Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৭৯

দাহশয্যা পর্ব ৭৯

দাহশয্যা পর্ব ৭৯
Raiha Zubair Ripti

ঢাকায় আসার পরের সপ্তাহে সোলেমান আসলো রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে। এই কলেজের প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে মেহরিনের ট্রান্সফার সহ ভর্তির সকল কার্যক্রম শেষ করে। সোলেমান কে বেশি কিছু বলতে হয় নি। তারাই নিজ দায়িত্বে সব করে নিবে। মেহরিন কে নিয়মিত ক্লাস করতে আসার জন্য বলা হলো। সোলেমান মাথা নেড়ে চলে আসলো।

এজওয়ান ঢাকায় ফিরে তার পরের দিনই কোথাও একটা চলে গেছে। একদিন পর মাহি কে এজওয়ান ফোন করে বলেছে সে চট্টগ্রাম গেছে ঘুরতে বাহাদুরের সাথে। মাহি আর মাথা ঘামায় নি। এজওয়ান এখন বসে আছে পিসির সামনে। এই শীতের মধ্যেও সে ঘামছে। শরীরে থাকা কালো গেঞ্জি টা ভিজে গেছে এসির ভেতরও । টানা একটা সপ্তাহ এই ছেলে ঘুমায় নি ঠিকমতো। গোসল আর ওয়াশরুমের চাপ পেলে শুধু তখন সরেছে পিসির সামনে থেকে। এমনও হয়েছে সকাল গড়িয়ে রাত এসেছে এজওয়ান বুঝতেই পারে নি। যেই ছেলে দিনে কম করে হলেও দু বার গোসল করে সেই ছেলে এই সাত দিনে গোসল মিস দিয়েছে অনেক বার। বাহাদুর টাইম টু টাইম খাবার এনে দিলেও সেটা পাশেই পড়ে থেকেছে। রোবটের মতো লাগলো বাহাদুরের কাছে এই এজওয়ান কে।

এজওয়ান লাস্ট ডাটা এন্ট্রি করালো। স্ক্রিনের সামনে ঝুঁকে থাকা এজওয়ানের চোখে একধরনের জ্বলন্ত তীব্রতা। কিবোর্ডে আঙুল থামার পরও মনিটরের নীল আলোয় তার মুখ ঘামছে। তীরে এসে তরী ডোবার মতো ফিলিংস হচ্ছে। যদিও চান্স কম এটার। তারপর যদি সফল না হয় তখন আবার শুরু থেকে সবটা করতে হবে। এটা ভেবেই ডিপ্রেশনে চলে যেতে ইচ্ছে করছে এজওয়ানের।
একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেলল এজওয়ান । তারপর মাউসের কার্সরটা ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে গেল ডানদিকের কোণে থাকা Execute বোতামের ওপর। একবারও চোখ পিটপিট না করে ক্লিক করল।
সেকেন্ড খানেক নীরবতা বিরাজ করলো। তারপর হঠাৎই স্ক্রিনের অন্ধকার ভেদ করে উঠে এলো এক বিশাল লাইভ ড্যাশবোর্ড। একেকটা পয়েন্টে মৃদু আলোর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। এজওয়ান চেয়ারে হেলান দিলো। চোখের নিচে কালি, ঠোঁটে এখন মৃদু তৃপ্তির হাসি। ফাইনালি সে উইন! দীর্ঘ ৫ বছরের পরিশ্রম আজ তার চোখের সামনে! স্ক্রিনে স্পষ্ট একটা লেখা দেখা যাচ্ছে –

“System Integration: 100% Complete.”
তারপর একের পর এক নতুন ট্যাব খুলে গেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এজওয়ান পাশ থেকে ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিলো। তৃপ্তি, শান্তি দুটোই পেতে লাগলো। বাহাদুর এসে দাঁড়ালো পাশে। অবাক চোখে বলল-
“ ফাইনালি হলো তাহলে। ”
“ ইয়েস। এজওয়ান কখনও হারে না। অলওয়েজ আই প্রুফ ইট। ”
এজওয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে ফোন করলো। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই এজওয়ান বলল-
“ ফাইনালি দ্যিস ওয়ার্ক ইজ ফিনিশড প্রফেসর। চেক ইট। ”
এজওয়ান ফোন কেটে দিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। হায়হায় মেয়েদের মতো চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। কেমন গাঞ্জাখু্ড়ি লাগছে। এজওয়ান তাড়াতাড়ি করে লম্বা একটা শাওয়ার নিলো। তারপর লেদার জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে সেলুনে চলে গেল নিজেকে ঠিক করতে।
সুলতান নিবাসে বাশার সুলতান সোফায় বসে টিভির নিউজ দেখছিলো। মেহরিন নিজের রুমে। মাহি নিচে এসেছে কি মনে করে যেন। বাশার সুলতান ডাকলেন মাহি কে। মাহি সোফায় বসতেই বাশার সুলতান বললেন-

