দাহশয্যা পর্ব ৯২
Raiha Zubair Ripti
নিকষ কালো আঁধার। রাত দেড়টা বাজে এখন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখতেই মাহি এক চিলতে শান্তি অনুভব করলো। পরনে থাকা আকাশী আর সাদা রঙের চেকচেক ঢোলা হাফ হাতার শার্টটা সামনের দিকে চেপে ধরে সামনের পানে তাকালো। এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা কিছুটা কম দিনের চেয়ে। শান্ত শিষ্ট নীরব পরিবেশ মাহির ভীষণ পছন্দ। প্যান্টের সামনের পকেটে মাহি হাত রাখলো। পকেটে রাখা আছে এজওয়ানের মায়ের ছবিটা। বের করলো না ২য় বার। ল্যাগেজ টা হাতে নিয়ে মাহি বাহিরে আসলো। কই এজওয়ান তো আসে নি এখনও। আসবে না? মাহি ফোনটা বের করে এজওয়ান কে কল লাগালো।
এজওয়ান ল্যাবে বসে কাজ করছিলো। মাহির ফোন আসার সাথে সাথে তার মনে পরলো মাহি আজ অস্ট্রেলিয়া আসবে। কিন্তু তার ফ্লাইট কয়টায় ল্যান্ড করবে সেসব কিছু বলে নি। তাই এজওয়ানের যাওয়া হয় নি। ল্যাপটপে চলতে থাকা হাতটা থামিয়ে দিয়ে ল্যাপটপ টা বন্ধ করে এজওয়ান ফোনটা রিসিভ করে কানে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-
“ এসে পড়েছো তুমি? আমি এক্ষুনি আসছি। তুমি একটু অপেক্ষা করো। ”
মাহি জবাবে বলল-
“ কোথায় আপনি?”
“ ল্যাবে ছিলাম। এখন গাড়িতে। জাস্ট গিভ মি ফাইভ মিনিটস। আমি পৌঁছে যাব তোমার কাছে। ”
“ ঠিক আছে আসুন। ”
এজওয়ান ফোন কেটে দিয়ে গাড়ি চালানো তে মনোযোগ দিলো। এয়ারপোর্টের কিছুটা কাছে আসতেই এজওয়ান দেখলো রাস্তার মাঝখানে একটা বড়সড় গাছ ভেঙে পড়ে আছে। কি আশ্চর্য এই রাস্তা ব্লক তাহলে আগে থেকেই জানানো হলো না কেনো? এজওয়ান তো এমন নিউজ পায় নি। আর তাছাড়া আজ তো ঝড়ও হয় নি যে গাছ এভাবে ভেঙে পড়বে রাস্তায়। তাহলে এই গাছ ভাঙলো কি করে? এয়ারপোর্টে যাওয়ার রাস্তা তো এই একটাই। এজওয়ান আর কিছু ভাবলো না। তার মাথায় চিন্তা একটাই তাকে এয়ারপোর্টে যেতে হবে। সেজন্য এজওয়ান গাড়ি থেকে নেমে দৌড় শুরু করলো।
মাহি ওয়াকিং এরিয়ায় ল্যাগেজ হাতে করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে এজওয়ানের। আর বারবার ফোনে সময় দেখছে। এতক্ষণে তো এসে যাওয়ার কথা। আসছে না কেনো? মাহি ফোন করলো। ফোন বাজছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। মাহি আবার দিলো। ফলাফল বারবার সেম হচ্ছে। কি আশ্চর্য এই লোক ফোন কেনো তুলছে না? সমস্যা কি?
মাহি ওয়াকিং এরিয়া থেকে বের হয়ে একেবারে বাহিরে আসলো। সবাই যার যার নিজ বাড়ি ফিরে যাচ্ছে আপনজনের সাথে। মাহি ছিমছাম জনশূন্য জায়গার দিকে যেতে লাগলো। আকস্মিক হাঁটার সময় বেখেয়ালি তে কারো সাথে ধাক্কা খায়। হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায় নিচে ফোনটা। কেউ একজন মাহির ফোনটা তুলে দিয়ে বলল-
“ দুঃখিত ম্যাম খেয়াল করি নি। ”
মাহি তাকিয়ে দেখলো, একজন চিকনচাকন লম্বা পুরুষ। লোকটার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বলল-
“ সাবধানে চলাফেরা করুন। ”
লোকটা মাথা নত করে বলল-
“ জ্বি ম্যাম। ”
মাহি ফোনের অন বাটনে ক্লিক করে সময় দেখে নিলো। লোকটা এখনও সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখে মাহির ভ্রু কুঁচকে আসলো।
“ আপনি এখনও দাঁড়িয়ে আছেন যে? কোনো সমস্যা? ”
“ নো ম্যাম। ”
“ তাহলে সামনে থেকে সরুন। ”
লোকটা সরলো না। মাহির মেজাজ চড়াও হলো।
“ আরে ভাই কি সমস্যা? সরুন সামনে থেকে। যেতে দিন আমায়। ”
লোকটা কোনো কথা বললো না। ইশারায় পেছনে কি যেন দেখালো। মাহি সেই ইশারা ফলো করে যেই না পেছনে তাকাবে ওমনি নজর ঘুরাতে গিয়ে দেখলো এজওয়ান দৌড়ে এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকছে। মাহি এজওয়ান কে ডাকার জন্য উদ্যত হতেই পেছন থেকে এক লোক সাদা রুমাল দিয়ে চেপে ধরলো তার মুখটা। ঘটনাটা এত তাড়াতাড়ি হলো যে মাহি কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগলো। লোকটা তার শক্তিশালী দেহ নিয়ে মাহিকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। আশেপাশে কেউ নেই। সবাই সামনের দিকে। মাহি জোরে শব্দ করে উমমম উমম করতে লাগলো। কিন্তু সেই শব্দ অতদূরে এজওয়ানের কাছে গেলো না। মাহিকে কিছুদূর টেনে আনতেই আরো কজন লোক আসলো পেছন থেকে মাহি কে ধরে জোরজবরদস্তি করে গাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো।
এজওয়ান এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকে পুরোটা তন্নতন্ন করে খুঁজে। আশ্চর্য মাহি তো নেই। ফোন করার জন্য পকেটে হাত দিতে গিয়ে বুঝলো ফোন তো নেই। সেটাতো গাড়িতেই রেখে এসেছে এজওয়ান বিরক্তির সাথে উচ্চারণ করলো- ড্যাম ইট!
