Home তিমিরে ফোঁটা গোলাপ তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৬৭+৬৮

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৬৭+৬৮

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৬৭+৬৮
Taniya Sheikh

জার্মান সৈন্যরা রিগার পার্শ্ববর্তী শহর দখলে নিয়েছে। যে কোনো সময় রিগা আক্রমণ করবে ওরা। অনেকেই বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। ওলেগ আলেক্সিভ সপরিবারে এই শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে এক মুহূর্তও আর নিরাপদ নয়। কিন্তু সমস্যা হলো এতগুলো মানুষ নিয়ে যাবেন কোথায়? বরাবরের মতো এবারও তাঁকে চিন্তামুক্ত করলেন আন্না মেরিও। মস্কোতে তাঁর বাবার পৈতৃক ভিটা। সেখানেই সপরিবারে উঠবেন বলে জানালেন আন্না মেরিও। তাঁর বাবা এখনও বেঁচে আছেন। ভাইয়েরাও কম ভালোবাসে না! কতদিন সেখানে যাওয়া হয় না। সবাইকে দেখলে খুশিই হবে তাঁরা৷ সুতরাং সিদ্ধান্ত নেন আগামী পরশু সকালেই মস্কোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবে সকলে। খবরটা বাড়ির সব সদস্যের কানে পৌঁছেছে। নিজেদের বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়ে থাকতে যেতে কারই বা আনন্দ হয়? তবুও জীবন বাঁচাতে কত কী করতে হয় মানুষকে! বাড়ির সবাই যখন গোছগাছ করতে ব্যস্ত তখন ইসাবেলা সবার অলক্ষ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। পুকুরের পাশ ঘেঁষে ঝোপঝাড় পেরিয়ে ইটের রাস্তায় উঠল। কিছুদূর হাঁটলেই পুরোনো গির্জা। গির্জার পেছনে কবরস্থান।

নিকোলাস বলেছে এক সপ্তাহ পর আবার আসবে রাশিয়া। এসে যদি ইসাবেলাকে এখানে না পায় কী হবে তখন? ওকে ছাড়া এক মুহূর্তও ভালো লাগছে না ইসাবেলার। নিকোলাস যেন সাথে করে ওর মন, আত্মা সব নিয়ে গেছে। এই এখানে আছে ওর বিরহ কাতর দেহটা কেবল। তাতে আনন্দ নেই, সুখ নেই। সব যেন বিষাদ, শূন্য। এত আপনজন থাকার পরও হৃদয়টাতে কেবলই বৈরাগীর দোতরা বাজে। নিকোলাস ছাড়া সত্যিই ও শূন্য। ভালোবাসার মানুষটি ছাড়া এই এক সপ্তাহ শতাব্দীসম দীর্ঘ। আরও দীর্ঘ হোক ইসাবেলা চায় না। নিকোলাস তো না ই। তাই তো এখানে আসা ইসাবেলার।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

দুপুর এখনও হয়নি। সকালের রোদের তেজে শীতটা একেবারে জবুথবু হয়ে পড়েছে। এতক্ষণ দ্রুত পায়ে হেঁটে আসায় ঘেমে উঠেছে ইসাবেলা। গায়ের সোয়েটার খুলে ফেললে আরাম পাওয়া যেত, কিন্তু সেই সময় যে নেই। কেউ এখানে ওকে দেখলে সমস্যা হতে পারে। স্থানীয়দের ধারণামতে এই কবরস্থানটিতে অশুভ কিছু রয়েছে। রাত তো দূরের কথা দিনের বেলাতেও এদিকে আসা-যাওয়া করে না কেউ৷ একপ্রকার নিষিদ্ধ স্থানটিতে নিরুপায় হয়ে এসেছে ইসাবেলা। সাবধানে গির্জার পলেস্তারা খসা দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। সামনে কবরস্থান। তার মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ক্রুশচিহ্ন। সতেরো বছরের আগের ইসাবেলা হলে এই নিস্তব্ধ, গুমোট এবং মৃতের রাজ্যে আসতে ভয়ে জ্ঞানই হারাত। আজ যে ভয় করছে না তা নয়। বেশ ভয় করছে। কফিনের ভেতরে সবাই তো আর নিকোলাস নয়। ইসাবেলা গলার ক্রুশটা ধরে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে করতে বা’দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে এটা ও পরে নিয়েছিল। কবরস্থানের চারিপাশে বড়ো বড়ো নানান গাছের সারি। চারটে কবর পেরিয়ে থামল ও। সামনের সমাধিস্তম্ভে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা,
“পিয়েতর গুসেভ
একজন ভাই, একজন পিতা।
(১৮২০-১৮৭৬)
The great art of life is sensation, to feel that we exist, even in pain.– Lord Byron

