাঈম তালুকদার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,,
“সামনে থেকে সরে যাও।”
কাটকাট গলায় বিথী জবাব দিল,,
“না।”
“সরে যেতে বলেছি আমি।”
“বলেছি তো, সরব না।”
নাঈম তালুকদার বিথীর গালে থাপ্পড় মারার জন্য হাত তুলতেই দির্শক তার হাত চেপে ধরে কঠোর কণ্ঠে বলল,,
“এই ভুল একদম করবেন না।”
ভস্ম চোখে নাঈম তালুকদার দির্শকের দিকে তাকিয়ে ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলেন।
“আমার বাড়ি থেকে চলে যাও।”
এই বলে তিনি নাজিম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বললেন,,
“এই ছেলেটাকে এই মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের করে দিন, বড় ভাই।”
নাজিম তালুকদারের মুখ থমথমে হয়ে গেল। দির্শকের শরীরের রক্ত দেখে তার গা কাঁপছিল, বুক ধকধক করছিল। শুকনো ঢোঁক গিলে তিনি চোখ সরিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,,
“হ্যাঁ… যা ভালো মনে করিস, তাই কর।”
মাথা নত করলেন তিনি। ঠিক তখনই আলিফা বেগম হতভম্ব হয়ে দির্শকের কাছে ছুটে এলেন। কান্নাভেজা চোখে তার রক্তাক্ত শরীর দেখে আর্তনাদ করে বললেন,,
“বাবা… বাপ আমার, কী হয়েছে? এত রক্ত কেন?”
দির্শক শীতল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,,
“কষ্ট হচ্ছে তোমার, মা?”
‘মা’ ডাক শুনে আলিফা বেগম হু হু করে কেঁদে উঠলেন। দির্শকের শরীর ছুঁয়ে ব্যাকুল হয়ে বললেন,,
“বুক ফেটে যাচ্ছে… চলো, তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাব।”
দির্শক এক হাত আলিফা বেগমের গালে রেখে নাজিম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,,
“কিছু হবে না আমার, মা।”
“কোনো কথা বলবে না। তিন দিন ধরে তোমার দেখা নেই। কোথায় ছিলে তুমি? আমি খাবার নিয়ে অপেক্ষা করি তুমি নেই।”
দির্শক কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই নাঈম তালুকদার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে তার হাত ধরে টানতে টানতে বললেন,,
“বিদায় হও। আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।”
আলিফা বেগম দির্শকের অপর হাত ধরে তাকে আটকালেন। বিথী দৌড়ে এসে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করল,,
“দাঁড়াও, বাবা!”
দাঁতে দাঁত চেপে নাঈম তালুকদার বললেন,,
“সরে যাও, বিথী।”
“না, বাবা।”
“সরে যেতে বলছি।”
বিথী চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। ইতি আর নিধির দিকে তাকাল। তারা বুঝে গেল এবার বিথী কিছু বলবে।
সোজা বাবার চোখে চোখ রেখে বিথী বলল,,
“আমি দির্শক স্যারকে ভালোবাসি, বাবা।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই তড়াৎ করে এক চড় এসে পড়ল বিথীর গালে। মুহূর্তেই দির্শক রাগে ফুঁসে উঠল। চড়ের আঘাতে বিথীর চুল এলোমেলো হয়ে গেল। সে পাত্তা না দিয়ে আবার বলল,,,
“উনাকে আমার লাগবে, বাবা। আমি উনাকে খুব ভালোবাসি।”
আরও এক চড় পড়ল অপর গালে। দির্শক গর্জে উঠতে চাইল, কিন্তু আলিফা বেগম শক্ত করে তার হাত চেপে ধরলেন। সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে থামালেন। দির্শক চোখ বন্ধ করে নিজেকে সংযত করল।
বিথীর দু’গালে আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। তবু সে জেদি কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,,
“উনাকেই লাগবে আমার। লাগবেই লাগবেই!”
