তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৪৩+৪৪
Taniya Sheikh
হঠাৎ থেমে গেল দমকা হাওয়া। অশান্ত প্রকৃতি এখন শান্ত। নির্মম নীরবতা ভাঙল ইসাবেলার ক্লেশিত কাতরানিতে। ওর ঘাড় ধরে টেনে তুললেন রিচার্ড। তারপর গলা চেপে ধরে কর্কশ গলায় বললেন,
“বড্ড সাহস দেখিয়েছো মেয়ে। কী ভেবেছিলে আমরা টের পাব না ইভারলিকে তুমি শেষ করেছ?”
ইসাবেলার মুখটা আরো ভীত হয়ে ওঠে। প্রাণপণে চেষ্টা করে রিচার্ডের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে। রিচার্ড ওর গলা আরো জোরে চেপে ধরেন। দম বন্ধ হয়ে আসে ইসাবেলার।
“আমার ছেলেকে পইপই করে বলেছিলাম, মেরে ফেল এই মেয়েকে। শোনেনি আমার কথা। তোর মতো তুচ্ছ মেয়ের জন্য ও আমার কথা অমান্য করেছে।”
“ভালোবাসে আমাকে ও। নিকোলাস ভালোবাসে আমাকে।”
সাহস করে মিথ্যে কথা বলল ইসাবেলা। কথাগুলো কিন্তু পুরোপুরি মিথ্যা নয়। ওর প্রতি নিকোলাসের ফিলিংস আছে। নিজে মুখে স্বীকার করতে শুনেছে ইসাবেলা। আজ সেই কথাগুলোকে আশ্রয় করে বিপদমুক্ত হতে চাইল। ভেবেছিল ছেলে ভালোবাসে জানার পর রিচার্ড ওর ক্ষতি করতে দু বার ভাববে। কিন্তু হলো উলটো। প্রচন্ড রেগে গেলেন রিচার্ড। পেছনে গ্যাব্রিয়েল্লার হাসি থেমে যায়। ফোস ফোস করছে ও। রিচার্ড গলায় আরো জোরে চাপ দিতেই মুখ নীলচে হয়ে উঠল ইসাবেলার। চোখের সামনে অন্ধকার দেখে। রিচার্ডের হাত হঠাৎ ঢিলে হয়। ছেড়ে দেয় ইসাবেলাকে। মেঝেতে উবু হয়ে পড়ল।
খুক খুক করে কাশছে। স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে শ্বাস-প্রশ্বাস। রিচার্ড ওর দিকে ঝুঁকে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“নিকোলাস তোমাকে ভালোবাসে?”
মাথায় নাড়ায় ইসাবেলা। হো হো করে হেসে ওঠেন রিচার্ড। ওর হাসি দেখে গ্যাব্রিয়েল্লাও হাসে। রিচার্ড হাসতে হাসতে বলে,
“আমার জীবনে শোনা বেষ্ট জোকস।”
“বোকার স্বর্গে বাস করছিস। কোথায় নিকোলাস আর কোথায় তুই। তোর মতো মেয়েকে বড়োজোর একরাত বিছানায় রাখবে, কিন্তু ভালোবাসবে? হা হা হা, ভেরি ফানি।”
গ্যাব্রিয়েল্লার বিদ্রুপ দাঁতে দাঁত কামড়ে সহ্য করে ইসাবেলা। রিচার্ডের দিকে চেয়ে বলে,
“আমার কথা বিশ্বাস না হলে নিকোলাসকে ডাকুন। ও নিজেই স্বীকার করবে আমাকে ও ভালোবাসে।”