সমাধিস্তম্ভে লেখা কথাগুলো মনে মনে কয়েকবার আওড়ালো ইসাবেলা। ভ্লাদিমির কাছে একটু আকটু ইংরেজি শেখা। ইদানীং অবসরে ইংরেজি সাহিত্য পড়ছে। আগের তুলনায় ভাষাটা সহজ এখন। লেখাগুলো বেশ ভাবালো ওকে। কোনো এক কারণে এই পিয়েতর লোকটা সম্পর্কে জানার কৌতূহল বাড়িয়ে দিলো। এবার দেখা হলে নিকোলাসকে লোকটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। ইসাবেলা ফ্রকের বুকের কাপড়ের ভেতর থেকে চিঠিটা বের করল। নিকোলাস জার্মানি ফিরে যাওয়ার আগে বলেছিল, বিশেষ প্রয়োজন হলে এই কবরের ডালার ফাঁকে চিঠি রেখে যেতে। সময় মতো নিকোলাস পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। ইসাবেলা ডালার ফাঁকে গুঁজে রাখল চিঠিটা। চোখটা আবার স্তম্ভশীলার নামটার ওপর পড়ল। হঠাৎ একটা প্রশ্ন মাথায় উদয় হলো। পিয়েতর গুসেভও কি পিশাচ?

এই শহরেও পিশাচ আছে? গির্জার সামনের দিক থেকে মানুষের গলা শুনে চমকে ওঠে ইসাবেলা। প্রশ্নটা যেভাবে উদয় হয়েছিল সেভাবেই কোথাও মিলিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ও সেখান থেকে সরে এলো। আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখল মানুষগুলোকে। এরাও বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাচ্ছে। গির্জার সামনে দিয়ে চলে যাওয়া ইটের রাস্তা ধরে এগোচ্ছে ওরা। দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে ইসাবেলা বেরিয়ে এলো। তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরল ও। সরাসরি বাড়িতে ঢুকলো না। মা ওকে এমন এলোমেলো পোশাক ও ঘর্মাক্ত শরীরে দেখলে হাজারটা প্রশ্ন করবেন। ইসাবেলা মায়ের প্রশ্ন এড়াতে পেছনের দরজা খুলে ঢুকলো। যাওয়ার আগে ভেতর থেকে দরজাটা খুলে রেখে গিয়েছিল। চুপিচুপি জানালা ডিঙিয়ে হলঘর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢোকে। ঘামে ভেজা কাপড় পালটে গোসল খানায় গিয়ে গোসল করে নিলো আগে। শরীরে তোয়ালে জড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে রুমে ঢুকতে মাকে দেখতে পেল। গভীর ভাবনায় বুঁদ হয়ে বিছানার ওপর বসে আছেন। সারাক্ষণ রাশভারি মুখ করে থাকলেও মমতার সূক্ষ্ম ছায়া রয়েছে তাতে। মায়ের ব্যক্তিত্ব ভীষণভাবে আকর্ষণ করে ইসাবেলাকে। এই বয়সে এসেও তিনি যেমন স্মার্ট তেমনই সুন্দরী। বাবা ওলেগ প্রায়ই হেসে বলেন,”তোর মাকে প্রথম দেখেই নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। জীবনে বিয়ে যদি করি তবে একেই করব। তোর মা দয়া করে আমায় বিয়ে না করলে আমি নিশ্চিত সন্ন্যাসী হতাম।”

ইসাবেলার জানে বাবা মজা করে বললেও এ কথার সত্যতা শতভাগ। মাকে ওর বাবা খুব ভালোবাসেন। শুধু রূপের কারণে নয়। আন্না মেরিও আপাদমস্তক গুণবতী রমণী। লোকে বলে রূপবতীদের বুদ্ধি আধুলি সমান। মাকে দেখে ইসাবেলা জেনেছে লোকের সব কথা সত্য হয় না। বুদ্ধি বিচক্ষণতার জোরে এ বাড়ির সর্বেসর্বা আজ ওর মা। এমনকি ওর দাদু-দিদাও বড়ো পুত্রবধূর মতামতকে ধ্রুব বলে মানে। ইসাবেলা নিজেকে যেন মায়ের ঠিক বিপরীত ভাবে। কতবার এই নিয়ে ছোটোবেলা আক্ষেপ করেছে। মা ওকে বুঝিয়েছে , প্রতিটি মানুষের নিজস্ব সত্তা থাকে। আমাদের উচিত নিজের সেই সত্তাটাকে ভালোবাসা। নিজের চোখে যে নগন্য পরের চোখে অনন্য হবে কী করে সে? আরও কতভাবে বুঝিয়েছিল। কিন্তু মায়ের মতো হতে না পারার আক্ষেপ ওর কিছুতেই যায়নি।

