তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৩১+৩২
Taniya Sheikh
লিভিয়ার সব কথা নিকোলাস শুনেছিল। প্রথমদিন থেকেই এই ভদ্রমহিলাকে ওর পছন্দ হয়নি। চোখের দৃষ্টিতে যেন কপটতার জাল। নিকোলাস মানুষের মুখ দেখলে অনেক কিছু আন্দাজ করতে পারে। লিভিয়াকে দেখে ওর সুবিধার মনে হয়নি। ধীরে ধীরে এ বাড়ির সবার প্রতি ওর মনে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। এমনকি ওই ডক্টর, যে সময় পেলে ইসাবেলাকে দেখতে আসে তাকেও ও সন্দিগ্ধ চোখে দেখছে। ইসাবেলাকে অবশ্য এসব ও বলেনি, বুঝতেও দেয়নি। বিপদ আশঙ্কা করেও এ বাড়িতে থাকার মানে হয় না জেনেও আছে। ইসাবেলার পায়ের ক্ষত এখনও শুকায়নি। এই অবস্থা ওকে নিয়ে হঠাৎ করে কোথাও যেতে পারছে না। তবে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে আশপাশে।
“লিভিয়া চলে গেল। আমাদেরও এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত।”
ইসাবেলা জানালায় মুখ করে বসে আছে। নিকোলাস বিছানায় বসে ছিল চুপ করে। এবার উঠে দাঁড়ায়। ফার্স্ট এইড বক্সটা হাতে তুলে এগিয়ে যায় ইসাবেলার দিকে। ওর পায়ের কাছে অনুচ্চ টুল এনে বসল। আহত পা’টা তুলে কোলে রাখতে মৃদু কেঁপে ওঠে ইসাবেলা। নিকোলাস ভুরু কুঁচকে তাকাতে লজ্জা আড়াল করে বলল,
“জবাব দিলেন না? আমার কিন্তু সত্যি ভয় হচ্ছে এখানে থাকতে।”
“আমি থাকতে তোমার কোনো ভয় নেই, বেলা।”
ইসাবেলার ফ্রকটা হাঁটুর ওপরে তুললো। হাত রাখল উন্মুক্ত পায়ের ত্বকে। শক্ত করে ঠোঁট চেপে ধরেছে ইসাবেলা। নিকোলাস প্রতিদিন এমনই করে স্পর্শ করে। ওর কাছে এটা হয়তো সাধারণ ব্যাপার কিন্তু ইসাবেলার কাছে নয়। শিহরিত হয় নিকোলাসের হাত পায়ের নগ্ন ত্বকে পড়তে। নিকোলাস ড্রেসিং করছে একমনে। ইসাবেলা অনিমেষ চেয়ে আছে ওর দিকে। লম্বা নাক, ঘন কালো ভুরু আর ওই লাল ঠোঁট। নিকোলাসের ঘন কালো চুলের কিছুটা উড়ে এসে পড়েছে কপালের ওপর। কী অবলীলায় খেলছে ওর কপালে! বড্ড হিংসে হলো চুলগুলোর ওপর ইসাবেলার। ওর দৃষ্টি ফের গিয়ে থামে নিকোলাসের ঠোঁটের ওপর। পিশাচ হবে ভয়ংকর, কদাকার। এমন সুদর্শন কেন হলো?
“ঠিক আছো তুমি?”
“হুঁ?” চমকে ওঠে ইসাবেলা। নিকোলাস এখনও চোখ তুলে তাকায়নি।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ঠোঁট ফুলাচ্ছ কেন?”
ঠোঁটে হাত উঠে এলো ইসাবেলার। সত্যি তো ও ঠোঁট ফুলিয়ে আছে। জোরপূর্বক হেসে বলল,
“এটাকে ঠোঁট ফুলানো বলে না, পাউট বলে। এই দেখো?” ইসাবেলা পাউট করে দেখায়।
নিকোলাস একপলক দেখে মুচকি হাসে। ইসাবেলা ওর হাসি দেখে বোকার মতো হাসে। তারপর বলে,
“আপনার হাসি কিন্তু চমৎকার সুন্দর। যে কোনো মেয়ে পাগল হয়ে যাবে।”
“তুমি পাগল হয়েছ?”
