না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৮ (৩)
মাইশা জান্নাত নূরা
ড্রয়িংরুমে না দাঁড়িয়ে তেজ শান্তি পাচ্ছে, আর না একটু শান্তিতে বসতে পারছে সে। হাঁটতে গেলে প্যন্টের ঘষা ও চাপে ব্য*থা অনুভব হচ্ছে। তেজ বিরবিরিয়ে বললো….
—”সকালে ভাইদের সামনে বে*ইজ্জতি হইছে এখন নির্ঘা*ত ইলমা আর অনুর সামনেও হতে হবে।”
তেজের কথা শেষ হতেই ইলমা অনুকে নিয়ে বাংলো বাড়ির মূল দরজা পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। তেজের দৃষ্টি সেদিকে পড়তেই সে জোরপূর্বক হাসলো। নিজের অস্বাভাবিক অবস্থা ওদের সামনে ঠিকঠাকভাবে লুকাতে পারবে কিনা সেই চিন্তায় ভিতরে ভিতরে অস্বস্তিও কাজ করছিলো তেজের।
ইলমা ও অনু তেজের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। ইলমা শান্ত কন্ঠে বললো……
—“আপনার সাথে আমার কথা আছে।”
তেজ নিজের ভেতরের অগোছালো অবস্থাটাকে আড়াল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ওদের সামনে পুরোনো এটিটিউড ধরে রেখে সংক্ষিপ্ত স্বরে বললো…..
—“হুম, বলুন।”
ইলমা একবার অনুর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় তেজকে অনুর উপস্থিতির কথা বুঝিয়ে দিয়ে বললো….
—“এখানে?”
ইলমার ইশারার মানে বুঝতে পেরে তেজ অনুর দিকে তাকালো। এ বাড়ির প্রতিটা জিনিস যে অনুকে টানছে, ওর যে সব ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তা ওর চঞ্চল দৃষ্টির মাঝে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। তেজ নরম গলায় বললো…..
—“অনু, বাড়িটা ঘুরে দেখতে চাও?”
অনু উচ্ছ্বাস ও খানিকটা লাজুক সং*কোচের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে একবার তেজের দিকে তো আবার ইলমার দিকে তাকালো। তারপর মাথা নেড়ে বললো….
—“না, না। দেখবো না আমি।”
তেজ হালকা হেসে বললো….
—“আরে, কোনো সমস্যা নেই। তুমি চাইলে দেখতে পারো। বাড়িটা তো বেশ বড়। আমি নির্ঝরকে বলে দিচ্ছি, ও তোমাকে ঘুরিয়ে দেখাবে।”
ইলমাও তেজের কথায় সায় দিয়ে বললো…..
—“হুম, ঘুরে দেখো তুমি। নির্ঝর খুব ভালো ছেলে। ওর সঙ্গে থাকলে তুমি নিজেকে অনিরাপদ মনে করবে না।”
অনু হালকা স্মিত হেসে বললো….
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—“আচ্ছা।”
তেজ বললো….
—“আমি নির্ঝরকে ডেকে আনছি।”
এই বলে তেজ নির্ঝরকে ডাকতে চলে গেলো। আগের মতো খুঁ*ড়িয়ে না হেঁটে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিলো তেজ। কিন্তু তাতে তেজের হাঁটার গতি আরও ধীর হয়ে গেলো। ইলমা অনুকে নিয়ে সোফায় বসে শান্ত স্বরে বললো…..
—“আমাকে একটু তেজের সঙ্গে বাইরে যেতে হবে। বেশি সময় লাগবে না। ততোক্ষণে তোমার বাড়িটা ঘুরে দেখাও শেষ হয়ে যাবে।”
অনু কিছুটা অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলো….
—“কোনো বিশেষ দরকার নাকি আপা?”
ইলমা হালকা হেসে বললো….
