Home ধূসর রংধনু ৩ ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ৪

ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ৪

ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ৪
মাহিরা ইসলাম মাহী

মাহরিসা উদ্দেশ্যহীন পথে হাঁটছে।
এইতো ক্লাসে নতুন স্যার হিসাবে সে আদ্রিতের দেখা পেয়েছিলো।
আজ অনেক গুলো বছর পর সে তার আদু ভাইয়ের মুখখানা খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছে।
সঙ্গে ধমক ও খেয়েছে রাম ধমক।
সে যখন আদ্রিতকে স্যারের পরিচয়ে প্রথম ক্লাসে দেখলো হতবাক হয়ে চেয়েছিলো সে।চিনতেও তার খানিকটা কষ্ট হচ্ছিল।

তার সঙ্গে কিছু বছর আগের আদ্রিতের রোগা পাতলা চেহারার গড়নের সঙ্গে তার বর্তমান শক্ত সামর্থ বাহু,প্রশস্ত শরীর দেখে মাহরিসা শুষ্ক ঢোক গিললো।সঙ্গে আরো শিওর হলো তার পরিচয় পর্ব সমাপ্ত হতেই।
রোশনী পাশ থেকে খোঁচা মেরে বলল,
“ কি ব্যাপার আমাদের মারু বানু? স্যারের প্রেমে পরে গেলি নাকি? চোখই সরাতে পারছিস না।তখন তো খুব বয়ান মারলে।উহুম উহুম।
মাহরিসার কর্ণকূহরে সে কথা পৌঁছালো কিনা কে জানে।সে তো গালে হাত দিয়ে তার আদু ভাইয়ের ধ্যান করতে মগ্ন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ হেই স্টান্ড আপ।”
রমণীর দিকে তীব্র আদেশ সূচক বাক্য ছুঁড়ে দেওয়ার পরেও রমণীর ধ্যান ভঙ্গ হলো না।
ক্ষিপ্ত মেজাজে আদ্রিত এগিয়ে এসে মাহরিসার বেঞ্চে থাপ্পড় বসাতেই মাহরিসা হকচকিয়ে উঠলো।
সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পরলো থতমত খেয়ে।
“ জ্বী.. জ্বী? “
“ ওদিক কি সার্কাস চলছে মিস?”
“ না আসলে, ওখানে আপনি..”
“ আউট, গেট আউট।”
আদ্রিতের ধমকে কেঁপে উঠলো মাহরিসা ।
মুখখানা কাঁদো কাঁদো হলো তার নিমিষেই।
প্রথম দেখাতেই আর আদু ভাই তাকে এভাবে ধমক দিতে পারলো?কি করে পারলো?
ক্লাসের সকলের সবাই চাপা হাসতে লাগলো।

মাহরিসা সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগটা হাতে নিয়ে এক দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল।
আদ্রিত ক্লাস শেষে বের হয়ে যেতেই মাহরিসা পুনরায় ক্লাসে ঢুকলো কিন্তু তার মন টিকলো না কিছুতেই।
রোশনী আর সৃজনীকে বলে বেরিয়ে এলো মুহুর্তে।
কিন্তু ক্লাসের বাইরে আসতেই তার মন বিষিয়ে উঠলো।
সে দেখতে পেল একজন সুন্দরী, রূপবতী, যুবতী রমণীর সঙ্গে আদ্রিত হেসে হেসে কথা বলছে।
সেই দৃশ্য অবলোকন করতেই মাহরিসার প্রচন্ড রাগ হলো।
কেন হলো সে জানে না।
শুধু জানে তার আদু ভাই কেন একজন, সুন্দরী রূপবতী রমণীর সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলবে?কেন?কেন,কেন,কেন? কেন বলবে?

