Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৮৪

দাহশয্যা পর্ব ৮৪

দাহশয্যা পর্ব ৮৪
Raiha Zubair Ripti

শরীর থাকা চাদর টা নিয়ে স্টাডি রুম থেকে বেরিয়ে দোতলায় নিজের রুমের দিকে হাঁটা ধরলো। রুমের দরজা টায় হাত রাখতেই বুঝতে পারলো দরজাটা ভেতর থেকে লাগানো না। ধীর হাতে দরজাটা খুলে রুমে প্রবেশ করলো এজওয়ান। সর্বপ্রথম চোখ গেলো বিছানায়। ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে শুয়ে আছে বিছানার একপাশে। এলোমেলো চুল গুলো মুখের উপর এসে মুখ ঢেকে রেখেছে। সেজন্য বিরক্তিতে চ সূচক উচ্চারণ করলো এজওয়ান।
হাতের চাদর টা ছুঁড়ে সোফায় ফেলে দিলো। এজওয়ান নিশ্চিত এই মেয়ে এজওয়ানের গায়ে চাদর দিতে যায় নি। নিশ্চয়ই এজওয়ানের বাপ আর নইলে ভাইজানের কাজ এটা। একমাত্র এজওয়ান কে তো এই দু’জনই ভালোবাসে। এই দুজনেরই তো কলিজা পুড়ে এজওয়ানের জন্য।
এজওয়ান ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। বসার ঘরে আসতেই দেখতে পেলো বাশার সুলতান এক লোকের সাথে কথা বলছে সোফায় বসে। লোকটা বাশার সুলতানের সমবয়সী হবে কিছুটা। বেশ পরিপাটি। এজওয়ান কে দেখেই বাশার সুলতান লোকটার উদ্দেশ্যে বলল-

“ ঐ তো আমার ছেলে এসে গেছে। ”
শামসুল মির্জা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। এজওয়ান কে এই সামনা-সামনি তার দেখা। ছেলের প্রাণ বাঁচিয়েছে যে তাকে সামনা-সামনি দেখতে এসেছেন। আসার ইচ্ছে টা তখনই বেশি হলো,যখন জানলো এজওয়ান সোলেমানের ভাই। সোলেমানেরই তো শিক্ষক ছিলো শামসুল মির্জা।
এজওয়ান গিয়ে তাদের দু’জনের সামনের সোফায় বসলো। চিনতে পারছে না এনাকে এজওয়ান। তবে চেহারাটা কিছুটা পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছে। কোথায় দেখেছে? মনে তো পড়ছে না।
শামসুল মির্জা গলা ঝেড়ে এজওয়ানকে জিজ্ঞেস করলো-
“ এখন শরীর কেমন আছে তোমার বাবা? ”
বাবা ডাক শুনে এজওয়ান নড়েচড়ে বসলো। এতো আদুরে ডাক! রিলেটিভ কেউ নাকি? এজওয়ান গম্ভীর গলায় বলল-

“ ভালো আছে শরীর। বাট আপনি কে চাচা? ”
বাশার সুলতান বললেন-
“ সোলেমানের শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ”
এজওয়ান পায়ের উপর পা তুলে বসে বলল-
“ ওহ্ ভাইজানের শিক্ষক। বেশ ইয়াং তো আপনি। জিম টিমে যান নাকি? ”
শামসুল মির্জা স্মিত হাসলেন। এজওয়ান সেটা দেখে বলল-
“ হাসছেন কেনো? হাসির কিছু বলেছি? ”
শামসুল মির্জা হাসি থামিয়ে দিয়ে বলল-
“ না। তোমার ভাইয়ের শিক্ষক হলেও, আমি আজ এসেছি তোমাকে দেখতে। ”
দেখতে এসেছে মানে! তার বাপ বাশার সুলতান কি দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছে নাকি এজওয়ানের? গম্ভীর স্বরে বলল-

