Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮১

দাহশয্যা পর্ব ৮১

দাহশয্যা পর্ব ৮১
Raiha Zubair Ripti

ইয়াসিনের বুকের সাথে লেপ্টে আছে বাতাসি। আকাশে বিজলি চমকাচ্ছে। থেকে থেকে সেই বিজলির চমকে চারিপাশ টা আলোকিত হচ্ছে। শীতে কেঁপে উঠছে বাতাসির ছোট্ট শরীর টা। বাতাসির গরম শ্বাস আছড়ে পড়ছে ইয়াসিনের বুকে। ইয়াসিন বৃষ্টি ছাড়ার অপেক্ষা করছে। কিন্তু নাম নিচ্ছে না কমার। অনেকক্ষণ বাতাসি কে বুকের সাথে এক হাত দিয়ে আগলে রাখলো। তারপর বৃষ্টি হাল্কা কমতেই সে বাতাসির হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো। গরম পোশাক পড়তে হবে বাতাসির।
বাতাসির মা দরজা কপাট দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে স্বামী সন্তান নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই এক হাঙ্গামা হয়ে গেছে বাড়িতে। আকস্মিক দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ শুনে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেললো। একপ্রকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে উঠে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই ফের ইয়াসিনকে, এবার তার সাথে বাতাসি কে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। ইয়াসিন বাতাসির দিকে তাকিয়ে বলল- তোমার রুমে গিয়ে পোশাক বদলে নাও। ঢাকায় ফিরবো আমরা। ”
বাতাসি তাই করলো। তার রুমে এসে ভেজা জামাকাপড় পড়ে নিলো। রুমের ভেতর থেকেই শুনতে পেলো ইয়াসিন তার মা আর সৎ বাবার সাথে কথা কাটাকাটি করছে। বাতাসি দরজা খুলে বাহিরে আসলো। ইয়াসিন ঘাড় বেঁকিয়ে বাতাসি কে দেখে বাতাসির হাতটা ধরে বলল-

“ এই যে নিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি জীবনে আর আপনাদের মুখ দেখতে হবে না বাতাসির। ”
বাতাসি ইয়াসিনের হাত টেনে ধরলো। ইয়াসিন জিজ্ঞেস করলো-
“ কি? ”
বাতাসি তার ভাইয়ের জামাকাপড় দেখিয়ে বলল-
“ আপনার জামাকাপড় তো ভেজা। ভাইয়ার গুলো আপনার লাগবে। সমস্যা না হলে পড়ে নিন। ”
ইয়াসিন ফাহাদের জামাকাপড় গুলো পড়ে নিলো। তারপর বাতাসির হাত শক্ত করে ধরে চলে গেল সেই রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে।
ইয়াসিন দিনাজপুরে পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিল মায়ের মৃত্যুর খবরটা শুনে। বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দেখলো খাটিয়ায় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো তার মায়ের দেহ টা। শ্বাসকষ্টে মা-রা গেছে রাতে। সকালে দুধওয়ালা দুধ নিতে এসে দেখে ইয়াসমিন বেগম পড়ে আছে। সাথে সাথে হসপিটালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃ’ত বলে ঘোষণা করে।
ইয়াসিন পাগলের মতো কেঁদেছে মায়ের খাটিয়া ধরে। বাপ ছাড়া বড় হওয়া ইয়াসিন মা বাপ বলতে এই একজনকেই চিনেছে। সেই মায়ের কাছে তার ক্ষমা চাওয়া আর হলো না। বলা হলো না আর কোনোদিন তার সাথে বাজে ব্যবহার করবে না। সব বলার আগেই তার মা অভিমান করে চলেই গেল!

