Home তোমার ছোঁয়ায় আসক্ত আমি তোমার ছোঁয়ায় আসক্ত আমি পর্ব ৩২

তোমার ছোঁয়ায় আসক্ত আমি পর্ব ৩২

তোমার ছোঁয়ায় আসক্ত আমি পর্ব ৩২
নীল মণি

শিকাগোর ব্যস্ত শহরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে, তুষারপাত থেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু বাতাসে এখনও জমে থাকা শীতের কামড়। আর এই অ্যাপার্টমেন্ট এর ভেতরে চলছে এক ভয়াভয় ঝড়।জ্বলছে যেন দাবানল, অ্যাপার্টমেন্ট এর ভেতরে চিৎকার করে চলেছে কেউ, এক সেকেন্ডের ব্যবধানে চৌচির হয়ে গেলো বড় কম্পিউটারের স্ক্রিন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মাউস, কীবোর্ড সব কিছু এক এক করে ভেঙে দিচ্ছে আবরার জায়ন। তার চোখ জ্বলছে, রাগে কাঁপছে শরীর, ফুলে উঠেছে কপালের শিরা, হাতের ভেইনস যেন ছিঁড়ে যাবে এখনই ,যেন পুরো ঘরটাকেই ধ্বংস করে দেবে।

দাঁতে দাঁত চেপে ফোন তুলে নিলো ,প্রথমে ইউভি’র নাম্বারে ডায়াল করলো রিং হচ্ছে , বারং বার… কিন্তু কেউ রিসিভ করলো না।
মুহূর্তেই দ্বিতীয় নাম্বার ডায়াল করলো ,মা এরর নম্বর।
দুইবার রিং বাজতেই ওপাশ থেকে মেহজাবীন বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো, গলা ভরা মমতায়–
“হ্যাঁ বাবা বলো… কী কর ….
কথা শেষ হওয়ার আগেই গর্জে উঠলো জায়নের কণ্ঠ

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“মা, অয়ন কোথায়?”
চমকে উঠলেন মেহজাবীন বেগম, ছেলের কণ্ঠের এই আগুনে শব্দে যেন বুক কেঁপে উঠলো— “অয়ন কোথায় থাকবে? নিজের বাসায়। ওহ তাহলে তুই খবর টা শুনেছিস? যাক, ভালোই হয়েছে।”
জায়ন আবার গর্জে উঠলো, এবার যেন আরও ভয়ংকরভাবে,
“শুনবো মানে কী শুনবো? কোন খবর শুনতে বলছো? পরিষ্কার করে বলো।”
মেহজাবীন বেগম রাগ সামলে বললেন,
“তোকে তো ফোন করলে পাওয়াই যায় না। এখন হুট করে ফোন করে আমাদের কথা জিজ্ঞেস না করে বলছিস অয়ন কোথায়, কেন?”
জায়নের কণ্ঠে এবার শীতল আগুন দাঁতে দাঁত পিষে বলল — “মা, আমি ঠিক কী শুনেছি? বলো। কোন খবরের কথা বলছো?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহজাবীন বেগম বললেন– “তোর কাছে তো সেদিনই বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তুই শুনলি না। কালকে তিয়াশা আর অয়নের বাগদান হয়েছে। তিন দিন পর বিয়ে।”
সেই মুহূর্তে যেন জায়নের চারপাশের পৃথিবী থেমে গেল।পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যাচ্ছে,হাত কাঁপছে, ঠোঁট থরথর করছে। চোখ লাল রক্তবর্ণ, নিঃশ্বাস ভারী। নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
“কি বললে? আরেকবার বলো!”
মেহজাবীন একটু হাসিমুখেই আবার বললেন–
“তিয়াশার বাগদান হয়েছে অয়………”
সে কথার মুহূর্ত তে জায়ন এক পায়ে লাথি মারল সামনে রাখা কাচের টেবিলটায়।
“ঝনঝন” করে ভাঙল টেবিল খানা কাঁচ ছড়িয়ে গেল মেঝেতে।
ওপাশে ফোনে সেই শব্দ শুনেই আঁতকে উঠলেন মেহজাবীন বেগম –“কি ভাঙলো রে বাবা?!”
জায়ন ঠান্ডা গলায় বলল — “আমার কংক্রিটের মন।”

“কি বললি?”
“কে পারমিশন দিয়েছে এই বিয়ের?”
“আমরা সবাই , কেন রে বাবা? ইউভি বাবা কেন জানিনা এই বিয়ে পছন্দ করছে না। তুই বল অয়ন কি খারাপ?”
এই কথাটুকু শোনার পর জায়ন আর কিছু না বলেই ফোন কেটে দিলো।
এদিকে মেহজাবীন বেগম ভাবছে হয়তো তার ছেলে কে জানানো হয়নি সেই রাগে ফোন কেটেছে।
এরপর ডায়াল করলো আরেকটি নাম্বার। ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় কেউ বলল— “হ্যালো স্যার, বলুন?”
জায়ন এবার এক হাত দিয়ে চুল টেনে বলল— “তোর স্যার বলার দশা গেছে , তালুকদারদের চট্টগ্রামের প্রজেক্ট শেষ হয়ে গেছে আর আমাকে ইনফর্ম করা হয়নি কেন ? ওই কু****র *চ্চা ঢাকায় ফিরে গেছে , তাও জানাসনি?”
ওপাশের কণ্ঠ এবার অসহায় ভাবে বলল