কথাগুলো বলে মনে মনে পস্তালো। এখন যদি সত্যি নিকোলাস আসে তখন কী হবে? কিন্তু এটাই ও চাচ্ছে। ওর বিশ্বাস নিকোলাস এলে অন্তত প্রাণে বেঁচে যাবে।
“বোকা তুমি। নিকোলাস কাওকে ভালোবাসে না, বাসতে পারে না। ওর মধ্যে সেই ফাংশনই নেই।” রিচার্ড বললেন। ইসাবেলা জোর গলায় বলে,
“এটা আপনার ভুল ধারণা। হতে পারে জীবন্মৃত কিন্তু ওর হৃদয় আছে। প্রতিটি হৃদয়ই কারো না কারো জন্য স্পন্দিত হয়। কাওকে না কাওকে ভালোবাসে। নিকোলাস হৃদয়হীন নয়।”
“নিকোলাস হৃদয়হীন। এই যে তোমার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি এটাই তার প্রমাণ। তোমাকে মারতে ও আমাদের পাঠিয়েছে। ইভারলির হত্যার প্রতিশোধ নিতে পাঠিয়েছে আমাদের নিকোলাস।”
ইসাবেলা উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“মিথ্যা কথা। আপনি মিথ্যা বলছেন।”
“সত্যি বলছে রিচার্ড। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করবি তুই। বিশ্বাস করিয়েই ছাড়ব। নিকোলাস তোকে ভালোবাসে এই ভ্রম তোর মরণকালে কাটবে।”
গ্যাব্রিয়েল্লার ঠোঁটে ক্রূর হাসি। সাদা চকচকে শ্বদন্ত বেরিয়ে এলো। রিচার্ড সদম্ভে বসল বসার ঘরের সিঙ্গেল সোফাটাতে। মাথা নাড়িয়ে ইশারা করতে গ্যাব্রিয়েল্লা ইসাবেলার কাঁধে সমস্ত চাপ দিয়ে বলে,
“হাঁটু মুড়ে বস।”
ব্যথায় ককিয়ে উঠলেও সে কথা মানে না ইসাবেলা। গ্যাব্রিয়েল্লা রাগে হিসহিসিয়ে ওঠে।
“বস হারামজাদি, বস।”
“না।” শির উন্নত করে জবাব দেয় ইসাবেলা। রিচার্ডের চোয়াল শক্ত হয়। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণা বেঁকে যায় কপট হাসিতে।
“তোমার নামটা যেন কী মেয়ে?”
ইসাবেলা জবাব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না। গ্যাব্রিয়েল্লা ওর উন্নত শির সজোরে চেপে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে, কিন্তু হাঁটু মুড়ে বসাতে পারেনি। এত জোর ইসাবেলা হঠাৎ কোথা থেকে পেল কে জানে!রিচার্ড দুচোখ বন্ধ করেন। ইসাবেলা লক্ষ্য করে সেই সময় তাঁর বা’হাতের তর্জনী চক্রাকারে ঘুরছে। সেকেন্ড খানিকের মধ্যে রক্তিম চোখজোড়া মেলে তাকালেন ওর দিকে। একটু ভাবুক হলেন। তারপর বললেন,
“ইসাবেলা, ইসাবেলা, চমৎকার নাম তোমার। তবে নামের মতো তোমার ভাগ্য চমৎকার না। এই অল্প বয়সে দুনিয়ার মায়া ছাড়তে হবে। আমার বড্ড খারাপ লাগছে তোমার জন্য। একটু করুণা করতে ইচ্ছে করছে। বাঁচতে চাও ইসাবেলা?”
“আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।”
“বাঁচতে চাও ইসাবেলা?” আবারো একই প্রশ্ন করলেন রিচার্ড। সম্মোহনী তাঁর গলার স্বর। মরতে কে চায় এই ভুবনে? শত কষ্টেও মানুষ বাঁচতে চায়। এই রঙিন দুনিয়ার মোহমায়া কাটানো বড়ো শক্ত।
“হ্যাঁ, আমি বাঁচতে চাই। ছেড়ে দিন আমাকে।” জড়ানো গলায় জবাব দেয় ইসাবেলা। রিচার্ড বললেন,
“আমার সামনে হাঁটু মুড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাও। বলো, ‘আমার প্রাণ ভিক্ষা দিন প্রভু।’ নত করো তোমার মাথা।”
ইসাবেলা রাজি হয় না। রিচার্ড হাসলেন।
“গ্যাবি, যা তোর শিকার ধরে আন। ওই রাঁধুনিকেও সাথে নিয়ে আসবি। প্রথমে ওদের রক্ত পান করব তারপর এই মেয়ের। আগামীকাল তিনটে লাশ দেখবে এই গাঁয়ের লোক।”
গ্যাব্রিয়েল্লা মুচকি হেসে ইসাবেলাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে অদৃশ্য হয়ে যায়। ইসাবেলার হাঁটুর চামড়া ছিঁড়ে রক্ত পড়ছে। রিচার্ড বুভুক্ষু চোখে চেয়ে রইল ওর পায়ের দিকে। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“এখনো সময় আছে আমার কথা শোনো ইসাবেলা। আমি তোমাকে নতুন জীবন দেবো। যে জীবনে ভয় নেই, মৃত্যু নেই। যে জীবনে তুমি পাবে অসীম ক্ষমতা। মেনে নাও আমার দাসত্ব।”
“না না, ওই অভিশপ্ত জীবন আমি চাই না। আপনার মতো পিশাচের দাসত্ব করার চেয়ে মরণ ভালো।”
“কিন্তু আমি যে তোমাকে সেই মরণ আর দেবো না ইসাবেলা। তোমাকে আমি আমার অন্ধকার জগতে চাই। আমার দাসী হওয়ার সৌভাগ্যকে অবজ্ঞা করো না বোকা মেয়ে।”
ঘৃণায় নাক কুঁচকে ফেলে ইসাবেলা।
“আমি এক ঈশ্বরের দাসত্ব ছাড়া আর কারো দাসত্ব করি না করব না।”
ব্যথা গিলে উঠে দাঁড়াল। রিচার্ড কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। গ্যাব্রিয়েল্লার দৃশ্যমান ক্ষুব্ধ চেহারা দেখে থেমে গেলেন।
“কী হয়েছে?”
“এই হারামজাদি ওদের গলায় রসুনের মালা পরিয়ে দিয়েছে। ওদের ধারের কাছে যেতে পারছি না। আজ আমি একে শেষ করে ফেলব।” গ্যাব্রিয়েল্লা হাওয়ার বেগে ছুটে আসতে ইসাবেলা দৌড়ে সিঁড়িতে ওঠে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না। ওর পা টেনে ধরে গ্যাব্রিয়েল্লা। হুমড়ি খেয়ে সিঁড়ির ওপর পড়ে ইসাবেলা।
“ছেড়ে দাও আমাকে।”
“ছেড়ে দেবো? ইভারলির পাশে আমাকে পেলে ছেড়ে দিতি? ভাগ্যিস রিচার্ডের কক্ষে ছিলাম। নয়তো ইভারলির মতো আজ আমাকেও মেরে ফেলতি। আবার আমার শিকারকে বাঁচিয়ে দেওয়া প্লান করেছিস, হুম? দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছ উলটে খেতে পারিস না৷ এমন ন্যাকা সেজে নিকোলাসের মন ভুলানোর চেষ্টা করেছিলি? মনে রাখ, নিকোলাস আমার। আমি ওর সহচরী। তুই কেবল একটা মানুষ যাকে ও খাবার হিসেবে চায়, সঙ্গী হিসেবে না।”