“ আমায় কেনো দেখতে এসেছেন? মেয়ের জামাই বানানোর জন্য নাকি? দেখুন চাচা আমি বিবাহিত, আমার একটা বউ আছে। কদিন পর হয়তো বাপ ও হবো। তাই আমার বাবার কথায় উষ্কে যাবেন না। পারলে তার জন্য মেয়ে দেখুন। ”
শামসুল মির্জা হতবিহ্বল হয়ে গেলো এহেন কথায়। তার তো মেয়েই নেই সেখানে এই ছেলেকে কি করে মেয়ের জামাই বানাবে?
“ তোমার বুঝতে ভুল হচ্ছে এজওয়ান। আমার কোনো মেয়ে নেই। শুধু একটা ছেলে আছে। ”
“ ওহ্ আচ্ছা তাহলে ঠিক আছে। ”
“ সাফওয়ান কে চিনো তো? ”
“ হ্যাঁ। ঐ ডাব্বাওয়ালা কে চিনি। ”
শামসুল মির্জা ভ্রু কুঁচকালো ডাব্বাওয়ালা নাম টা শুনে।
“ ডাব্বাওয়ালা মানে? ”
“ ও কিছু না। তা উনি কি করেছে আপনার? অবৈধ কাজকর্ম করতে গিয়েছিলেন নাকি? সেজন্য পিছু পড়ে আছে নাকি? সাহায্য চাইতে এসেছেন সেজন্য? ”
শামসুল মির্জা অবাক না হয়ে পাড়ছে না। সে নাকি অবৈধ কাজ করছে বলে তার ছেলে নাকি তাকে ধরার জন্য পিছু পড়ে থাকবে!

“ আচ্ছা সমস্যা নেই। আমি ডাব্বাওয়ালা কে বলবো যেন আপনার পেছনে না পড়ে থাকে। খুব ছ্যাঁচড়া প্রকৃতির এই লোক। আমার বউয়ের পেছনও পড়ে থাকে। এতো মানা করি তাও শুনে না। মনে হয় গণ্ডারের চামড়া গায়ে। ”
বাশার সুলতান এজওয়ান কে ধমক দিয়ে বলল-
“ গাধার বাচ্চা সাফওয়ানের বাপ এটা। তার ছেলের নামে তার কাছেই বদনাম করছিস! ”
এজওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সরু চোখে। শামসুল মির্জা বাকহারা হয়ে আছেন। এসেছিল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে,অথচ হয়ে গেলো হতবিহ্বল!
এজওয়ান একটু মুখে চওড়া হাসি টেনে বলল-

“ ওহ্ মিস্টেক। ভুল জায়গায় সত্য কথা বলে ফেলছি। কিছু মনে করবেন না আঙ্কেল। ”
“ ছেলের প্রাণ বাঁচিয়েছো। সেজন্য তোমায় দেখতে আসা। কিন্তু তুমি যে আমার ছেলেকে এতো অপছন্দ করো তা ভাবতে পারি নি। এত অপছন্দ করো তারপরও কেনো বাঁচাতে গেলে? তুমি তো তার ভালোবাসার মানুষ টিকে কেঁড়ে নিছো। যদিও মাহি কে আমার পছন্দ না। তারপরও আমার ছেলে তো করতো পছন্দ। ”
“ কেনো বাঁচিয়েছি? উনার মতো সৎ লোকের বেঁচে থাকা উচিত,দেশের জন্য সমাজের জন্য। সেজন্য বাঁচিয়েছি। আর রইলো আপনার ছেলের ভালোবাসা কে কেঁড়ে নেওয়ার কথা? তাহলে বলবো যার জিনিস সে নিজ দায়িত্বে নিজের করে নিয়েছে। আপনার ছেলেকে মুভ অন করতে বলুন। ”