“ এজওয়ান আসবে কবে? জানো কিছু? ফোন ধরে নি আমার। ”
“ বলতে পারছি না। আমার ফোনও ধরে নি আজ। বাহাদুর কে জিজ্ঞেস করুন তো আঙ্কেল। ”
বাশার সুলতান উঠে গেল ফোন করতে। এজওয়ান সেলুনের বিল পে করছিল ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। বাপের ফোন পেয়ে রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
“ ইয়েস মাই হ্যান্ডসাম দূর্নীতিবাজ কিউট ফাদার বলুন। ”
বাশার সুলতান চোখ মুখ কুঁচকে বলল-

“ শাট-আপ। কোথায় তুই? ”
“ কেনো, মিস করছো নাকি আমাকে? অবশ্য তুমি মিস করলেও পাত্তা পাবে না আমার থেকে। ”
“ বাসায় আসবি কবে? ”
“ তুমি যেদিন বলবে। ”
“ তাড়াতাড়ি আয়। আস্ট্রেলিয়া কি আর যাবি না নাকি? না গেলে রাজনীতি তে ঢোক। ”
“ আমাকে দিয়ে রাজনীতি করাতে চাইছো? ”
“ করলে সমস্যা কি? ”
“ যে রাজনীতি তে নীতি নেই সেই রাজনীতি আমি করতে ইচ্ছুক নই ফাদার। তোমরা করো। এর ওর কামলাগিরী দেওয়া অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব না। এজওয়ান কামলা হায়ার করে, কারো কামলা হয় না,গট ইট? ”
“ আসছে জমিদারের বাচ্চা। ”
“ নিঃসন্দেহে জমিদারের বাচ্চা আমি। ”
“ সামনের নির্বাচনে নাম লিখাবি। দেশের হয়ে কাজ করবি না তুই? ”
“ দেশের হয়ে কিসের কাজ করবো আমি? আমার মাতৃভূমি এটা? আমি নির্বাচনে দাঁড়িয়ে নিজের পাছায় গু রেখে কি জনগণ কে বলবো ওহে দেশবাসী তোমরা কিন্তু হাগু করে পাছা পরিষ্কার করবে। যেখানে নিজেরাই পাছায় গু নিয়ে হাঁটো। সরো এসব আমি পারবো না। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও,আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি বহু আগেই। যেটা পারি না পারি না সেটা না করাই শ্রেয়। সব করলে ব্যর্থ জীবন।”

“ হারামজাদা কোথাকার। নিজের বাপ ভাইকে পচাচ্ছিস? ”
“ অনলি ইউ কে পচাচ্ছি। ভাইজান, চাচা ভালো। ইউ ডিজঅনেস্ট ম্যান। আই লাভিউ তোমাকে। এখন রাখি? বাসায় আসছি। ”
এজওয়ান ফোনটা কেটে হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে একটা টঙের দোকানের সামনে দাঁড়ালো।
তারপর বেঞ্চে বসে বলল-
“ মামা আপনার এই ছোট দোকানে কি কি পাওয়া যায়। কি কি বিক্রি করেন?
দোকানে থাকা মধ্যবয়স্ক লোকটা বলল-
“ আমি বিরিয়ানি পোলাও বিক্রি করি মামা। খাইবেন? ”
এজওয়ান দোকানে উঁকিঝুঁকি দিলো। বিরিয়ানি পোলাও এর হাড়ি কই?

“ কই তাহলে আমি দেখতে পাচ্ছি না কেনো? শুধু চা বিস্কুট দেখতেছি যে। ”
“ চোখ নাই আপনার তাই দেহা পারেন না। চা বিস্কুট দেখার পরও বলেন আমি কি বিক্রি করি! অক্ষিশিত লোক। ”
“ হোয়াট অক্ষিশিত? ”
“ পড়ালেহা করেন নাই জীবনে? ”
“ না করি নাই জীবনে। আপনে করছেন? ”
“ হ কেলাশ ওয়ান অব্দি। ”
“ অনেক দূর পড়াশোনা করছেন মামা। আপনাদের দিনের ওয়ান পাশ করা আর বর্তমান দিনে পিএইচডি পাশ করা সেম সেম। এখন মামা এক মগ চা দেন তো। ”
লোকটা মাটির কাপে চা দিলো। এজওয়ান তাকালো। এই টুকু কেনো চা? এটা তো এক ঢকেই পেটে সব চলে যাবে।

“ কি মামা,এতো অল্প কেনো চা? একটু বড় মগে দেন। ”
দোকানদার পাশে চা রেখে বলল-
“ ড্রামের ভিতর পানি তোলার গোসলের মগ আছে। ঐ টায় দিমু? ”
“ গোসলের মগে ক্যান দিবেন খাইতে? চা খাওয়ার মগ নাই? আরো কয়েক কাপ নিয়ে আসেন। চায়ের সাথে কি দেন খাইতে? ”
“ আপনি কি খাইবেন চায়ের লগে? বিস্কুট নাকি পাউরুটি। ”
“ না থাক বাসি জিনিস দিতে পারেন ভরসা নাই। আর ৫ কাপ দেন চা। ”
দোকানদার আরো ৫ কাপ এনে দিলো চা। এজওয়ান রাস্তার চলন্ত গাড়ি গুলো যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চা টা খেতে লাগলো। খাওয়ার মাঝে এজওয়ান রিভিউ দিতে লাগলো-
“ মামা চা টা খুব একটা মজা হয় নি। চিনি কম দিবেন। ”