“মা?”
“হুঁ?” চকিতে তাকালেন মেয়ের দিকে আন্না মেরিও। যেন ভিন্ন এক জগত থেকে এইমাত্র এখানে এলেন।
“এত কী ভাবছিলে বলো তো?”
“মায়েদের কত ভাবনা থাকে! সে যাক। যেটা বলতে এসেছিলাম।” বলেই দম নিলেন। উঠে দাঁড়ালেন। সদ্য স্নান সেরে আসা মেয়েকে দেখে হতাশ গলায় বললেন,
“আহ! তুই দেখছি গোসল করে নিয়েছিস। ভেবেছিলাম তোকে একটু বেসমেন্টে যেতে বলব।”
“এখন বেসমেন্টে? কোনো বিশেষ দরকার আছে কি সেখানে?”
“তেমনই। কিন্তু তোর তো আর যাওয়া হচ্ছে না। আমাকেই যেতে হবে তাহলে।”
“আমি যাব। কী আনতে হবে বলো।”

তোয়ালের নিচে অন্তর্বাস পরে আলমারি থেকে পুরোনো একটা ফ্রক পরে নিলো ইসাবেলা। আন্না মেরিও একটা ফর্দ সামনে ধরে বললেন,
“এই জিনিসগুলো বেসমেন্টের স্টোরেজ থেকে নিয়ে আসবি। আর একটা নীল দাগের ছোট্ট বাক্স আছে সেটাও নিয়ে আসবি।”
ইসাবেলা ফর্দটা হাতে নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে আমি যাচ্ছি।”

মা এবং মেয়ে হলঘরে এসে থামল। আন্না মেরিও আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন কী কী আনতে হবে। তারপর চলে গেলেন নিজের রুমের দিকে। অনেক কাজ পড়ে আছে তাঁর। রাতের ভেতর সব গুছিয়ে নিতে হবে। ইসাবেলা বেসমেন্টে চলে এলো। হাতে ল্যাম্প। স্টোরেজের ঢুকে ল্যাম্প এককোণের উঁচু স্থানে রাখল। প্রথমে ফর্দে লেখা জিনিসগুলো একটা কাঠের বাক্সে ভরলো। কাজটা শেষ হলে মায়ের বলা নীল বাক্সের সন্ধানে নামে। ওটা খুঁজতে গিয়ে সেখানে রাখা একটা বাক্সের ওপর চোখ পড়ল ওর। ধুলোর আস্তরণেও বাক্সের ওপরের নামটা পুরোপুরি ঢেকে যায়নি। ফুঁ দিয়ে হাতের সাহায্যে ধুলো ঝাড়তে নামটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সিস্টার ভ্যালেরিয়া। এই নামটা ইসাবেলাকে বিষণ্ণ করতে যথেষ্ট। বাক্সটা তালাবদ্ধ। বাক্সটা খুলবে না খুলবে না করেও তালা ভাঙবে বলে মনস্থির করে বসে। ভারি পাথুরে একটি বস্তু দিয়ে সহজে তালাটা খুলে ফেললো। যা ভেবেছিল তাই। এতে ভ্যালেরিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র রয়েছে। সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে চোখ ভরে এলো ইসাবেলার। একটু পর পুনরায় গুছিয়ে রাখতে গিয়ে হঠাৎ চোখ গেল কালো রঙের একটা ফ্রকের দিকে। ভ্যালেরিয়া এসব পোশাক পরা অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছিল। এখানে কেন তাহলে? ইসাবেলা কালো ফ্রকটাতে হাত বুলিয়ে দেখছিল। হঠাৎ কিছু একটা বাধল হাতে। ভালো করে দেখতে বুঝতে পারল শক্ত গোলাকৃতির কিছু হবে। ফ্রকের কাপড়ে এমনভাবে বাঁধা যে খুঁজে পেতে গিয়ে সময় লাগল। নিচের কুচির ভাঁজের সাথে কৌশলে সেলাই করে আঁটকানো বাক্সটা। এত কৌশল করে বাক্সটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে কেন? ইসাবেলা কৌতূহল দমাতে না পেরে বাক্সটা বের করে ছাড়ল। কাপড়টা তাতে ছিঁড়ে গেল। বেজায় খারাপ লাগল ইসাবেলার। ভ্যালেরিয়ার শেষ স্মৃতি নষ্ট হোক চায়নি। মন খারাপ করে চেয়ে রইল লাল মখমল কাপড়ে মোড়ানো বাক্সটার দিকে।

“এই ঘোড়ার ডিমের বাক্সের জন্য আমার ভ্যালেরির জামাটা ছিঁড়ে গেল।” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল ইসাবেলা। যে বাক্সটার জন্য ওর প্রিয় ভ্যালেরির জামা ছিঁড়ল তার রহস্য জেনেই ছাড়বে। চারপাশের লেছ খুলে সাবধানে ওটার মুখ খুললো। এক টুকরো কাগজ ছাড়া ওতে কিছু নেই। এইটুকু কাগজে কী এমন আছে যার জন্য এত রাজকীয় ব্যবস্থা! কাগজটার ভাঁজ খুলে দেখল সেটা একটা ম্যাপ। কিছু সাংকেতিক চিহ্নও রয়েছে তাতে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না ইসাবেলা। কাগজটা আবারো উলটে পালটে দেখল না। না, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
“বেলা, এখনও কাজ শেষ হয়নি তোর?” আন্না মেরিও ওপর থেকে জিজ্ঞেস করলেন।