“ পারছে না তো। তোমরা সুখী অথচ আমার ছেলেটাকে অসুখী করে রাখছো। ”
এজওয়ানের ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠলো কিঞ্চিৎ। সুখী! এজওয়ান আর মাহি সুখী!
“ বিয়ে দিয়ে দিন ছেলের। বউ কাছে থাকলে সুখী হয়ে যাবে। ”
“ মেয়ে তো কম দেখাই নি। শুধু বলছে বিয়ে করবো না বিয়ে করবো না। ”
“ তাহলে আপনার ছেলের বিয়ের ঘটকালির দায়িত্ব টা আমায় দিয়ে দিন। আমি দেখছি মেয়ে। ”
“ তাহলে আসলেই উপকৃত হই। ”
“ ঠিক আছে। বাসায় গিয়ে এখন রিলাক্স থাকুন। কদিন পর ছেলের বিয়ে হবে তার প্রিপারেশন নিন। ”
“ দুশ্চিন্তা মুক্ত করলে বাবা। ”
“ আপনিও আমার দুশ্চিন্তা মুক্ত করলেন আঙ্কেল। আপনার ছেলের বিয়ে হয়ে গেলে আমিও বাঁচি। এখন আসি,কাজ আছে। ”
বাশার সুলতান সে কথা শুনে বলল-

“ এই অসুস্থ শরীর নিয়ে কোথায় যাবি? ”
এজওয়ান সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে যেতে বলল-
“ আরেহ্ রুমে যাচ্ছি। ”
বাশার সুলতান বিরবির করে বেয়াদব বলল। তারপর শামসুল মির্জার দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আসলেই খুব উপকৃত হই শামসুল তোমার ছেলের বিয়েটা হয়ে গেলে। মাহি কে তোমার মতো আমারও পছন্দ না। আমার ছেলেটাকে একটুও সম্মান করে না। সবসময় ঝগড়া অসম্মান করে। বাপ হয়ে এসব ভালো লাগে দেখতে? এখন বিয়েটা হয়ে গেলে যদি আমার ছেলেটা একটু শান্তি পায়। ”
“ হুমম। আমার ও পছন্দ না এই মেয়েকে। ওর চালচলন, কথাবার্তা, মাঝেমধ্যে হুট করে গায়েব হয়ে যাওয়া। ভালো মেয়ের কোনো লক্ষন নেই। এজওয়ান এতোদিন ধরে কিভাবে সংসার করছে বুঝে আসে না। ”
“ ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছে ছেলে টা। সেজন্য ওর নিজেরই গণ্ডারের চামড়া হয়ে গছে। তাই ছ্যাচড়ার মতো সংসার করছে। ”

“ ভালোবাসা জিনিস টাই এমন বাশার। যাই হোক আসি। এসো কখনও বাসায়। ”
“ বিয়ের দাওয়াত দিও। অবশ্যই যাব। ”
“ দোয়া করো বিয়ের জন্য যেন রাজি হয় ছেলেটা। ”
“ এজওয়ান যখন দায়িত্ব টা নিয়েছে। তখন হবে দেখে নিও। ”
এজওয়ান রুমে এসে দেখলো মাহি উঠে পড়েছে ঘুম থেকে। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে। এজওয়ান বিছানার ওপর পাশে গিয়ে বসতেই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। এজওয়ান নম্বর না দেখেই ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো –
“ যখন বন্ধুর বউ ছিলো না,
তখন ছিলাম আমি..
এখন বন্ধুর বউ হইয়াছে
পর হইয়াছি আমি..
ও বন্ধু বিয়া করিয়া
গেলি আমায় ভুলিয়া..
ঘরে কি তোর বউ তোরে গুতায়
বউ পাইয়া গেলি কোথায়…”
বাহাদুরের কাকের মতো গলায় এমন গান শুনে দাঁতে দাঁত চেপে এজওয়ান বলল-

“ মা*র*চ*দ এসে দেখে যা আমার বউ আমারে গুতায় নাকি ঠাপ খাওয়ায়। ”
” আরেহ চেতিস না। কেমন আছিস সেটা বল। ”
“ গুলি খাইয়া বেডে পইড়া ছিলাম তখন কোথায় বা’ল ফেলাইতে গেছিলি? আজ ফোন দিছিস কেমন আছি জিজ্ঞেস করতে। ”
বাহাদুর চমকালো এ কথা শুনে।
“ গুলি খাইছিস মানে! ”
“ পুরো বাংলাদেশ জানে। আর তুই জানস না বালের নাতি। ”
“ আমি তো বাংলাদেশে নাই। অস্ট্রেলিয়া আসছি।”
এজওয়ানের ভ্রু কুঁচকে আসলো।

