Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৩

দাহশয্যা পর্ব ৮৩

দাহশয্যা পর্ব ৮৩
Raiha Zubair Ripti

ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগটা এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো অবস্থা। স্ট্রেচার একের পর এক আহত মৃ’ত লা’শ ঢুকছে।
সভায় সব কিছুই ঠিকঠাক ছিলো। সভার চারিপাশ টা কড়া পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিলো। সাফওয়ান অপেক্ষায় ছিলো এজওয়ানের। এজওয়ানের গাড়িটা আসতেই সাফওয়ান এগিয়ে গিয়েছিল। এজওয়ান গাড়ি থেকে নেমে একবার সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে লম্বা করে টেনে সালাম দিয়ে বলল-
“ ভালো আছেন? ”
সাফওয়ান প্রফেশনালি ভাবে জবাব দিলো –
“ জ্বি স্যার। ”
এজওয়ান তা শুনে বলল-
“ স্যার ডাকছেন। নিজেকে ভিআইপি মনে হচ্ছে। চলুন ভেতরে। ”
সোলেমান বাশার সুলতান সহ আরো বেশ কিছু নেতারা স্টেজের প্রথম সারিতে বসেছিল। এজওয়ান কে দেখা মাত্রই সোলেমান ইশারায় কাছে আসতে বলল। এজওয়ান গিয়ে বসলো।

” এতো দেরি হলো কেনো? ”
“ গাড়ি স্লো চালাচ্ছিলাম,সেজন্য। ”
বাশার সুলতান উঠে মাইক্রোফোনের কাছে গেলো। দলের হয়ে অনেক কথা বার্তা বললো। সাথে বিরোধী দল দের ও টেনে এনে অনেক কথা বললো। সাথে এ-ও ঘোষণা দিলো যে তার একমাত্র ছেলে এজওয়ান সুলতান রাজনীতি তে যুক্ত হতে যাচ্ছে। নেক্সট নির্বাচনে ঢাকা ৯ আসনের হয়ে লড়বে। এজওয়ান ভ্রু কুঁচকালো সেকথা শুনে। সে মোটেও কোনো আসন নিয়ে টানাটানি করতে চায় না। এমনি বাপের মন রাখার জন্য বলছিলো রাজনীতি করবে। তার রাজনীতি করার সময় কই? তাকে আবার অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে হবে। হলে ছাত্রলীগ করা যায় একটু-আধটু। আর ঢাকা ৯ আসনের জন্য লড়তে হলে তাকে আরো ২ বছর অপেক্ষা করতে হবে। কবে ২৪ সাল আসবে আর এজওয়ান ধুম তা-না-না ধুম তা-না না করবে।

“ ভাইজান। আব্বা একটু বেশি বেশি করে বলছে না? আমি কোনো আসন নিয়ে লড়তে চাই না। এমনি রাজনীতি করি তোমার দল নিয়ে। এমপি হলে অনেক দায়িত্ব। সরকারের গোলামি করতে হবে। সারা সময় বাহিরে থাকতে হয়। বউকে সময় দিতে পারবো না তখন। আর বউকে সময় না দিলে বউ ভেগে যায়। ”
সোলেমান বাঁকা চোখে তাকালো।
“এভাবে তাকাও কেন? ইট’স ট্রু, ভাইজান।”
“চাচা ডাকছে তোকে। যা।”
এজওয়ান আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে এক অদ্ভুত কৌতূহল। সবাই মুখিয়ে আছে বাশার সুলতানের ছেলেকে দেখার জন্য। অনেকেই জানতোই না, বাশার সুলতানের কোনো ছেলে আছে। আজ হঠাৎ খবরটা ছড়িয়ে পড়ায় পুরো সভাস্থল জুড়ে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা।
সব চোখ গিয়ে আটকে গেল কালো লেদার জ্যাকেট পরা লম্বা, স্মার্ট এক যুবকের দিকে। পোশাক দেখে অনেকে একটু চমকাল। কারণ এখানে একটা অলিখিত ধারণা বহুদিন ধরেই চালু যে রাজনীতি মানেই পাঞ্জাবি, সাদা-পায়জামা, গম্ভীর মুখ। সেই চেনা ছবির বাইরে এজওয়ান যেন এক ব্যতিক্রম।
এজওয়ান গিয়ে বাবার পাশে দাঁড়াতেই বাশার সুলতান ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। কণ্ঠে গর্ব, চোখে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল-