“এই তো হলো মা।”
মায়ের ডাকে ঘাবরে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে ভ্যালেরিয়ার ব্যবহৃত জিনিসের বাক্সটা বন্ধ করল। তারপর আবার সেই নীল দাগের বাক্স খুঁজছে। তখনই খেয়াল হলো এখনও সেই কাগজটা ওর হাতে। কাগজটা আগের বাক্সে রাখবে বলে এগোয়। তাড়াতাড়িতে পায়ের সাথে কিছু বাধা লেগে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তেও পড়ল না। কিন্তু ওর হাতের ধাক্কায় কাপড়ে ঢাকা বড়ো আয়নাটা ভেঙ্গে পড়ে ফ্লোরে।
“বেলা, কী ভাঙলি?” আন্না মেরিওর গলা উদ্বিগ্ন শোনায়। ইসাবেলা কপাল চাপড়ে নিজেকে মনে মনে বকে। মাকে উদ্দেশ্য করে মিথ্যা বলল,
“তেমন কিছু না মা। এই একটা পুরোনো গ্লাস।”

আন্না মেরিও গলা নামিয়ে কী যেন বললেন। বেসমেন্টের সিঁড়িতে তাঁর হিলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইসাবেলা এখন কী করবে? সব গুছিয়ে রাখতে গিয়ে ওর চোখ স্থির পায়ের কাছের কাঁচের টুকরোর ওপর। কাগজটা উলটে আছে টুকরোটার ওপরে। সরাতে গিয়ে থমকে যায়। পরিচিত একটা নাম যেন দেখল! কাগজটা আবার উলটে পালটে দেখে৷ না, মনের ভুল। সারাক্ষণ ওকে নিয়ে ভাবছে বলেই হয়তো এমন ভুল হয়েছে। কিন্তু মন মানল না। ভাঙা আয়নার টুকরোটার দিকে ফের তাকাল। হাতের কাগজের টুকরো নিলো ভাঙা আয়নার সামনে। মনের ভুল না। এই তো নামটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। ওই যে সাংকেতিক চিহ্ন ওগুলোর মাঝে এই নামটা লুকিয়ে ছিল। আয়নার প্রতিবিম্বে দেখা যাচ্ছে সেটা। নিকোলাসের সাথে এই কাগজের সম্পর্ক কী?

“বেলা।”
স্টোরেজের দরজা ঠেলে আন্না মেরিও ভেতরে ঢুকতে দ্রুত কাগজটা বুকের কাপড়ের নিচে লুকিয়ে ফেললো ইসাবেলা। ওর মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কাগজটা ভালো করে দেখতে হবে আরেকবার। যে করেই হোক এর ভেতরের রহস্য উদঘাটন করতে হবে ওকে। জানতে হবে নিকোলাসের নামটি কেন লেখা।
“বেলা, কী হয়েছে?” মেয়ের চিন্তিত মুখ দেখে প্রশ্ন করলেন আন্না মেরিও। জোরপূর্বক হাসল ইসাবেলা। ঢোক গিলে বলল,
“আয়না ভেঙে গেছে মা।”
মহল কাঁপানো শব্দ করে রুমের দরজা খুলে যেতে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে নোভা। গভীর মনোযোগ দিয়ে জার্নাল লিখছিল। হাতে কলমটা এখনও রয়ে গেছে। মুখের চমকটা মুছে একরাশ ক্ষুব্ধতা প্রকাশ পেল। রাগে ফুঁসে উঠে বলল,
“এত দুঃসাহস তোমার! আমার কক্ষে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো? এবং এমন অশিষ্টের মতো?”

পল অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলল,
“মাফ করবেন রাজকু_”
“তোমার জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলব ফের ওভাবে সম্বোধন করেছ যদি। বেরিয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে, বেরিয়ে যাও বলছি।”
পল একচুল নড়ল না দেখে নোভা ওর কলার চেপে ধরে। লম্বায় ও পলের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি ছোটো। ঝুঁকতে হয় পলকে। নোভার এই আচরণে বিস্মিত না হয়ে পারে না। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। ওর হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক হয়। মনে হয় এখনই হৃদপিণ্ড ফেটে যাবে। নোভার দৃষ্টির তাপে ভেতরটা শুকিয়ে আসে। চোখ নামাতে গেলে কলার ধরে রাখা মুষ্টির চাপ দৃঢ় হয়। আড়ষ্ট হয়ে আসা জিহ্বা বহু কষ্টে নড়ে।
“এ কী করছেন? ছাড়ুন আমাকে।”