“ বলিস নি তো আমাকে। গেলি কবে? ”
“ কিছু দিন আগে। ভার্সিটি থেকে ই-মেইল পাঠিয়েছিল। সেজন্য আসা। কিন্তু গুলি খেলি কি করে? কারা করলো? ”
“ জানি না। জানলে তো ওর বি*চি একদম গালিয়ে দিতাম। শুয়োরের বাচ্চার খোঁজ টা শুধু পাই। ”
“ অস্ট্রেলিয়া চলে আয়। ”
“ কেন? তোর সাথে সংসার করতে? ”
“ গে ভাবস আমারে? ”
“ গে ই তো তুই। নইলে ফোন দিয়াই ঐ গান গাইলি কেন? তর জ্বলে আমি বিবাহিত বলে? ”
“ প্রচুর জ্বলে। ”
“ বিয়া করে ফেল। তখন বুঝবি কোন জায়গা দিয়ে আসলে জ্বলে শালার ব্যাটা। ”
“ এনা আসছিলো। ”
এজওয়ানের কপালে দু ভাজ পড়লো এ কথা কানে আসার সাথে সাথে। রুম থেকে বের হয়ে বেলকনিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“ কি বললো? ”
“ সোলেমান ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলো। ও কি জানে না সোলেমান ভাই বিবাহিত? ”
“ জানলে এখনও ঠিক থাকে? জানলে তো দৌড়াইয়া বাংলাদেশে চলে আসতো আমার ভাইয়ের সংসার ভাঙতে। জানাইস না তুই। আমি অস্ট্রেলিয়া এসে হ্যান্ডেল করবো এই পাগল কে। ”
“ আচ্ছা তাড়াতাড়ি আয়। বেচারির জন্য খারাপ লাগে। ”
“ এত খারাপ লাগলে করে ফেল তুই বিয়েটা। তাইলে তো আমার ভাইডাও বাইচ্চা যায়। ”
“ পাত্তা দেয় না তো আমায়। ”
“ সো স্যাড তোর জন্য। ফোন রাখ এখন। আর ঐ পাগলের কানে যেন না যায় এটা। ”
“ আচ্ছা। ”
এজওয়ান কথা শেষ করে পেছন ফিরে দেখলো মাহি দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। এজওয়ান জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু বলবে? ”
মাহি চোখের ভাষায় জানালো সে কিছু বলতে চায়।

“ বলো। ”
মাহি এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল-
“ আমাদের একটা সমঝোতায় আসা উচিত। ”
“ যেমন? ”
“ আপনার পরিবারের পছন্দ না আমাকে। আর.. ”
“ তোমার পছন্দ না আমি তাই তো? ”
মাহি দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। এজওয়ান দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো।
“ ইউ নো হোয়াট তরিকুলের বেটি, কুত্তার পেটে কখনও ঘি হজম হয় না। ”
মাহি সাথে সাথে তাকালো এজওয়ানের দিকে। সেটা দেখে এজওয়ান বলল-
“ ডোন্ট ওয়ারি তোমাকে কুত্তা বলি নি। বাট আনফরচুনেটলি আমি সেই ঘি। যেটা আবার যার তার পেটে হজম হয় না। ”
মাহির মুখে স্পষ্ট দেখা গেলো অপমানিত হওয়ার ছাপ। বুঝতে বাকি নেই এজওয়ান আসলে কি মিন করেছে।
“ মুখটা এমন কালো হলো কেনো? তোমাকে তো কিছু বলি নি। নিজেকেই তো ঘি বললাম। ”
মাহির শরীর কাঁপতে লাগলো। গমগম গলায় বলল-

