ধরিয়া রাখিও সোহাগে আদরে পর্ব ২০
জেনিফা চৌধুরী
“একজন ডিভোর্সি, সিঙ্গেল মাদারকে ভালোবাসা এত সহজ না, সায়র। একজন মাকে ভালোবাসতে হলে সবার আগে তার সন্তানকে আগলে রাখার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে৷”
মেহরিশের কথা শুনে সায়র পাল্টা প্রশ্ন করল,
“আপনার কি মনে হয়, আমি সে ক্ষমতা নেই?”
মেহরিশ নড়েচড়ে বসল। বলল,
“সে কথা বলিনি, সায়র। আমি বুঝাতে চেয়েছি, আপনি আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতে পেরেছেন?”
সায়র সামান্য হাসল। মেহরিশের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। বলে উঠল,
“ভালো না বেসেই বিয়ে করে ফেললাম?”
মেহরিশ সায়রের চোখে চোখ রেখে বলে উঠল,
“বিয়ে মানে ভালোবাসা না, সায়র। বিয়ে করতে হলে ভালোবাসতে হবে এটা কোথাও বলা হয়নি। বরং এরেঞ্জ ম্যারেজ যাদের হয় তারা কিন্তু বিয়ের পরেই একে অপরকে ভালোবাসে। ভালোবেসে বিয়ে করে আমার জীবনটা নরক হয়ে গেছে দেখছেন না?”
সায়র সাথে সাথে বলে উঠল,
“সে নরকটাকেই ভালোবাসা দিয়ে সর্গ সুখে পরিনত করব আমি।”
মেহরিশের কেন যেন বুক কাঁপছে। মনে হচ্ছে সব কেমন অচেনা। অজানা। চারপাশের সব কিছু কেমন তিক্ত লাগছে। মিথ্যে মনে হচ্ছে৷ তাইতো মেহরিশ সায়রকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। শুধু সায়র না নিজের মাকেও এখন মেহরিশের মিথ্যে মনে হয়। মেহরিশের দিকে খেয়াল করল সায়র। মুখটা চুপসে আছে। কি নিয়ে যেন চিন্তায় আছে। সায়র একটু গলা ঝেরে বলে উঠল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“মেহরিশ, এনি প্রবলেম?”
মেহরিশ ছোট্ট করে উত্তর দিল,
“নো।”
সায়র এবার মেহরিশের দিকে ঘুরে বসল। মেহরিশের এক গালে হাত রাখল আলতো করে। সায়রের দিকে ঘুরিয়ে বসালো। দুই গালে হাত রাখল আলতো করে৷ শান্ত স্বরে বলে উঠল,
“আপনার কি মনে হয়, আমি আপনাকে ভালোবাসি না?”
মেহরিশ উত্তর দিল না। সায়র পুনরায় বলল,
“মেহরিশ, হাতের পাঁচ আঙ্গুল যেমন সমান না। তেমন সব ছেলে-মেয়েরাও এক না। পৃথিবীর সব মানুষ এক হলে কি পৃথিবী সুন্দর থাকতো? আমি আপনাকে ভালোবাসি, মেহরিশ। এই পৃথিবী, আলো বাতাস, চাঁদ-সূর্য যেমন সত্যি আমার ভালোবাসাও তেমন সত্যি। আমাকে আপনি জোর করে ভালোবাসবেন এটা আমি চাইনা। আপনি আমার পাশে থাকবেন, আমার দুঃখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবেন, আমার মন খারাপে আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরতে দিবেন। ব্যস! আর কিছু চাইনা। এইটুকু চাওয়া আমার পূরণ করবেন, মেহরিশ?”
