তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫১
রাফিয়া জান্নাত রিফা
আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে দির্শক। চার দিনের অবিরাম ঝড় তার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রতিটি চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে আছে। বাবরি চুল এলোমেলো, শার্টের কয়েকটি বোতাম নেই, কোথাও কোথাও শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। মুখ শুকনো, বিবর্ণ চোখ দু’টি লালচে ও জ্বালাময় নিদ্রাহীনতা, ক্লান্তি আর অজস্র প্রশ্নের ভার সেখানে জমাট বেঁধে আছে।
বিচারক কক্ষের ভেতর তীব্র উত্তেজনা। দির্শকের পক্ষের আইনজীবী আলবান ও আর্দ্রের সঙ্গে বিপক্ষের উকিলের তুমুল বাকবিতণ্ডা চলছে। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, কাগজের খসখস শব্দ, টেবিলে হাতের আঘাত সব মিলিয়ে উত্তেজনায় ভরপুর। আলবান ও আর্দ্র নীরবে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এই সমস্ত কোলাহলের মাঝেও দির্শকের দৃষ্টি বিচ্ছিন্ন। তার দৃষ্টি বারবার ভিড়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে। নীল চোখ দুটি অস্থিরভাবে খুঁজে ফিরছে তার মা-কে, আর সেই উজ্জ্বল নারীকে যার উপস্থিতি তার ভাঙা সাহস জোড়া লাগাতে পারত। কিন্তু দির্শকসারিতে তাদের দেখা নেই। প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে তার চোখ আরও তীব্র, আরও উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে।
হঠাৎ সে মাথা উঁচু করে চারপাশে তাকাতে শুরু করে একবার বাম দিকে, একবার ডান দিকে। চোখের নাগালের বাইরে কোথাও তারা লুকিয়ে আছে তার সেই নির্দিষ্ট মানুষটি। কাঠগড়ার ভেতর দাঁড়িয়েই তার এই অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলবান ও আর্দ্র তা টের পায় এক ঝলক দৃষ্টি বিনিময়ে তারা বুঝে নেয়, দির্শক কাকে খুঁজছে।
ইতি, বিথী, নিধি এবং আলিফা বেগম তারা এসেছে। কিন্তু তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যত্র আটকে রাখা হয়েছে, আদালতকক্ষের ভেতর প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
আদালতকক্ষের ভেতর বিচার চলতে থাকে শব্দ।
দির্শকের আইনজীবী নাজিম তালুকদারকে কাঠগড়ায় ডাকা হলো। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন। একবার চোখ তুলে দির্শকের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। শুকিয়ে যাওয়া মুখ, ক্লান্ত চোখ, অবসন্ন দেহভঙ্গি সব মিলিয়ে ছেলেটিকে যেন চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সেই চোখের গভীরে জমে থাকা প্রশ্নের সামনে দাঁড়াবার সাহস তার হলো না। দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন তিনি।
বিপক্ষের আইনজীবী কণ্ঠ পরিষ্কার করে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“দির্শক প্রধানের মা দুর্তি বার্নির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী? আদালতের সামনে স্পষ্ট করে বলুন।”
নাজিম তালুকদারের আঙুল কেঁপে উঠল। তিনি একবার চারপাশে তাকালেন কৌতূহলী, তীক্ষ্ণ, বিচারমুখর অসংখ্য চোখ তার দিকে নিবদ্ধ।
ঠিক তখনই আদালতকক্ষের বাইরে অস্থিরতা। দেখা গেল বিথী হনহনিয়ে এগিয়ে আসছে, তার পেছনে ইতি ছুটে চলেছে। বিথী জানালার কাছে এসে থামল। সেখান থেকেই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা দির্শককে স্পষ্ট দেখা গেল। মুহূর্তের মধ্যে বিথীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে জানালার গ্রিল আঁকড়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে ডাকল,,,
“দুষ্মন স্যার!”