“ আপনার সাথে কোনো সুস্থ মেয়ের পক্ষে সংসার করা সম্ভব নয়। ”
“ বাট তুমি তো অসুস্থ। তোমাকে তো কেউ সুস্থ বলে না। বলে অসুস্থ মেয়ে। ”
“ ছেড়ে কেনো দিচ্ছেন না তাহলে? ”
“ অসুস্থ বলেই তো ছাড়ছি না। সুস্থ হলে তো কবেই ছেড়ে দিতাম। ”
“ ছেড়ে দিয়ে নিজেও সুস্থ থাকুন। আর আমাকেও সুস্থ থাকতে দিন। অসুস্থ সম্পর্কের মধ্যে থাকতে থাকতে আমরা দুজনই অসুস্থ হয়ে গেছি। ”
“ মুক্তি চাও? ”
মাহি মাথা নত করে বলল-
“ হু। ”
“ পাবে না তো। ”
“ এভাবেই চলবে তাহলে এই সম্পর্ক? আমি আপনাকে এতো দুঃখ দেই। এত অবজ্ঞা করি তারপরও কেনো আপনি আমার সাথে থাকতে চান? ”

“ কারন যা কিছু আমাকে দুঃখ দেয়। সেই সব কিছুর প্রতি আমার খুব দূর্বলতা। ”
“ আমি আপনার দূর্বলতা? ”
“ নিঃসন্দেহে। তোমায় দেখলেই আমি দূর্বল হয়ে যাই। ইউ নো হোয়াট আই মিননন? ”
শেষের কথাটা টেনে বললো এজওয়ান। কিছুর একটা ইঙ্গিত দিয়ে। মাহি বেশ বুঝলো। অসুস্থ অথচ ফাজলামো বাদ দিতে নারাজ।
“ আপনি ভীষণ অসভ্য একটা লোক। ”
“ তোমার বাপের চেয়ে তো ভালো। পরকীয়া তো আর করি না তোমাদের বাপ মেয়ের মতো। ”
“ আমি পরকীয়া করি?”
“ করো না বলছো? ”
“ কখন করলাম? ”
“ আমি দেখি নি ভেবেছো? দেখি নি কিভাবে তুমি সাফওয়ান কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলে? অপরাধী মনে হয় নি তখন? স্বামীর জন্য না কেঁদে এক্সের জন্য কাঁদছিলে। আমার দুঃখে তো তোমাকে কখনও কাঁদতে দেখা তো দূর সামান্য মন খারাপ অব্দি করতে দেখি নি। আমার দুঃখ কি তোমায় তাহলে ছুঁতে পারে না? ”
“ আপনার দুঃখ আছে? আমার দেখা তো সবচেয়ে সুখী মানুষ আপনি। কখনও তো কিছু হারান নি। সব পেয়েছেন,সব। ”

“ সব পেয়েছি! ওহ্ আচ্ছা। তুমি না বললে তো জানতেই পারতাম না। ভালোবাসার যতনা কাকে বলে জানো? ”
“ আমার থেকে বেশি জানেন আপনি? মনে করিয়ে দিব? আপনি এজওয়ান সুলতান আমার জীবনে না আসলে আমার জীবন টা সুন্দর হতো। সাফওয়ানের সাথে আমার চমৎকার একটা সুস্থ সংসার হতো। কিন্তু আপনি তা হতে দিলেন না। জোর করে নিজের ভাগ্যের সাথে জড়িয়ে নিলেন আমায়। এটা কি কম অপরাধ ছিলো আপনার?”
“ তোমার কষ্ট হচ্ছে সে জন্য তরিকুলের বেটি? আমি কি একটুও সুখ দিতে পারি নি তোমাকে? অবশ্য আমার দেওয়া সুখ তো তোমার কাছে অসুখের মতো। আমি তোমার জীবনের সুখ নামের অসুখ। জীবন অসুখ ছাড়া চলে না তরিকুলের বেটি। মেনে নাও অসুখ কে।

