Home নিষিদ্ধ রংমহল নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৯

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৯

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৯
আতিয়া আদিবা

তাইমুর গজনবী ঝোড়ো গতিতে কক্ষ ত্যাগ করলেন। তার পদশব্দে গজনবী মহল যেন জাগ্রত হল।
হেমাঙ্গিনীর কক্ষের জানালার পর্দাগুলো প্রাতঃকালীন ঝোড়ো হাওয়ায় অবাধ্য হয়ে পতপত করে উড়ছিল। হেমাঙ্গিনী লজ্জামিশ্রিত নয়নে দাঁড়িয়ে রইল একাকী। হৃদস্পন্দন তখনও ঢাকের শব্দের ন্যায় বেজে চলেছে ঢুপ ঢুপ।
​তাইমুর অন্দরমহল পেরিয়ে গজনবী মহলের বৈঠকখানায় প্রবেশ করলেন। বিশাল খিলানগুলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীরা মাথা নিচু করে তাকে কুর্নিশ জানাল। কিন্তু কারো চোখেই আজ স্বাভাবিক স্থিরতা লক্ষণীয় নয়।
কক্ষের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে সিকান্দার গজনবী অত্যন্ত অস্থিরচিত্তে পায়চারি করছেন। তার হাতে একটি দীর্ঘ চর্মপত্র। যার ওপরে ব্রিটিশ রাজকীয় মোহর দৃশ্যমান। একখণ্ড লাল গালা দিয়ে সিল করা।
​তাইমুর পিতার সন্নিকটে গিয়ে স্থির হলেন। তিনি অত্যন্ত সংযত স্বরে শুধালেন,

​- পিতা, আপনার ললাটে বিষাদের রেখা কেন? শোবহান মির্জা জানালেন ব্রিটিশ রেসিডেন্স হতে কোনো এক পরোয়ানা এসেছে? কী সেই বার্তা, যা আপনাকে এতটা বিচলিত করে তুলেছে?
​সিকান্দার গজনবী পায়চারি থামালেন। তার রক্তবর্ণ চোখদুটো পুত্রের ওপর নিবদ্ধ হলো। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের চর্মপত্রটি তাইমুরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
​- শকুনের নজর যখন কোনো সমৃদ্ধ শিকারের ওপর পড়ে, তখন সে কেবল শিকারের অপেক্ষায় থাকে না বরং শিকারকে নিঃস্ব করার প্রার্থনায় লিপ্ত হয়। নানাবিধ আয়োজন করে। ব্রিটিশ রেসিডেন্টের পক্ষ হতে যে পরোয়ানা এসেছে,
এটি কোনো সাধারণ পত্র নয়, তাইমুর। এটি একটি সুনিপুণ চক্রান্ত। গজনবী বংশের সার্বভৌমত্বের ওপর এক সুপরিকল্পিত কুঠারাঘাত।
​তাইমুর অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে পত্রটি গ্রহণ করলেন। কাগজের খসখসে শব্দে কক্ষের নিস্তব্ধতা মুহুর্তেই খানখান হয়ে গেল।
পত্রটি পড়ার সাথে সাথে তাইমুরের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তার চোখের মণি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তিনি প্রতিটি অক্ষর যেন গোগ্রাসে গিলছিলেন। পড়া শেষ করা মাত্রই বিস্মিত কণ্ঠে শুধালেন,