—“হ্যাঁ, দরকার তো বটেই। তেজ আমাকে যে কফিশপে কাজ জোগাড় করে দিয়েছেন সেখানেই যেতে হবে। নতুন কাজে জয়েন করেছি, কিছু নিয়ম-কানুন তো থাকেই।”
অনু বুঝে নেওয়ার ভঙ্গিতে ছোট্ট করে ‘হুম’ বললো।
তেজ নিজের রুমে ঢুকতেই দেখলো নির্ঝর এখনো উপুড় হয়ে পড়ে আছে বিছানাতে। নির্ঝরের মুখ দিয়ে চাপা স্বরে “আ উুঁ উুঁ” শব্দ বের হচ্ছে। তেজের মনটা কেমন খচখচ করে উঠলো নির্ঝরের অবস্থা দেখে। তেজ মনে মনে ভাবলো…..
—“ইসস, তখন বেচারার সাথে ওমন করাটা ঠিক হয় নি। ভালোই ব্য*থা পেয়েছে নিশ্চয়ই।”
নির্ঝরের প্রতি তেজের খানিকটা মায়া লাগলো সঙ্গে নিজের কাজের জন্য হালকা গিল্টি ফিলও হলো ওর। তেজ নির্ঝরের পাশে এসে দাঁড়িয়ে সে বললো…..
—“তোর শরীর-মন ফুরফুরা করে দেওয়ার মতো একটা নিউজ এনেছি। শুনবি?”
নির্ঝর সেই অবস্থাতেই ঘাড় খানিকটা ঘুরিয়ে তেজের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—“কি নিউজ ভাই?”
তেজ হেসে বললো…..
—“অনু এসেছে।”
এই কথা শোনামাত্র নির্ঝর ঝট করে উঠে বসলো। হঠাৎ নড়াচড়ায় ব্য*থার জায়গায় তীব্র যন্ত্র*ণা অনুভব হতেই নির্ঝর চিৎকার করে উঠলো…..
—“আহহহ! মা গো! আমার পশ্চাৎদেশ!”
তেজ সঙ্গে সঙ্গে ফিসফিস করে বললো…..
—“এই চুপ কর ব্যাডা! ড্রয়িংরুমেই আছে ওরা। এমন ষাঁ*ড়ের মতো চেঁচালে তা শুনে রুমেই চলে আসবে ওরা।”
নির্ঝর বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে নিজের পশ্চাৎদেশ চেপে ধরে কাঁ*তর গলায় বললো….
—“ভাই, আমার আর জীবনে বিয়ে করা হবে না। আমি তা বুঝে গিয়েছি।”
তেজ ভ্রু কুঁচকে অবাক স্বরে বললো…..
—“কেনো? তোর আবার কী হলো? ব্য*থা তো পিছনেই পেয়েছিস। সামনে পেলে না হয় ভাবনার বিষয় ছিলো।”
নির্ঝর চোখ-মুখ কুঁচকে হতাশ গলায় বললো….
—“তুমি আবার সামনে–পিছনে নিয়ে পড়ছো! আমি ভাবছি, অনুর কথা। সে আমার প্রথম ক্রাশ। ওর সামনে এই অবস্থায় গেলে নিশ্চিত যেটুকু ইজ্জত আমার বাকি আছে তাও থাকবে না। আর ই*জ্জতই যদি পুরো খুঁ*ইয়ে বসি, তাহলে প্রেম হবে কীভাবে? বিয়েটাই বা হবে কীভাবে বলো!”
তেজ বললো….
—”প্রেমেও পড়েছো, আবার সম্মানও চাও?
ভালোবেসেছো, আবার মর্যাদাও চাও?
তুমিও বড়ই নাদান নিজ্ঝরিয়া
বি*ষ খেয়েছো, আবার বাঁচতেও চাও?
আয় হায় আয় হায়!”
নির্ঝর নাক ছি*টকে তেজের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”খেয়ে দিলে তো গালিব মির্জার বলা ইমোশনে ভরপুর ডায়লগটাকে এই পরিস্থিতিতে বলে!”
তেজ শব্দ করে হাসতে শুরু করলো। নির্ঝর রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে যেতে বললো….