__” “আসলে স্যার, আমি ভাবছিলাম আপনি হয়তো… এই প্রজেক্ট নিয়ে আর ”
আরও একবার গর্জে উঠলো জায়ন,
__”তোর ভাবা মাই ফুট, তোরা এক একটা অকেজো পিস। যদি তোদের সব কটাকে হসপিটাল না পাঠাই, তো এই আবরার জায়ন চৌধুরীর উপরে থুতু মারিস কসম করে বলছি।”
এসবের মাঝেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ইউভির
নাম, ফোন টা জায়ন রিসিভ করেই ইউভিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই এমন ভাবে চিৎকার করে উঠলো যে মনে হলো ঘরের দেয়াল পর্যন্ত কেঁপে চলেছে–

” দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলাম না ? কোথায় সেই দায়িত্ব?
বাড়ি বয়ে এসে এক কু***র *চ্চা তোর বোন কে আংটি পরিয়ে গেলো , তোরা কি আঙুল চুষ চিলিশ।”
এদিকে ইউভির ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে উঠছে তার ভাইয়ার এই রকম কণ্ঠস্বরে, কি করবে এখন সে ? কি করে এই লোক কে বোঝাবে? ভাইয়া কে, কে জানালো ? এই সব ভাবনার মাঝেই আবারো এক গর্জন ভেসে আসলো —
” এখন কেন বলছিস না ? আনসার মি ইউ ড্যাম ইট।
দায়িত্বর জায়গায় নিজের বোনের বিয়ে খাবার সখ হয়েছে ? সব সখ মেটাবো তোদের।”
ইউভি যে কিছু বলবে তার সাহস টুকু ও কুলিয়ে উঠতে পারছে না তবুও নিজের মন কে বুঝিয়ে একটু সাহস করে ইউভি বলে উঠলো —

” ভা ভাইয়া আমি জানতাম না, জানার পরেও তুমি তো জানো আমার কথা বাসার কেউ শোনে না । তোমাকে ও অনেক বার ফোন দিয়েছি । আমি কি করতাম বলো? ”
জায়নের কণ্ঠ এবার বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু সেই ঠান্ডার মধ্যেও বিষ ছড়িয়ে–
” বাসায় আসার আগে আধ মারা করে হসপিটাল এ
পাঠাটি।”
জায়ন এর এই কথা সোনা মাত্রই ইউভি শব্দহীন হয়ে পরল, সে কি করে কাউকে আধমারা করবে তার তো
নিজের ই হাত কাপে এইসব শুনলে সে তো তার জায়ন ভাই এর মত না ।

” যদি নিজের ভালো চাস তোকে আড়াই দিন সময় দিচ্ছি আমার জন্য সাউন্ড প্রুফ লাক্সারি বাসার ব্যবস্থা কর, প্রাইস ডাস নট মেটার। কিন্তু আমার বাসা চাই ই চাই ।”
জায়ন এর কথায় যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল
এত তাড়াতাড়ি বাসা কোথায় পাবে ? আর সাউন্ড প্রুফ বা কেন?
কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো –
” ভাইয়া সাউন্ড প্রুফ দিয়ে কি করবে , আর তুমি বাসা নেবে কেন বি ডি তে । তুমি তো এখন ইউ এস এ আছো?”
জায়ন এর রাগে চোঁখে জ্বলছে আগুন যেন জ্বালিয়ে দিবে সব কিছু ,জায়ন ঠোঁট উল্টে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে রাগ, প্রতিহিংসা আর ঠান্ডা পরিকল্পনার ছায়া —

” সেটা জেনে যাবি। ”
ইউভি আর কিছু বলে উঠতে পারলো না তার আগেই জায়ন ফোন কেটে দিলো।
চললো আরো কিছু ফোনআলাপ…
জায়নের কণ্ঠ এবার ধীর, ভারী, কিন্তু গম্ভীর শ্বাসে তোলপাড়–
” জেমস আমার ২ দিনের মধ্যেই সব প্রসেসিং শেষ করে বি. ডি. যাওয়ার ২ টো এয়ার টিকিট চাই
অ্যাট এনি কস্ট।”
” ওকে স্যার, সঙ্গে কি আমিও যাচ্ছি।”
জায়নের বিরক্তির সুর যেন ছুরির মতো কেটে গেল হাওয়ায়–
” এখানে আমার কোন বউ আছে ? যে আমি ২ টো
টিকিট করতে বলবো? নিজের জরুরি জিনিষ পত্র প্যাক করে নিও । সব ফর্মালিটিস দুদিনের মধ্যেই কমপ্লিট চাই , আই রিমাইন্ড ইউ এগেইন অ্যাট এনি কস্ট। ”
” ওকে স্যার । ”

জায়নের ফোন কেটে যাওয়ার পর থেকেই ইউভির মনে অদ্ভুত অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়াচ্ছে একপ্রকার ছটফটে উন্মত্ততায়।
প্রাণপণে নিজেকে ঠাণ্ডা রাখতে চাইছে, কিন্তু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একই প্রশ্ন–
“আড়াই দিনের মধ্যে কোথায় খুঁজে পাব এমন একটি লাক্সারি সাউন্ডপ্রুফ অ্যাপার্টমেন্ট?
তাও আবার ঢাকায়, হায় আল্লাহ, সব সময়ই কি শুধু
জবাইয়ের জন্য আমার মুখ টাই মনে পরে।
ঠিক এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো —

“আহান ভাই কলিং…”
ফোন রিসিভ করতেই ইউভি বলল–
” হ্যাঁ ভাইয়া বলো।”
” জায়ন ফোন করেছিল, বললো তোর সঙ্গে কথা বলে কোন প্রপার্টি ডিলার সঙ্গে যোগাযোগ করি জেন আমারা।,”
ইউভি অবাক হয়ে বলল —
” ভাইয়া তোমাকেও এই কথা বলেছে?
আহান একটু বিরক্ত নিয়েই একটু গম্ভির কন্ঠে জবাব
দিল —
“আমায় যা বলেছে শুনে তুই নিজেই অবাক হবি।
সে বলেছে, তার একান্ত প্রয়োজন একটি ‘সাউন্ডপ্রুফ লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট’ চাই ,
আর সেটা চাই আগামী দুই দিনের মধ্যেই।
তুই নিজেই বল, এই সময়ের মধ্যে সেটা কোথায় পাব?”
আহানের কথা শুনে ইউভি মনে মনে ভাবলো ওহ শুধু জবাই এর মুরগি আমি না আহান ভাই ও আছে এই ভেবেই এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো–

“ভাইয়া, সেই চিন্তায়ই তো আমার ঘাম ছুটছে!”
আহান আরেক ধাপ যোগ করলো–
“শুধু এইটুকু না রে ভাই।
সাগর ফোন করে বলছে, জায়ন নাকি ওকে কিছু ডকুমেন্ট ফ্যাক্স করেছে।আর বলেছে, সব ডকুমেন্ট যেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি থাকে।তোর এই ঘাড়ত্যাড়া ভাইটারে একদিন উদোম ধোলাই না দিলে কিছুই ঠিক হবে না।শালার মাথায় শুধু আগুন, আর শালার ওই আগুনে আমরা জ্বলে পুড়ে মরছি। তিয়াশার বিয়ার কথা শুনেই হাজার মাইল দূর থেকে ঝড় তুলছে। ভাই রে এত দুর দিয়া ঝড় তুলছে কাছে থাকলে কি হত”
ইউভি একটু হেসে বললো—
“কাছে থাকলে অয়ন আমাদের বাসার থেকে শত মাইল দূরে থাকতো। আর তুমি না পারবা না আহান ভাই। তুমি তাকে ধোলাই দিতে পারবা না”
আহান বিরক্ত হয়ে বলল–

“তুই আমার না পারার কথা বলছিস কেন? অবশ্য ঠিক বলছিস প্রাণের প্রিয় বন্ধু আমার।”
ইউভি হাসি সামলিয়ে গম্ভীর সুরে বলল —
“এসব বাদ দাও, আমি আকাশ কেও ডেকে নিচ্ছি।
তোমার সঙ্গে এক ঘণ্টার মধ্যে দেখা করছি।”
“হুম, তাড়াতাড়ি আয়। আমি অফিসের সামনেই থাকবো।”
কল শেষ হতেই ইউভি একদম দেরি না করে আকাশের নাম্বার ডায়াল করলো …….

তিয়াশা বিছানার কোণে একা বসে আছে, তার অনামিকা আঙুলে থাকা হীরার আংটির দিকে দৃষ্টিটা যেন থেমে গেছে।চোখে পড়ছে হীরের তীব্র ঝলক,
কিন্তু সেই ঝলকানি যেন তার হৃদয়ে নামিয়ে আনছে গভীর অন্ধকারের ছায়া। হঠাৎ কী এক তীব্র যন্ত্রণায় সে আঙুল থেকে আংটিটা খুলে ছুড়ে ফেলল মেঝেতে।
“টং” করে ধাতব শব্দ ছড়িয়ে পড়ল ঘরের নিস্তব্ধতায়।
চোখ বন্ধ করে বসে রইল তিয়াশা, বুকের ভেতর যেন জ্বলছে এক দগ্ধ আগুন। চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি নেমে এলো গাল ছুঁয়ে চিবুক পর্যন্ত।
তার মন ক্রমাগত কথা বলে চলেছে এক নিঃশব্দ যন্ত্রণায়।

“বলে তো গেছিলেন হতে দেবেন না অন্য কারো, কই গেল আপনার সেই কথা। কেন একবার এলেন না ? বাসা থেকে তো জানিয়েছে আপনাকে তাই না ? তবে কেন আটকাচ্ছেন না আমাকে কেন যেতে দিচ্ছেন । আমি আপনাকে ছাড়া কখনো জায়গা দেইনি আমার এই ছোট্ট হৃদয়ে। আত্মহত্যা যদি হারাম না হতো তাহলে আমি ওই পথ ই বেছে নিতাম , আমার পুরো টা জুড়ে শুধু আপনি বাঘের বাচ্চা। পারবো না আমি হতে অন্য কোন পুরুষের সঙ্গিনী, আমি হতে চাই আমার শখের পুরুষের বন্দিনী।”
ঠিক তখনই তার ফোনটা কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল, baby Calling…