মায়ের দাফনের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর ইয়াসিন গোরস্থানেই মায়ের কবর টা জাপটে ধরে ছিলো। এই বাড়িতে ঢুকলেই বাড়িটা খা খা করবে। ইয়াসিন যখন গোরস্থানে মায়ের কবর জাপ্টে ধরে বাচ্চা দের মতো আহাজারি করছিল,ঠিক তখনই বাতাসির ফোন আসে। কয়েকবার কেটে যাওয়ার পর নম্বর টা না দেখেই রিসিভ করেছিল ইয়াসিন। আর রিসিভ করার পরই বাতাসির ওমন ভাঙা কান্নারত গলায় এক আকাশ সম অসহায়ত্ব নিয়ে বলা কথা গুলো শুনেই ইয়াসিন কি মনে করে যেন ছুটে আসে চট্টগ্রাম । প্রথমে বাড়িতেই এসেছিল। বাতাসি কে ডাকলো। ইয়াসিনের ডাক শুনে বাতাসির মা বেরিয়ে আসে। ইয়াসিন জানতে চায় বাতাসি কোথায়। বাতাসির মা যখন বলল জানিনা। তখন ইয়াসিন রাগে ছনের রান্নাঘরে জোরে একটা লা’ত্থি মারে। সাথে সাথে রান্নাঘর টা বা দিকে হেলে যায়।
জানে না মানে? বাতাসি কোথায় জানবে না কেনো?

ইয়াসিন আশেপাশে খুঁজতে লাগে। যেই নম্বর থেকে কল এসেছিল সেই নম্বরে কল লাগায়। তখন জানতে পারে বাতাসিকে সে স্কুল ঘরের দিকে যেতে দেখেছে। ইয়াসিন স্কুলঘরের দিকে ছুটে আসে। বৃষ্টির মধ্যে বাতাসি কে আহাজারি করে কাঁদতে দেখে তার বুকের ভেতর টায় হুট করে মোচড় দিয়ে উঠে। মায়া লাগলো তার। নিজেকে অপরাধী মনে হলো। ইয়াসিন দৌড়ে ছুটে এসে আগলে নেয় বাতাসির ছোট্ট পাতলা দেহ টাকে। বাতাসি তখন ইয়াসিনের ভরসা যোগ্য এই বুক পেতেই এলোমেলো কন্ঠে বলতে থাকে- আপনি এসেছেন! এসেছেন আপনি! আমি এতিম আমার কেউ নেই,আমি কালো বলে আপনারা সবাই আমাকে এতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এতো নিষ্ঠুর কেনো আপনারা? একটু কি দয়া করে আমাকে আপনার সাথে রেখে দেওয়া যায় না? কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল ফুরায় অথচ আমার দুঃখ ফুরায় না। ”
ইয়াসিন তখন বাতাসির পিঠে হাত রেখে বলেছিল-
“ আমি আছি। কেঁদো না আর। ”

ঊর্মি কে নিয়ে ইব্রাহিম এসেছে আজ সুলতান নিবাসে। সমাবেশের কাজে ইব্রাহিম বিজি থাকবে, ঊর্মির খোঁজ খবর সময়ের অভাবে নিতে পারবে না বলে নিবাসে আনলো। এখানে থাকলে মেহরিনের সাথে থাকবে। চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে ইব্রাহিম।
ইব্রাহিম একটু পরপর এসে ঊর্মি কে জিজ্ঞেস করছে- কি খাবে,খারাপ লাগছে কি না। হাঁটতে বের হবে কি না। ঊর্মি মাঝেমধ্যে এটা ওটা খেতে চাচ্ছে, আর ইব্রাহিম ফোনে অর্ডার করে সেসব আনাচ্ছে। এই প্রেগন্যান্ট অবস্থায় আইসক্রিম খেতে চাইলেও মানা করে না ইব্রাহিম। মেহরিন অবাক হয়। কেমন ধরে ধরে নিয়ে হাঁটে। আবার একটু পরপর হট ওয়াটার এনে দেয়। ঠান্ডা পানি খেতে দেয় না। এক দিক দিয়ে আইসক্রিম খাওয়ায় আবার অন্য দিকে দিয়ে গরম পানি খাওয়ায়। বিকেলের পরপর ঊর্মির স্যুপ খেতে ইচ্ছে করলো খুব। ইব্রাহিম ফোনে অর্ডার করতে চাইলো। ঊর্মি মানা করলো। সে ইব্রাহিমের হাতে খেতে চায়। ইব্রাহিম একবারও বললো না যে আমি পারবো না। বউয়ের কথা শুনে চুপচাপ সোজা রান্নাঘরে গিয়ে ফোনের ইউটিউব থেকে ভিডিও বের করে বানাতে লাগলো।
এজওয়ানের ভাই কে এমন রান্নাঘরে দেখে চোখ কপালে । কিসব মেয়েলি কারবার! এজওয়ান সোফায় বসে বলল-