চা মজা হয় নি শুনে দোকানদারের কপালে দু ভাজ পড়লো। মুখের উপর কেমনে বলে দিচ্ছে মজা হয় নাই!
“ কি কইলেন এটা মামা। খাঁটি গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে বানাইছি চা। লগে গ্যেন্ডারির চিনি। আর আপনি বলেন মজা হয় নাই? জীবনে চা খাইছেন আপনে? চায়ের স্বাদ জানেন? ”
“ খাঁটি গরুর খাঁটি দুধ! গরুও খাঁটি হয় দুধের মতো!”
“ হ। দেশি গরু। ”
“ গেন্ডারি কি? ”
“ কুশল। ”
“ কুশল আবার কি? ”
“ আরে ভাই আখ আখ। ”
“ ওহ ঐ যে বাঁশের মতো দেখতে চিকন ওটা? ”
“ হ রে ভাই হ। ”
“ আচ্ছা, বুঝলাম। বাট অনেস্টলি বলছি আপনার হাতের চা ভীষণ বাজে লাগলো। চা হবে চায়ের মতো। কিন্তু এটা তো চায়ের মতো না। শরবতের মতো। ”

“ চা কেমন হয়? ”
“ চায়ের মতো হয়। ”
“ কি দিয়া বানায়? ”
“ তা তো বলতে পারবো না। ”
“ আপনে তাড়াতাড়ি খাইয়া বিদায় হন তো। আর আইবেন না আমার দোকানে। ”
“ আপনার মনে হয় আমি ২য় বার আসবো আপনার দোকানে? ”
” চা ভালা না চা ভালা না কইয়া কইয়া ৫ কাপ খাইয়া ফেলছেন। চা ভালা হইলে কয় কাপ খাইতেন? ”
“ ভালো চা পেলে বলতে পারতাম। ”
খাওয়া শেষে এজওয়ান মানিব্যাগ থেকে তার এটিএম কার্ড টা বের করে বলে-
“ নেন বিল টা রাখেন। ”
দোকানদার কার্ডের দিকে একবার তাকিয়ে ফের এজওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে-

“ কিসের বিল? ”
“ কেনো চায়ের বিল। ”
“ টাকা না দিয়া ভিজিটের কার্ড দিয়া কইতাছেন বিল নিতে? আপনে টাকা দেন। ”
“ আরেহ্ মামা এটা ভিজিটিং কার্ড না। এটা এটিএম কার্ড। ”
“ কিয়ের কার্ড এটা হুনবার চাই নাই আমি। আপনে নগদ টাকা দেন। ”
“ নগদ টাকা তো নাই মামা। আমি ক্যাশ ইউজ করি না। ”
দোকানদার রেগে গেলো।
“ টাকা নাই তাইলে খাইতে আইছেন ক্যান? আবার খেতে এসে কত ঢং করলেন। টাকা না দিলে এক পা-ও যাইতে দিমু না কইলে। লোকজন ডাইকা আইনা খুঁটির লগে বাইন্ধা রাখবো। তাড়াতাড়ি টাকা দেন। ”
এজওয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করে বাহাদুর কে ফোন করলো। কম করে হলেও ৭ বার ফোন দিলো এজওয়ান। শালার ব্যাটা ফোন ধরছে না।

“ আমার বিকাশ আছে। আপনে বিকাশে দিয়া দেন টাকা। ”
এজওয়ানের তো বিকাশ নেই।
“ আমার বিকাশ নেই মামা। ”
“ নগদ? ”
“ নেই বললাম তো। ”
“ রকেট? ”
“ কিচ্ছু নাই মামা এই কার্ড ছাড়া। ”
“ তাইলে এহন কই থে টাকা দিবেন তাড়াতাড়ি দেন। এই যে রশি লইয়া দাঁড়ায় আছি। বাইন্ধা রাখমু কইলে। ”
“ আশেপাশে এটিএম দোকান নেই? ”
“ জানি না। ”
“ দাঁড়ান দেখে আসি। ”
এজওয়ান হাঁটা ধরতে নিলে দোকানদার দু হাত মেলে ধরে বলে-

“ এক পাও যাইতে দিমু না। পলায় যাইবেন গা। বাড়ির কাউরে কন টাকা নিয়া আইতে। ”
এজওয়ান তরিকুলের বেটি কে ফোন করলো। মাহি দুপুরের খাবার খাচ্ছিলো বসে। এজওয়ানের ফোন পেয়ে রিসিভ করে কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই এজওয়ান বলল-
“ হাই তরিকুলের বেটি। হোয়াটসঅ্যাপ? ”
“ ভালো। ”
“ কি করছো? ”
“ খাচ্ছি। ”
“ তুমি কি একটু বের হতে পারবা? ”
“ কোথায়? ”
“ টিএসসি। ”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো।
“ আপনি ঢাকায় আসছেন? ”
এজওয়ান ঢাকাতেই ছিলো। চট্টগ্রাম না। কিন্তু বলা যাবে না। সেজন্য এজওয়ান বলল-
“ হু ঢাকায় এসেছি। তুমি একটু আসো তো। ”
“ আমার আসা লাগবে ক্যান? বাড়ি চিনেন না? ”
“ চিনি তো। তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। সেজন্যই তো বলছি আসতে। প্লিজ আসো তরিকুলের বেটি। ”
“ আসছি। ”

