তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬২
তাবাস্সুম খাতুন
সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে শহর জুড়ে। রুমের মধ্যে নিশান আর সিমি এখনো গভীর ঘুমে আছে। হঠাৎ নিশানের মাথার কাছে থাকা তার ফোনটা সশব্দে বেজে উঠলো। নিশান হাতড়িয়ে ফোনটা নিলো নাম্বার টা দেখলো আনকন নাম্বার। নিশান ফোনটা রেখে দিলো। ফোন টা বেজে বেজে কেটে গেলো আবারো কল দিলো। নিশান এইবার বিরক্তি নিয়ে উঠে বসলো ফোনটা রিসিভ করলো। ফোনের ওইপাশ থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসলো,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম..
নিশান গম্ভীর ভাবে জবাব দিলো,
“ওয়ালাইকুম আসসালামু who are you..?”
মেয়েটা ক্ষীণ হাসলো অরতঃপর বললো,
“আমার পরিচয় দিয়ে কি করবেন মিস্টার তানভীর চৌধুরী নিশান উপস না ওইটা বউ পাগল নিশান হবে !”
মেয়েটার কথা শুনে নিশান বাঁকা হেসে জবাব দিলো,
“আমি জানি আমি পাগল। ইশুর জন্য নিশান সবসময় পাগল থাকবে। সেইটা তোকে ঘটা করে বলতে বলছি না।”
ওইপাশ থেকে মেয়েটা এইবার একটু রাগী স্বরে বললো,
“এত যে পাগলামি করছিস। ভেবে দেখ যদি ওকে নিয়ে পালিয়ে যাই কোন এক জায়গায় কি অবস্থা হতে পারে তোর?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নিশানের মুখের ভাব পাল্টে গেলো তবুও শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
“মোবাইলে হুমকি না দিয়ে সাহস থাকলে এই কথাটা আমার সামনে এসে বল। তাহলে দেখিস এই বউ পাগল নিশান কতটা দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।”
মেয়েটা “চ” সূচক শব্দ উচ্চারণ করে বললো,
“জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ মিস্টার তানভীর চৌধুরীর চোখের উপরে ধোঁকা দিয়ে তার ইশু কে কিডন্যাপিং করে চলে যাবো দূর দুরন্তে। পারলে বাঁচিয়ে রাখিস তোর ইশুকে।”
নিশান ও কাঠকাঠ গলায় বললো,
“পারলে আমার ইশু না আমার বাল টা ছিঁড়ে দেখাস। তবেই বুঝবো না শালীর দম আছে আমাকে ধমক দেওয়ার।”
বলেই নিশান কলটা কেটে দিলো। সে ফোনটা রেখে বেড থেকে নেমে কাঁচের দেওয়াল থেকে পর্দা সরিয়ে দিলো কাঁচের দরজা এক পাশ থেকে সরাতেই সূর্যের আলো এসে সোজা সিমির মুখে পড়ছে। নিশান বেলকুনিতে দাঁড়ালো। তার গায়ে কোন পোশাক নেই শুধু একটা টাউজার পড়া। বুক হাত জুড়ে থাকা ট্যাটু গুলো উজ্জ্বল করছে সূর্যের আলোয়। সে রেলিং এ দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে বাড়ির বাইরের গার্ডেন এর দিকে।কে এই মেয়ে? খবর নিতে হবে!অপরদিকে সূর্যের আলো সিমির মুখে পড়তেই সিমির ঘুম ভেঙে গেলো সে হাত দিয়ে সূর্যের আলো আটকাতে রাখলো। কিন্তু পারলো না।সে উঠে বসলো মাথাটা ভার হয়ে আছে। সামনে তাকিয়ে দেখলো নিশান দাঁড়িয়ে আছে। সিমি বেড থেকে নামলো সে কি পরে আছে কিনা নেই সেগুলো দেখলো না। সোজা বেলকুনির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিশানের উদ্দেশ্য বললো,
“সমস্যা কি আপনার? দেখছেন না আমি ঘুমিয়ে আছি। তাহলে এইভাবে রোদ পাওয়ার কি আছে?”
