তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৭
জান্নাতি আক্তার জারা
আরাত রা ভরদুপুরে খুঁজে পেলো না কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়। শেষমেশ সবাই মিলে দুপুরে ঘুরতে যাওয়া ক্যানসেল করে বিকালে ঘুরতে যাওয়া ডিসিশন নেওয়া হইলো।
পুরো তালুকদার বাড়ি একদিন আগেও মানুষ দিয়ে ভরা ছিলো বিয়ের উদ্দেশ্য। বিয়ে শেষ, মেহমান রা নিজ নিজ গ্রন্তব্য চলে যাচ্ছে। বাড়িটা একদম আগের ন্যায় হয়ে যাবে। দুপুরে ঘুরতে যাওয়া ক্যানসেল হয়ে যাওয়া দুপুরের ডিনারের পর হাবীব আর সন্ধ্যা একসঙ্গে বাড়ির উদ্দেশ্য বের হয়ছে। হাবীব সন্ধ্যা কে সন্ধ্যার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে হাবীব নিজের বাড়িতে চলে যাবে। আশিক থেকে গেলো। আশিক আজকে রাত তালুকদার বাড়িতে থেকে সকাল সকাল তালুকদার বাড়ি থেকে রাঙামাটি ভ্রমণের উদ্দেশ্য বের হবে। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে এলো। শীতের মওসুম সবাই মিলে ঘুরতে তালুকদার বাড়ি থেকে বাজারে দিকে যাবে। বাজারের পাশে আহিন আলভী স্কুল মাঠ। আহিন আলভী বলছে স্কুল মাঠে বিকালে নানার রকম দোকান বসে। যেমন ফুচকা চটপটি, বটভাজা, চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা, হরক রকমে দোকান বসে থাকে।
আরাত মিম আইরা তিনজন রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে এসে দেখে মাহির রাফি আরশ তিনজন ঘুরতে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে সোফাতে ওঁদের জন্য অপেক্ষা করছে। আরাত দের আসতে দেখে মাহির রা বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো। আরাত একনজর মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির পূর্বে থেকে আরাত কে দেখছিলো। দুজনের চোখাচোখি হতে দুজন দু’দিকে চোখ ফিরে নিলো। আইরা মিম স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়িয়ে আশিকের বের হওয়ার অপেক্ষা করছে। রাফি হেঁসে আগ বাড়িয়ে আইরা কে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
” বিয়াইন আর কতক্ষণ ওয়েট করবো, চলুন আমরা দুজন সামনে আগায়! ওরা সময় নিয়ে আসবে ।
রাফির কথায় সবাই বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। রাফি সবার দৃষ্টি পরক করে পুনরায় বলল,
” আমি বলতে চাইছি, আমরা সবাই গল্প করতে করতে সামনে এগোয়! ওরা রেডি হয়ে চলে আসবে।
রাফির কথায় আইরা বলল,
“আপনার মনে হয় অনেক তাড়া তাইনা ! আপনি চাইলে আগে যেতে পারেন।
” বিয়াইন দের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার এতটা এক্সাইটেড কাজ করছে। বসে থাকতে পারছি না এজন্য এতো তাড়া বিয়াইন!
আইরা আর কিছু বললো না। আশিক আনাস একসঙ্গে রেডি হয়ে নিচে নেমে এলো। আনাস কে আশিকের সঙ্গে আসতে দেখে আরাত তীক্ষ্ণ কন্ঠে আনাস কে বলল,
” ভাইয়া তুমি কই যাবে?
” তোদের নতুন বেয়াই দের ঘুড়াতে।
” কিন্তু ফুপি তো আমাদের বলছে?
