দাহশয্যা পর্ব ৮০
Raiha Zubair Ripti
রাত বাজে পনে এগারোটা। প্রেমা নিজের রুমে শুয়েছিল। পায়ের আঘাতে ঠিকমতো ঔষধ না লাগানোর কারনে শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসলো। সেই জ্বর নিয়ে একটু আধশোয়া হতেই কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো বুঝতে পারলো না। প্রেমার ঘুম ভাঙলো কারো ধাক্কায়। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাতেই শেখরের মুখ টা দেখেই তড়িঘড়ি করে উঠে বসতে গিয়ে পায়ে অসম্ভব ব্যথা অনুভব করলো। শেখর একবার পায়ের দিকে তাকালো। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আসলো। আবার আরেক নাটক শুরু হলো! গায়ের শার্ট টা খুলে বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“ খাবার বাড় গিয়ে, আমি ফ্রেশ হয়ে আসতেছি। ”
প্রেমা হা না কিছুই বললো না। চুপচাপ বিছানা ছেড়ে উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিচ তলায় আসলো। মহসিন আলী সোফায় বসে ফোন টিপছিলো। প্রেমা কে দেখেই তিনি ফোন টা নামিয়ে বলল-
“ কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি,কোথায় ছিলে তুমি? ”
প্রেমা প্লেটে খাবার বাড়তে লাগলো। শেখর ফ্রেশ হয়ে চেয়ার টেনে বসলো। হাত ধুয়ে খাবার মুখে নিতে গিয়ে শেখর আবিষ্কার করলো সামির আজ খাবার টেবিলে নেই। প্রেমার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ সামির কে ডেকে আন। ”
প্রেমা তরকারি পাতে দিতে দিতে বলল-
“ বাসায় নেই সামির। ”
“ বাসায় নেই মানে? কোথায় গেছে? ”
“ সেটা আমি কি করে জানবো? আপনার ভাই আমাকে বলে যায়? ”
শেখর পকেট থেকে ফোন বের করে সামিরের ফোনে ফোন কল দিতে লাগলো। বারবার ফোন কেটে যাচ্ছে রিসিভ হচ্ছে না। মহসিন আলী খাবার খেতে খেতে বলল-
“ হয়তো ক্লাবে গেছে,থাকুক, তুই খা তো। ”
শেখর তাই করলো। খাওয়া শেষে চলে যাওয়ার সময় শেখর প্রেমা কে বলল তাড়াতাড়ি ঘরে যেতে। তার দরকার প্রেমা কে। একটা বারও জিজ্ঞেস করলো না প্রেমা খেলো কি খেলো না। যে যার যার মতো খেয়ে চলে গেল! প্রেমা আর খেলো না রাতে। খাবার গুলো ঢেকে পায়ে বেঁধে রাখা কাপড় টা খুলে দেখলো রক্ত জমাট বেঁধে শুকিয়ে গেছে। হাল্কা গরম পানি করে জায়গাটা আবার ধুয়ে নিলো প্রেমা। তারপর রুমে এসে টুথপেষ্ট লাগিয়ে বেঁধে ফেললো পা টা। শেখর তখন আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে। প্রেমা কে দেখামাত্রই বলল-
“ লাইট নিভিয়ে আয়। ”
প্রেমা লাইট নিভিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলো। কাছে যেতেই শেখর বা হাত টেনে ধরে বিছানায় টেনে ফেললো। পা গিয়ে লাগলো খাটের সাথে। ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো প্রেমা। বাহিরের ল্যাম্পপোস্টের বাতির আলোয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মুখ টা। শেখর যেন এই কুঁচকে যাওয়া মুখটা দেখে আনন্দিত হলো। প্রেমা দেখলো শেখরের মুখের সেই হাসি। কি জঘন্য একটা মানুষের সাথে প্রেমা সংসার করে…ছিঃ নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা আসে তার। শেখর যখন একেবারে কাছে চলে আসলো তখন প্রেমা এক অদ্ভুত জিনিস টের পেলো। শেখরের শরীর থেকে মেয়েলি পারফিউমের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। প্রেমা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো শেখর কে। চরিত্রহীন পুরুষ। আকস্মিক ধাক্কায় শেখর তাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়ে যায়। চোখ মুখে ভয়ংকর রাগ। প্রেমা ততক্ষণে উঠে বসেছে। ঘৃণায় শরীর কাঁপছে। কান্না রাগ সব একত্রে এনে প্রেমা তীরে মতো বলে বসলো-
