দাহশয্যা পর্ব ৪৬
Raiha Zubair Ripti
ভোরের আজান কানে আসতেই ঘুম ভেঙে যায় মেহরিনের। আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেলে পাশে তাকাতেই দেখতে পেলো সোলেমান নেই। মেহরিনের ভ্রু কুঁচকে আসলো। কই গেলো লোকটা? মেহরিন বিছানা ছেড়ে উঠলো। লম্বা চুল গুলো হাত খোঁপা করে ওজু করার জন্য ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে দেখলো সোলেমান বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুল হবে। সোলেমান কিছু পোড়াচ্ছে। কি পোড়াচ্ছে?
মেহরিন ওজু করে এসে নামাজ টা সেরে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে আসলো। সদর দরজা পেরিয়ে বাগানের কাছে এসে সোলেমানের পেছনে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো সোলেমান হাতে থাকা একটা বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ছিঁড়ে আগুনে ফেলছে। বইয়ের নাম টা খেয়াল করতেই দেখতে পেলো মেহরিনের সবচেয়ে পছন্দের একটি বই। মেহরিন একটু অবাকের সাথেই জিজ্ঞেস করলো—“ বইটা কেনো পোড়াচ্ছেন?”
সোলেমান কিছুটা চমকালেও মেহরিন কে তা বুঝতে দিলো না। সোজা থেকেই বলল—“নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বইটা। সেজন্য পুড়িয়ে ফেলছি।”
মেহরিন ফের বইটায় চোখ বুলালো—“ কিন্তু বইটা তো নতুনের মতই লাগছে।”
—“ নতুন মনে হলেও এর ভেতর টা নষ্ট। সেজন্য পুড়িয়ে ফেলাটাই সঠিক মনে হলো।”
–“ওহ্ আচ্ছা। ”
–“হুম। উঠলে কখন?”
—·“একটু আগেই।”
–“ব্যথা কমেছে?”
–“হুমম,আপনার?”
—“আছে কিছুটা।”
—“চলুন ঔষধ লাগিয়ে দেই।”
—“ হুমম।”
সোলেমান বইটা ধরেই এবার আগুনে ফেলে দিলো। ঐ মেয়ের কোনো কিছু সে এই জীবনে রাখবে না। সেদিন সব পোড়ানোর পরও এই ছবি আর বইটা রইলো কি করে? যতসব আজাইরা।
ঐ ফালতু মেয়েকে কেনো মনে করতে গেলো সে হঠাৎ এত গুলো বছর পর? ও ম’রে যাক তাতে সোলেমানের কি? প্রেমার অস্তিত্ব ততদিন ই ছিলো যতদিন প্রেমার সাথে তার সম্পর্ক ছিলো। এখন তার জীবনে শুধু মেহরিন আর মেহরিন। মেহরিন ব্যতিত আর কোনো নারীর ঠাই তার জীবনে নেই। নিজের ভুল টা বোঝার সাথে সাথেই ভোর হতেই প্রেমার ছবি আর প্রেমার দেওয়া বইটা পুড়িয়ে ফেলেছে। ঐ ঠকবাজ, ছলনাময়ী নারী যেনো আর না আসে তার মস্তিষ্কে।
সোলেমান বউয়ের পেছন পেছন রুমে আসলো। মেহরিন সোলেমান কে বিছানায় বসিয়ে বার্ন ক্রিম টা লাগিয়ে দিলো।
সোলেমান অপলক চেয়ে দেখলো বউকে। ইশ মেহরিন যদি তার জীবনের প্রথম নারী হত! কিন্তু হবে কি করে। যখন সে প্রেমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তখনও বোধহয় মেয়েটা ফিটার খায়।
মেহরিন সোলেমান কে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো—“ কি দেখছেন এভাবে তাকিয়ে? ”
সোলেমান শ্বাস ফেলে বলল—“তোমায় দেখলাম।”
—“ বিয়ের এত গুলো মাসেও কি দেখা হয় নি আমায় যে আজ আবার দেখতে হচ্ছে।”
সোলেমান মেহরিনের কোমর চেপে বলল—“ এক সাথে ছিলামই বা কদিন যে দেখার সুযোগ টা পাবো।”
—“তা অবশ্য ঠিক। ”
—“হুমম।”
—“কফি আনবো খাবেন?”