—”তোমাদের জন্য আমি এই মানুষের ভীরে টিকতে পারবো না খুব বেশিদিন। দেখবা কবে জানি সব ছেড়ে-ছুঁ*ড়ে নি*র্বা*সনে চলে যাই চিরতরের জন্য। তখন কাইন্দো বসে বসে আমার কথা ভেবে।”
পিছন থেকে তেজ হাসতে হাসতে বললো….
—”নির্বাসনে কেউ নিজ থেকে যায় না রে গ*র্ধভ। ওটাকে সন্নাসে যাওয়া বলে।”
নির্ঝর ড্রয়িংরুমে আসতেই সোফায় ইলমা আর অনুকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখে মনে মনে বললো….
—“তেজ ভাই তাহলে তখন মজা করে কথাটা বলে নি! ইলমার সাথে অনু সত্যিই এসে বসে আছে এখানে। ইয়া মাবুদ, আমার ইজ্জত রক্ষা করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন আপনার হাতেই।”
নির্ঝর স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা নিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে এসে বললো….
—“আপনারা কখন আসলেন?”
অনু চোখ তুলে একপলক নির্ঝরের দিকে তাকালো। ঠিক পরমুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। যেনো বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা মানা। ইলমা স্বাভাবিক কন্ঠে বললো…..
—“এই তো, একটু আগেই এসেছি।”
এই বলে ইলমা কিছুটা পেছনে হেলে নির্ঝরের আসার পথের দিকে তাকালো। তেজকে না দেখে খানিকটা বির*ক্তি মেশানো কণ্ঠে বললো…..
—“আপনাকে ডাকার জন্য আপনার ভাই ভেতরে গেলেন। এখন মনে হচ্ছে, ওনাকে ডাকতে আবার অন্য কাউকে পাঠাতে হবে।”
কিন্তু নির্ঝর এক দৃষ্টিতে অনুর দিকেই তাকিয়ে থাকায় ইলমার কথাগুলো যেনো কান দিয়ে ঢুকেও মস্তিষ্ককে স্পর্শ করতে পারলো না। ইলমা নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখে ঠোঁট চেপে নিঃশব্দে হাসলো। অতঃপর ইচ্ছাকৃতভাবে হালকা শুকনো কাশি দিলো ইলমা। কাশির শব্দে নির্ঝরের ঘোর কাটলো। নির্ঝর খানিকটা হকচকিয়ে ইলমার দিকে তাকিয়ে বললো….
—“আব-আপনি কিছু বলছিলেন আমাকে, ইলমা?”
পাশ থেকে অনু ভ্রু কুঁচকে নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বললো….
—“আপনার মধ্যে দেখি সমস্যার শেষ নেই।”
নির্ঝর অনুর কথার মানে ধরতে না পেরে হকচকিয়ে বললো…..
—“মানে! আ–আর কী সমস্যা দেখলেন আপনি আমার মধ্যে?”
পরক্ষণেই নিজের শরীরের নিম্নাংশের দিকে চোখ বুলিয়ে নির্ঝর মনে মনে বললো…..
—“না না, প্যান্ট তো ঠিকঠাক ভাবেই পড়ে এসেছি। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় পিছনের অবস্থা তো ওদের বোঝার কথাও না!”
অনু নির্বিকার কণ্ঠে বললো……
—“আপা তো পরিষ্কারভাবেই কথা বললেন, আর আপনি নাকি শুনতেই পান নি! আপনার যে কানে কম শোনার সমস্যা আছে, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। তার ওপর বুদ্ধির গতিও দেখছি বেশ ধীর। সহজ কথার মানে সহজে ধরতে পারেন না। পাল্টা প্রশ্ন করতেই হয়।”
অনুর কথা শুনে নির্ঝর একদম হা হয়ে গেলো। যেনো নির্ঝরের মন ওর মস্তিষ্কের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বলছে…..