একটু ইতস্তত করে ধরল কলটা।ওপাশ থেকে এক মুহূর্ত দেরি না করে আরোহী একনাগাড়ে চিৎকার করে উঠল–
“শয়**তানি! তোরে আমি খুন করবো! কাল থেকে তোকে কতবার কল দিছি, দেখেছিস?
তোর বিয়ের খবর আমার আব্বুর কাছ থেকে শুনতে হয়।তুই বিয়ে করছিস, ভালো কথা… কিন্তু তোর জানের টুকরাটারে জানাস না?তোর কী করে এতটা সাহস হলো, হ্যাঁ?”
তিয়াশা এতক্ষণ চুপ করে ছিল, কিন্তু আর পারল না।
চোখ র*ক্ত*বর্ণ, গলায় জমে থাকা কান্না আর কষ্ট একসাথে বিস্ফোরণ ঘটালো–
“তোদের সবার সমস্যা কি বলতো কখনো আমার কথাটা বলতেই দিস না, নিজেরাই যা ভাবিস সেটাই সত্যি করে মেনে নিস । আমি কেন ? কখনো কেন আমি আমার কথাটা রাখতে পারি না কেন তোরা সব সময় বলে যাবি আর আমি শুনবো । আমি কি মানুষ না, নাকি তোরা ভাবিস না আমি মানুষ আমি পাষান বল।”

এই বলেই সে ফেটে পড়ল কান্নায়।
হঠাৎ শক্ত একটা দেয়াল ভেঙে পড়ল যেন…
ওপাশে থাকা আরোহী প্রথমে ঘাবড়ে গেল,
তারপর কণ্ঠটা একেবারে কোমল হয়ে উঠল–
“আচ্ছা দোস্ত, সরি… প্লিজ সরি …
রাগ করিস না তুই। আমি শুনবো এবার।
প্লিজ, বেবি প্লিজ… আমার সঙ্গে সব শেয়ার কর।”
তিয়াশা ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল।কণ্ঠটা ফাটাফাটা হলেও সব খুলে বলল —

আরও কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে চলতে লাগল নিঃশব্দ কথোপকথন।
আকাশ, ইউভি আহান বসে আছে এক প্রপার্টি ডিলারের অফিসে , এর মধ্যেই আকাশের ফোনটা বেজে উঠলো … স্ক্রিনে নাম উঠলো জলপরী।
মুখে হাসি ফুটলেও এই মুহূর্তে কল তার পক্ষে রিসিভ করা সম্ভব নয় তাই সে কলটা কেটে দিল। কিন্তু তাতে কি আর রক্ষে আবারো স্ক্রিনে নাম উঠলো জলপরী,
চার বারের বার যখন ফোন কাটতে যাবে তখন ইউভি বলল —

” আর ফোন কাটলে তোর জলপরী অগ্নিপরি হয়ে উঠবে। বাইরে গিয়ে কথা বল”
আকাশ ও এবার একটু ঘাবড়েই গেল —
মনে মনে ভাবলো তার জলপরী নিজে থেকে তো তাকে কল দেয় না কখনো —
বাইরে গিয়ে ফোন রিসিভ করতেই এক চিৎকার এসে লাগলো কানে —
” এই বা**র ডক্টর ফোন ধরিস না কেন ? তোর চুল সব তুলে নেবো ।”
আকাশ যেন আরোহীর কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল, একটু ঢোক গিলেই বলল —
” জলপরী তোমার ভাষা কিন্তু দিন দিন খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে । আর বালের ডক্টর মানে নিজের হবু স্বামীকে কেউ এই ভাবে বলে।
” ওরে আমার হবু স্বামীরে, বালের স্বামী আমার প্রপোজ টা পর্যন্ত তোর দারা হয় না তুই আবার স্বামী স্বামী করছিস ।”

আরোহীর কথায় আকাশ যেন হতবাক হয়ে যাচ্ছে নয়ন জোড়া বড় হয়ে উঠেছে —
” ইস কি জঘন্য মুখের ভাষা , আগে জানলে প্রেমেই পড়তাম না । কি ভাবে তুই তুই করে বলছে ছি ছি লজ্জায় মরে যাই, আল্লাহ কি ডেঞ্জারাস মাইয়া জুটাইসে।
তবে যাই হোক আমার তো এই গালী দেওয়া জলপরী কেই চাই।”
” হুঁ আমি যেন ওনার জলপরী হাওয়ার জন্য বসে আছি। তোর লজ্জা নিয়ে বুড়ি গঙ্গায় চুবনি খা।
আর শোন তোর ভাইয়ার জন্য যদি আমার বেবি র চোঁখে পানি দেখি তাইলে তোর খবর আছে ।”
” আমি কি করলা……
কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে আরোহী কল কেঁটে দিলো —-
আকাশ মনে মনে ভাবলো —
” কি তেজ বাবা আমার বউ টার, এই তেজে তো আমি ঝলশায় জাবো কিন্তু তাও আমার ওকেই লাগবে ।”
এই বলে একটু মুচকি হেসে আবার ইউভি দের পাশে গিয়ে বসল —-

