Home নির্লজ্জ ভালোবাসা নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৫

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৫

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৫
সুমি চোধুরী

কথাটা বলেই তুরা উঠে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু সাথে সাথেই একটি মাত্র কথায় তুরা থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
“তুই খাইয়ে দে?”
রৌদ্রের কথা শুনে তুরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। রৌদ্র কেমন এক কোমল, অথচ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি দেখে তুরা আবারো তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিলো। তুরা কিছুটা বিরক্ত ও অস্বস্তি নিয়ে ভীত কণ্ঠে বলল।

“আমি পারবো না। আপনি খান তো! এমনিতেই আপনার রুমে আছি, বাড়ির কেউ জেগে উঠে দেখে ফেললে খারাপ মনে করবে। আমি গেলাম, আপনি খেয়ে নিন।”
কথাটা বলেই তুরা আবারো যেতে উদ্যত হলো। সাথে সাথেই রৌদ্র আবারো আহ্বান যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে বলল।
“খাইয়ে দে না! খুব ক্ষিদে পেয়েছে। আমার তো হাত কাটা, আমি নিজের হাতে খেতে পারবো না?”
রৌদ্রের কথা শুনে তুরা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে গেলো কী করবে এখন! তুরাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুনরায় আবার রৌদ্র করুণ স্বরে আর্দ্র,কাতর স্বরে বলল।
“খাইয়ে দে না! খুব ক্ষিদে পেয়েছে?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রৌদ্রের এই করুণ স্বর শুনে তুরা হালকা কেঁপে উঠলো। মুহূর্তে সে রৌদ্রের দিকে তাকালো। রৌদ্র এখনো সেই গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তুরার আবার চোখ গেল রৌদ্রের হাতের দিকে। ডান হাতটাই ব্যান্ডেজ করা, সত্যি সত্যিই সে নিজের হাতে খেতে পারবে না। তুরা এসব ভেবে আবারো বড় করে একটি লম্বা শ্বাস নিল।
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে এসে। তারপর খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে ভাত একটু মেখে রৌদ্রের মুখের সামনে ধরলো। রৌদ্র যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিলো,সে সাথে সাথে ‘হা’ করে মুখে নিয়ে নিলো।রৌদ্র একদম ছোট বাচ্চাদের মতো খেতে থাকলো। তুরা বুঝতে পারলো, রৌদ্রের সত্যি সত্যিই খুব ক্ষিদে পেয়েছে। রৌদ্র খাওয়ার ফাঁকে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।

“তুই খেয়েছিস?”
তুরা রৌদ্রের কথা শুনে না-সূচক মাথা নাড়লো। রৌদ্র সাথে সাথে সামান্য আবদার মিশিয়ে বলল।
“তাহলে তুইও খা!”
তুরা নিশ্চুপ স্বরে বলল।
“না,আপনি খান। আমার ক্ষিদে পায়নি।”
রৌদ্র হুমকির সুরে, খেলার ছলে বলল।
“চুপ কর! তুই খা বলছি, নাহলে তোর হাতে কামড় দেব?।”
রৌদ্রের এমন কথা শুনে তুরা নিজের অজান্তেই হালকা হেসে উঠলো। সেই হাসি তার মুখে অনেক দিন পর দেখা গেল। এরপর সে নিজেও খেতে লাগলো।তুরা যখন রৌদ্রের মুখে ভাত তুলে দিলো, ঠিক তখনই রৌদ্র আলতো করে তুরার হাতে কামড় দিলো। তুরা সামান্য ব্যথায় ফুঁফিয়ে উঠলো, অভিযোগের সুরে বলল।

“আউচ! এইটা কী করলেন ভাইয়া?”।
রৌদ্র মিষ্টি হাসি দিয়ে, দুষ্টুমির স্বরে বলল
“আদর করেছি।”
তুরা অস্বস্তিতে মুখ ফিরিয়ে বলল।
“বাজে কথা!”
রৌদ্র তুরার কথায় তাল দিলো।
“হুম,একদম।”
তুরা অজান্তেই রৌদ্রের সাথে আড্ডায় জমে গেল। রৌদ্র তুরাকে অনেক মজার মজার কথা বলে হাসাতে লাগলো আর দুজনে একসাথে খেতে থাকলো।দুজনেই কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করলো। তুরা রৌদ্রকে হাতের ব্যথার ট্যাবলেট আর জ্বরের ট্যাবলেট দুটোই খাইয়ে দিলো। তুরা যখন সব কাজ শেষ করে চলে আসতে উদ্যত হলো, হঠাৎ রৌদ্র শান্ত, কৌতূহলী কণ্ঠে বলল