‘এই মেয়ে এমন কেনো? সমস্যা ছাড়া কি আর কিছুই ওর চোখে পড়ে না!’
অনুর পাশ থেকে ইলমা এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। অতঃপর বললো…….
—“আর কতো সমস্যা খুঁজে বের করবে তুমি বেচারার মধ্যে, অনু! এবার ওকে মাফ করো।”
অনু ইলমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললো…..
—“যতোক্ষণ না পর্যন্ত ওনাকে কোনো বিশেষ ফকির বা ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে, আর আমি নিজ চোখে ওনার শরীর থেকে ঝেঁ*টিয়ে তেনাদের তাড়াতে দেখতে পারবো ততোক্ষণ পর্যন্ত আমার ওনার প্রতি বিশ্বাস জন্মাবে না, বুঝলে আপা!”
এই কথা শুনে নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে বুকের বাঁ-পাশের টি-শার্টের কাপড়টা মুঠো করে চেপে ধরলো নির্ঝর। অনুর কথাগুলো শুনে ওর বুকের ভেতরটা যেনো মো*চড় দিয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই তেজ রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালো। ইলমা, অনু ও নির্ঝর তিন জনের দৃষ্টিই একসাথে তেজের ওপর পড়লো। তবে সেই দৃষ্টির ভাষা একেক জনের কাছে একেক রকম অর্থ প্রকাশ করছে। নির্ঝরের চোখে ভেসে উঠেছে চাপা ক*ষ্ট আর অপ*মান, অনু নীরব দর্শকের মতো বসে আছে, আর ইলমার দৃষ্টির ভাষা হয়তো সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
তেজের পরণে নেভি-ব্লু রঙের একটা শার্ট রয়েছে। ওর ফর্সা, ফিট শরীরে রংটা অসম্ভব মানিয়েছে। সাথে অফ হোয়াইট একটা প্যন্ট পড়েছে। চুলগুলো হালকা এলোমেলো ভাবে কপালের উপর ছড়িয়ে আছে। পায়ে ডার্ক লেদারের জুতা আর হাতে ওয়াচ রয়েছে। তেজের এই রুচিশীল লুকটা যে কারোর নজর কাড়তে বাধ্য।
তেজ নির্ঝরের পাশে এসে দাঁড়াতেই নির্ঝর ওর দিকে খানিকটা হেলে ফিসফিসিয়ে বললো…..
—“পিছনের ওমন অবস্থা নিয়েও এমন হ্যান্ডসাম লুকে কোথাও যাওয়া কেবল তোমার দ্বারাই সম্ভব, ব্রো। আমি তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছি না।”
তেজ নির্ঝরের কাঁধে হাত রেখে জোরপূর্বক হেসে ফিসফিসিয়ে বললো…..
—“আমি আর ইলমা বাহিরে যাবো জন্যই তুই তোর ক্রাশের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাবি পারবি। তোর প্রেম প্রেম ভাব যেনো আরো প্রখর হয় তাই এতো সুন্দর একটা পথ তৈরি করে দিয়েছি। ফলস্বরূপ আমার জন্য দোয়া করবি তুই বুঝলি! যেনো ইলমার সামনে অন্তত আমার ইজ্জতের চাটনি না তৈরি হয়ে যায়।”
নির্ঝর প্রতিত্তুরে নিঃশব্দে হাসলো। তবে ওর সেই হাসিতে আনন্দের কোনো ছাপ ছিলো না। কারণ অনুর বাঁত নির্ঝরের সবক্ষেত্রেই সমস্যা খোঁজা। তাই অনুর সাথে কিছু সুন্দর সময় কাটানো কেবল জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার মতোই অসম্ভব। ইলমা বললো….
—”ভাইয়ে ভাইয়ে খোশগল্প করা শেষ হলে এখন যাওয়া যাক!”
তেজ নির্ঝরকে উদ্দেশ্য করে বললো….