ইসাবেলার পা ধরে শূন্যে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। কিচেনের পাশের দেওয়ালে আছড়ে পড়ে চিৎকার করে উঠল ইসাবেলা। গ্যাব্রিয়েল্লা চূড়ান্ত আক্রমণ করতে যাবে তখনই রিচার্ড বলে ওঠেন,
“ওকে একেবারে মারবি না গ্যাবি।”
রিচার্ডের জ্বলন্ত চোখে চেয়ে হাঁপ ছেড়ে অসন্তোষের সাথে বলে,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। এক ইভারলি যেতে না যেতে আরেকটার আগমন। আবার সবকিছুতে ভাগ বাটোয়ারা করতে হবে। এই মেয়ের সঙ্গে ভাগাভাগি ঘৃণা করি আমি। ঘৃণা করি একে।”
ইসাবেলা উপুড় হয়ে পড়ে আছে দেয়ালের পাশে। গ্যাব্রিয়েল্লা ভাবল জ্ঞান হারিয়েছে। রাগত মুখে ঝুঁকে ওর চুল টেনে ধরে মুখোমুখি আনে। কপাল ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। লোভে জিহবা লকলক করছে গ্যাব্রিয়েল্লার। ইসাবেলার রক্তাক্ত কপাল জিহবা দিয়ে চাটতে শুরু করে। ঠিক সেই সুযোগে ইসাবেলা চোখ মেলে তাকায়। হাতে লুকানো কাঠের টুকরোটা বসিয়ে দেয় ওর হৃদপিণ্ড বরাবর। আর্তনাদ করে ওঠে গ্যাব্রিয়েল্লা। দূরে ছিটকে যায়। ইসাবেলা কালক্ষেপণ করে না৷ রসুনের মালাটা পরে নেয়। ব্যাগের পাশে পড়ে থাকা রসুন আর ছুড়ি হাতে দৌড়ে যায় গ্যাব্রিয়েল্লা দিকে। গ্যাব্রিয়েল্লা সিঁড়ির ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলার পূর্বে ব্যাগটা তুলে নিয়েছিল বুকের সাথে। গ্যাব্রিয়েল্লাকে ছাড়বে না ও। যন্ত্রণা ছটফট করছে গ্যাব্রিয়েল্লা। ইসবেলার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে৷ রক্তে মুখ ভিজে গেছে। মাথা ঝাঁকিয়ে টলতে টলতে এসে থামে গ্যাব্রিয়েল্লার পেছনে। ওর চুলের মুঠি চেপে হাঁটু ওপর বসায়। তারপর গলা পেঁচিয়ে ধরে বা’বাহু দ্বারা। ওর এই রূপ দেখে রিচার্ড লাফিয়ে ওঠেন সোফা থেকে। চিৎকার করে বলেন,
“খবরদার ইসাবেলা, ভালোই ভালোই বলছি ছেড়ে দাও ওকে।”
ইসাবেলা যেন কিছুই শুনতে পায়নি৷ অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফটরত গ্যাব্রিয়েল্লার ঠোঁটের মধ্যে পুরে দেয় রসুনটা। ছুড়ি চালিয়ে দেয় ওর গলায়। রিচার্ড বার বার নিষেধ করছে৷ ইসাবেলার গলার রসুনের মালা তাঁকে কাছে আসতে বাধা দেয়। এই অসহায়ত্বে গর্জন করতে লাগলেন। ইসাবেলার কোনো দিকে যেন হুঁশ নেই। যতদূত আশ্রয় নিয়েছে বুঝি ওর মধ্যে। চোখ দু’টো স্থির, মুখ কঠিন। গ্যাব্রিয়েল্লার শিরশ্ছেদ করে চুল ধরে শিরটা তুলে রিচার্ডের দিকে চেয়ে বলে,
“আমি বাঁচতে চাই, কিন্তু ভিক্ষার জীবন নিয়ে নত হয়ে না। আমি বাঁচতে চাই শির উন্নত করে।”