“ আজও পতিতালয়ে গিয়েছিলেন আপনি? আজও কোনো এক নারীর দেহ শুষে খেয়ে এসেছেন তাই না? ছিঃ আর কত ভাবে আপনি আমাকে ভেঙেচুরে শেষ করে দিবেন শেখর? আপনার কি একটুও মায়া হয় না আমার জন্য? ”
শেখর উঠে এসে প্রেমার চুলের মুঠি ধরলো।
“ শা’লি তোর জ্ঞান শুনতে চাইছি আমি? তোর কাজ আমার সেবা করা,আমার চাহিদা পূরণ করা। বারতি কথা বলে কেনো রাগাস আমায়? আমার রাগ যে তোর উপর ভারী পড়ে জানিস না? নিজের বিপদ নিজে কেনো ডেকে আনিস। ”
প্রেমা ব্যাথাতুর গলায় বলল-
“ প্লিজ আপনি আমার কাছে আসবেন না। হয় আমাকে মুক্তি দিন আর তা না হলে আমাকে একেবারে মেরে ফেলুন? একজন চরিত্রহীন, পাপী,নোংরা পুরুষের বউ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো। ”
“ মৃত্যু চাস তুই? মৃত্যু? এতই সহজ ? চিন্তা করিস না তোর মৃত্যু আমার হাতেই লেখা আছে। কিন্তু…. ”
“ কিন্তু কি? ”
“ তোর বাপ আমার থেকে ৫ কোটি টাকা নিয়ে তোকে আমার কাছে বেঁচে দিয়েছে বিয়ের নাম করে। সেই ৫ কোটি আমি উশুল করবো তোর দেহ দিয়ে। তারপর বিশ্বাস কর তোর বেঁচে থাকার আয়ু টা আর এক সেকেন্ডের জন্যও থাকবে না এই পৃথিবীতে। ”
“ দেহ কি ভোগ করেন নি এই কয় বছরে? উশুল কি হয় নি সেই ৫ কোটি? কোন কোন অবস্থায় আপনি আমার সাথে মেলামেশা করেছেন ভুলে গেছেন? আমার পিরিয়ড টাইম বাদ রাখেন নি,আমি প্রেগন্যান্ট ছিলাম তখনও বাদ দেন নি। আমার নাড়ি ছিঁড়ে দু দুটো সন্তান কে টেনে হিঁচড়ে বের করে কুকুর কে খাইয়েছেন,সেই অবস্থা তেও আমার দেহ রক্ষা পায় নি। আমাকে মাতৃত্বের সুখ একবারের জন্যও পেতে দেন নি। আমাকে বন্ধ্যা বানিয়ে রেখেছেন। আপনার হাত পা ধরে আমি কেঁদে কেঁদে আমার সন্তানদের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিলাম এক ভিক্ষুকের মতো। আপনি লা’ত্থি মেরে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। আমার যেই শরীরে একটা দাগও ছিলো না। সেই শরীর আজ কালচে মারের দাগে কলঙ্কিত হয়ে কালো বর্ণের হয়ে গেছে। আমার মুখের দিকে তাকালে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন না? চোখের নিচে কালো দাগ,ঠোঁটের পাশে কালো দাগ। আপনার বাপ ভাই পর্যন্ত কুনজর দিতে বাদ রাখে নি আমার এই শরীরের উপর। আরো চাই উশুল? ”
শেখরের মাথা ধরে গেল এসব শুনে। সেজন্য কষে একটা চড় সে প্রেমার গালে দিয়ে বলল-
“ শালি একদম নাটক মারাবি না। তোর এই সুখ দুঃখের কথা আমি শুনতে চাই নাই। হয় আমার ঘরের বিছানায় থাকবি নইলে পতিতালয়ের পরপুরুষ দের সাথে থাকবি। এখন কোন পথে হাঁটবি ভেবে দেখ। ”
প্রেমা নুইয়ে গেলো। ইচ্ছে করছে খু’ন করে ফেলতে। চুপচাপ গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো প্রেমা। জীবন তোমাকে শান্তি দিবে না প্রেমা। কিন্তু জীবনের এই নিয়মেও তো তুমি চলতে পারবে না। শেখর আসলো,অনেকটা গভীর ভাবে আসলো কাছে। প্রেমা সেই গভীরতায় কোনো প্রেম,কোনো সহানুভূতি, কোনো সুখকর অনুভূতি খুঁজে পেলো না। পেলো শুধু আক্রমনকারী হিংস্র থাবা। দু চোখ বেয়ে শুধু তার নোনাজল গড়ালো। কি এক আশ্চর্য অমানুষিক চাহিদা শরীর নিয়ে। এই শরীরের জন্য কত কি সহ্য করতে হয়! মানুষ ঠিকই বলে ভাতে কুড়কুড়ায় না কুড়কুড়ায় যৌবনে। কেউ দু মুঠো ভাতের যাতনায় কষ্ট করে আর কেউ শরীর নিয়ে যন্ত্রণা ছটফটিয়ে মরে।