এজওয়ান এয়ারপোর্টের ওয়াকিং এরিয়ায় লাস্ট দিকে আসলো। মাহির তো ছিমছাম পছন্দ। সেটা ভেবেই এদিক পানে আসতেই দেখলো জায়গাটা পুরোপুরি খালি। কেউ নেই। এজওয়ান উল্টোঘুরে বেরিয়ে আসলো। এদিক ওদিক তাকালো। সেই চিরচেনা মুখটা তো নেই এত মুখের ভীড়ে। এজওয়ান ডান সাইডের দিকে হেঁটে যেতে লাগলো হন্তদন্ত হয়ে। আহা মেয়েটা তো এদিকেও নেই। বেয়াদব মেয়েটা কোন চিপায় গিয়ে বসে আছে? পেলে থাবা মেরে দিবে কানপট্টি গরম করে। দূরে একটা গাড়ির সামনে কয়েকজন লোক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এজওয়ান একবার তাকিয়ে সামনে ঘুরে চলে যেতে নিবে এমন সময় আকস্মিক মাহির গলার স্বর ভেসে আসে।
“ এজওয়ান…!! ”
এজওয়ান সাথে সাথে পেছন ঘুরে। দেখে কয়েকজন লোক মাহিকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলছে। এজওয়ানের মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেলো। দৌড়ে ছুটে আসতে আসতে বলল-
“ এই মাদা**দরা কু’ত্তার বাচ্চারা, শু*রের বাচ্চা রা মাহি কে ছেড়ে দে…”
এজওয়ান আসতে আসতে গাড়িটা ততক্ষণে মাহি কে নিয়ে চলে যায়। এজওয়ান উল্টো ঘুরে দৌড়ে পার্কিং এরিয়ায় ঢুকে। এদিক ওদিক তাকাতেই তার দৃষ্টি পড়ে এক গাড়ির উপর। গাড়ির ভেতরে বসে একজন লোক ফোনে ব্যস্তভাবে কথা বলছে, এজওয়ানের চোখে তখন রক্ত নেমে এসেছে। সময় নষ্ট করার মতো অবস্থায় সে নেই। সে দৌড়ে গিয়ে হঠাৎ করেই গাড়ির দরজা খুলে ফেলল।
লোকটা চমকে উঠে বলল-
“এই! আপনি কে? কি করছেন…”
কথা শেষ করার আগেই এজওয়ান তার কলার চেপে ধরে টেনে বাইরে ছুড়ে ফেলল। লোকটা হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। ফোনটা ছিটকে গিয়ে দূরে পড়ল।
এজওয়ান কোনো দিকে না তাকিয়ে, এক মুহূর্তও দেরি না করে লোকটার হাত থেকে গাড়ির চাবিটা কেড়ে নিল। চোখেমুখে তখন একরাশ ভয়ংকর দৃঢ়তা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
“গাড়িটা লাগবে আমার। ”
তারপর ঝট করে গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। পরের মুহূর্তেই চাকা ঘুরে উঠল তীব্র শব্দে। গাড়ি ছুটে চলল অন্ধকার রাস্তা চিরে। খুব স্পিডে গাড়িটা চালাচ্ছে এজওয়ান। সামনের দিকে ঘরতেই দূরে দেখা যাচ্ছে সেই গাড়িটা। যেটায় মাহিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এজওয়ান পাগলের মতো স্পিড বাড়িয়ে ধাওয়া করতে লাগল। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রেখেছে, চোখ একদম সামনে স্থির। চারপাশের সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গেছে। তার মাথায় একটাই নাম ঘুরছে। মাহি… মাহি…তার তরিকুলের বেটি..
গাড়ির ভেতরে সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে মাহি। গাড়িতে থাকা বাকি লোক গুলো পেছনে এজওয়ান কে ধাওয়া করতে দেখে একজন তাদের বস কে ফোন করলো। ফোনটা রিসিভ হতেই বলল-
“ স্যার এজওয়ান নামের লোকটা তো আমাদের ফলো করছে। কি করবো আমরা? মে’রে ফেলবো?”
“ এই না, খবরদার না। মেয়েটাকে মে’রে ফেলো জাস্ট। ঐ ছেলেকে জাস্ট পথভ্রষ্ট করে দাও। ওর কিছু হলে তোমাদের আমি ছাড়বো না। একটা আঘাত ও যেন ওর শরীরে না আসে। ওর বেঁচে থাকাটা জরুরি। ”
“ কিন্তু স্যার আঘাত না করে কিভাবে কি করবো?”