​- বকেয়া রাজস্ব? আশি হাজার স্বর্ণমুদ্রা? এর মানে কি, পিতা?
সিকান্দার গজনবী দৃঢ়ভাবে বললেন,
– বিগত পাঁচ বছরের প্রতিটি তাম্রমুদ্রার হিসাব আমাদের তোখানায় সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি কিস্তিতে খাজনা আদায় করে রেসিডেন্সির কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
তাইমুর কণ্ঠের সেই বিস্ময়কর ভাব ধরে রেখে পুনরায় শুধালেন,
– তবে আজ কোন যাদুমন্ত্রে এই আকাশচুম্বী বকেয়া সৃষ্টি হলো?
​সিকান্দার গজনবী ধীরপদে তার কারুকার্যখচিত আসন্দিতে বসলেন। ভারাক্রান্ত স্বরে বললেন,
– মিথ্যে অপবাদ দেওয়া তাদের পুরনো অভ্যাস, তাইমুর। তারা দাবি করেছে, বিগত কয়েক বছরে আমরা নাকি হিসেবে কারচুপি করে শস্যের পরিমাণ কম দেখিয়েছি। আর সেই অনাদায়ী খাজনার ওপর তারা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ চাপিয়েছে। এই অর্থ আগামী পূর্ণিমা তিথির মধ্যে যদি শোধ না হয়, তবে আইন অনুযায়ী গজনবী এস্টেট নিলামে উঠবে।
​তাইমুর ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি পত্রটি মুচড়ে ধরে বললেন,

– আমি বুঝতে পারছি। এর পেছনে কাদের হাত রয়েছে। নীলকুঠির প্রধান প্রতিনিধি মিস্টার রবিনসন। সাথে রামকমল রায়ের কুবুদ্ধি তো বটেই। তাদের নীল চাষের প্রস্তাবের কথা মনে নেই, পিতা? আপনি সেদিন তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এটি তারই প্রতিশোধ।
​সিকান্দার গজনবী তামাকের নলটি হাতে নিলেন ঠিকই, তবে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন না।
তিনি বললেন,
​- বিষয়টি আমার বোধগম্য হয়েছে পরোয়ানার শেষের দিকে উল্লেখিত ওই গোপন শর্ত দেখা মাত্রই।
যদি আমরা নীলকরদের সাথে সেই ‘দাদন’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করি এবং প্রজাদের ধানের জমিতে নীল চাষ বাধ্যতামূলক করি, তবে এই পুরো আশি হাজার স্বর্ণমুদ্রার ঋণ তারা মাফ করে দেবে। অর্থাৎ, হয় নিজের প্রজাদের রক্ত চুষে নীল চাষ করো নতুবা জমিদারি হারাতে হবে।
​তাইমুরের কুঞ্চিত ভ্রুঁ যুগল নিয়ে বললেন,

​- যে জমিতে একবার নীলের বিষ ঢোকে, সেখানে সাত বছর অন্য কোনো শস্য ফলে না। আমার প্রজারা কি শেষে মাটি খেয়ে বাঁচবে? ব্রিটিশদের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। পিতা, গজনবী মহলের প্রতিটি প্রস্তরখণ্ড সাক্ষী যে আমাদের পূর্বপুরুষরা কখনো বিদেশি শক্তির কাছে নতজানু হননি! কলকাতায় গিয়ে একবার বড়লাটের নিকট নালিশ করলে হয় না?
​সিকান্দার গজনবী ম্লান হেসে বললেন,
​- বড়লাট? তিনি তো স্বয়ং নীলকরদের পৃষ্ঠপোষক।
তাইমুর হতাশা মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
​ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষের বিশাল কপাট দুটো প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল। বিশৃঙ্খল অবস্থায় ভেতরে প্রবেশ করলেন দাউদ। তিনি প্রায় চিৎকার করে বললেন,
– হুজুর! রক্ষা করুন! সর্বনাশ হয়ে গেছে! গজনবী এস্টেটের প্রজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে! হাজার হাজার কৃষক লাঠিসোঁটা নিয়ে এদিকে ধাবিত হচ্ছে। তারা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত।
​তাইমুর কন্ঠস্বরে বজ্রের নিনাদ শোনা গেল,