“হুঁ?” অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ইসাবেলা। নিজের বলা কথাতে ও বেশ লজ্জিত হলো। কেন যে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কথাটা! নিকোলাসের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হলো। ড্রেসিং শেষে ওর পা আস্তে করে নিচে রাখল। ফ্রকটা নামিয়ে দিলো নিচে। ইসাবেলা সোজা হয়ে বসল। পায়ে যেন এখনও নিকোলাসের রুক্ষ, কঠিন হাতটার স্পর্শের রেশ রয়ে গেছে। বক্সটা হাতে নিয়ে উঠে গেল নিকোলাস।
“ব্যথা কী এখন তেমন নেই?”
“আছে তো। কেন?”
“ড্রেসিংএর সময় ব্যথা অনুভব করছ না কেন তাহলে? আজ আমি ইচ্ছে করে ক্ষতর ওপর তুলো সামান্য জোরে চেপেছিলাম। তোমার কাছ থেকে কিন্তু ব্যথা ট্যাথার প্রতিক্রিয়া পেলাম না।”
ইসাবেলা হাতটা ব্যান্ডেজের ওপর রেখে আঙুলে মৃদু চাপ দিতে চোখ মুখ শক্ত করে তোলে। ভীষণ ব্যথা! তাহলে তখন কী হয়েছিল? তখন কেন টের পায়নি কিছু?
“বেলা?”
“উম, মনে হয় কিছু ভাবছিলাম। গভীর ভাবনায় ডুবে গেলে এমনটা হয় সচরাচর।”
“আর ইউ সিওর?” নিকোলাস অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়। ইসাবেলা চট করে মুখটা জানালার দিকে ঘুরিয়ে বলে,
“হ্যাঁ, অবশ্যই।”
নিকোলাস এখনও দৃষ্টি অনড় রেখেছে ওর দিকে। গভীর ভাবনা না ছাই! ওর ব্যথা ভোলার কারণ ছিল নিকোলাস। বেশ ভালোভাবেই সেটা জানে নিকোলাস।
“বেলা?”
“হুম?”
ক্ষণিক নীরবতা নামল ঘরময়। ইসাবেলা এখনও নিকোলাসের দিকে ফেরেনি। ওর কেন যেন মনে হচ্ছে নিকোলাস সবটা ধরে ফেলেছে। একটুখানিই তো দেখেছে। ওইটুকু দেখলে কী হয়? ও তো আর নিকোলাসের মতো ঠোঁট বাড়িয়ে চুমু খেতে যায়নি!
“বিছানায় এসে শুয়ে পড়ো।”
হাঁপ ছেড়ে বাঁচে ইসাবেলা। নিকোলাস দরজার দিকে যেতে ও বলল,
“এই পা নিয়ে বিছানা পর্যন্ত কীভাবে যাব?”