“ অত কিছু জানি না। শুধু জানি ওর কিছু হওয়া যাবে না। কিভাবে কি করবে তা তোমরা বোঝো। টাকা দেওয়া হচ্ছে কি তোমাদের এমনি এমনি?”
কেটে গেলো ফোনটা। লোকগুলো কি করবে এখন বুঝতে পারছে না। পেছন থেকে পিস্তল নিয়ে এজওয়ানের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে লাগলো।
আকস্মিক গুলি ছোঁড়ার কারনে হকচকিয়ে যায় এজওয়ান। তার গান তো তার কাছে নেই। ওহ্ শ্যিট! এজওয়ান গাড়িটা এদিক ওদিক করে ডানে বামে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো যাতে গুলি গুলো তার গাড়িতে এসে না লাগে।
লোক গুলো বার বার ফেইল হচ্ছে। রাগও উঠে যাচ্ছে। ফোনে বলা লোকটার হুকুম কে পাত্তা না দিয়ে গাড়ি থেকে ইমপ্যাক্ট টাইপ এক্সপ্লোসিভ টা ছুঁড়ে এজওয়ানের গাড়ির সামনে ফেললো। মুহূর্তের মধ্যে ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটলো রাস্তায়।
বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। এজওয়ানের গাড়ির ঠিক সামনেই বিস্ফোরণটা হলো। আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল রাস্তাজুড়ে।
এজওয়ানের গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্লাইড করল। এজওয়ান স্টিয়ারিং সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষণে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ব্রিজের সাথে গাড়ির সজোরে ধাক্কা লাগায় সামনের কাঁচ গুলো ভেঙে বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। এজওয়ানের মাথা গিয়ে জোরে আঘাত করল স্টিয়ারিংয়ে। ফেটে গেল কপাল। গরম রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো চোখের পাশ দিয়ে। চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে… চারপাশের আগুন, ধোঁয়া সবকিছু যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটা আর দেখা যাচ্ছে না। অচেতন হওয়ার আগের শেষ মুহূর্তে এজওয়ানের ঠোঁট কাঁপল- “মা…হি…”
নামটা যেন বুকের ভেতর থেকে ছিঁড়ে বের হয়ে আসলো। অচেতন হয়ে পড়ে রইলো বিধ্বস্ত গাড়ির ভেতর এজওয়ান। সামনে থেকে আগুনের লেলিহান ধেয়ে আসতে লাগলো এজওয়ানের গাড়ির দিকে।
ডেনমার্কে নামার পর সোলেমান সরাসরি রাজধানী কোপেনহেগেনে যায়। ঠান্ডা, হিসেবি চোখে শহরটা দেখে। এই শহরের আলো ঝলমলে অংশের নিচেই লুকিয়ে থাকে ইউরোপের সবচেয়ে নোংরা অর্থের স্রোত, সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।
সে কোনো তাড়াহুড়া করে না। প্রথম কাজ হিসেবে নিজের পুরোনো ফিনান্সিয়াল রুটগুলো আবার চালু করে। বহু বছর আগের সেই নেটওয়ার্ক।যেখানে টাকা এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়, পরিচয় বদলায়, মালিক বদলায়, কিন্তু আসল মালিক কখনো সামনে আসে না। সেই জালটাকে সে আবার সচল করে তোলে।
তারপর শুরু হয় খোঁজ। সে টাকা ট্র্যাক করে, কিন্তু সোজা পথে না। যেখানে টাকা গিয়ে শেষ হয়, সেখান থেকে নয়। যেখান থেকে শুরু হয়, সেখান থেকে। কারণ শেষ গন্তব্য সবসময় সাজানো থাকে, কিন্তু শুরুতে ভুল হয়। আর সেই ভুলই সত্যের দরজা খুলে দেয়।
টানা তিনদিনের ফাইল ঘেঁটে, রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে, সে একটা অস্বাভাবিক বিষয় ধরে ফেলে।
ডেনমার্কে একটা ছোট শিপিং কোম্পানি। কাগজে-কলমে প্রায় ধ্বংস বছরের পর বছর লস। কিন্তু তবুও কোম্পানিটা বন্ধ হচ্ছে না।
সোলেমান জিজ্ঞেস করলো-
“এই কোম্পানির মালিক কে?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসে-
“ডেনিম লুই।”
“বিস্তারিত।”
“ফ্রান্সের নাগরিক। প্রায় দশ বছর আগে ডেনমার্কে এসে ব্যবসা শুরু করে। শুরুতে ছোট ছিল, পরে হঠাৎ করে টাকার ফ্লো বাড়ে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে লস দেখাচ্ছে।”
সোলেমান কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর ফের জিজ্ঞেস করে-
“লস খেয়ে টিকে থাকে কিভাবে?”