“তুরা, ছাদে যাবি?”
তুরা রৌদ্রের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। এত রাতে ছাদে, তাও রৌদ্রের সাথে!তুরা বিস্ময় ও সামান্য বিরক্তি নিয়ে বলল।
“আপনি পাগল? এত রাতে ছাদে কেন যাব?”
রৌদ্র মিনতির সুরে বলল।
“আয় না,যাই। একটু রাতের ঠান্ডাটা অনুভব করে আসি?”
তুরা দৃঢ় স্বরে, দ্রুত পরিস্থিতি থেকে বের হতে চেয়ে বলল
“আপনার শরীর খারাপ, শুয়ে থাকুন। আমার ঘুম আসছে, ঘুমাতে গেলাম। গুড নাইট!”
আচমকা এই কথা বলে তুরা যেতে নিলে, রৌদ্র সাথে সাথে তুরাকে পাঁজা কোলে তুলে ফেললো।রৌদ্র চোখে গভীর আবেগ নিয়ে, চাপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
“তোকে পাবো না জানি, তবে তোর সাথে একটু সময় কাটানো তো অপরাধ হবে না। একটু সময় কাটিয়ে কিছু অনুভূতি ভাগ করাই যায়।”

রৌদ্রের এমন কাজে তুরা যেন এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। বুকের ভিতর হার্টবিট দ্রুত ধড়ফড় করতে লাগলো। মুখ থেকে যেন কথা বলার ভাষাও হারিয়ে ফেললো।রৌদ্র তুরাকে কোলেই নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে চলে এলো। ছাদে হালকা ঠান্ডা বাতাসে দুজনের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। রৌদ্র তুরাকে আলতো করে গ্রিলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো। দুজনেই নীরবতায় পাশাপাশি দাঁড়ালো,রৌদ্র শান্ত,আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলল।
“সরি, তুরা, তোকে এইভাবে নিয়ে আসার জন্য। আসলে এই মনটা চাইলো তোর সাথে একটু সময় কাটাতে। বেহায়া মনটা কিছুতেই শান্ত হতে পারছিলো না, তাই এইভাবে নিয়ে এসে পড়লাম।”
রৌদ্রের কথায় ছিল হাজারো বেদনা তুরাকে না পাওয়ার কষ্ট, আর আসন্ন বিচ্ছেদের যন্ত্রণা। তুরা রৌদ্রের কথা শুনে কিছু বলল না, শুধু চুপ করে সেই গভীর অন্ধকারের মাঝেই রৌদ্রের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে ছিল কৌতূহল এবং এক অব্যক্ত সহানুভূতি।
রৌদ্র আবারো গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আকাশের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠস্বর করুণ করে বলতে শুরু করলো তার আগের কিছু ঘটনা।

“তুরা, জানিস? আমার জীবনটা এমন ছিল না। আমার জীবনটাও একজন সাধারণ ছেলের মতোই ছিল। ড্যাড যখন আমাকে পড়াশোনা করার জন্য বাইরের দেশে পাঠালেন, সেখানে গিয়ে আমার অনেকগুলো বন্ধু হয়। আর একটা মেয়ে বন্ধুও হয়, এক কথায় সে আমার খুব কাছের বেস্ট ফ্রেন্ড হয়। সে ছিল বিদেশী, নাম ছিল ফুওয়া (Fuwah)। সে আমার সুখে দুঃখে সবসময় পাশে থাকতো। আমার মন খারাপ থাকলে কখনো নাচত, কখনো আলতু-ফালতু কথা বলতো মানে আমাকে বিরক্ত করে হলেও মন ভালো করতো। আমিও দীরে দীরে তার প্রতি বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে আসক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। দুজনেই মারামারি,ঝগড়াঝাঁটি করতাম, আবার দুজনেই কান ধরে ‘সরি’ বলতাম। কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারতাম না।”
রৌদ্র যেন সেই পুরনো দিনের স্মৃতিতে ডুব দিলো।