রিচার্ডের কুপিত মুখে দৃষ্টি অনড় রেখে অপ্রকৃতস্থের মতো মুচকি হেসে গ্যাব্রিয়েল্লার ছিন্ন মাথাটা ছেড়ে দেয়। দপ করে ওটা মেঝেতে পড়ে। হাঁটু মুড়ে বসে আছে গ্যাব্রিয়েল্লার মাথা বিহীন শরীর। রিচার্ডের দিকে চেয়ে গ্যাব্রিয়েল্লার দেহের সামনে এসে দাঁড়ায়। পা দিয়ে আঘাত করে ফেলে দেয় মাথা বিহীন গ্যাব্রিয়েল্লার দেহ। অপমানে দুচোখ বন্ধ করে রিচার্ড। চোখ মেলতে দেখে ইসাবেলার হাতে দিয়াশলাই। ওটাতে আগুন জ্বালাতেই সদর দরজায় উপস্থিত হয় উদ্বিগ্ন চেহারার নিকোলাস। ইসাবেলাকে জীবিত দেখে উদ্বিগ্নতা খানিক কাটলেও মেঝেতে পড়ে থাকা ছিন্ন দেহ ওকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। পাশে দাঁড়ানো রিচার্ড চেঁচিয়ে ওঠেন,
“দেখো নিকোলাস, দেখো তোমার দয়ায় বেঁচে যাওয়া এই মেয়ে কী করেছে। নিষেধ করেছিলাম ওকে বাঁচিয়ে রাখতে। শোনোনি তুমি। তোমার ভুলে ইভারলি আর গ্যাব্রিয়েল্লাকে হারাতে হলো আজ। একদিন আমাদের সবাইকে ও এভাবে শেষ করবে। প্রমাণ করে দিয়েছে ও সিস্টার ভ্যালেরিয়ার ভাগ্নি। এখনো সময় আছে মেরে ফেলো এই মেয়েকে, মেরে ফেলো।”
পিতার কথা শুনে ক্রোধে জ্বলতে লাগল নিকোলাসের দৃষ্টি। ইসাবেলা সেই দৃষ্টিতে চেয়ে কেঁপে উঠল কিন্তু একচুল পিছু হটল না। নিকোলাসকে আজ ও শিক্ষা দেবে। বুঝিয়ে দেবে ও আর দুর্বল নেই। ভয় পায় না ওকে। বুঝিয়ে দেবে ওর কারণে ইসাবেলা বদলে গেছে। ওর কারণে আজকে ওকে এমন নিষ্ঠুর হতে হলো। চোখ পুড়ছে, কিন্তু কাঁদবে না ইসাবেলা। দিয়াশলাইয়ের আগুন গ্যাব্রিয়েল্লার দেহে ধরিয়ে দিতে যাবে অমনি বাধা দেয় নিকোলাস,
“বেলা, না।”
ইসাবেলা উপেক্ষা করে সেই কথা, যেমন করে নিকোলাস ওকে উপেক্ষা করেছে এতদিন। দুজনের মাঝে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুনের শিখা। আগুনের শিখার স্ফুরণে স্থির দুইজোড়া অগ্নিকল্প চোখ।
একজন যুবক যে ছিল ভীরু, দুর্বল। ব্যথা ভুলতে যে কাপুরুষের মতো মানুষ থেকে পিশাচ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পবিত্র আত্মা পাপের আগুনে পুড়ে ছাইয়ে পরিণত হয়। যে ছাই কেবল অন্ধকারকে অনুভব করেছে। মানবীয় সকল অনুভূতি হারিয়েছিল সেই আঁধারে। যার দৃষ্টিতে আলো আছে সে পৃথিবীটা রঙিন দেখে। যুবকের দৃষ্টিতে আলো নেই, পৃথিবীটা ওর কাছে একরঙা, কালো। ওর হৃদয় পাপের ভারে হলো পাথর। সেই পাথর কারো কান্নায় গলেনি, দুঃখে কাঁদেনি। যে স্বার্থপর পৃথিবী যুবককে পিশাচে পরিণত হতে বাধ্য করেছে, সেই পৃথিবীর আলো মুছে দিতে বেপরোয়া হয়ে উঠল যুবক। জীবন্মৃত নয়, নিজেকে মৃত ভেবেছে সবসময়। মৃতের হারানোর ভয় থাকে না। যুবকেরও আর কোনো ভয় ছিল না। সে নিজেই হয়ে উঠেছিল ভয়ের আরেক নাম। আশ্চর্য! বহুকাল পরে আবার ভয় অনুভব করছে।