” মানুষজন তালুকদার বাড়ির মেয়েদের অন্য ছেলেদের সঙ্গে রাস্তায় দেখলে, তালুকদার বাড়ির বদনাম হবে। আমি তোদের জাস্ট গাইড দিবো।
আরাত ভাইয়ের কথায় মুখ বাঁকালো। আহিন আলভী কে নিয়ে দশজন মিলে চলল। বিকালের মিষ্টি আবহাওয়া উপভোগ করতে। পরিবেশ টা শান্ত দেখা গেল। চুপচাপ একে-অপরের পাশাপাশি পায়ে হেঁটে চলছে। রাফির মুখ ছটফট করছে কিছু বলার জন্য। কী বলবে কথা খুঁজে না পেয়ে চুপচাপ সবার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলো। আনাস ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে বারকয়েক তাকলো আইরা দিকে। আইরা ভাবনাশীল হয়ে হেঁটে চলছে। আরাতের মনের মধ্যে এক নতুন অনুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে। ভালোলাগার পুরুষের সঙ্গে একপথ চলছে। মনের মধ্যে কল্পনা গুলো ভালোলাগার পুরুষ কে নিয়ে অনেক কিছু কল্পনা করতে শুরু করছে। আহিন আলভী সবার আগে হেঁটে গল্প করছে আর পথ দেখাচ্ছে। তালুকদার বাড়ি থেকে কয়েক মিনিট হেঁটে আহিন দের স্কুল মাঠে এসে দাঁড়ালো সাবাই।
হরেক রকমের দোকান, মানুষজন দিয়ে প্রতিটা দোকানে ভীড় লেগে আছে। আরাত আইরা মিম আহিন আলভী প্রথমে ফুচকা দোকানে দিকে চলে গেলো। রাফি মাহির আরশ আর আশিক চারজন মিলে বটভাজা দোকানে গিয়ে চারজনের জন্য বটভাজা নিয়ে নিলো। আশিক আনাস কে তাদের সঙ্গে আসতে বলল। আনাস আশিকের কথায় না করে আরাত দের চোখেচোখে রাখতে ফুচকা দোকানের সাইটে দাঁড়িয়ে ফোন স্ক্রল করতে লাগলো।
মাঠের মধ্যে চেয়ার গোল করে মানুষজনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। মাহির রা চোয়ারে বসে বটভাজা খেতে খেতে আরাত দের দের দেখতে লাগলো। প্রায় দশ মিনিটের মতো সময় নিয়ে কয়েকজন বাদাবাদি করে ফুচকা খেয়েয় যাচ্ছে। আনাস বিরক্তি হয়ে আরাত কে ধমক দিয়ে উঠলো,
” আজকে ফুচকা খেয়ে দুনিয়ায় মায়া ত্যাগ করার, কন্টাক্ট পেপারে সাইন করে এসেছিস?
আইরা কোনোদিকে কান না দিয়ে এখনো ফুচকা খেতেই আছে। আরাত মিম আহিন আলভী ফুচকা হাতে নিয়ে আনাস সের দিকে তাকালো। আনাস আইরা দিকে তাকিয়ে আইরা কে আগের ন্যায় দোকান থেকে ফুচকা নিয়ে খেতে দেখে মুখে রাগ ফুটে উঠলো। রাগ নিয়ে পুনরায় আরাত কে বলল,
“আজাইরা জিনিস খেতে খেতে দিনদুনিয়া খেয়ে ফেলছিস, আশেপাশে তাকিয়ে দেখ কত-কী দেখা যায়।
আনাস সের কথায় চারজন পাশ ফিরে দেখলো গরম গরম ভাপা পিঠা বানাচ্ছে। আহিন সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আনাস কে বলল,
” ভাপা পিঠা বানাচ্ছে, এটা দেখার কী আছে?
“এখান থেকে বিদায় হয়ে ভাপা পিঠা খেয়ে আমাকে উদ্ধার কর যা।
আনাস সের অহেতুক কথা চারজনের পছন্দ হইলো না, আলভী ভাবনাশীল হয়ে আনাস কে প্রশ্ন করলো,
” কেনো ভাইয়া! আপনি কী ভাপা পিঠার মধ্যে আটকে আছেন। আপনাকে উদ্ধার করতে হবে কেনো?