পল বাঁচতে চায়। নোভা ছাড়লেই ও বাঁচবে। নয়তো লক্ষণ ভালো নয় বেশি। হঠাৎই নোভার রাগ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ সম্মোহনী হাসি৷ এই হাসির অর্থ পল বোঝে। চট করে চোখ বুজে ফেললো। কী চাইছে এই মেয়ে? পলকে এভাবে নাজেহাল না করলে কী চলছে না ওর? ওই’ই বা সেই সুযোগ দেয় কেন নোভাকে? পল নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তারপর ছাড়িয়ে নিতে চায় নোভার মুষ্টি থেকে শার্টের কলার। নোভা ছাড়ছেই না। পল আরও জোর দিতে নোভা ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দেয়। তারপর বিড়বিড় করে কিছু যেন বলে। পল নিজেকে সামলাতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে খেয়াল করে না।

“বেরিয়ে যাও। শীঘ্রই আমার সামনে আসবে না। যদি আসো তো তোমায় আমি শাস্তি দেবো। এমন শাস্তি যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। যাও।” আবার ওর গলা কর্কশ হয়ে উঠল। মুখটা কঠিন। পল মনে মনে ওর বলা কথায় বার বার ভাবে। শাস্তি দেবে! কেন পলকে ওর এত অপছন্দ? ওর কারণে পল বহুদিন কোনো নারীসঙ্গ উপভোগ করেনি। ওর কারণে পল কোনো মেয়েকে বিছানায় কামনা করতে পারে না। আর কী বাকি আছে যা করলে পলকে নোভার পছন্দ হবে? কী সেটা? কী? ভেতরে ভেতরে চাপা ক্ষোভে ফুঁসতে লাগল। পরক্ষণেই অবাক হলো নিজের প্রশ্নে। কবে থেকে নিজেকে নোভার পছন্দ অপছন্দের ছাঁচে ফেলতে শুরু করল ও? মন জবাব দিলো, অনেক আগে থেকেই। উপলব্ধি আজ হলো। চোখ তুলে দেখল একবার নোভাকে। বদরাগী, অহংকারী ডাইনি নয় আজ নোভা ওর চোখে। নোভা সুদর্শনা এবং খানিকটা অন্যরকম। যা হৃদয় তোলপাড় করে।
কবি সাহিত্যিক হলে পল ওকে হয়তো এই মুহূর্তে তুলনা করত, ভোরের শিশিরবিন্দু আবার গহীন অরণ্যে ফোটা ভীষণ সুগন্ধি মনোমুগ্ধকর এক জংলি ফুলের সাথে। এই জংলি ফুলকে পল ঘৃণা করে না, পছন্দ করে। তাই তো নিজেও চায় নোভার পছন্দ হতে। কিন্তু তা কী সম্ভব?

“এখনও যাওনি?”
নোভার কর্কশ গলা পলকে মলিন করে দেয়। নিজের প্রশ্নের জবাবে নিজেই যেন মনে মনে বলে,
“এই জনমে তোমার পছন্দ হয়ে ওঠা হবে না, জংলী ফুল। এই ভাবনা কেন যেন বিবশ করে তুলছে!”
“পল!”

“মনিব আপনাকে সাথে নিয়ে যেতে বলেছেন।” পলের নিস্পৃহ গলার স্বরে গাঢ় চোখে তাকায় নোভা। পল দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। কেন যেন নোভার দৃষ্টির তাপ অসহ্য হয়ে ওঠে। তখনই টেবিলের ওপরে রাখা নোভার জার্নালটাতে চোখ পড়ল। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করতে নোভা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি জার্নালটা বন্ধ করে ড্রয়ারে লুকিয়ে ফেললো। পল এবার ভুরু কুঁচকায়। এত দূরে দাঁড়িয়ে জার্নাল পড়া অসম্ভব ওর জন্য। নোভা কী বোঝেনি সেটা? না কি পল তাকাল বলে এমন করল। নোভা যে জার্নাল লেখে তা জেনেই অবাক হয় পল। কী লেখে ওতে? ওর মনের কথা, মনের মানুষের কথা? মনের মানুষ! নোভা কী কাওকে পছন্দ করে? পল অনুভব করল ঈর্ষার একটা সূক্ষ্ম সূচ ওর মনে বিধঁল। ও ড্রয়ারের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে দেখে ড্রয়ার শরীরে পেছনে আড়াল করে দাঁড়ায় নোভা। আঙুল চোখের সামনে ধরে বলল,

