দাহশয্যা পর্ব ৪৮
Raiha Zubair Ripti
এজওয়ান যখন চোখ মেলে তাকালো তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করলো হসপিটালের এক ভিআইপি কক্ষে । তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো ইব্রাহিম আর বাহাদুর। এজওয়ান বাহাদুর আর ইব্রাহিম কে দেখে চোখ সরিয়ে আশেপাশে তাকালো। নাহ্ আর কেউ নেই এই কক্ষে। বাবা, ভাইজান কেউ নেই। মাহিও নেই। বাহাদুর এজওয়ানের জ্ঞান ফিরতে দেখে যেন স্বস্তির শ্বাস ফেললো। টিটকারি মে’রে বলল-
-” শালা বউয়ের হাতে খুন হতে হতে বেঁচে গেছিস।
এজওয়ান হাল্কা নড়তে গিয়ে বুকে ব্যথা অনুভব করলো। ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে বলল-
-” হা’রামজাদা তোর জ…
পুরো কথাটা আর শেষ করলো না। কিছু একটা মনে হতেই বাম হাত টা নিয়ে চাদরের নিচ দিয়ে দু পায়ের মাঝখানে রাখলো। না কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা ঠিকই আছে। স্বস্তি পেলো।
ইব্রাহিম কেবিনের বাহিরে চলে গেলো ইয়াসিন কে ফোন দিতে। বাহাদুর এজওয়ানের কোমরের কাছে বসে বলল-
-” কি এমন করছিলি বউয়ের সাথে যে বউ সোজা বুক বরাবর ছু’রি বসিয়ে দিলো।
-” যেই অকাম করছি বউয়ের সাথে বউ যে আমার টুনটুনি টা কেটে দেয় নাই এটাই তো আমার সাত কপালের ভাগ্য।
বাহাদুর ভ্রু কুঁচকালো।
-” কি অকাম করেছিলি?
এজওয়ান মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল-
-” কইতে শরম করে।
বাহাদুর ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। হেতির বলে শরম করে কইতে! সিরিয়াসলি! শরম কারে কয় হেয় জানে? নির্লজ্জ ছেলে আজ শরমের কথা বলছে!
-” আমার বাপ ভাই কই রে? আমি মৃত্যু শয্যায় অথচ তাদের দেখতেছি না।
-” তোর ভাইজান মহাদেবপুর আর তোর বাপ মাহিরে খুঁজতে গেছে।
এজওয়ানের ভ্রু কুঁচকে আসলো।
-” মাহিকে খুঁজতে গেছে মানে? আমার বাপে আমার বউরে দিয়ে কি কাজ?
-” তার ছেলেকে এভাবে জখম করে পালিয়েছে,তো খুঁজবে না? পেলে হয়তো মে’রেই আসবে।
এজওয়ান তাড়াতাড়ি করে উঠে বসলো।
-” কই গেছে খুঁজতে?
-” মাহির অ্যাপার্টমেন্টে।
এজওয়ান শার্ট টা বাহাদুরের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
-” পড়তে সাহায্য কর শালা।
বাহাদুর শার্ট টা পড়িয়ে দিতেই এজওয়ান নেমে পড়লো বেড থেকে। কেবিন থেকে বের হতে যাচ্ছিলো পেছন থেকে বাহাদুর এজওয়ানের হাত টেনে বলল-
-” কই যাচ্ছিস? বেশি নাড়াচাড়া করলে ব্লিডিং হবে আবার।
-” হোক তাতে তোর বাপের কি?
এজওয়ান বাহাদুর কে ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেলো।
ইব্রাহিম ইয়াসিন কে ফোন করেছে। অথচ ইয়াসিন ফোন ধরছে না। বেয়াদব ম’রে টরে গেছে নাকি?
৩ বার রিং হওয়ার পর ফোন রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই এপাশ থেকে ইব্রাহিম বলল-
-” গাধার বাচ্চা মরতে গেছিলি নাকি? কতক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছি।
ওপাশ থেকে সাথে সাথে মেয়েলি গলায় ভেসে আসলো—
-” এক্সকিউজ মি? কাকে গাধার বাচ্চা বলছেন? কে আপনি?