ভাবলেশহীন মুখে তাকায় নিকোলাস। কঠিন গলায় বলে,
“সব ব্যাপারে এত পরনির্ভরশীল কেন তুমি, হ্যাঁ? কী ভাবো? আজীবন তোমাকে কোলে করে ঘুরে বেড়াব? এক পা আহত হয়েছে অন্য পা তো ঠিক আছে। চেষ্টা করো নিজে নিজে।”
বলেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল নিকোলাস। ইসাবেলার চোখ ছলছল করছে। খুব আঁতে লাগল নিকোলাসের কথা। অন্য পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াতে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। টলমল চোখের জল এবার গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। পায়ের ব্যথার চেয়ে নিকোলাসের কথার ব্যথা বেশি লেগেছে ওর। আহাত পা হেঁচড়ে চললো বিছানার দিকে। খুব কষ্ট হলো কিন্তু হার মানল না। কারো ওপর বোঝা হয়ে থাকার মতো কষ্ট দুটো নেই পৃথিবীতে। বিছানায় বসে পা’টা মেলে দিলো। সাদা ব্যান্ডেজের খানিকটা রক্তে ভিজে গেছে। ঠোঁট কামড়ে কান্নার শব্দ দমালো। শারীরিক মানসিকভাবে নিকোলাস বহু আঘাত দিয়েছে ওকে। কিন্তু আজকেরটা অন্য সবটার মতো ছিল না। শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল। কাঁদতে কাঁদতেই একসময় ঘুমিয়ে গেল।
লিভিয়ার এই বাড়িটির পেছনের দিকে বিশাল অরণ্য। ডান দিকে সরু লেক। বেশ ফাঁকা ফাঁকা বসতি আশেপাশে। নিকোলাসের রক্তনেশা চেপেছে। ক্রোধ বাড়ছে প্রচণ্ড বেগে। রক্ত প্রয়োজন ওর। তৃষ্ণা মেটাতে রক্ত প্রয়োজন। হাওয়ায় মিশে গিয়ে থামল একটি বাড়ির সামনের সবজি খামারে। এক যুবতী এই ভর বিকেলে সেখানে বসে আগাছা পরিষ্কার করছে। নিকোলাস আশেপাশে সতর্কে দেখল। কেউ নেই। ধোঁয়ার কুন্ডলি হয়ে যুবতীর চতুর্দিকে ঘুরতে লাগল। মেয়েটি প্রথমে খেয়াল করেনি। ভয়ংকর গোঙানির শব্দে আঁতকে ওঠে ও। দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়। সূর্যের আলোর তেজ বেশ কমে এসেছে। তারমধ্যে চারপাশ ঘুরতে থাকা ধোঁয়াটা ওর নজরে এলো। সাথে ভয়ংকর গা শিওরে ওঠা চাপা হাসি। মেয়েটি উলটো দিকে দৌড়াবে ওমনি নিকোলাস ওকে ধরে ফেলে। টেনে নিয়ে যায় জঙ্গলের মধ্যে।
“প্লিজ ছেড়ে দাও আমাকে।”
নিকোলাসের ভেতরকার পিশাচটা লোভে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকে। মেয়েটাকে একটা গাছের সাথে দাঁড় করিয়ে ওর গলা চেপে ধরে। নিকোলাসের জ্বলন্ত লাল চোখ, রক্তিম ঠোঁটের পাশ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে শ্বদন্ত। ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল মেয়েটির মুখ। আকুতি করে,
“আমি গর্ভবতী, আমায় মেরো না। দোহাই তোমার।”
নিকোলাসের চোখ যায় ওর হাত রাখা পেটের ওপর। ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল আরেকবার। কানের কাছে ঝুঁকে এসে বলল,
“তবে তো আজ আমার মহাভোজ।”
মেয়েটি কিছু বুঝার আগেই তীক্ষ্ণ শ্বদন্ত বসিয়ে দেয় ওর ঘাড়ে। চিৎকার করে নিস্তব্ধ জঙ্গল কাঁপিয়ে তোলে মেয়েটি। খানিক পরেই সব আগের মতো শান্ত হয়ে যায়। মেয়েটির ফ্যাকাশে দেহ পড়ে আছে নিচে। নিকোলাসের শরীর চাঙা হয়ে ওঠে। ঘুরে দাঁড়াতে মেয়েটির দুর্বল গলার স্বরে থেমে যায়।
“আমার সন্তান! আমার সন্তান!”
নিকোলাস ঘুরে দাঁড়ায়। মেয়েটির চোখ বোঁজা। হাতটা পেটের ওপর। এখনও সামান্য রক্ত অবশিষ্ট ওর দেহে। এতে কি বাঁচবে ওর সন্তান?
“বাঁচুক কিংবা মরুক তাতে আমার কী?”