আনাস ভ্রুকুচকে আহিনের দিকে তাকালো। আহিন আলভী উপর বিরক্তি হয়ে বলল,
“আরে বলদ, আনাস ভাইয়া আটকে থাকবে কেনো! ভাইয়া টাকা বাঁচানোর জন্য আমাদের সবকিছু অল্প অল্প করে খেতে বলছে। চল আমরা এখন ভাপা পিঠা খাবো।
কথাটা বলে আহিন আলভী কে নিয়ে চলে গেলো। আহিন কে খুঁচা মেরে কথা বলা দেখে মিম হেঁসে উঠলো। আরাত নিজের ভাইয়ের দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে মিম কে সঙ্গে নিয়ে জায়গা ত্যাগ করলো। আনাস ওদের চলে যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে আইরা উপর রাখলো। আইরা কে আগের ন্যায় ফুচকা খেয়ে দেখে আনাস ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে ফুচকাওয়ালা কে দিতে দিতে রাগী গলায় আইরা কে বলল,
” অনেক খেয়েছিস, চল এখন ওদিকে আয়।
“মামা ঝালটা আরেকটু বেশি দিবেন।
বয়স্ক ফুচকাওয়ালা আইরা দিকে তাকালো। আইরার চোখমুখ ঝালে লাল হতে দেখে বললেন,
” আফা আর কত ঝাল দিমু! আপনি তো ঝালে তে কান্দে দিবেন এখন। পড়ে মোর দোকানের বদনাম হবো। কেউ মোর দোকানে আসতে চাইবো না।
“মামা কথা না বলে বেশি করে ঝাল দিন তো!
আনাস আইরা হাত থেকে ফুচকার বাটিটা কেরে নিয়ে ফুচকা দোকানের উপর রাখলো। আইরা এতক্ষণে রেগে আনাস সের দিকে তাকালো। আনাস রেগে আইরা বলল,
” সমস্যা কী তোর, ঝালে চোখমুখের আবস্থা দেখছিস কী হাল হয়ে আছে, পানিটা খেয়ে নে।
আনাস ফুচকার দোকান থেকে পানির বোতল নিয়ে আইরা কে দিচ্ছে। আইরা আনাস সের হাত থেকে পানি না নিয়ে বিরক্তি মুখে নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বের করে ফুচকাওয়ালা কে দিতে দিতে বলল,
“মামা এটা আমার বিল।
” কিন্তু আফা আপনাদের বিল তো এই ভাই দিয়ে দিছে?
“আপনার ভাইয়ের সঙ্গে আমি আসিনাই, তো আমি ওনার টাকায় ফুচকা খাবো কেনো!
কথাটা বলে আইরা টাকা টা দোকানে রেখে দিয়ে আরাত দের দিকে যেতে লাগলো। হটাৎ রাফি আইরা সামনে এসে আইসক্রিম ধরে বলল,
” বিয়াইন আইসক্রিম টা আপনার জন্য!
” আইসক্রিমের জন্য ধন্যবাদ বিয়াই সাব।
রাফি দূরে বসে আইরা কে আনাস সের পানির বোতল ফিরিয়ে দেওয়া দেখতে পেয়ে। আইসক্রিমের দোকান থেকে একটা কোন আইসক্রিম কিনে নিয়ে আইরা কে দিলো। আইরা রাফির হাত থেকে আইসক্রিম নিয়ে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সামনে দিকে গেলো। আনাস দুজনের যাওয়ার দিক রুক্ষ নয়নে চেয়ে রইলো। আনাস কে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ফুচকাওয়ালা টাকা আনাস কে ফিরিয়ে দিতে বলল ।
“ভাই আপনার টাকা!
” রেখে দিন।
আনাস আইরার যাওয়ার দিকে রুক্ষ নয়নে তাকিয়ে আশিকের কাছে গিয়ে বসলো। আশিক এতক্ষণ যাবত আনাস কে দূর থেকে পরক করছিলো। আনাস কে নিজের পাশে বসতে দেখে। আনাস কে রাগাতে চোয়ারের সঙ্গে গা এলিয়ে দিয়ে গেয়ে উঠলো,
পরাণ যায় জ্বলিয়ারেরররর… পরাণ যায় জ্বলিয়ারেররররর….আহা ভালোবাসা কেনো এত অসহায়….বুকে প্রেম, মুখে কেনো অভিনয়, তোর ভালোবাসা তোর আচরণে কেনো বুঝা যায়….