“ ভাইয়ে এক মগ কফি দিও তো। ”
ইব্রাহিম ভ্রু কুঁচকালো। তাকে কি কাজের লোক পেয়েছে নাকি এজওয়ান যে ফরমায়েশ করছে। এজওয়ান ভাইয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে ফের বলল-
“ কি হলো? আওয়াজ আসছে না কেনো রান্নাঘর থেকে? কফি কি দিবে না নাকি। ”
ইব্রাহিম রেগে বলল-
“ হতচ্ছাড়া, তোর চাকর আমি? বানিয়ে খা নিজের টা। আমি কাজ করছি দেখছিস না? ”
সোলেমান বাহির থেকে ভেতরে আসছিলো। ইব্রাহিম কে রান্না ঘরে দেখে চোখ মুখ কুঁচকালো।
“ হোয়াট ইজ দ্যিস? ”
ইব্রাহিম স্যুপ বোলে বেড়ে বলল-
“ বউ খেতে চাইলো। সেজন্য এসেছি রান্না ঘরে ,উল্টাপাল্টা ট্যাগ দিবি না খবরদার । ”
ইব্রাহিম স্যুপ নিয়ে চলে গেল। সোলেমান রুমে চলে গেলো। এজওয়ান মাহির নাম ধরে ক’বার ডাকলো। মেহরিন সেই ডাক শুনে বলল-

“ আপু বাসায় নেই ভাইয়া। ”
এজওয়ানের কপালে দু ভাজ পড়লো এ কথা শুনে।
“ নেই মানে? কোথায় গেছে,বলে গেছে? ”
“ না। কার যেন একটা ফোন আসলো। তারপর কথা বলতে বলতে চলে গেল। ”
এজওয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করে কল দিলো মাহি কে। সুইচ অফ বলছে। এজওয়ান কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলো। চোয়ালদ্বয় অলরেডি শক্ত হয়ে গেছে তার। এজওয়ান রুমে চলে গেল সোজা।
সন্ধ্যার পর মাহি নিবাসে ফিরে ক্লান্তি ভঙ্গিতে। রুমে ঢুকেই আবিষ্কার করে এজওয়ান সোফায় দু পায়ের মাঝখানে দু হাত একত্রে করে বসে আছে। থমথমে মুখের ভঙ্গিমা। মাহি হাতের ব্যাগ টা বিছানায় রেখে ওয়াশরুমের দিকে যেতে নিলে এজওয়ান মাহির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলে-

“ কোথায় গিয়েছিলে? ”
এজওয়ানের প্রশ্ন টা শুনে মাহি কিঞ্চিৎ ঘাড় বেঁকিয়ে এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আপুর বাসায়। ”
এজওয়ানের ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। বিরবির করে বলল- মিথ্যাবাদী।
“ কিছু বললেন? ”
এজওয়ান বসা থেকে উঠে চলে যেতে যেতে বলল-
“ না। ”
দরজা অব্দি গিয়ে ফের থেমে গেলো। উল্টো ঘুরে মাহির কাছে এসে,এক হাত দিয়ে মাহির কোমর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল-
“ তুমি নিজেকে খুব চালাক মনে করো তাই না? তুমি নিজেকে যেই জলের মাছ ভাবছো মাহি । আমি এজওয়ান কিন্তু সেই জলের শ্রোতের বিপরীতে চলা নাবিক। সো বি কেয়ারফুল। ”
মাহি ভ্রু কুঁচকালো একথা শুনে।
“ মানে? ”
“ মানে টা হলো নিজেকে জাহির করা আর চালাক ভাবা এক জিনিস না। চালাকিরও একটা সীমা আছে, তারপরে কিন্তু সেটাকে বোকামি বলে। তাই বোকার মতো কোনো কাজ করো না যার জন্য ভবিষ্যতে তোমাকেই বিপদে পড়তে হয়। আমি বেঁচে থাকা অব্দি না হয় তোমায় বাঁচিয়ে নিব। তারপর? তারপর বাঁচাবে কে? ”