“ অসুখ হলে তার জন্য ঔষধ সেবন করা প্রয়োজন। সারা জীবন অসুখ নিয়ে বাঁচা যায় না।”
“ সেই ঔষধ তো তাহলে আমার মৃত্যু।”
“ ডিভোর্স ও তো হতে পারে।”
“ সেটা তো আমি বেঁচে থাকতে পাবে না তরিকুলের বেটি। উমমম মরে গেলে হয়তো মুক্তি পেতে পারো। তখন গিয়ে না হয় সাফওয়ান সাহেবের সাথে সুন্দর সংসারটা করে নিও। ”
“ বুড়ো বয়সে সাফওয়ান আমাকে মেনে নিবে?”
এজওয়ান গা দুলিয়ে হাসলো এ কথা শুনে।
“ তারমানে বুড়ো বয়স অব্দি আমার সাথে থাকতে চাইছো! শুনে এজওয়ানের জীবন খানা যে ধন্য হয়ে গেল তরিকুলের বেটি ।”

“ দম বন্ধ করে থাকতে হবে আপনার সাথে। খুশি মনে না। ”
“ কেনো খুশি মনে থাকতে পারবে না? ”
“ পছন্দ না আপনাকে আমার। উশৃংখল বখাটে আপনি। কোনো শালীনতা নেই আপনার মাঝে। ”
এজওয়ান তাচ্ছিল্যের হাসি আনলো মুখে। তারমধ্যে নাকি শালীনতা নেই! অথচ বিয়ের পর কতো চেঞ্জ হয়ে গেছে এজওয়ান। মাহি কি লক্ষ্য করে নি তা? মাহির ভেতর বুঝি খুন শালীনতা আছে? এজওয়ান রুম ছেড়ে চলে যেতে যেতে বলল-

“আমি এজওয়ান সুলতান যেমনই হই, আমি মানে আমিই। আমার মতো কেনো আমার ছায়ার মতোও কাউকে তুমি তরিকুলের বেটি একশো বার জন্ম নিলেও পাবা না। এজওয়ান সুলতান এই পৃথিবীতে এক পিসই। এজওয়ান সুলতানের বিকল্প হিসেবে কেউ নেই। ইন ফিউচারেও কেউ তার বিকল্প হিসেবে আসতে পারবে না । কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তুমি আমাকে দেখো নি। দেখেছো আমার আবরণ টা কে। যদি হৃদয় টা দেখতে পেতে তাহলে ১ বিলিয়ন পার্সেন্ট শিওর আমি। তুমি তরিকুলের বেটি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী মনে করতে। আর তাছাড়া আমি তোমাকে আগেও বলেছি তোমার যা মনে চায় তুমি তাই করো। বাঁধা দিব না। বাট আমার তরফ থেকে ডিভোর্স পাবে না। সেপারেশনে থাকতে চাইলে থাকতে পারো। কোনো জোর জবরদস্তি নেই। তবে নিবাস ছেড়ে চলে গেলে আমাকে চলে যেতে হবে। আর আমি চলে গেলে আমার বাপ কিন্তু হিংস্র হয়ে উঠবে। তোমাকে মে’রে ফেলতেও দুবার ভাববে না। তার ছেলেকে তুমি কষ্ট দিবা,ঘর ছাড়া করবা আর সে তো বসে থাকবে না। ”

বেলকনিতে বসে আছে মেহরিন আর সোলেমান। হাতের ক্ষত টা এখনও সারে নি। মেহরিন বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সেদিন কার ঘটনা টা মনে পড়লেই এখনও বুক কাঁপে।
সোলেমান পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে মেসেজ দিয়ে বলল-
“ এনেছিস ঐ সাংবাদিক কে? ”
ওপাশ থেকে মেসেজের উত্তর আসলো-
“ হু। বেঁধে রেখেছি। ”
“ গুড। ১ টার পর আসছি আমি। ”
তারপর ফোনটা পকেটে ভরে রাখলো। সোলেমান মেহরিন মাথায় চুমু খেয়ে ধীর গলায় ডাকলো-
“ মেহরিন। ”
মেহরিন ছোট্ট করে উত্তর দিলো-
“ হু। ”
“ তুমি বোরকা ছাড়া নিকাব ছাড়া বের হবে না বাসা থেকে। পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেনো আমার। তুমি আসবে না সেখানে। মনে থাকবে? ”
মেহরিন মাথা তুলে তাকালো।