এরপর হঠাৎ শান্ত কণ্ঠে বলল,,
“আমাকে যত ইচ্ছে মারো, বাবা। কিন্তু উনাকেই চাই।চাই মানে চাই,
এখন উনি খুব অসুস্থ। ওনার চিকিৎসা দরকার, প্লিজ।”
নাজিম তালুকদার কথায় কান না দিয়ে রাগে কাঁপতে লাগলেন। তিনি বিথীর কাঁধ ধরে ধাক্কা দিলেন। বিথীকে তার মা ধরে নিল। এদিকে নাজিম তালুকদার দির্শকের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলেন।
বিথী আহাজারি করে মাকে বলল,,
“মা, বাবাকে আটকাও। দির্শক স্যারের চিকিৎসা
দরকার। ইতি, নিধি বাবাকে বোঝা না। আলবান, আর্দ্র ভাই তোমাদের তো বন্ধু হয়, আটকাও প্লিজ। কসম, ওনার কিছু হলে আমি শেষ হয়ে যাব।”
বিথী ছুটে গেল দির্শকের দিকে। সিদ্দিকী বেগম কান্নারত কণ্ঠে বারবার বলছিলেন,,
“ভাই, ছাড়ো ওকে। ওর হাতে গভীর ক্ষত।”
তবু নাঈম তালুকদার আরও জোরে টানতে টানতে দির্শককে ড্রয়িংরুমে এনে দরজার দিকে ছুড়ে মারলেন। আলিফা বেগম তাকে ধরে ফেললেন।
সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দির্শক নিষ্পলক দৃষ্টিতে বিথীকে দেখল। সে কাছে পৌঁছানোর আগেই নাঈম তালুকদার তার হাত ধরে ফেললেন। বিথী ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল।
শেষমেশ শান্ত কণ্ঠে অসহায়ভাবে বলল,,
“সরি, বাবা।”
কথার মানে বুঝে ওঠার আগেই বিথী হঠাৎ বাবার হাতে কামড় বসাল। ব্যথায় নাঈম তালুকদার চিৎকার করে উঠলেন আরও বেশি অবাক হলেন, নিজের মেয়ের এমন আচরণে।
বিথী ছুটে গিয়ে দির্শকের কাছে পৌঁছাল। দির্শক কাছে গিয়ে তার রক্তাক্ত শরীর দেখে হঠাৎ ভেঙে পড়া শিশুর মতো কাঁদতে লাগল চুল টানছে, ও শরীর দুলছে। ঘরের সবাই হতবাক। এ কোন বিথী? বিথী পাগলের ন্যায় আচারণ করলো।
ইতি, নিধি, সিদ্দিকী বেগম কাঁদছে। পিকির চোখেও পানি। সুন্দর নিঝুমের দিকে তাকিয়ে ভাবছে ভালোবাসা কি এমনই হয়?
বিথী কাঁদতে কাঁদতে দির্শকের ক্ষত নেড়ে দেখছে। অস্হির কণ্ঠে বলছে,,
“কি করি… আমি কি করি?”
এ দৃশ্য দেখে সবচেয়ে বেশি স্তব্ধ নাঈম ও নাজিম তালুকদার। দাঁতে দাঁত চেপে নাঈম তালুকদার গর্জে উঠলেন,,
“এই ছেলের মধ্যে কী আছে, যে তুই এমন পাগলামি করছিস?”
বিথী অস্হির গলায় বলল,,
“কি আছে? সেটাই তো আমি জানতে চাই।”
হঠাৎ ফের সে চিৎকার করে উঠল,,
“এই ছেলেকেই লাগবে আমার! হ্যাঁ এই ছেলেকেই লাগবে, নাহলে আমি পাগল হয়ে যাবো? হ্যাঁ,আমি এ যন্ত্রণা নিতে পাচ্ছি নি।”
আরও জোরে,,
“এই দুষ্শমন লোকটাকেই লাগবে বাবা,লাগবেই!”
এই কথা শুনে দির্শকের মন এক মুহূর্তের জন্য শান্ত হলো পরক্ষণেই বুকটা তীব্র যন্ত্রণায় কেঁপে উঠল।দির্শক বিথীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো, বিথী ব্যস্ত হয়ে পড়লো দির্শকের শরীর রক্ত বন্ধ করানোর জন্য,যে হারে বিথী কাঁদছে ঠিক সেই হারেই বিথী হাত কাঁপছে,এই কেমন পরিবর্তন বিথীর, এমন আকুলতা কখনো কারো জন্য দেখা যায় নি বিথীর তবে আজ সে ক দিনের পরিচয়ের দির্শকের জন্য এমন করছে।
হঠাৎ দির্শক বিথীর কাঁপতে থাকা দুই হাত জোড়া শক্ত করে ধরে নিল। ক্ষীণ কণ্ঠে সে বলল,,,
“উজ্জ্বল নারী…”
বিথী চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। দির্শক মুচকি হেসে আবার বলল,,,
“আমার একটা কথা রাখবে?”