সোলেমান নিবাসে ফিরে ডানে-বামে না তাকিয়ে সোজা নিজের রুমে এসেছে। মেহরিন তখন পড়ার টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে ছিলো। বই পড়তে পড়তে হয়তো ঘুমে তলিয়ে গেছে। সোলেমান দেখলো বউ তার এভাবে টেবিলের উপর মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে আছে। পড়নের শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে হাত ঘড়িটা খুলে এগিয়ে গেলো। আলতো করে হাত রাখলো মাথায়। একটা পুতুল বউ তার। এই পুতুল বউকে কেউ ছোঁয়ার চেষ্টা করবে,দেখার চেষ্টা করবে আর সোলেমান জেনেও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে! প্রেমিকার জন্য যেখানে ভরা ক্যাম্পাসে মানুষ পেটাতে পেরেছে সেখানে বউয়ের বেলায় তো মানুষ খু’ন করতেও দ্বিধা করবে না এই সোলেমান। কলিজা টেনে বের করে আনবে তার বউয়ের দিকে নজর দিলে। এখন এই নজর যেই দিক।
মেহরিন মাথার উপর হাল্কা ভারি অনুভব করতেই পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো। সোলেমান কে দেখামাত্রই সে হুড়মুড়িয়ে উঠতে গিয়ে কনুই তে ব্যথা পেলো। সোলেমান সাথে সাথে অস্থির গলায় বলল-
“ আরে আস্তে বউ আস্তে। দেখি দেখি কোথায় ব্যথা পেলে। ”
মেহরিন আলতো করে বলল-
“ বেশি পাই নি। সামান্য ব্যথা। অস্থির হবেন না। ”
“ তোমার এই সামান্য ব্যথাই আমার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয় মেহরিন। আমার অক্সিজেনের সাথে সাথে কি শরীরের শিরা-উপশিরায় বয়ে যাওয়া র’ক্তের সাথেও মিশে গেলে নাকি? ”
মেহরিন আড়চোখে তাকালো। সোলেমান মেহরিনের ডান হাতটা তুলে নিলো হাতে। এই হাত দিয়েই তো চ’ড় মেরেছিল। একটা কেনো মা’রলো চ’ড় মেহরিন? অন্ততপক্ষে তো আরো কয়েকটা দেওয়া উচিত ছিলো। থাক বউ না দিতে পারলো সোলেমান তো পুষিয়ে নিয়েছে।
“ আজকে তোমার এই হাতটার সৌন্দর্য বোধহয় একটু বেশিই বেড়ে গেছে। খেয়াল করেছো তুমি? ”
মেহরিন বুঝলো না সোলেমানের বলা এই কথার মানে। হাতের সৌন্দর্য বেড়ে গেছে মানে? সোলেমান হাতটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে চুমু খেতে শুরু করলো। মেহরিন ভেবেছিল দু একটা চুমু দিবে যা সচারাচর দিয়ে থাকে। কিন্তু আজ থামছেই না। চুমুর পর চুমু দিয়েই যাচ্ছে! মেহরিন হাতটাও সরিয়ে আনতে পারছে না। একটু চাপা স্বরেই বলল-
“ এত চুমু খাচ্ছেন কেনো হাতে? শরীর ঠিক আছে? ক্ষুধা লেগেছে? ভাত খাবেন? ”
সোলেমানের সোজাসাপটা জবাব-
“ না। পেটের ক্ষুধা নেই তবে…”
“ তবে কি? ”
“ আত্মিক আর দৈহিক ক্ষুধা লেগেছে।এখন তুমি মেটাতে দিলে তবেই মিটবে এই ক্ষুধা । ”
“ আপনাকে অস্বাভাবিক কেনো লাগছে আজ? ”
সোলেমান গুনে গুনে মেহরিনের হাতে একশত দশটা চুমু খেয়ে এবার দৃঢ় দৃষ্টি নিয়ে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ তুমি কিছু লুকিয়েছো আমার থেকে মেহরিন। ”
মেহরিন থতমত খেয়ে গেলো।
“ ক..কি লুকাবো? ”
“ কলেজে কেউ তোমার সাথে বাজে বিহেভিয়ার করেছিল,,অ্যাম আই রাইট ওর রং? ”
মেহরিন হাত ছাড়িয়ে আনলো।
“ করেছিল বাজে বিহেভিয়ার। বিষয় টা আমি সেখানেই ক্লোজ করেছি। আশা করবো সেই ছেলে দ্বিতীয় বার আর এমন করবে না। ”
সোলেমান ঠোঁটে আঙুল চালিয়ে বিরবির করে বলল-
“ দ্বিতীয় বার করার মতো অবস্থায় থাকলে তো করবে। ”
“ কিছু বললেন? ”
“ না। খেয়েছো তুমি? ”
“ না। ”
“ খাবে না? ”
“ উঁহু। ”
“ তাহলে আমরা সময় নষ্ট করছি কেনো? ”
“ সময় নষ্ট করছি মানে? ”
“ শুভ কাজে বিলম্বিত করা মানে সময় নষ্ট করা। আর সময় নষ্ট কারিরা শয়তানের বন্ধু হয়ে থাকে।”
কথাটা বলেই সোলেমান মেহরিন কে পাঁজা কোলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যেতেই মেহরিন শক্তপোক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সোলেমানের গলা। তারপর বুকে মুখ লুকাতেই সোলেমান মুচকি হেঁসে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে গাইলো-
“ Aaj Phir Tumpe Pyar Aaya Hai
Behad Aur Beshumar Aaya Hai….