“যদি বেলা এই ঘটনা জেনে যায়?” নেকড়ে সত্ত্বা প্রশ্ন করে। পিশাচ বলে,
“ও সব জানে। আমি কী ও ভালো করেই জানে। নতুন কিছু নয় এসব ওর কাছে? আমি এমনই। এমনই নির্মম, নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর আমি।”
“তারপরেও ও তোমাকে পছন্দ করেছে, বিশ্বাস করে এখন।”
“কী বলতে চাইছ?”
“তোমার তৃষ্ণা তো মিটেছে তবে এই মেয়েকে বাঁচালে ক্ষতি কী? হয়তো এই কারণে বেলার ভালোবাসাও পেয়ে যেতে পারো একদিন।”
“ভালোবাসা! তোমার মাথা খারাপ হয়েছে। কারো ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। আমি একে বাঁচাব না।”
নিকোলাস ধোঁয়ার কুন্ডলি হয়ে গলে যায় গাছের সারির ফাঁকে। কিছুদূর গিয়ে ফের ফিরে এলো। মেয়েটি অচেতন পড়ে আছে এখন। কোলে তুলে নিলো ওকে। মেয়েটির অচেতন মুখে চেয়ে বলে,
“তোমাকে আমি বাঁচাচ্ছি কেবল করুণা করে। আর কিছু না।”
নেকড়ে সত্ত্বা ফিক করে হেসে উঠতে রাগে গোঙানি দিয়ে ওঠে নিকোলাস।
“চুপ করো নয়তো একে এখনই ছুঁড়ে ফেলতে আমার বাধবে না।”
পিশাচদের ভরসা নেই। সুতরাং নেকড়েটা চুপ করে গেল।
ইসাবেলার পায়ের ক্ষত অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। এখন ক্রাচে ভর করে একটু আকটু চলতে পারে ও। কিন্তু নিকোলাসের কড়া বারণ খুব বেশি হাঁটা যাবে না। ইসাবেলা সে কথা প্রায়ই অমান্য করে। আগের মতো দু’পায়ে জোর লাগিয়ে হাঁটতে চায় ও। এভাবে দিনরাত নিকোলাসের ঘাড়ে বসে সেবা শুশ্রূষা নিতে ওর আর ভালো লাগছে না। নিকোলাস পাশে শায়িত এই মুহূর্তে। ইসাবেলা উঠে বসল। সাবধানে নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে ক্রাচে ভর করে দাঁড়ায়। এমন না যে ওর উঠে দাঁড়ানোর শব্দে নিকোলাসের ঘুম ভেঙে যাবে। তবুও এভাবেই উঠল। রোজ ওঠে। জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। আঙুলের ডগা দিয়ে পর্দার কোনাটা সামান্য সরিয়ে বাইরে উঁকি দিলো। রৌদ্রময় সকাল। অদূরে গমের খেতের মাঝে উইন্ডমিলটা শ্লথ গতিতে ঘুরে যাচ্ছে। মাঠ জনমানবহীন। জানালার পাশে ও প্রায়ই বসে থাকে। তাকিয়ে দেখে দূরের দিগন্ত বিস্তৃত গম খেত। প্রথম প্রথম দু এক একজন লোক দেখা গেলেও ইদানীং একেবারে কাওকে দেখে না। আশেপাশে মানুষের সাড়াশব্দও তেমন নেই।
কেবল মাঝে মাঝে গাড়ি চলার শব্দ আর ফায়ারিং শোনে। যুদ্ধ যে কবে শেষ হবে! এভাবে এখানে থাকতে ভয় যে করে না তা নয়। তবে সেই আগের মতো অতটাও নয়। তাছাড়া সাথে যখন নিকোলাস আছে ওর আর ভয় কীসের! ঘাড় ঘুরিয়ে নিকোলাসের নিদ্রিত মুখের দিকে তাকাল। সটান হয়ে শুয়ে আছে ও। বুকের ওপর হাত ভাঁজ করা। নিকোলাসের আপাদমস্তকে এক লহমায় চোখ বুলিয়ে নিলো। তারপর দৃষ্টি স্থির হলো মুখের ওপর। অনেকদিন