“কি?”বিথীর কণ্ঠ ভাঙা।
“এই মুহূর্তেই আমাকে বিয়ে করবে?”
বিথী চমকে উঠল। ভেজা ভেজা চোখে বিস্ময়ে সে দির্শকের দিকে তাকিয়ে রইল। উপস্থিত সবার মনে হলো, যেন মুহূর্তের মধ্যে সেখানে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে,অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে গেল সবাই।
নাঈম তালুকদার রাগে গর্জে উঠে তেড়ে এলেন তাদের দিকে। মুখ খুলে কঠোর কিছু বলতেই দির্শক হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। এই আচরণে নাঈম তালুকদার গভীরভাবে অপমানিত বোধ করলেন। রাগে কটমট করে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে রইলেন তিনি।
বিথী কান্নাভেজা চোখ দুটো দির্শকের চোখ থেকে সরিয়ে সবার দিকে তাকাল। সবাই অবাক হয়ে শুধু বিথীর দিকেই তাকিয়ে আছে। সে বাবার দিকে তাকাল রাগে জ্বলজ্বল করছে তার চোখ। তারপর ধীরে ধীরে তাকাল মায়ের দিকে; আলিফা বেগম আঁচলে মুখ চেপে নিঃশব্দে কেঁদেই চলেছেন।
বিথীর দৃষ্টি এবার গিয়ে পড়ল ইতির দিকে। ইতি তাকিয়েই মৃদু হাসি দিয়ে তাকে সাহস দিল। পরক্ষণে ইতি ও নিধি একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে বিথীর পাশে এসে দাঁড়াল। এরপর ইতিই এগিয়ে এসে নাঈম তালুকদারের উদ্দেশে বলল,,
“ক্ষমা করো বাবা, কিন্তু বিথীর এই কষ্ট আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। এই বিথীকে আমরা চিনতেই পারছি না। আমরা আমাদের আগের সেই চঞ্চল, জেদি, বদমেজাজি, রাগি বিথীকেই চাই।”
ইতির কথা শেষ হতেই নাঈম তালুকদারের রাগ যেন বিস্ফোরিত হলো। ঠিক তখনই আলবান ও আর্দ্র এগিয়ে এসে বিথীর পাশে দাঁড়াল। আলবান দৃঢ় কণ্ঠে নাঈম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,,
“আমরাও ওদের এই সিদ্ধান্তের পাশে আছি। দির্শকের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা আর বিশ্বাস আছে।”
এবার আলিফা বেগম আর ভয় পেলেন না। দৃঢ় পায়ে এগিয়ে এসে দির্শকের পাশে দাঁড়ালেন। তার বাহু শক্ত করে ধরে শান্ত অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন,,,
“আমি ও আছি।”
তার কথার রেশ কাটতে না কাটতেই একে একে মুহিন, পিকি, নিঝুম, সুন্দর সবাই এসে তাদের পাশে দাঁড়াল।
বিথী এবার মায়ের দিকে তাকাল। সিদ্দিকী বেগম একবার সন্তানদের দিকে তাকাচ্ছেন, আবার নাঈম তালুকদারের রাগে জ্বলতে থাকা চোখের দিকে। কয়েক ঢোঁক শুকনো শ্বাস গিলে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন। নাঈম তালুকদারকে উপেক্ষা করে এগিয়ে এসে বিথীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললেন,,
“আমার মেয়ে যেখানে সুখী হবে, আমি মা হয়ে সেখানেই থাকব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বিথী দির্শকের কাছেই ভালো থাকবে।”
নাঈম তালুকদার ঝাড়ি মেরে রাগী কণ্ঠে বললেন,,
“বেশি বুঝো তুমি? ওই ছেলের সঙ্গে ও কখনো সুখী হবে না। এ বিয়ে আমি মানব না।”
দির্শক ধীরে ধীরে নাঈম তালুকদারের দিকে এগিয়ে গেল। চোখে কোনো ভয় নেই, কণ্ঠে অবিচল দৃঢ়তা,,
“হ্যাঁ, হয়তো সুখী হবে না। তবুও চাই। আমি চাই সে আমি ব্যতীত আর কারও না হোক। আপনি মানলেও চাই, না মানলেও চাই।”
নাঈম তালুকদার তেতে উঠলেন। কিছু বলতেই যাবেন, ঠিক তখনই দির্শক নাজিম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
“বোঝান আপনার মেজ ছেলেকে।”
হঠাৎ কী হলো, তা বোঝার আগেই নাজিম তালুকদার কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন,,
“নাঈম… হোক এই বিয়ে। বাধা দিস না।”
“কিন্তু ভাই..”