—“তোমার আনতে হবে না। আমি বলে দিচ্ছি কফি আর চা পাঠাতে।”
সোলেমান ফোন করে ম্যেড কে বলল চা আর কফি পাঠিয়ে দিতে রুমে। মিনিট দশেক পর ম্যেড আসলো চা কফি নিয়ে। সোলেমান দরজার কাছ থেকে চা কফি নিয়ে দরজা চাপিয়ে দিলো। এগিয়ে এসে চায়ের কাপ টা মেহরিনের হাতে দিয়ে বলল—“ চলো বসা যাক।”
বেলকনিতে থাকা চেয়ারে বসলো মেহরিন আর সোলেমান। বাগানে এখনও বইটা আগুনে জ্বলছে। সোলেমান একবার তাকিয়ে কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল—“জীবনে কখনও কারো প্রেমে পড়েছিলে মেহরিন?”
আচমকা এমন প্রেমে পড়ার কথা শুনে মেহরিন বিষম খেলো। চা নাক মুখে ঢুকে গেলো। সোলেমান মেহরিনের পিঠে হাত ঘঁষে বলল—“ সাবধানে। ”
মেহরিন ওড়না দিয়ে মুখ মুছলো। সোলেমান আড়চোখে মেহরিন কে দেখতে লাগলো। চা টা আর খাওয়া যাবে না। মুখ থেকে চা ছিটকে কাপের ভেতর পড়েছে। কাপটা আস্তে করে বেলকনির রেলিঙের উপর রাখলো মেহরিন।
সোলেমান কফির মগে চুমুক দিয়ে বলল—“ উত্তর দাও মিসেস মেহরিন সুলতান।”
মেহরিন লম্বা করে একটা শ্বাস ছাড়লো। বাগানে জ্বলতে থাকা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল—“ প্রেম করার সুযোগ পাই নি কখনও। তাই করা হয়ে উঠে নি।”
মেহরিনের এমন জবাবে ভ্রু কুঁচকালো সোলেমান। —“ প্রেম করার সুযোগ পাও নি মানে? দেখতে শুনতে তো তুমি মারাত্মক সুন্দর। তাহলে হয়ে উঠে নি কেনো?”
মেহরিন স্মিত হেঁসে বলল—“ আমার আব্বু প্রেম রিলেশন এসব কে ভালো চোখে দেখে না। আব্বুর মতে প্রেম,রিলেশনে জড়ালে মানুষ নষ্ট হয়ে যায়,বাবা মায়ের সমাজে মুখ দেখানোর জো থাকে না। একবার জানাজানি হয়ে গেলে পাড়া জুড়ে রটে যায়। চায়ের দোকানে তখন সকাল সন্ধ্যা গল্পের হাট বসে ওমুকে মেয়ে ওমুক ছেলের সাথে প্রেম করে । আমরা গ্রামের মানুষ, আমাদের আব্বা আম্মার কাছে তাদের মানসম্মানের মূল্য অনেক। একবার এটা চলে গেলে বাঁচা মুশকিল মাথা উঁচু করে সমাজে। সেজন্য আম্মু সব সময় আমাকে আর আপাকে এসবে জড়াতে মানা করেছে। বুঝিয়েছে এসব পাপ। আমি ছোট থেকেই বাবা ভক্ত একটা মেয়ে। বাবার সব কথা মেনে চলি। সেজন্য বাবা আমায় একটু বেশিই ভালোবাসে আপার থেকে। আমার সহজ সরল বাবা আমাকে একটা সহজ-সরল জীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তার দেখানো জীবনের বাহিরে আমি আর অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দেই নি। অতিরিক্ত কোনো ফ্রিডম আমাদের দেওয়া হয় নি। আপা আর আম্মার সাথেই স্কুলে যাওয়া আসা করেছি। আব্বু কখনও একা ছাড়ে নি বাসার বাহিরে। কারন দিনকাল ভালো না কখন কোন অঘটন ঘটে যায় তার রিস্ক আব্বু নেয় নি। এক সন্তান হারিয়েছিল। সেই শোক এখনও আব্বুকে কাঁদায়।
— “ এক সন্তান হারিয়েছিল মানে?”