আকস্মিক মেয়েলি গলা শুনে চমকে উঠলো ইব্রাহিম। মেয়ে কি করে এলো ফোনের ওপাশে?
ইব্রাহিম কান থেকে ফোন টা সামনে এনে দেখলো না নম্র তো ঠিকই— ০১৯৫৬৭২৩৬৩১। ইয়াসিন বিয়ে করে ফেলেছে তাহলে! বেয়াদব জানালোও না তাদের!
-” আপনার স্বামী কে ফোন টা দিন আপু।
ঊর্মি এবার আরো হকচকিয়ে গেলো। হোয়াট! স্বামী! সে স্বামী কই পাবে? তার কি বিয়ে হয়েছে নাকি?
-” এই মাথামোটা একটা সিঙ্গেল মেয়েকে কি করে বলছেন স্বামী কে ফোন দিতে? আমি স্বামী পাবো কোথায়? আমার স্বামী নেই।
ইব্রাহিম বিরক্ত হলো।
-” তাহলে ইয়াসিনের নম্বর আপনার কাছে কি করে? বুঝলাম রাগ করেছেন ফোন দেওয়ায়। স্বামী কে কাছ ছাড়া করতে চাইছেন না। বোন তাকে ফোন টা দিন। খুবই আর্জেন্ট দরকার। কাজ শেষে পরে সিন্দুকে ভরে রাইখেন।
-” থাপড়িয়ে আপনার দাঁত ফেলিয়ে দিব অসভ্য ব্যাটা ছেলে কোথাকার। একে তো রং নম্বরে ফোন দিছেন। তারপর আবার আলতু ফালতু কথা বলছেন। রাখেন ফোন বেয়াদব।
ফোন কে’টে গেলো। ইব্রাহিমের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো। এই ইয়াসিন টা কে আজ হাতের কাছে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। হারামজাদা ফোন কোন মেয়ের কাছে রাখছে?
ইব্রাহিম কেবিনে আসলো। বাহাদুর কে একা দেখে জিজ্ঞেস করলো-
-” এজওয়ান কোথায়? ওয়াশরুমে?
-” না ভাই। ও বেরিয়ে গেছে।
ইব্রাহিমের কপাল কুঁচকে আসলো।
-” বেরিয়ে গেছে মানে?
-” আঙ্কেলের কাছে গেছে।
-” এই অবস্থায়! সবেই ব্যান্ডেজ করা হয়েছে।
-” শুনলো না তো।
-” ইয়াসিন কে কল লাগাও তো। বে’য়াদব কে ফোন দিলে ওর বউ আমায় ঝাড়ি দিচ্ছে।
বাহাদুর বিস্ময় হয়ে বলল-
-” ইয়াসিন বিয়ে করেছে!
-” তাই তো মনে হয়।
বাহাদুর পকেট থেকে ফোন টা বের করে ইয়াসিন কে হসপিটালে আসতে বললো। দশ মিনিটের মাথায় সে হসপিটালে আসলো। ইব্রাহিমের সামনে আসতেই ইব্রাহিম কান টেনে বলল-
-” আমি ফোন দিলে মেয়ে ধরে কেনো? কোথাকার কোন মেয়েকে ফোন দিয়ে রাখিস?
ইয়াসিন কান থেকে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল-
-” আহ্ ভাই লাগছে তো।
-” লাগুক।
-” আপনি কখন আমায় ফোন দিছেন? ফোন তো দিছে বাহাদুর ভাই।
ইব্রাহিম তার ফোন টা ইয়াসিনের মুখের সামনে মেলে ধরে বলল-
-” কার নম্বর এটা?
ইয়াসিন নম্বর টা ভালো মত দেখে বলল— এটা কি আমার নম্বর নাকি? ০১৯৫৬৭৩২৬৩১। আর এটা ০১৯৫৬৭২৩৬৩১। আপনি ২ আর ৩ এ গুলায় ফেলছেন। কার নম্বর এটা?