তার মন মানতে নারাজ।সে যতই বোঝাক বেহায়া মনকে।
যে মন প্লিজ এসব ভাবনা ভাবিস না প্লিজ।
কিন্তু সে কি আর শোনার পাত্রী।
মেঘের হঠাৎ তীব্র প্রতিবাদে মাহরিসা চমকে উঠলো।
পুনরায় গুরুম গুরুম শব্দের ধ্বনিতে মাহরিসা ভ্রুকুচকে তাকালো আকাশ পানে।
মুহুর্তেই সে চমকে উঠলো।
সে কি! হঠাৎ রোদে পোড়া উত্তপ্ত আকাশ এমন শীতলতায় ছেয়ে গেল কেমন করে।
মেঘরাশি কেন তার রঙ বদলালো?
বৃষ্টি আসবে নাকি সর্বনাশ।
তার কাছে না আছে ছাতা আর না সে দেখতে পাচ্ছে আশ্রয় নেওয়ার মত কোনো ছাউনি।
অপরিচিত পথ দেখে সে আরো চমকে উঠলো।
দিগুণ আতঙ্কিত হলো তার হৃদয়।

বছর খানেক আগের স্মৃতি তার মানস্পটে হানা দিলো দারুণ ভাবে।
সঙ্গে নিজের গায়ে পরিহিত সাদা এপ্রোনটি তার খুব করে চোখ কারলো।
এমনি তো দৃশ্য ছিলো সেদিন।
মুহুর্তেই ঝমঝমিয়ে বর্ষনে ভিজিয়ে দিলো তার শরীরের পরিহিত বস্ত্র।
অদূরে কতগুলো বখাটের চেহারা দৃশ্যমান হতেই তার মুখখানি রক্তশূন্য হলো।
ততক্ষণে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে গিয়েছে।
মাহরিসা ঠোঁট কামড়ে ধরলো আতঙ্ক উত্তেজনায়।
বখাটে গুলোর মাঝের একজন বলে উঠলো,
“ বস পাখি তো খাঁচায় নিজে থেকে এসে ধরা দিয়েছে। আজ তো আমাদের খোঁজার কোনো প্রয়োজনই হলো না।”
একজন মাহরিসার বাম হাত চেপে ধরলো।
মাহরিসা ছেলেটার অন্তকোষ বরাবর লাথি মেরে কোনো রকমে ছুটতে লাগলো।
তাল মাতাল হয়ে ছুটতে ছুটতে সে কারো গাড়ির সামনে এসে আঁচড়ে পরলো।
কোনো রকমে উঠে দাঁড়ালো সে।

সেই মুহুর্তে মাহরিসা স্পষ্ট দেখতে পেল তার আদু ভাইয়ের সঙ্গে তার দুই বন্ধু বিদ্যুৎ আর আবিদ বেরিয়ে এসেছে গাড়ি থেকে।
আদ্রিত এগিয়ে এসে মাহরিসার ছোট শরীরটাকে আগলে ধরলো।
মাহরিসা দেখলো তখন কঠিন স্বরে স্টান্ড আপ আর গেট আউট বলা যুবকটি এই মুহুর্তে তার বড্ড চেনা।ঠিক আগের ন্যায়।
সেখানে নেই কোনো অপরিচিতির ছোঁয়া।
যেন প্রতিদিন তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়, কথা হয়।
মাহরিসার জীবনের ইতিহাসের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
বছর খানেক আগের ঘটনা যেন মাহরিসার মস্তিষ্কের সমানতালে কড়া নাড়ছে।
“কোনো সালার*পুত তোর শরীরে টাস করেছে? স্পিক আপ ইডিয়েট?””
আদ্রিতের তেজশ্রী বজ্রকন্ঠে মাহরিসা কেঁপে উঠলো।
মাহরিসা মাথা নাড়লো।
আদ্রিত শিকারির দৃষ্টির ন্যায় মাহরিসার শরীরে চোখ বুলাতে বুলাতে সুধালো,