“একদিন আমাদের বন্ধুরা সবাই মিলে পার্টি দেয়। আমি আর ফুওয়া সেই পার্টিতে যাই। সেখানে অনেক ছেলে, অনেক মেয়ে ছিল। আমি আর ফুওয়া অনেকক্ষণ ডান্স করি। তারপর আমি আমার বন্ধুদের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমি বন্ধুদের সাথে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে আমার ফুওয়ার কথা মাথায়ই ছিল না। পার্টি শেষে মানুষ যখন আস্তে আস্তে চলে যেতে শুরু করলো, তখন আমি দেখি ফুওয়া কোথাও নেই। আমি পুরো পার্টির হল খুঁজলাম, কিন্তু ফুওয়া কোথাও নেই। আমার বন্ধুরাও খুঁজতে শুরু করলো, কিন্তু খুঁজে পেল না। আমি ফুওয়ার নাম্বারে কল দিলাম, অনেকবার রিং হলো, কিন্তু রিসিভ হলো না। আমরা পুরো আশপাশ তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলাম।খোঁজার সময় হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠল। আমি দেখি, ফুওয়া কল দিয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি রিসিভ করলাম। ফুওয়া সাথে সাথে বলল।

“রৌদ্র, রেটে মিছ! ইশ বিন ইম ভাল্ড দা হিনটেন। আইন পার য়ুংস ফেরফোলগেন মিছ মিট শ্মুৎসিগেন বেমেরকুঙ্গেন। ডি য়ুংস ভেয়ডেন মাইন এয়া হাহমেন! রেটে মিছ!”
(রৌদ্র,আমাকে বাঁচা! আমি পেছনের জঙ্গলের দিকে আছি! কিছু ছেলে নোংরা মন্তব্য করতে করতে আমাকে তাড়া করছে। ওরা আমার ইজ্জত কেড়ে নেবে! বাঁচা)

” সেই করুণ আর্তনাদ শেষ হতেই কলের লাইনটা কেটে গেল। আমি আবার কল দিলাম, এইবার ফোন বন্ধ পেলাম। আমার বুকের ভেতর যেন ঝড় বইতে শুরু করলো, মাথা একদম নষ্ট হয়ে যেতে লাগলো। আমি আমার সব বন্ধুদের বিষয়টা বললাম, আর আমরা তাড়াতাড়ি সেই জঙ্গলের দিকে দৌড় শুরু করলাম।
তখন রাত বারোটা (১২:০০টা)। আমরা সবাই ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ফুওয়াকে গলা ছেড়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলাম। কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না। পুরো জঙ্গল আমরা খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে গিয়েছি, কিন্তু তাকে পেলাম না। আমার যেন কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।

“হঠাৎ এমন সময় আমরা কারও আর্তনাদ চিৎকার শুনতে পেলাম। আমরা সেই চিৎকার অনুসরণ করে সেই অনুযায়ী দৌড় শুরু করলাম। আর যেতেই দেখলাম, সেখানে ভয়াবহ দৃশ্য! অনেকগুলো ছেলে ফুওয়ার সাথে নোংরা কাজ করছে। বিশ্বাস করবি না, ফুওয়া একদম নগ্ন অবস্থায় ছিল। চার-পাঁচজন ছেলে তার হাত-মুখ চেপে ধরেছে, আর একজন সেই ঘৃণ্য কাজটা করছে। আমি এই দৃশ্য দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।মুহূর্তে আমার রাগে সারা শরীর জ্বলে উঠলো। আমি গলা ছেড়ে দিলাম এক ভয়ঙ্কর চিৎকার! আমার চিৎকারে ছেলেগুলো যে যেদিকে পারলো, দৌড় শুরু করলো। আমার বন্ধুগুলোও ছেলেগুলোকে ধরার জন্য পিছু ছুটলো। আমিও রাগে দৌড়ানোর জন্য পিছু ছুটতে লাগবো,এমন সময় ফুওয়া আমাকে ডাকলো।”