সেভ না করাতে দাঁড়ি বেশ বড়ো হয়েছে। ইসাবেলার দাড়িওয়ালা লোক পছন্দ ছিল না। কিন্তু আজ ওর মনে হলো- দাড়িতেও আলাদা রকমের সৌন্দর্য বিরাজ করে। মৃদু মাথা ঝাঁকাল। ফের ঘুরে দাঁড়ায় জানালার বাইরে মুখ করে। সেদিনের ওমন রূঢ় ব্যবহারের পর নিকোলাসের সাথে তেমন কথা বলে না ও। হ্যাঁ, নাতেই জবাব দেয়। এর পরের দুদিন ও একাই পায়ের ক্ষতে ড্রেসিং করেছে।
সকাল সকালই কাজটা করত যেন নিকোলাসের সাথে এ নিয়ে কথা না বলতে হয়। জেগে উঠে নিকোলাস একবার তাকিয়ে ছিল ওর পায়ের নতুন ব্যান্ডেজের দিকে। তারপর ওর মুখের দিকে। ইসাবেলা ভেবেছিলাম কিছু বলবে, কিন্তু কিছুই বলেনি। চুপচাপ বেরিয়ে গিয়েছিল বাইরে। কখন ফিরত ইসাবেলা জানে না। হয়তো ভোরে কিংবা আগেই। মাঝে মাঝে নিচের তলায় পায়ের শব্দ পেত। লিভিয়া চলে যাওয়ার পর এ বাড়িতে আর নতুন কেউ আসেনি। এমনকি ওই ডাক্তারও না। প্রথমে একটু ভয়ে পেয়েছিল লিভিয়ার সেই কথাগুলো মনে করে। কিন্তু না, খারাপ কিছু এখন পর্যন্ত ঘটেনি। পরে আন্দাজ করে নিয়েছে ওটা হয়তো নিকোলাস হবে। ইসাবেলার সাথে একই ঘরে থাকতে ওর ভালো লাগছিল না বলেই আসেনি ওপরে৷ তবে ভোরে কেন আসে?
তখনও না আসলেই পারে। ওইটুকু করুণা না করলেই কি নয়? নিজেকে আজ ওর কেবলই বোঝা মনে হয়। নিকোলাসের ওপর আর বোঝা হয়ে থাকতে চাইছে না। চোখ জ্বলছে কেন যেন। এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না৷ ক্রাচে ভর করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। শব্দহীনভাবে লক খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। ছোট্ট কড়িডোরের এককোণে সিঁড়ির ধাপ। ওদের রুমের আগেও আরো একটা রুম আছে। সামনে এগোবে কি না ভাবল। পেছন ফিরে রুমের ভেতরে দেখল আরেকবার৷ নিকোলাসকে এখান থেকে ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। কী ভাবছে ইসাবেলা ফের পালাবে? মনে মনে হাসল কথাটা ভেবে ইসাবেলা। দরজাটা ভিজিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোলো। সামনের রুমটা লক। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে ওর বেজায় কষ্ট হলো। পড়ে যাওয়ার একটা ভয় ছিল। সব ভয় ডর কাটিয়ে ও নিচে নামে। কাঠের এই বাড়িটি বেশ সাদামাটা। গ্রামের সাধারণ আর সকল ঘরের মতোই ছোট্ট কিচেন, ডাইনিং এর সাথে বসার ঘর আর দুটো রুম। সদর দরজা লক করে পর্দা টেনে দেওয়া।
