দাহশয্যা পর্ব ৮২
Raiha Zubair Ripti
প্রেমার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিলো ২ বছর। আমার জীবনের প্রথম প্রেম সে। যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম। এর আগে কখনও কোনো নারীর প্রেমে আমি পড়ি নি। প্রেমা আমাদের দলের বিরোধী দলের মেয়ে ছিলো। ওর আব্বা বিএনপির একজন প্রবীণ নেতা। তবে রাজনীতির সাথে সরাসরি তখন যুক্ত ছিলো না। তার সাথে আমার বা আমাদের পরিবারের কোনো শত্রুতা ছিলো না। প্রেমাই নিজ থেকে আমাকে প্রপোজ করে। শুরুতে আমি পাত্তা দেই নি। সব সময় এড়িয়ে যেতাম। আমার তখন এসব প্রেম ভালোবাসার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিলো না। আমি রাজনীতি নিয়ে মত্ত ছিলাম তার উপর ছাত্রলীগের নেতা । চাচা এখানে ওখানে পাঠাতো। আমাকে এখানে ওখানে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। প্রেম করার সময় কই আমার?
চাচা এরমধ্যে আমাকে একবার চট্টগ্রাম পাঠায় এক সভায়। ঐ সভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় আমার উপর গুলি ছোঁড়া হয়। আর গুলিটা এসে লাগে আমার বা হাতে। হসপিটালে ভর্তি ছিলাম দু’দিন। দুদিন পর ঢাকায় ফিরি। আর ফিরেই জানতে পারি দুটো দিন প্রেমা পাগলের মতো কেঁদেছে। বারবার ইব্রাহিম কে জিজ্ঞেস করেছে আমি কেমন আছি। প্রেমাকে যেন একটু নিয়ে যায় চট্টগ্রাম। রাস্তায় আমাকে দেখামাত্রই উন্মাদের মতো দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। আমি হতবিহ্বল হয়ে যাই। প্রেমা কেঁদে কেঁদে বলছিলো-
“ ইব্রাহিম ভাইয়া কে কত করে বললাম আমাকে একটু নিয়ে যেতে আপনার কাছে। কিন্তু নিয়ে গেলো না। এই দুটো দিন আমার কিভাবে কেটেছে জানেন? পাগল পাগল লাগছিলো। আপনার কিছু হয়ে গেলে বোধহয় সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যেতাম। একটু সাবধানে থাকতে পারেন না? ”
রাস্তার লোকজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো আমাদের। আমি প্রেমা কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম সেদিন। গায়ের রং দুধ ফর্সা। পাতলা গড়নের শরীর। বলতে দ্বিধা নেই মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর। গোলাপি ঠোঁট জোড়া কাঁপছিলো। চোখের নিচে কালো দাগ বসে গেছে। ইব্রাহিমের থেকে জানতে পারলাম দুটো দিন কিছুই খায় নি এই মেয়ে। পরিচয় কিন্তু আমাদের খুব বেশি দিনের ছিলো না। চাচার নির্বাচনের সময় লিফলেট বিলি করছিলাম। রাস্তা দিয়ে প্রেমা হেঁটে যাচ্ছিলো। সাধারণ মানুষ মনে করেই দিয়েছিলাম লিফলেট টা। সেই থেকে মেয়েটা পেছনে পড়ে ছিলো। খোঁজ নিয়ে যখন জানলাম বিরোধী দলের মেয়ে। তখন থেকেই বেশি ইগনোর করি আমি প্রেমা কে। প্রেমা সে কথা জেনে আরো বেশি চেপে আসে আমার দিকে। বিরোধী দলের লোকের সাথে আমাদের কথা বলাটাও যেখানে ঘোর অপরাধের সমান সেখানে বিরোধী দলের মেয়েকে ভালোবাসবো! ইম্পসিবল ছিলো। চাচাও সতর্ক করে দিয়েছিল। হয়তো আমাদের ফাঁসানোর নতুন কোনো ফন্দি এটা। আমারও তাই মনে হতো। তা না হলে এতবার মানা করার পরও কেনো এই মেয়ে পেছনে পড়ে থাকবে?
তবে সেদিন মায়া হলো,খারাপও লাগলো। মেয়েটা আমার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে এমন পাগলামি করেছে বলে। আরেকটু ভালো করে খোঁজ নিয়ে জানলাম ওর আব্বার সাথে ওর ভালো সম্পর্ক না। ওর আব্বা প্রায়ই অত্যাচার করে ওর আর ওর আম্মার উপর। আমার সহানুভূতি জাগলো। তবে প্রেমা তার এই পারিবারিক কথা গুলো কখনও আমায় নিজ থেকে জানায় নি। আমিই খোঁজ নিয়ে জানতাম। সেই দিনের পর থেকেই একটু একটু করে পাত্তা দিতে লাগলাম প্রেমা কে। সেই পাত্তা দেওয়াটাই যেন আমার কাল হয়ে দাঁড়ালো। পাত্তা দিতে দিতে এমন দিন এসে গেলো নওয়াজ সোলেমান সুলতানের যে পৃথিবীর সবকিছু এক দিকে আর এই মেয়েটা চলে গেলো আরেক দিকে। আমার সব কিছু যেন প্রেমাময় হয়ে গেলো। আমার সব কিছু তার দখলে চলে গেলো। রাত জেগে কথা বলা,এখানে ওখানে দেখা করা। সময় পেলেই ঘুরতে বের হওয়া। রাজনীতি তে মনোযোগ হারিয়ে ফেললাম। জানোই তো সদ্য প্রেমে পড়লে মানুষ তখন আর নিজের ভেতর থাকে না। কল্পনার জগৎে চলে যায়।