নাজিম তালুকদার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।
দির্শকের ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। তখন আর্দ্র এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করল,,,
“তোর শরীর থেকে এত রক্ত কেন? আর গুলির মতো লাগছে… কী হয়েছে, বল?”
দির্শক শান্ত গলায় উত্তর দিল,,
“একটু পর সব পরিষ্কার হবে।”
ঊষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে সে ধীরে ধীরে হাতে ধরা জ্যাকেটের বুক-পকেট থেকে একটি কাগজ বের করল। তারপর বিথীর কাছে এসে চোখে চোখ রেখে দৃঢ় অথচ চাপা কণ্ঠে দির্শক বলল,,,
“এটা রেজিস্ট্রি পেপার। এখানে একটা সাইন করে দাও।”
উপস্থিত সবার মনে একসঙ্গে প্রশ্ন জাগল দির্শক এত তাড়াহুড়ো করছে কেন? কিন্তু বিথীর অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে সে প্রশ্ন মুখে তোলার সাহস কারও হলো না।
হঠাৎ করেই বিথীর শরীরটা কেঁপে উঠল। সে শুকনো গলায় এক ঢোঁক গিলল। চারপাশে তাকিয়ে দেখল,সবাই নীরব সম্মতি জানাচ্ছে। কাঁপতে থাকা হাতে কাগজ আর কলম নিয়ে সে স্বাক্ষর করে দিল। এরপর দির্শকও সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের সাইন করল।
পেপারে এক্সটা কিছু লেখা ছিল, আলবানের চোখে এক ঝলক পড়েছিল বটে, কিন্তু সে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিল না। সাক্ষী হিসেবে আলবান ও আর্দ্র দুজনেই স্বাক্ষর করল।
অনেক জোরাজুরির পর অবশেষে নাঈম তালুকদারও সই করলেন।
তবুও বিথীর শরীরের কাঁপুনি থামল না, বুকের ভেতর ধুকপুকানি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে কাঁপা হাতে রেজিস্ট্রি পেপারটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,,
“যত্ন করে রাখবে। আমি চলে যাওয়ার পর এটা খুলে পড়বে।”
বিথী শুধু মাথা নাড়ল।নাঈম তালুকদার মনে মনে হিসেব কষলেন এই রেজিস্ট্রি ম্যারেজে যেহেতু কোনো কাজি উপস্থিত ছিলেন না, তাই প্রয়োজনে খুব সহজেই এটিকে অবৈধ প্রমাণ করা যাবে। কাজি না থাকলে আদালত এমন বিয়েকে স্বীকৃতি দেবে না। এটা আদতে বিয়ে নয়, কেবল একটি চুক্তিমাত্র,এসব চুপচাপ হয়ে মনোযোগ দিয়ে ভাবলেন।
আলিফা বেগম দৃঢ় অথচ স্নিগ্ধ কণ্ঠে দির্শকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এখনই ডাক্তারের কাছে চলো, বাবা।”
দির্শক হালকা একচিলতে হাসি ছুড়ে দিল। সেই হাসিতে ছিল ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা।
“ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মতো সময় নেই,” সে বলল।
বিথী বিস্মিত চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,,,
“সময় নেই মানে কী?”