এইটুকু নামতে ইসাবেলার ঘাম ছুটে গেছে। ব্যাটারি চালিত ফ্যানটা চালাবে বলে সুইচ টিপল। না, ঘুরছে না ফ্যান। ডাইনিংএর চেয়ার টেনে বসল। ক্রাচটা রাখল চেয়ারের একপাশে। চুলটা খোঁপা করে হাত বাড়িয়ে সামনের বোতল টেনে আনে। পানি ভেবে ছিপি খুলে মুখের কাছে আনতে বুঝতে পারে এতে পানি না ভদকা। তৃষ্ণা মিটাতে সেটা গটগট করে গলায় ঢাললো। অর্ধেকটা শেষ করে বোতলটা পুনরায় টেবিলের ওপর রেখে দেয়। ভদকার ঝাঁঝ এখনও গলায় টের পাচ্ছে ও। ভদকাতে ও অভ্যস্ত নয়। দ্রুত নেশা চড়ে যায়। তৃষ্ণা মিটতে পেটের ছুঁচোটা ছটফট শুরু করল। টেবিলে ভদকার বোতল আর কয়েকটা গ্লাস উলটানো ছাড়া কিছু নেই। ইসাবেলা ক্রাচে ভর করে আবার উঠল। নিকোলাস রোজকার মতো আজও হয়তো খাবার রেখেছিল রুমে।
কিন্তু ইসাবেলা ওই খাবার খেতে ওপরে উঠবে না। সেই ধৈর্য, ইচ্ছে অথবা বল কোনোটাই নেই ওর মধ্যে এই মুহূর্তে। খিদে পেটে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। বসার ঘরের জানালার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে জানালা খুলতে মৃদু বাতাস এসে লাগল গায়ে। সকালের রোদ মেশানো বাতাসে প্রশান্তি না পেলেও এতক্ষণে হাসফাস ভাবটা খানিক কমে গেল। পিঠ লাগিয়ে বসল জানালার সাথের সোফাটাতে। এইটুকুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ও। অনেকক্ষণ বসে রইল থম ধরে। তারপর জানালার দিকে বেঁকে বসল। পর্দা পুরোপুরি সরিয়ে দিতে সাহস পাচ্ছে না। বন্ধ বাড়িতে ওকে কেউ দেখে ফেললে শেষে আরেক বিপদ। সোফার পেছনে বাহু রেখে মাথাটা এলালো তার ওপর। এভাবে বসে বেশ বাতাস লাগছে গায়ে। বসার ঘরটা দোতলার ওদের থাকার রুমের ঠিক নিচে। ওই যে গম খেতের সেই ঘুরতে থাকা উইন্ডমিল দেখতে পাচ্ছে এখানে বসে। আনমনে সেদিকে চেয়ে রইল। এই মুহূর্তের নিঃসঙ্গতা ওকে কত কী ভাবায়। খালি পেটে ভদকাটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছে। যত আবেগ ছিল সব ঠেলে বের করে আনছে। জীবনের গত হওয়া সবটুকু যেন ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বুক ভারী হয়ে উঠল হঠাৎ।
“ইসাবেলা”
চমকে তাকায় সামনে ইসাবেলা। আগাথা দাঁড়িয়ে বসার ঘরের মুখে।
“আগাথা!” সোজা হয়ে বসল ও। আগাথা এগিয়ে এলো। বসল ওর মুখোমুখি। ইসাবেলার টলমল চোখে চেয়ে শুধাল,
“ঠিক আছো তুমি?”
মাথা ঝাঁকাল,
“না, একদমই ঠিক নেই আমি আগাথা।” ওর চোখ থেকে টুপ করে একফোঁটা জল পড়ল। আগাথা দুবাহুতে জড়িয়ে ধরে ইসাবেলাকে। ফুঁপিয়ে কাঁদছে ও। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে চোখ মুছল ইসাবেলা। এভাবে কেঁদে ফেলা উচিত হয়নি ওর। কেন যে কাঁদল! নেশাটাই যত নষ্টের মূল।
লজ্জায় মুখ নুয়ে ফেলে। আগাথা হাঁপ ছেড়ে ওর মাথায় হাত রাখেন।
“কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“ইসাবেলা, তাকাও আমার দিকে।”
ইসাবেলা তাকাল আগাথার দিকে। আগাথা পরম মমতায় ওর গালে হাত রাখল। ওর বাদামী চোখে চেয়ে বলল,
“তোমার এই চোখ কারো কথা মনে করিয়ে দেয় আমাকে ইসাবেলা।”
“কার?”
