দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৭ (২)
আনায়া আফরিন
দেশের অবস্থা এখনো তেমন একটা ভালো না।মেয়েরা এখনো নিখোঁজ হচ্ছে।তাই আজ স্বয়ং আলতাফ সাহেব এসেছেন মেয়েকে নিয়ে যেতে।রুদ্ভিকা চলে গিয়েছে বাসায়।ফিহাও এসে দাড়িয়েছে আফরিনের সাথে।আফরিনের আর ক্লাস করতে ইচ্ছা করছিলো না।তাই সে বেরিয়ে গিয়েছে।তবে ভাইদের ফোন দেয়নি।বাসায় জানে ক্লাস শেষ হতে আরো ১ ঘন্টা বাকি।ফিহা ক্যান্টিনে।আফরিন বললো-
“ফিহা আমি গেইটের সামনে দাড়ালাম।তুমি এসো।অপেক্ষায় থাকবো।”
ফিহা-“আচ্ছা আপু!”
ফিহা একটু চুপ থেকে জিজ্ঞাসা করলো-
“আজ এরিদ ভাই আসবে না তোমাকে নিতে?”
আফরিন-“হ্যাঁ সময় হলেই সে আসবে!”
ফিহা-“আচ্ছা আমি আসছি তুমি যাও!”
আফরিন গেইটের সামনে এসে দাড়াতেই আচমকা একজনের মুখোমুখি হলো।হয়টা মানুষটা তার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে ছিলো।আফরিন দেখে একটু অবাক হলো।আরশের হাতে ব্যান্ডেজ।কপালটাও ব্যান্ডেজ করা।ঘাড়ে অজস্র কাটা দাগ।পা দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে আফরিনের কাছে আসলো।আফরিনের মনে পড়লো সেই রাতের কাহিনি।এড়িয়ে সামনে যেতেই আরশ রাস্তা আটকালো-
“আফরিন একটু শুনো!”
আফরিন এবার একটু রাগ দেখিয়ে বললো-
“কোন মুখে এটা বলছেন আরশ?ল*জ্জা নেই আপনার?”
আরশ-“না নেই!”
আফরিন-“বোঝাই যাচ্ছে!”
আরশ-“আমাকে একটা বারের জন্য মাফ করা যায় না আফরিন?”
আফরিম তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো!বললো-
“মাফ?আপনাকে?আপনি আমার কেউ নন,তাই মাফ করার প্রশ্ন উঠছে না!”
আরশ-“তুমি না আমাকে ভালো বাসতে?”
আফরিনের নিজের প্রতি বড্ড আফসোস হলো।মরীচিকার পছনে ছুটেছে সে।আফরিন বললো-
“কখনো বলিনি আমি!”
আরশ-“অথচ আমি বলেছি।তুমি ভালোবাসোনি আমাকে কিন্তু আমি বেসেছি!”
আফরিন-“আপনি শতবার ভালোবাসি বলেও ভালোবাসেননি আমায়,অথচ আমি কখনো না বলেও নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছি আপনাকে!”
আরশ-“তবে ক্ষমা করো আমায়।আমি সব বাবার কথায় করেছি।জানো তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমিও কষ্ট পাচ্ছিলাম!”
আফরিন আরশের মুখে নুন্যতম অনুতপ্তবোধও দেখলো না।
আফরিন-“রাস্তা ছাড়ুন আরশ!”
আরশ-“আমি তোমার জন্য অনেক কেদেছি সেদিন”
আফরিন-“হাসি পেলো বড্ড।আমার ধ্বং*স হয়ে যাও হৃদয়ের আকুতি শুনেও যে পুরুষের মন টলেনি,সে পুরুষের চোখ দিয়ে নাকি আমার জন্য পানি পড়েছে!”
আরশ-“বিশ্বাস ক……”
আফরিন-“বিশ্বাসের মর্যাদা আপনাদের মতো মানুষরা দিতে পারে না!”
আরশ-“কিন্তু…..”
আফরিন-“আপনার এই অবস্থা কেন?কোন মায়ের বুক খালি করতে চেয়েছিলেন আবার?”
আরশ মাথা নিচু করে বললো-
“তোমার ভাইয়েরা করেছে এই অবস্থা!”
আফরিন অবাকের চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছালো।তার ভাইয়েরা?তার ভাইরা কাউকে এইভাবে মার*তে পারে?আফরিন বুঝলো এবার কেন এরিদ তাকে গাড়িতে তখন সেকথা বলেছিলো।আরশ বললো-
“দেখেছো কীভাবে মে*রে*ছে?তুমিও অবাক হয়েছো!”
আফরিন হেসে বললো-
“আমি অবাক হয়েছি আপনি বাচলেন কী করে?প্রসঙ্গ যখন আমার তখন আমার ভাইয়েরা তো স্বয়ং নিজেদের কথাও ভুলে বসে সেখানে আপনাকে বাচিয়ে রাখলো কেন তারা?”