“ আপনাদের সাথে আজ আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। এই হচ্ছে আমার একমাত্র ছেলে এজওয়ান সুলতান। ছোটবেলা থেকেই অস্ট্রেলিয়ায় বড় হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতি আর সংস্কৃতির ভেতরে তার বেড়ে ওঠা হয়নি। তবে জ্ঞান, মেধা আর চিন্তাশক্তির দিক থেকে সে নিজেকে প্রমাণ করেছে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে। এবং সে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন টপ স্টুডেন্ট। আমি বিশ্বাস করি—ইনশাআল্লাহ, রাজনীতিতে আসলেও সে দায়িত্বশীলতা, সততা আর দক্ষতায় নিজেকে প্রমাণ করবে। আপনাদের বিশ্বাসযোগ্য একজন প্রতিনিধি হয়ে উঠবে। ঠিক যেমনটা আপনারা পেয়েছেন আমার ভাইস্তা সোলেমান সুলতানের মাঝে।”
করতালিতে সভাস্থল মুখর হয়ে উঠল।বাশার সুলতান ছেলেকে মাইকের সামনে টেনে নিলেন।
এজওয়ান সামনে তাকাল। চোখের সামনে মানুষের ঢল কোথাও কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। সাধারণ মানুষ, কর্মী, বয়স্ক মুখ, তরুণ চোখ সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে হালকা করে গলা খাঁকারি দিল।
“আসসালামু আলাইকুম। আশা করি আপনারা সবাই ভালো আছেন। আছেন তো ভালো?”
মুহূর্তেই চারদিক থেকে সবাই একসাথে গর্জে উঠল-

“হ্যাঁ, ভালো আছি!”
এজওয়ান মাথা নেড়ে মৃদু হাসল। মাইকের আরে একটু কাছে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বলল-
“আপনাদের এই শক্ত কণ্ঠই প্রমাণ করে এই দেশের মানুষ এখনো আশা ছাড়েনি। আমি জানি আপনাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। বিদেশে বড় হওয়া একজন ছেলে কি এই দেশের বাস্তবতা বুঝবে? গ্রাম, গলি, খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট কি সে চিনবে? আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চাই না। বরং সোজাসাপ্টা বলতে চাই আমি সব জানি না। কিন্তু আমি শিখতে রাজি। শুনতে রাজি। এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভুল করলে তা স্বীকার করার সাহস রাখি।”
সভাস্থল নিস্তব্ধ। মানুষ মন দিয়ে শুনছে এজওয়ানের কথা।

“ আজ রাজনীতি সবচেয়ে বেশি যেটা হারিয়েছে, সেটা হলো জবাবদিহিতা। ক্ষমতায় গিয়ে আমরা কথা ভুলে যাই। মানুষ আমাদের দরজায় আসে, আর আমরা দরজা বন্ধ করে দিই। আমি যদি কখনো আপনাদের প্রতিনিধি হই তাহলে আমার দরজা বন্ধ থাকবে না। প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হবে এই বিশ্বাসটা নিয়েই আমি সামনে আসতে চাই। আমি উন্নয়নের গল্প শুনিয়েই বড় হইনি, আমি গবেষণার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি। সংখ্যা, তথ্য, বাস্তবতা এই তিনটা জিনিস আমাকে শিখিয়েছে যে উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় বিল্ডিং না। উন্নয়ন মানে একজন যুবকের কাজ পাওয়া, একজন মায়ের চিকিৎসা পাওয়া, একজন কৃষকের ন্যায্য দাম পাওয়া। আমি রাজনীতিকে উত্তরাধিকার হিসেবে দেখতে চাই না। আমি চাই যোগ্যতার প্রতিযোগিতা হোক। যদি আমি যোগ্য না হই, আপনারা আমাকে প্রত্যাখ্যান করবেন। কিন্তু যদি মনে করেন আমি শিখতে পারি, বদলাতে পারি তাহলে আমাকে সুযোগ দেবেন।”
এজওয়ান এবার বাবার দিকে একবার তাকাল, তারপর আবার জনতার দিকে।