“ এমন পেঁচিয়ে কথা বলছেন কেনো? কিসের বিপদ কিসের চালাকি? ”
এজওয়ান ছেড়ে দিলো মাহি কে।
“ যাও নিজের কাজে যাও। বাকিটা আমি দেখে নিচ্ছি। ”
এজওয়ান চলে গেল। মাহি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর ওয়াশরুমে চলে গেল।
মেহরিন ডিনার শেষ করে পড়ার টেবিলে বসে কলেজের পড়া পড়ছিল। সামনেই খোলা আছে উচ্চ মাধ্যমিকের সাহিত্য পাঠ বইটা। বড়বড় অক্ষরে হেডলাইন দেওয়া আছে গদ্যের নামটা। বায়ান্নর দিনগুলো। গদ্যটা ভীষণ হট টপিক এইচএসসিদের জন্য। প্রতি ইয়ার এমসিকিউ আর সৃজনশীল প্রশ্ন আসে। গদ্যটা পড়ার সময় হুট করে চোখ টা খানিক ভিজে উঠলো মেহরিনের। মুজিব কারাগার থেকে বাসায় ফেরার পর কামাল যখন হাচিনা কে বলল-
“ হাচু আপা হাচু আপা তোমার আব্বা কে আমি একটু আব্বা বলি? ”
লাইন টায় বোধহয় কিছু একটা ছিলো। মেহরিন লাইনটা পড়তেই নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেললো। নিজের বাবা কে চিনতে পারে নি সেই ছোট্ট কামাল।
সোলেমান শুয়ে শুয়ে ফোন স্ক্রোল করছিল। হুট করে মেহরিনের নাক টানার শব্দ পেয়ে পাশে ফিরলো। মেহরিন কে কাঁদতে দেখে রীতিমত চমকালো। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলো-

-” এ্যাই মেয়ে কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো? ”
মেহরিন নাক টানতে টানতে জবাব দিলো-
-” দেখুন না শেখ কামাল তার বাবাকে চিনতে পারলো না। ”
কথাটা বলেই বইটা বাড়িয়ে দিলো৷ সোলেমান মার্ক করা সেই লাইনটা পড়লো৷ মেহরিন কাঁদছে এই সামান্য একটা লাইন পড়ে! তাও আবার এই মানুষটাকে পড়ে! হায়রে! আর সে কি না কি ভাবছিল মেহরিনের কান্না দেখে, বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
-” ভাবো তাহলে কেমন বাপ যে তার সন্তান তাকে চিনতেই পারে না। ”
মেহরিন বইটা নিয়ে সামনে টেবিলে রেখে বলল-
-” চিনবে কি করে? জেলে ছিলো তো। পায় নি কাছে। ইশ নাকের ভেতর দিয়ে পাইপ ঢুকিয়েছিল মুজিবকে খাওয়ানোর জন্য। ”
সোলেমান পানির বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে বিরবির করে বলল-
-” ভাগ্যিস বাঁশ ঢুকিয়ে দেয় নি৷ ম’রেও শান্তি দিলো না লোকটা। জীবনটা ত্যাজপাতা বানিয়ে রেখেছে শেখ আর শেখের বেটি মিলে। ”
মেহরিন জিজ্ঞেস করলো-

-” কিছু বললেন? ”
সোলেমান মুখ মুছে বলল-
-” না না কিছু বলি নি। ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন উনি। বাংলাদেশের একমাত্র লয়্যাল পার্সন ছিলেন৷ দেশ স্বাধীনতায় অনেক অবদান তার। তাই দেশটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বাপের সম্পত্তি। কিন্তু আফসোস অকালে ম’রতে হলো তাকে বেশি সৎ থাকার অপরাধে। ভীষন কষ্ট হয় উনার জন্য আমার। কষ্টের ঠেলায় বলতে ইচ্ছে করে ম’রে গিয়েও শান্তি দিলেন না আমাদের। আপনার পেছন কোটি কোটি টাকা ভাঙতে ভাঙতে দেশ আজ ফকির হওয়ার পথে। ”
মেহরিন বাকি অংশ টুকু পড়ে নিলো। হুট করে নাকে সিগারেটের গন্ধ পেয়ে বেলকনির দিকে তাকালো সে । এই এত রাত করে মহাশয় সিগারেট খাচ্ছে? ঐ নাপাক মুখই একটু পর এসে মেহরিনের ঘাড়ে ডুবিয়ে দিবে। মেহরিন বইটা বন্ধ করে বেলকনিতে আসলো। সোলেমানের পেছনে দাঁড়িয়ে কিছুর বলার জন্য মুখ খুলতে গিয়ে বাহিরে তাকাতেই দেখলো ইব্রাহিম ঊর্মির হাত ধরে কোথাও একটা যাচ্ছে। মেহরিনের মুখে আসা কথা গুলো মুখেই আঁটকে রইলো। এই রাত করে কোথায় যাচ্ছে? হাঁটতে নাকি? মাঝেমধ্যেই নাকি রাত করে তারা হাঁটতে বের হয়।
সোলেমান ও দেখলো তাদের। মেহরিনের উপস্থিতি অনেক আগেই টের পেয়েছে। সোলেমান মুখ দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে বলল-