“তার ব্যক্তিগত সম্পদের অভাব নেই। বাইরে থেকে লস, ভেতরে অন্য কিছু থাকতে পারে।”
সোলেমানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে-
“লস দেখানো মানে লাভ লুকানো।”
সোলেমান তার পুরোনো এক কন্টাক্টের কাছে যায় এবার। তিনি একজন ডাটা ব্রোকার, যে ইউরোপের ডার্ক নেটওয়ার্কে পরিচিত ঘোস্ট আর্কাইভিস্ট নামে। শহরের বাইরে পরিত্যক্ত এক শিল্প এলাকায় তার আস্তানা। বাইরে ভাঙা দেয়াল, মরচে ধরা গেট। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটা তথ্যের গুদাম। সারি সারি সার্ভার, অন্ধকার ঘর, স্ক্রিনে ভেসে ওঠা হাজারো ডাটা।
সোলেমান ঢুকতেই লোকটা তাকে দেখে বলে ওঠে-
“তুমি আবার ফিরেছো… মানে কেউ খুব খারাপ ভাবে মরতে যাচ্ছে।”
সোলেমান কোনো কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বলে-
“৫৭ বছর বয়স। পায়ে ওরোবোরোস ট্যাটু। মুখের হদিস নেই, নাম নেই। নতুন এসেছে এই দুনিয়ায়। তার সম্পর্কে আমি সব জানতে চাই।”
“ তোমার জন্য আমার জানটাও হাজির। এ তো এক লোকের কেবল পরিচয় খোঁজা মাত্র। ২৪ ঘন্টার মধ্যে পেয়ে যাবে। ”
সোলেমান নিজের বাড়িতে ফিরে। রাত হওয়ায় মেহরিন কে ফোন করে। সোলেমান হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ফোন করেছে। যেহেতু সে ডেনমার্কে বাংলাদেশের সিম চলবে না। মেহরিন তখন বসে বসে আফিয়া সুলতানের মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছিলো। হোয়াটসঅ্যাপে সোলেমানের ফোন আসা দেখে রিসিভ করে কানে নিলো। সালাম দিতেই ওপাশ থেকে সালামের জবাবের সাথে ভেসে আসলো-
“ কি করছো?”
“ বসে আছি। আম্মার মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছি। আপনি?”
“ আমি ডেনমার্কে এসেছি। ”
মেহরিন চমকালো।
“ কখন?”
“ গত পরশু। তোমাকে জানানো হয় নি আসার আগে। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। ফিরবেন কবে?”
“ এ সপ্তাহের ভেতরই ফিরবো। ফিরে তোমার সাথে মহাদেবপুর গিয়ে থাকবো কটা দিন। তোমাকে ছাড়া থাকাটা ভীষণ কষ্টের। ”
“ আমার জন্য বুঝি খুব সহজ?”
“ কঠিন ভীষণ কঠিন। ”
“ ফিরে আসুন তাড়াতাড়ি। বাবু তার বাবা কে মিস করে খুউব। ”
“ তার বাবাও তাকে আর তার মাকে ভীষণ মিস করে। ঔষধ ঠিক মতো খাচ্ছ?”
“ হুমম। ”
“ আচ্ছা সাবধানে থেকো। রাখছি?”
“ হুমম। রাখুন। আর আপনিও সাবধানে সুস্থ মতো আমাদের কাছে ফিরুন। আমরা আপনার অপেক্ষায়। ”
মেহরিন কেটে দিলো ফোন। বাতাসি চায়ের কাপ টি-টেবিলে রেখে রান্না ঘরে আসলো বিস্কুট নিতে। এমন সময় তার ফোনে কল আসলো। তাকিয়ে দেখলো তার বান্ধবী মিথির একটা ছবি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বাতাসির ম্যাডাম এক হাত ইয়াসিনের কাঁধে আর আরেক হাতে ইয়াসিনের শার্ট খাঁমচে ধরো রেখেছে। মুচকি হাসি ম্যাডামের মুখে। ইয়াসিনের মুখের একপাশ দেখা যাচ্ছে। তার এক হাত ম্যাডামের হাতের উপর। যেটা শার্ট ধরে রেখেছে। তারপর আরো তিনটে ছবি। একটা ম্যাডাম জড়িয়ে ধরেছে ইয়াসিন কে। আরেকটা মুখ গুঁজে রেখেছে বুকে। আর শেষের টা দেখে তো ঘৃণা লাগলো। ইয়াসিন চুমু খাচ্ছে বাতাসির ম্যামের কপালে। ছিঃ! নিচে মিথি কিছু টাইপ করছে।
“ আজ দেখলাম তোর স্বামী আর ম্যাডাম কে রাস্তায় এভাবে। তুই আমার কথা তো বিশ্বাস করলি না। সাবধান করতেছি তোকে বাতাসি। এই লোক তোকে ঠকাচ্ছে। স্ট্যান্ড নে নিজের জন্য। ”
বাতাসির দু চোখ জলে ভরে উঠলো। ডিভোর্স অব্দি কি অপেক্ষা করা যেত না? রাস্তাতেই এসব শুরু করে দিছে! শরীর ঘৃণায় কেঁপে উঠলো। ফোনটা সুইচ অফ করে রাখলো।
ইয়াসিনের মেজাজ ভীষণ চোটে আছে বাতাসির ম্যামের উপর। কি বেহায়া নির্লজ্জ মহিলা এটা! লজ্জার নাড়ি ছোঁয়ায় নি নাকি জন্মের পর! অটিস্টিক ঠিক মতো হাঁটতে পারে না। প্রথমে ডাক দিলো। তারপর ঢং ম্রে দৌড়ে আসতে গিয়ে পড়ে যেতে লাগলো। পড়লো তো পড়লো একেবারে ইয়াসিনের গায়ের উপর। সেই অব্দি না হয় মানা যেতো কিন্তু এই মহিলার কপাল এসেছে ঠেকেছিল ইয়াসিনের ঠোঁটে! রাগে তার শরীর কাঁপছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ছবি গুলে ক্লাসে বসে জানালা দিয়ে তোলে মিথি। ক্লাসে স্যার চলে আসায় পরবর্তীতে কি হয়েছ তা তার অজানা।
ইয়াসিন বাতাসির ম্যাম কে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার মতো করে রাস্তায় ফেলে দেয়। ম্যামটা পড়ে যায়। ইয়াসিন পকেট থেকে ট্যিসু দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে বলে-
“ এই বেডি চোখ থাকে কই তোর? আমার ঠোঁট টারে নাপাক বানায় দিছস। জমজমের পানি পাবো কই এখন আমি? এনে দিবি তুই? খাটাশ মহিলা। দেখলেই হলো জোকের মতো পেছন পেছন আসে। পাখি হেগে দিতে পারে না তোর গায়ে? অসভ্য নারী কোথাকার। ঠাটায়া চড় লাগাবো আর কোনোদিন আমারে ডাকলে,খবিশ। ”
ইয়াসিন চলে যায় ক্লাবে। ক্লাবে এসে সাবান দিয়ে বেসিনের সামনে ডলে ডলে ঠোঁট টা ধুতে নেয়। এমন সময় ইব্রাহিম এসে বলল-
“ মুখ না ধুয়ে ঠোঁটের সাথে ওমন যুদ্ধ করছিস কেনো?”