“অনু, তিয়াশা কে ডেকে নিয়ে আয় তো। ঘরোয়া বিয়ে হোক আর যাই হোক, কিছু দরকারি শপিং তো করতেই হবে। ওর বিয়ের শাড়িটা ওর পছন্দমতো কিনে দিব। তুইও যাবি, তোর চোখে তো ফ্যাশনের ভালো বোঝা আছে ।
রূহেনা বেগম চা টা টেবিলে রেখে বললেন। রূহেনা বেগম এর এই কথায় অনন্যা একটু ইতস্তত করেই বলল,
“জি, মেজ আম্মু। এখনই ডেকে আনছি। তবে… আমি আজকে যাবো না শপিংয়ে।”
এই কথা শুনেই যেন তিন বেগম থমকে গেলেন।
সবার আগে চমকে উঠলেন সুরাইয়া বেগম—
“বড় আপা, মেজ আপা আমার মেয়েটার মাথা ঠিক আছে তো? কি বলছে ও যাবে না শপিং এ ভাব যায় ।আল্লাহ্ আমার অনুটা কে রক্ষা করো।”
মেহজাবীন বেগম এবার মুচকি হেসে বললেন—
“হ্যাঁ রে ছোট, চিন্তার বিষয় তো বটেই। আমাদের অনু আম্মু শপিং না গিয়ে বসে থাকবে, এর চেয়ে অস্বাভাবিক দৃশ্য আর কী হতে পারে।”
তিন বেগমের মাঝে হেসে হেসে চলে কিছুক্ষণ খুনসুটি।
কিন্তু অনু হাসছে না।

সে জানে, এই মুহূর্তে শপিংয়ে যাওয়ার চেয়ে বড় যন্ত্রণা তার আপুর মনে চলছে।সে জানে, তিয়াশার চোখের পেছনের লুকানো কান্না, আর ঠোঁটের নিচে এক অমোচনীয় অভিমান বাসা বেঁধেছে। অনু তো চায় না তার তিয়াশা আপু বিয়ে করুক ওই উড়ে এসে জুড়ে বসা অয়ন নামের ব্যক্তিকে যতই সে বড় আম্মুর ভাতিজা হোক ।
তার মন চায়, তিয়াশা আপু মাথা রাখুক শুধু তার জায়ন ভাইয়ার বুকেই, যে ওর সমস্ত ভালোবাসার প্রাপ্য।
এই ভাবনাগুলো মাথায় নিয়ে সে চলে গেল তিয়াশার রুমে।
গিয়ে দেখে একটা হীরের আংটি মেঝেতে পড়ে আছে।
তিয়াশা চুপ করে বিছানার এক কোণায় বসে আছে, চোখে গভীর ক্লান্তির ছাপ।
অনু ধীরে বলল,

“তিউ আপু…”
তিয়াশা ধীরে ফিরে তাকাল, গলা ভার করা–
“হুমম, বল।”
আরোহী তিয়াশা কে দেখে ঠিক বুঝতে পারছিলো
তার তিউ আপু এতক্ষণ ধরে কান্না করছিল কারণ তার চোখ গুলো এখনো চোখের পানিতে ভেজা।
আরোহী কি করে তাকে শপিংয়ে যাওয়ার কথা বলবে। কিন্তু তাকে তো বলতেই হবে নইলে আবার মেজ আম্মু আম্মুর বকা শুনতে হবে।
মনে মনে ভাবছে ইস তার তিউ আপু আগে কত চঞ্চল ছিল, পুরো বাসা মাতিয়ে রাখতো। আর এখন সেই তিউ
আপুর নিস্তব্ধতা ছেয়ে থাকে পুরো বাসায়।
আরোহী তিয়াশা কে দেখে ঠিক বুঝতে পারছিলো
তার তিউ আপু এতক্ষণ ধরে কান্না করছিল কারণ তার চোখ গুলো এখনো চোখের পানিতে ভেজা।
আরোহী কি করে তাকে শপিংয়ে যাওয়ার কথা বলবে । কিন্তু তাকে তো বলতেই হবে নইলে আবার মেজ আম্মু আম্মুর বকা শুনতে হবে।

মনে মনে ভাবছে ইস তার তিউ আপু আগে কত চঞ্চল ছিল, পুরো বাসা মাতিয়ে রাখতো। আর এখন সেই তিউ আপুর কেউ টু শব্দটি এই বাসায় পায় না।
“কি হল বল?”
অনু ফিরে এলো তার ভাবনার জগত থেকে–
“তোমায় মেজো আম্মু ডাকছে, তোমার বিয়ের শপিং করতে যাবে তার জন্য।”
তিয়াশা মুখ ঘুরিয়ে জবাব দিল–
“তোর মেজ আম্মুকে বলে দে আমার মাথা ব্যাথা করছে আমি যাব না।”
অনু জানে তার না যাওয়ার কারণ কিন্তু এখন যদি না যায় তাহলে আবার মেজ আম্মু চেঁচামেচি করবে।
” কিন্তু আপু?”
“কোন কিন্তু শুনতে চাচ্ছি না তুই যা আমাকে একটু একা থাকতে দে।”
অনু আর কিছু বলল না, তিয়াশার রুম ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল নিচের ড্রয়িং রুমে। মেজো আম্মুকে দেখতেই বলল–

“মেজ আম্মু আপু যাবে না, আপুর মাথায় যন্ত্রণা করছে তাই সে যাবে না।”
রুহেনা বেগম কপাল কুচকে বলল–
“এখন হঠাৎ মাথা যন্ত্রণা কেন হল আমি নিজে গিয়ে দেখছি।
এই বলে পা বাড়াতেই যাবে তখন সুরাইয়া বেগম বললো–
“মেজ আপা হয়তো সত্যিই মাথা যন্ত্রণা করছে তুমি আর চেঁচামেচি কোরো না সময় তো আর বেশি নেই আমরাই গিয়ে কেনাকাটা করে আসি ওর বিয়ের শাড়ি নিয়ে আমরাই পছন্দ করে আনবো।
সুরাইয়া বেগম আবারো মেহজাবিন বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন —
“কি বলো বড় আপু?”
মেহজাবিন বেগম ও বললেন–