“ তুমি যখন প্রেগন্যান্ট হবে তখন নিশ্চয়ই তোমারও এমন মুড সুয়িং হবে? আমাকে জ্বালাবে অনেক হু? ”
মেহরিনও ভাবলো। প্রেগন্যান্সির সময় নাকি অনেক পরিবর্তন আসে অভ্যাসে। মেহরিনেরও নিশ্চয়ই মুড সুয়িং হবে? সুলতান সাহেব কি তখন বিরক্ত হবে ? মেহরিনের লোভ জাগলো মা হওয়ার। একটা ছোট্ট সদস্য আসলে মন্দ হয় না। মেহরিন আনমনেই বলে উঠলো-
-“ আমার বাচ্চা লাগবে সুলতান সাহেব। আমি বাচ্চা নিতে চাই।
মেহরিনের এমন কথা শুনে চকিতে মাথা ঘুরিয়ে মেহরিনের দিকে তাকালো সোলেমান। সেও ভাবছিল বাচ্চা নেওয়ার কথা,কিন্তু কয়টা নিবে বাচ্চা এগজ্যাক্টলী সেটা নিয়েই কনফিউজড ছিলো । হাতে থাকা সিগারেট টা তৎক্ষনাৎ ফেলে দিয়ে পরনে থাকা শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এগিয়ে এসে মেহরিন কে পাঁজা কোলে করে রুমে নিয়ে যেতে যেতে বলল-

-“ আমি রেডি তোমায় বাচ্চা দিতে। বলো কতগুলো বাচ্চা নিতে চাও তুমি?এক হালি? দুই হালি? নাকি তিন হালি? তুমি যত বলবে আমি ততগুলোই দিতে প্রস্তুত। ইচ্ছে করলে ২০-২৫ টাও চাইতে পারো আই হ্যাভ নো প্রবলেম।আশা করছি ২০-২৫ টাতেই আমাদের হয়ে যাবে। এতেও কম মনে হলে আরো নেওয়া যাবে পরে,কি বলো? তোমার ক্যারি করতে কোনো প্রবলেম নেই তো মিসেস সুলতান ? ”
মেহরিন বিজলীর ন্যায় চমকে উঠলো। এ লোকের মাথা ঠিক আছে? ২০-২৫ টা বাচ্চা! মেহরিন কে কি মানুষ ভাবছে না নাকি? একটাই কি যথেষ্ট মনে হচ্ছে না তার? ক্যারি তো আর তার করতে হবে না,সেজন্য বলতে পারছে ২০-২৫ টা।
সোলেমান মেহরিন কে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। সোলেমান এবার বাপ ডাকার রেইসে নামবে। মেহরিনের কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
“ Come on, Mrs. Sultan. Let’s start the process of becoming parents. I hope I’ll be able to share good news with you in a few months. After all, your husband still has the strength for it….”
মেহরিন লজ্জায় অন্য দিকে ফিরে গেলো। সোলেমান মুচকি হেঁসে রুমের বাতি নিভিয়ে এগিয়ে গেলো মেহরিনের কাছে…
তারপর যা হওয়ার তাই হলো। তবে যা হলো তা বর্ণনা করে শব্দের অপচয় করতে চাই না। বুদ্ধিমান পাঠকদের জন্য ইশারাই কাফি হ্যা।