—“ আমার একটা ভাই হয়েছিল। হাওয়ার পর মা-রা যায়।
—” ওহ্ আচ্ছা।
—“ হুম। গ্রামে একটা প্রচলিত রীতি আছে জানেন? এই রীতি টার প্রতি আমি বেশ অমত প্রকাশ করি।
সোলেমান জানতে চাইলো—“ কি সেই প্রচলিত রীতি?”
মেহরিন বেশ অসন্তুষ্টি মুখে বলল—“ এই যে মাধ্যমিক পাশ করলেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া।
সোলেমান আগ্রহ নিয়ে আবার জানতে চাইলো—“ তুমিও তোমার বিয়ে নিয়ে বেশ অসন্তুষ্ট ছিলে তাহলে?”
মেহরিন মৃদু হেঁসে বলল—“ অস্বীকার করার উপায় নেই। আসলেই শুরুতে অসন্তুষ্ট ছিলাম। কারন আব্বুর ইচ্ছে ছিলো আমি ডাক্তার হবো। আব্বুর শরীর খারাপ হলে তখন তাকে আমি দেখবো। সেই আব্বু হুট করে আমার বিয়ে ঠিক করায় কেঁদেই ফেলেছিলাম। মুখের উপর বলতেও পারছিলাম না আমি বিয়ে টা করবো না। পরে আপা জানালো আপনারা আমায় পড়তে দিবেন। সেজন্য পরে আর এই অসন্তুষ্টি ধরে রাখতে পারি নি। আমার জীবনে কোনো ছেলে ফ্রেন্ড নেই। পরিবারের বাহিরে আপন বলতে আছে শুধু ঊর্মি আর তার বড় ভাই। তাকে আমি একজন বড় ভাই,একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে মানি। আর আজীবন তাই মেনে আসবো।
সোলেমান দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো—“ তারমানে বিয়ের আগে প্রেম করা ভালো না তাই তো?
—“ এক হিসেবে না করাটাই ভালো আমার মতে। ধরুন যদি আমি প্রেম করতাম বিয়ের আগে। যার সাথে প্রেম করলাম তার সাথে যদি আমার বিয়ে টা না হতো তাহলে আপনাকে আমি মানতাম কি করে? মনে থাকতো একজন অথচ সংসার করা লাগতো আরেকজনের সাথে। তখন না পারতাম আপনায় আপন করতে আর না পারতাম নিজেকে বোঝাতে যে ঐ মানুষ টাকে ভুলতে। ঐ মানুষ কে মনে করে কাঁদলে আবার আমার বাহির স্বত্তাই আবার আমায় উপহাস করে বলতো—“ একে তো হারামে জড়িয়েছিলি তার উপর ঐ হারামের জন্য কাঁদছিস!
তখন আমি নিরুত্তর হয়ে যেতাম। আমরা তো মানুষ তাই আমাদের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি ঝোঁক টা একটু বেশিই থাকে। তবে মজার বিষয় কি জানেন? আপার বিয়ে টা দেখতে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ মনে হলেও আপার কিন্তু লাভ ম্যারেজ ছিলো। অনিক ভাইয়া আগেই প্রপোজ করেছিল আপাকে। আপা বলেছিল বউ করার ইচ্ছে থাকলে যেনো বাসায় প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবেই আপা রাজি হবে। অনিক ভাইয়া তাই করেছিল। ফুপু কে তার মা কে দিয়ে বলিয়েছিল আপাকে আন্টির বেশ পছন্দ। ভাইয়াও দেখতে শুনতে ভালো,জব করে শিক্ষিত। ফুপু নিয়ে আসে প্রস্তাব। আব্বুর ও ভালো লাগে অনিক ভাইকে। তারপর দু পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে দেওয়া হয়। অনিক ভাইয়া, আমি আর আপু ছাড়া কেউ জানে না এই বিষয়।
সোলেমান এই সুযোগে মেহরিন কে জিজ্ঞেস করলো —“ তাহলে ধরো কেউ একজন আগে প্রেম করেছে। মাত্রাতিরিক্ত কাউকে ভালোবেসেছে। কিন্তু তাকে পায় নি। বিয়ে হয়ে গেছে তার অন্য কোথাও। তো সেও বিয়ে করে নিয়েছে। এখন তার হ্যাজবেন্ড বা ওয়াইফ যদি জানে সেই প্রথম রিলেশনের কথা তাহলে তার রিয়াকশন কি হবে?”