সেই ডাক যেন বজ্রের মতো নেমে এলো আদালতের নিস্তব্ধতার ভেতর। উপস্থিত সবাই একযোগে জানালার দিকে তাকাল। দির্শকের কানে বিথীর কণ্ঠ পৌঁছাতেই বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল। সে অজান্তেই হাত রাখল বুকে হৃদস্পন্দন যেন দ্রিমদ্রিম শব্দে কাঁপছে।
ধীরে ধীরে সে মুখ তুলে তাকাল। জানালার ওপারে বিথীর মুখে, বিথী তার চোখে দৃশ্যটা স্পষ্ট হতেই তার চোখ ভিজে উঠল। আবেগের ভার সামলাতে না পেরে সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল তার থেকে।
দির্শকের সেই চোখ ফিরিয়ে নেওয়াই যেন বিথীর হৃদয়ে আরও গভীর আঘাত করল। তার হাসি মিলিয়ে গেল। চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবু কাঁদতে কাঁদতেই সে আকুল স্বরে বলল,,
“চিন্তা করবেন না। আজ আপনার জামিন হবেই। আমাদের এখনও অনেকটা পথ একসঙ্গে চলা বাকি আছে।”
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দির্শক নিঃশব্দে সেই শব্দগুলো গ্রহণ করল। চারদিকের তর্ক, আইন, প্রশ্ন সব কিছুর ঊর্ধ্বে একটিমাত্র বাক্য তার অন্তরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল ‘আমাদের পথ এখনও শেষ হয়নি।’
দির্শক বিথীর কথা শুনেও মাথা তুলল না। তার দৃষ্টি মেঝের এক অদৃশ্য বিন্দুতে স্থির। যেন ভেতরের ঝড়কে আড়াল করতেই সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
এমন সময় আদালতকক্ষের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে দেখে ম্যাজিস্ট্রেট হালকা বিরক্ত হলেন। গ্যাভেল টেবিলে পরপর দুইবার আঘাত করে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন ,,,
“অর্ডার! অর্ডার!”
মুহূর্তেই ফিসফাস স্তব্ধ হয়ে এল। বিথীও নিজেকে সামলে নিল, জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
বিপক্ষের আইনজীবী আবার মুখ খুললেন,
“আমার প্রশ্নের উত্তর এখনো পাইনি, মিস্টার নাজিম তালুকদার।”
নাজিম তালুকদার গভীর শ্বাস নিলেন। মাথা নিচু রেখেই বললেন,,
“দুর্তি বার্নি আমার স্ত্রী।”
আদালতকক্ষে আবারও চাপা গুঞ্জন উঠল।
“অর্থাৎ আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন?”
“না তৃতীয় ।”
সবাই আবাক হলো,এতে দির্শক একবার মুখ তুলে চাইলো নাজিম তালুকদারের দিকে তার জানা ছিল না যে ইনি তৃতীয় বিয়ে করেছেন।
“সবকিছু খুলে বলুন।”
নাজিম কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,,,
“দুর্তি বার্নি ইতালির রাজধানী রোমের এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে ছিলেন। সে পরিবার ছিল ঐতিহ্যবাহী, ক্যাথলিক ধর্মাচরণে কঠোর। অফিসের কাজে আমাকে ও আমার ছোট ভাই নাঈমকে সেখানে যেতে হয়েছিল। বছরের প্রথম দিনটি তাদের বংশে অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে উদ্যাপন করা হয়। সেদিনের এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাঝেই নাঈম হঠাৎ কাঁপতে কাঁপতে আমার কাছে আসে দু হাত রক্তে ভরা।
সে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, ‘ভাই, ওদিকে একজন খুন হয়েছে।’
কেউ দেখার আগেই আমি তাকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। বাগানের নির্জন কোণে এক ব্যক্তি পড়ে আছে পেটে ছুরি গাঁথা। নাঈম বলল, আমি খুনি নি ভাই বরং ছুরিটা বের করার চেষ্টা করছিলাম, ঠিক তখনই এক নারী আমাকে এই অবস্থায় দেখে ফেলে।”
সেই সময় রোম শহরে খুনের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। সন্দেহ হলেই পুলিশ গ্রেপ্তার করত। নাঈমের বয়স তখন মাত্র আঠারো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই নারীকে খুঁজে বের করতেই হবে।
খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেলাম একটি বেঞ্চে বসে, মাথা নিচু করে। সে-ই দুর্তি বার্নি। তার সৌন্দর্য ছিল চোখধাঁধানো কিন্তু সেদিন তার মুখে ছিল ভয় আর বিপর্যস্ততা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি হয়েছে?’