“আমার চোখ ওপরে পল।”
“ওই চোখেই তো তাকাতে ভয় করে আমার।” ওর বিড়বিড়ানি স্পষ্ট শুনতে পায় না নোভা। বিরক্তি ঝেড়ে বলে,
“কী বললে?”
মাথা দু’দিকে নাড়িয়ে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
“চলুন।”
“কোথায়?”
“মনিবের জলসা ঘরে।”
“তুমি যাও। আমি একটু পরে আসছি।”
“মনিব আমাকে আদেশ করেছেন আপনাকে সাথে নিতে যেতে।”
“যদি না যাই। জোর করবে?”
“আপনি ভালো করেই জানেন সেই দুঃসাহস আমার নেই।”
“কী করে জানব? বাড়ি কাঁপিয়ে আমার দরজা খোলার তো সাহস দেখিয়েছ আজ।” নোভা টেবিলের পাশ থেকে বিছানার দিকে হেঁটে এলো। পলের পিঠ ওর দিকে। পল বলল,

“ক্ষমা করবেন বেয়াদবির জন্য। আমি অনেকক্ষণ ধরে দরজায় কড়া নাড়ছিলাম। আপনি জার্নাল লেখায় এত মগ্ন ছিলেন যে টের পাননি।”
“তার জন্য ওমন করে দরজা খুলবে?” অভিযোগ করল নোভা। পল কী করে বোঝাবে এতবার কড়া নেড়ে ওর সাড়াশব্দ না পেয়ে চিন্তা হচ্ছিল। দরজাটাতে জোর সেই কারণেই পড়েছে।
“ভুল হয়েছে। আবারও ক্ষমা চাচ্ছি। এবার প্লিজ চলুন আমার সাথে।”

পলের এমন অনুনয়ে নোভা আর তর্ক করতে পারল না। দুজনে হেঁটে চললো কড়িডোর ধরে। নিকোলাসের জলসাঘর নিচতলার হলঘরের পুবের দিকে। পল আগে আগে হাঁটছে। নোভা পেছনে। পলের কেন মনে হচ্ছে নোভা ওর দিকে চেয়ে আছে? মনের কৌতূহল দমাতে না পেরে ঘাড়ের ওপর দিয়ে পেছনে ফিরল। নোভা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। হতাশ মুখে সামনে মুখ ঘুরায় পল। জলসা ঘরের কাছাকাছি আসতে উগ্র, অশ্লীল সংগীত শুনতে পায় নোভা। একটু যেন ধীর হয় ওর চলার গতি। সাথে পলেরও। জলসা ঘরের দরজার কাছে যেতে যে দৃশ্য দেখে তাতে লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয় নোভা। দশ বারোটা অর্ধ বসনা ডাইনি নিকোলাসের চারপাশে। নোভা এদের চেনে। কমিউনিটির পতিতালয়ে এদের বাস। আগে এই মহলে বেশ আসা-যাওয়া ছিল ওদের। না, আন্দ্রেই আনত না। আন্দ্রেই ক্যাসানোভা হলেও ওর কিছু নীতি আছে। নিজ মহলে কোনোদিন কোনো মেয়েকে আনেনি। পতিতাগুলো আসত নিকোলাসের জন্য। দৈহিক প্রয়োজনে খুব কম ডাইনিগুলোকে ব্যবহার করেছে। জলসাঘর বসতোই মূলত বিভিন্ন কুটনৈতিক প্রয়োজনে।

গত এক বছর কিন্তু কোনো প্রয়োজনেই নিকোলাস জলসার আসর বসায়নি, ডাকেনি ওই কামুক ডাইনিগুলোকেও। কেন তার জবাবও নোভা জানে। ইসাবেলার কারণে। ওর ভালোবাসা বদলে দিয়েছিল নিকোলাসকে। কিন্তু আজ যেন সেই পুরোনো নিকোলাসকে দেখছে ও। আন্দ্রেইর ধারণা তবে ঠিক ছিল। নিকোলাস অবশেষে ভুলে গেছে ইসাবেলাকে! আন্দ্রেইর অপরাধ ঢাকতে সত্য গোপন করলেও মনে মনে ও চেয়েছিল নিকোলাসের মন থেকে ইসাবেলার প্রতি ভালোবাসা কোনোদিন না যাক। ভালোবাসা ওর দুর্বলতা না হোক, শক্তি হোক। আন্দ্রেইকে সাপোর্ট করলেও ওর মনোভাবকে কোনোদিন নোভা সাপোর্ট করে না। ভালোবাসার পক্ষে ও। তবে সেটা কেবলই মনে মনে। প্রকাশ্যে আনলে কমিউনিটির সকলে হাসবে৷ এমনিতেই তো সবার নজরে দুর্বল ও। আজ নিকোলাসকে এই রূপে দেখে খারাপ লাগল। রাগ হলো ওই ডাইনিগুলোর ওপর। একজন দরজায় দাঁড়ানো সুঠামদেহি পলের দিকে এগিয়ে এলো। গলা জড়িয়ে ধরল কাছে এসে। পল মানুষ হলেও এরা ওর ক্ষমতা জানে। নিকোলাসের ডান হাতের ক্ষতির চিন্তা ভুলেও করবে না।