—“ রিয়াকশন অনেক রকম ভাবে আসতে পারে। যেমন ধরুন সে যদি অনেক আবেগপ্রবণের হয়ে থাকে তাহলে তার খারাপ লাগবে,কাঁদবে। যদি সে অ্যাগ্রেসিভ টাইপের হয় তাহলে রেগে যাবে। ভালোবাসার মানুষ আগে কাউকে ভালোবেসেছে সেটা মানাটা আসলেই অসম্ভব হয়। কথায় কথায় টিচ মারবে। আর যদি কিছুটা বুঝদার হয় তাহলে সে তার অতীত নিয়ে মাথাই ঘামাবে না। যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। সেটা কে টেনে বর্তমান ভবিষ্যৎ নষ্ট করার মানেই হয় না। প্রেম,ভালোবাসা একটা সুন্দর অনুভূতি যদি মানুষটা সঠিক হয় তবেই। এসবই রিয়াকশন হবে।
সোলেমান আরেকটু কনফার্ম হওয়ার জন্য বলল—“ ছেড়ে চলে যাওয়ার কোনো চান্স আছে নাকি?”
—“ সেটা ডিপেন্ড করছে ঐ মানুষ টার উপর। সে তার অতীত ধরে বসে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ কে অনিশ্চিতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না। যদি অতীত ধরেই পরে থাকে,তাহলে ছেড়ে যাওয়ার চান্স ৮৯%। আর বাকি ১১% হয়তো ভালোবাসে বলে থেকে যাবে সাথে। সব মানুষ তো আর সমান না।
—“ অতীত নিয়ে পড়ে নেই তবে হঠাৎ করে অতীত মনে পড়ে তার। কখনও আবেগী হয়ে পড়ে তো কখনো ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরে রাগ লাগে বিষয় টা বুঝতেই। আবার ভয়ও হয় যদি তার সাথের মানুষ টা ভুল বুঝে এসব জানতে পারে যে এখনও মাঝেমধ্যে..
মেহরিন সোলেমান কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল—“ ইট’স নরমাল। মানুষ কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস না যে ডিলিট ফাংশনে ক্লিক করলো আর সব মেমোরি ডিলিট হয়ে গেলো। মৃত্যুর আগ অব্দি মনে থাকবেই। এটাই চিরন্তন সত্য। এখন ওপর পাশের মানুষটাকেও বুঝতে হবে,সময় দিতে হবে তার পার্টনার কে। এই আর কি,দুজনের মিল থেকেই বিষয় টা হ্যান্ডেল করতে হবে। তাহলে অতীত টা কে একটু সরিয়ে রাখা সম্ভব জীবন থেকে। তবে পুরোপুরি ভাবে সরানো অসম্ভব।
সোলেমান কফির মগে চুমুক দিতে গিয়ে দেখলো কফি নেই। গ্লাস খালি। হ্যাঁ অসম্ভব সুন্দর হৃদয়ের একটা বউ পেয়েছে সোলেমান। এই মেয়েকে জীবন থেকে হারানো মানে পৃথিবীর সব সুখ শান্তি তার বিমুখে চলে যাওয়া ।
সোলেমান বসা থেকো উঠে প্যান্টের পকেটে এক হাত গুঁজে রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল—“ কখনও কি প্রপোজাল পাও নি প্রেমের তুমি? ক্লাসে তো আর তোমার আপা আম্মু থাকতো না।”
—“ জ্বি পেয়েছি।”
—“ তখন তোমার রিয়াকশন কি ছিলো? ওদের কি বলেছিলে?