“ গুয়ের ড্রেনের সাথে লেগে গিয়েছিল ভাই, সেজন্য। ”
“ মানে?”
“ মানে টানে কিছু না। সোলেমান ভাই আইবো কবে?”
“ এ সপ্তাহেই। ”
“ উনার সাথে আমার একটা কথা আছে। ”
“ কি কথা?”
“ বাতাসির ভাইকে নিয়ে। ভাইজানের কি হাত আছে ফাহাদের খুনের পেছনে? ”
ইব্রাহিম অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। সোলেমানের হাত না থাকলেও বাশার সুলতানের উপর আদেশ দেওয়া হয়েছিল ফাহাদের মুখ থেকে কথা বের করার জন্য। তবে এটা ইয়াসিন কে জানানো হয় নি।
“ সোলেমানের হাত থাকবে কেনো? সোলেমান কি ঢাকায় ছিলো তখন?”
“ না। ”
“ তাহলে?”
“ ইমন ভাই কি মিথ্যা বলবে আমাকে?”
“ বলতেও পারে। বিরোধী দল আমাদের ভুলে গেছিস? এখন বল দিনকাল কেমন যাচ্ছে তোর?”
“ আপনার তে ভালোই যাচ্ছে। বউ নিয়া ভালোই বিজি থাকেন। ”
“ বউ আছে বলেই তো বিজি। তোরও তো আছে। তুইও থাক বিজি। ”
“ বউ তো ভাইয়ের শ্বশুর বাড়ি। আমার কি যে কষ্ট হয় জানেন না। ”
“ বউ ছাড়া থাকতে সবারই কষ্ট হয়। ”
“ আসলেই ভাই। নিজের জামাকাপড় নিজের ধুতে হয়। হোটেলে গিয়ে খেতে হয়। এক গ্লাস পানি টাও নিজের ভরে খেতে হয়। অনেক কষ্ট। ”
ইব্রাহিম সাথে সাথে চাটি মারলো ইয়াসিনের মাথায়। এ শালা বলে কি এসব! নিজের কাজ নিজে করতে হয় সেজন্য বলে ওর কষ্ট লাগে!
ইয়াসিন মাথা চুলকে বলল-
“ মারেন ক্যান আমারে?”
“ তাহলে কি তোরে চুমু খাব গর্দভ? বউকে তুই এজন্য মিস করিস! ”
“ মিস করি কখন বললাম?”
“ ছাগল,পান্ডা। আহাম্মক, গরুর পাল। ”
“ বকেন ক্যান?”
“ আমাকে শাহবাগ যেতে হবে। থাক তুই গাধা। ”
ইব্রাহিম কাউকে ফোন করতে করতে চলে গেলো। ইয়াসিন নিজের ফোন টা বের করলো। নম্বর চেক করতে গিয়ে বাতাসির নম্বর দেখে বাতাসির নম্বরে কল করলো। কল ঢুকছে না। সুইচ অফ বলছে।
পাঁচ থেকে ছয়বার ট্রাই করলো, সেম। ইয়াসিন বিরক্ত হয়ে কল দেওয়া বন্ধ করে দিলো।
রাতে বাড়ি ফিরে আবার ট্রাই করলে তখনো সেম বন্ধ বলে। ইয়াসিন মেহরিনের নম্বরে কল করে। মেহরিন ইয়াসিনের নম্বর দেখে রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে ইয়াসিন অস্থির গলায় বলে-
“ ভাবি বাতাসি কোথায়?”
মেহরিন বিছানায় তাকায়। বাতাসি পড়তেছে। ”
“ রুমেই আছে। পড়তেছে। কিছু হয়েছে?”
“ ওর ফোনটা কোথায়?”
“ ওর পাশেই। ”
“ তুলে একটা আছাড় মারুন। কতবার ফোন দিচ্ছি ধরছে না। ”
“ বাতাসি..!”
বাতাসি পেছন ফিরে তাকায়।
“ ইয়াসিন ভাইয়া ফোন করছে তোমার ফোনে। কি হয়েছে?”