“ আজ আমি কোনো প্রতিশ্রুতির পাহাড় বানাতে আসিনি। শুধু এটুকু বলার জন্য এসেছি আমি আপনাদের সাথে হাঁটতে চাই, আপনাদের সামনে নয়। সিদ্ধান্ত নেবো আপনাদের কথা শুনে, আপনাদের সমস্যা বুঝে। এই দেশ কারো ব্যক্তিগত বা কারো বাপের পৈতৃক সম্পত্তি না। এই দেশ আমাদের সবার। আর রাজনীতি যদি মানুষের জন্য না হয় তাহলে সেই রাজনীতির কোনো মূল্য নেই। আপনারা দোয়া করবেন আমি রাজনীতি তে ঢুকলে যেন আমি ক্ষমতার কাছে কখনও দুর্বল না হই, নিজের দল বলে দলের অন্যায় কে অন্যায় না বলে ধামাচাপা না দেই। বরং আওয়াজ তুলতে পারি। পরিশেষে এটুকু বলবো, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বুঝেশুনে ভোট দিবেন। যাকে ভোট দিয়ে জেতাচ্ছেন সে আদোও আপনাদের কল্যাণে আসবে তো?। যারা বলে আমাকে জেতালে ওমুক তমুকের উন্নয়ন করবো। তারা রীতিমত একটা ভণ্ড। একজন প্রকৃত নেতা কখনই বলবে না আমাকে আপনারার জেতালে এটা করবো ওটা করবো। যে প্রকৃত নেতা সে কখনও এসব বলবে না। তারা বলে কেন জানেন? কারন নির্বাচন হলে নির্বাচনের পেছন একজন প্রতিনিধি লাখ লাখ টাকা সেটা কোটিতেও গিয়ে ঠেকতে পারে।

এতে বড় অ্যামাউন্ট তারা খরচ করে। সেই টাকা কি তারা উঠাবে না ভাবছেন? তার ডাবল উঠায়। কিভাবে জানেন? এই যে ট্রেন্ডারি চাঁদাবাজি করে সরকারের কাছে গিয়ে বলে আমার এলাকার ওমুক জায়গায় ব্রিজ করতে হবে। রাস্তায় পানি জমে,এসব বলে একটা হিউজ অ্যামাউন্ট কালেক্ট করে তার ৩০% ও বোধহয় আপনাদের পেছন ব্যয় করে না। ঐ যে প্রচারণা করার সময় নিজের পকেট থেকে টাকা ভাঙছে সেগুলো আগে পূরণ করতে হবে। তারপর বাঁচলে এঁটো মেটো আপনাদের দেওয়া হয়। সেজন্য বলছি যোগ্য মানুষকেই নির্বাচিত করবেন আপনার এলাকার জন্য। যেমনটা নির্বাচন করেন আমার ভাইজান কে। আর কিছু বলার নেই,শুধু বলবো যোগ্য নেতা হারালে কাঁদতে হয় আড়ালে,ধন্যবাদ। আসসালামু আলাইকুম। ”

এজওয়ান সরে গেলো। সভার সবাই বেশ পছন্দ করে ফেললো এজওয়ান কে। কেউ কেউ এখনই ঠিক করে রাখলো এই ছেলে নির্বাচনে দাঁড়ালে তাদের ভোট এই ছেলেকেই দিবে।
সোলেমান মাইকের সামনে এসে এজওয়ান কে নিয়ে আরো অনেক কথাবার্তা বললো। দুই ভাই দুই আসনের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে এ তো খুশির বিষয়। সোলেমান তার কথাবার্তা বলা শেষে আরো কয়েকজন বক্তৃতা দিলো। তাদের মধ্যে কিছু জনের এজওয়ান কে পছন্দ হলো না। কিভাবে বললো দেশটা কারো বাপের সম্পত্তি না। এটা যে কাকে মিন করে বলেছে তা আর তাদের বুঝতে বাকি নেই। কিভাবে এই ছেলে মনোনয়ন পায় সেটাও দেখবে তারা।
বক্তৃতার পর্বটা শেষের দিকেই ছিল। মঞ্চের চারপাশ তখন বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা। ভেতরের রিংয়ে সেনাবাহিনী, তার বাইরে পুলিশ ও র‍্যাব। জনতার ভিড়ে ছড়িয়ে ছিল ডিজিএফআইয়ের সিক্রেট টিম সাধারণ পোশাকে, নিঃশব্দ নজরদারিতে। প্রতিটি প্রবেশপথ স্ক্যান করা, আকাশে ড্রোন ঘুরছে, ছাদে স্নাইপার পজিশন। সবকিছু এতটাই আঁটসাঁট যে সামান্য একটি পাখিও নজর এড়িয়ে ঢুকতে পারার কথা না। তারপরও আক্রমণ আসে।
এজওয়ান সোলেমানের পাশে বসে ফোন স্ক্রোল করছিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে গণমাধ্যম নিউজ। তার বক্তৃতার ক্লিপ ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। এজওয়ান হালকা নিশ্বাস ফেলল।

সভাস্থলের উত্তেজনা তখন ধীরে ধীরে নামছে। ঠিক সেই সময় প্রথম বিস্ফোরণটা ঘটে মঞ্চের বাম পাশে। শব্দটা শুধু কানে নয়, বুকের ভেতর আঘাত করে। আগুন আর ধোঁয়ার সাথে সাথে মানুষ ছিটকে পড়ে।
এক সেকেন্ডের ভেতর পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এরপর একযোগে শুরু হয় গোলাগুলি। কোথা থেকে গুলি আসছে বোঝার আগেই চারপাশে মানুষ পড়ে যেতে থাকে। নিরাপত্তার ব্যারিকেড ভেঙে যায়, লোহার গেট উড়ে গিয়ে ভিড়ের উপর পড়ে। দ্বিতীয় বিস্ফোরণটা ঘটে সামনের সারিতে,সেখানে যারা বসে ছিল, তাদের অনেকেই আর মানুষ হিসেবে চেনার মতো থাকে না।
রক্ত, ধোঁয়া, চিৎকার আর আতঙ্ক একাকার হয়ে যায়। সেনাবাহিনী মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টা অবস্থান নেয়। ডিজিএফআইয়ের টিম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আকাশে হেলিকপ্টার, মাটিতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ। আক্রমণের ধরন দেখে স্পষ্ট এটা ছিল নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত, ভেতরের তথ্য ছাড়া অসম্ভব।
লোক মরছে। কেউ গুলিতে, কেউ বিস্ফোরণে, কেউ পদদলিত হয়ে।

সোলেমানের শরীর হিম হয়ে যায়। সবাই ছোটাছুটি করছে। সেনাবাহিনীর একটা দল এসে সোলেমান দের প্রটেকশন দিলো। তাড়াতাড়ি নেমে আসতে বললো। পেছনের গেট দিয়ে তাদের বের করে নিয়ে যাওয়া হবে। সোলেমানের শরীর নড়ছে না। এজওয়ান আর বাশার সুলতানের দিকে তাকিয়ে বললো তোমার যাও। আমি থাকবো এখানে। আমার জনগণ মরছে আর আমি নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পালাবো! কাপুরষ আমি?
সোলেমান মঞ্চ থেকে নেমে গেলো। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হচ্ছে। অনেক সেনা সদস্য আহত হলো। সোলেমান যখন দৌড়ে জনসমাগমে আসলো। দেখলো রক্তে লাল হয়ে গেছে জায়গাটা। বুকের ভেতর টায় যেন পাহাড় এসে পড়লো। আহতদের কান্নাকাটি জান বাঁচানোর জন্য আহাজারি। সোলেমান পকেট থেকে ফোন বের করে এম্বুলেন্স পাঠাতে বললো। সোলেমান আহতদের কে তোলার চেষ্টা করলো। সাদা পাঞ্জাবি টা র’ক্তে লাল হয়ে গেলো। সবচেয়ে বেশি ব্যাথিত হলো যখন দেখলো একটা ১০ বছরের বাচ্চার একটা পা ইতিমধ্যে শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। গগন কাঁপিয়ে কাঁদছে ছেলেটা এক কোনায় ছিটকে পড়ে। সোলেমান সেই আহত ছেলেটাকে কোলে নিয়ে দৌড়াতে লাগলো। ঠিক সেই সময় পাশ থেকে একটা গুলি এসে লাগে সোলেমানের বাহুতে। সোলেমান ব্যথায় দাঁড়িয়ে যায়। পাশ ফিরে যখন দেখলো লোকটা ফের গুলি মা’রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ঠিক সেই সময় সোলেমান কোমর থেকে তার পিস্তল টা বের করে লোকটার বুক বরাবর গুলি করে। লোকটা লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। সোলেমান পেছনের দরজা দিয়ে ছেলেটাকে গাড়িতে বসি একটা সেনা সদস্য কে বলল নিয়ে যেতে ইমিডিয়েটলি।

এজওয়ান নিজের হ্যান্ড গান টা নিয়ে ইতিমধ্যে নেমে পড়েছে। বাশার সুলতান পারে না আতঙ্কে এখনই জামাকাপড় ভরে প্রস্রাব করে দিতে। এজওয়ান কে কত করে আটকাতে চাইলো। ছেলেটা শুনলো না। কোনো বুলেটপ্রুফ ভেস্টও তো পড়ে নি এই ছেলে। এখন গুলি এসে লাগলে তখন?
সোলেমানের বাহু দিয়ে গলগল করে র’ক্ত বের হচ্ছে। সেই অবস্থায় আহতদের টেনে টেনে গাড়িতে তুলে দিচ্ছে।
মঞ্চের সিঁড়ি রক্তে ভিজে গেছে। পতাকা ছিঁড়ে পড়ে আছে লাশের উপর। রাজনৈতিক সভা মুহূর্তেই কোমন গণহত্যার দৃশ্যে রূপ নিলো। এজওয়ান ইতিমধ্যে কয়েকটাকে মে’রে শুইয়ে দিছে। বাঁচিয়ে রাখার স্কোপ নেই। বাঁচিয়ে রাখলে জনগণের প্রাণ আরো বিপন্ন হতে পারে। সাফওয়ান এজওয়ান কে প্রটেক্ট দেওয়ার জন্য আসতে চাইলে এজওয়ান হাতের ইশারায় বলল-

“ আমার জনগণ কে আপনি প্রটেক্ট দিন আগে। আমি নিজের প্রটেকশন নিজে দিতে পারি। ”
সাফওয়ান আগের ন্যায় গুলাগুলি করতে লাগলো।
প্রায় অনেকক্ষন এই বিশৃঙ্খলার পর এজওয়ানের নজরে পড়ে সাফওয়ান মির্জার উপর। সাফওয়ান তখন আক্রমণকারীদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে ব্যস্ত, নিজের দিকে আসা বিপদ বুঝে ওঠার আগেই এক শুটারের নিশানা তার দিকে স্থির হয়ে যায়।
তার হাতে থাকা পিস্তলটা ঐ লোকের দিকে এজওয়ান তাক করে বুঝতে পারে তার পিস্তলের বুলেট শেষ হয়ে গেছে। কয়েক বার চিৎকার করে ডাকলো এজওয়ান সাফওয়ান কে। এই শোরগোলে সেই আওয়াজ যাচ্ছে না সাফওয়ান অব্দি। এজওয়ান আর কোনো হিসাব কষলো না। সে নিরাপত্তা বলয় ভেঙে দৌড়ে এগি এগিয়ে যায়। সাফওয়ান কে ধাক্কা দিয়ে সরাতেই ঠিক সেই সময় গুলিটা ছোড়া হয়। মূহুর্তে নিশানা বদলে যায়। গুলিটা এসে এজওয়ানের শরীরে বিদ্ধ হয়।

শব্দটা আলাদা করে শোনা যায় না, কারণ চারপাশ তখন বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দে ভরা। এজওয়ান নিজেও চমকালো হুট করে বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব করতেই। কি হয়েছে সেটা দেখার জন্য নিজের দিকে তাকাতেই দেখলো গলগল করে বুক থেকে রক্ত পড়ছে তার শরীর বেয়ে মাটিতে। শালার পুত গুলি করলো এজওয়ান কে! ওর কলিজা টেনে আনবে এজওয়ান।
লোকটা আরো একটা গুলি ছুঁড়তে নিলে সাফওয়ান পড়া থেকে উঠে গুলি করে বসে ঐ লোক কে। তারপর দৌড়ে আসে এজওয়ানের দিকে। এজওয়ানের শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে যায়, তারপর ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কালো লেদার জ্যাকেটের নিচে রক্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আরেকটি বোমা ফাটে দূরে। সেনাবাহিনী শুটারকে নিস্ক্রিয় করে। এলাকা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ততক্ষণে সভাস্থল লাশে ভরে গেছে। যারা বেঁচে আছে, তারা রক্তমাখা, স্তব্ধ, নির্বাক।
এজওয়ান মাটিতে পড়ে থাকে। গুলিবিদ্ধ শরীর, নিঃশ্বাস অনিয়মিত। সাফওয়ান মির্জা অক্ষত আছে।
এজওয়ান তাকিয়ে দেখে সাফওয়ান এসেছে দৌড়ে। সেটা দেখে মুচকি হাসে। সাফওয়ানের কি যে খারাপ লাগছে। তাকে বাঁচাতে কেউ বুক পেতে দিয়েছে! তাও আবার সে যাকে সাফওয়ান সহ্য করতে পারে না! এজন্যই বেশি খারাপ লাগছে বোধহয়। সাফওয়ান এজওয়ানের বুলেট বিঁধে যাওয়া বুকে হাত চেপে রক্ত আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল-
“ কি দরকার ছিলো আপনার দৌড়ে আসার? গুলি টা তো লাগতো আমার। আমি ম’রে গেলে এতে তো আপনারই সুবিধা হতো। কেনো বাঁচাতে গেলেন? ”
এজওয়ানের ঠোঁটের কোনে তখন মৃদু হাসি। সাফওয়ানের চোখ মুখে স্পষ্ট অপরাধবোধের ছায়া। হাহ্‌! সেটাও এজওয়ান কে নিয়ে!

“ আপনাকে বাঁচানোর একটাই উদ্দেশ্য। আপনি আমার তরিকুলের বেটির সবচেয়ে পছন্দের মানুষ। আপনার কিছু হলে আমার তরিকুলের বেটি ঠিক থাকবে না। তার হাসির কারণ আপনি হয়েছেন। আমি চাই না,তার কান্নার কারণটাও আপনি হন। এইটুকু না হয় আমার নামে থাক। যদিও তরিকুলের বেটির কিছুই যায় আসবে না আমি চলে গেলে। বরং সে আরও মুক্ত হবে ঠিক যেমন অনেক দিন খাঁচায় বন্দি থাকা একটা পাখি হঠাৎ আকাশ পেলে মুক্ত হয়ে যায়।”
সাফওয়ান চমকালো। এমন কথা মোটেও আশা করে নি সে। এজওয়ান কে উঠাতে উঠাতে বলল-
“ উঠুন আপনি। এই অবস্থাতেও এসব বলছেন আপনি! মৃ’ত্যু কখনই কাউকে মুক্তি দিতে পারে না। ”
“ পারে। পারে মুক্তি দিতে। আমার মৃ’ত্যুই একমাত্র পারে তরিকুলের বেটিকে মুক্তি দিতে। শুনুন সাফওয়ান যদি আমি বেঁচে ফিরি তাহলে তরিকুলের বেটি শুধুই আমার। আর যদি মরে যাই তাহলে সে শুধুই আপনার। সেজন্য বলছি আপনার আল্লাহ কে বইলেন সে যেন ভুলেও আমাকে না বাঁচায়। আমাকে বাঁচালে কিন্তু মাহি কে আপনি পাবেন না। মাহি কে পেতে হলে দোয়া করুন ভুল করেও আমি যেন বেঁচে না ফিরি…..”

সোলেমান এসেছিলো ভাইকে খুঁজতে। বাশার সুলতান গাড়ির কাছে গেলেও ছেলেকে এখনও না দেখে অস্থির হয়ে গেছে। এদিকে তার শরীর টাও আর চলতে চাইছে না। খুঁজতে খুঁজতে আকস্মিক এজওয়ান কে সাফওয়ানের সাথে দেখে এগিয়ে কাছে আসতেই বুকটা মুচড়ে উঠলো। বুকের পাশ দিয়ে কেমন গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। গুলি করেছে কেউ? কোন শু’য়োরের বাচ্চা গুলি করলো? সাফওয়ানের থেকে এজওয়ান কে নিজের কাছে টেনে নিলো সোলেমান। আধখোলা চোখ এজওয়ানের। ছোট ভাইয়ের এমন অবস্থা সহ্য করতে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। এজওয়ান ভাইজানের দিকে তাকালো। এই লোকটা মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসে তাকে। তার বাপও ভালোবাসে। সবাই বাসে, শুধু বাসে না তরিকুলের বেটি। সোলেমান কাঁধে তুলে নিয়ে উন্মাদের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে বলল-
” কিচ্ছু হবে না তোর এজওয়ান। ভাইজান হতে দিবে না। চোখ বন্ধ করবি না ভাই আমার। একদম চোখ বন্ধ করবি না। হসপিটাল বেশি দূরে না। ”

বাশার সুলতান ছেলের এমন দশা দেখে কেঁদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম। সোলেমান নিজেই গাড়ি চালিয়ে ভাইকে ঢাকা মেডিকেল হসপিটালে নিয়ে আসলো। হসপিটালে এসে ডক্টর দের ডাকতে লাগলো। ডক্টর রা সবাই ব্যস্ত। হসপিটাল ভর্তি লা’শে আর আহতদের দিয়ে। কেউ আসছে না। সোলেমান এজওয়ান কে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিজেই চলে গেলো ডক্টর ডাকতে। একজন ডক্টর কে ডেকে নিয়ে আসলো। ডক্টর এজওয়ান কে দেখার সঙ্গে সঙ্গে জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে বললো নার্স কে। এজওয়ান কে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হলো। এজওয়ানকে ভেতরে ঢোকানো মাত্রই ডাক্তাররা ঘিরে ধরল। BP ড্রপ করছে!হার্ট রেট ১৩০! অক্সিজেন স্যাচুরেশন নামছে ভেন্টিলেটর রেডি রাখতে বলা হলো।
এজওয়ানের বুকের ডান পাশে গুলির ক্ষত। রক্ত এখনো থামেনি। শার্ট কেটে ফেলা হয়েছে, গজ চাপা দেওয়া তবু র’ক্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
সিনিয়র সার্জন দ্রুত বললেন-

“গুলি হার্টে লাগেনি, কিন্তু ফুসফুসে ইনজুরি আছে। হেমোথোরাক্স হচ্ছে। এখনই অপারেশন লাগবে।”
নার্স প্রশ্ন করল-
“স্যার… বাঁচবে তো? এমপির ভাই তো। না বাঁচাতে পারলে আবার সমস্যা। ”
ডাক্তার এক সেকেন্ড থামলেন। তারপর কঠিন স্বরে বললেন-
“এখনই কিছু বলা যাবে না। অপারেশনের পরের এক ঘণ্টাই ওর ভাগ্য ঠিক করবে।”
এজওয়ানের চোখ আধখোলা। ঠোঁট শুকনো। অক্সিজেন মাস্কের নিচে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
মনিটরে হঠাৎ বিকট শব্দ হলো। সেটা দেখে সার্জন বলল-
“Pressor বাড়াও! দুই ইউনিট ব্লাড রেডি করো!OR খালি আছে তো? ”
“ জ্বি স্যার।
স্ট্রেচার ছুটতে শুরু করল অপারেশন থিয়েটারের দিকে।

প্রেমা টিভির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কত কত লোক মারা গেছে আহত হয়েছে তা হিসেব করার সাধ্য প্রেমার হচ্ছে না। যখন দেখলো একটা দশ বছরের বাচ্চাকে নিয়ে সোলেমান ছুটছে পাগলের মতো তখন বুকের ভেতর টা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। শেখর তাহলে এটারই প্ল্যান করছিলো! অমানুষের বাচ্চা। নিজের সন্তান দের তো মেরে ফেলছে এখন অন্যের সন্তানদেরও মা’রছে! আজ শেখর ফিরলে যে প্রেমা কি করবে তা নিজেও জানে না।
তার কিছুক্ষণ পরই শেখর ফিরলো বাসায়। কিছুটা ভীত দিশাহীন অবস্থা। যাদের মা’রতে চাইলো তারা তো মরলোই না। রুমের দিকে যাওয়ার পথে প্রেমা এসে দাঁড়ালো সামনে। ঘৃণায় ইচ্ছে করছে মাথা ফাটিয়ে দিতে। প্রেমা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো-

“ এসব আপনি করেছেন তাই না? ”
শেখর টিভির দিকে তাকালো। তারপর প্রেমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চলে যেতে নিলে প্রেমা রেগে বলে উঠে-
” অমানুষের বাচ্চা আপনি। জানোয়ারের থেকে অধম। আমি নিজে গিয়ে বলবো পুলিশ সিআইডি কে এইসব আপনি করেছেন। আমার সাথে অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন। আমি গিলে খেয়েছি,আমার কথা শোনার মতো কেউ ছিলো না। কিন্তু এবার শোনার লোক আছে। আপনাকে আমি জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বো। ”
শেখর তেড়ে এসে চুলির মুঠি ধরে টান দিলো। কতবড় সাহস গলা উচু করে কথা বলছে! প্রেমা ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো।
“ বান্দির বা’চ্চা পুলিশের কাছে যাবি? তোর ভা’তার লাগে ওরা? মা’গি। লাং দেখে পিনিক উঠছে তোর শরীরে? লাগাইতে যাবি? ”

প্রেমা আর সহ্য করতে পারলো না। এখনও কেমন ফাঁফর গলা বাজি নোংরা কথাবার্তা! শেখরের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে পরপর দুটো চড় বসিয়ে দিলো শেখরের গালে প্রেমা।
শেখর হতবিহ্বল হয়ে গেল। প্রেমা চ’ড় মারলো তাকে! এত বড় সাহস! এই সাহস টা বেড়েছে ঐ সোলেমানের জন্য! নাহ এই বান্দির বাচ্চাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। আগে এটাকেই সরাতে হবে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে শেখর কাউকে আসতে বললো। মিনিট দশেকের মাথায় দুজন পুরুষ এলো। প্রেমা আঁতকে উঠলো।

দাহশয্যা পর্ব ৮২ (২)

দু’জন পুরুষ প্রেমার দিকে এগোতে নিলে প্রেমা দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো। রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতে চাইলো তার আগেই তারা এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে দেয়। প্রেমা ছিটকে পড়ে যায় দূরে। লোক দুটো এগিয়ে এসে প্রেমার হাত পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। প্রেমা বাঁচার জন্য আকুতি মিনতি করলো। কত চেষ্টা করলো। কিন্তু পুরুষালি শক্তির কাছে তার নারী শক্তি খুবই তুচ্ছ। তারপর পাটের বস্তায় ভরে নিয়ে চলে গেলো।

দাহশয্যা পর্ব ৮৩ (২)