“হ্যাঁরে মেজ ছোট ঠিকই বলছে। চল আমরা গিয়েই কিনে আনি।
এর মধ্যেই রায়ান কোথা থেকে বাড়ি ফিরছিল তখন সুরাইয়া বেগম বললেন–
” রায়ান আমাদের একটু শপিংমলে নিয়ে চল না।”
রায়ান একটু কপাল চুলকে বিরক্ত হয়ে বলল–
” আম্মু তোমরা কি আমায় ছাড়া শপিং করতে পারো না। যখন ই যাবে আমাকে পেছন পেছন নিয়ে যাবে । তোমাদের এই মহিলা শপিং এ না আমার মোটেই ভাল লাগেনা আমি যাব না তোমরা যাও তো।”
রায়ানের কথা শুনে এবার মেহজাবীন বেগম নরম গলায় বললেন–
“ছোট বাবা চল না নিয়ে কেউ যাচ্ছে না তুই চল বাবা নিয়ে।”
বড় আম্মুর কথা এই বাড়ির কোন বাচ্চারাই ফেলতে পারে না তাই শেষমেষ রায়ানের তার আম্মুদের সঙ্গে যেতেই হল।

আজ মঙ্গলবার। সময় তখন সকাল এগারো টা বেজে দশ
আমেরিকার শীতল এক সকালের আলতো রোদ যেন এয়ারপোর্টের কাঁচঘেরা জানলা বেয়ে পড়ে আছে রানওয়ে’র ধারে। পাতাঝরা গাছের সারি, দূরে উঁকি মারা ধোঁয়ামাখা পাহাড় আর নীলাভ মেঘের ভাঁজে হিমেল হাওয়ার আনাগোনা, সব মিলিয়ে যেন বিদায়ের নিঃশব্দ এক চিত্রকাব্য।
জায়ন ও জেমস প্রায় দেড় ঘন্টা পর বোর্ডিং পাস ও অন্যান্য ফরমালিটিশ শেষ করে বিজনেস ক্লাসের সিটে এসে বসেছে। উজ্জ্বল আলো-ছায়ার মধ্যে জানলার পাশে বসে জায়ন চুপচাপ তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে। প্লেনের ডানা তখনো স্থির, কিন্তু সময় এর সঙ্গে সঙ্গে যেন জায়নের মন ভেতরে ভেতরে এক ভয়ঙ্কর ঝড় বইয়ে চলেছে।
এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করলো সে।
তারপর ধীরে জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে চাপা গম্ভির কণ্ঠে বলল—

“সময় মতো পৌঁছে দিও আমাকে… আমার ডেস্টিনিতে।
সবার মস্তিষ্ক ঠিক করতে আমায় সময় মত পৌঁছাতে হবে।
দূরে আকাশে তখন সাদা ধোঁয়ার রেখা টেনে উড়ে যাচ্ছিল আরেকটি প্লেন,
ঠিক যেন জায়নের ভেতরের দুঃখগুলো আকাশে উড়ে যাচ্ছে,
তার খুব চেনা গন্তব্যের দিকে।
কিন্তু তার এই অকস্মাৎ আগমনের কথা কারো জানা নেই —

সকালের আলো যেন আজ একটু অন্যরকম। গুলশানের চৌধুরী বাড়িতে সূর্য উঠে এসেছে এক ঘন মেঘমালা পেরিয়ে, যেন আগাম কিছু জানিয়ে দিতে চায়। বাড়ির উঠোনে মাঝে মাঝে রোদের ফালি এসে পড়ছে আবার কোথাও কুয়াশার হালকা আস্তরণ, হালকা হাওয়ায় ওড়না উড়ছে, আর পুকুরপাড়ে বসানো ফুলের তোড়াগুলো বাতাসে হেলে পড়ছে বারবার।
ভোরের আজান পড়ার পর থেকেই বাড়ির বড়দের ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে।
সময় নয়টা বেজে ষোল বাইরে যেখানটায় রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখান থেকে ভেসে আসছে জিরে, এলাচ আর ঘি-র মুগ্ধ করা গন্ধ। কড়াইয়ে চড়ছে গাজরের হালুয়া, হাঁড়িতে বসেছে খাসির রেজালা। যেন সকালটা নিজের ভাষাতেই বলে দিচ্ছে আজ এই বাড়ির বিয়ে।
চৌধুরী বাড়ির মেজো মেয়ে, তিয়াশা, আজ কনে। কিন্তু তার মুখে নেই কোনো বৌ-সাজা উচ্ছ্বাস, নেই কোনো কৌতূহল।

বাড়ি এখন আত্মীয়স্বজনের পদচারণায় মুখর।
সুরাইয়া বেগমের বোন এসেছেন স্বামী সহ দুই মেয়েকে নিয়ে , ঊর্মি সূর্মী আগের মতো ছোট নেই, এখন একটু বড় হয়েছে।
কেউ কেউ কোথাও বসে কনে সাজানো নিয়ে আলোচনা চলছে, কেউ আবার ভিডিও করতে করতে বলছে,
“এই কোণটায় সেলফি তুললে আলোর রিফ্লেকশন ভালো আসে।”
রূহেনা বেগমের ভাই মাসরুফ সাহেব এসেছেন স্ত্রী ও মেয়ে নেহাকে নিয়ে। নেহা সদ্য ভার্সিটি শেষ করেছে। ওর ভাই রিক এবার আসতে পারেনি, এক মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির চাকরির কারণে পাড়ি জমিয়েছে জার্মান।
আয়েশা বেগম, আশরাফ খান, মারিয়া, আকাশ গত রাতেই এসে গেছে । কিন্তু আকাশ ইউভিড় সঙ্গেই অসহায়ের মত দাড়িয়ে আছে ইউভির ঘরের বেলকনিতে। তাদের ও যে জায়ন ঠিক ঠাক কিছু জানায় নি, তাদের জানাই নেই কেউ একজন ঝড় হয়ে আসতে চলেছে ।