“ চার্জ নেই আপু। ব্যাটারি শেষ। ”
“ চার্জে দাও। ”
বাতাসি চার্জে দিলো ফোন বন্ধ রেখেই।
“ ভাবি আপনার ফোনটা বাতাসি কে দিন তো। ”
মেহরিন ফোনটা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দিতেই বাতাসি বলল-
“ আমি এখন পড়তেছি আপু। কথা বলার সময় নেই। ব্যস্ত আছি। ”
ইয়াসিন সেটা শুনে কটমট করতে করতে কে’টে দিলো ফোন।
রাত দেড় টার দিকে ইয়াসিন আবার ফোন করলো ফোন বন্ধ। ইয়াসিনের ইচ্ছে করছে চড়িয়ে বাতাসির গাল লাল করে দিতে। ছাগল।
ইয়াসিন পুরো রাত গিয়ে দিনটা কোনো রকমে পাড় করে বিকেল হতেই আর পারলো না থাকতে। চলে গেলো মহাদেবপুর। একটা ঠাস করে চ’ড় লাগিয়ে দিয়ে চলে আসবে আবার।
লোকটার ব্যপারে তথ্য খোঁজাটা সহজ ছিল না।
কারণ ওই লোকটা নিজের অস্তিত্বটাই মুছে ফেলেছিল। প্রথম ধাপে ডার্ক ওয়েব ট্র্যাকিং করা শুরু করলো। সোলেমান তার টিমকে দিয়ে গত ১০ বছরের সব আন্ডারওয়ার্ল্ড লেনদেন খুঁজে বের করায় যেখানে অদ্ভুত একটা প্যাটার্ন ছিল।
প্রতিটা বড় অপারেশনের টাকা সরাসরি কারো কাছে যায় না। তিন থেকে চারটা ভুয়া ফাউন্ডেশন ঘুরে, শেষে এক অচেনা অ্যাকাউন্টে গিয়ে থামে।
দ্বিতীয় ধাপ অর্গান ট্রেডিং রুট। সোলেমান তার পুরোনো নেটওয়ার্ক চালু করার পর দেখে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার একটা নির্দিষ্ট রুটে হঠাৎ করে কার্যক্রম বেড়েছে। রুটটা কোপেনহেগেন থেকে উত্তর উপকূলের দিকে যায় একটা নির্জন উপকূলীয় শহরে।
তৃতীয় ধাপে সংযোগ মেলায়। সোলেমান সব ডাটা এক জায়গায় এনে বসায়। শিপিং কোম্পানি। অর্গান রুট। ফাউন্ডেশন ঘুরে আসা টাকা। একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডেনিম লুই আর ওই অজানা ৫৭ বছরের মানুষ একই ব্যক্তি। কিভাবে?
ডেনিম লুইয়ের কোম্পানির কনটেইনারগুলোই ওই নির্দিষ্ট রুটে যায়। তার কোম্পানির নামে যেসব লস দেখানো হয়, সেই টাকার পরিমাণই ডার্ক ওয়েবের লেনদেনের সাথে মিলে যায়।
আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ, একটা গোপন রিপোর্টে উল্লেখ আছে, তার কোম্পানির এক কনটেইনারে কাজ করা একজন লোক দেখেছে মালিকের পায়ের কাছে ওরোবোরোস ট্যাটু দেখেছে।
সোলেমান কপাল স্লাইড করতে করতে বিরবির করে –
“ছদ্মবেশে ব্যবসায়ী… আসলে আমারই শিকারি।”
এবার লোকটাকে খুঁজে বের করা বাকি। সোলেমান বুঝে যায়। এই মানুষটা ডিজিটাল না, সে অফ-গ্রিড।
তাই সে পুরোনো পদ্ধতিতে যায়। যারা তার সাথে কাজ করেছে, তাদের খুঁজে বের করা শুরু করে। একজনকে পাওয়া গেল। একজন ভাড়াটে অস্ত্র সরবরাহকারী, যে এখন ভয় পেয়ে গা ঢাকা দিয়ে আছে। তাকে ধরে আনা হলো। প্রথমে স্বীকার করতে চাইলো না। তারপর শুরু হলো তার উপর ভাঙা মনস্তাত্ত্বিক চাপ, ভয়, আর একের পর এক হিসেবি নির্যাতন। অবশেষে লোকটা স্বীকার করে।
সে বলে-
“ লোকটা থাকে ডেনমার্কের উত্তর উপকূলে, সমুদ্রের ধারে একটা পুরোনো মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায়, যেটা বাইরে থেকে বন্ধ, কিন্তু ভেতরে চলছে অন্য ব্যবসা।
ওপর পাশ থেকে কেউ সোলেমানের গতিবিধি লক্ষ্য রাখছে। সোলেমান প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে সে অবগত হচ্ছে। কেউ তাকে জানিয়ে বলছে-
“ আপনার প্ল্যান মাফিক সব হচ্ছে। সে আপনাকে খুঁজছে। আর আপনার আস্তানা অব্দিও পৌঁছে গেছে। কি করবেন এখন?”