“ সেদিনকার কথা বলছেন? ”
“ হুমম। তোমার ছবি নিউজ চ্যানেলে, খবরের কাগজে চলে গেছে। ফেস ওড়না দিয়ে ঢাকা ছিলো বলে পরিষ্কার ভাবে দেখা যায় নি সেভাবে। আমি চাই না তুমি দুনিয়ার নজরে আসো এভাবে। এই দুনিয়া ভালো না। একবার নজর লেগে গেলে পিছু ছাড়ে না। শেষ করে তবেই খ্যান্ত হয়। আর তুমি খুব মূল্যবান আমার কাছে। আমার নিজের চাইতেও। আমার ফ্যামিলি আমার পৃথিবী হলে তুমি হচ্ছো আমার অক্সিজেন। অক্সিজেন আর পৃথিবী ছাড়া তো বাঁচা সম্ভব না আমার। ”
“ আপনাকে ছাড়া বুঝি আমার পক্ষে বাঁচা সম্ভব খুব? ”
সোলেমান মেহরিনের গালে হাত রেখে বলল-

“ এই মেয়ে শোনো আমাকে কখনোই তোমার নিজের থেকে বেশি ভালোবেসো না। যখন আমি থাকবো না তখন কি করে সামলাবে নিজেকে? ভালোবাসা তখনই সুন্দর, যখন সেটা আত্মনাশে নিয়ে না যায়। আমি আছি বলেই তুমি আছো এই ভাবনাটা কখনোই পুষে রাখবে না মনে। আমার জীবন অনিশ্চিত মেহরিন। আমি আদৌ বৃদ্ধ অবধি তোমার সাথে বেঁচে থাকবো কিনা, সেটার নিশ্চয়তা নেই। এখন তুমি যদি আমাকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুপস্থিতিতে তুমি ভেঙে পড়বে, হারিয়ে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে। তোমার ভালোবাসার জায়গায় আগে থাকবে আগে তুমি নিজে। তারপর অন্য কেউ। নিজেকে আগে ভালোবাসতে শিখো, শক্ত থাকতে শিখো, তাহলে আমিও নিশ্চিন্ত থাকতে পারবো এই ভেবে যে, যদি আমি তোমার সাথে না-ও থাকি, তাহলে তুমি ঠিক সামলে নিতে পারবে নিজেকে। আমায় ভালোবাসো, গভীরভাবে ভালোবাসো, কিন্তু সেই ভালোবাসায় নিজেকে হারিয়ে ফেলো না মেহরিন। তবে এই টুকু বিশ্বাস রাখতে পারো আমি মারা যাওয়ার পর এই পৃথিবীতে, এক আমার ভালোবাসার অভাব ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো অভাবই তোমাকে ছুঁতে পারবে না মেহরিন। ”

“ অথচ পৃথিবীতে সব কিছুর অভাব সহ্য করার ক্ষমতা আমার থাকলেও আপনার এই ভালোবাসার অভাব টাই সহ্য করার ক্ষমতা যে আমার নেই সুলতান সাহেব। আমার মৃত্যু টা যেন আপনার মৃত্যুর আগেই হয় । ”
“ তাহলে আমার কি হবে? আমি বাঁচবো কি নিয়ে? তোমার খাটিয়ার ভার বহন করার শক্তি যে তোমার স্বামীর নেই। ”
“ আর আপনার মৃত্যু দেখার সাহস যে আপনার বিবিজানের নেই। আমাদের মৃত্যু টা যেন এক সাথেই হয়। তাহলে আপনাকেও আমার খাটিয়ার ভার বহন করতে হবে না। আর আমাকেও আপনার মৃত্যু দেখতে হবে না…. ”