—”অনুকে পুরো বাড়িটা সুন্দর মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাস৷ ও যেনো কোনোভাবেই তোর সাথে থাকতে নিজেকে অনিরাপদ মনে না করে।”
নির্ঝর ওর মাথার পিছনের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে হালকা হেসে বললো…..
—”কি যে বলো না তুমি ভাই! আমি কি ঐ টাইপের ছেলে নাকি যে মেয়েরা আমার সাথে থাকতে গেলে অনিরাপদ ফিল করবে!”
—”হুম, হুম সবই জানি। কেমন টাইপের ছেলে তুমি। নিজের গুণগান করতে হবে না আর৷”
ইলমা নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”অনুর খেয়াল রাখবেন নির্ঝর। সকালে জ্বর এসেছিলো প্রচন্ড। তাই শরীরটাও ওর দূর্বল কিছুটা। বাড়িটা ঘুরে দেখার সময় যদি শরীর খারাপ হয় ওর আমাদের জানাবেন।”
পরপরই ইলমা অনুর দিকে তাকিয়ে বললো…..
—”ভয়ের কিছু নেই। আমরা একটু পরই চলে আসবো।”
অনু স্মিত হেসে মাথা নাড়লো। অতঃপর তেজ ও ইলমা বাংলোর ভিতর থেকে বের হলো। তেজ পার্কিং সাইড থেকে ওর বাইকটা এনে ইলমার পাশে দাঁড় করাতেই ইলমা উঠে বসলো। তেজ বললো….
—”কোথায় যেতে চান ম্যম?”
—”কফিশপে, যেখানে কাজ নিয়ে দিয়েছিলেন আপনি আমাকে।”
—”আচ্ছা।”
তেজ বাইক স্টার্ট করলো।
ইলমা আর তেজ বেরিয়ে যেতেই ড্রয়িংরুমে হালকা নীরবতা নেমে এসেছিলো। অনু সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। নির্ঝরও দায়িত্বশীল ভঙ্গিতে কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বললো…..
—“চলুন তাহলে, আপনাকে বাড়িটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাই।”
অনু সংক্ষিপ্ত ভাবে জবাব দিলো…..
—“জ্বি।”
তেজ কফিশপের সামনে এসে বাইক থামাতেই ইলমা নেমে দাঁড়ালো। তেজ হেলমেটটা খুলতে খুলতে বললো….
—“আপনি ভেতরে যান, আমি বাইকটা পার্ক করে আসছি।”
ইলমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে কফিশপের কাঁচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো।
ভেতরে ঢুকতেই ইলমার চোখে পড়লো রিসিপশনে দাঁড়িয়ে কাজে ব্যস্ত থাকা সেই পুরোনো দায়িত্বশীল, গম্ভীর, একরোখা মুখভঙ্গি নেওয়া ছেলেটাকে যার অধিনে ১ম দিন সে কাজ করেছিলো। ইলমা বিরবির করে বললো…..
—“প্রায় আড়াই দিন, মানে পাক্কা ৬০ ঘণ্টা কেটে গেলো অথচ এই খাঁরু*শটার মুখভঙ্গীতে এক চুল পরিমাণও নরম ভাব দেখা যাচ্ছে না। জন্মের সময় কিছু কিছু মা-চাচীরা কেনো যে বাচ্চাদের মুখে মধু দিতে ভুলে যায়, বুঝি না! আজ আবার কী কী শুনতে হবে ওনার থেকে কে জানে!”
ইলমা ওর ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে রিসিপশনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বললো……
—“আসসালামু আলাইকুম স্যার, কেমন আছেন?”
ছেলেটি ইলমার দিকে না তাকিয়েই কফি বানানোর কাজে মনোযোগ রেখে গম্ভীর স্বরে বললো…..
—“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আল্লাহর মাল তিনি ভালো রাখলেও আলহামদুলিল্লাহ, ভালো না রাখলেও আলহামদুলিল্লাহ। আর আমি আপনার শিক্ষক নই। তাই আমাকে স্যার ডাকতে হবে না। আমার নাম নাহিদ। ডাকার হলে নাম ধরেই ডাকবেন।”
ইলমা নাক ছিঁ*টকে ফিসফিসিয়ে বললো…..