বন্ধুরেররর…বন্ধুরেরররর…….. তুই দারুণ অভিনয় জানিস রেরররর……
আনাস রাগী চোখে আশিকের দিকে তাকালো। কখন জানি পা থেকে জুতা খুলে এত মানুষের মধ্যে মেরে দেয় বলা যায় না। আশিক মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো। আশিকের সংমিশ্রণ গানে অনেকের নজর তাদের উপর। ঠিক তখন আদিল কে দেখা গেলো ওঁদের দিকে আসতে । আদিল এসে আনাস সের পাশে চেয়ার টেনে বসতে বসতে আশিকের দিকে এক টুকরো কাগজ এগে দিতে দিতে বলল,
” ব্রো এই নেও তোমার হবু শাশুড়ির নাম্বার।
আনাস সের রাগী চোখ দু’জনের উপর ভ্রুকুচকে এলো। আশিক আদিলের দিকে তাকিয়ে কাগজ টা হাতে নিয়ে হাসার চেষ্টা করে আনাস সের দিকে একবার তাকালো ,পুনরায় আদিল কে বলল,
“সব জায়গায় সবকিছু বের করতে নেই ইডিয়েট।
” হবু শাশুড়ীর নাম্বার মানে?
“হ্যা আমার ভবিষ্যৎ বউয়ের আম্মুর নাম্বার। রাফি রা কই গেলো খুঁজতে হবে চল ওঠে পড়ি।
আশিক কে কথা ঘুড়াতে দেখে আনাস আর কথা বাড়ালো না। আদিল কে বলল,
” তুই এসময় এখানে কেনো! তাকবীর ভাইয়া কই?
আদিল অবিশ্বাস্য হয়ে আনাস কে বলল,
“স্যার তো ৩:৩০ এর ফ্লাইটে লন্ডনের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। স্যার আপনাকে জানায় নাই?
“হোয়াট! আমার সঙ্গে মজা করছিস?
“আই’ম নট কিডিং ব্রো।
আনাস কথা বলল না। ফোনে সময় দেখলো, ৪: ৪৯ মিনিট। তাকবীরের বর্তমান অবস্থান বিমানের মধ্যে। কিছুক্ষণ চুপচাপ এভাবে বসে থেকে। আশিকের দিকে তাকিয়ে সবাই কে ডেকে দিতে বলল। আদিল কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলো। আশিক সবাই কে ডেকে পুনরায় তালুকদার বাড়িতে ফিরলো সবাই মিলে। বাড়িতে ফিরে রাতের খাবার খেয়ে আরিশা কে নিয়ে আমান রা চলে গেলো নিজেদের বাড়িতে। বাড়ি টা একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আইরা নিজের ঘরে বসে উপন্যাসে মগ্ন। আরাত মিম কে নিয়ে রশ্মি দের বাড়িতে আসলো। তিনদিন যাবদ আরাত রশ্মি কে ফোনে পায় না। বলতে গেলে রশ্মি ইচ্ছা করে আরাতের ফোন ওঠাচ্ছে না। রশ্মি নিজের মার ফোন ধরবে ভেবে রাহিমা সুলতানার ফোন থেকে কয়েকবার রশ্মির ফোনে ফোন দিলো আরাত। কিন্তু রশ্মি রাহিমা সুলতানা ফোন রিসিভ করলো না। আরাত এবার রশ্মির বাবা কাছে ভিডিও কল লাগালো। দুবার রিং হওয়ার মাথায় ভদ্রলোক ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করলেন। আরাত ফোন রিসিভ হতে সালাম দিলো, ওপাশ থেকে ভদ্রলোক সালাম দিয়ে বলল,
” কেমন আছো আরাত মামনী?
আরাত মুখ মলিন করে অভিযোগের সুরে বলল,
” আপনার মেয়ে আমাকে ভালো থাকতে দিলে তো
ভালো থাকবো আঙ্কেল।
ভদ্রলোক আরাতের অভিযোগে বলা কথায় মুচকি হাসলেন, আরাত পুনরায় বলল,
” আক্কেল রশ্মি কই, আমার ফোন ওঠাচ্ছে না আন্টির ফোন ওঠাচ্ছে না। ও কী আমার উপর রাগ করেছে?