ইব্রাহিম চমকালো। আসলেই ভুল? কিন্তু সে তো নম্বর মুখস্থ করে রাখে নি করো। শুধু লাস্ট ডিজিট আর কোন সিম সেটা মনে রাখে। এটা তো ঊর্মির মায়ের নম্বর। তাহলে ওটা ঊর্মি ছিলো! কি অবস্থা নম্বরেরও এত মিল কেনো থাকা লাগবে? বার বার কেনো সে এই টুকু একটা বাচ্চা মেয়ের সামনে এভাবে অপদস্ত হচ্ছে?
এজওয়ান মাহির অ্যাপার্টমেন্টের সামনে আসতেই দেখতে পেলো বাপের কালো প্রাইভেট কার টা। একা নিশ্চয়ই আসে নি। গার্ড নিয়ে এসেছে। এজওয়ান এলেমেলো পায়ে হেঁটে লিফটে উঠলো। ৫ম তালায় গিয়ে লিফট খুলতেই লিফট থেকে বেরিয়ে মাহির রুমের দিকে গেলো। মাহির রুমের দরজা টা খোলা। এজওয়ান ভেতরে ঢুকলো। দেখলো দু জন গার্ড ভেতরে দরজার দু পাশে দাঁড়ানো। এজওয়ান কে দেখামাত্রই সালাম জানালো। এজওয়ান রুমের দিকে গেলো।
মাহির দিকে রক্তাক্ত চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছে বাশার সুলতান। কত বড় সাহস এই মেয়ের তার ছেলেকে আঘাত করে! একটা চড় অব্দি মারেনি কখনও তার ছেলেকে। আর এই মেয়ে বুক অব্দি চলে গেছে। সকালে ব্রেকফাস্ট করেই দরকারে ছেলের রুমের দিকে গিয়েছিল বাশার সুলতান সেজন্য ছেলেকে দেখতে পেয়েছিল ওভাবে। তা না হলে তো ওভাবেই পরে ম’রে থাকতো ছেলেটা।
দু’জন গার্ড মাহির হাত ধরে রেখেছে। আগে দু’টো চড় মে’রেছে বাশার সুলতান। যার কারনে ঠোঁটের কোনায় র’ক্ত। তৃতীয় বার চ’ড় বসানোর জন্য হাত উঁচু করলে এজওয়ান এসে থাবা দিয়ে ধরে ফেলে। হকচকিয়ে যায় বাশার সুলতান। এজওয়ান রক্তিম চোখে তাকালো। তারপর ঘাড় বেঁকিয়ে মাহির দিকে তাকালো। মাহির ঠোঁটের কোনে রক্ত দেখে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেলো। গার্ড গুলো এজওয়ানের রক্তিম চাহনি দেখে ছেড়ে দিলো। এজওয়ান বাপের হাত ঝাড়া দিয়ে ফেলে মাহির গালে হাত রাখলো। মাহি ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলো। বাশার সুলতান আবার তেড়ে আসতে চাইলে এজওয়ান হাত উঁচু করে থামিয়ে দেয়। দাঁত চেপে বাপের দিকে চেয়ে বলে-
-” হাউ ডেয়ার ইউ হিট মাই ওয়াইফ বাবা?
বাশার সুলতান অবাক হলেন ছেলের এ কথা শুনে। কেনো মেরেছে জানে না?
-” ওর সাহস হয় কি করে তোকে আঘাত করার?
-” শি হিট মি বিকজ আই ওয়াজ রঙ। দ্যাটস আওয়ার ম্যাটার। হু গেভ ইউ দ্যা রাইট টু টাচ হার? ইউ হ্যাভ নো রাইট টু হিট মাই ওয়াইফ।
-” ওয়াইফ? এটা ওয়াইফ? ওয়াইফ এমন হয়? কই সোলেমানের বউ কে দেখেছিস? ও কি বাড়ির বউ না? মেহরিন কে কখনও তোর বউয়ের মত অসভ্যতামি করতে দেখেছিস? কোনো স্বামীর সাথে উচ্চ বাক্যে কথা অব্দি বলে নি। স্বামীর সব কথা মেনে চলে। সেখানে তোর বউ কি করে?