“ কোথায়?”
“ হাত চেপে ধরেছিল আদু ভাইয়া।”
“ কোনটা?”
মাহরিসা হাত উঁচু করে দেখিয়ে দিতে দেরি আদ্রিতের ছেলেটার উপর হিংস্র সিংহের ন্যায় ঝাপিয়ে পরতে দেরি নেই।
মনে হচ্ছে এই বুঝি সে ছেলেটার হাড় মাংশ ছিড়ে খাবলে একাকার করে ফেলবে।
মাহরিসা আদ্রিতের এমন হিংস্ররুপে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুখে হাত চেপে। মাহরিসা স্পষ্ট টের পেল তার আদু ভাই পরিবর্তন হয়েছে।তার চেহারার গঠনের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে তার গাম্ভীর্যতায় সঙ্গে পুরুষালী হুংকারের, ক্ষমতার সঙ্গে তেজশ্রী ভাব ভঙ্গিমার।
মাহরিসা প্রতিজ্ঞা করেছিল এভাবে আর কখনো সাদা ড্রেস পরে বের হবে না বাহিরে।কিন্তু এখন এই সাদা এপ্রোনই তার নিত্য দিনের সঙ্গী।
মাহরিসা লক্ষ করছে আদ্রিতের মাঝে এই মুহুর্তে বেপরোয়া ভাব অধিক পরিমাণে উজ্জীবিত।
সে দেখলো তার আদু ভাই এবারে আর উম্মাদের মতো ছেলেগুলোকে মেরে ফেলার পায়তারায় নেই। ঘটনা পুরোটা ঘটতে গিয়েও যেন কেমন করে আদ্রিত শেষ মুহুর্তের মোড় ঘুরিয়ে দিলো।একদম মেরে ফেলা নয় বরং সে বিদ্যুৎ আর আবিদ কে ঝাঁঝালো স্বরে বলল,

‘ ন*টির ছেলেগুলোকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আয়। একটাকে ও হসপিটালে ভর্তি করবিনা।মেয়েদের ইভটিজিং করা হারামজাদা গুলোর প*** ভেতর ঢুকিয়ে দেব। ওর কঁলিজা ছিঁড়ে এনে আমি ভোনা করবো গরম তেলে। ওদের খবর লাগা, ওর মা বোনকে সামনে এনে আমি ওদের দিয়ে ইভটিজিং করাবো।”
আদ্রিতের হুংকারে মাহরিসা ঠোঁট চেপে কেঁদে উঠলো। একজন দ্বায়িত্বশীল ডাক্তার কি করে এতটা বেপরোয়া অমানবিক হতে পারে।কি করে এতটা কঠোর হৃদয়ের পাষান্ড হতে পারে?
ডাক্তার তো সে।কোনো দয়া নেই কি তার মাঝে?
মাহরিসার ভিতরকার হৃদয় চিৎকার করে বলে উঠলো,

“ অবশ্যই তার হৃদয়ে দয়ামায়া আছে মাহরিসা। নাহলে তো তোর প্রতি এই দয়া মায়া দেখাতো না সে।
সমাজের কীটপতঙ্গ প্রতি যে দয়া মায়া দেখাতে নেই।তাদেরকে তাদের কর্মফলের উপযুক্ত শাস্তিই দেওয়া উচিত।এটাই তাদের প্রাপ্য।সেখানে দয়া মায়ার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়াই তোর বেকামি।সেখানে পাষান্ডই খাটে।নাহলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে কেমন করে সে।দূর্বল চিত্তের মানুষেরা সমাজের আর কয়েকটা কাপুরুষ পুরুষের ন্যায় পিছিয়ে থাকে। পরে থাকে সবার পরের সারিতে।
সহ্য করে নেয় সমস্ত অন্যায় অপবাদ,লাঞ্ছনা। “
লম্বা লম্বা পা ফেলে আদ্রিত তার রক্তাক্ত হাতে মাহরিসার বাম হাত চেপে ধরলো।
তার ধরার ধরণ প্রখর।

মনে হচ্ছে এই বুঝি মাহরিসার হাতখানা তার আদু ভাইয়ের হাতের চাপে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হবে।
ব্যাথায় মাহরিসা শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
আদ্রিতের রাগ তরতর করে বেড়ে গেল ততক্ষণাৎ। হিসহিসিয়ে বলল,
“ তোর কি ধারণা তোর কান্না দেখে আমার বাপ-মা আমায় প্রত্যেকবার বিদেশ পাঠানোর প্রস্তুতি নেবে? হু?”
“ আদু ভাইয়া…”
“ শাট আপ। আর একবার যদি আদু ভাই ডেকেছিস তো এক থাপ্পড়ে সারাজীবনের জন্য তোর জবান বন্ধ করে দেব।চিনিস আমায়?”
আদ্রিতের ধমকে মাহরিসা ঠোঁট উল্টে কেঁদে দিলো।
আদ্রিত নিজের কপাল চেপে ধরলো।
“ এই চুপপপ, চুপপ।তুই কি এখনো ছোট? খবরদার যদি এখনও তুই ছোট সাজার চেষ্টা করেছিস তোকে আজ আস্ত রাখবো না।”