দুর্তি কিছুক্ষণ দ্বিধা করে জানাল, যে লোকটি নিহত হয়েছে সে তাকেই অপহরণ করতে এসেছিল। বাড়ির কেয়ারটেকার তাকে বাধা দিলে ধস্তাধস্তি হয়, আর রাগের মাথায় কেয়ারটেকার ওই ব্যক্তিকে ছুরি মারে। ঘটনাটি সে নিজ চোখে দেখেছে।
আমি অবাক হয়েছিলাম একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষকে সে এত বড় গোপন কথা বলল কেন? পরদিনই নাঈমকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিই। এরপর প্রায়ই দুর্তির সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো। প্রেম তা ছিল কি না, আজও নিশ্চিত নই। তবে দুর্তি বলত, আমার সঙ্গে কথা বললে তার অদ্ভুত শান্তি লাগে।
এক রাতে, প্রায় বারোটার সময়, সে আমাকে তাদের বাড়ির পেছনে ডেকে পাঠায়। কাঁপা কণ্ঠে বলে,,
‘আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি গর্ভবতী। যদি পরিবার জানতে পারে, আমাকে আর আমার সন্তানকে মেরে ফেলবে।’
আমি হতবাক হয়ে যাই। তখনও কিছু সমাজে অবিবাহিত অবস্থায় গর্ভধারণকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে দেখা হতো। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,,‘সন্তান কার?’
সে উত্তর দেয়নি। শুধু অনুরোধ করেছিল, তাকে এখান থেকে সরিয়ে নিতে।
তার সেই অসহায় জোরাজুরির সামনে আমি নতি স্বীকার করি।“পরের রাতেই অন্ধকারের আড়ালে তাকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার পরিকল্পনা করি। কিন্তু বেরোবার আগেই আমাদের ধরে ফেলে সেখানকার কয়েকজন লোক। বিষয়টি মুহূর্তেই দুর্তির পরিবার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি এমনভাবে ঘুরে দাঁড়ায় যে তারা ধরে নেয় দুর্তির গর্ভের সন্তান আমারই।
আমি প্রতিবাদ করার সুযোগও পাইনি। দুর্তি নিজেও তখন সবার সামনে ঘোষণা করে বসে তার গর্ভে আমার সন্তান। কেন সে এমন বলল, আজও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। হয়তো ভয়, হয়তো নিজেকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
দুর্তির পরিবার পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেয়। সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় বিধি আর প্রভাবশালী পরিবারের চাপ সব মিলিয়ে আমাকে জোর করেই বিয়েতে সম্মত করা হয়। খ্রিস্টীয় নিয়মে একবার, আবার ইসলামি শরিয়াহ্ অনুযায়ী দুই ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। যেন কোনো সন্দেহ না থাকে, কোনো প্রশ্ন না ওঠে।
বিয়ের পরদিনই আমাদের দুজনকে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে। সম্পর্ক স্বীকার করল, কিন্তু দায়িত্ব নিল না।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি গলাটা শক্ত করলেন।
আমি ভীষণ রাগান্বিত ছিলাম। প্রতারিত, অপমানিত, বাধ্য। দুর্তির সঙ্গে একটি কথাও বলিনি সেদিন। বাংলাদেশে ফিরে তাকে রাখি আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাসস্থানে। সেখানেই সে থাকতে শুরু করে।
অনেক দিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবু এক অদ্ভুত টান, না বলা এক দায়বোধ আমাকে হঠাৎই দুর্তির কাছে টেনে নিয়ে গেল। সঙ্গে ছিল নাঈম। গোধূলির নিস্তব্ধ আলোয় পৌঁছে যা দেখলাম, তা আজও আমার দুঃস্বপ্নের প্রধান দৃশ্য দুর্তি এক কালো মুখোশধারী লোকের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছে। লোকটি মরিয়া, তার কণ্ঠে হিংস্র তাড়না; সে জোর করে দুর্তির কাছ থেকে কিছু জানতে চাইছে। দুর্তি অটল, অবিচল কিছুতেই মুখ খুলছে না।
হঠাৎ লোকটি কোমর থেকে ছুরি বের করল। ঝকঝকে ফলাটি দুর্তির পেটের কাছে থেমে রইল, যেন আর এক মুহূর্তেই তা মাংস চিরে ফেলবে। মুখোশধারী আমাদের দেখতে পায়নি। সেই সময় নাঈম কাঁপা গলায় আমার হাতে একটি বন্দুক গুঁজে দিয়ে বলল,
“ভাই, নিন… শুট করুন।”
আমার হাত কাঁপছিল। মাথা শূন্য। ট্রিগারের ওপর আঙুল স্থির হচ্ছিল না।
“ভাই, শুট করুন! না হলে উনাকে মেরে ফেলবে… উনি গর্ভবতী!”