মেহরিশ অশ্রুসিক্ত নয়নে সায়রের দিকে চেয়ে রইল। সায়র হুট করে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল৷ মেহরিশের অশ্রুসিক্ত চোখের পাতায় চুমু খেয়ে ফেলল। মেহরিশ অনুভূতিতে সিক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল৷ গা শিরশির করে উঠল। দুই হাতে খামচে ধরল সায়রের শার্টের কলার। মেহরিশের মুখপানে তাকিয়ে সায়রের কি যেন হলো। নিজের উপর কন্ট্রোল হারাল৷ উদাস মন কিসব ভাবছে। কিসব করতে চাইছে। মেহরিশকে আদর করার বড্ড স্বাদ জাগছে৷ মেহরিশের কম্পিত ঠোঁট দুটো সায়রকে ইশারায় ডাকছে৷ সায়র এবার ঠোঁট ছোয়ালো মেহরিশের কপালে। মেহরিশ হুট করেই কাঁপতে শুরু করল। পরনে ক্রপ টপস, গলায় ওড়না ঝুলানো, সাথে প্লাজু। সোফায় জড়োসড়ো হয়ে বসার জন্য প্লাজু বেশ খানিকটা উপরে উঠে গেছে৷ টপসটাও কিছুটা উপরে উঠে যাওয়ায় নাভি স্পষ্ট হয়ে আছে। সায়রের বড্ড ইচ্ছে করছে সেখানটায় চুমু এঁকে দিতে। কিন্তু নিজের ভেতরে থাকা কোনো শক্তি আটকাচ্ছে। নিজের মনকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও নিজের হাতটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। হাত চলে গেল সেখানে৷ সায়রের শীতল হাতের স্পর্শ মেহরিশের উন্মুক্ত পেটে পড়তেই মেহরিশ প্রবল ভাবে কেঁপে উঠল। সামলাতে না পেরে সায়রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। সায়র যেন এবার আকাশের চাদ হাতে পেয়ে গেল। মুখ ডুবাল মেহরিশের ঘাড়ে৷ অস্পষ্ট বাক্যে বলে উঠল,
“মেহরিশ, আমার নিজেকে সামলাতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে।”
মেহরিশ উত্তর দিল না। চুপটি করে রইল সায়রের বুকে। বরং আরো জড়োসড়ো হয়ে সায়রের কোল উঠে পড়ল। সায়র পুনরায় বলে উঠল,
“মেহরিশ, আমি আপনার আপত্তি কিছু করতে চাইনা।”
মেহরিশ উত্তর দিল না দেখে সায়রের রাগ হলো। মেহরিশের ঘাড়ে গাঢ় ঠোঁটের স্পর্শ লেপে দিল। বলল,
“মেহরিশ, আমাকে সামলানোর সুযোগ দিন। নয়তো কিছু একটা অঘটন ঘটে যাবে।”
মেহরিশ সায়রের বুকে আরো শক্ত করে নিজের জায়গা করে নিতে নিতে বলল,
“আমি শুধু আপনাকে খানিকক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকতে চাই, সায়র।”
সায়র আগের ন্যায় বলল,
“মেহরিশ, কেরোসিন আর আগুন একসাথে হলে দাউদাউ করে জ্বলে, নিভে না। আমি একজন পুরুষ, মেহরিশ। আমার অনুভূতির জোয়ার বড্ড ধারাল। একবার সেই জোয়ারে ভাসা শুরু করলে সামলাতে পারবেন না।”
মেহরিশের কানে কথাটা যেতেই সায়রকে ছেড়ে দিল। ধ্যান ভেঙে গেল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল দরজা খোলা। লজ্জায় চুপসে গেল। সায়রের দিকে লজ্জায় দৃষ্টি রাখতে পারল না৷ মিনমিন করে বলল,
“আমি এসবের জন্য এখনো প্রস্তুত না, সায়র।”
সায়র উঠে দাঁড়াল। শার্ট ঠিক করে, নিজেকে গুঁছিয়ে নিতে নিতে বলল,
“তাহলে আমাকে বেসামাল করে দিতে কাছে আসবেন না। প্রথম বলে ছেড়ে দিলাম। নেক্সট টাইম করলে আর ছাড়ব না। একদম…।”
মেহরিশও সাথে সাথে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
“একদম কি?”
সায়র মুচকি হাসল। মেহরিশের দিকে সামান্য ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“বাসর সেরে ফেলব।”
বলেই শিস বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে গেল। সায়র চলে যেতেই মেহরিশ লাজুক হেসে উঠল৷ এক হাত ঘাড়ে রেখে, অন্য হাত গালে রেখে কল্পনায় ভেসে গেল। মিনমিন করে বলতে লাগল,
“আমিও আপনার প্রতি দিন দিন মারাত্নক ভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছি, সায়র।”
“ডাঃ আংকেল, হঠাৎ ইমারজেন্সি ডাকলেন যে?”
সায়র তড়িঘড়ি করে ডাঃ রুমির কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে উপরোক্ত প্রশ্নটি করল। ডাঃ রুমি সায়রের দিকে চেয়ে হাস্যজ্বল মুখে বলে উঠলেন,
“কাম ডাউন, ইয়াং ম্যান। এত হাইপার হওয়ার মতো কিছু হয়নি। বসো আগে৷ ”
সায়র বসতে বসতে হাঁফ ছাড়ল। শান্ত স্বরে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে এত ভোরে আসতে বললেন কেন, আংকেল?”
ডাঃ রুমি হেসেই জবাবে বললেন,
“তোমাকে একটা খবর দেওয়ার ছিল।”
“কি খবর, আংকেল?”
ডাঃ রুমি বললেন,
“আবির সাহেবের জ্ঞান ফিরেছে।”
সায়রের চোখ মুখ খুশিতে ভরে উঠল। ঠোঁটের হাসিটা বেশ প্রস্তর হলো। উত্তেজিত হয়ে বলল,
“সত্যি! সত্যি বলছেন, আংকেল?”