“ আর শোনো,বাড়ির গাড়ি করে না এসে রিকশা করে এসো। ঠিক আছে? ”
“ রিকশা দিয়ে কেনো আসবো? ”
“ আরে আসোই না। বললাম না সারপ্রাইজ আছে।”
“ ঠিক আছে। ”
মাহি খাওয়া শেষে রেডি হলো। পিংক কালারে একটা কুর্তি পড়ে মুখে সানস্ক্রিন লাগিয়ে সাইড ব্যাগ নিয়ে বের হলো। বাড়ির সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রিকশা পেতেই সেটায় উঠে বসে বলল টিএসসি চত্বর যেতে।
রিকশা টিএসসি চত্বর এসে থামতেই মাহি নেমে এদিক ওদিক তাকালো। এজওয়ান কে তো দেখতে পাচ্ছে না। ভাড়া মিটিয়ে ফোন করলো-

“ কই আপনি? ”
“ বামের চায়ের দোকানে আসো। ”
মাহি বামে ঘুরে হাঁটা ধরলো। দেখলো এজওয়ান চায়ের দোকানের বসে আছে। মাহি এগিয়ে গিয়ে বলল-
“ কি জন্য আসতে বললেন? ”
এজওয়ান সরে বসে বলল-
“ বসো তরিকুলের বেটি বসো। কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলাম। মামা চা দেন তো তরিকুলের বেটি কে। ”
দোকানদার তাকাতেই বলল-
“ এসে গেছে তো দিয়ে দিব। ”
“ আমি চা খাব না। ”
“ আরেহ কি বলো তরিকুলের বেটি। চা খেতেই হবে। দারুন খেতে উনার হাতের চা। একবার খেলে বারবার খেতে ইচ্ছে করবে। আমি এ নিয়ে কতবার আসলাম খেতে। দেখো না চা খেতে থেমেছি বাড়ি না গিয়ে।
দোকানদার চা দিলো। মাহি চুমুক বসালো। এজওয়ান জিজ্ঞেস করলো-

“ মজা না? ”
“ যতটা ভালো বলেছেন ততটাও না। ”
এজওয়ান মুখ ঘুরিয়ে ফেললো। চা শেষ হতেই এজওয়ান উঠে দাঁড়ায়। তারপর মাহিকে বলে-
“ বিল টা দিয়ে দিও তরিকুলের বেটি । ”
মাহির কপালে দু ভাজ পড়লো।
“ বিল দিয়ে দিব মানে? ”
“ চা কে খেয়েছে? ”
“ আমি। ”
“ তাহলে বিল কে দিবে? ”
“ আপনিই তো বললেন দিতে চা। সেজন্যই তো খেলাম। ”
“ আমি দিতে বললেই তুমি খাবে? কিপ্টামি করো না। দিয়ে দাও বিল। যত দিবে আল্লাহ তোমাকে তার দ্বিগুণ করে ফেরত দিবে। দাও দাও। ”
মাহি ১০ টাকার একটা নোট বের করে দিলো। দোকানদার সেটা দেখে বলল-
“ ১০ টাকা না। ৬০ টাকা হইছে। ৬০ টাকা দেন। ”
মাহির চোখ কপালে।

“ কিহ! এক কাপ চা ৬০ টাকা? মগের মুল্লুক নাকি? তেমন আহামরিও তো ভালো না টেস্ট। ”
এজওয়ান ফিসফিস করে বলল-
“ আরে মাহি দিয়ে দাও। ঝগড়া করছো কেনো ঝগরুটেদের মতো। ”
মাহি কটমট করে তাকালো।
“ ১০ টাকার বেশি এক টাকাও দিব না। এই মামা টাকা নিন। ”
“ কি কয় এই মাইয়া? টাকা দিতে কন তাড়াতাড়ি। কিসের ১০ টাকা হু? কয় কাপ…
এজওয়ান দোকানদার কে থামিয়ে দিয়ে বলল-
“ এ মামা চুপ করেন তো। আখাইয়ার মতো টাকা চাচ্ছেন। ৬০ টাকাই তো। মনে হচ্ছে কোটি টাকা পান।
মাহির হাত থেকে এজওয়ান টাকা টা কেড়ে নিয়ে বলল-
“ ১০০ টাকার নোট আছে না? ”
“ কেনো কি করবেন? ”
“ দাও বলছি। ”