-” ডোন্ট কম্পেয়ার মাই ওয়াইফ টু এনিওয়ান বাবা।
-” কেনো করবো না কম্পেয়ার? এই মেয়েকে এক্ষুনি তালাক দিবি। এই মেয়ে সুলতান বাড়ির বউ হওয়ায় যোগ্য না। হয় তালাক দিবি আর তা না হলে এটাকে আমিই মে…
-” ডোন্ট ক্রস ইয়োর লিমিট। ইন ফিউচার… ইউ মেক দ্য সেম মিস্টেক… আই’ল বি ওয়ার্স দ্যান এনি ওয়ান ইউ’ভ এভার সিন। মাইন্ড ইট। বউ চল।
এজওয়ান মাহির হাত টানলে মাহি হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়। কিন্তু এজওয়ান ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাতেই মাহি দমে যায়। এজওয়ান মাহিকে নিয়ে সুলতান বাড়িতে আসে।
বাশার সুলতান প্রচণ্ড রকমের রেগে আছে মাহি এজওয়ানের উপর। এই মেয়েটা না জানি তার ছেলেকে কেঁড়ে নেয় তার থেকে।
সোলেমান মহাদেবপুর রওনা হওয়ার পরপরই গাড়িতে থাকা কালিনই শুনেছে এজওয়ানের কথাটা। যখন শুনলো হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে তাই আর গাড়ি ঘুরায় নি। বউ কে রেখে তারপর যাবে হাসপাতালে। সোলেমান মেহরিন কে মহাদেবপুর সুলতান ভিলায় রেখে আধঘন্টা পরই রওনা হয় ঢাকার দিকে। মেহরিন জানে না নিবাসের ঘটনা। সোলেমান জানায়ও নি। জানাইলে অস্থির হবে। কয়েক ঘন্টার জার্নি শেষে সুলতান নিবাসে আসে। বাড়ি ফিরেই নিজের রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দেয়। বড্ড ক্লান্ত লাগছে।
সোলেমান এসেছে শুনে বাশার সুলতান সোলেমানের রুমে আসে। এজওয়ান মাহিকে ফের নিবাসে নিয়ে এসেছে সেসব নিয়ে অনেক কথাবার্তা বলে। সোলেমান চুপচাপ শুনলো। শোনা শেষে রুম থেকে বেরিয়ে এজওয়ানের রুমের দিকে গেলো।
এজওয়ান আধশোয়া হয়ে শুয়ে ছিলো। আর মাহি বেলকনিতে। সোলেমান কে ঢুকতে দেখেই নড়েচড়ে বসলো এজওয়ান। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল-
-” ভাইজান যে! ফিরলে কখন?
সোলেমান সোজা কথায় আসলো।
-” তোর বউ কোথায়?
মাহি সোলেমানের গলার ডাক শুনে বেলকনি থেকে বেরিয়ে এসে বলল-
-” বলুন কি বলবেন?
সোলেমান লক্ষ করলো মাহির ঠোঁটের সাইড টা কালচে হয়ে আছে। মেরেছে কেউ।
সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
-” কে মেরেছিল তোমায়? এজওয়ান?
এজওয়ান জিভে কামড় দিয়ে মাথায় হাত রেখে বলল-
-” কসম ভাই আমি মারি নাই। বউ মা’রার জিনিস নাকি? তোমার গুনধর চাচা মে’রেছে আমার বউকে। তার বিচার করো।
সোলেমান চাচার দিকে তাকালো। বাশার সুলতান এজওয়ানের উপর রেগে গেলো। বেয়াদব পেটের শত্রু। কিন্তু সোলেমানের চাহনি দেখে ভীত হয়ে গেল।
-” বাড়ির বউয়ের গায়ে কোন সাহসে তুমি হাত তুলেছো?
বাশার সুলতান চুপ। সোলেমান গর্জন তুলে ফের বলল-
-” চুপ কেনো? বলো কেনো মেরেছো?