ডাঃ রুমি হাসলেন। বললেন,
“হ্যাঁ, সত্যি। তবে তাকে এখানে রাখা যাবে না৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে নিয়ে যাও।”
সায়রও এবার চিন্তায় পড়ে গেল। ডাক্তারের সাথে কিছু পরামর্শ করে উঠে পড়ল।
নীলুফা বেগম আনমনে হয়ে রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন৷ চা উতলে পড়ছে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। শাড়ির আঁচলটাও গ্যাসর উপর পড়ে আছে। আগুন ধরতে শুরু করে। মেহনূর রান্না ঘরে ঢুকতেই এহেন দৃশ্য দেখে মা বলে চিৎকার করে উঠল। তাড়াতাড়ি গ্যাস নিভিয়ে সামনে থাকা এক মগ পানি আঁচলে ঢেলে দিল। নীলুফা বেগমকে ছিটকে সরিয়ে আনল সেখান থেকে। নীলুফা বেগম হঠাৎ কান্ডে ভড়কে গেলেন। মেহনূরের ভয়ার্ত মুখখানা দেখে চমকে তাকালেন নিজের আচলে। কিছুটা পুড়ে গেছে। চা পড়ে চারদিকে একাকার অবস্থা৷ মেহনূর নীলুফা বেগমকে সামান্য জড়িয়ে ধরল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল,
“মা! কি হয়েছে তোমার? এক্ষুনি কতবড় একটা দূর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল!”
নীলুফা বেগম হঠাৎ কান্ডে কথা বলতে পারছেন না। তবুও কোনোরকমে বলল,
“একদম খেয়াল ছিল না রে, মা।”
মেহনূর কিছু বলতে যাবে তার মধ্যেই নীলুফা বেগমের ডাক পড়েছে। নীলুফা বেগম মেহনূরকে বলল,
“তোর বাবা ডাকছে। শুনে আসি।”
বলেই রুমের দিকে ছুটে গেলেন। সাবির সাহেব তৈরি হচ্ছেন। কোথাও বের হবে হয়তো। নীলুফা বেগমকে ঘরে ঢুকতে দেখে কঠিন বাক্যে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় থাকো? কতক্ষণ যাবৎ ডাকছি।”
নীলুফা বেগম শান্ত স্বরেই বলল,
“কি বলবে, বলো।”
সাবির সাহেব নীলুফা বেগমের এক হাত ধরে টেনে সামনে এনে দাঁড় করালেন। নীলুফা বেগমের গালে হাত রেখে বলে উঠলেন,
“বের হওয়ার সময় তোমার মুখ না দেখে গেলে আমার দিন ভালো যায় না, নীলু।”
নীলুফা বেগম হেসে উঠলেন। তাচ্ছিল্যের হাসি। হাসতে হাসতে বললেন,
“আমার জীবন ধ্বংস করে নিজে ভালো থাকবে আশা করো কিভাবে? আমার সংসার, আমার স্বামী সব কেড়ে নিয়েও ভালো থাকতে পারছো না?”
সাবির সাহেব রেগে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। হাসি টেনে বলে উঠলেন,
“এখন আমার হাতে সময় নেই, নীলু। ফিরে এসে তোমার প্রশ্নের জবাব দিব।”
বলেই নীলুফা বেগমের কপালে চুমু এঁটে বেরিয়ে গেলেন। এটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। নীলুফ বেগমের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সাবির সাহেব রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই নীলুফা বেগম ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। ভেতর থেকে চিৎকার করে কান্না আসছে কিন্তু আফসোস কাঁদতে পারছেন না। ঠিক কত বছর ধরে এই কান্না চেপে আছে জানা নেই। কত বছর ধরে এই চারদেয়ালের মাঝে এক নারীর বদ্ধ চিৎকার জমে আছে কেউ জানেনা। এক নারী অনিচ্ছায় কত রাত নিজের সতিত্ব বির্সজন দিয়েছে কে জানে সে কথা? নীলুফা বেগম এবার ফুঁপিয়ে উঠলেন। ফুঁপিয়ে বলে উঠলেন,
ধরিয়া রাখিও সোহাগে আদরে পর্ব ১৯
“ এতদিন তোমার ফেরার আশায় পথ চেয়ে চেয়ে সব অন্যায়, অত্যাচার মেনে নিয়েছিলাম, আবির। আজ আমি শূন্য। আমি মুক্ত। তুমি নেই। আমার অস্তিত্বও নেই। আমার অস্তিত্বের লড়াইয়ে আমি হেরে গেছি। বেঁচে থেকেও লাশ হয়ে ছিলাম। এখন না হয় সত্যি সত্যি লা°শ হয়ে যাব। এক দেহে এত কলঙ্ক নিয়ে আর বাঁচতে পারব না। উপরওয়ালা ছাড়া কেউ জানবে না, এক নারী তার ছোট্ট দেহে কত ব্যাথা লুকিয়ে রেখে নিরবে চলে গেল।”