মাহি টাকাটা ব্যাগ থেকে বের করতেই এজওয়ান সেটা দোকানদারের সামনে রেখে মাহির হাত ধরে হাঁটা ধরলো। মাহি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো। এজওয়ান আরো চেপে ধরে বলল-
“ কি ছোটলোকি বিহেভিয়ার তোমার তরিকুলের বেটি ছি! সুলতান বাড়ির বউদের সামান্য কয়টা টাকা নিয়ে এভাবে ঝগড়া করাটা ভীষণ নিচু দেখায়। আর উনার চায়ে স্পেশাল কিছু আছে হয়তো সেজন্য এক কাপ ৬০ টাকা। ”
“ আমি আরো ৪০ টাকা পাই। আনতে দিন সেটা। ”
এজওয়ান কার্ড টা মাহির হাতে দিয়ে বলল-
“ কয়েকশো গুন ডাবল আছে এতে। নিয়ে নাও ভাই। তারপরও চলো এখান থেকো। ছোটলোকি কারবার যত্তসব। ”
মাহি কে নিয়ে এজওয়ান হাঁটা ধরলো। ফুলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ তরিকুলের বেটি ডু ইউ লাইক ফ্লাওয়ার? ”
“ না। ”
“ ভাব মারাইও না তো। একটা গোলাপ দেই কিনে,নিয়ে নিও। ”
একটা লাল গোলাপ হাতে নিয়ে এজওয়ান ফের বলল-
“ তরিকুলের বেটি ২০ টাকা দাও। ”
“ আবার কি জন্য টাকা দিব? ”
“ ফুলের দাম। ”

মাহি রেগে এজওয়ানের হাত থেকে ফুল টা নিয়ে ফুলের বালতিতে রেখে দিলো। তার টাকা দিয়ে তাকেই ফুল কিনে দিতে চাইছে! মাহি রিকশা ডেকে রিকশায় উঠে বসলো। এজওয়ান তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে রিকশায় উঠলো। তরিকুলের বেটি রেখে চলে গেলে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হবে। নিবাসের সামনে এসে রিকশা থামতেই এজওয়ান নেমে হাঁটা ধরলো। পেছন থেকে মাহি বলল-
“ ভাড়া দিবে কে? ”
এজওয়ান চলে যেতে যেতে বলল-
“ অবশ্যই তুমি। কার্ড তো তোমার কাছেই। ”
মাহি কটমট করতে করতে ভাড়া মিটিয়ে দিলো। বসার ঘরে আসতেই দেখলো ইব্রাহিম আর সোলেমান রাজনৈতিক খবর দেখছে। এজওয়ান কে দেখেই সোলেমান বলল-

“ কোথায় ছিলি? ”
“ ট্যুরে ছিলাম ভাই। ”
সোলেমান ইব্রাহিম উঠে চলে গেল। মাহি সাইড ব্যাগ টা টেবিলের উপর রেখে বসলো। এজওয়ান রুমে চলে যাচ্ছিলো বলে মাহি বলল-
“ ব্যাগ টা নিয়ে যান। ”
এজওয়ান ব্যাগটা নিয়ে চলে গেল। মাহি আধঘন্টা পর রুমে এসে দেখলো এজওয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এজওয়ান ভীষণ ক্লান্ত। এত ঘুরাঘুরি করতে হবে কেনো? মাহি নিজের ল্যাপটপ টা নিয়ে বেলকনিতে চলে গেল।

জানুয়ারি মাস, সাল টা ২০২২,তারিখ ৫। আকাশে এখনও ঘন কুয়াশা। বাতাসি ফজরের নামাজ পড়ে বাড়ির পুরো উঠান টা ঝাড়ু দেয়। এঁটো থালাবাসন মেজে তা উপর করে রাখে। হাল্কা রোদের আলো দেখা যেতেই গোয়াল ঘর থেকে বাতাসি গরু গুলো কে বের কর বেধে দেয় খুঁটির সাথে। গোয়াল ঘরের গোবর গুলো উঠিয়ে লম্বা কাঠের সাথে লাগিয়ে শুকাতে দেয়। তারপর চুলায় আলু, বেগুন সেদ্ধ দিয়ে ভাত বসায়। আরেক চুলায় মশুরির ডাল বসায়। সকালের খাবার আজ এটাই। ইয়াসমিন বেগম এখনও ঘুমে। বাতাসি আর উঠায় নি। শরীরে জ্বর এসেছে উনার।
সাড়ে আটটার দিকে বাতাসির সব কাজকর্ম শেষ হয়ে যায়। বাতাসি খাবার টেবিলে সাজিয়ে তারপর ইয়াসমিন বেগম কে ডাকতে যায়। ইয়াসমিন বেগম বাতাসির ডাক শুনে উঠে বসে। মাথা টা ভীষণ ব্যথা করছে যে।
হাত মুখ ধুয়ে তারা সকালের খাবার টা খেয়ে নিলো। ইয়াসমিন বেগমের আজকাল শরীর টা একটু বেশিই খারাপ যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি আজরাইল এসে পড়লো জান নিতে। সেই ভয়ে সে বাতাসি কে অনেকক্ষণ বুকের সাথে চেপে ধরে থাকে। মেয়েটা এই কদিনে অনেক আপন হয়ে গেছে। ইয়াসমিন বেগম আবদার করে বাতাসি কে বলল-