‘গর্ভবতী’ শব্দটি আমার ভেতরের সমস্ত দ্বিধা ভেঙে চূর্ণ করে দিল। আর কিছু ভাবিনি। পরপর দুটি গুলি ছুঁড়ে দিলাম। শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। লোকটি লুটিয়ে পড়ল। আমার শরীরও কাঁপছিল, যেন প্রতিটি স্নায়ু বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই দূরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বেজে উঠল। সংকেতের তীক্ষ্ণ শব্দ অন্ধকার চিরে এগিয়ে আসছিল। মুহূর্তের মধ্যে আরও চারজন মুখোশধারী কোথা থেকে যেন বেরিয়ে এলো, পাঁচিল টপকে অদৃশ্য হয়ে গেল। যেন তারা ছিল ছায়া এসেছিল, কাজ সারেনি, তবু মিলিয়ে গেল।
এরপর যা ঘটল, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ।
আমার ভেতরে তখন জেগে উঠল এক নিষ্ঠুর স্বার্থপরতা স্ত্রী, দুই সন্তান, পরিবার… তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের নিরাপত্তা। ভয় আমাকে কাপুরুষ বানাল। আমি দুর্তির হাতে বন্দুকটি ধরিয়ে দিলাম। পুলিশ এসে পৌঁছাতেই বললাম,
“ওই মহিলা গুলি করেছে।”
দুর্তি শুধু স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে ছিল না প্রতিবাদ, না অনুনয় ছিল এক গভীর বিস্ময় আর অবিশ্বাস। পুলিশ তাকে নিয়ে গেল।
কিছুদিন পর শুনলাম, সন্তানের জন্মের পাঁচ বছর পর তার ফাঁসি কার্যকর হবে। আইন তার মাতৃত্বকে সময় দিয়েছে, কিন্তু জীবন তাকে ক্ষমা করেনি। আর আমি? সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত এক অন্তহীন অনুশোচনার ভেতর বাস করছি। বহুবার জেলে গিয়ে দেখা করতে চেয়েছি, সে দেখা করেনি। হয়তো সে চেয়েছিল, আমার মুখ আর কখনও না দেখতে।
দুর্তির সন্তান দির্শক।
তাকে নিজের কাছে টেনে নেওয়ার জন্য আমি বহুবার হাত বাড়িয়েছি ভাবছিলাম, হয়তো এভাবে আমার অপরাধের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হবে। কিন্তু পারিনি। ভাগ্যের নিষ্ঠুর বিধান, আইনের অচল কঠোরতা, কিংবা দুর্তির নীরব অভিমান কোনো কিছুই আমাকে সে সুযোগ দেয়নি।
আমি জানি, অপরাধী আমি। শাস্তির ভারও আমারই প্রাপ্য ছিল। দুর্তির ফাঁসির মঞ্চে যে দড়ি নিঃশব্দে দুলছিল, তার প্রতিটি তন্তুতে যেন আমার নাম উৎকীর্ণ ছিল। অথচ শাস্তি পেল সে, আর আমি বেঁচে রইলাম এই বেঁচে থাকাই যেন আমার দীর্ঘতম দণ্ড।
তবু এক প্রশ্ন আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে। সেদিন সেই পাঁচ মুখোশধারী কী জানতে চেয়েছিল? কারা ছিল তারা? কোন অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে তারা দুর্তিকে ঘিরে ধরেছিল? আর দুর্তি সে কোন গোপন সত্য বুকের গভীরে চেপে রেখে নীরবতার শপথ নিয়েছিল?