বাতাসি কে নিয়ে ঢাকায় আসতে আসতে ভোর হয়ে গেল ইয়াসিনের। বাড়ির দরজা খোলা আছে। ইয়াসিন ভেতরে ঢুকে দেখলো লিভিং রুমে শুয়ে আছে তার কালো রঙের কুকুর,টাইসন। ইয়াসিন কে দেখামাত্রই এগিয়ে এসে ঘুরঘুর করতো। বাতাসি আগে দেখে নি এই কুকুর কে। ইয়াসিন বাতাসি কে চট্টগ্রাম রেখে আসার পরই এটার সাক্ষাৎ পেয়েছে। বৃষ্টি তে ভিজছিল বলে আশ্রয় দিয়েছিল। সেই থেকে এ বাড়িতেই থাকে।
ইয়াসিন বাতাসি একটু অপেক্ষা করতে বলে হোটেলে গেল খাবার আনতে। দুটো দিন হলো ইয়াসিনেরও পেটে কিছু পড়ে নি। ভাত,করলা ভাজি,ডাল,মাংস আর ভাত নিয়ে আসলো। বাসায় এনে প্লেটে বেড়ে বাতাসি কে খেতে বললে বাতাসি মাথা নত করে বলে-
“ আমার ক্ষুধা নেই। আপনি খান। ”
ইয়াসিন হাত টেনে বসালো।
“ আমি জানি কিচ্ছু খাও নি। খেয়ে নাও। আমি আছি তো বলছি। ইনশাআল্লাহ না খাইয়ে রাখবো না। যখন যা পারি এনে খাওয়াবো। ”
বাতাসি চুপচাপ খেতে লাগলো। খাওয়া শেষে ইয়াসিন বাতাসি কে নিয়ে নিউ মার্কেট গেলো। এই প্রথম কোনো বড় মার্কেটে আসলো বাতাসি। ইয়াসিন বাতাসি কে মেয়েদের সাইটে নিয়ে গিয়ে বলল-
“ যা যা লাগবে পছন্দ করো। ”
বাতাসির অস্বস্তি হতে লাগলো। ইয়াসিনের এমন সরল ব্যবহার ঠিক হজম করতে কষ্ট হচ্ছে।
“ আমার কিছু লাগবে না। যা আছে সেগুলো তে বছর খানেক চলে যাবে। ”

ইয়াসিন নিজেই পছন্দ করতে লাগলো জামাকাপড়। তারপর বাতাসির পায়ের সাইজের দু জোড়া জুতো কিনলো। শীতের জন্য ময়েশ্চারাইজার, স্নো,পাউডার যা যা লাগে কিনে দিলো। কেনাকাটা শেষে তারা দুপুরের লাঞ্চ টা রেস্টুরেন্টে করে তারপর রাতের খাবার নিয়ে একেবারে বাড়ি ফিরে।
বাড়ি ফিরে বাতাসি এক এক করে উল্টেপাল্টে দেখে জামাকাপড় গুলো। অনেক দামী এসব। এতো দামী পোশাক কিনে দিয়ে ঋণ বাড়িয়ে দিচ্ছে ইয়াসিন। বাতাসির অল্প অল্প করে শোধ করে দিতে হবে কাজ পেয়ে গেলে।
রাতে তারা দু’জনে দু রমে ঘুমালো ডিনার করে। ডিনারে তারা যা খেয়েছে সেম খাবার কুকুর কেউ দিয়েছে ইয়াসিন খেতে। বাতাসি একবার তাকিয়েছিল কুকুরটার দিকে। কুকুরটা তার চেয়েও কালো। অথচ কত মূল্য পাচ্ছে!
সকালে ভোরে ইয়াসিন ফজরের নামাজ সেরে বাজারে যায় বাজার করতে। হোটেল থেকে খাবার খেয়ে কুলানো যাবে না টাকায়। মাছ মাংস,চাল ডাল,সবজি, মশলাপাতি সব কিনে আনে। বাতাসি তখন ঘুমে ছিলো। ইয়াসিনের ডাক শুনে বেরিয়ে এসে এতো এতো বাজারের ব্যাগ দেখে অবাক হলো। ইয়াসিন হাত ধুতেধুতে বলল-