দির্শক কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে তালুকদার বাড়ির দরজার বাইরে একাধিক পায়ের দ্রুত ও কঠোর খটখট শব্দ ভেসে এল। শব্দে ঘরের ভেতরের বাতাস যেন থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সবার দৃষ্টি একসাথে সেদিকে স্থির হলো।
দরজা খুলতেই দেখা গেল সাতজন পুলিশ। প্রত্যেকের চোখে কর্তব্যের কঠোরতা, হাতে তোলা বন্দুকের নল সোজা দির্শকের দিকে তাক করা। নিঃশ্বাস ফেলারও যেন অবকাশ নেই।
একজন গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করল,
“ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।”
উপস্থিত সবার পায়ের নিচের মাটি যেন হঠাৎ সরে গেল। বিস্ময় ও আতঙ্কে তারা বাকরুদ্ধ। অসংখ্য প্রশ্ন জমে উঠল সবার মনে কেন, কীভাবে, কবে কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউই একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না।
ঘরের ভেতর নেমে এলো ভারী, নিস্তব্ধ এক শূন্যতা।
দির্শকের মুখে কোনো আলাদা প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেল না। তার মুখাবয়ব দেখে বোঝার উপায় নেই মনে ঠিক কী চলছে।
বিথী একবার দির্শকের দিকে, আবার পুলিশের দিকে তাকাচ্ছে। সে বোঝার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছে না।
কাঁপা কণ্ঠে সে বলল,,
“মা… মানে, ক… কী বলছে এসব?”
দির্শক পুলিশের দিকে তাকাল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে বিথীর শুষ্ক, ফ্যাকাশে মুখের ওপর। সে যেন বিথীর মুখের প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার ভেতরের ঝড়টা বোঝার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান বন্দুক হাতে দির্শকের দিকে এগিয়ে এসে দাঁত কটমট করে বলল
“অনেক দৌড়ঝাঁপ করিয়েছিস। চল, এবার মামার বাড়ি।”
এই বলে সে দির্শকের হাত ধরতে উদ্যত হলে, সঙ্গে সঙ্গে আলবান ইন্সপেক্টরের সামনে এসে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,,
“আগে বিষয়টা পরিষ্কার করুন।”
ইন্সপেক্টর ঠান্ডা গলায়, অথচ বিষ ঢালা শব্দে বলল,,
“সে একজন খুনি। এক মাসে পাঁচটি খুন করেছে।”
“কি…?”
উপস্থিত সবার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই প্রবল রাগে ফেটে পড়ে বিথী ইন্সপেক্টরের দিকে এগিয়ে এল,,,
“এখান থেকে চলে যান! অন্য কাউকে ভেবে এখানে এসেছেন। যান! এখানে কোনো খুনি নেই। বেরিয়ে যান এখান থেকে!”
পুলিশের চোখে রাগের ঝিলিক দেখা দিল। সে কঠোর স্বরে বলল,,,
“এনিই সেই খুনি। আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন। এমনকি নাঈম তালুকদার আর নাজিম তালুকদারকেও একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করেছে এই খুনি।”
দির্শককে ‘খুনি’ বলা মাত্রই বিথীর মাথায় যেন আগুন ধরে গেল,,
“আর একবার খুনি বললে মুখ ভেঙে দেব, বুঝেছিস? বেড়িয়ে যা বলছি?”
ইন্সপেক্টর গর্জে উঠল,,
“আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তা! আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে পারেন না। এর ফল ভালো হবে না।”
আলবান বিথীকে থামতে বললে, কষ্ট চেপে সে থেমে যায়।
বিথী আর কিছু না বলে দির্শকের কাছে এগিয়ে এসে আকুতি ভরা চোখে বলল,,
“তুমি কিছু বলছ না কেন? ওদের যেতে বলো এখান থেকে!”