কিন্তু একটু আনন্দ উপভোগ তো দোষের না৷ ডাইনিটা ঠোঁট এগিয়ে আনতে পল নোভার দিকে তাকায়। রক্তচক্ষু নিয়ে ওদেরকেই দেখছে নোভা। এই আগুন দেখতে এত কেন ভালো লাগছে পলের? ডাইনি ঠোঁট বসিয়ে দেওয়ার আগেই ঠেলে ফেলে দিলো পল। মুহূর্তে ওটা দাঁত খিঁচিয়ে গালাগাল দিয়ে ওঠে। পল কিন্তু তখনও আড়চোখে নোভাকেই দেখছিল। নোভা সুন্দর। রাগলে আরও সুন্দর দেখায়। হাসল পল। পলকে গালাগাল দিয়ে ডাইনিটা সুরা হাতে নিকোলাসের পাশে বসল। নোভার দৃষ্টি ফের গেল ভাইয়ের দিকে। ওরই দিকে অনিমেষ চেয়ে আছে নিকোলাস। কয়েকজন ডাইনি যেন গায়ে মিশে যেতে চাচ্ছে।

নিকোলাসের সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। আগের ডাইনিটা হাতের সুরাপাত্র একটু পর পর নিকোলাসের ঠোঁটের কাছে নেয়। ইচ্ছে করে পাত্রটা নাড়িয়ে দেয় যেন। সুরা নিকোলাসের থুতনি বেয়ে গলা দিয়ে নামতে নামতে অর্ধখোলা বুকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ডাইনিগুলো ঠোঁট নামিয়ে আনতে চায়। কিন্তু বাধা পায়। এক একটার চুলের মুঠি টেনে সরিয়ে দেয় নিকোলাস। বাধা পেয়ে রূপের আড়ালের হিংস্র পিশাচিনী হিসহিসিয়ে ওঠে। আবার শান্ত হয়ে কাছে আসে। লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেয় নোভা। ভাইয়ের এই নির্লজ্জতা দেখে মনে মনে ভীষণ কষ্ট পায়। নোভার মনে পড়ে না পূর্বে কখনও এমন নির্লজ্জতা দেখিয়েছে ওর ভাই। মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে ওর?

“নোভালি, মাই ফাইয়ারক্রাকার। কাছে এসো।”
ছোটোবেলায় এই উপনামে ম্যাক্স বাবা ও নিকোলাস নোভাকে ডাকত। পিশাচ হওয়ার পর খুব কম ডেকেছে এই নামে। যতবার ডেকেছে আবেগতাড়িত হয়েছে নোভা। কিন্তু ওই ডাইনিগুলো ওর সকল আবেগ ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। রাগ প্রকাশে ভাই বোন কেউ কারো চেয়ে কম নয়। ভাইয়ের নির্লজ্জতাকে কটাক্ষ করে বলল,
“এখানে দাড়িয়েই বেশ দেখছি। বিশ্বাস করো বমির উদ্রেক হচ্ছে তোমাকে দেখে। আমাকে কি এই নোংরামি দেখানোর জন্যই এনেছ? এত অধঃপতন হয়েছে তোমার?”
“অধঃপতন? আহ! আমি আরও ভাবলাম মুভ অন করেছি দেখে খুশি হবে। এটাই তো চাচ্ছিলে তোমরা। বিশেষ করে তুমি এবং আন্দ্রেই। তাহলে রেগে যাচ্ছো কেন? খুশি হওনি ইসাবেলার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠেছি আমি?”

শেষ কথা নোভাকে চুপ করিয়ে দেয়। ভাইয়ের দিকে ভালো করে তাকায় এবার। নিকোলাসের ঠোঁটে সেই চেনা ক্রূর হাসি। ও কি কিছু টের পেয়েছে? গলা শুকিয়ে আসে নোভার। পল চুপচাপ ভাই-বোনকে দেখছে। মনিবকে ও খুব ভালো করে চেনে। যতই নীচ করুক বোনের সামনে এমন বেলেল্লাপনা করার মতে হীন কাজ আগে করেনি। আজ কেন করল তবে? সামনা সামনি এই প্রশ্ন করার সাহস পলের নেই। কিন্তু এটা জানে যে, কারণ ছাড়া এত নীচ কাজ ওর মনিব কোনোদিন করবে না। মনিবের গত কয়েকদিনের কর্মকান্ড ভাবতে লাগল। তাতে যদি কোনো ক্লু পাওয়া যেত। রাশিয়াতে ইসাবেলাকে জীবিত পাওয়া অপ্রত্যাশিত ছিল ওদের দুইজনের জন্য। ইসাবেলা নিজের বেঁচে থাকার যে ঘটনা বলেছিল পল শুনেছে। পুরোপুরি যে বিশ্বাস করেছে তা নয়। ইসাবেলা গুছিয়ে মিথ্যা বলতে পারে না। সহজেই মিথ্যাটা ধরা যায়। নিকোলাস সেই মিথ্যার আড়ালের সত্যিটা জানতে উদগ্রীব। জার্মানি ফেরার পর পলকে নিষেধ করেছে ইসাবেলার ব্যাপারে মুখ খুলতে। তারপর ও যায় দাদোম এর কাছে। দাদোম এখানকার কালো জাদুর সম্রাজ্ঞী। নিকোলাসের সাথে ওর পুরোনো সখ্যতা। সেখানে গিয়ে দুজনের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছে পল জানে না। ওই পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি ওর নেই। এখন হঠাৎ মনে হলো ইসাবেলার ওই মিথ্যার আড়ালে ঢাকা সত্যের সাথে নোভার কোনো সম্পর্ক নেই তো? উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাল নোভার দিকে। নোভার স্নায়ুযুদ্ধ স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে ওর মুখে। পল এবার নিশ্চিত নোভা কিছু করেছে। ভীষণ চিন্তা হতে লাগল ওর জন্য।

“হু?” নিকোলাসের গলা শুনে দুজনেই চমকে তাকায়। উঠে দাঁড়িয়েছে নিকোলাস। এখনও দৃষ্টি নোভার দিকে স্থির। ওর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি যেন বোনের সবটা পড়ে নিয়েছে। ডাইনিগুলোকে ইশারা করল রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। ক্ষোভ নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল ওরা। নোভা বার বার ঢোক গিলছে। নিকোলাস বেশ স্বাভাবিক ছন্দে বোনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওর সারা গা দিয়ে মদের বিদঘুটে গন্ধ। নাক কুঁচকে ফেলে নোভা। মদকে ও ঘৃণা করে।

“খুশি হওনি ফায়ারক্রাকার?” আবারও বলল নিকোলাস। নোভা হাসার চেষ্টা করে বলল,
“তোমার খুশিতেই আমার খুশি।”
“আমার খুশিতেই তোমার খুশি?”
“হ্যাঁ।”
“মিথ্যা বলছ তুমি ফায়ারক্রাকার।” নিকোলাসের আকস্মিক গর্জনে কেঁপে ওঠে নোভা। পল করুণ চোখে তাকায়। কী করবে এখন ও? নিকোলাসকে শান্ত করা ওর পক্ষে অসম্ভব।
“আ…মি_”
নোভার তোতলানো বন্ধ হয় নিকোলাসের হিংস্র গর্জনে। ওর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলে,

“তুমি আমার খুশিতে কোনোদিন খুশি হওনি। দেখেছিলে না বেলাকে ছাড়া কেমন কষ্টে দিনাতিপাত করেছিলাম আমি? প্রতিনিয়ত মরেছি তোমাদের সামনে। আর তোমরা সব জেনেও দিনের পর দিন, মাসের পর মাস মিথ্যা বলেছ। কষ্ট, যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখেও সত্যিটা বলোনি। বলোনি আমার বেলা জীবিত। বলোনি ওকে আন্দ্রেই ভয় দেখিয়ে বাধ্য করেছে আমাকে ত্যাগ করতে। একটুও দয়া হয়নি আমাকে দেখে তোমাদের নোভা? একটুও করুণা হলো না? লোকে বলে আমার চেয়ে নির্মম পৃথিবীতে দুটো নেই। আমি তো দেখি তোমরা এখন আমাকেও ছাড়িয়ে গেছ। এই তুমি আমার বোন নোভালি? বোনেরা এমন করে আঘাত করে ভাইকে? তবে প্রয়োজন নেই তোমার মতো প্রতারক, মিথ্যাবাদী বোনকে আমার।”

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৬৫+৬৬

নোভার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। মাথা নুয়ে পড়েছে। কম্পিত গলায় উচ্চারণ করল,
“ভাই।”
“ভাই ডাকবে না।” চেঁচিয়ে ওঠে নিকোলাস। নোভা ওর সামনে হাঁটু ভেঙে বসে দুহাত জোড় করে বলে,
“আমাদের ভুল হয়েছে ভাই। ক্ষমা করো। আন্দ্রেইকে ক্ষমা করো ভাই। তোমাকে হারানোর ভয়ে ভুল করে বসেছে ও। শুরুতেই ব্যাপারটা জানলে ওকে আমি বাধা দিতাম। বিশ্বাস করো আমাকে। আমাদের অপরাধ মার্জনা করো।”
নিকোলাস ওকে উপেক্ষা করে সরে দাঁড়ায়। রাগে কাঁপছে রীতিমতো। পলকে বলল,
“ধরে নিয়ে আয় ওই প্রতারককে। ও আমার বিশ্বাস ভেঙেছে। আমাকে আঘাত করেছে। যার শাস্তি ওকে পেতেই হবে।”

তিমিরে ফোটা গোলাপ পর্ব ৬৯+৭০