ইসাবেলা অ্যালেক্সিভ। এই মেয়েকে প্রথম দেখে নিকোলাসের পাথর হৃদয় জানান দিয়েছিল এখনো খানিক স্পন্দন তাতে অবশিষ্ট। চোখে ঘোর লেগে যায়, হৃদয়ে লাগে দোল। বহুকাল পরে সে এক নতুন অনুভূতির সম্মুখীন হয়। যাকে দুর্বলতা ভেবে বার বার দুরদুর করেছে। বার বারই নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছে ওর মনের দুয়ারে। তিক্ত বিরক্ত হয়ে ইসাবেলাকে চিরতরে দূর করতে চায়। রওয়ানা হয় রিগার উদ্দেশ্যে। এই যাত্রা পথে দুজনে কিছুটা কাছে এলো। নিকোলাস বহুকালের স্বভাব ছেড়ে এক মানবীর প্রতি প্রকাশ করল ভালোলাগা। ভালোলাগার মানবীর কিছু হয়ে যায় এই শঙ্কায় শঙ্কিত থাকে। আগলে রাখতে শুরু করে। এদিকে ভেতরে ভেতরে চলে মহাযুদ্ধ। হৃদয়ের সাথে স্বভাবের, মনের সাথে মস্তিষ্কের। এই যুদ্ধে হৃদয়কে তুচ্ছ হতে হয় ম্যাক্সের সাথে ইসাবেলার সম্পর্ক জেনে। আবার নিষ্ঠুরতা দেখায় নিকোলাস। বিপদের মুখে আহত অবস্থায় ফেলে চলে যায়।
এই চলে যাওয়া কেবল শরীরের। হৃদয়টা ততদিনে ইসাবেলাকে ধারণ করে নিয়েছে। কত কী করেছে হৃদয় থেকে ওকে ঝেড়ে ফেলতে, কিন্তু পারেনি। ফিরে এসেছে আবার ইসাবেলার দুয়ারে। দূর থেকে মাতভেই আর ইসাবেলার সান্নিধ্য দেখে জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে। মনে মনে আশ্চর্য হয়ে ভেবেছে, মৃতের কি ব্যথাবোধ থাকে? যে বাতাসে ইসাবেলার গন্ধ পাওয়া যায় সেই বাতাস ছেড়ে গিয়েছিল নিকোলাস। ও ইসাবেলার জন্য ঠিক নয়, ইসাবেলাও ওর জন্য বেঠিক। এবার শুধু নিজের ভালো চিন্তা করল না, ইসাবেলার ভালো ভাবল। নিকোলাস জার্মানি বসে খবর পেল ইভারলির পরিণতির কথা। এর পেছনে কে দায়ী রিচার্ড খোলাখুলিভাবে জানায়নি।
বলেছিল স্থানীয় কেউ একজনের কাজ। নিকোলাস মারতে আদেশ করে দেয়। ভাবেওনি যাকে মারতে আদেশ দিয়েছে সে আর কেউ না ওরই প্রিয়তমা ইসাবেলা। যখন পল সত্যিটা জানায় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ লিথুনিয়া এসে ইসাবেলার এই ভয়ংকর নির্মম রূপ ওকে স্তব্ধ করে দেয়। ক্রোধের আগুনে প্রজ্জ্বলিত চোখজোড়া নিকোলাসের হৃদয়ে যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। ছুটে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে চায়, কিন্তু এবার দুরত্বের দেওয়াল তুলে দিয়েছে স্বয়ং ইসাবেলা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিচার্ড ইসাবেলাকে মারবে বলে প্রতিজ্ঞা করে। শুধু সে নয়, সমস্ত পিশাচ কমিউনিটির টার্গেট এখন ইসাবেলা। ওকে না মেরে এরা শান্ত হবে না। ভয়, নিকোলাসের ভয় আবার ফিরে এসেছে।
“কাউন্ট, কমিউনিটির নিয়ম অনুযায়ী ওই মেয়েকে আমাদের এখনই শেষ করতে হবে। এ কাজে আপনার অনুমতি চাচ্ছি আমরা।”
কমিউনিটির সদস্যের কথাতে নিকোলাস নিরুত্তর। রিচার্ড খেঁকিয়ে ওঠেন,
“অনুমতি দিচ্ছো না কেন তুমি? কেন ওই মেয়েকে মারতে বিলম্ব করছ নিকোলাস।”
“আপনি ভুলে যাচ্ছেন ছেলে নয় রাজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। বড্ড বেশি ভুল করছেন ইদানীং।” দাঁতে দাঁত পিষে বলল নিকোলাস। রিচার্ড ছেলের অগ্নিদৃষ্টি দেখে গলা সামান্য নামালেও ঝাঁজ বজায় রেখে বললেন,