​- বিদ্রোহ? আমার প্রজারা বিদ্রোহ করেছে? কিসের ভিত্তিতে?
সিকান্দার গজনবী আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বিস্মিত কণ্ঠে শুধালেন,
– আমাদের প্রজারা কেন আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে? এর উৎস কোথায়?
​দাউদ হাপাতে হাপাতে বললেন,
​- হুজুর, চক্রান্ত অনেক গভীর। শ্রবণগোচর হয়েছে, নীলকরদের কুঠিয়ালরা গ্রামে গ্রামে রটিয়ে দিয়েছে যে আপনি ব্রিটিশদের সাথে গোপনে হাত মিলিয়েছেন। তারা কৃষকদের বলছে, জমিদারি বাঁচাতে আপনি নাকি ব্রিটিশদের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়েছেন এবং আগামী মৌসুম হতে তাদের জমিতে জোর করে নীল চাষ করানো হবে!
নীলকররা তাদের রসদ দিচ্ছে, অস্ত্র দিচ্ছে।
​সিকান্দার গজনবী পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলেন। ​তাইমুরের চোখে তখন এক হিংস্র বাঘের প্রতিচ্ছবি। তিনি বললেন,

– পিতা, ইংরেজরা কেবল পরোয়ানা পাঠায়নি। বরং তারা মহলের ভেতরে এবং বাইরে একযোগে আক্রমণ করেছে। প্রজাদের আবেগকে পুঁজি করে তারা গজনবী মহলের সিংহাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে চাইছে।
​এবার তিনি দাউদকে উদ্দেশ্য করে শুধালেন,
​- কতজন বিদ্রোহী আছে? তারা এখন কোথায়?
​দাউদ বললেন,
– হুজুর, সংখ্যায় তারা কয়েক হাজার। তারা এখন সীমানা ভেঙে ভেতরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের হাতে লাঠিসোটা আর মুখে এই মহলের বিরুদ্ধে স্লোগান।কুঠিয়ালরা ঘোড়ায় চড়ে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
​তাইমুর পিতার দিকে ফিরলেন। বললেন,
​- পিতা, আপনি বিচলিত হবেন না। প্রজারা অবোধ, তারা ধূর্তদের চাল বুঝতে পারেনি। আমি আজ তাদের সামনে দাঁড়াব। যদি তারা যুক্তিতে ফেরে তবে ভালো, নতুবা আমার তলোয়ারের স্বাদ নিতে হবে তাদের। আর যারা এই মিথ্যে গুজব ছড়িয়েছে, তাদের জিহ্বা আমি নিজ হাতে উপড়ে ফেলব।
​সিকান্দার গজনবী দাঁড়িয়ে উঠলেন। পুত্রের কাঁধে হাত রেখে বললেন,

​- রক্তপাতে সমাধান আসবে না তাইমুর। যুক্তিতেই তাদের ফেরাতে হবে। ব্রিটিশরা চায় তুমি আবেগতাড়িত হয়ে রক্তপাত ঘটাও। যদি আজ কোনো প্রজার রক্ত তোমার হাতে ঝরে, তবে ব্রিটিশদের জন্য জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা আরও সহজ হবে। তারা একে ‘অরাজকতা’ হিসেবে প্রচার করবে। আমাদের তাদের ইচ্ছার বিরোধিতা করতে হবে। তোমার সাথে আমিও যাব।
তাইমুর বললেন,
– না, পিতা। আপনি এ অঞ্চলের জমিদার। আপনি তাদের মুখোমুখি হবেন না। আমি একাকী পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার সর্বস্ব চেষ্টা করব।
সিকান্দার গজনবী পুত্রকে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন,
– সাবধানে যেও, তাইমুর। খোদা তোমায় রক্ষা করবে।
​তাইমুর কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি ঝোড়ো গতিতে কক্ষ ত্যাগ করলেন।
উন্মত্ত প্রজাদের মুখোমুখি হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তাইমুরের অবচেতন মন তাকে টানল অন্দরমহলের সেই শান্ত কক্ষটির দিকে। যে কক্ষে তিনি রেখে এসেছেন তার হৃদয়ের সঙ্গিনীকে।
​তাইমুর অত্যন্ত সন্তর্পণে হেমাঙ্গিনীর কক্ষের ভারী দুয়ার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। কক্ষের ভেতরে এখন আলো ছায়ার এক অদ্ভুত খেলা চলছে। পর্দার আড়াল হতে আসা ভোরের ধূসর আলো হেমাঙ্গিনীর লাবণ্যময় মুখাবয়বের ওপর আছড়ে পড়েছে।