তারপর তারা ইতিহাস গড়তে ব্যস্ত হয়ে গেল। এই একই রাতে কেউ স্বামীর ছোঁয়ায় সুখ খুঁজে পেলো আর কেউ পেলো অসুখ।
এজওয়ান রাতে আর বাড়ি ফিরে নি। ফিরেছে একেবারে ভোর বেলায়। মাহি তখন ঘুমে বিভোর। এজওয়ানের মনে হলো মাহি আজ শান্তি ঘুম ঘুমিয়েছে। অবশ্য এজওয়ান যতক্ষণ না থাকে তার সাথে ততক্ষণ নাকি মাহি শান্তি পায়। এ কথা শুনে প্রতিবার এজওয়ান মুখ ভেংচায়। মীরজাফরের গুষ্টি একটা। এজওয়ান ফ্রেশ হয়ে একেবারে গোসল সেরে বের হলো। মাহি পানি পড়ার শব্দ শুনে উঠে বসেছে। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকাতেই দেখলো এজওয়ান পড়নে টাওয়াল পেঁচানো শার্ট বিহীন উন্মুক্ত শরীরে মাথা মুছতে মুছতে বের হচ্ছে। মাহির চোখ গিয়ে প্রতিবার আটকায় ঐ লকেটের দিকে। আর মাহি শিউরে উঠে। এজওয়ান মাহি কে এভাবে হা করে হাভাতের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে হাতে থাকা ভেজা টাওয়াল টা মাহির মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বলল-
“আই নো তরিকুলের বেটি, আই অ্যাম দা মোস্ট হ্যান্ডসাম, মোস্ট ড্যাশিং, মোস্ট কিউট অ্যান্ড মোস্ট লয়্যাল হিউম্যান ইন দিস ওয়ার্ল্ড।
সো হোয়েন ইউ লুক অ্যাট মি, লুক হার্ড, যাতে আই ক্যান কমপ্লিটলি লুজ মাই ব্যালেন্স অ্যান্ড ফল ফর ইউ। আন্ডারস্ট্যান্ড ? ”
মাহি চোখ ফিরিয়ে নিলো। এজওয়ান ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ বুঝছো? ”
মাহি বিরক্তের সহিত বলল-
“ বুঝছি। ”
এজওয়ান বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল-
“ তুমি আমার কচু বুঝছো। তোমারে বোঝাতে বোঝাতে আমি এখন নিজেই কম বুঝি। ”
“ আপনি বুঝবেন কম! এ-ও বিশ্বাস করতে হবে আমায়? অতিরিক্ত বোঝা মানুষ আপনি এজওয়ান। ”
“ এতো অতিরিক্ত বুঝেও তো তোমায় কিছুই বোঝাতে পারলাম। সো স্যাড লাগে নিজের উপর।”
“ আমাকে বোঝাতে আসলে আপনি নিজেই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবেন। সো বি কেয়ার ফুল। ”
“ সরি,আমার ডিকশিনারিতে কোনো কেয়ারে ফুল টুল নেই। তাই কেয়ার ফুল হতে পারছি না। ”
“ ফুলস্টপ তো আছে? ”
“ না সেটাও নাই। তবে দাঁড়ি আছে আর সেটা তাও আবার আমার মুখে। ”
“ সারা রাত কোথায় ছিলেন? ”
“ পেট খারাপ ছিলো। সেজন্য মলমূত্র ত্যাগ করতে ব্যস্ত ছিলাম সারা রাত। তুমি মিস করেছো আমায়? ”
“ কখনই না। আজ তো…
“ শান্তি মতো ঘুমাইছো সেটাই তে বলবা। ”
“ জ্বি। ”
“ তোমারে আমি হামানদিস্তায় পিষে পিষে মে’রে ভর্তা বানাতে পারলে মনের দুক্কু টা মিটতো। ”
“ আর আপনাকে আমি শূলে চড়িয়ে কয়েক ঘা অনবরত দিতে পারলে আত্মিক শান্তি পেতাম। ”
“ অসভ্য বর্বর মহিলা একটা। দয়ামায়া নাই মনে। ভালোবাসতে পারো না আমায়? ভালোবেসে দেখো এজওয়ান সুলতান তোমার জন্য কি কি করে। ”
“ যাকে তাকে আমি মাহি ভালোবাসি না। যারা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য তাদেরই বাসি। ”
“ হ জানি তো কারা সেই যোগ্য মানুষ। তোমার এক্স শা’লা সাফওয়ান। আমি তাকে শালা বানিয়েছি,মানে সে তোমার পাতানো ভাই। সো এখন থেকে ভাই বলে ডাকবে তাকে।”
“ জান কলিজা বাবু শোনা বলে ডাকবো ভালোবেসে। আপনি শুনবেন? ”
“ সর দূর হ আমার চক্ষের সামনে থেকে। আমি ভুলেই গেছিলাম যে ভালোবাসা হচ্ছে একটা বারোভাতারি। তোর কাছে ভালোবাসা চাওয়া মানে নিজের গু নিজে খাওয়া। যেই শালায় কয় ভালোবাসা সুন্দর সেই শালার মায়রে আসসালামু আলাইকুম। ভালোবাসা আর পরকীয়া দুইটাই সেম সেম গুয়ের টাঙ্কি। এই দুইটা জীবনেও পেটের ভিতর থাকতে পারে না পশ্চাৎদেশ দিয়ে বেরিয়ে যাবেই । আর শালার ব্যাটারা এটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধতম অনুভূতি বইলা চালায় দেয়। আল্লাহর লানত পড়বে এই শালার ব্যাটাদের উপর। ”
কথাটা বলে এজওয়ান চলে যাচ্ছিলো। দরজার কাছে গিয়ে ফের থেমে গেল। কিছু একটা ভেবে ঘাড় ফিরিয়ে বলল-
“ ঐ তরিকুলের বেটি…তারপরও তোম্রে আইলাভিউ। এখনও সময় আছে ভালো হয়ে যাও। স্বামী ভক্তি হও সওয়ার পাবা। ”
মাহি ফ্রেশ হতে চলে গেল।
সোলেমান মেহরিন কে কলেজে পৌঁছে দিয়ে আজ আর সাথে সাথে চলে যায় নি। মেহরিন কে তার ক্লাস রুমে চলে যেতে বলে সোলেমান সোজা চলে গেছে অফিস কক্ষে। মেহরিন কিছুটা অবাক হলো। অফিস রুমে কেনো গেলো উনি? গতকাল কের বিষয় টা নিয়ে কিছু করতে নয় তো? মেহরিন হাসফাস করতে লাগলো। ঊর্মি টাও নাকি ক’দিন আসবে না কলেজে। ডক্টর রেস্ট নিতে বলছে। অতিরিক্ত চিন্তা করার কারনে নাকি শারীরিক কিছু ত্রুটি দেখা গেছে। যা বাড়তে থাকলে বাচ্চার উপর ইফেক্ট ফেলতে পারে। ইব্রাহিম কোনো রিস্ক নিতে চায় না। দরকার পড়লে পড়ার সব নোটস ইব্রাহিম কালেক্ট করে এনে দিবে। তাও বউ নিয়ে নো রিস্ক।
বিয়ে টা যেভাবেই হোক,তবে বলতেই হয় ঊর্মি একটা সাপোর্টিভ কেয়ারিং লাভিং স্বামী পেয়েছে। তবে পাওয়ার রাস্তাটা মারাত্মক বাজে ছিলো। এজন্য বুঝি লোকে বলে-
~ সখি তোরা প্রেম করিও না
পিরিত ভালো না…
পিরিত করছে যে জন
জানে সে জন,, পিরিতের কী বেদনা….