গুলশানের এক নাইট ক্লাবের বারে বসে আছে এজওয়ান এক বোতল ওয়াইন খেয়ে আরেক বোতল হাতে। শরীর অসুস্থ অথচ সেদিকে খেয়াল নেই। বাহাদুর টা দেশে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু নেই শালার ব্যাটা। সেজন্য ইয়াসিন কে ফোন করে ডাকলো। ইয়াসিন আবার এসব ক্লাব টাব পছন্দ করে না। তারপরও আসলো। এসে এজওয়ান কে খুঁজে এসে দাঁড়ালো তার পাশে। এজওয়ান একবার ইয়াসিন কে দেখে বলল-
“ তোরা এতো সুইট কেনো রে ইয়াসিন? তোদের ডাকার সাথে সাথে তোরা এসে হাজির হোস। ”
ইয়াসিন আশেপাশে তাকালো। মেয়েরা ছোট ছোট পোশাক পড়ে আছে। কি অবস্থা। এজওয়ান কে তাড়া দিয়ে বলল-
“ এই সব জায়গায় আসেন কেন ভাই। আশেপাশে কিসব আস্তাগফিরুল্লাহ নাউজুবিল্লাহ মার্কা ন’টিরা ঘুরঘুর করতেছে। চলেন তো। ”
এজওয়ান বোতল টা নিয়ে টুল থেকে উঠে বলল-

“ ন’টি রা ন’টি গিরি করতে আসছে। আমার কি? ওদের জন্য কি আমার আসা বন্ধ হবে নাকি? আর তুই দেখিস কেনো নাউজুবিল্লাহ মার্কা ন’টি দের? চোখের হেফাজত কই তোর? ”
“ আপনারে খুঁজতে গিয়েই তো চোখ গেছে। এইখানে আসছেন ক্যান? ”
“ মুড অফ রে। ”
“ আপনাদের আবার মুড অফ হয় নাকি? ”
“ ক্যান রে শালার ব্যাটা আমরা কি মানুষ না? নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী যে মুড অফ হতে পারবে না। দুঃখ হতে পারবে না। ”
“ বাসায় যান। আপনার বউ অপেক্ষায় আছে হয়তো। ”
“ এসব কথা বলে আমায় হাসাস না তো ইয়াসিন। হাসি পায় শুনলে। ”
“ হাসি পাবে কেন? ”
“ তুই ব্যাটা সৌভাগ্যবান ভাব নিজেরে। যে বাতাসি তোরে ভালোবাসে। তোর জন্য অপেক্ষা করে। এক তরফা ভালোবাসার যে কি কষ্ট তুই তো জানিস না। বাতাসি কে জিজ্ঞেস করিস একদিন। ”
“ আপনাকেও ভালোবাসবে আপনার বউ একদিন দেইখেন। ”
“ ভালোবাসা! এই গোলামের পুত ভালোবাসা কোনোদিনও আমাকে ভালোই বাসে নি। তুই তো বাসিস না ভালো তোর বউকে। আবার আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস। যা বাসায় যা। আমিও যাই। ”

“ একা যাইতে পারবেন? ”
“ হু পারবো। ”
ইয়াসিন হাঁটা ধরলো। এজওয়ান ফের ডেকে উঠলো –
“ ইয়াসিন শোন। ”
ইয়াসিন পেছন ফিরে বলল-
“ হু বলেন। ”
“ দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্য বুঝিস। বাতাসি ছাড়া তোর কেউ নাই রে। মা নাই বাপ নাই। যে আছে তাকে অবহেলা করে হারাইস না। সবাই এজওয়ান না যে শুধু সয়ে যাবে অবহেলা। ”
এজওয়ান উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটা ধরলো। হাতে থাকা ওয়াইনের বোতলে চুমুক দিচ্ছে আর এলোমেলো পায়ে হাঁটছে। রাস্তায় গাড়িটাড়ি কিছু নেই। পুরো ফাঁকা রাস্তা। কুয়াশা আর ল্যাম্পপোস্টের আলো। এজওয়ান এই জনশূন্য রাস্তার ধার ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো –

দাহশয্যা পর্ব ৮৩ (২)

~ মরছি মরছি আমি মরছি
তোমরা কেউ আর মইরো না
যে জন মন বোঝে না তারে মন দিও না।
যে জন প্রেম বোঝে না তারে প্রেম দিও না।
আশি তোলায় সের হইলে চল্লিশ সেরে হয় রে মণ
মনে-মনে এক মন না হইলে মিলবে না ওজন…
পাগল মন রে,মন কেন এতো কথা বলে…

দাহশয্যা পর্ব ৮৪ (২)