নিশান সিমির দিকে ফিরলো। ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে।সিমি দরজায় হাত দিয়ে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে নিশানের দিকে। তার পরনে নিশানের একটা কালো শার্ট। শার্ট এর উপরের দুইটা বোতাম খোলা।হাতা দুইটা ফোল্ট করা। চুলগুলো অগোছালো অবস্থাতে ছেড়ে দেওয়া। নিশান ঠোঁট কামড়ে ধরে বললো,
“তোকে বড্ড হট লাগছে জানবাচ্চা।”
নিশানের এমন কথা শুনে সিমির চোখ জোড়া ছোট থেকে বড়ো হয়ে গেল। সে নিজের গায়ে তাকিয়ে দেখলো নিশানের জামা সে অবাক কন্ঠে বললো,
“আপনার জামা আমি কখন পড়লাম?”
“কাল রাতে।”
“কাল রাতে কখন?”
নিশান সিমির কাছে এসে সিমির কোমরের খাঁজে হাত দিয়ে তাকে ঘুরিয়ে রেলিং এর ঐখানে রাখলো সিমি একটু পেছন দিকে ঝুঁকে গেলো। নিশান রেলিং এর দুইপাশে হাত দিয়ে ঝুঁকে আসলো সিমির মুখোমুখি। সিমি চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে। নিশান হাঁস্কি টোনে বললো,
“তোকে বলেছিলাম। প্রতিনিয়ত সুইট কিছু ফিল করাবো আমি। বাট তুই যে কাল রাতে এইরকম সারপ্রাইস দিলি আমাকে আমি অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে গিয়েছি।”
সিমি চোখ খুললো নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“আমি কখন সারপ্রাইস দিলাম আপনাকে?”
নিশান একই ভাবে বললো,
“বুঝে নে কাল রাতে কি করেছিলিস?”
সিমি চোখ নামিয়ে নিলো। তার মাথায় আসছে না সে কি করেছে। চোখ বন্ধ করে মাথায় চাপ দেওয়া চেষ্টা করলো তবে হাল্কা পাতলা মনে আসছে সে বলা ধরলো,
“আমি টিভি দেখছিলাম কোরিয়ান ড্রামা। খেতে ইচ্ছা করছিলো ফ্রিজের কাছে গিয়ে দেখি শুধু পানীয় বোতল। ঐটা দুইটা তিনটা এনে খেলাম ভালো লাগছিলো তাই আরো দুইটা এনে খেয়েছি। তারপর ড্রামাতে কিস মোমেন্ট চলছিল। একটু পরেই আপনি আসলেন তারপর আমার আর মনে পড়ছে না কেন?”
সিমি থামতেই নিশান সিমির কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কিছু বললো। যা শুনে সিমি বলে উঠলো,
“আস্তাগফিরুল্লাহ নাউযুবিল্লাহ ছিঃ কি বললেন এইসব?”
নিশান সরল জবাব দিলো,
“যেইটা হয়েছে সেইটাই, তোর কি প্রমান লাগবে দেখবি?”
সিমি matha দুইপাশে নাড়ালো। সে দেখতে চাই না। সিমি মনে মনে বললো,
“ছিঃ সিমি ছিঃ করলি কি তুই? আর আমি ভাবছি ওইটা স্বপ্ন। ওয়াক স্বপ্ন না বাস্তব ছিঃ নিজের উপরে এত রাগ হচ্ছে দূর বাল ভালো লাগে না।”
নিশান এইবার সরে আসলো। সিমিকে বললো ফ্রেশ হতে নাস্তা খাওয়ার জন্য। সিমি না যেয়ে বললো,
“কাল রাতে ঐসব আমি ইচ্ছা করে করিনি। আপনি ভুলে যান প্লিজ।”
নিশান ঘাড় কাত করে বলে উঠলো,
“মেয়ে যেই নেশা করালে তুমি সেই নেশার কাহিনী কি আমি সজ্ঞানে ভুলে যেতে পারি?”