” আমার মেয়ে একটা ছেলের জন্য কানাডা চলে এসেছে। বিষয়টা তোমার প্রথম থেকে জানা ছিলো। এখন আমাকে জিজ্ঞাস করছো রশ্মির কী হয়েছে। আমার থেকে তো বেশি তোমার জানার কথা মামনী?
আরাত ভদ্রলোকের প্রশ্নে উওর করতে পারলো না। ভদ্রলোক আরাত কে চুপচাপ থাকতে দেখে বললেন,
” কানাডা আসার পর কিছুদিন হাসিখুশি ছিলো আমার মেয়েটা। আমার সঙ্গে আড্ডা দিতো, আমার টেককেয়ার করতো। ইদানিং মেয়েটার বিহেভিয়ার চেঞ্জ লাগছে। আমার মেয়েটা ঠিক নেই আরাত।
” আঙ্কেল রশ্মি কলেজ করে না?
“কলেজ, খাওয়া-দাওয়া সবকিছু বন্ধ করছে, রুম থেকে বের হতে চাইছে না।
বেশ কিছুক্ষণ রশ্মি কে নিয়ে কথা বলে আরাত নিজেদের বাড়িতে চলে এলো। রাত সাড়ে ন’টায় আদনান তালুকদার আনাস কে তাকবীরের হটাৎ লন্ডন যাওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাস করতে আনাস নতুন কাইন্ড দের সঙ্গে ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে বলে বুঝালো। আনাস ছাঁদে একা একা অন্ধকার ঝাপঝোপের দিকে তাকিয়ে কিছু নিয়ে ভাবনা তে মগ্ন।
” একা একা অন্ধকারে কী নিয়ে ভাবছিস?
আনাস আশিকের কন্ঠে নড়েচড়ে দাঁড়ালো। আশিক কে নিজের পাশে দাঁড়াতে দেখে আনাস শান্ত কন্ঠে বলল,
” ঘুমাতে যাস নাই?
” ঘুম ধরছিলো না, এজন্য ছাঁদে আসলাম। বললি না তো! কী নিয়ে ভাবছিস?
“তাকবীর ভাইয়া হটাৎ কাউকে না জানিয়ে আদিল কে রেখে, একা একা লন্ডনে যাওয়া। কেমন যেন মিলাতে পারছি না।
” তুই নিজের অনুভূতি বুঝতে পারছিস না, ব্রো কে বুঝবি কিভাবে?
“আমার অনুভূতি মানে?
আশিকের কথায় আনাস আশিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলো। আশিক শব্দহীন হেঁসে পুনরায় বলল,
” চোখের সামনে শখের নারীর চোখে অন্য কারো জন্য ভালোবাসা দেখার মতো সাহস তোর ভাইয়ের নেই। নিজের অনুভূতি লুকাতে পালিয়ে’ছে। পালিয়ে বাঁচবে কতক্ষণ! ভালোবাসা কে দূরে রাখা যায়। অনুভূতি কে না। অনুভূতি গুলো তো পিছু ছাড়বে না। দূরে থেকে বেশি মনে পরবে। আর মনে পড়া মানে ধীকে ধীকে কষ্ট পাওয়া।
“তাহলে ভালোবাসা মানে কী! আমি বুঝবো কিভাবে তাকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি?
আনাস উওরের আশায় আশিকের দিকে চেয়ে রইলো। আশিক কিছুক্ষণ আনাস কে পরক করে একটু সময় নিয়ে। পুনরায় আশিক আনাস সের কথায় উওর করলো,
” আমার কাছে ভালোবাসা মানে, শখের নারীকে যত্নে রাখা। সম্মান করা, তার ছোটছোট আবদার গুলো যত্নে নিয়ে পূরণ করা। তাঁর খোঁজখবর রাখা। তার নিজেকে নিয়ে পাগলামি গুলো দেখে নিজের মনের মানসিক শান্তি খুঁজে পাওয়া।
আশিক দম নিলো। পুনরায় অন্ধকারে চোখ রেখে বলতে শুরু করল,
“আর তুই বুঝবি কিভাবে! যখন দেখবি তাঁর হাসিতে তুই তৃপ্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছিস। তাঁর খুশিতে তোর মুখে অজান্তে হাসি ফুটে উঠেছে। তাঁর কষ্টে তোর বুক ভার হয়ে আরছে। সে অন্য কারো সঙ্গে হেঁসে কথা বলছে, তোর মনে তাকে নিয়ে জেলাসি সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁকে অন্য কারো পাশে সহ্য করতে পরছিস না। হ্যাঁ তখন বুঝবি তুই তার প্রেমে একেবারে ডুবে গিয়েছিস।
যদি সাতার জানা থাকে! তাহলে কূল সহজে পেয়ে যাবি। সাঁতার না জানলে হাবুডুবু খেতে হবে দোস্ত?