“বাহ! বেশ বলেছেন কাউন্ট। আমি ভুল করছি, হুম? এখানে ভুল যদি কেউ করে থাকে তবে সেটা আপনি কাউন্ট। আপনার ভুলে ইভারলি, গ্যাব্রিয়েল্লাকে হারাতে হয়েছে আমাদের। আপনার ভুলে কমিউনিটির দুজন সদস্যের ওমন পরিণতি হয়েছে। ওই মেয়েকে মায়া দেখিয়ে আমাদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনি বাঁচিয়েছিলেন। মনে আছে তো কাউন্ট? এখানের সবার কিন্তু মনে আছে। জিজ্ঞেস করুন।”
নিকোলাস তাকাতে পিশাচ সদস্যেরা দৃষ্টি মেঝেতে সরিয়ে নেয়। পিতার বক্র জবাবে ক্রোধিত হলেও সেটা চেপে গেল নিকোলাস। রিচার্ড ক্রূর হাসল মনে মনে। আবার বলল,
“আজ দুজনকে মেরেছে কাল আরো দুজনকে মারবে ওই মেয়ে। সিস্টার ভ্যালেরিয়ার বংশধর বলে কথা। আমি আগেই সাবধান করেছিলাম। দেখুন এখন কী হলো। পিশাচদের জন্য থ্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে ও। অথচ, এখনো আপনি চুপ করে আছেন। ওই মেয়েকে মারতে আপনার এত ঔদাসিন্যে কেন কাউন্ট?”
“ঔদাসিন্য না ছাই। মরা গাছে বসন্তের হাওয়া লেগেছে।”
সোফিয়ার কটাক্ষে উপস্থিত সকলে ভুরু কুঁচকে তাকাল। নিকোলাসের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
“মা!” আন্দ্রেই সতর্ক করল মাকে। নোভা রেগে তাকায়। সোফিয়া নিষ্পাপ ভাব ধরে বসে রইল চুপচাপ। রিচার্ড স্ত্রীর দিকে চেয়ে মুচকি হাসলেন। হাসি স্থির রেখে নিকোলাসকে লক্ষ্য করে বললেন,
“ওহ! তবে এই কারণ? আমাদের কাউন্ট প্রেমে পড়েছেন?”
“রিচার্ড!”
নিকোলাসের চোখে রিচার্ড এবার সম্মান হারালো। বাবা ডাকের সম্মানটুকু ছিল লোক দেখানো। এখন সেটার বালাইও রাখল না নিকোলাস। ওর গর্জনে কেঁপে উঠল কক্ষটি৷ রিচার্ড ঢোক গিললো। কর্কশ গলায় নিকোলাস বলল,
“আপনি যথার্থই বলেছেন ভুল করেছি আমি। হ্যাঁ, করেছি ভুল। আপনাকে সম্মান দেখিয়ে এবং আপনার রক্ষিতাকে আপনার পাশে বসার অনুমতি দিয়ে ভুল করেছি। আজ তার দারুন মাশুল গুনছি। বড়ো বেশি স্পর্ধা দেখালেন আপনারা, বড়ো বেশি। এরপরে ক্ষমা নয় শাস্তি পাবেন আপনি এবং আপনার রক্ষিতা।”
“নিকোলাস! ভুলে যাচ্ছো ও আমার স্ত্রী এবং তোমার মা।”
“আর আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমি রাজা, এটা আমার রাজত্ব। এখানে যদি কারো শাসন, হুকুম চলে তবে সেটা একা আমার। আপনি আপনার স্থান ভুলে গেছেন। আমাকে জ্ঞান দেওয়ার বেয়াদবি করছেন একবার নয় বার বার। আপনার সো কলড রক্ষিতা আমার মা নয়। এরপর তাকে আমার মা বলার দুঃসাহস দেখালে চরম শাস্তি পাবেন আপনি। এই রাজ্য আমার। আমার মতের ওপর কথা বলার স্পর্ধা কারো নেই। অথচ, আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সেই নিয়ম বার বার ভঙ্গ করেছেন। আমি কাকে মারব না মারব তার কৈফিয়ত কাওকে দেবো না, কাওকে না। কারো স্পর্ধা থাকলে চেয়ে দেখুক কৈফিয়ত!”