“ কাটতে পারবে? ”
বাতাসি এগিয়ে গিয়ে বলল-
“ জ্বি পারবো। ”
“ আচ্ছা তাহলে সকালের নাস্তা টা করে তারপর কাটাকাটি করতে বসো। টেবিলে রাখা আছে পরোটা আর ডাল। আমি আসছি। ”
“ কোথায় যাচ্ছেন? ”
“ কার্ড থেকে টাকা তুলতে। নগদ টাকা নেই আর। সব শেষ। ”
বাতাসি আর কিছু বললো না। ইয়াসিন চলে গেল। বাতাসি নাস্তা করে তারপর কাটাকাটি করতে বসলো।
ইউএসে নিয়ে আসার পর সামিরের হাতে কৃত্রিম আঙুল লাগানো হয়েছে। তবে এই হাত দিয়ে ভারী কোনো কাজ করতে পারবে না। খুবই পাতলা, স্বল্প পরিমাণের কাজ করতে পারবে।
শেখরের ইচ্ছে করছে ঐ এজওয়ান কে মে’রে তাকেও এমন যন্ত্রণা দিতে।
এজওয়ান যদি একবার জানতে পারতো সামিরের ভাই তাকে নিয়ে এসব ভাবছে। তাহলে নিঃসন্দেহে ব্যাটা বিরস মুখে বলতো-
“ অবস্থা খারাপ করলো ভাইজানে,মারলো কাটলো ভাইজানে,আমি জাস্ট একটু মুখে মুইতা দিছি। তাই বলে সব দোষ আমার হয়ে যাবে এভাবে! আগে জানলে তো হাগু করে দিতাম ওর মুখে। ”

শেখর কাউকে একটা ফোন করলো। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই শেখর বলল-
“ এজওয়ান সুলতানের সম্পর্কে সকল ডিটেইলস আমার চাই। ”
ওপাশ থেকে একটা পিডিএফ আসলো। শেখর ওপেন করে জানতে পারলো এজওয়ান রাজনীতি তে ঢুকছে। আর সামনের একটা সমাবেশের মাধ্যমে তার রাজনীতি তে আগমনের বিষয়টা পাবলিকলি প্রকাশ করা হবে। ”
শেখর দাঁত চেপে বলল-
“ সমাবেশ টা যেন শান্তি মতো না হয়। ”
ওপাশ থেকে জবাব আসলো-
“ ডোন্ট ওয়ারি,সব ব্যবস্থা শেষ। আশা করছি এজওয়ান সুলতানের সর্ব প্রথম ও সর্ব শেষ সমাবেশ হবে এটা। ”
শেখরের মুখে হাসি ফুটলো।
“ গুড। আমি যতক্ষণ না এই নিউজটা শুনতে পাচ্ছি, ততক্ষণ অব্দি শান্তি পাবো না। সমাবেশ টা কবে? ”
“ ৫ দিন পর। ”
“ সবটা যেন প্ল্যানমাফিক হয়। ওর মৃ’ত্যুর খবরটা কনফার্ম হওয়া চাই। সোলেমানের কাছের মানুষ কে এক এক করে ওর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারলে তবেই আমার জ্বা’লা মিটবে। ”

ক্লাসরুমে বসে আছে মেহরিন আর ঊর্মি। ক্লাসের বাকি মেয়ে গুলো বারবার মেহরিনের সাথে কথা বলতে এসেও ফিরে ফিরে যাচ্ছে। ঠিক কিভাবে শুরু করবে সেটা বুঝছে না। এক মেয়ে মেহরিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
“ মেহরিন তুমি সোলেমান সুলতানের কি হও? ”
মেহরিন আকস্মিক এমন প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকালো। মেহরিন কে চুপ থাকতে দেখে মেয়েটা বলল-
“ কি হলো বলো। কি হও? বোন নাকি ভাগ্নি নাকি ভাস্তি? ”
মেহরিনের রিয়াকশন এবার আকাশ ছুঁইছুঁই। এরা বউ কে বোন,ভাগ্নি,ভাস্তি বানিয়ে দিচ্ছে!
পাশ থেকে ঊর্মি বলল-
“ এই মাথা ঠিক আছে তোমাদের? কি বলছো এসব? ”
“ কেনো ভুল কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি? কি লাগে সোলেমান সুলতানের মেহরিন? ”
“ সোলেমান সুলতানের ব.. ”