“ আসতে দাও তাকে। এই পৃথিবীতে আজই তার শেষ দিন। একটু আশা নিয়ে বাঁচতে দাও কয়েক ঘন্টা। ”
সেই রাতেই সোলেমান রওনা দেয়। সমুদ্রের ধারে জায়গাটা একেবারে নিঃশব্দ। হাওয়া বইছে, দূরে ঢেউ ভাঙছে। কারখানাটা অন্ধকারে ডুবে আছে।
বাইরে থেকে মৃত কিন্তু ভেতরে জীবন্ত।
সোলেমান সরাসরি ঢোকে না। প্রথমে চারপাশ ড্রোন, থার্মাল স্ক্যান, করে প্রবেশ পথের হিসাব কষে। সে বুঝতে পারে ভেতরে অন্তত ১২-১৫ জন সশস্ত্র লোক আছে। কতজন ঢুকছে, কতজন বের হচ্ছে, কোথায় আলো জ্বলে সব দেখে।
তারপর পরিকল্পনা করে বাহিরে বসে। বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেওয়া হয়। বাইরের পাহারাগুলোকে নিঃশব্দে একে একে মুখ চাপা দিয়ে সরিয়ে ফেলা হয়। ভেতরে ঢোকার পথ পরিষ্কার করা হয়। সবকিছু এত নিখুঁত ভাবে হয় যে কেউ বুঝতেই পারে না।
ভেতরে ঢোকার পর শুরু হয় ক্লোজ-কমব্যাট। প্রতিটা মুভ হিসেব করে, প্রতিটা আঘাত মারাত্মক। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শেষে সে পৌঁছায় মূল রুমে।
একটা বড় ঘর। মাঝখানে একটা চেয়ার।
সেখানে বসে বড় বড় মাছের ভেতর ড্রাগের প্যাকেট ভরছে। পড়নে কালো ওভারকোট সোলেমানের মতই। পা দেখা যাচ্ছে না। লোকটা পায়ের আওয়াজ শুনে পেছনে না তাকিয়েই বলল-
“ ছুরি টা নিয়ে আয় তো। ”
সোলেমান পাশে তাকালো। ট্রে তে থাকা ছুরিটা নিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে তার হাতে দিলো। লোকটা মাছের পেট কে’টে ড্রাগের প্যাকেট ঢুকিয়ে বলল-
“ শুনলাম মাফিয়া কিং এসএস ব্যাক করেছে ডেনমার্কে? দেশে এসেছে?”
“ হুমম এসেছে। আর সে এখন তোর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তোর মৃত্যু নিয়ে হাজির হয়েছে। ”
লোকটার হাত থেকে পরে যায় ছুরি টা। কাঁপা কাঁপা শরীরে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকায়। সুঠাম দেহের অধিকারী লোকটা তার সামনে দাঁড়িয়ে।
“ ক…কে তুমি?”
সোলেমান মুখ থেকে ব্লাক মাস্ক টা সরিয়ে বলল-
“ এস এস। চিনেছিস?”
লোকটা তাকালো মুখ পানে। তার লোকদের চিৎকার করে ডাকতে চাইলে সোলেমান বলে-
“ ডেকে লাভ নেই। কেউ নেই। সবাই মৃত। ”
“ তুমি কিজন্য এসেছো এখানে? কি চাই তোমার?”
“ বদলা নিতে এসেছি। আর তোর মৃত্যু নিয়ে। ”
“ ক…কি করেছি আমি তোমার?”
“ তোর পা দেখা আমাকে। ”
“ মানে?”
“ মানে পা দেখা। প্যান্ট ওপরে তোল। কি হলো তোল….কথা কানে ঢুকছে না?”
লোকটা বাম পায়ের প্যান্ট উপরে তুললো। ট্যাটু নেই। সোলেমান ইশারায় ডান পা দেখাতে বললো। লোকটা দেখালো। ডান পায়ে দেখা গেলো সেই কাঙ্ক্ষিত ট্যাটু টা।
সোলেমান সাথে সাথে গলা চেপে ধরে বলল-
“ তুই সেই খুনি। তুই আমার বাবা মা কে মেরেছিলি। বল কিজন্য মেরেছিলি? বল। ”
লোকটা পেছাতে পেছাতে দেওয়ালে ঠেকে গেলো পিঠ। ভয়ে উচ্চারণ করলো-
“ কে তুমি? তোমার বাবা মা কে? আমি কাকে মেরেছি?”
“ আমজাদ সুলতান। আর মরিয়ম সুলতান। মনে পরলো কিছু? কি দোষ ছিলো তাদের? কিসের শত্রুতা ছিলো তোর তাদের সাথে? মারলি কেনো তাদের?”