হেমাঙ্গিনী তখন সুগভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন। ক্লান্তিতে তার দীর্ঘ পল্লবগুলো নিমীলিত। ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ আলগা হয়ে আছে। তাইমুরের চোখে সে যেন এক স্বর্গীয় পরী। যে বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত ধূলিকণা আর ষড়যন্ত্রের ঊর্ধ্বে এক শান্তির রাজ্যে বিচরণ করছে।
​তাইমুর নিজের বলিষ্ঠ দেহটি নিয়ে অতি সাবধানে হেমাঙ্গিনীর শিয়রের কাছে এসে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। তার চোখের কঠোরতা মুহূর্তেই এক নিদারুণ কোমলতায় রূপান্তরিত হলো। তিনি অপলক নেত্রে হেমাঙ্গিনীর পানে তাকিয়ে রইলেন।
কয়েক মুহূর্ত আগে যে হেমাঙ্গিনীর ঠোঁটজোড়া স্পর্শ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এক অপূর্ণ অতৃপ্তিতে পর্যবসিত হয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা এখন কণ্ঠনালি চেপে ধরেছে তার।

তাইমুর জানেন না, কয়েক দণ্ড পরে রণক্ষেত্রে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে! হতে পারে এটিই তাদের শেষ দেখা। তার মনের ভেতরে এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল। তিনি নিজেকে আর সংবরণ করতে পারলেন না। অতি ধীরে, অত্যন্ত আবেগভরে তিনি নিজের মুখ হেমাঙ্গিনীর আনত মুখমণ্ডলের কাছে নিয়ে এলেন।
হেমাঙ্গিনীর উষ্ণ নিশ্বাসের ঘ্রাণ তাকে আচ্ছন্ন করল। তাইমুর গভীর অনুরাগে হেমাঙ্গিনীর সেই গোলাপি ওষ্ঠাধরে নিজের অধর মিলিয়ে দিলেন।
সে এক গাঢ় এবং তীব্র চুম্বন!
সহসা সেই উষ্ণ স্পর্শে হেমাঙ্গিনীর তন্দ্রা টুটল। সে ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলে তাকাল। সামনে তাইমুরকে দেখে সে মুহূর্তেই দিশেহারা হয়ে পড়ল। দুচোখে খেলা করতে লাগল রাজ্যের বিস্ময়। লজ্জায় গুটিয়ে নিল নিজেকে। উঠে বসার চেষ্টা করতেই তাইমুর তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন। নিচু স্বরে বললেন,

​- মাফ করবেন হেমাঙ্গিনী। আপনার সুগভীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর কোনো অধিকার আমার ছিল না। তবে আজ আমি বড় অসহায়! যে ভালোবাসা টুকু এই ঠোঁটে এঁকে দিতে চেয়েছিলাম, তা আমানত হিসেবে নেওয়ার সুযোগ যদি আর না পাই?
​হেমাঙ্গিনী বিস্ময়বিস্ফোরিত নেত্রে তাইমুরের দিকে তাকিয়ে রইল। তাইমুর তার চিরপরিচিত পোশাকে সজ্জিত নয় এখন! তার পরনে গাড়ো নীল রঙের এক দীর্ঘ আচকান, যা অত্যন্ত পুরু ও দৃঢ় বুননের। সেই আচকানের বুকের দুপাশে সোনালি কারুকার্য করা পিতলের বোতামগুলো প্রদীপের ম্লান আলোয় ঝিকমিক করছিল। আচকানের উপরিভাগে কাঁধ হতে কোমর পর্যন্ত রয়েছে রত্নখচিত তলোয়ার।
হেমাঙ্গিনী রুদ্ধকণ্ঠে শুধাল,