আরশ এই উত্তরের জন্য প্রস্তুত ছিলো না।সে হা করে তাকিয়ে রইলো।আফরিন বলে উঠলো-
“আমি ভুল মানুষকে ভালোবেসেছি আজ বুঝলাম।আপনি ভুলে গিয়েছেন আমি আপনার চোখ পড়তে পারি।আজও পড়েছি।এই চোখে কোন অনুতপ্ততা নেই।আছে কেবল হিং*স্র*তা!”
আরশ-“ভুল দেখছো তুমি!”
আফরিন-“এতোদিন ভুল দেখেছি।আজ সঠিক দেখলাম!”
আরশ আর কিছু বলতে যাবে তখনই ফিহা এসে বললো-
“আফরিন আপুউ!”
আফরিন দ্রুত সরে গেলো।ফিহা বললো-
“এরিদ ভাই এসেছে পিছনের গেইটে দাঁড়িয়ে আছে।”
আফরিন “আসছি” বলে একবার আরশের দিকে তাকালো।তারপর চলে গেলো।আরশের শরীর রা*গে কাপতে লাগলো।
অন্যদিকে-
এরিদ আফরিনকে জিজ্ঞাসা করলো-
“বের হয়েছিস কখন? ”
আফরিন নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বললো-
“এইতো কিছুক্ষণ হলো ভাইয়া?”
এরিদ-“আয় বস গাড়িতে”
ফিহা তাকিয়ে রইলো।আফরিন ফিহাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো।ফিহা এখনো গাড়িতার দিকেই তাকিয়ে আছে।সরু রাস্তার মিশে যাচ্ছে গাড়িটা।ফিহা বিড়বিড়িয়ে বললো-
“একবার তাকালেনও না আপনি।আপনাকে এক নজর দেখার জন্য সেই কখন থেকে অপেক্ষায় আছি।”
আজ এরিকের হসপিটালে অনেক কাজ ছিলো।হসপিটালে আসার সময় এরিক দেখলো একজন লোকের হাত পুরো কে*টে গিয়েছে।লোকটার র*ক্ত দেখে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে।সাথে একটা ১২/১৩ বয়সী মেয়ে আছে।মেয়েটার বাবা হয়তো।আশেপাশের কেউই লোকটাকে ধরছে না!এরিক লোকটার কাছে গেলো।লোকটার চিকিৎসা করালো।তার মধ্যে তার আজকের কিছু রোগীর অবস্থা বেশ শোচনীয় ছিলো।তাদেরকে দেখতে হয়েছে।সারাদিন এমন ক্লান্তিতেই গিয়েছে।এখন নিজের চেম্বারে ফিরে আসার সময় তার সহচারী বললো-
“স্যার আপনার মোবাইলটা!”
এরিক এপ্রোন টা খুলে তার সহচারী রাতুলের হাতে দিয়ে বললো-
“হ্যাঁ দেও!কেউ কি কল দিয়েছিলো?”
রাতুল-“জ্বি স্যার।রাজনন্দিনী নামের একজন প্রায় ২০ বারের বেশি কল দিয়েছে!”
এরিক মাথায় হাত দিয়ে বললো-
“বলো কি?ও এতো গুলো কল দিয়েছে?কিছু হলো নাকি আবার তার?”
এরিক কল ব্যাক করতে নিলেই রাতুল বলে উঠলো-
“স্যার ভিতরে একজন ম্যাম অপেক্ষা করছে।পরিচয় জানিতে চাইলো সে বললো সে আপনার স্ত্রী।নাম মেহের।আপনি বলেছিলেন একদিন নাম।তাই সে ভিতরে সেই বিকাল থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে!”
এরিক অবাক হলো।তার চেম্বারে মেহের আছে। তার রাজনন্দিনী।তার জন্য অপেক্ষা করছে।সে দ্রুত চেম্বারে প্রবেশ করলো।সেখানে একটি ছোট্ট রুম সংযুক্ত আছে।এই হসপিটালের প্রতিটি মেইন ডাক্তার দের চেম্বারদের সাথে একটি ছোট্ট রুম যুক্ত আছে।এরিক নিজের রুমটাতে যেয়ে দেখলো সেখানে মেহের ঘুমিয়ে আছে।ইশারায় রাতুলকে চলে যেতে বলতেই রাতুল বেরিয়ে গেলো।এরিক মেহেরের কাছটায় গিয়ে হাটু গেড়ে বসলো।মুখের সামনে এসে থাকা চুলগুলো আলতো করে হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো।কারো স্পর্শ পেতেই মেহেরের ঘুম ভেঙে গেলো।একবারে মুখের কাচগে এরিককে দেখে লাফ দিয়ে উঠে বসলো।এরিক জিজ্ঞাসা করলো-
“ঠিক আছো তুমি?”