সেদিন একটি গুলির শব্দ আমি শুনেছিলাম কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর ছিল আরেকটি শব্দ। সেটি ছিল আমার বিবেকের পতনের শব্দ। সেই মুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম, মানুষের মৃত্যু যতটা উচ্চকণ্ঠ, বিবেকের মৃত্যু তার চেয়ে বহু গুণ নিঃশব্দ তবু তার প্রতিধ্বনি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।
কারাগারের সেই বিকেলটিতে দির্শক প্রধান যেন হঠাৎ করেই নিজের জীবনকে অপরিচিত এক আয়নায় দেখতে পেল। এতদিন তার মা তাকে বলে এসেছিলেন সে নাজিম তালুকদারের সন্তান। সেই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করেই সে বড় হয়েছে, ঘৃণা আর অপমানের আগুনে দগ্ধ হয়ে। অথচ আজ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে জানতে পারল সে নাজিম তালুকদারের রক্তধারার কেউ নয়।
এই প্রকাশ তার সমগ্র অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল।
দির্শকের শৈশবের স্মৃতিতে কারাগারের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, লোহার শিক, আর মায়ের উষ্ণ আঁচল ছাড়া আর কিছু নেই। পাঁচটি দীর্ঘ বছর সে মায়ের সঙ্গেই বন্দি ছিল। মায়ের কোলই ছিল তার পৃথিবী, মায়ের কণ্ঠই ছিল তার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। ফাঁসির আগের রাতেও মা তাকে অদ্ভুত কোমলতায় আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই আদরের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অনিবার্য বিদায়ের আভাস, যা শিশুমন বুঝতে পারেনি।
পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে দির্শক দেখল মা নেই। চারদিকে অস্বাভাবিক নীরবতা। কিছুক্ষণ পর পুলিশদের ঠান্ডা কণ্ঠে সে শুনল, তার মায়ের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। মুহূর্তেই তার ছোট্ট পৃথিবী ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সেই দিন সে অঝোরে কেঁদেছিল অপরাধ, বিচার, ন্যায় এসবের কোনো অর্থ তখন তার কাছে ছিল না ছিল শুধু মাকে হারানোর শূন্যতা।
সেদিনই তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। বিদায়ের আগে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় মায়ের রেখে যাওয়া একটি ডায়েরি শেষ স্মৃতি, শেষ স্বীকারোক্তি, শেষ উত্তরাধিকার।
মা বহুবার অতীতের কথা বলতেন। দির্শকের ছোট্ট মন বিশ্বাস করেছিল নাজিম তালুকদারের কারণেই তার মা বন্দি, অপমানিত, অবশেষে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। সেই বিশ্বাস থেকেই তার অন্তরে জন্ম নেয় এক গাঢ় ঘৃণা। তবু মায়ের মুখেই সে শুনেছে সে নাজিম তালুকদারের সন্তান। সেই পরিচয়ই ছিল তার অস্তিত্বের একমাত্র ভিত্তি।
কিন্তু আজ যখন জানা গেল সে সেই ব্যক্তির রক্ত নয়, তখন প্রশ্নটি বজ্রপাতের মতো নেমে এলো তবে তার প্রকৃত পিতা কে?
ডায়েরির পাতায় পাতায় লেখা ছিল প্রতারণা, ষড়যন্ত্র আর পাঁচজন মানুষের নির্মম অপরাধের বিবরণ। সেখানে উন্মোচিত হয়েছে এক গভীর অন্ধকার ইতিহাস যার বলি হয়েছিলেন তার মা।
দির্শক সেই ডায়েরিকে পথনির্দেশের মতো আঁকড়ে ধরল। প্রতিটি শব্দ তার মনে প্রতিশোধের শপথ হয়ে জেগে উঠল। একে একে সে খুঁজে বের করল সেই পাঁচজন অপরাধীকে। বিচারব্যবস্থার বাইরে, নীরব ছায়ার মতো, তাদের জীবনে নেমে এলো তার প্রতিহিংসার অগ্নিঝড়। নির্মম, পরিকল্পিত এবং অবধারিত প্রত্যেককে সে এমনভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, যেন প্রতিটি আঘাতে সে মায়ের অপমানের প্রতিশোধ নিচ্ছে।
কিন্তু প্রতিশোধ কি সত্যিই তাকে মুক্তি দিল?
রাতের নির্জনতায়, যখন চারদিক স্তব্ধ, তখনও তার কানে বাজে মায়ের কণ্ঠ। প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে তার প্রকৃত পিতা কে? কেন তাকে মিথ্যা পরিচয়ে বড় করা হলো?