—“ আমার কিছুই বলতে হয় নি। আমি এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দিতাম। কিন্তু ঊর্মি ইমন ভাইয়া কে গিয়ে বলে দিত। পরে ইমন ভাইয়া ঐ ছেলেদের যা বলার বলতো।”
সোলেমান আকস্মিক ইমন নাম টা শুনে একটু হকচকিয়ে গেলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ইব্রাহিমের ড্রাইভারের মুখ। পরক্ষনেই ভাবলো ইমন নাম তো অনেকেরই হয়।
—“ দেখতে হবে তোমার ইমন ভাই কে।”
—“ অবশ্যই। উনি তো এই ঢাকাতেই থাকে।”
—“ তাই নাকি?”
—“ হুম।”
—“ কোথায় থাকে?
—“ মালিবাগ হয়তো। সঠিক জানি না এখন।
—“ আচ্ছা সমস্যা নেই আমি খুঁজে দেখা করে নিব কোনো একদিন। তবে একটা বিষয় আসলেই প্রশংসা করার মতন.. তোমার আব্বু তোমাকে আগলে রেখেছে ভীষণ, তা না হলে এই যুগের মেয়ে প্রেম করে না,তারপর এত ধার্মিক। কৃতজ্ঞ থাকবো তোমার বাবার কাছে আমি।”
—“জ্বি। আমি নিজেকে একজন ভাগ্যবতী মনে করি উনাকে আমার আব্বু হিসেবে পেয়ে।”
সোলেমান মুচকি হাঁসলো। মেহরিন বলে উঠলো—“ সুলতান সাহেব শুনুন।
সোলেমান মেহরিনের মুখের দিকে তাকালো—“ হুমম বলো?”
মেহরিন ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল—“ আপনার জীবনে কি আমি প্রথম নারী? আমার আগেও কি আপনার জীবনে কেউ এসেছিল? আমার কিছু লুকাবেন না কখনও। আমার জীবনে কোনো গোপন কথা নেই। আমি একটা সাদা পৃষ্ঠার মতন। কোনো কলঙ্ক, কোনো কালির দাগ লাগতে দেই নি ।
সোলেমান হাঁটু গেঁড়ে বসলো। মেহরিনের হাত টা মুঠোয় নিয়ে বলল—“ কসম কোনো কলঙ্ক লাগতেও দিব না তোমার শরীরে। সব কলঙ্ক, সব কালির দাগ আমি নিজের শরীরে লাগিয়ে নিব।”
—“ এড়িয়ে গেলেন কথাটা?”
—“ তুমি যা ভাববে তাই।”
সোলেমান বসা থেকে উঠে চলে যেতে নিলে মেহরিন সোলেমানের হাত ধরে আঁটকে দিয়ে বলল—“ আমি আপনায় ভালোবাসবো বলে কখনও কোনো পুরুষের দিকে ভালোবাসার নজরে তাকাই নি৷ আমি আপনায় হৃদয়ের গভীরে ঠাই দিব বলে কখনও কাউকে হৃদয়ের আশপাশে আসতে দেই নি৷
সেই আমিটাকে প্লিজ কখনও ঠকাবেন না। আপনার জীবনে কেউ থেকে থাকলে আমায় শুধু একবার বলবেন, আমি নিঃশব্দে চলে যাব আপনার জীবন…”
সোলেমান বাকি কথাটা আর শেষ করতে দিলো না মেহরিন কে। তার আগেই মেহরিনের ওষ্ঠদ্বয়ে নিজের ওষ্ঠদ্বয় মিলিয়ে দিলো সোলেমান। মেহরিনর পিঠ ঠেকে গেলো দেওয়ালে। সোলেমান এক হাত দেওয়ালে ঠেকিয়ে রেখে অন্য হাত রেখেছে মেহরিনের চোয়াল পেশিতে। মিনিট কয়েক পর সোলেমান ছেড়ে দিলো মেহরিন কে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে দু’জন। সোলেমান মেহরিনের কপালে কপালে ঠেকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—“ আমার জীবনে তুমি এসেছো নিজের ইচ্ছায়। আর বের হবে আমার ইচ্ছায়। যা মৃত্যুর আগে অসম্ভব। মৃত্যুর আগ অব্দি তোমাকে আমার সাথেই থাকতে হবে। মিসেস সুলতান হয়েই তোমায় ম’রতে হবে। কদিন পর আমার বাচ্চার মা হবে তুমি। গুনে গুনে ১২ টা বাচ্চা নিবো আমরা। আমার বাচ্চাদের পালবে তুমি,সেই সাথে বাচ্চাদের এই বাপটাকেও সামলাবে। গট ইট? জীবনে কে ছিলো সেটা দেখার বিষয় না। আমার জীবনে মেহরিন নামের এই ল্যাদা বউ ছাড়া আর কারো কোনো অস্তিত্ব নেই কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে রাখো।”
মেহরিন কে ছেড়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সোলেমান। মেহরিন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ওভাবেই। কি সূক্ষ্ম ভাবেই না কথা এড়াতে পারে সোলেমান!