মেহরিন লক্ষ করলো আজকে সেই বেয়াদব ছেলেটা আসে নি কলেজে। তাহলে কি গতকালের চড়ে ছেলেটার শিক্ষা হয়ে গেছে? মেহরিন তপ্ত শ্বাস ফেলে অপেক্ষা করলো ক্লাস শুরু হওয়ার। আজকের প্রথম ক্লাস টা হলো বাংলা। টিচার গুলো বেশ ভালোই পড়ায়। সেকেন্ড ক্লাসের সময় কলেজের প্রিন্সিপাল আসলো। সবাই বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম জানালো। তিনি সবাইকে হাত দেখিয়ে বসতে বললেন। সবাই বসতেই প্রিন্সিপাল জানালো আজ তাদের বায়োলজি ক্লাস টা নিউ টিচার নিবে। সবাই কৌতূহল হলো। কোন নিউ টিচার নিবে ক্লাস? প্রিন্সিপাল ইশারায় বাহিরে তাকিয়ে বলল-
“ আসো,ভেতরে আসো ইয়াং ম্যান। ”
লোকটা ভেতরে আসলো। পায়ের শব্দ শুনে মেহরিন দরজার দিকে তাকালো। আর তাতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সুলতান সাহেব নিবে তাদের ক্লাস! উনিই সেই নিউ টিচার! কই মেহরিন কে তো সে বললো না! সোলেমান একবার শুধু বাঁকা চোখে তাকালো মেহরিনের দিকে। বউয়ের এক্সপ্রেশন দেখে বাঁকা হাসলো। তারপর প্রিন্সিপালের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রিন্সিপাল সব বলে দিলো নাম টাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ তম ব্যাচের টপ বয় ছিলো এই নওয়াজ সোলেমান সুলতান। ক্লাসের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে চিনে এই নওয়াজ সোলেমান সুলতান কে। কারন সোলেমানের পেজ তারা ফলো করে। ছেলেমেয়ে দের হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছে। এই হ্যান্ডসাম এমপি এখন নাকি তাদের টিচার…ও মাই গুডনেস টাইপের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। মেহরিন আশেপাশে তাকালো। কিভাবে হাভাতের মতো তাকিয়ে আছে। এরা কি জানে না এই লোক বিবাহিত? আশ্চর্য পরের স্বামীর দিকে এমন নজর দেওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক?
প্রিন্সিপাল চলে যেতেই সোলেমান পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে হাতের মার্কার টা রেখে গলা ঝেড়ে বলল-
“ ইতিমধ্যে প্রিন্সিপাল স্যার আমার পরিচয়টা অলরেডি দিয়ে গেছে,তাই নতুন করে নিজের পরিচয় দিয়ে সময় নষ্ট করছি না। আর সবার পরিচয় জানতে গেলে ক্লাসের সময় শেষ হয়ে যাবে কিন্তু পরিচয় নেওয়া শেষ হবে না। তাই আমি আমার মতো করে জেনে নিচ্ছি….এই থার্ড বেঞ্চের সেকেন্ড… ইউ পরিচয় দাও। ”
একটা ছেলে দাঁড়ালো। ছেলেটা তার পরিচয় দিতেই সোলেমান তার দু বেঞ্চ পেছনের আরেকজন কে দাঁড় করালো। বেশ বেছে বেছেই দাঁড় করাচ্ছে। চতুর্থ টাইমে এবার সোলেমান মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ হেই ফোর্থ বেঞ্চ ইউ,পরিচয় দাও। ”
মেহরিন হকচকিয়ে গেলো। আশেপাশে তাকাতে তাকাতে দাঁড়ালো। সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“ হোয়াটস ইউর নেইম?”
নাম জানার পরও জিজ্ঞেস করছে! মেহরিন বলল-
“ মেহরিন তাবাসসুম। ”
সোলেমান চোখ মুখ কুঁচকে বলল-
“ হোয়াট? মেহরিন কি? ”
মেহরিন হাত কচলে বলল-
“ ম…মেহরিন সুলতান। ”
“ সিট ডাউন। ”
মেহরিন বসে পড়লো। বাপরে এখন নাকি স্বামী তার টিচার! রাজনীতি ছেড়ে শিক্ষক হতে গেলো কেনো?