“ভুলতে না পারলে মনে করতে হবে না।”
নিশান এইবার স্বাভাবিক ভাবে বললো,
“বেশি তেড়ামি না করে ফ্রেশ হয়ে আয়।”
সিমি ও একই ভাবে বললো,
“একশোবার তেড়ামি করবো। শুধু আপনি ভুলে যান।প্লিজ।”
নিশান এইবার ধমক দিয়ে বললো,
“বিলিভ মি ইশু, বেশি তেড়ামি করলে জানে মেরে দাফন দিয়ে আসবো।”
নিশানের কথা শুনে সিমি মুখ ভাঙিয়ে বললো,
“সাহস যদি থাকে তবে দাফন দিয়ে দেখান।”
সিমির কথা শেষ হতেই নিশান সিমিকে ঠেলে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো। সিমির গাল চেপে ধরলো বাম হাত দিয়ে শক্ত করে।সিমি ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো। নিশান সিমির মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে হিংস্রতার সাথে বললো,
“আমার সাহসের কথা উল্লেখ করছিস তুই? তুই কি জানিস আমার সাহস কতটা দূর অতিক্রম করেছে শুধু তোর জন্য।তোর সারা দেহে আমার হাতের বিচারণ আছে। আমার সন্তান ও তোর গর্ভে ছিলো। তাহলে ভাব এই তানভীর চৌধুরী নিশানের ঠিক কতটা সাহস আছে?”
বলে নিশান সিমিকে ছেড়ে দিয়ে শান্ত বাণী ছুড়ে দিলো,
“চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে নে।”
সিমি আর কিছু বললো না চোখে পানি নিয়ে রুমে ঢুকে আলমরি থেকে পোশাক বাহির করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। এইদিকে নিশান রুমে আসলো ফোন নিয়ে আবারো বেলকুনি গেলো। ফোনে একজকনের নাম্বার খুঁজে ফোন দিলো। কল রিসিভ হতেই ওই পাশ থেকে ভেসে আসলো,
“বস আপনি কেমন আছেন? এতদিন পরে কোন সমস্যা হয়েছে বস? আমরা কি সাহায্য করবো?”
নিশান শান্ত ভাবে বললো,
“হাইপাই হস না। ভেবেছিলাম এইসব ছেড়ে দেবো। কিন্তু কিছু মানুষ আমাকে থাকতে দিচ্ছে না নিশ্চিন্তে আমি আবারো ব্যাক করছি আমার TN টিমে। আমি একটা নাম্বার আর কল রেকর্ড তোকে পাঠাচ্ছি সবকিছু দেখ ভালো ভাবে রিচার্জ করে কে দিলো কল? মেয়েটা কে? কোন দেশের? মেয়েটার সম্পূর্ণ বায়োডাটা আমার চাই। আমি ইতালি আছি। আমার বাড়িতে তোদের সাথে রাতে দেখা করতে যাবো। এর মধ্যে সবকিছু রিচার্জ কর আল্লাহ হাফেজ।”
বলে নিশান কল কেটে দিলো।ঘাড় এইপাশে ঐপাশে ঘুরিয়ে ফুটিয়ে নিলো শব্দ হলো নিশান বাঁকা হেসে বললো,
“তুই যেই হোস না কেন মেয়ে এই TN টিমের লিডার তানভীর চৌধুরী নিশানের ছায়াতাও মারতে সাহস পাবি না।”
নিশান এইবার রুমে আসলো সিমি বেড়িয়ে আসছে মাত্র। নিশান ও নিজের পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। পাঁচ মিনিট পরে বেড়িয়ে আসলো। সিমি চুপচাপ বেডে বসে আছে। নিশান এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সেট আপ করে নিলো। এরপর সিমিকে নিজের সাথে আসতে বলে রুম থেকে বেরোলো। সিমিও কিছু না বলে যেতে শুরু করলো। নিশান ডাইনিং টেবিলে বসলো। সিমিকেও বসতে বললো। খাবার বেড়ে দিলো। নিশান খেলো সাথে সিমি ও চুপচাপ খেতে লাগলো। খাওয়া শেষ হতেই নিশান সিমির হাত ধরে টেনে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো। সিমি কিছু জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও করলো না। যেথাই খুশি সেখানে নিয়ে যাক সে চুপ থাকবে কোন কথা বলবে না।নিশান সিমিকে গাড়িতে উঠতে বসলো। সে নিজেও ড্রাইভিং সিট এ বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। নিশান সিমির উদ্দেশ্য বললো,
“আমি যখন বাড়িতে থাকবো না তখন অনেকে আসবে তোকে দরজা খুলতে বলবে আমার কসম তুই কোন ভাবেই দরজা খুলবি না। অনেকে আমার কণ্ঠের নকল ও করবে তাও খুলবি না কারন আমার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে আমি খুলতে পারবো। আর কেউ যদি বলে আমি এক্সিডেন্ট করছি বাঁচতে পারবোনা। তবুও দরজা খুলবি না কারন আমার নিশ্বাস থাকালীন আমি নিজেই তোর কাছে আসবো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রটেক্ট করতে। আমি বডিগার্ড বাড়িয়ে দেবো। তবুও তুই সচেতন থাকিস অন্তত আমার জন্য থাকিস। তোর কিছু হলে আমার বেঁচে থাকা দায় হয়ে যাবে। Please keep yourself safe, just for me Janbaccha.”