-” ও কেনো আমার ছেলের বুকে ছু’রি দিয়ে আঘাত করলো?
-” তার বিচার অন্য ভাবে করা যেত। তুমি কেনো মারবে? তোমার ছেলে দোষ না করলে কি এমনই ওপর জন আঘাত করতে আসে?
এজওয়ান চুপসে গেলো। কাম সারছে। ভাই তো এখন বাপের উপর থেকে সরে তার দিকে আসতেছে। যদি জিজ্ঞেস করে কি করছি বউয়ের সাথে যে এমন করলো। তখন কি বলবে এজওয়ান?
সোলেমান এখন এজওয়ানের দিকে তাকালো।
-” এই তুই কি করছিস? তোকে কেনো মাহি মা’রতে গেলো?
এজওয়ান নুইয়ে গিয়ে বলল-
-” মনে নেই কি করেছিলাম। মনে পড়লে জানাবো।
সোলেমান এগিয়ে গেলো। শার্টের বোতাম খুলে দেখলো ব্যান্ডেজ করা। এজওয়ান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল-
-” ফল কাটার ছু’রি তো সেজন্য বেশি গভীর হয় নি।
-” ব্যাথা করছে এখনও অনেক?
-” বেশি না ভাই। তুমি চিন্তা করো না।
সোলেমান উঠে দাঁড়ালো।
-” তোকে নিয়ে চিন্তা করার মতন অতো সময় নেই আমার।
তারপর মাহির সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
-” কাজ টা তুমি মোটেও ঠিক করো নি মাহি। এই ভুল দ্বিতীয় বার যেন রিপিট না হয়। সংসার টা কোনো গেমিং এপ্স নয় যে ভালো লাগলো তো রাখলাম। আর ভালো লাগলো না বলে ডিলিট করে দিলাম। সংসার মানেই ঝগড়া মনোমালিন্য। তাই বলে ছু’রি তুলে নিয়ে স্বামী কে মারবে এটা কেমন কাজ?
-” আপনার ভাই কাজকর্মই এমন করেছে যে…
-” কি করেছে সেটাই জানতে চাচ্ছি।
-” সেটা বলতে পারলে বলেই দিতাম।
-” তাহলে নিজেদের মধ্যে সল্ভ করে নাও। লোক জানাজানি হলো কেনো এভাবে? আর তোকে বলছি এজওয়ান। বিয়ে করেছিস নিজের পছন্দে দেখে শুনে জেনে। তাহলে এসব কেনো হচ্ছে? বউকে বোঝার চেষ্টা কর।
-” আমি তো বোঝারই চেষ্টা করি ভাই। কিন্তু বউ তো বুঝে না।
-” নিজে আগে ঠিক হও। আর হ্যাঁ আঘাত টা তুমি যেহেতু করেছো মাহি,সেহেতু এজওয়ান কে সারিয়ে তুমিই তুলবে।
সোলেমান চলে গেলো। এজওয়ান বাপকে যেতে না দেখে বলল-
-” ভালো হয়েছে না ভাইজানের হাতে বকা খেয়েছো? বেশ হয়েছে। আরো মারতে আসবা আমার বউকে?
বাশার সুলতান রেগে হনহন করে চলে গেলো। এজওয়ান দু হাত মাথার উপর দিয়ে এক পা আরেক পায়ের উপরে দিয়ে বলল-
-” ও বউ ক্ষুধা লেগেছে ফল কেটে খাওয়াও।
মাহি শক্ত মুখে তাকালো। এজওয়ান সেটা দেখে বলল-
-” ডাক দিব ভাইজান কে? ভাইজান কিন্তু আমার দেখভাল করতে বলেছে তোমায়।
মাহি ফলের ঝুড়ি নিয়ে আসলো। পাশে বসে আপেল কাটতেই এজওয়ান মাহির হাতের ছুরি টার দিকে তাকিয়ে বলল-
-” এই ছু’রি দিয়েই মে’রেছিলে নাকি?
-” না।
-” তাহলে ওটা কেথায়?