পুরো ক্লাসটা সোলেমান একদম পারফেক্ট ভাবেই পড়ালো। নিঃসন্দেহে টিচার হিসেবে বেস্ট। কিন্তু মেহরিনের সমস্যা হচ্ছে এই বেস্টে। মেয়ে গুলো কিভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। সোলেমান ভুলেও এদিক ওদিক তাকাচ্ছে না। তার পুরো মনোযোগ বই আর হোয়াইট বোর্ডে। তাকে দেখে কেউ বুঝবে না যে এই লোকের বউও উপস্থিত আছে এই ক্লাস রুমে। পুরো ক্লাসের সব পড়া নোট করে নিলো মেহরিন। ঊর্মি কেও তো দিতে হবে। যখন ঘন্টার পড়লো সোলেমানের ক্লাস শেষ হলো তখন সোলেমান দ্বিতীয় বার তাকালো। মেহরিনের সাথে চোখাচোখি হতেই মেহরিন দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।
মেয়ে গুলো ফিসফিস করতে লাগলো,আজকের ক্লাসটা নাকি বেস্ট ক্লাস ছিলো। সোলেমান সুলতান টিচার হিসেবে এত্তো ভালো! অলরাউন্ডার দেখছি এই সোলেমান সুলতান। ব্যাটার বউ যে হবে সেই মেয়ে তো লাকি নম্বর ওয়ান। আরো কত হাবিজাবি কথাবার্তা বললো। মেহরিনের কান লাল হয়ে যেতে শুরু করলো। স্বামী কে নিয়ে অন্য নারীর মুখে এমন টাইপের কথা শুনলে তো যে কারোরই রাগ হবে এটাই স্বাভাবিক। মেহরিন অস্থির মন নিয়ে বাকি ক্লাস গুলোও করলো।
ক্লাস শেষে যখন মেহরিন গেটের কাছে আসলো তখন দেখলো নিত্যদিনের মতো সোলেমান দাঁড়িয়ে আছে গাড়িতে হেলান দিয়ে। আজ আর মুখে মাস্ক নেই সোলেমানের। মেহরিন এগিয়ে গিয়ে উঠে বসতেই তাদের ক্লাসের ক’জন ছেলে মেয়ে দেখে ফেললো। হায়হায় তাদের ক্রাশের গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো কেনো এই মেয়ে? ক্রাশের কি লাগে এই মেয়ে? কালই জাপ্টে ধরবে তারা সবাই মেহরিন কে। কি হয় মেহরিন তাদের ক্রাশের? বোন? নাকি ভাগ্নী,ভাস্তি? সোলেমান সুলতানের তো শুনেছে একটা বোনও আছে। এটাই কি তাহলে সেই বোন? হায়হায় তাদের ননদ তাহলে এই মেহরিন। নাহ্ খুব সুইট ভদ্র ব্যবহার করতে হবে তাদের মেহরিনের সাথে।
মেহরিন গাড়িতে উঠে বসতেই সোলেমান যখন ড্রাইভিং সিটে বসলো মেহরিন সাথে সাথে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো-
“ আপনি রাজনীতি ছেড়ে কলেজের টিচার হলেন কেনো? আর আমাকে আগে বলেন নি কেনো? ”
” বললে কি হতো? ”
“ জানা থাকতো। তাহলে আর এতো অবাক হতাম না ক্লাসে। ”
সোলেমান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল-
“ আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টেক এনি রিস্ক উইথ ইউ। ”
“ রিস্ক! আমাকে নিয়ে? ”
“ ইয়েস। আমার তো শত্রুর অভাব নেই। কখন কোন জা’নোয়ার এসে আমার আদুরে বউয়ের ক্ষতি করে বসে,সেজন্য চাই না আমার বউ আমার চোখের আড়ালের বাহিরে থাকুক। যতক্ষণ তুমি নিবাসের বাহিরে থাকবে ততক্ষণ আমি তোমার সাথেই আছি। ”
“ এতো শত্রু জুটালেন কি করে? ”
“ আমার হটনেস দেখিয়ে। ”
কথাটা বলেই সোলেমান মেহরিনের দিকে তাকাতেই দেখলো মেহরিন হাসছে।
“ হাসছো কেনো মেয়ে? ”
মেহরিন হাসি থামিয়ে বলল-
“ তারা কি লেসবিয়ান? ”
“ এই তো একদম সত্যি গেস করেছো। আসলেই ওরা হয়তো লেসবিয়ান। নইলে ছেলে হয়ে কেনো ছেলের পেছন লাগবে? অশিক্ষিত ছেলেপেলে কোথাকার। ”
সারা রাস্তা দু’জনে বকবক করতে করতে ফিরলো নিবাসে।
বাতাসি আজ মেরুন রঙের একটা সেলোয়ার-কামিজ পড়েছে। এই কামিজ টা পাশের বাড়ির সাবিনা আপা দিছে। সে আগের তুলনায় মোটা হয়েছে বলে নাকি এখন আর গায়ে লাগে না। বাতাসি নিলো। এমনিতেও তো তার জামাকাপড় তেমন নেই। ইজ্জত ঢাকতে হলে তো নিতেই হবে হাত পেতে। ভাই তো নেই যে তাকে বলবে বায়না করে কিনে দিতে। আর স্বামী? সে তো লাপাত্তা। বউ কালো বলে ঘেন্নায় তাকায় অব্দি না। তার কাছে নিজের কিছু চাওয়া মানে নিজের মুখে নিজে জুতার বারি মা-রা। বাতাসির মা আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে ডেকে উঠিয়েছে বাতাসি কে। এই গা কাঁপানো শীতে নাকি এখন চকে গিয়ে পুকুর থেকে কলসিতে করে পানি নিয়ে ধানের চারায় দিতে হবে। বাতাসি বড় একটা কোলসি নিয়ে চলে গেল চকে। একটা সুইটারও নেই। সব পুড়িয়ে ফেলছে বাতাসি চলে যাওয়ার পরই। রোদ নেই আজ,পুকুরের পানি প্রচুর ঠান্ডা। পুকুর থেকে পানি নিয়ে ক্ষেতে যেতে ৫ মিনিট লাগে। বাতাসি কম করে হলেও এই ৫ মিনিটের পথ যেয়ে যেয়ে পানি দিয়ে আসলো। পানি দেওয়ার কাজ শেষ হলো ৯ টার দিকে। তখন হাল্কা একটু রোদের আভাস পাওয়া গেলো।