ঊর্মি বাকি কথাটা আর শেষ করতে পারলো না। সোলেমান ঢুকে পড়ে ক্লাসে। ছাত্র ছাত্রী রা যার যার জায়গায় বসে পড়ে। সোলেমান বায়োলজির বইটা নিয়ে জিনতত্ত্ব অধ্যায় টা পড়াতে শুরু করে। আজকের টপিক গুলো মেন্ডেলের নিয়মসমূহ,পানেট স্কয়ার, ডিএনএর গঠন, প্রোটিন তৈরি, মিউটেশন, মিয়োসিস,লিঙ্গ নির্ধারণ।
সোলেমান হোয়াইট বোর্ডে মার্কার দিয়ে চিত্র সহকারে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এক ছাত্রী হাত উঁচু করে বলল-
“ স্যার আমার একটা কুয়েশ্চন আছে। ”
সোলেমানের লেখা থেমে যায়। পেছন না ফিরেই বলে-
“ টেল মি। ”
“ স্যার আমাদের সমাজে তো নারীদের গর্ভ থেকে কন্যা শিশু জন্ম নিলে তার পুরোপুরি দোষ দেওয়া হয় সেই নারী কে। কিন্তু আদোও কি সেই নারীর কোনো দোষ আছে এতে? ”

“ আমি এখনও সেই টপিকে যাই নি। যখন যাব তখন আমি নিজেই বুঝিয়ে দিব। সিট ডাউন। ”
মেয়েটা বসে পড়লো। সোলোব টপিক শেষ করে লাস্টে আসলো লিঙ্গ নির্ধারণ টপিকে। সোলেমান বলতে লাগলো-
“ আমাদের সো কোল্ড সমাজে মূলত একটি নারীর গর্ভ থেকে কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তার দোষ পুরোটা নারী উপর দেওয়া হয়। এবং সেই ঘটনার জন্য ডিভোর্স অব্দি হয়। এই কন্যা সন্তান হওয়ার জন্য কোনো ভাবেই নারী দোষী হতে পারে না। তারজন্য দোষী একজন পুরুষ। কিভাবে সেটা বিস্তারিত বলছি। একটা অনাগত বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারণ হয় বাবাকে দিয়ে। পুরুষের থাকে XY ক্রোমোজম আর নারীর থাকে XX ক্রমোজোম।
মায়ের যেহেতু দুটোই ক্রোমোজম X। সেজন্য মা X ক্রোমোজম দিতে পারে। আর বাবার যেহেতু আলাদা আলাদা XY ক্রোমোজম। সেজন্য বাবা হয় শুধু X দেয় আর তা না হলে শুধু Y দেয়। বাবার তরফ থেকে Y আসলে সেই দম্পত্তির ছেলে হয়। আর X আসলে হয় মেয়ে। ক্লিয়ার হয়েছে এখন? ”
সবাই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো। সোলেমান পড়ানোর মাঝেই খেয়াল করেছে তার ল্যাদা বউয়ের দিকে টানা ২০ মিনিট ২২ সেকেন্ড ধরে একটা ছেলে তাকিয়ে আছে। বিষয়টা ঠিক হজম হচ্ছে না সোলেমানের। হাতে থাকা মার্কার টা সেই ছেলের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে-

দাহশয্যা পর্ব ৮০ (৩)

-“ হেই হোয়াইট শার্ট পড়া থার্ড বেঞ্চে বসা লাফাঙ্গার, ফোকাস অন দ্যা বোর্ড। নট অন মাই গার্ল। অ্যাদারওয়াইজ আই উইল মেক শিওর ইউ ক্যান নেভার পাস দ্যা এইচএসসি এক্সাম। সো বি কেয়ারফুল। ”
ক্লাসে ঘন্টার বেল বেজে উঠলো। সোলেমান চলে গেল। ক্লাসে থাকা বাকি মেয়ে গুলোর কানে এখনও বাজছে নট অন মাই গার্ল! তারমানে মেহরিন সোলেমান সুলতানের মেয়ে সমতুল্য!

দাহশয্যা পর্ব ৮১ (২)