মাহরিসার কান্না থামলো কিন্তু ঠোঁট তার উল্টেই রইলো।
সে কান্না করছে তবে এবারের আদ্রিতের ধমকে নিঃশব্দে।
আদ্রিত কয়েক সেকেন্ড মাহরিসার বৃষ্টিভেজা অশ্রুশিক্ত মুখশ্রী ভেজা শরীর দেখে চোখ বন্ধ করে নিলো।
“ ঠোঁট উল্টাবিনা মারু অঘটন ঘটে যাবে কিন্তু খবরদার। তার জন্য কিন্তু আমি দায়ী থাকবো না মোটেও।“
মাহরিসা সে হুশিয়ারে কান দিলো না।
“ গাড়িতে বস।”
মাহরিসা ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,
“ বসবো না।”
“ বসতে বলেছি কিন্তু তোকে মারু আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিস না মোটেও, ফল ভালো হবে না।”
“ যাবো না আদু ভাইয়া।”
“ চুপপপপপপপপ গাঁধা।”
আদ্রিত তার হাত চেপে ধরে জোড় করে গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে দিলো।
“ আদু ভাই..”

বলতে নিয়েও মাহরিসা নিজের হাতে সাহায্যে ঠোঁট চেপে ধরলো।
কি আশ্চর্য সে চেয়েও কেন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না।
কই সে তো এতটা ভঙুর হৃদয়ের নয়।তবে কেন তার এতদিনের গড়ে তোলা সংযম আদ্রিতের সামনে খন্ড বিখন্ড হয়ে যাচ্ছে নিমেষে।
শত চেষ্টা সাধ্য করেও সে পারছেনা তার ভেতরকার সত্তা লুকিয়ে রাখতে।
স্বভাব এমন একটি অদৃশ্য হাতিয়ার যা মানুষ একবার নিজের মাঝে ধারণ করে নিলে তা বদলানো বড্ড কঠিন।
যেমন চোরের স্বভাব চুরি করা।
তাকে যদি চুরির দায়ে জেলেও ভরা হয় তবে, দেখা যাবে জেলের ভেতরেও সে তার চুরির স্বভাব ছাড়তে পারেনি।তার সেলে অবস্থিত অন্যকারো জিনিসের উপর হাত সাফাই করছে নিমিষে।
মাহরিসাও হয়েছে ঠিক একই দশা হাজার বছর যাক কিন্তু শত চেষ্টা করেও সে নিজের ছোট বেলার তার আদু ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত স্বভাব গুলো ছাড়তে পারেনি।

শুধুমাত্র আদ্রিত দূর দেশে থাকায় এতদিন সেগুলো তার নিজের মাঝে দৃশ্যমান হয়নি।
যখনই তার আদু ভাই দেশে ফিরলো অমনি সে তার নিজের রং বদলে আসল রংয়ের খোঁজে বেরিয়ে পরলো পুনরায়।
আদ্রিত অপর পাশ দিয়ে ফ্রন্ট সিটে এসে বসতেই মাহরিসার দিকে ভ্রু কুঁচকে চাইলো।
“ ঠোঁটে হাত দিয়েছিস কেন? কি সমস্যা? “
মাহরিসা আতঙ্ক গ্রস্থ হয়ে ঠোঁটে হাত চেপে বসে রইলো। এ হাত সে কিছুতেই সরাবেনা তবে পুনরায় বেফাঁস কথা বলে ফেলবে।অতঃপর তার আদু ভাইয়ের ধমক খেতে হবে।
কোনো দরকার নেই।
কিন্তু আদ্রিত তো নাছর বান্দা।

ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ৩

মাহরিসা জেদি হলে আদ্রিত জেদি সঙ্গে তেজী।
আদ্রিত মাহরিসার হাত দুটো চেপে ধরলো শক্ত করে। মাহরিসা নিজের হাত দুটো আরো শক্ত করে ধরলো।
ঠোঁট সে আজ কিছুতেই ছাড়বে না।
আদ্রিতের সামনে আজ সে মুখ কিছুতেই খুলবেনা যাই হয়ে যাক না কেন।

ধূসর রংধনু ৩ পর্ব ৫