বাতাসি কিছুক্ষণ ক্ষেতের পাশে বসে রইলো। একটু জীবনের অংক কষতে ব্যস্ত হলো। তার ভবিষ্যৎ কি? ভাই চলে যাওয়ার পর পড়াশোনা টাও বন্ধ। সে কি করবে এখন? এভাবেই কি শুধু শ্রোতের মতো ভেসে বেড়াবে? কিন্তু আর কতদিন এভাবে চলবে? আর একটু পড়াশোনা জানা থাকলে বাতাসি নিশ্চয়ই শহরে একটা চাকরির সন্ধান করতো। কিন্তু বাতাসি তো মাধ্যমিক টাও পাশ করে নি। আরো কত কত ভাবনা ভাবলো। ভাই চলে গেল কিন্তু বাতাসি কে নিয়ে গেলো না। কি বৈষম্য এই ছোট্ট বাতাসির সাথে সবার! একদিন দেখবে সবাই বাতাসি আর কারো বিরক্তের কারন হবে না,একদিন অভিমান করে সত্যি সত্যি চলে যাবে। তখন কি সবাই ভুলে যাবে? হুমম, ভুলেই তো যাবে। জীবিত বাতাসি কেই কেউ মনে রাখে না সেখানে মৃ’ত মানুষ কে মনে রাখবেই বা কে? বাতাসি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হাঁটা ধরলো। বাড়ি গিয়ে আরেক ঝামেলার সম্মুখীন হতে হলো। বাতাসির মা বাড়ি মাথায় করে ফেলেছে। সকালের রান্না কেনো এখনো করে নি বাতাসি? কি আশ্চর্য! বাতাসি কয়দিকে ছুটবে? তার হাত পা কয়টা? এক সাথে কত কাজ করবে?
“ নবাবজাদি আসছিস তুই? পানি দিতে এতক্ষণ লাগে ক্ষেতে? তোর জন্য যে আমাকে বকা খেতে হলো। ”
বাতাসির রাগ হলো। এখানেও তার দোষ!
“ পানি দিতে তো সময় লাগে আম্মু। তুমি তো রাঁধতে পারতে আমি না আসা অব্দি। আমি আসলে না হয় তখন উঠে যেতে। ”
এই তো বাতাসি তার মাইর বোধহয় কিনে আনলো। মুখে মুখে তর্ক! এত মানুষ ম’রে এই মেয়ে মরতে পারে না? ছেলেটার বদলে এই কালি ম’রতো,তাহলে তো হাফ ছেড়ে বাঁচত। না কইলজা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য বেঁচে রইছে। স্বামীর বাড়িতে না গিয়ে এই বাড়িতে এসে ফের জুটেছে।
বাতাসির মা শোলার ঝাড়ু টা হাতে নিয়েই কয়েক ঘা বসিয়ে দিলো। অশ্লীল অশ্লীল ভাষায় বকতে বকতে সে বাতাসি কে উঠানের মাঝে ফেলেই মা’রতে রাগলো। প্রচুর রাগ চেপে আছে। ইয়াসিন নাকি বাতাসি কে আর নিবে না। সেই রাগ এখন তীব্র ক্ষোভে পরিনত হয়ে সব একেবারে ঝেড়ে দিলো। শোলার ঝাড়ুর অংশ গুলো কিছু কিছু শরীরেও বিঁধে গেলো। কোনো জায়গা বাদ রাখে নি মারার। মুখ, পিঠ,হাত, বুক,পা সব জায়গায় মেরেছে। কেমন ছিলে ছিলে গেলো জায়গা গুলো। বাতাসি পা জড়িয়ে ধরলো,আকুতি মিনতি করলো। বাতাসির মায়ের মন গললো না। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বাতাসির সৎ ভাই বোন। ভয়ে তারাও কেঁদে দিচ্ছে। বাতাসির এই তীব্র আর্তনাদ মহিলার কান অব্দি গেলো না। এক জন্মদাত্রী মা,মেয়ে দেখতে কালো বলে ভালোবাসে না,অথচ মা’রার জন্য সবসময় সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। যখন মা’রতে মারতে ক্লান্ত হয়ে গেল তখন যেন তিনি সরে গেলেন। ততক্ষণে বাতাসির শরীর ব্যথায় জমে হিম হয়ে গেছে। বাতাসির মা বলল- এই মেয়েকে আর থাকতে দিবে না বাড়িতে। বাড়ির ত্রিসীমানায় দেখলেই খুব খারাপ হবে। বাতাসির চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তে লাগলো। এত কষ্ট কেনো তার? এর চেয়ে আল্লাহ তুমি মানুষ রূপে না পাঠিয়ে কুত্তার রূপে পাঠাতে। তাও মনকে বাতাসি বুঝ দিত,সে কুত্তা সেজন্য এমন অবহেলিত। কিন্তু তুমি যে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পাঠিয়েও তাকে সেরা জীবের স্থানে আসতে দিলে না! তার জন্মটাই পাপ,নাকি মানুষ হয়ে আসাটা পাপ? নিজের ভাগ্য যদি অগ্রীম দেখা যেত তাহলে কতই না ভালো হতো। যদি সুখ থেকে থাকতো তাহলে বাতাসি খুব খুশি হতো সেই এক সেকেন্ডের সুখের জন্য।