“রৌদ্র..?
” আমি ফুওয়ার কথায় তাড়াতাড়ি তার কাছে গেলাম। তার সারা শরীরে একটুকরো পোশাকও ছিল না, আর শরীরে হিংস্র কামড়ের দাগ।যেন কোনো প*শু তাকে ছিঁড়ে খেয়েছে। আমি ফুওয়ার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। আমার চোখ থেকে অসহায়ত্বের পানি গড়িয়ে আসলো। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এমনভাবে একটা মানুষের সাথে খারাপ কাজ করতে পারে! আমি তাড়াতাড়ি নিজের শার্ট খুলে ফুওয়াকে পরিয়ে দিলাম।ফুওয়া শার্ট পরে হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে বলল। তার চোখ তখন ক্রমশ নিষ্প্রাণ হয়ে আসে।”

“রৌদ্র, ইশ হবে দিছ জেয়ার গেলীপ্ট। ইশ কন্ট দিয় ডী ভাহহাইট নী জাগেন, ভাইল ইশ আইনে আউসল্যান্ডেরিন ভার উন্ড দু মিছ ভিয়েল্লাইশ্ট নিশট moggen würdehst। ইশ হাটে আংস্ট, দাস দু উনজের বেস্টে ফ্রয়েন্ডশাফ্ট বেয়েন্ডেন würdest। আবা হয়াটে কান ইশ এ্যাস নিশ্ট উনগেজা গত লাসেন, ভাইল মাইনে ছাইট গেকমেন ইস্ত। ভেন ইশ এ্যাস নিশ্ট জাগে, ভির্দ্ এ্যাস মাইন গ্রোসটে বেডাওয়েরন জায়ন। রৌদ্র, ইশ লিবে দিছ ভির্কলিশ জেয়ার। আই লাভ ইউ সো মাচ, রৌদ্র।

(রৌদ্র, আমি তোকে অনেক ভালোবাসতাম। এই সত্যি কথাটা কখনো তোকে বলতে পারিনি। কারণ আমি বিদেশী, তুই হয়তো আমাকে পছন্দ করবি না, তাই কখনো বলার সাহস হয়ে ওঠেনি। তুই যদি আমার সাথে বেস্ট ফ্রেন্ডের সম্পর্ক নষ্ট করে দিস, এই ভয়ে। কিন্তু আজ না বলে থাকতে পারলাম না, কারণ আমার যাওয়ার সময় এসে গেছে। যদি না বলে যাই, তাহলে আমার এইটাই আফসোস থেকে যাবে। রৌদ্র, আমি তোকে সত্যিই অনেক ভালোবাসি, আই লাভ ইউ সো মাচ, রৌদ্র)

“আমি ফুওয়ার কথা শুনে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমার চোখ থেকে অসহায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অতি কষ্টে আমি কথা বলার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলাম। ফুওয়া তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার ঠিক আগে, তার নিষ্প্রাণ চোখ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো।
“রৌদ্র, উম্মার্ম মিছ বিত্টে এইনমাল। ইশ ম্যশটে দাইনে ভ্যারমে ফ্যূহলেন, বিভোর ইশ গেহে। বিটে হা’ল্ট মিছ।”
(রৌদ্র আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবি? যাওয়ার আগে আমি তোর উষ্ণতাটা একটু পেতে চাই প্লিজ ধর?)
” আমি ফুওয়ার কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। ফুওয়াও তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আমাকে ধরল। আমি ফুওয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে নীরবে কাঁদছিলাম। আমার চোখ থেকে ঝরে পড়া জল ফুওয়ার শার্ট ভিজিয়ে দিচ্ছিলো।”

“বেশ কিছুক্ষণ পর আমি বুঝলাম, ফুওয়ার হাত কেমন যেন আলগা হয়ে এসেছে, তার শরীরের উষ্ণতা কমছে। আমি সাথে সাথে ফুওয়াকে ছাড়িয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সে যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি অনেকবার ফুওয়াকে ডাকলাম, কিন্তু ফুওয়া কোনো কথা বলল না। আমি তার নিঃশ্বাস পরীক্ষা করলাম, দেখলাম নিশ্বাস আর চলছে না।আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না ফুওয়া যে আর এই পৃথিবীতে নেই।”
“আমি ফুওয়াকে আবারো জড়িয়ে ধরলাম, আর এবার গলা ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলাম। আমার যেন কলিজাটা কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গেল। সেই রাতে সেই জঙ্গলে আমার আর্তনাদ আর কান্নার শব্দে যেন পুরো প্রকৃতিও স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো।”