উপস্থিত সবাই তখন দির্শকের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু দির্শকের দৃষ্টি আটকে আছে নাজিম তালুকদারের ওপর। নাজিম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন চোখে অপরাধবোধের ছায়া।
দির্শক ধীরে নাজিমের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুলিশের উদ্দেশে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,
“আর দৌড়াতে হবে না আপনাদের। আমি এমনিতেই আত্মসমর্পণ করতাম। শুধু এখন কিছু হিসাব মেলানোর জন্য আমাকে আর একটু সময় দিন।”
পুলিশ কিছু বলার আগেই দর্শক ধীরে ধীরে এক পা, দু’পা করে এগিয়ে এসে নাজিম তালুকদারের সামনে দাঁড়াল। কেন জানি না, নাজিম তালুকদার দির্শকের দিকে মুখ তুলে তাকানোর সাহস পাচ্ছিলেন না। তিনি চাইছিলেন না এই মুখোমুখি হওয়া। দির্শককে দেখলেই তার ভেতরটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, বুকের গভীর থেকে হু হু করে কান্না উঠে আসছিল। কীসের এত টান তা নিজেও বুঝতে পারছিলেন না।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর দির্শক উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল,,,
“বাবা…”
উপস্থিত সকলের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। নাজিম তালুকদার ধীরে চোখ তুলে দর্শকের দিকে তাকালেন।আগের তুলনায় বুকটা বেশিই ধুকপুক করে উঠলো,,
“শব্দটা কি আপনার সঙ্গে মানায়?”
এরপর দির্শক চারপাশে উপস্থিত সবার দিকে একবার তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,,,
“আমি এখন ওনাকে কয়েকটা কথা বলব। এর মাঝে কেউ কোনো কথা বলবেন না।”
দির্শক বলতে শুরু করল,,,
“আজ যদি আপনি আমার বাবা হতেন, তবে হয়তো আমি একটা সুন্দর জীবন পেতাম, জানেন তো? আপনি খারাপ মানুষ নন, একদমই নন,কারো কাছেই খারাপ নন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আপনি খারাপ কেন হলেন? কেন আপনার কারণেই আমাকে ‘জারজ’ নামের অভিশপ্ত পরিচয় বয়ে বেড়াতে হলো? কেন?কেন আমার মাকে এভাবে মরতে হলো?
আমি এসেছিলাম প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু এসে পড়লাম সবার মায়ার জালে। আমার এই অস্তিত্বে সারাক্ষণ একাকিত্বই রাজত্ব করত। অথচ এই পরিবারে এসে সে শূন্যতা ঘুচে গেল। বিথী উজ্জ্বল নারী আমাকে পথভ্রষ্ট করে দিল। আমি নিজেই এলোমেলো হয়ে গেলাম। না পারছিলাম সব ছেড়ে যেতে, না পারছিলাম প্রতিশোধ নিতে।
তিনবার আপনাকে এবং নাঈম তালুকদারকে হত্যা করার চেষ্টা করেছি আমি। তিনবারই ব্যর্থ হয়েছি।সে ছোট থেকেই মা জননীর ধুকে মৃত্যু দেখলাম, জানলাম সব,বারো বছর বয়স তখন থেকেই নিজেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলাম। আলবান ও আর্দ্রের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এক গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তাদের করতে চাইলাম মাধ্যমে, কিন্তু.
হঠাৎ করেই দির্শক আর্দ্রকে ডাকলো,,,
“আর্দ্র, এদিকে আয়।”
আর্দ্রের সঙ্গে আলবানও এগিয়ে এলো। দির্শক নাজিম তালুকদারের চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো,,
“এই আর্দ্রটা কে? সারাজীবন তো সবাইকে বলে এলেন, আবর্জনার স্তুপ থেকে আর্দ্রকে কুড়িয়ে পেয়েছেন। এবার তো বলুন আর্দ্র আসলে কে?”