আশিক শেষের কথাটা দুষ্টুমি ছলে বলল। আনাস এতক্ষণ যাবত আশিকের কথা মনোযোগ সহকারে শুনছিলো। আশিক এবার আনাস কে রাগাতে বলল,
” প্রেম ভালোবাসা তোর জন্য না! এটা আশিকের জন্য পারফেক্ট। শালা আমার কপাল টা খারাপ এতদিন তোর মুখের দিকে তাকিয়ে আইরা কে বোনের নজরে দেখে আরছি। মাঝখান থেকে আরেকজন এসে নিয়ে যাবে। তোর দেবদাস হওয়ার চক্করে আইরা কে হাড়াতে হচ্ছে। বন্ধুর বউ হইলে তাও মনকে কিছুটা সান্তনা দিতে পারতাম। সালা আমার জিন্দেগীতে লাভ লস নেই পুরাতাই লস।
মানুষ পাখির মতো, পাখির উড়িয়ে বেড়ানোর জন্য পাখা থাকে। আর মানুষের ঘুরতে যানবাহন। তবুও মানুষের আফসোস কেনো পাখি হইলাম না। পাখি নিজের ডানায় ভর দিয়ে ঘুরে বেড়ায়, আমি কেনো পাইনা। মানুষ বুঝতে চায়না, পাখি কে উড়তে সর্বশক্তি দিয়ে নিজের ডানায় ভর দিতে হয়। আর মানুষ কে ঘোরাতে তার সামনে একজন শক্তিশালী মানব থাকে। কখনো বাবা-র মতো বটগাছ কখনো বড়ো ভাইয়ের মতো আগলে রাখার ছায়া। কখনো মায়ের মতো যত্নকারী যন্ত্র। তবুও মানুষের আফসোস ফুরায় না। কারো কাছে এগুলো বন্দী জীবন মনে হতে লাগে। মানুষ নিজেকে একটা বার ভাবে না আমি তো আস্ত একটা জান্নাতের পাখি। মানুষ যদি চোখ বন্ধ করে একবার ভাবতো প্রতিটা সেকেন্ড প্রতিটা মিনিট প্রতিটা সময় আমাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাহলে হয়তো এই মিনিট সময় গুলো নষ্ট করতো না। সময় কারো জন্য নির্দিষ্ট না।
আমাদের জীবন থেকে কিভাবে সময়গুলো কেটে যাচ্ছে আমরা বুঝতে পারছি না। কেটে গেছে আরো ছয়দিন, তালুকদার বাড়ি সম্পন্ন ফাঁকা। মিম রুপোলী বেগম গ্রামে চলে গেছে। আশিক পড়ে-দিন সকাল বেলা ব্রেকফাস্ট করে চলে গেছে। আরিশা শশুর বাড়িতে। আইরা আর আগের মতো তালুকদার বাড়িতে আসে না। আনাস আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার তিনজন সারাদিন অফিসে থাকে। আহিন স্কুলে যায়। আরাতের দিন কাটতে চায় না। এরমাঝে রশ্মি অসুস্থ হয়ে মেডিকেল ভর্তি ছিলো টানা একদিন। রাহিমা সুলতানা মেয়ের জন্য কান্নাকাটি শুরু করছিলেন। আরাত রাহিমা সুলতানা কে সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিল রশ্মির শরীর দুর্বল হওয়ার কারণে রশ্মি কে মেডিকেল রেখে রশ্মির বাবা, একরাতে মধ্যে রাহিমা সুলতানা এবং আলভী কে কানাডা নিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করছেন। রাহিমা সুলতানা বর্তমান অবস্থান কানাডা। আরাত দিনে বারকয়েক রাহিমা সুলতানা কে ভিডিও কল দিয়ে দূর থেকে রশ্মি কে দেখে শুধু । আরাত রশ্মির উপর রাগ করে কথা বলে না ।
তাকবীর পূর্বে থেকে বিজনেসের সূত্রে এদেশ তো ওদেশে যাওয়া আসা হতেই থাকে। কিন্তু এবার লন্ডনে যাওয়া সপ্তাহ পার হতে চলছে। আনাস সের সঙ্গে তাকবীরের যোগাযোগ চলছে। তাকবীর শুধু মাঝেমধ্যেই নিজ থেকে নিজের ফুপি অর্থাৎ আনহা শেখ কে ফোন দিয়ে কথা বলে। আরাত আজকে কলেজ যাবে রেডি হয়ে সোফাতে ভাত খাইছে আর টিভি দেখছে। আনাস অফিসে যাওয়ার জন্য বের হতে আরাত কে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো।
“বুড়ী শোন?