চাচার রাজনীতি ক্যারিয়ারে তখন দূর্দশা চলে আসে আমার অনুপস্থিতিতে। চাচা কারন জানতে চাইলো। চাচাকে জানালাম। চাচা রাগারাগি করলো সেদিন। জেনেশুনে কি করে নিজের পায়ে নিজে কোড়াল মারছি। আমি মাঝখানে আবার রাজনীতি আর বিজনেসের দিকটা নিয়ে ভাবতে লাগলাম চাচার কথায়। আমাকে প্রায় সময়ই দেশের বাহিরে যেতে হয় বিজনেসের জন্য। বছরের ছ’মাসই কাটাই তখন দেশের বাহিরে। কম যোগাযোগ হতো প্রেমার সাথে। ওর মুঠো ফোনটা প্রায় বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকতো। এরমধ্যে খবর পাই প্রেমার সাথে শেখর অসভ্যতামি করেছে রাস্তায়। আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। সেই দিনই আমি প্রাইভেট জেটে করে বাংলাদেশে এসে শেখর কে খুঁজে ভরা ক্যাম্পাসে সকলের সামনে কু’ত্তার মতো পিটিয়ে আধমরা করি। সবাই জানে প্রেমা সোলেমান সুলতানের প্রেমিকা। শেখরের কিভাবে অজানা থাকে এই কথা? আমি আর শেখর একই ব্যাচের স্টুডেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ওর সাথে আমার দা-কুমড়ার মতো সম্পর্ক।
প্রেমার ওড়না টেনে ধরেছিলো। ঐ হাত আমি ঝলসে দিয়ে লবন আর মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে দিয়েছিলাম।
সেদিনের পরই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ে করবো। প্রেমাও রাজি হলো। চাচাকেও বললাম। চাচা প্রথমে রাগারাগি করলো কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত যখন টলাতে পারলো না তখন সেও রাজি হলো। বিজনেসের জন্য ফের আমাকে ২ মাসের জন্য বাহিরে যেতে হলো। আমি প্রেমা কে বললাম ২ মাস পর ফিরেই বিয়ে করবো। যোগাযোগ টা যেন কন্টিনিউ রাখে আমার সাথে। যাওয়ার আগের দিন সারাটা দিন প্রেমার সাথে কাটিয়েছি। কত কি প্ল্যান করেছি। বিয়ের পর এটা করবো,ওটা করবো,ওখানে যাব।
আমি চলে আসলাম দেশের বাহিরে। বিদেশে আসার পরই প্রেমাকে আমি কল দিলে পেতাম না। ফোন বন্ধ থাকতো আর তা না হলে ফোন বাজতে বাজতে একটাই কেটে যেত। আমার পাগল পাগল লাগতো তখন নিজেকে। হুট করে অভ্যাসে পরিনত হওয়া মানুষ টা যদি এমন অনিয়মের মতো কাজ করে তখন তো রাগ লাগবেই। এই এক মাসে আমাদের কথা হলো না। এদিকে আমি বাংলাদেশেও আসতে পারছিলাম না। উপায়ন্তর না দেখে আমি ইব্রাহিম কে ফোন করে বললাম প্রেমার কথাটা। ও যেন প্রেমা কে বলে আমায় একটু ফোন দিতে। কথা বলার জন্য মরিয়া হয়ে আছি আমি। ইব্রাহিম সেই এক মাসে প্রেমার দেখাই পেলো না। বাড়িতে যেতে বললাম। ইব্রাহিম গেলো প্রেমাদের বাড়িতে। প্রেমার সাথে কথা হলো। প্রেমা জানালো তার ফোন টা নষ্ট হয়ে গেছে। কাজ করে না। তার আম্মারও শরীর টা তেমন ভালো না। সেজন্য কথা বলতে পারছে না। আমি সেটা শুনেই তৎক্ষনাৎ একটা নতুন ফোন কিনে দিতে বলি। ইব্রাহিম ফোন কিনে দিলো। আমি প্রেমাকে ফোন করে বললাম- এবার যেন যোগাযোগ বন্ধ না করে। প্রেমা শুধু জিজ্ঞেস করলো-
“ তুমি আসবে কবে সোলেমান? ”
আমি বলেছিলাম –
“ এই তো আর ক’দিন। কাজ শেষ হলেই চলে আসবো। ”
“ একটু তাড়াতাড়ি এসো? তোমার অপেক্ষা বড্ড পোড়ায় আমায়। ”
তারই ৫ দিন পর আকস্মিক খবর পাই প্রেমা বিয়ে করে ফেলছে। এই ৫ দিন আমি নিজ থেকে খবর নিতে পারি নি সেভাবে। প্রেমার ফোনে কল যাচ্ছিলো না। ওর বিয়ের খবরটা আকস্মিক শুনে বিশ্বাস করো আমার পৃথিবী উলোটপালোট হয়ে গেছিলো। মনে হচ্ছিলো শ্বাস আঁটকে গেছে আমার। যেই মেয়ে আমাকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেই মেয়ে কি করে অন্য কোথাও বিয়ে করলো? আমি ফের উন্মাদের মতো বাংলাদেশে আসি ১০ কোটি টাকা একটা ডিল ছেড়ে। প্রেমাদের বাড়ি কু’ত্তার মতো ছুটে যাই। গিয়ে কি দেখি জানো? ঐ ছলনাময়ী নারী ঐ শেখর কে বিয়ে করছে। যাকে আমি ওর জন্য পিটিয়েছিলাম ভরা ক্যাম্পাসে। যেই ছেলে আমাদের জাত শত্রু তাকে! আমার রাগ ক্ষোভ যন্ত্রণা মিশে সব একাকার হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম কেনো এভাবে ঠকালে? ভালো তো বাসতে চাই নি। জোর করে বাসালে। আর যখন বাসলাম তখন এমন প্রতারণা! তোমার আব্বা জোর করে নি তো? কিছু লুকিয়ো না। আমায় বলো। ৫ দিন আগেও তো কথা হলো আমাদের। তখন কিছু বললে না তো। বলো শুধু একবার এই বিয়েতে তোমার মত ছিলো না।
ঐ মেয়ে কি বলেছিল জানো? বলল- আমার অনুপস্থিতিতে নাকি ওর শেখরের সাথে গভীর সম্পর্ক হয়ে যায়। আমি তাকে ঠিকমতো সময় দেই না। বেশির ভাগ সময় দেশের বাহিরে থাকি। তার একাকিত্ব লাগে। সেই সময় এই শেখর তাকে সময় দিত। সেজন্য ফোন বন্ধ পেত। ফোন রিসিভ করতো না। কখন একে ওপরকে তারা ভালোবেসে ফেলছে বুঝতেই পারে নি। আর বোঝা মাত্রই আমি ফেরার আগে তারা বিয়ে করে নিলো। যাতে আমি জেনে যাওয়ার পর বাগড়া দিতে না পারি বিয়েতে সেজন্য!
সিরিয়াসলি! প্রেমা সব জেনেই তো এসেছিলো। ও তো জানতো আমাকে এখানে ওখানে ছোটাছুটি করতে হয়। আমি আমার সকল ব্যস্থতা কে সাইডে রেখে ওর জন্য সময় বের করতাম। আমাকে প্রেমা বলতো -সোলেমান আমি আর তোমাকে ভালোবাসি না। শেখর কে ভালোবাসি, আমি নিজ থেকে ওদের বিয়ের ডেকোরেশনের দায়িত্ব নিতাম। কিন্তু এই মেয়ে আমার সাথে প্রতারণা করলো! বিশ্বাসঘাতকতা দের আমি ঘৃণা করি। আমি বলেছিলাম আমাকে কোনোদিন ঠকিও না । ঠকালে কিন্তু যতটা না ভেঙেচুরে গুড়ে যাব তারচেয়ে বেশি তোমার জন্য ক্ষতিকর হয়ে যাব। আমার ঘৃণার পরিমাণ বাড়বে তোমাকে নিয়ে। এতবার সতর্ক করলাম। এই মেয়ে তারপরও সেই কাজ করলো!
আমি রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রেমার গলা চেপে ধরি। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করি। যার জন্য করলাম চুরি সেই কয় চোর! বললাম-
“ তোর মতো রাস্তার মেয়েকে আমার ভালোবাসা উচিত হয় নি। চাচার কথা শোনা উচিত ছিলো আমার। রাস্তার মেয়েদের থেকেও খারাপ তুই। তোকে আমি নিজ হাতে মে’রে ফেলতে পারলে এই জ্বালা মিটতো। বাজারি মেয়ে একটা তুই। সুখ পাস নি আমার কাছে তাই না? যেই সুখের জন্য আমায় ঠকালি সেই সুখ তুই জীবনে পাবি না দেখিস। সুখের জন্য কাতরাবি অথচ সুখ পাবি না। তোর এই মুখটা নিয়ে কখনও আমার সামনে আসবি না। আসলে কসম আমি তোকে জ্যন্ত পুঁতে রাখবো। আজকের পর থেকে ঘৃণা করি আমি তোকে। এতদিন ভালোবাসা দেখছিস এবার দেখবি ঘৃণা। ভালোবাসা তো শেষ হয়ে গেলো। কিন্তু ঘৃণা তো শেষ হবে না। আমার আমৃত্যু ঘৃণা নিয়ে তুই বাঁচবি। আমাকে ঠকানোর শাস্তি তুই পাবি। ”
ইব্রাহিম এসে ছাড়িয়ে নিলো প্রেমা কে। আমারই চোখের সামনে শেখর টেনে জড়িয়ে ধরলো প্রেমা কে। নিয়ে চলে গেল গাড়িতে করে। বউ হওয়ার কথা ছিলো আমার। সেখানে বউ হলো সে অন্য কারোর! শেখরের চোখ মুখে সেদিন সদ্য জয়ী হওয়া বিজয়ী হাসি। আমি হেরে গেছি। আমাকে এই প্রথম হারাতে পেরেছে বলে পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছিলো।
আমার ভেতরে ঝড় বইতে শুরু করলো। আমি আর থাকলাম না। প্রচণ্ড ঘৃণা লাগতে শুরু করলো। সেই ঘৃণার পরিমাণ এতোটাই ছিলো যে প্রায় এক বছর আমি দেশে আসি নি। চাচা আমাকে কত সতর্ক করেছিলো। আমি শুনিনি। সেজন্য চাচাও এবার অনেক কথা শোনালো। সেদিনের পর থেকে প্রেমা নামক মেয়েটাকে আমি ঘৃণায় তালিকায় রেখেছি। এই ৯ বছরে ওকে কখনও দেখিনি। না ওর কোনো খোঁজ খবর নিয়েছি।
এসব বলার মতো বিষয় না। বললে আমার নিজেরই খারাপ লাগতো,বউয়ের সাথে প্রাক্তন নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করার রুচি হচ্ছিলো না। আমি তাকে কখনই আমার জীবনে ফেরত পেতে চাই না। ফেরত আনার কথা কখনও মাথাতেও আনি নি। আমি তোমার সাথেই থাকতে চাই। তোমাকেই ভালোবাসতে চাই। আমি অপাত্রে আমার ভালোবাসা দান করে ফেলছিলাম। যার সাজা পেয়েও গেলাম। আমি তোমাকে হারাতে চাই না মেহরিন। সেজন্য ভালোবাসতে গেলে ভয় হতো। তুমিও যদি ওর মতো ছেড়ে চলে যাও তখন?
মেহরিন ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালো এবার সোলেমানের দিকে। চোখ মুখে ঐ নারীর জন্য তীব্র ঘৃণার সাথে সাথে এক প্রকার অসহায়ত্ব টাও দেখতে পেলো। এই কথাগুলো আগেই বলে দিলে আজকে মেহরিন কে এমন রুড হতে হতো না। মেহরিন উঠে যেতে যেতে বলে গেল-
“ জানি না সে আপনাকে ছেড়ে ভুল করেছে কি না। সে যেই সুখের জন্য আপনায় ছেড়ে গেলো সেই সুখ আদৌও সে পেলো কি না। তবে হ্যাঁ আমাকে ভালোবাসতে হলে মুক্ত মনে স্বাধীন হয়ে ভালোবাসবেন। যেই ভালোবাসায় কোনো জড়তা দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ভয় থাকবে না। প্রাক্তন নিয়ে আমিও চাই না আমাদের মধ্যে তর্কবিতর্কের জায়গা তৈরি হোক। আর যাকে আমি চিনি না জানি না তাকে নিয়ে কোনো কমপ্লিমেন্ট আমি দিতে পারি না। আপনার জীবনে এখন আমি আছি। তাই আমার সঠিক মূল্যায়ন করুন। আমার যা প্রাপ্য সেটা দিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। আশা করছি আমি আমার পয়েন্ট অফ ভিউ টা বুঝাতে পেরেছি। ”
মেহরিন গিয়ে শুয়ে পড়লো। সোলেমান তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ মেহরিনের দিকে। কিছুক্ষণ পর এলোমেলো পায়ে রুমে এসে লাইট নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো। যেই বুকে প্রতিদিন মেহরিন এসে মাথা রাখে,সেই বুকে আজ মাথা রাখলো না। এক হাত দূরত্ব রেখে উল্টোপাশে মুখ করে ঘুমিয়েছে। সোলেমান মেহরিনের পানে তাকিয়ে শুলো।
এজওয়ান বিছানায় ঘুমিয়ে মাথার উপর ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা শুনেছে সোলেমান ভাই প্রেম করেছিল একবার। এজওয়ান ভাই হয়েও জানলো না এখবর! দুক্কুর ঠেলায় কচু গাছের সাথে ফাঁসি নিতে ইচ্ছে করলো। মাহি পাশ ফিরতেই এজওয়ান কে এখনও জেগে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ ঘুমাচ্ছেন না কেনো? ”
“ কিছু একটা ভাবছি। ”
“ কি? ”
“ ভাবি গুলো কাঁদল কিভাবে। ”
“ কাঁদার মতোই তো বিষয়। ”
এজওয়ান ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে মুখ ঢেকে বলল-
“ ইশ আমার তরিকুলের বেটি টাও যদি এভাবে কেঁদেকুটে চোখের জলে আমার বুক টারে সমুদ্র বানায় দিত তাহলে মসজিদে ছিন্নি দিতাম,রাস্তার এতিম পুলাপান গো ফ্রী তে বাংলা মাল খাওয়াইতাম…কিন্তু আফসুস আমার কোনো এক্স নামক কালসাপ নাই। আর আমার তরিকুলের বেটির আমার জন্য চোখ দিয়ে পানি পড়ার মতো ওমন চোখও নাই…। ”
“ আপনার এক্স থাকলে সেটার কোলে আপনাকে আমি বসিয়ে রেখে আসতাম। জঞ্জাল সাফ হতো জীবন থেকে। ”
এজওয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে বলল-
“ এই জঞ্জাল কেই একদিন মিস করবা। ”
“ মিস করার মতো কিছু করছেন যে মিস করবো? সারা দিন রাত চিপকে চিপকে থাকেন। সময় কই মিস করার? ”
এজওয়ান এ কথা শুনে সাথে সাথে মাহির দিকে ফিরে তাকালো। অদ্ভুত কিছু খোঁজার চেষ্টা করলো সেই দৃষ্টি তে। মাহি এজওয়ান কে এভাবে তাকাতে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। এজওয়ানের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
“ মিস করার মতো কিছু করতে বলছো তাহলে? ”
“ চেষ্টা করে দেখুন। বাট গ্যারান্টি দিতে পারছি না যে মিস করবো। ”
“ অনিশ্চিত সম্ভাবনা নিয়েই আমি চেষ্টা করবো। আমি জানি আমি জিতবো। ”
রাতটা ভীষণ গভীর। বাজে হয়তো পনে একটা কি দুইটা। আলী বাড়িতে প্রেমা আর মহসিন আলী ছাড়া কেউ নেই। প্রেমা শুনেছে সামিরের হাতে কৃত্রিম হাত লাগানো হয়েছে। কিন্তু দেশে আসবে কবে সেটা জানায় নি। প্রেমারও শরীর টা খারাপ যায় আজকাল। কলেজেও আর যাওয়া হয় নি সেদিন। আগামীকাল যাবে। সোলেমানের বউটাকে শেষবার দেখবে। না জানি আবার কবে বের হতে পারে বাড়ি থেকে। প্রেমা জানালার গা ঘেঁসে বসে আকাশের দিকে তাকালো। আবার কবে দেখতে পাবে ওদের প্রেমা? কি সুন্দর মানিয়েছে ওদের দুজন কে। চোখ জুড়িয়ে যায় দেখলে। কাল কি দেখার সৌভাগ্য হবে ওদের? কি জানি। প্রেমা স্মিত হাসলো। বিরবির করে বলে উঠলো-
এই পৃথিবীতে আমি কিছুই পেলাম না। আল্লাহর কাছে দীর্ঘ আয়ু চেয়েছিলাম। সুখ চাইতে ভুলে গেছিলাম। সেজন্য দেখো দীর্ঘ আয়ু দিয়ে সুখ দেখা নি। অথচ এই দীর্ঘ আয়ু আমি তোমার সাথে থাকার জন্য চেয়েছিলাম। আমার না পাওয়ার পাল্লা কত ভারী জানো? এই যে তোমাকে পেলাম না। বাবার ভালোবাসা পেলাম না। মায়ের ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী হলো না। আমি হলাম কারো দাবার চাল। সে তোমাকে হারানোর জন্য আমায় বিয়ে করলো। কখনও স্ত্রীর মর্যাদা দিলো না। ভালো মুখে জীবনে কথা বললো না। আমার গর্ভ ছিড়ে দু দুটো সন্তান কে মে’রে ফেলা হলো। এত কিছুর পরও যে বেঁচে আছি এটাই কি অনেক না? শেষ বার দেখছিলাম তোমায় কবে মনে আছে? বিয়ের দিন। কবুল বলার আগ মুহূর্তেও আমি অপেক্ষায় ছিলাম। আমার সোলেমান আসবে.. আমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমার সোলেমান আসলো না। মরুভূমিতে তৃষ্ণায় কাতরানো এক পথিকের মতো আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি আসলে না সোলেমান। তুমি আসলে না। তোমার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমি অন্য কারো হয়ে গেলাম। শোনো তোমার বউকে কখনও কষ্ট দিও না সোলেমান। আমি তো প্রেমিকা ছিলাম তাই কষ্ট সয়ে গেছি। মেহরিন তো বউ। বউরা কষ্ট পাওয়ার অধিকার রাখে না। তোমারা সুখী হও অনেক। আমার নজর যেন না লাগে কখনও। কাল কি তোমরা আসবে? আমি কি দেখতে পাবো শেষবার? এসো বউ নিয়ে? একটু দূর থেকে দেখবো…..
সকালের খাবার বানিয়ে শ্বশুর কে খাইয়ে দাইয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বের হলে তারপর প্রেমা বের হয় কলেজের জন্য। আজও বাড়ির গাড়ি করেই এসেছে। কলেজে যাওয়ার পর মাঠ দিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে প্রেমা গেলো অফিস রুমের দিকে। মেহরিন নেই। প্রিন্সিপালের সাথে কথা বললো আধঘন্টার মতো প্রেমা। সামির কে তারা আর রাখবে না। কলেজে যেন না আসে। আর তার স্বামী শ্বশুর যেন জোর না করে তাকে সামিরের জন্য। তার হাতে কিছু নেই। সোলেমান চায় না সামির এই কলেজে থাকুক।
সোলেমানের নাম শুনে চমকালো প্রেমা। সোলেমান চাইবে না কেনো?
“ সামির কি করেছে? ”
“ সোলেমানের ওয়াইফের সাথে মিস বিহেভিয়ার করেছে। টিচার প্যানেল থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সামির কে আর রাখা হবে না এই কলেজে। ”
প্রিন্সিপাল সামিরের সকল কাগজপত্র দিয়ে দিলো প্রেমা কে। প্রেমা কাগজপত্র গুলো খুলে দেখলো সামিরের রেজি কার্ড,এডমিট কার্ড এসএসসির। প্রেমা সেগুলো সাইড ব্যাগে নিয়ে বের হলো অফিস কক্ষ থেকে।
মেহরিন আজ দুটো ক্লাস করে আর কোনো ক্লাস করে নি। মাঠের এক প্রান্ত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। সোলেমান আসে নি। সকালে পৌঁছে দিয়ে গেছে। আজ সোলেমানের ক্লাস নেই কলেজে। তাদের মধ্যে প্রয়োজন ব্যতিত কথাবার্তা খুব কম হচ্ছে। মেহরিন ফোনে সময় দেখে নিলো। কলেজ ছুটি হতে অনেক দেরি এখনও। ভালো লাগছে না। হুট করে কাউকে পাশ কাটিয়ে পড়ে যেতে দেখে ডান হাত টা বাড়িয়ে দিয়ে হাতটা ধরলো চেপে।
প্রেমা পড়ে যেতে যেতেও বেঁচে গেলো।
“ সাবধানে। এখনই তো পড়ে যেতেন। ”
ধন্যবাদূ বলার জন্য পেছন ফিরতেই এক দেখাতেই চিনে ফেললো প্রেমা মেহরিন কে। প্রেমা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
“ ধন্যবাদ মেহরিন। ”
মেহরিন হতবিহ্বল হয়ে গেলো।
“ চিনেন আমাকে? ”
“ আমি সূচনা। ”
মেহরিন মনে করার চেষ্টা করলো। মনে পড়তে মৃদু হেঁসে বলল-
“ চিনতে পেরেছি। ”
“ ক্লাস না করে বাহিরে যে? ”
“ এমনি,সব সময় তো করিই ক্লাস। আজ একটু ফাঁকি দিলাম। তা আপনি কলেজে যে? ”
“ সেদিন কথা বলতে পারি নি প্রিন্সিপালের সাথে। আজ এসেছিলাম। ভাবতে পারি নি আজও দেখা হয়ে যাবে তোমার সাথে। ”
“ আমি ও ভাবতে পারি নি আপনার সাথে দ্বিতীয় বার দেখা হবে আমার। কেমন আছেন আপনি? ”
“ আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তোমার স্বামী এসেছে? বাসায় চলে যাচ্ছ? ”
“ না। উনার তো আজ ক্লাস নেই কলেজে। সেজন্য আসে নি। ”
“ উনি শিক্ষকতা করছে! ”
“ হুম। আপনার বাসা কোথায়? দু’দিন কথা হলে অথচ জিজ্ঞেস করা হয় নি। ”
“ ধানমন্ডি শ্বশুর বাড়ি। ”
“ বাসায় যাওয়ার পথে পড়ে সামনে। ”
“ হুমম….মেহরিন। ”
হাঁটতে হাঁটতে গেট অব্দি আসলো দুজনে।
“ হুমম বলুন। ”
“ একটু নিকাব টা সরাবে মুখের সামনে থেকে? একটু দেখবো তোমায়। আর যদি কখনও দেখা না হয়। তাহলে তোমাকে না দেখার আফসোস হবে ভীষণ। ”
মেহরিন এ কথা শুনে চমকালো।
“ আমাকে দেখতে চাচ্ছেন কেনো? ”
“ এমনি, পরিচয় হলো। অথচ মুখ দেখতে না পেলে আফসোস হবে না? ”
মেহরিন মুখের সামনে থেকে নিকাব টা সরালো। প্রেমা আবিষ্কার করলো এক অসম্ভব সুন্দরী রূপবতী একটা মিষ্টি চেহারা। মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো –
“ মাশা-আল্লাহ। তুমি ভীষণ সুন্দর মেহরিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাকে নিখুঁত ভাবে সৃষ্টি করেছে। ”
মেহরিন নিকাব টেনে দিলো।
“ আল্লাহর সৃষ্টি সবই সুন্দর আপু। ”
“ তারপরও, তোমার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় আছে তার। ”
“ যেমন? ”
“ নাই বলি। তোমার জীবনে কোনো দুঃখ না আসুক। ”
“ আপনি দু’দিনের দুদিনই আমার জন্য এমন প্রার্থনা করলেন। আপনার জীবনে কি অনেক দুঃখ? ”
“ দুঃখ ছাড়া মানুষ হয়? ”
“ তা হয় না। কারো জীবনে কম তো কারো জীবনে বেশি। ”
“ নিঃসন্দেহে সেই বেশি দের তুলনায় আমি। ”
মেহরিন ঘুরে তাকালো প্রেমার দিকে।
“ এতো দুঃখ কিসের আপনার? আমায় বলতে পারেন অসুবিধে না থাকলে। ”
“ আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো আমার কেউ নেই । আমি ভীষণ অভাগী একটা মেয়ে মেহরিন। এতটাই অভাগী যে, আমি যদি মরেও যাই,আমার জন্য দু’ফোঁটা জল ফেলার মতো কেউ নেই। আমার কবরের পাশে বসার মতোও কেউ নেই। ”
মেহরিনের বড্ড মায়া হলো একথা শুনে। ইশ কিভাবে বলছে তার কেউ নেই।
“ আপনার আব্বু আম্মু নেই? আপনি না বিবাহিত স্বামী সন্তান নেই? ”
সন্তানের কথা শুনে বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠলো প্রেমার।
“ মা নেই। আমার সন্তানেরাও নেই। আর বাপ থাকতেও না থাকার মতো। আর স্বামী? তাকে স্বামী বলতেও ঘৃণা করে। ”
“ ঘৃণা করে কেনো? ”
“ অমানুষ যে। অমানুষদের তো মানুষ ঘৃণাই করে। ”
মেহরিন রাস্তার দু’পাশে দেখে বলল-
“ ক্যাফে তে বসি আমরা? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা ভালো দেখাচ্ছে না। ”
“ তোমার সময় হবে? ”
“ কেনো নয়? উনার আসতেও দেরি আছে। মনটাও ভালো নেই আজ। আপনার সাথে কথা বলে একটু ভালো লাগছে। আপনাকে জানার আগ্রহ হচ্ছে। ”
মেহরিন আর প্রেমা একটা ক্যাফের সর্বশেষ টেবিলটা বসলো।
প্রেমা জানতে চাইলো।
“ তোমার মন খারাপ কেনো? আমায় বলতে পারো। ”
মেহরিন প্রথমে বলতে চাইলো না। ঘরের কথা পরের মানুষকে বলাটা শোভা পায় না। প্রেমার জোরাজোরি তে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলল-
“ আমার একটা ফ্রেন্ড আছে। তার স্বামী বিয়ের আগে সম্পর্কে জড়িয়েছিলো। তো গতকাল জানতে পেরে ঝগড়া করেছে। সেটা শুনেই মন খারাপ। ”
প্রেমার বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। অন্যের বিষয়ে শুনেই মেয়েটা এমন মনের অবস্থা। নিজের স্বামীর বিষয়ে যখন শুনবে তখন কেমন লাগবে? মেয়েটার সামনে কখনও না আসুক এই সত্য। নিশ্চিত সে প্রেমা কে ভীষণ ঘৃণা করবে।
“ লুকিয়েছিলো কেনো? ”
“ বউ কষ্ট পাবে সেজন্য। ”
“ বউ কে ভালোবাসে হয়তো বড্ড। সেজন্য হারাতে চায়নি বলে বলেনি। ”
“ হয়তো। ”
“ মেহরিন শোনো…ভালোবাসাটা কখনও দোষের না। ভালোবাসা সুন্দর, ভয়ংকর রকমের সুন্দর। এই ভালোবাসা কেউ ভুলে না, আর ভুলে গেলে সেটা ভালোবাসা ছিলো না! ধরে নিতে হবে ক্ষণিকের মায়া ছিলো, যা বিষন্ন বিকেলে সূর্য অস্তাচলে যাওয়ার মতোই হারিয়ে যায়। আর পুরুষ তার দ্বিতীয় নারীকে বেশি ভালোবাসে প্রথম নারীর তুলনায়। তাই মন খারাপ করতে না করো তাকে। ভালোবাসে বলেই বলে নি। সেদিক দিয়ে তুমি তো কত সৌভাগ্যবতী বলো। ”
মেহরিন অন্য মনস্ক ছিলো। কথার তালে বলে বসলো-
“ সেও বেসেছিল ভালো কাউকে। ”
প্রেমার বুকের পানি শুকিয়ে আসলো সে কথা শুনে।
“ মেহরিন কি বললে এটা? ”
মেহরিনের হুশ আসলো।
“ কি বললাম? ”
“ তোমার স্বামীও কাউকে ভালোবেসেছিল! জানো সেই নারীর বিষয়ে? ”
মেহরিন মাথা নত করে সম্মত জানালো।
“ না। শুধু জানি আমার স্বামী তাকে ঘৃণা করে। আমি দেখেছি তার চোখে সেই ঘৃণা,অসহায়ত্বতা। সে ঠকিয়েছে আমার স্বামী কে। আমার স্বামী তাকে অসম্ভব ভালোবেসেছিল। সে সেই ভালোবাসার মূল্য দেয় নি। সে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে। ”
প্রেমার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো। ঠকিয়েছি তাই না? হু ঠকিয়েছি তো। তোমার ভাষায় আমি বিশ্বাসঘাতকতা। এই ডাক নামেই না হয় বেঁচে রইবো।
“ তোমার কি একই ধারণা ঐ নারী কে নিয়ে? ”
“ আমার তাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই আপু। আমি তাকে চিনি না। তার সম্পর্কে অত গভীর ভাবেও জানি না। এক পাক্ষিক কথা শুনে আমি তাকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারি না। আমি জানি না সে কেনো তাকে ছাড়লো। ছাড়ারই যদি ইচ্ছে ছিলো তাহলে কেনো নিজ থেকে আসলো,পাগলামি করলো, ভালোবাসালো। আমি শুধু চাইবো সে যেখানেই থাকুক যেভাবেই থাকুক সুখে থাকুক। আমাদের জীবনে না আসুক। ”
“ ইনশাআল্লাহ কোনো দিন আসবে না। ” বিরবির করে বলল কথাটা প্রেমা।
“ আপনি কিছু মনে না করলে আপনাকে আমি দেখতে পারি? ”
প্রেমা না করলো। এই মুখ চায় না সে মেহরিন কে দেখাতে। জায়গায় জায়গায় কাটাছেঁড়ার দাগ দিয়ে ভরা এই মুখ।
“ কোনো সমস্যা? ”
“ হু। এলার্জি উঠে ভরে গেছে মুখটা। ”
“ আপনার স্বামী খারাপ বললেন তখন। জেনেশুনেই বিয়ে করেছিলেন? ”
“ সে অনেক কাহিনি বোন। ভালোবেসেছিলাম একজন কে অথচ সংসার করছি আরেকজনের সাথে। ”
“ আপনিও বেসেছিলেন ভালো কাউকে! ”
“ হুমম। তাকে ভালোবাসার সময়টা খুব দীর্ঘ ছিলো। ”
“ স্বামী কে ভালোবাসার চেষ্টা করেন নি কখনও? ”
“ করেছি। কিন্তু আমি ব্যর্থ। স্বামী এমন একটা মানুষ যে ভালো হলে দুনিয়াটা জান্নাত আর যদি খারাপ হয় তাহলে দুনিয়াটা নরক। ”
“ আলাদা হলেন কেনো? ”
“ পরিস্থিতির জন্য মাঝেমধ্যে নিজের স্থান ছেড়ে দিতে হয় অন্যদের আগমনের জন্য। ”
“ সে বিবাহিত এখন? ”
“ হুমম। ”
“ ভালোবাসলে ছেড়ে আসা যায়? ”
“ যায়। যখন সেখানে অন্য কারো ভালো মন্দের বিষয়টা ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে থাকে। তখন নিজের সুখ বিসর্জন দিতেই হয়। ”
“ সব সময় ছেড়ে আসাটা বুদ্ধিমানের কাজ না। একতরফা বিষয় হলে তখন গুটিয়ে চলে আসা যায়। কিন্তু দুতরফা হলে তখন অপর পক্ষের কথাও ভাবতে হয়। আপনি ছেড়ে আসার পর তার কি হবে? ”
“ অল্প বয়স ছিলো তখন বুঝি নি। বুঝলে নিশ্চয়ই নিজের জায়গাটা ছাড়তাম না। আজ তার পাশে আমি থাকতাম। ”
“ দেখা হয় তার সাথে? ”
“ উঁহু। ”
“ সম্পর্ক হলো কি করে আপনাদের? ”
“ ভার্সিটির সিনিয়র ছিলো। প্রথমে তাকে আমি ১ বছর একতরফা ভালোবেসেছি । আর ৫ বছর জানিয়ে। সেই ৫ বছর ছিলো আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তম বছর। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী তখন আমি ছিলাম বোধহয় । সে আমাকে একটুও কষ্ট পেতে দিত না জানো? সবসময় আগলে রাখতো। আমার ব্যথায় ব্যথিত হতো। কখনও বাবার ভালোবাসা পাই না। ঐ মানুষটাই তখন আমার সব কিছু ছিলো। তার জীবনের পুরোটা জুড়ে শুধু আমিই ছিলাম। কেউ কারো সাথে কথা না বলে থাকতে পারতাম না। দুজন দু’জনকে এতো ভালোবাসার পরও দেখো আজ আমরা আলাদা। সে অন্য কারো স্বামী। আর আমি অন্য কারো সহধর্মিণী। অবশ্য আমিই নিজ থেকে তাকে ছেড়েছি। ”
“ আপনার তাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত হয় নি আপু। আপনি যে আফসোস করছেন। সেও নিশ্চয়ই এভাবে আফসোস করে? ”
“ তোমার মতো মিষ্টি মেয়েদের পেতে হলে যে আমাদের মতো মানুষদের ছেড়ে দিতেই হয়। আমি জানি সে আফসোস করে না আমাকে হারিয়ে আমার মতো। কারন তার তোমার মতো একটা সুন্দর বউ আছে। আর তোমার মতো বউ যাদের আছে তারা কি আর প্রাক্তন কে ভেবে আফসোস করে? অবশ্য তার বউ ভীষণ ভাগ্যবতী তোমার মতো। আমি না ছাড়লে এমন চমৎকার পুরুষকে পেত কি করে? ”
মেহরিন দু মগ কফি অর্ডার দিলো। এরমধ্যে টুকটাক কথা হলো মেহরিনের পরিবার কে নিয়ে। মোতালেব ভুঁইয়া, সানজিদা বেগম,সেরিন সকলের কথা শুনে মুগ্ধ হলো। কি সুন্দর বাবা মা মেহরিনের। বাবা অন্ত প্রান। তার বাবা টাও যদি এমন হতো! তাহলে সেদিন বিনা চিকিৎসায় তার মা টাকে মরতে হতো না। অমানুষ বাপের মতো অমানুষ স্বামী পেয়েছে।
কফিটা শেষ হতে হতে সোলেমানের ফোন আসলো। কলেজের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে সে। মেহরিন কেনো আসছে না। মেহরিন জানালো- আসছি অপেক্ষা করুন।
মেহরিন বিলটা পে করে প্রেমার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আসছি আপু। উনি এসেছেন। আল্লাহ আপনার সব কষ্ট বৃষ্টির পানির মতো ধুয়েমুছে সাফ করে দিক। আপনার স্বামী কে হেদায়েত দান করুক। আমাদের আবার দেখা হোক। ”
“ ভালো থেকো তুমি সর্বদা মেহরিন। ”
“ দোয়া করবেন। আল্লাহ হাফেজ। ”
মেহরিন চলে গেলো। প্রেমা ঠাই বসে রইলো। তার বড্ড মেহরিন হতে ইচ্ছে করছে। ইশ মেহরিন কত সুখী। একটু খানি সুখের লোভে প্রেমা কাতর হয়ে আছে। মেহরিন দোয়া চাইলো? মেহরিন কে দেখলেই যে প্রেমার বুক ফেটে কান্না পায়। তারপরও দেখতে ইচ্ছে করে। প্রেমা ক্যাফের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দু’জন কে দেখলো। তাদের দুজনের চোখেই প্রেমা আজ দোষী! প্রেমা হুহু করে কেঁদে বলে উঠলো-
“ তোমাকে আমি দোয়া দিলাম মেহরিন। পরের জন্মে তুমি প্রেমা হয়ে জন্ম নিও। তখন তুমি অনুভব করবে,ভালোবাসার মানুষ টাকে পেয়ে হারানোর বেদনা ঠিক কতটা গভীর, কতটা অসহনীয় হতে পারে। আমি সোলেমান কে ছেড়েছি বলেই তুমি তাকে পেয়েছ, তোমার আজকের এই প্রাপ্তির পেছনে লুকিয়ে আছে আমার অসহায় ত্যাগ, আমার অশ্রু-ভেজা রাত, আর বুকের ভেতর চেপে রাখা অগণিত আর্তনাদ। তুমি যখন আমার মতো হারানোর যন্ত্রণায় পুড়বে, তখন বুঝবে প্রেমাদের হাহাকার, তারা কিভাবে ক্ষত-বিক্ষত বুকে পাহাড় সমান দুঃখ নিয়ে দিব্যি চালিয়ে যায় জীবন। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হলো আমার দোয়া কখনও কবুল হয় না। যদি কবুল হতোই তাহলে তোমার জায়গায় আজ আমি থাকতাম।
আর পরজন্ম বলতেও কিছু নেই। না তুমি প্রেমা হতে পারবে। আর দূর্ভাগ্যের বিষয়, না আমি মেহরিন হতে পারবো। সুতরাং আমার এই দোয়া কোনো কাজে লাগবে না। আর হ্যাঁ তোমার স্বামী সাথে আমার ৫ বছরের সম্পর্ক ছিলো না। ছিলো দু বছরের। আমি জানি সে কি কি বলেছে। আমিও ২ বছর বললে তুমি দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে সময় নিবে না। বুদ্ধিমতী মেয়ে তুমি। আমি আর চাই না আমাদের দেখা হোক। আমি চাইনা তুমি কখনও প্রেমাকে দেখো। আমি তোমার জীবনে সূচনা হয়েই থাকতে চাই। ”
প্রেমা বেরিয়ে গেলো ক্যাফে থেকে। বাসায় আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেলো। বসার ঘরে পা রাখতেই আকস্মিক শেখর কে দেখে চমকে গেলো। শেখর মাথা নিচু করে বসে আছে। অপেক্ষা ছিলো প্রেমার ফেরার। বাড়িতে এসেই জানতে পারলো প্রেমা বাসায় নেই। কথাটা শুনেই রাগে ফেঁপে উঠছিল। এখন রাগ টা আয়ত্তে ধরে রেখেছে। ঠান্ডা গলায় এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় গিয়েছিলে? ”
প্রেমা এক ঢোক গিললো।
” সামিরের কলেজে। ”
” কি জন্য? ”
প্রেমা ব্যাগ থেকে সামিরের রেজি কার্ড এডমিট কার্ড বের করে বলল-
“ কলেজ থেকে বের করে দিছে আপনার ভাই কে। আমি বলেছিলাম আপনারা কেউ নেই বাসায়। উনি আমাকেই যেতে বলল। ”
শেখর শক্ত মুখে দেখলো কাগজ গুলো। তারপর বলল-
“ রুমে যাও। ”
প্রেমা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কিছু বললো না তাহলে। প্রেমা রুমে চলে গেলো। সোফায় বসে থাকা সামির বলল-
“ দেখো গিয়ে হয়তো প্রাক্তনের সাথে প্রেমালাপ করতে গেছিলো। ”
শেখর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো।
“ মানে? ”
“ সোলেমান ঐ কলেজের টিচার। ওর বউ আমার ক্লাসেই পড়ে। ওর বউয়ের লাইগাই আমার হাতের এই অবস্থা। ঐ সোলেমান আর ওর ঐ জাউরা ভাই এজওয়ান করছে আমার সাথে এগুলো। ”
শেখর হাতের কাগজ গুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলো সাথে সাথে। আগামীকাল ই সভা! এই দু’টোর শেষ দিন আগামীকাল ই। শেখর পকেট থেকে ফোনটা বের করে বলল-
“ কাজ কতদূর? ”
“ রাতে শেষ হবে। ”
“ এখনও শেষ হয় নি! ”
“ না। মধ্য রাতে করা হবে। সিকিউরিটি প্যানেল সিস্টেম টা ভীষণ হার্ড। ”
দাহশয্যা পর্ব ৮১ (৩)
” তাড়াতাড়ি করা চাই । ঐ জানোয়ার রা যদি কোনো ভাবে কাল বেঁচে যায় তাহলে কিন্তু আমার বাঁচা অসম্ভব । একদম শেষ হয়ে যায় যেন ওরা রমনার মাটিতেই। অনেক দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। সোলেমান কে হটাতে পারলে ঢাকা ৮ এ রাজত্ব করতে পারবো আমরা। ওর জন্য পারছি না। ”
“ চলে এসো রমনায় কাল। দুজন মিলে দেখবো লাইভ…..