বাতাসি ওভাবেই কাতরাতে কাতরাতে পড়ে রইলো উঠানে।
ইয়াসিন গতকাল রাতে মায়ের সাথে খুব রাগারাগি করেছে। মা ফোন দিলেই শুধু বাতাসি বাতাসি করে। নিজের পেটের ছেলের চেয়ে কেনো পরের মেয়ের জন্য এতো দরদ থাকবে তার? ইয়াসিনের রাগ হয়। সেজন্য লাস্ট কথা বলেই মায়ের ফোন নম্বর টা ব্লক করে রেখেছে। সোলেমান ভাই ও এক সপ্তাহ তার সামনে যেতে না করেছে। অগ্যতা ইয়াসিন ঘর টু টঙের দোকানেই ঘুরঘুর করে সময় কাটাচ্ছে। আকস্মিক বিকেল থেকে ইয়াসিন তীব্র খারাপ কিছু অনুভব করলো। চায়ের দোকানে চা খেতে গিয়েও সেই চা আর তার গলা দিয়ে নামলো না। হাসফাস করলো। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলো। সকালে মায়ের সাথে ওভাবে রুড হয়ে কথা বলা একদই উচিত হয় নি। সেটার জন্যই নিশ্চয়ই খারাপ লাগছে? হ্যাঁ সেজন্যই হয়তো। ইয়াসিন মাথার চুল গুলো নাড়িয়ে চাড়িয়ে বসা থেকে উঠে বাড়ি গেলো। হাত মুখ ধুয়ে ফোন টা হাতে নিয়ে নিজেকে বোঝালো মায়ের সাথে কোনো উচ্চবাক্যে কথা বলবি না ইয়াসিন। সে তোর মা। মায়ের সাথে এমন ব্যবহার কেউ করে না। ইয়াসিন সময় নিয়ে বোঝালো তাকে। হ্যাঁ বুঝলো মন। ইয়াসিন মায়ের নম্বর টা ব্লক লিস্ট থেকে আনব্লক করে কল লাগালো।
একবার, দুবার তিনবার কম করে হলেও ইয়াসিন ১০-১২ বার ফোন দিলো। ফোন রিসিভ হচ্ছে না। মা ফোন কেনো রিসিভ করছে না? খুব হার্ট হয়েছে তাই না? ইশ ইয়াসিন এক মেয়ের জন্য কেনো তুই মায়ের সাথে মিস বিহেভিয়ার করলি? ইয়াসিন আবার ফোন করলো। বারবার বলতে লাগলো- আম্মা অ্যাম সরি আম্মা। ফোনটা ধরো আম্মা। আর রাগ করবো না। একটু ধরো। না ফোন রিসিভ হলো না। ইয়াসিনের নিজের উপর তীব্র রাগ হলো। এই বাতাসি তার জীবনে আসার পর থেকে সে কেমন যেন খারাপ হয়ে গেলো। রাগে দুঃখে ইয়াসিন মাথা নিচু করে বসে রইলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো,সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যখন ফের নতুন সকাল এলো তখন ইয়াসিনের নম্বরে ফোন আসলো একটা। ইয়াসিন তাকিয়ে দেখলো মায়ের নম্বর টা ভাসছে ফোনের স্কিনে। অধৈর্য অনুতাপে ভরা হৃদয় টায় যেন এক পশলা সুখ আসলো। ইয়াসিন তড়িঘড়ি করে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বলল-
“ আম্মা আম্মা অ্যা’ম সরি আম্মা। আর কোনোদিন আমি তোমার মুখের উপর ফোন কেটে দিব না। আর কোনো দিন খারাপ ব্যবহার করবো না । প্লিজ আম্মা, প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দাও। খুব অভিমান হয়েছে তাই না? খুব কষ্ট পেয়েছো আমার ব্যবহারে। এই অধম কে শেষ বারের মতো ক্ষমা করে দাও। আম্মা আম্মা কথা কও আম্মা। চুপ কেনো তুমি? কি হলো বলো করবা না ক্ষমা বলো?…”
ওপাশ থেকে মায়ের কন্ঠ আর ভেসে আসলো না। আসলো এক অপরিচিত গলার স্বর। কেউ একজন বলল-
“ ইয়াসিন রে তোর মায় আর নাই। ম’ইরা গেছে….”
দাহশয্যা পর্ব ৭৯ (২)
ইয়াসিনের পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। কানে বাজতে লাগলো একটা শব্দই- তার মা আর নাই..মইরা গেছে..! হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেলো ফ্লোরে। মায়ের মুখটা ভাসছে চোখের সামনে। সেই যে সেদিন আসলো ইয়াসিন,ইয়াসমিন বেগম বারবার ইয়াসিনের গা হাতিয়ে বোঝাচ্ছিলো। আর ইয়াসিন বারবার বিরক্তের সহিত হাত সরিয়ে দিচ্ছিলো। ইয়াসিন যদি ঘুনাক্ষরেও টের পেত সেই হাতরানোই ইয়াসমিন বেগমের শেষ হাতরানো ছিলো তাহলে ইয়াসিন ভুলেও সেই হাতটা সরিয়ে দেওয়ার মতো দুঃসাহস দেখাতো না। শরীরের ভারসাম্য আর ধরে রাখতে পারলো না ইয়াসিন। গগনবিদারী এক চিৎকারে সে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। ওপাশ থেকে বারবার কেউ হ্যালো হ্যালো করছে। ইয়াসিন আর ডানে-বামে তাকালো না। পাগলের ন্যায় ছুট লাগালো দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে…..