” হ্যাঁ ভাইয়া! আমার টাকা টা সোফাতে রেখে দেও, আমি নিয়ে নিবো।
আরাত খাওয়া আবস্থাতে টিভি দিকে চোখ রেখে বলল,আনাস ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে এক হাজারের নোট সোফাতে রাখলো। পুনরায় আরাত কে জিজ্ঞাস করে,
“ইরা কে দেখি না! ও আসে না এ-ই বাড়িতে?
আরাত এবার টিভি থেকে চোখ ফিরিয়ে আনাস সের উপর রাখলো। আনাস কে প্রশ্নভরা চাওনি নিয়ে তাকাতে দেখে আরাত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” না আইরা আপু আসে না।
” কেনো আসে না?
“এসে কী করবে?
” কী আর করবে! আমাকে জ্বালাবে….
আনাস নিজের মুখ ফসকে বলা কথায় নিজেয় বেশ অবাক হইলো। আরাত আনাস সের দিকে ভ্রুকুচকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ। পুনরায় আনাস কে বাজিয়ে দেখতে বলল,
“আইরা আপু আগে ফ্রি ছিলো। এজন্য টুকিটাকি তোমার সঙ্গে মজা করছে এখন…..
“এখন….এখন কী বল, ফ্রি ছিলো মানে! ও কী এখন ফ্রি নেই। আর তুই যেটাকে মজা বলছিস এটাকে মজা না পাগলামি বলে।
হটাৎ আনাস সের মেজাজ তৈরতৈর করে উঠলো, আনাস কে রেগে যেতে দেখে আরাত ধীর ঠান্ডা কন্ঠ রেগে বলল,
” তুমি তো আইরা আপুর ভালোবাসা মানতে চাও না, এটা মানো তো! মুখের কথা বুকে এসে লাগলে মানুষ চুপ হয়ে যায়! আইরা আপুর নিঃসঙ্গ জীবনে রাফি ভাইয়ার এসে পরিপূর্ণ করে দিবে। আই নো এটা একটু খারাপ লাগবে, বাট ইউ নো ইটস ওকে! সবকিছু মেনে নিতে হয়। কারণ তুমি আইরা আপুর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য না।
তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ২৬
আরাত টাকা টা হাতে নিয়ে প্লেট সহ কিচেন রুমের দিকে গেলো। আনাস বোনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে শূন্যদৃষ্টি তে চেয়ে রইলো। পুনরায় নিজেকে পাওা না দিয়ে চলল অফিসের উদ্দেশ্য। আরাত কলেজে পা রাখতেই সবাই অদ্ভুত নজরে আরাত দেখছে। তাঁদের চাওনি তে বলে দিচ্ছে তাঁদের খুব প্রিয় কিছু আরাত কেরে নিয়েছে যেন। আরাত সবার নজর অগ্রহ করে ক্লাসে চলে গেলো। সন্ধ্যা আগে থেকে ক্লাসে ছিলো আরাত আসার কিছুক্ষণের মাথায় মিরা কে আসতে দেখা গেলো ক্লাসে।