“ বাতাসি শোন। ”
“ জ্বি বলুন। ”
“ হায়াত-মউতের কথা তো কওয়া যায় না। জানি না আর কতদিন তরে আগলায় রাখতে পারবো । ইয়াসিন রে বোঝাতে বোঝাতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। কাল বলে তোরে নিতে আইবো। ঢাকায় নিয়ে ইয়াসিনে যদি তরে ডিভোর্স দিতে চায়,তুই রাজি হবি না হ্যাঁ? চাপ দিলে সোলেমান রে বইলা দিবি। সোলেমান শাসন করবে ইয়াসিন রে। সোলেমান আমার আরেক ছেলে। তোর বড় ভাই। আগলায় রাখবো দেখিস। ”
বাতাসি জড়িয়ে ধরলো ইয়াসমিন বেগম কে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-
“ আমারে রাইখা দেন আম্মা আপনার সাথে। থাকি না আপনার লগে। ”
“ ইয়াসিন রাখবে না রে। আল্লাহ আমার ছেলেটারে হেদায়েত দিক। এই পৃথিবীর সবাই রূপের পেছন ছুটে বলে পোলাটাও রূপের পেছনই ছুটতে চাইতাছে। ”

“ যেখানে আমার মা’ই আমাকে পছন্দ করে না সেখানে আপনার পোলা কিভাবে পছন্দ করবে আমায় আম্মা? আমি খুব কুৎসিত বোধহয়। সেজন্য সবাই দেখে নাক ছিটকায়। তবে আপনি আর ভাইয়া কখনও নাক ছিটকান নাই আমারে দেখে। আপনারা অনেক ভালো। সবাই আপনাদের মতো হলে আমি বাতাসি আর কষ্টই পাইতাম না জীবনে। ”
“ দোয়া করি মা তোর চারপাশে এমন মানুষ গুলোই থাকুক সবসময়। এখন উঠি,গরু দুটো কে চকে বেঁধে দিয়ে আসি। ”
ইয়াসমিন বেগম চলে গেল। বাতাসি খাবার-দাবার ঢেকে রুমে আসতেই দেখলো ফোন বাজছে। বাতাসি রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ইয়াসিন বিরক্ত গলায় বলল-
“ কতবার ফোন দিতাছি আম্মা। ফোন ধরো না ক্যান? ”
বাতাসি ইয়াসিনের গলা শুনে মিনমিন করে বলল-

“ আম্মা বাড়ি নাই। ”
বাতাসির গলা শুনে ইয়াসিন ভ্রু কুঁচকালো।
“ কই গেছে? ”
“ চকে গেছে। ”
“ আসলে ফোন দিতে বইলো তো। ”
“ আচ্ছা।…..শুনুন। ”
“ কি বলো। ”
“ আপনি কাল নিতে আসবেন আমারে? ”
“ হ। ”
“ ডিভোর্স দিয়া দিবেন নিয়া? ”
“ হুমম। ”
“ তারপর দ্বিতীয় বিয়ে করবেন? ”
“ হুমম। ”
“ এত পাষাণ কেনো আপনি? ”
“ আমি পাষাণ-ই। তুমি তো ভালো। তাহলে ছেড়ে দিয়ে উপকার করো আমার। ”
“ আম্মা ডিভোর্স দিতে না করছে। ”
“ আম্মা না করবেই। আম্মার কথা আমি শুনবো না এবার। আমার তোমাকে পছন্দ না বাতাসি। বোঝো বিষয় টা। বাচ্চা তো নও তুমি। ”

“ ঠিক আছে বুঝলাম। সাবধানে আসবেন,রাখছি। ”
ইয়াসিনের মুখের উপর ফোনটা কেটে দিলো বাতাসি।
মেহরিন আর ঊর্মি একই কলেজে পড়বে। ইব্রাহিম ঊর্মির ট্রান্সফার করিয়ে এনেছে। ইব্রাহিম একটুর জন্যও ঊর্মিকে চোখের আড়াল হতে দেয় না। বাড়িতে আরো দুজন কাজের লোক রেখেছে। মেহরিন কে সোলেমান কলেজে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতেই ইব্রাহিম ও আসে ঊর্মি কে নিয়ে। ক্লাস নম্বর খুঁজে ইব্রাহিম ঊর্মি কে মেহরিনের পাশে বসিয়ে রেখে গেছে। ছুটি শেষে আসবে নিতে। পুরো ক্লাসের সবাই আড়চোখে দেখছে তাদের। ক্লাসে সবাই কলেজ ড্রেস হিসাবে কামিজ গোলজামা পড়লেও মেহরিন ঊর্মি বোরকা নিকাব পড়া। মেহরিনের অস্বস্তি হতে লাগলো তাদের চাহনি তে। ঊর্মি ঘাড় বেঁকিয়ে বলল-

“ কিছু বলতে চাও আমাদের? ”
মেয়েদের ভেতরে একজন বলল-
“ তোমরা কি নতুন? ”
“ জ্বি। ”
“ আমার নাম ঐশী। তোমাদের নাম? ”
“ ঊর্মি। আর ওর নাম মেহরিন। ”
“ পরিচয় হয়ে ভালো লাগলো। ”
ঐশি গিয়ে সামনে নিজের সিটে বসলো। ক্লাসের বেল বেজা উঠায় বাহিরে থাকা ছেলেপেলে এক-এক করে ক্লাসে আসলো। টিচার আসতেই সবাই উঠে দাঁড়ালো। টিচার সিট ডাউন বলে ক্লাস শুরু করলো। ক্লাস চলার প্রায় ২৫ মিনিট পর একজন শ্রেণিকক্ষের দরজা দিয়ে স্যারের অনুমতি না নিয়েই সোজা ভেতরে ঢুকে পড়লো। স্যার একবার বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-