এজওয়ান আজ নিবাস থেকে বেরিয়েছে ক্লাবের দিকে। অনেকদিন হলো মাল টাল খাওয়া হয় না।
এজওয়ান ড্রিংকসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে শার্টের পকেটে হাত দিলো। অনেকক্ষণ ধরেই সূচের মতন বিঁধছে। এজওয়ান পকেটে হাতটা ঢোকাতেই সাথে সাথে হাতে কিছু একটা বিঁধে গেলো। ব্যথায় মৃদু কপাল কুঁচকালো। পকেট থেকে হাত বের করতেই দেখলো সুঁইয়ের কিছু অংশ হাতে ঢুকে গেছে।
শালার তরিকুলের বেটি বোতাম সেলাই করে সুই রাখার আর জায়গা পায় নি। মেজাজ টা বিগড়ে গেলো। বাসায় ফিরে এই সুঁই দিয়েই শালির ঠোঁট সেলাই করে দিবে। এমন সময় পেছন থেকে মেয়েলী গলায় ভেসে আসলো—
“ হাই প্লে বয়।”
এজওয়ান না ঘুরেই বুঝলো এটা তাকেই বলা হয়েছে। একমাত্র প্লে বয়ের তকমা এজওয়ান ই অর্জন করেছে। ওভাবেই উল্টো থেকে বলল—“ হ্যালো নটি গার্ল।”
—“ হাউ আর ইউ?”
—“ অ্যা’ম ফাইন। ইউ?
—“ অ্যা’ম অলসো ফাইন। অনেক দিন পর দেখলাম তোমায়।
— “ কিন্তু আমি তো তোমাকে দেখি নি এখনও ।”
—“ এই ক্লাবে রোজ আসি। তোমায় দেখি।”
—“ আমার দেখার মতন কি আছে? টুনটুনি তো আমি ঢেকেই রাখি।
—“ শুনেছি তুমি প্রতি রাতে আগে একটা করে মেয়েকে বেডে নিতে?”
—“একদম ঠিক শুনেছো। এখন তুমিও কি আমার বেডে আসতে চাও নাকি?”
—“ তুমি রাজি…
এজওয়ান সম্পূর্ণ কথা আর শেষ করতে দিলো না। —” যাদের থেকে শুনেছো এ কথা দ্বিতীয় বার কি আর দেখা পেয়েছিলে তাদের?
—“ না তো।”
—“ ওকে,এখন ডিসিশন তোমার। আমার বেডে এক রাতের জন্য এসে পরের দিনের জন্য চিরতরে গায়েব হয়ে যাবে নাকি আমার থেকে দূরে থেকে সুস্থ মতো প্রাণ খুলে বাঁচবে?
—“ আই ওয়ান্ট টু কিস ইউর লিপস এজওয়ান। জাস্ট ওয়ান কিস। রিয়েলি আই ওয়ান্ট ওয়ান টু কিস ইউর লিপস।
কথাটা বলেই সামনে থাকা রমণী এজওয়ানের দিকে আরো এগিয়ে আসলো। এজওয়ান এবার সামনে ঘুরে তাকালো তার দিকে। পড়নে একটা টিয়া রঙের বিকিনি, তার উপর কালো মশারীর মতন একটা পাতলা জামা। পুরাই বস্তির মতন লাগলো।।দরকার কি ছিলো মশারী টা উপর দিয়ে পড়ার।
এজওয়ান ড্রিংকসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল—“ রিয়েলি ইউ ওয়ান্ট দ্যিস?”