-” বাগানে ফেলে দিয়েছি।
-” ইশ মা’রার আগে একটু ধার দিয়ে নিতা।
-” সেজন্য এখন আফসোস হচ্ছে। পরের বার এই ভুল আর হবে না।
-” আবার মা’রবা নাকি?
-” অবশ্যই।
-” আমায় অনেক ঘৃণা করো তাই না?
মাহি এজওয়ানের মুখে আপেল পুড়ে দিয়ে বলল-
-” আমি আপনাকে মারাত্মক রকমের ঘৃ’ণা করি এজওয়ান সুলতান। যতটা ঘৃণা করলে কখনও কারো প্রতি আর এক ফোঁটাও মায়া জন্মায় না। আপনি একটা ধ’র্ষক। আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না। কসম আমি আপনাকে সুযোগ পেলেই মে’রে ফেলবো।
এজওয়ান আপেল খাওয়ার সময় ইচ্ছে করে মাহির আঙুলে চুমু দিয়ে বলল-
-” তোমার জন্য না হয় আমি হলাম ধ’র্ষক। বিয়েটা যেভাবেই করি না কেনো। তুমি আমার বউ। তোমাকে ছোঁয়ার রাইট আমার আছে। মৃত্যুর আগ অব্দি এভাবেই ছুঁয়ে যাব। আচ্ছা….সাফওয়ান ছুলে কি তাকেও এভাবে ধর্ষক বলে আখ্যায়িত করতে মাহি?
মাহি কমলার খোসা ছাড়িয়ে বলল-
-” ওর নোখের যোগ্য নন আপনি। তাই ওর নাম উচ্চারণ করবেন না।
-” আমি হতেও চাই না ওর নোখের যোগ্য। আমি আমার মতন হয়েই থাকতে চাই। উল্টো ও আমার বা’লের ও যোগ্য না।
-” রাগাবেন না আমায়। আমার মন মেজাজ ভালো না। সাফওয়ান কে নিয়ে একটা কথাও আর বলবেন না।
-” তুমি এখনও ভালোবাসো ঐ ব্যাটা কে? বলো মাইন্ড করবো না।
মাহি বিরক্ত হতে লাগলো।
-” শান্তিতে থাকতে দিবেন আমায় আপনি? আমাদের একে ওপরে কে আলাদা করেও শান্তি হয় নি এখন আবার পুরোনো কাসন্দি ঘাঁটছেন।
-” কাসুন্দি ঘাঁটতে আমার ভালোই লাগে। আচ্ছা ঐ ব্যাটা আসলেই তোমায় ভালোবাসতো? আমার ভীষণ ডাউট আছে।
-” তাতে আমার কি?
-” না ভাবো ভালোবাসে তোমায় তাহলে এত চুপচাপ আছে কি করে? ভালোবাসলে তো ছিনিয়ে নিতে হয়। যেমন টা আমি নিয়েছি ছিনিয়ে।
-” কারন সাফওয়ান একটা ভদ্র ঘরের সন্তান।
-” এক্সের সাইড নেওয়া বন্ধ করো। ভালোবাসা কখনও ভদ্র অভদ্র দেখে না। পাওয়া ইচ্ছে থাকলে কেঁড়ে নিতে হয়। তোমার সাফওয়ান যদি কেঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তোমায়, আর যদি বাই এনি চান্স পেরেও যায় কসম আমি তোমায় সাফওয়ানের হাতে তুলে দিব। কিন্তু আফসোস সাফওয়ান এটা জীবনেও পারবে না।
মাহি এবার বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
-” আমিও চাই না সাফওয়ান তার মূল্যবান সময় গুলো আপনার মতন ইতরের পেছনে পড়ে নষ্ট করুক।
মাহি সবেই চলে যেতে চাচ্ছিলো কিন্তু এজওয়ান ডেকে উঠলো-
-” এই তরিকুলের বেটি শোনো?