আগাথা ম্লান হাসল। কিন্তু ওর প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
“এখান থেকে রিগা বেশিদূর নয় ইসাবেলা। তোমার পা সেরে উঠতেই নিকোলাস তোমাকে সেখানে রেখে আসবে।”
“আমিজানি।” বিড়বিড় করে বলল ইসাবেলা।
“কিছু একটা করতে হবে আমাদের। যে করেই হোক তোমাকে আবার ফিরতে হবে নিকোলাসের প্রাসাদে।”
“এ অসম্ভব এখন।”
“এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে তোমাকে ইসাবেলা। হাতে সময় কম আমাদের।”
“আমি পারব না আগাথা। আমার দ্বারা এ কাজ হবে না। আমাকে ক্ষমা করুন।”
চাহনি কঠিন হয় আগাথার।
“এত দুর্বল কেন তুমি?”
“কারণ আমি দুর্বল। দুর্বল আমি আগাথা। এই যে এক পায়ে গুলি খেয়ে বোঝা হয়ে আছি আপনার ছেলের ওপর। আমি সবার ওপর শুধু বোঝা হয়ে উঠি।”
অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল ইসাবেলা। আগাথার দৃষ্টি নরম হলো। কিছু বলবে তার পূর্বে দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম ঢং ঢং শব্দ করে জানান দেয় বারোটা বাজে। আগাথা হতাশ মুখ উঠে দাঁড়ায়।
“সুযোগ পেলে আবার আসব আমি ইসাবেলা। এর মধ্যে কিছু একটা ভেবে স্থির করে ফেলব। তারপর যা বলব তাই করবে তুমি। ভ্যালেরিয়ার কথা মনে রেখো। তোমার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে ও। ওর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা তোমার কর্তব্য। ওর আত্মার শান্তির জন্য সেই কর্তব্য নিষ্ঠার সাথে পালন করবে বলে আশা রাখি আমি। আর হ্যাঁ, ভদকা তোমার জন্য ঠিক না। আর খাবে না ওটা।”
ইসাবেলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল আগাথা। ভ্যালেরিয়ার কথা স্মরণ করেও আজ ইসাবেলার দুর্বল মন কিছুতেই শক্ত হতে পারল না। কিছুতেই ফিরে এলো না প্রতিশোধস্পৃহা। প্রতিশোধের আগুন না জ্বললে কী করে নিকোলাসকে শেষ করবে? ওকে এবং ওর পরিবারকে শেষ করেই তো ভ্যালেরিয়ার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে হবে। মনটা এমন করছে কেন আজ? কেন জোর পাচ্ছে না প্রতিশোধের? দুর্বল মনটাকে তিরস্কারে তিরস্কারে জর্জরিত করে তুললো ও।
“বেলা?” বসার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে নিকোলাস। না, ইসাবেলার কোনো জবাব নেই। এমনকি ফিরে পর্যন্ত দেখল না ওকে। সেদিনে সেই রূঢ় ব্যবহারের পর থেকে এমন করছে ও নিকোলাসের সাথে। আগের মতো কথা বলে না, কথা বলতে গেলে না পেরে হ্যাঁ, নাতেই কোনোরকমে জবাব দেয়। ইসাবেলার এই আচরণ নিকোলাসকে রাগিয়ে দেয়। কিন্তু মেজাজ যথাসাধ্য শান্ত রাখে। ভাবে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে ইসাবেলা এমন করায়। এতে ওর প্রতি জন্মানো মায়া খুব বেশি বাড়বে না। নিজেকে এবং নিজের অনুভূতিকে বশে রাখতে পারবে। তাই তো ও নিজেও দুরত্ব বাড়াচ্ছে।
“বেলা, তোমাকে আমি ডেকেছি।” রুক্ষ গলায় বলল নিকোলাস। ইসাবেলা একপ্রকার অবহেলিত গলায় বলল,
“শুনছি আমি।”
“তোমাকে রুম ছেড়ে বেরোতে নিষেধ করেছিলাম আমি। কেন নিচে নেমেছ?”