“ বাজে কয়টা? আর আমার অনুমতি ছাড়া ভেতরে কেনো আসলে? ”
ছেলেটা একবার স্যারের দিকে তাকিয়ে সামনের বেঞ্চে একটা ছেলেকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বসলো। স্যার আবার প্রশ্ন করলো-
“ আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি। ”
ছেলেটা বলে উঠলো-
“ আমার ইচ্ছে আমি কখন ক্লাসে আসবো না আসবো। আপনাদের ক্লাস করানোর কথা সেটাই করুন চুপচাপ। কে কখন আসলো কে কখন গেলো সেটা না দেখলেও চলবে। ”
স্যার রেগে গেলো ভয়ঙ্কর। ছেলেটার কলার ধরে রাগী গলায় বলল-
“ তুমি ক্লাসের একজন টপার বয় হতেই পারো। বাট মানুষ হিসেবে একদমই বাজে। বের হয়ে যাও আমার ক্লাস থেকে। আর কোনোদিন আমার ক্লাসে তুমি ঢুকবে না। তোমার মতো স্টুডেন্ট আমার দরকার নেই। ”
ছেলেটা স্যারের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-

“ এই বয়সে এমন রাগ মোটেও ভালো না। হার্ট অ্যাটাক করে মরতে বেশি সময় লাগবে না। বি কেয়ারফুল স্যার। চললাম,এমনিতেও আপনার ক্লাস আমার পছন্দ না। এই চল তোরা। ”
ছেলেটার ডাকে,সামনের সিটে থাকা চারজন উঠে চলে গেল। স্যার বিরবির করে দুটো বকা দিলো। মেহরিন হতবিহ্বল হয়ে গেলো একজন টিচারের সাথে স্টুডেন্টের এমন বিহেভিয়ার দেখে। এটা নওগাঁ হলে এতক্ষণ এই ছেলের গায়ে নিঃসন্দেহে বেতের বাড়ি পড়তো কয়েকটা। কি বেয়াদব অভদ্র ছেলে। আবার নাকি ক্লাসের টপার! ভদ্রতার ছিটেফোঁটা নেই। ক্লাস শেষ হওয়ার আধঘন্টা আগেই ইব্রাহিম এসে হাজির ঊর্মি কে নিতে। সোলেমান এখনও আসে নি। ইব্রাহিম বলল তাদের সাথে যেতে। মেহরিন মানা করলো। সোলেমান যেহেতু আসবে বলেছে সেহেতু ইব্রাহিমের সাথে না যাওয়াই ভালো। মেহরিন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।
ফোনে বারবার সময় দেখলো মেহরিন, সোলেমান কে ফোন করে জানতে পারলো সোলেমান কলেজে খুব কাছেই আছে,আসতেছে। মেহরিনের তেষ্টা পাওয়ায় ব্যাগ থেকে ওয়াটার বোতল বের করে পাশে মুখ ঘুরিয়ে নিকাব হাল্কা উঠিয়ে পানি খেলো।
কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলো সামির নামের ছেলেটা।মুখ ফিরিয়ে বামে তাকাতেই পানি খেতে থাকা এক মেয়েকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। যদিও মুখের এক সাইড দেখেছে।
সামির বন্ধুদের জিজ্ঞেস করলো-

“ মেয়েটা কে রে? ”
“ নতুন। আজ এসেছে কলেজে প্রথম। ”
“ নাম কি? ”
“ জানি না। ”
“ নাম ঠিকানা কোথায় এ টু জেট এনে দিবি আমায় কালকের মধ্যেই। ”
মেহরিন পানির বোতল টা ব্যাগে রাখতে রাখতেই দেখলো সোলেমানের গাড়ি। মেহরিনের সামনে থামতেই মেহরিন উঠে বসলো। সোলেমান সিট বেল্ট বেঁধে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ ক্লাস কেমন ছিলো আজ? ”
“ জি ভালোই। ”
“ ক্ষুধা লেগেছে? কোনো রেস্টুরেন্টে যাব? ”
“ না বাসায় চলুন। ”
সোলেমান মেহরিন কে নিবাসে নামিয়েই চলে গেল। মেহরিন বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখলো মাহি নিউজ দেখছে লিভিং রুমে। মেহরিন কে দেখামাত্রই মাহি মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলল-