—“সম্মানের যোগ্য কি আর সবাই হয়! আমিও একটা বে*ক্কল। জেনেশুনেই অপাত্রে সম্মান ঢালতে এসেছিলাম। জানতামই, এই ব্যাটা আস্ত একটা খাঁ*রুশ।”
নাহিদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো…..
—“ছুটি কাটানো শেষ? আজ থেকে কাজ শুরু করতে চান?”
ইলমা মনে মনে ভাবলো…
—“আগে তেজের সাথে কথা বলা দরকার। এখনই যদি বলি কাজ শুরু করবো, তাহলে এখন থেকেই কাজের পাহাড় চাপিয়ে দেবে আমার উপর এই খাঁ*রুশ নাহিদা আপা। থুক্কু! নাহিদ্দা। না না, নাহিদ হবে।”
নাহিদ ওর হাতের বাম পাশে রাখা বেলটা টিপে বললো…..
—“কাস্টমার নাম্বার পনেরো, অর্ডার রেডি। নিয়ে যান।”
ইলমা সংক্ষিপ্তভাবে বললো…
—“একটু পর থেকে কাজ শুরু করবো।”
নাহিদ আর কিছু বললো না। সেই সময় কফিশপের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো তেজ। রিসিপশনের সামনে ইলমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তেজের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই কাউন্টারের পেছনে থাকা নাহিদের ওপর পড়লো। ছেলেটা যে যথেষ্ট সুদর্শন আর রুচিশীল তা এক ঝলক দেখলেই বোঝা সম্ভব।
তেজ বিড়বিড়িয়ে বললো…..
—“যেদিন ইলমাকে কাজ নিয়ে দিতে এসেছিলাম, সেদিন তো এই ছেলেটাকে দেখি নি। তার মানে এখন থেকে ইলমা এই ছেলের সাথেই কাজ করবে! আগুন আর ঘি একসাথে থাকবে! ও আল্লাহ! এ কী সর্ব*নাশা কাণ্ড!”
পরক্ষণেই ইলমা সামনের দিকে ঘুরতেই দরজার সামনে তেজকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ওদের দিকেই তাকিয়ে থাকতে দেখে এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজেই ওর দিকে এগিয়ে গেলো।
অনু আর নির্ঝর দু’জন পাশাপাশি হাঁটছে। দোতলার বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রত্যেকটা রুমের দরজা খুলে ভিতরটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে নির্ঝর অনুকে। পিছনের ব্য*থা ও জ্ব*লা ভাবের কারণে নির্ঝরের হাঁটার ধরন কখনো ধীর হচ্ছে তো কখনো সে হঠাৎ থেমে যাচ্ছে কিছুসময়ের জন্য, আবার কখনো অদ্ভুত ভাবে শরীরটা একদিকে কাঁত করছে সে। অনু প্রথমে প্রথমে বিষয়টা লক্ষ্য করলেও কিছু বলে নি নির্ঝরকে। কিন্তু কয়েক মিনিট পর অনু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নির্ঝরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে ভ্রু কুঁচকে বললো……
না চাইলেও তুমি শুধু আমারই পর্ব ২৮ (২)
—“আপনি ঠিক আছেন তো?”
নির্ঝর সঙ্গে সঙ্গে ওর ঠোঁটে হাসি টেনে বললো…..
—“জি, জি। একদম ঠিক আছি আমি।”
আরও কয়েক পা হাঁটার পর অনু আবারও বললো….
—“কিন্তু আপনার হাঁটার ধরণটা অনেকক্ষণ থেকেই অস্বাভাবিক লাগছে আমার কাছে।”
নির্ঝর এবারও জোর পূর্বক হেসে বললো….
—“না না, আমি তো ঠিক ভাবেই হাঁটছি। আপনি ভুল দেখছেন হয়তো।”
অনু এবার থেমে গেলো।