“দমবন্ধ হয়ে আসছিল আমার ওই রুমে।”
“আমার জাগা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারোনি?”
ইসাবেলা মুখ ফেরাল ওর দিকে। একটু আগের কান্নায় ওর নাক মুখ লাল হয়ে আছে। নিকোলাসের দিকে ক্ষুব্ধ চোখে চেয়ে গলা চড়িয়ে বলল,
“না, পারিনি। অনেক করুণা করেছেন আমার ওপর। আপনার করুণার চাপে দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। আর করুণা নিতে পারছি না। তাছাড়া সেদিন বলেছিলেন না, “সব ব্যাপারে এত পরনির্ভরশীল কেন তুমি, হ্যাঁ? কী ভাবো? আজীবন তোমাকে কোলে করে ঘুরে বেড়াব? এক পা আহত হয়েছে অন্য পা তো ঠিক আছে। চেষ্টা করো নিজে নিজে।” খুশি হন। সেটাই করছি আমি।”
তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ২৯+৩০
দাঁতে দাঁত কামড়ে আগের মতো মুখ ঘুরিয়ে রইল ইসাবেলা। নিজের বলা কথা এখন ইসাবেলার মুখ থেকে শুনে মোটেও ভালো লাগল না নিকোলাসের। সেদিন কথাগুলো রাগের মাথায় বলে বসেছিল। ইসাবেলার ওর সাথে সহজ হয়ে উঠছে। এক মন দারুন খুশি তাতে। কিন্তু অন্য মন বেজার। নিকোলাস টের পাচ্ছিল ইসাবেলার দৃষ্টির পরিবর্তন। ঘৃণা নেই, রাগ নেই। নিকোলাসকে ও একটু একটু করে নিরাপদ আশ্রয় ভাবতে শুরু করেছিল। হয়তো এমন চললে একদিন ভালো লাগাটাও হয়ে যেত। কোনো একদিন নিকোলাস আশা করেছিল এই পরিবর্তন। এখানে আসার পর যখন ওর মধ্যে তেমনই লক্ষণ দেখতে পেল নিকোলাস মনে মনে দারুন আনন্দিত হয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দ ছিল ক্ষণিকের। ওর পৈশাচিক মন মনে করিয়ে দিলো ইসাবেলা আর ও কোনোদিন এক হতে পারবে না। ইসাবেলার এই পরিবর্তনকে প্রশ্রয় দেওয়া মানেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। নিজেকে ধ্বংস করতে এত ত্যাগ করেনি নিকোলাস। শত শত বছরের শ্রম সে এক মেয়ের জন্য নষ্ট করবে না। এই পৃথিবীতে একছত্র অধিপত্যে গড়ে তুলতে চায় ও। ওর আর ওর স্বপ্নের মাঝে কাওকে আসতে দেবে না, কাওকে না। থাক মুখ ঘুরিয়ে ইসাবেলা। এতে ওর ভালো, নিকোলাসের নিজেরও ভালো। কিন্তু কান্নায় লাল হওয়া ইসাবেলার নাক আর মুখ দেখে ওর মনের মধ্যে কাঁটা ফুটতে লাগল। কেন কাঁদছিল জানতে বড়ো ইচ্ছে হয়। কান্নার কারণ ও কি না এই ভেবে ভেবে অশান্তি শুরু হলো মনে৷ এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইসাবেলাকে এই অবস্থায় দেখতে পারছে না। একপলক ওর দিকে তাকিয়ে ধোঁয়ার কুন্ডলি হয়ে সদর দরজার ফাঁক গলে বেরিয়ে যায় নিকোলাস।