মেহের চিন্তিত গলায় বললো-
“হ্যাঁ আমি তো ঠিক আছি।আপনি ঠিক আছেন?আমার কল ধরেনি কেন?কোথায় ছিলেন আপনি?কতো গুলো কল দিয়েছি দেখেছেন?আমার চিন্তা হচ্ছিলো আপনার জন্য?”
এরিক ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসা করলো-
“আমার জন্য চিন্তা হচ্ছিলো কেন?”
মেহের-“আপনি কল ধরছিলেন না।আবার আজকে সারাদিন আমাকে কলও করেননি একটা!”
এরিক এবার মজা করে বললো-
“আমাকে মিস করছিলে বুঝি?”
মেহের আবার বললো-
“কল ধরছিলেন না তাই চিন্তা হচ্ছিলো!”
এরিক-“যাক শুনে খুশি হলাম কেউ আমার জন্য এতোই চিন্তিত যে আমার চেম্বারে এসে পড়েছে আমার খোজ নিতে!”
মেহের এবার একটু অভিমানী সুরে বললো-
“হাটু ব্যাথা করছে না?কখন থেকে এভাবে বসে আছেন!”
এরিক এবার হেসে বললো-
“তোমার স্বামীর তুমি পাশে থাকলে সব ব্যাথা-দুঃখরা চলে যায়।”
মেহের চুপ হয়ে গেলো।এই কথা প্রেক্ষিতে কিছু বললো না।এরিক আবার বললো-
“আজ সারাদিন অনেক কিছু হয়েছে।শুনিবে তুমি সব?”
মেহের-“হ্যাঁ সব শুনবো।আগে বলুন কিছু খেয়েছেন?”
এরিক-“কাজের চাপ আজ এতোই বেশি ছিল যে কিছু করার সময়-ই পাইনি।আর ফোনও আমার কাছে ছিলো না।তুমি কি রাগ করেছো?”
মেহের-“আরেহ না না।আমার বড্ড চিন্তা হচ্ছিলো আপনাকে নিয়ে।”
এরিক দেখলো মেহেরের মুখটা শুকিয়ে আছে।জিজ্ঞাসা করলো-
“তুমি খাওনি?”
মেহের কিছু বললো না।এরিক অবাক হয়ে বললো-
“তুমি কিছু খাওনি?তুমি তো সকালেও খাওনি!তার মানে সারাদিন না খেয়েছিলে?এটা ঠিক না রাজনন্দিনী!”
মেহের-“আপনিও তো খাননি!”
এরিক স্তব্ধ হলো।মনে মনে বললো-
“মানুষের প্রথম ভালোবাসা নাকি ভুল মানুষের সাথে হয়।অথচ আমার টা পৃথিবীর সেরা দ্বিতীয় নারীর সাথে হয়েছে।আমি রোগীর রোগ নিরাময় করতে পারলেও আমার রোগ নিরাময়ের ঔষুধ একমাত্র আপনি রাজনন্দিনী!”
মেহের-“কি হলো?”
এরিক-“চলুন আজ আমরা বাহিরে ডিনার করবো।তারপর সেখান থেকে লং ড্রাইভে যাবো!”
মেহের শুনে খুশি হলো।বহুদিন বাহিরে যাওয়া হয়না।আজ যাবে।কি দারুণ অনুভুতি হচ্ছে তার।মেহের নিজের চুলগুলো ঠিক করে এরিকের সাথে বের হয়ে গেলো।তারা সামনের একটা রেস্টুরেন্টে খেলো।তারপর সেখান থেকে বের হলো লং ড্রাইভে!এরিক এক হাত দিয়ে ড্রাইভ করছে।মেহের দৃষ্টি আবদ্ধ হলো এরিকের পানে।মেহের মনে মনে ভেবে উঠলো-
“আমি হেরে গিয়েও জিতে গেলাম।মানুষ বা*জেভাবে হেরে গিয়েও কীভাবে যে এমন সুন্দর ভাবে জিততে পারে তাই আমি আমার শুদ্ধ পুরুষকে পেয়ে বুঝলাম!”
এরিক গান ছাড়লো।এক হাতে সে ড্রাইভ করছে আরেকটা হাত দিয়ে ধরে রেখের মেহেরের হাত।গান চলছে-
“আমার পোড়া কপালে,
আর আমার সন্ধ্যে সকালে,
তুমি কেনো এলে জানি না এখনো!”
“তোর ছায়ার সঙ্গী হবো,
দগ্ধ প্রেমানল পর্ব ২৭
দু’হাতে প্রেম কুড়াবো!
আমাকে চুপটি করে,
মনের কথা বলতে আয়!”
“আমি যেতে পারি,
হেসেই পেরোতে পারি,
অনেক অনেক অতল!”
“তোর কথা উঠে,
আমার কপালে জুটে,
দারুণ খুশির দল!”
“কে তুই বল,
কে তুই বল?”