আরোহী রাও উপস্তিত থাকবে যতই হোক বান্ধবীর বিয়ে মন খারাপের মাঝেও বান্ধবীর সঙ্গে তো তাকে থাকতেই হবে । তাছাড়া আরোহীর আব্বু আর তিয়াশার আব্বু দুই বাল্য কালের কাছের বন্ধু ঠিক আরোহী তিয়াশার মত
আর বাকি কিছু মেহমান দের নিয়েই সন্ধ্যায় আয়োজিত হবে পারিবারিক ভাবে বিয়ে অয়ন ও তিয়াশার বিয়ে।
তিয়াশা আজ নিজের ঘরের বিছানার এক কোণে বসে আছে চুপচাপ। চোখে ঘুম নেই, মুখে রঙ নেই, ভেতরে শুধু এক জমাটবাঁধা কষ্ট। আয়নার সামনে রাখা তার কনের বেনারসি, গয়নার বাক্স সবই তার দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ সে চোখ ফিরিয়ে রাখছে।

চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িংরুমের কাজ করা ভারী সোফায় বসে আছেন তিন কর্তা,প্রান্তিক সাহেব, প্রণয় সাহেব আর তাহসান সাহেব ও আশরাফ খান ও মসরফ সাহেব। ঘরের এক কোণ থেকে নরম আলো এসে পড়ছে, জানলার ওপাশে গুলশানের রাস্তা, সকাল বেলার ব্যস্ততা আর মাঝে মাঝে ভেসে আসছে অতিথিদের আগমনের শব্দ।
প্রান্তিক সাহেব হাতে কফির কাপ নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন—
“সময় চলে যাচ্ছে ভাই, ভাবতেই পারছি না তিয়াশা আম্মু এত বড় হয়ে গেছে। মনে পড়ে, একদিন স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েছিলাম… আজ ওর বিয়ে।”

প্রণয় সাহেব একটু হাসলেন, তবে সেই হাসিতে যেন একরাশ ভার—
“হ্যাঁ, সত্যি আমার মেয়েটা বড় হয়ে গেছে। কিন্তু এই সবকিছু যেন একটু হঠাৎই না হয়ে গেল? যতই আজ ওরা বাসায় না তুলুক কিন্তু আমার মেয়েটা তো পর হয়ে গেল বড় ভাই।
আর এদিকে জায়ন ও আসলোনা বিয়ে তে, সত্যি ছেলেটা না দিন দিন এই বাসার মায়া হয়তো ত্যাগ করছে।
প্রান্তিক সাহেব কফি চুমুক দিতে দিতে বললেন–
“ওতো যবে থেকে ওর ওই গেমিং প্রজেক্টের কাজে হাত দিয়েছে তবে থেকে ওর যে বাসা আছে সেটাই ভুলে গেছে। ওকে তো আর ফোন করা হয়নি তোর ভাবি ও জানিয়েছে সে কিছু বলেনি । তাই আজ খুশির দিনে ওর কথা না ভেবে এই খুশির মুহূর্তগুলোকে আনন্দ কর।
তাহসান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন–

” যাইহোক বড় ভাই ও তো আমাদের বাসার বড় ছেলে কি করে ওকে উপেক্ষা করে এত বড় অনুষ্ঠানে আমরা আনন্দ করতে পারি সেটা তো আর সম্ভব নয়, আমি অবশ্য অনেকবার ফোন করেছি কিন্তু সে তো ফোনই ধরে না কি আর করব । তাছাড়া সব কিছু ঠিকঠাকই আছে, অয়ন ভালো ছেলে। আমাদের তিয়াশা আম্মু সুখেই থাকবে”
“আমার বড় ছেলেকে রেখে এত বড় একটা অনুষ্ঠান করছো বাড়ির মেজো মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ , এটা কিন্তু ঠিক হলো না ভাবীরা।”
আয়েশা বেগমের কথায় রুহেনা বেগম বললেন —
“আমিও ঠিক এক কথাই বলেছিলাম কিন্তু বড় ভাইয়া তো এক কথারই মানুষ শুনলো কোথায়। আমারও ঠিক মনটা মানছে না আমি তো ফোন করে জায়ন কে আসতেও বললাম সে তো কিছু বলল না কি একটা বলে ফোনটা কেটে দিলো। ”

মেহজাবীন বেগম ও জায়ন এর সঙ্গে এ
সেই দিনের কথোপকথন জানালো, তারও মনটা ভালো নেই নিজের ছেলের এই বাসা থেকে দূরত্ব বজানো টা।
এদিকে অনু রায়ানের কান টেনে বলল —
“এত ফড়িং এর মত লাফাচ্ছিস কেন?
রায়ান একটু রেগেই বললো
“আরে শাকচুন্নি লাগছে আমার, সকাল থেকে ই আমার বাঁ চোখটা লাফাচ্ছে তাই লাফাচ্ছি আমিও।
অন্য একটু হেসে বলল–