প্রতিশোধের আগুন নিভে গেলে যে ছাই পড়ে থাকে, তার ভেতরেই দির্শক খুঁজতে থাকে নিজের প্রকৃত পরিচয়। কারণ সে বুঝতে শুরু করেছে রক্তের পরিচয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় সত্য লুকিয়ে আছে সেই ডায়েরির অমোঘ শব্দগুলোর আড়ালে।
আদালতে সবার মধ্যে খোঁচা খুচি কথা শুরু হয়ে গেল,নানা ধরনের কথা শুরু হলো সবার তা নিয়ন্ত্রণে আনতে মেজিস্ট্রেট হ্যাডেল টেবিল দুবার মেরে,,
“ওডার,ওডার”
সবাই চুপ করে গেল। মেজিস্ট্রেট দু পক্ষের উকিলের কথা শুনে রায় ঘোষণা করলেন,,,
“উপস্থাপিত সাক্ষ্য–প্রমাণে প্রমাণিত হয় যে, আসামি নাজিম তালুকদার ইচ্ছাকৃতভাবে নিরপরাধ দুর্তি বার্নির ওপর হত্যার দায় চাপিয়ে দেন, যার ফলে একজন নির্দোষ ব্যক্তি অন্যায়ভাবে দণ্ডিত হন যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তবে গুলির ঘটনাটি একজনকে রক্ষার প্রয়াসে সংঘটিত হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান।অতএব, দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় আসামিকে তিন (৩) বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
আদেশ প্রদান করা হলো।”
নাজিম তালুকদার রায় শোনার পর অন্তরের গভীরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলেন। দীর্ঘদিন ধরে যে অপরাধবোধ তাকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে দিচ্ছিল, সেই বোঝা যেন অবশেষে লাঘব হলো। তিনি উপলব্ধি করলেন অপরাধের প্রাপ্য শাস্তিই ন্যায়ের পরিণতি। তাই বিনা দ্বিধায়, অবনত মস্তকে তিনি দণ্ড গ্রহণ করলেন মনে হলো, এ শাস্তির মধ্য দিয়েই তাঁর আত্মার মুক্তি নিহিত।
অন্যদিকে, দির্শক প্রধানের বিরুদ্ধে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় আদালতকক্ষে এক গভীর উত্তেজনা ও আতঙ্কের সঞ্চার হলো। উপস্থিত অনেকের হৃদয়ে ভয়ের তীব্র স্পন্দন ধ্বনিত হতে লাগল কারও মুখ বিবর্ণ, কারও দৃষ্টি স্থির। বিথী চোখ বন্ধ করে অবিরাম আল্লাহর নাম জপতে লাগল, যেন আসন্ন রায়ের ভার সহ্য করার শক্তি প্রার্থনা করছে।
সমস্ত সাক্ষ্য–প্রমাণ ও সত্যের নিরিখে, আদালতের গাম্ভীর্যপূর্ণ নীরবতার মধ্যে মেজিস্ট্রেট দির্শক প্রধানের রায় ঘোষণা ,,,
“উপস্থাপিত সাক্ষ্য–প্রমাণ ও আসামির স্বীকারোক্তি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, আসামি দির্শক প্রধান পাঁচটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন। নিহত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ন্যস্ত ছিল; কিন্তু আসামি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করেন। এহেন কার্যকলাপ আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
অতএব, দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আসামি দির্শক প্রধানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।
আদেশ ঘোষণা করা হলো।
মুহূর্তের মধ্যে আদালত প্রাঙ্গণে হুলস্থুল পড়ে গেল। রায় ঘোষণার অভিঘাতে বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। বিথী চোখ খুলতেই তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো; শরীর ঢলে পড়ল, ইতি তড়িঘড়ি তাকে ধরে ফেলল। নিধি এগিয়ে এসে সহায়তা করল। আলিফা বেগমকে সামলে নিলেন সিদ্দিকী বেগম চারদিকে তখন কান্নার রোল।
দির্শকের মুখে তখনও অনুশোচনার ছাপ স্পষ্ট ছিল না কিন্তু জানালার ধারে নেতিয়ে পড়া বিথীর দিকে তার স্থির দৃষ্টি থেমে রইল। সেই প্রথম তার অন্তরে অদ্ভুত এক বেদনাবোধ জাগল এই মেয়েটির জন্য। চোখের কোণে জমল পানি। এত ভালোবাসা সে কবে পেল? এই মেয়েটি তাকে ছাড়া কীভাবে বাঁচবে? নিজেকে কীভাবে সামলাবে? প্রশ্নগুলো তার বুকের ভেতর ঝড় তুলল, কিন্তু কোনো উত্তর মিলল না।