মাহি পিছন তাকাতেই এজওয়ান চুমু দেখিয়ে বলল-
-” আইলাভিউ। আমার একশো সন্তানের জননী হওয়ার তৌফিক দান করা হোক তোমায়।
মাহি চলে গেলো।
ইব্রাহিম বাড়ি ফিরে ফোনটা হাতে নিয়ে বারবার পায়চারি করছে। নম্বর ঊর্মি চিনে নি। কারন সে ২ নম্বর সিম দিয়ে ফোন করেছে আজ। আর সেদিন এক নম্বর দিয়ে করেছিলো। আরেকবার ফোন দিয়ে পরিচয় দেওয়া যাক। দেখা যাক ঊর্মি কি বলে। ইব্রাহিম ফের কল লাগালো। বেজে কেটে যেতে যেতেও শেষমেষ রিসিভ হলো।
-” আবার ফোন দিয়েছেন কেনো কাকা? দেখুন এটা রঙ নম্বর। আমার কোনো স্বামী নেই ইয়াসিন নামের।
ইব্রাহিম গলা খাঁকারি দিয়ে বলল-
-” ঊর্মি।
আকস্মিক নিজের নাম শুনে ঊর্মি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।
-” কে আপনি? আমার নাম জানলেন কি করে?
-” আমি ইব্রাহিম চিনেছো?
ঊর্মির মাথা কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্লক হয়ে গেলো। ইব্রাহিম! মেহরিনের ঐ মেয়র দেবর টা?
-” চিনেছো আমায়?
-” আপনি মেহরিনের দেবর?
-” হ্যাঁ।
-” আমাদের ফোন নম্বর কোথায় পেলেন?
-” সত্যি বলবো?
-” মিথ্যা কেনো বলতে যাবেন? সত্যিই বলেন।
-” ইমনের ফোন থেকে নিয়েছি।
ঊর্মির ছোক বড়বড় হয়ে আসলো।
-” ভাইয়ার! কিন্তু কি করে?
-” ইমন আমার এখানেই কাজ করে।
ঊর্মি চমকে বলল-
-” ভাইয়া আপনার ওখানে কাজ করে!
-” হুমম। তো সেদিন তোমার ভাইয়ার ফোন আমিই ধরেছিলাম।
ঊর্মির চোখ খিঁচে ধরলো।
-” পরিচয় দিলেন না কেনো সেদিন? বাজে ব্যবহার করে ফেলছিলাম সেদিন।
ইব্রাহিম মনে মনে বলল ভাগ্যিস সেদিনের কথাটা বলি নি। যে ঊর্মি কে তার বাচ্চার বাপ বলতে গিয়ে তার মা কে বলে দিয়েছিল । বলে দিলে মানসম্মান চলে যেত।
-” ভালো আছো?
-” হুমম আপনি? হঠাৎ ফোন দিলেন যে? কিছু বলবেন?
-” এমনি ইচ্ছে করলো তোমার খোঁজ খবর নিতে।
-” ওহ আচ্ছা। মেহরিন কেমন আছে?
-” মেহরিন তো আজ মহাদেবপুর চলে গেছে।
-” ওহ্। চাচা বোধহয় তাহলে কাল পরশু আনতে যাবে ওকে।
-” আমিও তাই শুনেছি।
-” আচ্ছা রাখি তাহলে?
-” সত্যি রেখে দি…
-” কার সাথে কথা বলছিস রে ঊর্মি? কে ফোন দিয়েছে?
আকস্মিক মায়ের ডাক শুনে ঊর্মি তড়িঘড়ি করে বলল-
দাহশয্যা পর্ব ৪৭
-” রাখছি মা দেখলে বকবে।
ফেনটা কেটে দিয়ে বলল-
-” মেহরিন ফোন করেছিল মা। ঢাকা থেকে এসেছে আজ। তাই ফোন দিয়েছিল।
ইতি বেগম আর কিছু বললো না। ঊর্মি জোরে শ্বাস টানলো। বাঁচা গেছে।
ইব্রাহিম ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুখের উপর কেটে দিলো ফোনটা! মেয়েটাকে মনে ধরে গেছে। সোলেমানের মতো সেও না হয় ভুল করে ফেলুক। সোলেমানের শালি মানেই তো আমার ঘরওয়ালি।