“ কেমন ছিলো প্রথম ক্লাস? ”
প্রতিত্তোরে মেহরিন নিকাব টা খুলে বলল-
“ আনএক্সপেক্টেড ছিলো। ”
“ কেনো কিছু হয়েছে নাকি? ”
মেহরিন সব টা বলল। মাহি শুনে বলল-
“ এখানে পারিবারিক শিক্ষার অভাব আছে। এসব মানুষের থেকে সবসময় দূরে থাকবে। যাও এখন ফ্রেশ হয়ে নাও।”
মোহরিন চলে গেলো। মাহি টেবিলের উপর থেকে রিমোট টা নিয়ে নিউজ চ্যানেল বদলালো। বদলাতে বদলাতে হুট করে একটা আন্তজার্তিক খবরে মাহির চোখ আঁটকে গেল। এই প্রথম কোনো গবেষক একটা আশ্চর্য রকমের অ্যাপ্স তৈরি করেছে। যেটা নারী পাচার, ব্যাংক ডাকাতির মতো ভয়ানক অপরাধের সাথে জড়িত অপরাধী দের ধরতে ৮০% সহায়তা করবে। কোন দেশের এই গবেষক,আবিষ্কারকের নাম কি, কোনো কিছুই উল্লেখ নেই। তবে খুব শীগ্রই একটি অ্যাপ চালু হতে যাচ্ছে। অ্যাপ টার নাম- স্মার্ট সিটি মনিটরিং। এটি একটি ফোনভিত্তিক অ্যাপ, যা শহর পর্যবেক্ষণের পুরো ধারণাকে বদলে দিবে। এই অ্যাপটি মূলত একটি কেন্দ্রীয় ডেটা মনিটরিং সিস্টেম। সংবাদমাধ্যমে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও নীতিগত কারণে নাম প্রকাশ করা হয়নি আবিষ্কারকের। সেই আবিষ্কারকের তৈরি এই AI-চালিত স্মার্ট-সিটি মনিটরিং অ্যাপটি সীমিত পাইলট অনুমোদন পেয়েছে আজ। গবেষক কোন দেশের নাগরিক সেটাও ধোঁয়াশার মধ্যে। প্রাথমিকভাবে অ্যাপটির পাইলট কেবল তিনটি দেশে সীমাবদ্ধভাবে অনুমোদিত হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের নির্দিষ্ট কিছু শহরাঞ্চল।

এই অ্যাপটি শহরের বিভিন্ন উৎস থেকে অনুমোদিত ডেটা সিসিটিভি, ট্রাফিক ক্যামেরা, ব্যাংক সার্ভার, জনসমাগম সেন্সর, এমনকি পাবলিক ইভেন্ট সিগন্যাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সব ডেটা এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণ করবে।
অ্যাপটির প্রধান স্ক্রিনে দেখা যাবে শহরের একটি লাইভ মানচিত্র,যেখানে প্রতিটি এলাকার নিরাপত্তা অবস্থান রঙের মাধ্যমে প্রকাশ পাবে—
সবুজ মানে নিরাপদ,
হলুদ মানে সতর্কতা প্রয়োজন,
আর লাল মানে জরুরি নজরদারি দরকার।
ব্যক্তিগত শনাক্তযোগ্য ডেটা কেন্দ্রীয় সার্ভারে যাবে না, স্থানীয় প্রি-প্রসেসিং ও এনক্রিপশন ব্যবহার করা হবে। নাগরিকদেরকে অ্যানোনিমাইজড সতর্কতা দেখানো হবে। পাইলট পর্যায়ে স্থানীয় প্রাইভেসি কমিশন, স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড ও human-in-the-loop তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করছে।

ফলস্বরূপ, অপরাধ প্রতিরোধ, আর্থিক নিরাপত্তা, নারী পাচার, নাগরিক আস্থা এবং নগর নীতি উন্নয়নে সহায়তা হবে। পাইলটের মেয়াদ ৬–১২ মাস এবং ফলাফল পর্যবেক্ষণযোগ্য ও সীমিত। অ্যাপস টি আগামী সপ্তাহে চালু হতে যাচ্ছে এই তিনটি দেশে। এরপর পর্যায়ক্রমে বেছে বেছে কয়েকটি দেশে দেওয়া হবে। এই অ্যাপটি মূলত শহরের পুলিশ, প্রশাসন ও তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকবে। নাগরিকদের জন্য সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়। তারা শুধু অ্যানোনিমাইজড সতর্কতার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে জানতে পারবে।

দাহশয্যা পর্ব ৭৮ (৩)

মাহি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলো নিউজ টা। বলতে হবে অসাধারণ কিছু আবিষ্কার করেছে এই গবেষক। বাট নামধাম কেনো প্রকাশ করলো না? দেশ..না না বিশ্ব কে এমন দারুণ একটা জিনিস উপহার দিলো। নাম ঠিকানা কিচ্ছু নেই! বাংলাদেশের দ্বারা সম্ভব নয় এমন কিছু আবিষ্কার করা। নিশ্চয়ই বাহিরের দেশের গবেষক, হয়তো এই তিন দেশেরেই কেউ। কারন গবেষক নিজের দেশ কে বাদ রেখে তো আর অন্য দেশ কে দিবে না। বাট এই তিন দেশের মধ্যে কোন দেশের হতে পারে? এবার হয়তো বা নারী পাচার,ব্যাংক ডাকাতি কিছুটা হলেও কমবে। আসলেই কমবে? কোটি টাকার প্রশ্ন কিছুটা থেকেই যাচ্ছে। ফুলফিল ভাবে কাজ করতে পারবে তো এই অ্যাপ টা?

দাহশয্যা পর্ব ৭৯ (২)