দির্শকের কথাগুলো একেবারেই ভালো লাগলো না আলবানের। রাগে মুখ শক্ত করে সে বললো,,
“কথা স্পষ্ট কর, দির্শক।”
দির্শক ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি টেনে নিয়ে বললো,,
“কথা স্পষ্ট করবেন উনিই। আমি শুধু এটুকু বলবো এই লোকটা চরিত্রহীন, লোভী।”
বাবাকে এভাবে অপমান করা আলবান কোনোভাবেই সহ্য করতে পারলো না। মুহূর্তের মধ্যেই সে দির্শকের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। দির্শকের কলার চেপে ধরে দাঁত চেপে বললো,,
“মুখ সামলে কথা বল। অনেকক্ষণ ধরেই তোর বাজে কথা সহ্য করছি।”
এই পুরো দৃশ্যটা আর্দ্র গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করছিল। হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে বললো,,
“আলবান, দির্শকের কলার ছেড়ে দে।”
কিন্তু আলবান ছাড়লো না। আগুনঝরা চোখে সে দির্শকের দিকে তাকিয়ে রইলো।
দির্শক ক্ষীণ হেসে বললো,,,
“রক্ত তো তাই গায়ে লেগেছে। নো প্রবলেম।”
ঠিক তখনই আলিফা বেগম কঠোরভাবে আলবানকে ধমক দিয়ে দির্শকের কাছ থেকে সরিয়ে নিলেন।
আর্দ্র তার বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু ভারী কণ্ঠে বললো,,,
“বাবা, আমি অনেক খোঁজ চালিয়েছিলাম আমার আসল বাবা-মা কে। কিন্তু কোনো সূত্রই পাইনি।”
নাজিম তালুকদার অস্বস্তিতে জড়িয়ে গিয়ে বললেন,,
“হয়তো তোমার আসল বাবা-মা আর বেঁচে নেই। তাই খোঁজ পাওনি।”
এই কথা শুনে দির্শক হেসে উঠলো এ হাসিতে ছিল বিদ্রুপ আর তাচ্ছিল্য।
“আর কত মিথ্যে বলবেন, নাজিম তালুকদার? এত মিথ্যে বলতে গিয়ে একবারও কি বুক কাঁপে না আপনার? মৃত্যুর ভয় করেন না? আর কত?”
নাজিম তালুকদার দির্শককে শাসাতে আঙুল তুলতেই, ঠিক সেই মুহূর্তে দির্শকের কাছে এগিয়ে এলো পুলিশ।
“অনেক সময় দিয়েছি। আর না এবার চলুন।”
দির্শক অনুনয়ের সুরে বললো,,
“আর দুই মিনিট, স্যার। প্লিজ।”
তারপর সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নাঈম তালুকদারের সামনে। চোখে ছিল হিমশীতল দৃঢ়তা,,
“বিথী আমার লিগ্যাল ওয়াইফ। সুতরাং তাকে আমার থেকে আলাদা করার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। না হলে ছয় নম্বর খুনটা আপনি হবেন, আমার হাতে।
এন্ড ট্রাস্ট মি এটা আপনি আটকাতেও পারবেন না।”
কথাগুলো বলেই দির্শক এবার ঘুরে দাঁড়ালো সিদ্দিকী বেগমের সামনে। এবার তার কণ্ঠ বদলে গেল কঠোরতা গলে গিয়ে সেখানে জমা হলো অসহায়ত্ব,,,
“আমি খারাপ না, আন্টি। বিশ্বাস করুন আমি খারাপ না।
আজ যদি নাজিম তালুকদারের ছেলে হয়ে বাঁচতে পারতাম, তাহলে একজন সুন্দর দির্শক প্রধান গড়ে উঠতাম। আপনার মেয়ের সঙ্গে একটা সুখের সংসার হতো…
কিন্তু হলো না, আন্টি। হলো না।”
এক মুহূর্ত থেমে সে ভারী নিশ্বাস নিল।
“জানেন কেন হলো না?আপনার স্বামী আর নাজিম তালুকদারের জন্য।
আমি চলে যাওয়ার পর তাদের জিজ্ঞেস করবেন কী ঘটেছিল, কেন আজ আমি একজন খুনি।
আর আর্দ্র কে? আমি কে?”
সিদ্দিকী বেগম নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো উত্তর এল না শুধু জমাটবাঁধা নীরবতা।
এরপর দির্শক এগিয়ে গেল আলিফা বেগমের দিকে। হঠাৎ করেই তার এক হাত আলতো করে চুমু খেল দির্শকের ঠোঁটে। সেই হাতখানা সে নিজের মুঠোর ভেতর বন্দী করে রাখলো।
আলিফা বেগমের চোখের দিকে তাকাতেই দির্শকের চোখ ভিজে উঠলো। ধীরে ধীরে তিনি যে অশ্রু ফেলছিলেন, দির্শক নিজের আঙুলে তা মুছে দিল।
ভাঙা, ব্যথিত কণ্ঠে সে শুধু বললো,,
“মা…
মা…
ও মা…”
আলিফা বেগম আর “মা… মা…” ডাকটা উপেক্ষা করতে পারলেন না। হু হু করে কেঁদে উঠে তিনি দির্শককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
“বাবা আমার… কোথাও যাবি না তুই। কোথাও না।”
দির্শকের চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরতে লাগলো।
“আমি কেন তোমার আর বিথীর কাছে এত দুর্বল হয়ে পরি, মা?