নিশান থামলো। সিমির সবকিছু মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। এইটা আবার কোন বিপদ আসছে তাঁদের দিকে।ভয় লাগছে প্রচুর। সে কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“অ.. আম.. র. ভো.. য়..”
বাকি কথা শেষ করার আগেই নিশান গাড়ি ব্রেক করলো। সিমির মাথাটা চেপে আনলো নিজের বুকে। সিমি অনুভব করলো নিশানের হার্টবিট টা অন্য দিনের তুলনায় একটু জোরেই বিট করছে। নিশান সিমিকে আশ্বাস দিয়ে বললো,
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি আছি। থাকবো আল্লাহ যতদিন আমাকে রাখে। শুধু আমি যতক্ষণ থাকবো না নিজেকে সেভ রাখিস। আর কিছু হবে না। বুঝেছিস আমি আছি কোন ভয় নেই নির্ভয়ে থাক।”
সিমি মাথা নাড়লো। নিশান সিমিকে টেনে নিজের কোলে বসালো মাথাটা বুকে চেপে ধরে এক হাত দিয়ে ড্রাইভ করতে লাগলো। সিমি বুকে মাথা রেখে নিশানের হার্টবিট এর প্রতিটা বিট শুনতে লাগলো মনোযোগ দিয়ে।
বিশ মিনিট ড্রাইভ পরে গাড়ি থামলো একটা পার্কের সামনে। নিশান নামলো সিমিকেও নামালো। সিমি বড়ো বড়ো চোখ করে সবকিছু দেখছে। নিশান সিমির হাত ধরে পার্কের ভিতরে ঢুকলো। সিমিকে নিয়ে গেলো একদম শুনশান জায়গায় যেইখানে মানুষ একটু কম আছে। সুন্দর ফুলগাছ ঘাস বসার বেঞ্চ। বড়ো বড়ো গাছ তাতে ফুল ফুটে আছে সুন্দর লাগছে খুব। সিমি মুগ্ধ নয়নে সবকিছু দেখছে নিশান সিমিকে বললো,
“কিছু খাবি তুই?”
সিমি মাথা দুইপাশে নাড়িয়ে বললো,
“ইচ্ছা লাগছে না এখন।”
নিশান বুকে হাত গুঁজে সিমির দিকে চেয়ে রইলো। সিমি হাত লম্বা করে বড়ো নিশ্বাস নিলো। অনুভব করতে লাগল হাল্কা বাতাস। চারপাশটা শান্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশে নিশানের কন্ঠে অশান্ত গানের রিলিক্স বলে উঠলো,
তুই শুধু আমার উন্মাদনা পর্ব ৬১
“কত কি বলতে বাকি,কতটা চলতে বাকি।
তোর চোখের চাউনিতে বুক, কতটা গোলতে বাকি।
তোকে পেতে সব হারাতে যাবো নীলচে নির্বাসন।
তোকে পেতে সব হারাতে যাবো নীলচে নির্বাসন।
জানে মন তুই জীবন, জানে মন তুই জীবন।”