“ তুমি আমজাদের ছেলে! ”
“ হ্যাঁ আমি আমজাদের ছেলে। ”
“ ছেড়ে দাও আমাকে। ছেড়ে দাও। ”
“ তোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমি এতদূর এসেছি রে? ”
“ কিজন্য মেরেছিস আমার বাপ মা কে বল। ”
“ তোমার বাপ একটা বিশ্বাসঘাতক ছিলো। স্বার্থপর ছিলো। ”
সোলেমান গলা চেপে ধরে আরো।
“ একদম মিথ্যা বলবি না। আমার বাপ ছিলো নিষ্ঠাবান, সৎ চরিত্রের। তুই তাকে নিয়ে মিথ্যা বলছিস! তোকে তো…”
“ অন্ধের শহরে তোর বসবাস ছেলে। তোর বাপের মতো জাউরা আর দুটো ছিলো না। সে আমাদের সাথে থেকেছে। আমাদের সাথে কাজ করেছে। আবার আমাদের পিঠ পেছন ছুরিও মেরেছে। ওমন বিশ্বাসঘাতক কে কি করে বাঁচিয়ে রাখতাম আমরা? মেরেছি বেশ করেছি। ”
“ এবার আমিও তোকে মেরে সেই বেশ টাই করবো কু’ত্তার বাচ্চা। আমার বাপ তোদের কুকীর্তি জেনে গিয়েছিল। বাঁধা দিয়েছিল বলে মে’রে ফেলছিস। সাথে আমার মা কেও ছাড়িস নি। আমার মায়ের ইজ্জতে হাত দিয়েছিলি। আমারই চোখের সামনে তাকে মেরেছিস। ”
সোলেমান পাশ থেকে ছুরিটা নিয়ে ডেনিম লুই এর শরীরে ঢুকিয়ে দিতে চাইলে আকস্মিক পুরো কক্ষ টা ধোঁয়ায় ভরে যায়। সামনের সব কিছু ঝাপসা দেখা যেতে লাগে। সেই সুযোগে ডেনিম লুই সোলেমান কে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে বলে-
“ ভুল মানুষকে ধরতে এসেছিস তুই। তোর বাপ কে আমি নই মেরেছে অন্য কেউ। এবার তোর মরার পালা। মর। এই জীবনে বাপ মায়ের খুনিকে আর তুই ধরতে পারবি না। ধরার জন্য তো তুই আর বাঁচবিই না। বোকা ছেলে। তোর বয়স অলরেডি আমরা পার করে এসেছি। তোর বুদ্ধি এখনো ঐ হাঁটুতেই আছে। তোকে এখানে নিয়ে আসাটা ছিলো আমাদেরই প্ল্যান। আর বোকা ছেলে তুই ভেবেছিস তুই নিজ থেকে এসেছিস এই অব্দি! তোর চ্যালা সব গুলো কে বেঁধে রাখা হয়েছে বাহিরে। বাঁচবি কি করে? মৃত্যু কে আলিঙ্গন করার জন্য এবার প্রস্তুত হ। ”
সোলেমান উঠে এসে ডেনিম কে ধরতে চাইলে ডেনিম দেওয়ালের সাথে থাকা সুইচ টিপে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। সাথে সাথে বিকট এক শব্দে পুরো গোডাউন টা আগুনের লেলিহান শিখায় তলিয়ে যেতে শুরু করে। সোলেমান স্তব্ধ হয়ে যায়। ভেতরে চারিদিকে আগুন আর আগুন! সব জিনিসপত্রে আগুন ধরে গেছে। ধোঁয়া আর আগুনের তাপে যেন শরীর পুড়ে যেতে চাইলো,শ্বাস আঁটকে আসতে চাইলো। দিকবিদিকশুন্য হয়ে সোলেমান যখন পলানোর পথ খুঁজতে শুরু করলো তখন অন্ধকারে শক্ত কিছুর সাথে পা বেঁধে পড়ে যায় মাটিতে। সাথে সাথে উপর থেকে আগুনের একটি লোহা এসে পড়লো সোলেমানের পায়ের উপর। এতটাই ভারী ছিলো ঐ লোহা যে মনে হলো পা টা ভেঙে গেছে। লোহা ঢুকে যাচ্ছে মাংস ভেদ করে। মৃত্যু যন্ত্রণা আসলেই এতটা কষ্টের! সোলেমানের তো কখনো নিজের মৃত্যু নিয়ে কষ্ট হয় নি। তাহলে আজ কেনো হচ্ছে? অবশ্য কষ্টটা নিজের মৃত্যু কে নিয়ে নয়। মেহরিন কে নিয়ে, তার অনাগত সন্তানের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। বাচ্চাটার মুখটা কি সোলেমানের আর দেখা হবে না তাহলে! বয়স কত ওর? তিন মাস হয়তো হয়েছে। মেহরিন ও যে তার সুলতান সাহেবের ফেরার অপেক্ষায় আছে! তাদের ছোট্ট সংসার টা এভাবেই শেষ হবার ছিলো তাহলে! ও মেয়ে যে পাগল হয়ে যাবে। সোলেমান না থাকলে মেহরিন কে রাখবে আগলে? তার শত্রুরা যে এখনো বেঁচে আছে।
ইশ সোলেমান তুমি আর একটু সময় নিয়ে এগোতে। আর একটু সাবধান হতে! যাকে তুমি এত বছরেও খুঁজে পাও নি। তাকে এখন আকস্মিক খুঁজে পাওয়া নিয়ে একটুও কি সন্দেহের দানা বাসা বাঁধে নি বুকে! এজন্যই তোমার শত্রুরা বলে সোলেমান যত উন্মাদ হবে ততই সোলেমান ভুল করবে। আর ততই সোলেমান ধ্বংসের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াবে। তাই হলো দেখলে?
দাহশয্যা পর্ব ৯১ (৩)
সোলেমান উঠতে যাবে এমন সময় পিঠের উপর আরেকটা আগুনের ভারী এক অংশ এসে পড়লো। সোলেমানের আর ওঠা হলো না। এই ধোঁয়া,এই আগুনের তাপে,সে চেয়ে চেয়ে দেখলো গোডাউন টা আগুনে তলিয়ে যাচ্ছে। সে শেষবার স্মরণ করলো বউ বাচ্চা কে। তার চোখ বুঁজে ফেললো।
অন্ধকার জগৎে যারাই ঢুকেছে তাদেরই নির্মম মৃত্যু হয়েছে। সোলেমান ও সেই মৃত্যুর খাতায় নাম লিখালো, হয়তো… তবে সেটা যে এত তাড়াতাড়ি হবার ছিলো,এ বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ালো…!!