হঠাৎ বিথী যেন উন্মনা হয়ে আদালতকক্ষে ঢুকে পড়ল। কাঁপা কণ্ঠে, অশ্রুসিক্ত চোখে মেজিস্ট্রেটের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করল,,
“এটা কি করলেন আপনি? এই রায় ফিরিয়ে নিন। ওনার সঙ্গে আমার এখন ও অনেক পথ চলা বাকি। আমি ওনার সঙ্গে সংসার সাজাবো স্বপ্নে যেমন সাজিয়ে ছিলাম। আপনি সব শেষ করে দিতে পারেন না।”
তারপর করুণ স্বরে বলল,,
“আমি ওনার জন্য খাবার এনেছি… ভালো ভালো তরকারি দিয়ে। ওনার বিরহে আমি নিজেই খেতে পারছি না।”
“আমি চারদিন থেকে বিছানায় ঘুমাই না, পান্তা ভাত ছাড়া কিছুই খাই না,আমার ও খিদে পেয়েছে,ওনার ও খিদে পেয়েছে,আমি ওনাকে খাইয়ে দিতে চাই।”
মেজিস্ট্রেট নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হলে বিথী ছুটে গিয়ে তাঁর পা জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,,,
“তাহলে আমাকেও ফাঁসি দিন। ওনাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। দয়া করুন।”
উপস্থিত সকলের হৃদয় কেঁপে উঠল। আলবান ও আর্দ্রের চোখ থেকেও অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগল। দির্শকের চোখেও নীরব অশ্রুধারা। তবু মেজিস্ট্রেট কঠোর কণ্ঠে বললেন,,
“এটি আইনের বিধান। পা ছাড়ুন।”
“রায় না পাল্টালে আমিও আপনার পা ছাড়ব না,” বিথীর দৃঢ় জবাব।
রুষ্ট স্বরে মেজিস্ট্রেট বললেন,
“এটা পাগলামি করার স্থান নয়।”
হঠাৎ বিথী তার কুচি থেকে একটি ছুরি বের করে মেজিস্ট্রেটের গলায় ধরল। মুহূর্তেই উত্তেজনা চরমে উঠল। পুলিশ এগিয়ে এলো। বিথী চিৎকার করে বলল,,
“রায় বদলান, নইলে আপনাকে হত্যা করব!”
একজন পুলিশ কর্মকর্তার কণ্ঠে সহানুভূতির সুর শোনা গেল,,
“স্যার, উনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।”
মেজিস্ট্রেটের কঠোরতা কিছুটা শিথিল হলো। দু’জন মহিলা পুলিশ বিথীকে টেনে সরিয়ে নিতে লাগল। সে ছটফট করতে লাগল। ঠিক তখনই দির্শক সামনে এসে দাঁড়াল। বিথী আর নিজেকে সামলাতে না পেরে তাকে জড়িয়ে ধরল,,,
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে… আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমি মরে যাব তো।”
এমন কথা দির্শকের আর নিজের সামলাতে পারল না চোখ ভিজে উঠল। তার ও ইচ্ছে হলো বিথীকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে, কিন্তু হাতদুটো তখন হ্যান্ডকাফে বাঁধা। সে পুলিশকে করুণ কণ্ঠে বলল,
“একটু খুলে দেবেন?”
পুলিশ মেজিস্ট্রেটের দিকে তাকাল। তিনি নীরবে সম্মতি জানালেন। হাত মুক্ত হতেই দির্শক স্নেহভরে বিথীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল এবং ভারী কণ্ঠে বলতে লাগল,
“তাকদিরে কিছু অধ্যায় অমিমাংসিত থেকে যায়। ঠিক তেমনি, আমার সাদা-কালো জীবনে তুমি অমিমাংসিত অধ্যায় হলে।
তবে হ্যাঁ,
তোমাকে পেতে আগুনের উপর দিয়েও হাঁটতে রাজি আমি। ভাঙা কাঁচে পা ছিন্নভিন্ন করে হলেও তোমাকে জিতে নিতে রাজি। সেখানে থাকবে না কোনো অন্ধকার জগতের হাতছানি। তৈরি হবে তোমার-আমার প্রেমের নতুন অধ্যায়। তখন আমাদের ভালোবাসা দেখে জোৎস্না ও তারাগুলো ঝলমলিয়ে উঠবে।
জানো, আল্লাহ তাআলা ভেঙে যাওয়ার জিনিসের ব্যবহার খুব যত্নে গড়েন! তার জন্য শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয়।
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫০
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় বলতেন,
“আল্লাহুম্মা সুখনা হুসনাল খাওয়াতিম।”
এর অর্থ হলো, হে আল্লাহ, তুমি আমাদের শেষটা সুন্দর করে দেয়।”