এত কষ্ট কেন হচ্ছে?
আমায় এত যত্ন কেন করলে?
কেন এই মা হাড়া ছেলেটার জীবনে তুমি পরিপূর্ণ মা হয়ে এলে? কেন মা?”
কণ্ঠ ভেঙে গেল তার।
“এখন তো আমায় যেতেই হবে।
এখন নিয়ম করে রাতে কে খাইয়ে দেবে?
কেন এই বদঅভ্যাসটা করালে আমায়, মা?
কেন?”
আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে আলিফা বেগম বললেন,,
“একদম বাজে কথা বলবি না। কোথাও যাবি না তুই আমায় ছেড়ে।
কেউ তোকে নিয়ে যেতে পারবে না।”
তালুকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে নেমে এলো এক ভয়ংকর নিস্তব্ধতা। মা–ছেলের এই আহাজারি দেখে সবাই স্তব্ধ। সবার চোখ দিয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
যে পিকি কখনো কাঁদতে জানে না, সেই পিকির চোখ দিয়েও টপটপ করে পানি পড়ছে।সুন্দরের চোখে পানি টলমল করছে।
ইতি আর নিধি তো সেই কখন থেকেই কেঁদেই যাচ্ছে এমন পরিস্থিতির সাক্ষী তারা আগে কখনো হয়নি।আজ যেন ঘরের প্রতিটা মানুষ কাঁদছে।কঠোর মানুষ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমানও থমকে দাঁড়িয়ে চোখ ভরা জল নিয়ে দৃশ্যটা দেখছেন। হাবিলদারদের চোখেও অশ্রু চিকচিক করছে।
বিথী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে চোখে কোনো অনুভূতি নেই, সম্পূর্ণ শূন্য। ইতি আর নিধি দৌড়ে এসে তাকে আঁকড়ে ধরলো, কিন্তু বিথী গাঁ ছেঁড়া শূন্যতায় ডুবে রইলো।
দির্শক আলিফা বেগমের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,,
“আমি কতদিন ধরে বাড়ি আসিনি?”
কাঁদতে কাঁদতে তিনি উত্তর দিলেন,,
“তিন দিন, বাবা।”
“তিন দিন ধরে পানি ছাড়া আর কিছুই পেটে পড়েনি আমার।”
এই কথা শুনে আলিফা বেগম শব্দ করে কেঁদে উঠলেন, সাথে সিদ্দিকী বেগম ও কেঁদে উঠলো।
দির্শক আবার বললো,,
“কাঁদছো কেন, মা?
খিদে পেয়েছে তো… ভাত এনে খাইয়ে দাও।
এই শেষবার,এরপর আর খাবো না…
এই শেষবার।”
দির্শকের কথায় ইন্সপেক্টরের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।আলিফা বেগম আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য পাতিলে শুধু দু’মুঠো পোড়া ভাত আর সামান্য ডাল। দুপুরের রান্না করে খাওয়ার পর সব খাবার শেষ হয়ে গেছে।এমন অবস্থায় আলিফা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো,
এই মুহূর্তে নিজের গালে ইচ্ছে করে থাপ্পড় মারতেও ইচ্ছে করলো তার।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন। তারপর পোড়া ভাত, ডাল আর পানি নিয়ে ছুটে এলেন দির্শকের কাছে। চোখ নামিয়ে কাঁপা কণ্ঠে অস্তিত্বতা নিয়ে বললেন,,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৪
“পোড়া ভাত আর ডালই পেলাম শুধু, বাবা।”
দির্শক ফেঁচেল হেসে বললো,,
“সমস্যা নেই, মা।
তোমার হাতে খেলে এতেই পেট ভরে যাবে।