” ফুওয়া চলে যাওয়ার পর আমার জীবনটাও পাল্টে গেল। আমি পড়াশোনায় মন বসাতে পারতাম না, হাসতাম না, খেতাম না আমার জীবনটাই যেন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ঘুমের মাঝেও আমি ফুওয়ার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগের কথাগুলো ভেবে কেঁপে উঠতাম। আমার ফুওয়াকে খুব মনে পড়তো। আমার বুক ফেটে আসতো। জীবনটাই যেন আমার শেষ হয়ে গিয়েছে।

“ফুওয়ার বিরুদ্ধে সেই ছেলেদের নামে কেস করা হয়েছিল। আমরা বন্ধুরাও মিলে অনেক চেষ্টা করেছি সেই ছেলেদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ওই দেশটাই ছিল টাকার খেলা। টাকাই যেন ওই দেশের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস ছিলো, যা ফুওয়ার মৃত্যুর অপরাধীদের বাঁচিয়ে দিলো। আমরা কিছুই করতে পারলাম না।”

“এইভাবেই আমার দিনগুলো কাটতে লাগলো। আমি পুরোই একদম চুপচাপ, নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। একদিন হঠাৎ আমার অনেক জেদ হলো। আমি সেই তীব্র জেদে নিজেকে নিজেই বলেছিলাম একটা নারীর সম্মানের থেকে এই দেশে মূল্যবান টাকাই যদি বেশি হয়, ঠিক আছে! তাহলে এই টাকা দিয়েই এই দেশের নারীদের আমি সম্মান নষ্ট করবো। দেখব, এই দেশ কত খারাপের দিকে যেতে পারে।সেদিন আমি অতি কষ্টে খারাপের দিকে চলে গেলাম।”
“আমি ভালো করে পড়াশোনা করে ওই দেশেই ব্যবসা শুরু করলাম। খুব অল্প সময়েই আমি সাফল্য পেলাম এবং দেখতে দেখতে নামকরা বড় বিজনেসম্যান হয়ে গেলাম। অর্থাৎ, এত বছর সেখানে থাকাতে ওই দেশের নাগরিকও হয়ে গেলাম।তারপর থেকে আমি টাকা দিয়ে যে মেয়েকে পেতাম, এক রাতের জন্য বিছানায় নিয়ে যেতাম। শুধু এক রাত। শুধু তাই নয়, যে ছেলেগুলো আমার ফুওয়ার জীবন শেষ করেছে, তাদেরও বোন ছিল। আমি খুঁজে বের করে সবগুলোকেই রিপ (ধর্ষণ) করেছি। অবশ্য কেউ কেউ টাকায় রাজি হয়েছিল, আর যারা হয়নি, তাদের জোর করেই করেছি। আর টাকা দিয়ে কেস উড়িয়ে দিয়েছি।

তারপর থেকে আমি ধীরে ধীরে খারাপ হয়ে গেলাম। নারীও যেন আমার কাছে এক রাতের নেশা হয়ে গেল। আর আমি ওই দেশে অনেকের কাছে যেমন নামকরাও ছিলাম, তেমন প্লে বয় নামেও পরিচিত ছিলাম।আমি ফুওয়া চলে যাওয়ার কষ্ট মানতে পারিনি। বিশ্বাস কর তুরা, এখনো আমার চোখে সেই নিষ্পাপ মেয়েটার চেহারা ভেসে ওঠে আর আমার যেন কলিজাটা ছিঁড়ে যায়।

কথাটা শেষ করেই রৌদ্র আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। সে ছাদের ঠান্ডা ফ্লোরে বসে পড়লো আর হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। রৌদ্রের সেই কান্না যেন তার ভেতরের সমস্ত চাপা কষ্ট আর অপরাধবোধ বের করে আনছে।রৌদ্রের কষ্ট দেখে তুরার চোখ থেকেও টপটপ করে পানি ঝরলো। কথায় আছে, অতি কষ্টে কেউ চুপ হয়ে যায়, কেউ পাগল হয়ে যায়, আবার কেউ খারাপ হয়ে যায় যেমনটা রৌদ্রের ক্ষেত্রে হয়েছে। রৌদ্রও অতি কষ্টে ও বেদনায় সেই খারাপের দিকে চলে গিয়েছে।