—“ ইয়েস।”
—“ আর ইউ শিওর?”
—“ অ্যা’ম শিওর।”
—“ওকে কাম।”
মেয়েটা তার মুখটা এগিয়ে নিয়ে আসলো এজওয়ানের ঠোঁটের দিকে। রাত না কাটাতে পারুক। একটা চুমু তো খেতে পারবে এটাই অনেক। সবেই ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিবে এমন সময় আকস্মিক ব্যথায় সে চোখ বড়বড় করে তাকালো। এজওয়ান তার ঠোঁট দুটো বা হাত দিয়ে ধরে সুই ঢুকিয়ে দিয়েছে। মেয়েটা ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। ব্যথায় শরীর ঝাঁকুনি দিচ্ছে।।ঠোঁট দিয়ে ক্রমাগত র’ক্ত বের হচ্ছে। এজওয়ান আরেকবার সুই ঢুকানোর সাথে সাথে মেয়েটা ছিটকে সরে গেলো দূরে। ঠোঁট চেপে ধরলো নিজের। এজওয়ান ড্রিংকসের গ্লাসে ফের চুমুক দিয়ে বলল—“ ফের যদি আমার আশেপাশে তোকে দেখি তাহলে এরচেয়েও বাজে কিছু করবো। আমি একদম ঐ সব বাজে কিছু মিন করছি নি। সোজা জা’নে মেরে ফেলবো। আমার শরীরে সব কিছু শুধু মাত্র আমার বউয়ের জন্য। গট ইট?”
বাহাদুর মুখ বাঁকালো এজওয়ানের কথা। মেয়েটা চলে গেলো। এখনই হসপিটালে যেতে হবে।—“ বিয়ের পর হাফেজ হয়ে গেছিস? ”
—“ হ মওলানা হয়ে গেছি আমি।”
—“ বিয়ের আগে কিসব করছিস আমি বোধহয় জানি না?”
—“ কি করছি?”
—“ মাইয়া নিয়া হোটেলে রাত কাটাইছিস।”
—“ তো?”
—“ তো আবার কি?”
—“ রুমের ভেতর আমি কি করছি ঐ মেয়েদের সাথে ওসব দেখছিস তুই?”
—“তুই আমারে দেখতে দিছস নাকি যে দেখমু?
—“ তাহলে চুপ থাক। ”
—“ ক্যান চুপ থাকবো? ঐ সবই তো করছিস।”
—“ভালো তাতে তোর বাপের কি? তোর ইচ্ছে হলে তুই গিয়ে কর। আর তাছাড়া তোর কাছে কোনো প্রুফ আছে? আগে প্রমান দেখাবি যে আমি অকাম করছি তারপর বিশ্বাস করবো। তাছাড়া আমি শুদ্ধ পুরুষ। যে কি না বিয়ের এতগুলো দিন হয়ে গেলো এখনও অব্দি বাসর করতে পারলো না বউয়ের সাথে। ”
দাহশয্যা পর্ব ৪৫
—“ আমি না করছি নাকি বাসর করতে বউয়ের সাথে? ”
—“ তুই না করলেই কি আমি শুনতাম?”
—“ তাহলে হয় নি কেনো তোর বাসর এখনও?”
—“ বউ রাজি না। কাছে ঘেঁষতে দেয় না। সারাদিন রাত ঝগড়া করে।”
এজওয়ানের এই কথা শুনে বাহাদুর ব্যাঙ্গ করে বলল—“ উলেলেলেলে বাবু টা বউকে জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করা এজওয়ান সুলতান আজ আমাকে বলছে বউ রাজি না বলে বাসর করতে পারছে না! বিষয় টা হাস্যকর। শরীরের শক্তি কমে গেছে নাকি? হারবাল এনে দেই তাহলে ডাক্তারের দোকান থেকে বেড়াল থেকে সিংহে পরিনত হওয়ার জন্য?”
এজওয়ান নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করতে লাগলো। এই বাহাদুর শালার ব্যাটা আজকাল বেশ ঠেস মে’রে কথা বলে। শা’লার জ্বলে নাকি এজওয়ান বিবাহিত বলে?