“হ্যাঁ তোকে ভূতে ধরেছে তো তাই।”
রায়ান এবার কি মনে করে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলল–
“আমাকে ভুতে ধরবে কেন আমাকে তো এক শাকচুন্নি অন্য কিছু তে ধরবে।”
এর মধ্যেই দুজনের কানেই এসে ভাসলো এক কণ্ঠস্বর—
“রায়ান ভাইয়া এই দিকে এসে বাক্সটা খুলে দাও না আমি খুলতে পারছি না।”
অনু একটু মুচকি হেসে বলল–
“যা তোর ডাক এসেছে।”
রায়ান ওর দিকে তাকিয়ে জবাব দিল–
“শয়***তানি ডাক এসেছে আমিও শুনেছি তোকে বলতে হবে না বদমাইশ কোথাকার।”
এই বলেই রায়ান ছুটে গেল মারিয়ার দিকে —
মারিয়া আবারও বলল–
“এই বাক্সটা খুলে দাও তো রায়ান ভাইয়া ।”
রায়ান একটু হাসতে হাসতে বলল —
“আমার কাছে সব বাক্সের চাবি আছে বুঝলি শাকচুন্নি, ফিউচারে যদি কোন বাক্সের তালা খুলতে হয় তো আমাকেই ডাকবি।”

অল্প বয়সী কিশোরী মারিয়া রায়ানের কথা বুঝতে না পেরে মাথা চুলকে বললো–
“আরে বাবা আপাতত এই তালা তো খোলো আর কোন তালা খোলার দরকার হবে না।”
আরোহী, অনন্যা, নেহা আর মারিয়া তখনও ব্যস্ত তিয়াশাকে বিয়ের কনে রূপে সাজাতে।
তিয়াশার মুখে লাল গারো লিপস্টিক, কপালে টিপ, মেরুন বেনারসিতে ঢাকা তার শরীর ,যেন এক জীবন্ত মূর্তি। মাথায় চেলি ওড়নার স্নিগ্ধ ছায়া, শরীর জুড়ে
গয়নায় মোড়া, কানে ঝুলছে ঝুমকা।
কতটুকু যে কষ্ট, মনভাঙা, বেদনা সবকিছুর পরও আজ তাকে এক কথায় তাকে মায়াবী পরী লাগছে।
চারজনের মুখ থেকে একসাথে বেরিয়ে এলো–
“মাশাল্লাহ।”

এইদিকে নিচে চৌধুরী বাড়ির ড্রইং রুমে বিয়ের প্রস্তুতি একেবারে শেষ ধাপে,
অয়ন দের বাসার পক্ষ থেকে এসেছে চার-পাঁচজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সবাই খুব খুশি, হাসিখুশি পরিবেশ।
অয়নের মুখে আজ এক আলগা তৃপ্তি, যেন এক লম্বা সময়ের প্রতীক্ষা শেষের দিকে।বাড়ির কর্তারা অতিথিদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
সবার দৃষ্টি তখন অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত,শরবত, পিয়াজু, কাবাব, চাটনি দিয়ে সার্ভ করা হচ্ছে সবার হাতে।
কৃত্রিম আলোয় ফুটে উঠেছে চৌধুরী বাড়ি সবার মনেই এক নতুন আলোর বাতি জ্বলেছে —
এদিকে কাজী সাহেব ও উপস্তিত হয়েছেন।
কিন্তু ইউভি আকাশ না চাইতেও এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, বোনের বিয়ে না চাইলেও থাকতে হবে।
চৌধুরী বাড়ির এই আনন্দের মাঝে শান্ত আকাশে যেন হঠাৎই বিদ্যুৎ চমকে উঠলো।
সবার অজান্তেই, ঝড়ের গতিতে সদর দরজার ভারী পাল্লাটা পার হয়ে কেউ ড্রইং রুমে প্রবেশ করল যার উপস্থিতি নজর কারা ও ভয়াবহ।

আলোর অভিমুখে দাঁড়িয়ে গেলেন একজন অপরূপ, দুর্দান্ত পুরুষ ,
ছয় ফুটের উপড়ে লম্বা সুঠাম কৃত্রিম দেহ , চুল ব্যাকব্রাশ করা ,
চোখে হালকা সাদা ফ্রেমের চশমা, উজ্জ্বল গায়ের রঙে তার উপস্থিতি যেন অদৃশ্য বাতাসকেও স্পর্শ করলো।
পরনে সাদা ইন করা শার্ট আর কালো ট্রাউজার, কব্জিতে চকচকে রিস্টওয়াচ–
কিন্তু যেটা সবার দৃষ্টি আটকে রাখলো, সেটা ছিল তার হাতে ধরা “” কাঠের চেলাকাঠ।””””
কোণের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইউভি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো—-

তোমার ছোঁয়ায় আসক্ত আমি পর্ব ৩১

“ভাইয়া!”
তার কণ্ঠে ছিল অবাক হওয়া, বিস্ময়, এবং… গভীর এক প্রত্যাশার পূর্ণতা-
আকাশ আর ইউভি বুঝে গেল
ঝড় এসে গেছে।

তোমার ছোঁয়ায় আসক্ত আমি পর্ব ৩৩