তুরা দ্রুত নিজের চোখের পানি মুছে, রৌদ্রের পাশে ঝুঁকে বসে মৃদু সহানুভূতির স্বরে বলল।
“সত্যিই আপনার জীবনে অনেক কষ্টের অতীত আছে। কিন্তু এইটা কি ঠিক হলো? আপনি এই ভুলের জন্য কিছু নিষ্পাপ মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলেন?”
রৌদ্র কাঁদতে কাঁদতে, স্বর ভেঙে যন্ত্রণা ও অনুশোচনা নিয়ে উওর দিলো।
“আমি চাইনি করতে! শুধুমাত্র ওই দেশের ওপর আমার জেদ চেপে বসেছিল। আমার ফুওয়ার কথা মনে পড়লেই ওই দেশের মানুষের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মাতো। তাই আমি নিজের রাগ আর দুঃখে ভুলেই গিয়েছিলাম কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক?”

রৌদ্র আর্তনাদ করে কাঁদতেই থাকলো। এই প্রথম তুরা রৌদ্রকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখলো। তুরার বুকটাও যেন ফেটে যাচ্ছে। সে নিজেও জানে না কেন, কিন্তু রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরে তার বলতে ইচ্ছে করছে কাঁদবেন না, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে এসব বলে শান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে করছে।তুরার ভাবনার মাঝেই রৌদ্র হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। সে হাত দিয়ে দ্রুত চোখের জল মুছে নিলো। তার মুখে এবার কষ্টের বদলে এক ধরণের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ফুটে উঠল।রৌদ্র দম আটকানো, ভারী কণ্ঠে বলল

“তুই চিন্তা করিস না তুরা। আমি তোর লাইফে আসবো না। আর কখনো পাগলামি করবো না,আমার মতো মানুষের মুখ ও যাতে তোকে দেখতে না হয় তাই অনেজ দূরে চলে যাবো। আর তুরা তুই এই পাপী রৌদ্র কে ক্ষমা করে দিস। তুই আমার সেই ভুলের চোখ খুলে দিয়েছিস আমি তোর প্রতি সত্যি অনেক কৃতজ্ঞতা। আমি দোয়া করি তুই সবসময় ভালো থাক।”
কথাটা বলেই রৌদ্র বড় বড় পা ফেলে ছাদ থেকে দ্রুত চলে গেলো। তুরা সেখানে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু বুকের ভিতর সে এক অজানা টান অনুভব করলো, যা ক্ষণিকের নীরবতাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

পরের দিন সকালে তুরার ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠেই সে বিছানার পাশে একটি চিরকুট দেখতে পেল। চিরকুট দেখে তুরা অবাক হয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা হাতে চিরকুটটা তুলে নিয়ে সে খুলল এবং পড়তে শুরু করল:
“আমি যদি থাকি, তাহলে আমার মতো জীবন সঙ্গী তোকে পেতে হবে। আমি তোকে অন্য কারও হতে দিতে পারব না। কিন্তু আমি চাই না, তুই আমার মতো জীবন সঙ্গী হিসেবে পাস। তাই আমি, আমি, আমি, ফিরে গেলাম সুইজারল্যান্ড।”

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৪

চিরকুটটা তুরার হাত থেকে আলতো করে ফ্লোরে পড়ে গেল। তুরার আর বুঝতে বাকি রইলো না, রৌদ্রই এই চিরকুটটি রেখে গেছে। হঠাৎ নিচ থেকে রৌশনি খানের কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। তুরা দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে এক প্রকার দৌড়েই নিচে এলো।আর নিচে এসেই তুরা জানতে পারলো রৌদ্র চলে গেছে। কাল রাতেই ফ্লাইট কেটে সে চলে গেছে!তুরার শরীর যেন এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। তার কলিজাটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো। রৌদ্রের চলে যাওয়ার খবর যেন তার ভেতরে থাকা অজানা টানটিকে মুহূর্তে এক তীব্র যন্ত্রণায় পরিণত করলো।

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৬