নিকোলাস উপস্থিত সদস্যদের দিকে চ্যালেঞ্জ করে বলল। রিচার্ড ইশারা করতে নতুন এক পিশাচ যুবক দাঁড়িয়ে যায়।
“আমি চাই। ওই হারামজাদির প্রেমে পড়ে আপনি পুরো কমিউনিটির সবাইকে বিপদে ফেলবেন আর আমরা চুপ করে থাকব? এ হবে না। আমরা ওকে শেষ করে ফেলব আজই। শুধু ওর রক্ত খাব না, ওর দেহকেও ছিড়বে ফেলব। যেন মানুষ ওর লাশ দেখার পর আমাদের বিপক্ষে যাওয়ার সাহস আর কোনোদিন না দেখায়। এই পিশাচ রাজা মানুষ হওয়ার ভং ধরেছে। এর গোলামি আর নয় ভাইয়েরা। চলুন আজই এর বিদ্রোহ করি। ওই সিংহাসনের উপযুক্ত ও নয়। আমার সাথে আসুন। এই কাপুরুষ রাজার দাসত্ব আর নয়।”
যুবক তলোয়ার কোষমুক্ত করে। তলোয়ারের সূঁচালো অংশে রসুন ঘষা। ওর কথাতে আরো দুজন নিকোলাসের বিরুদ্ধাচারণ করল। নিকোলাস শ্লেষাত্মক হাসল। তারপর গর্জে উঠল,
“পল!”
দরজার বাইরে থেকে ছুটে এলো পল। হাতে কোল্ট এম ওয়ান নাইন হান্ড্রেড পিস্তল।
“পায়ে গুলি কর এদের।”
আদেশ করতে যে দেরি পলের হাতের পিস্তলের ট্রিগার চাপতে দেরি হয় না। পিস্তলের গুলিগুলো হলি ওয়াটারে ভেজানো৷ পিশাচ তিনজনের পা পুড়ে কালো ধোঁয়া উঠছে। চিৎকার করে হাঁটুর ওপর বসে পড়ল ওরা। নিকোলাস বিদ্রোহী প্রথম যুবকের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওর হিংস্র দৃষ্টি যুবককে ভীত করে। রিচার্ডের দিকে ফিরে তাকায় সাহায্যের জন্য। নিকোলাস ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে। রিচার্ড ভয়ে পিছিয়ে যায়। নিকোলাসের ঠোঁটে ফুটে ওঠে বক্রহাসি।
“আমার গোলামি করবি না? সিংহাসনচ্যুত করবি আমাকে তোরা? এত সাহস?”
“প্রভু ক্ষমা করুন।”
অপর দুজন ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগল। নিকোলাস গর্জে উঠল,
“গোলামি করবি না? বেশ, মুক্ত করব আজ তোদের এই গোলামি থেকে। যা নরকে।”
তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৪১+৪২
হাওয়ায় অদৃশ্য হয়ে প্রথম প্রতিবাদি যুবকের পেছনে এসে দাঁড়ায়। মুহূর্তে ওর ধড় থেকে মাথা আলাদা করে। বাকি দুজনেরও একই অবস্থা। পল এসে ওদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলো।
নিকোলাস সিংহাসনে গিয়ে বসে। বলল,
“আর কে আছে কৈফিয়ত চায়? আর কে আছে আমার গোলামি থেকে মুক্তি চায়? কে আছে বেলাকে মারতে চায়? বেলা আমার শিকার। ওর সাথে আমি কী করব সেটা আমার ব্যাপার। আমার আদেশ অমান্য করে ওর দিকে কেউ হাত বাড়ালে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। কে আছে আমার বিরুদ্ধে যাবে? কে?”
উপস্থিত সকলে মাথা নত করে। এমনকি রিচার্ড আর সোফিয়াও বাধ্য হয়।