– হুজুর! একি সাজ আপনার? হাতে তলোয়ার… চোখে এমন রণক্লান্তি! কী হয়েছে?
​তাইমুর হেমাঙ্গিনীর হাতদুটো নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরলেন। তার কণ্ঠে ফিরে এলো সেই দৃঢ় ভাব। বললেন,
​- প্রজারা বিদ্রোহ করেছে, বাঈজী সাহেবা।আমাদেরই প্রজারা আজ মহলের সিংহদ্বারে লাঠিসোঁটা নিয়ে দাঁড়িয়েছে! আমাকে এখনই যেতে হবে। প্রজাদের ক্রোধ শান্ত করা আমার কর্তব্য।
​হেমাঙ্গিনী শিউরে উঠল। সে জানে, উন্মত্ত প্রজাবিদ্রোহ কতটা ভয়ংকর হতে পারে! সে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
– না হুজুর! আপনি এভাবে তাদের সামনে যাবেন না অনুগ্রহ করে। তাদের হিতাহিতজ্ঞান লোপ পেয়েছে। তারা যদি আপনার কোনো ক্ষতি করে ফেলে? যদি আপনি ফিরে না আসেন? তবে আমার এই জীবন, এই অন্দরমহলের বিলাসিতা কিসের জন্য? আপনি বরং আমাকেও সাথে নিয়ে চলুন!

​তাইমুর কিঞ্চিৎ হাসলেন। বীরত্বপূর্ণ হাসি। তিনি হেমাঙ্গিনীর কপালে পুনরায় চুমু খেলেন। বললেন,
– ভয় পাবেন না, বাঈজী সাহেবা। প্রজাদের ভালোবাসা আমি অর্জন করতে জানি। তাদের অবাধ্যতা সামলানোর সাহসও আমার মাঝে আছে। তবে হ্যাঁ, যদি আজ আমি ফিরে না আসি… তবে জেনে রাখবেন, রণক্ষেত্রে যাবার আগে আমার শেষ ভালোবাসা টুকু আমি আপনার ওষ্ঠেই রেখে গেলাম, বাঈজী সাহেবা। এই স্মৃতিটুকু সম্বল করেই যেন আমি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারি।
​হেমাঙ্গিনীর চোখ ভিজে এল। সে তাইমুরের বক্ষে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বলল,
​- হুজুর, আপনি আমাকে যে সম্মান দিয়েছেন, তা আমার আকাশকুসুম কল্পনাতেও ছিল না। আপনি ফিরে না আসলে এই কক্ষ আমার জন্য কবরখানা হয়ে যাবে। দয়া করে ফিরে আসবেন। আমার জন্য। গজনবী এস্টেটের জন্য। কথা দিন, হুজুর!

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৮

– কথা দিলাম, বাঈজী সাহেবা।
​তাইমুর হেমাঙ্গিনীকে তার বাহুডোর হতে আলতো করে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তলোয়ারের খাপটি ঠিক করে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় একবারও পেছনে ফিরে তাকালেন না।
​দুয়ারেরর বাইরে শোবহান মির্জা অপেক্ষা করছিলেন। তাইমুর তার উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে বললেন,
​- মির্জা, অন্দরমহলের এই কক্ষটির নিরাপত্তার ভার আপনার ওপর সোর্পদ করলাম। পাহারায় যেন কোনো ত্রুটি যেন না হয়। আমি আসছি!
​তাইমুরের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই হেমাঙ্গিনী পালঙ্কের ওপর লুটিয়ে পড়ল। কাঁদতে লাগল সে।
দূর থেকে ভেসে আসছে সহস্র মানুষের ক্রুদ্ধ চিৎকার আর রণদামামা।

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩০