নীরব উন্মাদনা পর্ব ১০১
সুরাইয়া জিয়াসমিন
উঠে দাঁড়ালো।ফ্লোর থেকে শার্ট কুড়িয়ে নিলো সে,নুবা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো
_” কোথায় যাচ্ছেন। অসহ্য লাগছে।”
_”আসছি, অপেক্ষা করো!”
বলেই ছুটে রুম থেকে বেড় হয়ে গেলো সে।নুবার কেমন কষ্ট লাগলো চেঁচিয়ে বলে উঠলো
_”আরহাম এরকম একটা মূহুর্তে যেতে পারেন না আপনি!”
কিন্তু কে শুনে কার কথা আরহাম চলে গেলো,নুবা তৃষ্ণার্ত পাখির মতো তাকিয়ে রইলো,চলে গেলো, চাঁপা কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে আসলো তার।নিজ অজান্তেই অজানা ভয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে, এমন ভাবে, এমন একটা সময়ে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সহ্য করতে পারলো না নুবা।
সকাল ৯ টা নাগাত নুবা শাওয়ারের তলে দাঁড়িয়ে আছে।এখনো আরহাম ফিরেনি,এখনো না,ভাবলেই তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে । সে পুরোটা রাত নিজ স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলো তবে সে সেই যে গেলো আর আসলো না,তবে একটু একটু চিন্তাও হলো নুবার হঠাৎ কি হলো?”
সকাল সকাল গোসল সেরে আয়ারকে নিয়ে লিভিং রুমে এসে বসলো নুবা, ক্লান্ত লাগছে, ব্যপারটা মেনে নিতেই হিমশিম খাচ্ছে সে। এরকম টা কখনোই হয়নি। আরহাম কখনোই এরকম করেনি!
নুবা লিভিং রুমে এসে বসতেই আমিনা বেগম মৃদু কন্ঠে বলে উঠলেন,
_”আরহাম উঠেছে, অফিসে যাবে না?”
নুবা মাথা নিচু করে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”কাল রাতে কোথায় যেনো বেড় হয়েছে।এখনো ফিরেনি!”
কথাটা শুনে আমিনা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলো,ভুরু কুঁচকে বললো
_”কি, কোথায় গেছে?”
নুবা শুকনো কন্ঠে বললো
_”উনি আমাকে কিছু বলে যায়নি, জিগ্গেস করেছিলাম তবে কিছুই বলেনি।একটা কল আসলো তার পর চলে গেলো।আর কিছু আমার জানা নেই।”
_’কে কল করেছিলো।”
_”আমি কি করে জানবো।”
নুবার এরকম শুকনো মুখ দেখে আমিনা বেগম এগিয়ে এসে বললেন
_”তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন,কি হয়েছে?”
নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বললো
_”তেমন কিছু না,বলছিলো তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু আসেনি তাই মন খারাপ।”
আমিনা বেগম চিন্তায় পড়ে গেলেন আজ পর্যন্ত আরহাম এমন কিছু করেনি।আমিনা বেগম ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন
_”কল করেছিলি।”
কথাটাই নুবার কষ্ট আরো বাড়লো,মিনমিন করে বললো
_”অনেক বার করেছিলাম রিং হচ্ছে তবে রিসিভ করেনি।”
নুবা রাত থেকে অনেক বার কল করেছে তবে রিসিভ করেনি আরহাম এই নিয়ে নুবার আরো অভিমান।
আমিনা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলললেন
_”চিন্তা করিস না,তোর শশুরকে বলছি দেখি।চলে আসবে হয়তোবা কোনো কাজে আটকেছে।”
নুবাকে শান্তনা দিলেও নিজেই টেনশনে পড়ে গেলেন আমিনা,আবার কোনো বিপদ আপদ হয়নি তো।এই বিষয়ে তাড়াতাড়ি হারুন মির্জাকে জানাবেন তিনি।
খনের মধ্যে পুরো বারি জেনে গেলো আরহাম রাতে ফিরেনি, হারুন মির্জা সবাইকে বুঝিয়ে গেলেন যে খোঁজ নিবে,এর ভিতরে নুবা আরো কয় একবার কল করলো কিন্তু রিসিভ করলো না আরহাম।
সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো অতঃপর রাত তবে আরহাম ফিরলো না। হারুন মির্জাও বেশ টেনশনে পড়ে গেলেন।
নুবা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে,রাত ৮ টা নাগাত বাজে, সারাদিন বুকে পাথর চেপে সে অপেক্ষা করেছে তবে এখন আর পারছে না।কেনো ফিরলো না আরহাম? কেনো তার কোনো খবর নেই?কল কেন রিসিভ করছে না?
নুবা ফুঁপিয়ে উঠে নাক টেনে বললো
_”আমার অনেক ভয় লাগছে মা,উনি কখনোই এমন করেননি, হঠাৎ করেই। উনার কিছু হলে আমি মরেই যাবো।”
আমিনা বেগম নুবাকে ধমকে বললেন
_”এই সব কি বলছিস,ফিরবে , পুরুষ মানুষ হয়তোবা কোথাও যেএ আঁটকে গেছে।”
নুবা কাউকে বুঝাতে পারলো না তার ভিতরে কি চলছে।নুবা ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”তোমরা বুঝতে পারছো না বিষয়টা।কে কল দিলো তার পর বেড় হয়ে গেলো, আমার ভিষন ভয় লাগছে নিশ্চয় কোনঝ বি,,,,
হাজেরা মেয়েকে ধমকে বললো
_”চুপ করবি তুই,ভালো কথা বল।
নুবা নাক টানলো,হাজেরা মৃদু কন্ঠে বললো
_বাচ্চাকে একটু বুকের দুধ দে খাওয়ার জন্য ছটফট করছে আর তুই বসে বসে কাঁদছিস।চলে আসবে এতো চিন্তা করার কি আছে।
নুবা কি করে বুঝাবে তার বুকটা যে হাহাকার করছে।ফোন আসার পরেই মুখের ভঙ্গি পালটে গিয়েছিলো তার,কেন যে যেতে দিলো?
নুবা আয়রাকে বুকের দুধ দিলো,আমিনা বেগম নুবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
_”জানিস তো কত বড় ইতর ও। চলে আসবে ইচ্ছা করে তোকে চিন্তায় ফেলছে। শান্ত হ.”
নুবা কম্পিত কন্ঠে বললো
_”তাই যাতে হয়।”
আরাফ আর হারুন মির্জা বাড়িতে ফিরলেন তবে তারা হতাশ।কোনো খোঁজ খবর নেই তাই বাধ্য হয়ে পুলিশ স্টেশনে গিয়েছিলেন তবে সব কিছু যাতে গোপন ভাবে হয় সেই ব্যস্ততা করে রেখে এসেছেন।যতোই হোক দিন পরা হয়ে রাত হয়েছে এই বিষয় হালকা ভাবে নিলে সবে না। কারণ তাদের শত্রু বেশি।
আরো ঘন্টা খানিক পার হলো নুবা চাতক পাখির মতো মোবাইল আর দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।এই বুঝি চলে আসলো,নুবা কাঁদতে কাঁদতে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।কখন আসবে
এই সব ভাবতে ভাবতে নুবার চোখ লেগে আসলো
আমিনা বেগম স্বামীর সামনে হু হু করে কেঁদে উঠে বললেন
_”রাত ২ টা বেজে গেলো,ছেলের কোনো খবর নেই। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে আরশির আব্বু আপনি দয়া করে ভালো মতো খোঁজ নেন।”
_”আমি পুলিশ স্টেশনে গিয়েছি আমিনা,এখন তো ওখানে গেলেই সবাই আগে থেকে ধরে ফেলে আমাদের বাড়ির মানুষ নিশ্চয় হারিয়ে গেছে , তুমি চিন্তা করো না, আরহাম ছোটো না বুঝদার চলে আসবে। শান্ত হও।”
_”তাই যাতে হয়।”
সকালের কোমল রোদ জানালার ফাঁক গলে ঘরে ছড়িয়ে পড়তেই নুবার ঘুম ভাঙল। আধখোলা চোখে সে টিপটিপ করে চারপাশে তাকাল, যেন ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি কোথাও আটকে আছে। এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর এসে পড়েছে, মুখে লেগে আছে ঘুমঘুম এক প্রশান্তি। হালকা ভ্রু কুঁচকে সে ধীরে ধীরে উঠে বসল, আশে পাশে তাকাতেই দেখলো আয়রা বুকের ভিতরে আগলে আছে।পরপর নুবার কিছু একটা মনে পড়তেই ফাল দিয়ে উঠে বসলো সে।
উঠেই আশে পাশে তাকিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষ টাকে খুঁজে লাগলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ১১ টা বাজে।নুবা ভালো মতো পাশে তাকিয়ে দেখলো হাজেরা তার পাশেই বসে আছে।
নুবাকে হঠাৎ উঠতে দেখে হাজেরা মৃদু কন্ঠে বললো
_”ঘুম পুরেছে।”
নুবা কথা ঘুরিয়ে বললো
_”আয়রার পাপা এসেছে।”
হাজেরার মুখটা কালো হয়ে গেলো। আরহাম ফিরেনি। উত্তর না পেয়ে নুবা নিজেই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আরহামকে খুঁজতে লাগলো চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”আরহাম!”
“আয়রার পাপা,আপনি এসেছেন।”
তবে সারা শব্দ নেই, হাজেরা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে মলিন কন্ঠে বললো
_”এখনো আসেনি।”
নুবার বুকটা কেঁপে উঠলো। কাঁদো কাঁদো চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো
_”মিথ্যা বলছো, আমি জানি এসেছে দুই দিন পর্যন্ত আমাদের ছেড়ে থাকতেই পারবেন না উনি!”
বলেই নুবা ওরনা নিয়ে রুম থেকে বেড় হয়ে গেলো
আমিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে নুবা রাগে দুঃখে চেঁচিয়ে উঠে বললো
_” সবাই মিলে জঘন্য মজা করছো আমার সাথে।এক রাত,দুই দিন পার হলো এখনি আসেনি এই সব কিরকম ফাজলামি। অসহ্য লাগছে উনাকে ডাকো চাচি, অনেক হয়েছে!”
আমিনা বেগম আশ্চর্য হয়ে বললো
_”তোর কি মনে হচ্ছে,আমি আমার ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছি?”
নুবা হাঁসফাঁস করে উঠে বললো
_” তালহে খোঁজ নিচ্ছো না কেনো,২৪ ঘন্টার বেশি পার হয়েছে চাচি,২ দিন এক রাত, তুমি বুঝতে পারছো আমার কেমন লাগছে,না কোনো খোঁজ খবর,আর না কলটা ধরছে।”
বলতে বলতে নুবা ধপ করে সোফায় বসে পড়লো,হাজেরা আয়ারকে নিয়ে এগিয়ে এসে বললো
_” ফ্রেশ হয়ে এসে আগে খেএ নে, দুপুর হয়ে যাচ্ছে।”
নুবা ছলছল চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো
_”গলা দিয়ে ভাত নামবে না মা,যতসময় উনাকে না দেখছি। ”
আমিনা বেগম নিজেকে যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রেখে বললেন
_’নুবা ,আগে খেএ নে।আয়রার কথা ভাব, তুই না খেলে ওর কি হবে।”
নুবা ছটফট করে উঠলো আর বললো
_”দম বন্ধ হয়ে যাবে চাচি, কেমন যেনো অস্থির লাগছে, আমাকে এক গ্লাস পানি দেও তো?”
আমিনা বেগম পানি নিয়ে এসে নুবাকে নিয়ে টেবিলে বসিয়ে এক প্রকার জোর করেই খাবার খাওয়ালেন,নুবা খেতে খেতৈ বারবার বলতে লাগলো
“আরহাম কখন আসছে” মাত্র দুটো দিন আরহামকে না দেখে পাগল হয়ে যাচ্ছে নুবা।
সবকিছু একটা আলাদা যুক্তি থাকে তবে হঠাৎ করেই বাড়ি থেকে বেড় হয়ে ফিরে না আসার যুক্তি মির্জা পরিবার খুঁজে পাচ্ছে না,আর না খোঁজ খবর।
দ্বিতীয় দিন নুবা হালকা পাগলামি করলো, তৃতীয় দিন লাগাম ছাড়া পাগল হলো সে অতঃপর ৮ টা দিন পার হতেই ভেঙ্গে পড়লো আরহামের মিনি হাতি।নুবার এখন মনে হচ্ছে”সে আরহামের আসক্তি না বরং আরহামি তার আসক্তি “পাগল হয়ে যাচ্ছে সে।
মির্জা বাড়িতে নেমে এসছে সোখের ছায়া,কারো খাওয়া দাওয়ার ঠিক নেই, হারুন মির্জা অফিসে না যেএ ছোটো ছেলেকে নিয়ে পুলিশ স্টেশনে দৌড়াদৌড়ি করছেন।আরশিও এখানে এসে বসে আছে।সেও খবরটা জানার পর অনেকটাই কান্না কাটি করেছে, হঠাৎ করে গায়েব হয়ে যাওয়ার কোনো মানেই নেই।
হাজেরা বেগম মেয়ের মুখের কাছে খাবার তুলে বললেন
_” খেএ নে নুবা,এভাবে চলতে থাকলে বাচ্চাটার কি হবে?”
নুবা ঝাড়া মেরে ভাতের প্লেট ফেলে দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো
_”খাবো না আমি, আয়রার পাপাকে এনে দেও। পাগল হয়ে যাচ্ছি।এনে দেও উনাকে।”
আরশি নুবার অবস্থা বুঝতে পেরে হালকা উঁচু পেটটা নিয়ে নুবার পাশে বসে বললো
_”নুবা, নিজেকে সামলা,আজ যদি আয়রা তোর গর্ভে হতো তুই কখনো এমন করতি হুম। শুধু নিজের কথাই ভাবছিস।”
নুবা হুহু করে কেঁদে উঠে বললো
_”হ্যাঁ আমি স্বার্থপর,আমি অনেক স্বার্থপর,যখন তোমার যাবে তখন তুমি বুঝবে।”
ইশিতা দাঁড়িয়ে ছিলো এবার নুবার কথায় একটু রেগে বললো
_”নুবা, শুধু তোমার স্বামী হয় না সে,আরশির ভাই হয়,কারো ছেলে হয় কারো ভাসুর,কালো মেয়ের জামাই।সবাই খারাপ অনুভব করছে তাই বলে এভাবে কান্না কাটি করলে কি হবে।আয়রাও বাবার অভাবে কেমন গুটিয়ে গেছে।এই সময়টা যদি তুমিও বাচ্চাটার হাত ছেঁড়ে দেও তবে কে রইলো তার? বাঁচবে কি করে?”
নুবা আর চোখে কান্না রত আয়রার দিকে তাকালো, অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হঠাৎ করেই আরহামের চেহারা না দেখায় তার উপরো প্রভাব পড়েছে।
নুবা কম্পিত হাতে আয়রাকে কোলে তুলে নিয়ে বললো
_”তোর পাপা এমন কেনো করছে আরু। আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। তুই তোর পাপাকে ফিরে আসতে বল না হলে আমি তো ধংস হয়ে যাবো রে।”
বলেই কাঁদতে লাগলো নুবা,আরশি নুবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
_’ ধৈর্য ধর,কেউ তো কম চেষ্টা করছে না?”
নুবা ফুঁপিয়ে উঠে বললো
_”আমার ইচ্ছা হচ্ছে আমি নিজেই উনাকে খুঁজতে বেড় হয়ে যাই, এতোটা স্বার্থপর কিভাবে হলেন,রিং হচ্ছে তাও কারো কলটা পর্যন্ত ধরছে না।কি করবঝ আমি?”
হাজেরা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_” এখন কি তুই খাবি নাকি এভাবে সারাদিন কান্না কাটি করবি বল। আমার কিন্তু এই সব সহ্য হচ্ছে না। শান্তি দিবি আমাকে।”
নুবা উত্তর দিলো না,হাজেরা বেগম রাগি কন্ঠে বললো
_”কিরে কথা বলছিস না কেন, বাচ্চাটাকে কি না খাওইয়ে মারবি অন্ততপক্ষে ৬ থেকে ৭/৮মাস হলেও আন্য কিছু মুখে দেওয়া যেতো এখন কি করবি?”
নুবা মাথা নিচু করে বললো
_”ভাত নিয়ে আসো।”
নুবার অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে বুকের ভিতরে,আমিনা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ছেলের চিন্তায়, এদিকে হারুন মির্জা মনের জোর দিয়ে এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছেন।আরাফো অনেক চিন্তিত বিষয়টা নিয়ে। রিহান এখানে এসেছে কারণ আরশি একা থাকবে কিভাবে।ইশিতারো আয়রা আর নুবার জন্য চিন্তা হচ্ছে।বাড়িতে কোনো কিছুই ঠিক নেই!
রাত তখন আড়াইটা ,নুবার চোখে ঘুম নেই, বারান্দায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ করেই একটা লোক কিকরে নির উদ্দেশ্য হতে পারে? কি করে?সবাই এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত কারো চোখে ঘুম নেই।
নুবার গুনগুন কান্নার ভিতরে হাজেরা এসে উপস্থিত হলো,মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
_”এখনো কান্না করছিস।এবার একটু ঘুমা,কি অবস্থা হয়েছে?নিজের দিকে একটু তাকিয়ে দেখ!”
নুবা জাপটে জরিয়ে ধরলো তার মাকে, হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে, ভাঙ্গা কন্ঠে বলে উঠলো
_”আমার মনটা কু ডাকছে মা,উনি নিশ্চয় কোনো বিপদে পড়েছেন,না হলে এতো দিনে চলে আসার কথা ছিলো।”
_”আসবে,আগে তুই শান্ত হ।”
_”কবে আসবে মা,সেই প্রথম দিন থেকেই একি কথা বলছো আজ ১০/১২ দিন হয়ে গেলো,,আমি না হয় পরের মেয়ে, অন্ততপক্ষে নিজের মেয়ের জন্য হলেও উনার ফিরে আসা উচিত ছিলো তাই না মা? আয়রা তো উনার কলিজার টুকরা ছিলো তবে কেনো এমন করছে?”
হাজেরা বেগম মেয়ের কান্না দেখে নিজেও ফুঁপিয়ে উঠলেন, চোখের পানি মুছে ভাঙ্গা কন্ঠে বললেন
_”এখন সে জানে তার অগোচরে তুই তার মেয়েকে আগলে রাখবি তাই এমন করছে,, নিশ্চয় ও তোর পরিক্ষা নিচ্ছে যে তুই আয়ারকে কতটুকু ভালোবাসির? ধৈর্য ধর ,আয়রার তুই ব্যতিত কে আছে, তুই তো ওর মা।তোকে শক্ত থাকতে হবে তবেই না বাকি সবাই মনোবল পাবে ।কোনো বিপদ হয়নি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া কর কিচ্ছু হবে না।”
নুবা ফুঁপিয়ে উঠে বললো
_”উনি না,আল্লাহ আমার পরিক্ষা নিচ্ছে মা,আমি তার পথ থেকে সরে গেছি তাই হয়তোবা ফিরে আসতে আহ্ববান জানাচ্ছে,উনাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না বলায় আল্লাহ অসন্তুষ্ট হয়েছে মা,আমি নিশ্চয় মাফ চেয়ে নিবো,এখনি।”
বলেই নুবা উঠে দাড়ালো,ছুটে যেএ ওযু করে আসলো সে পরপর জায়নামাজ নিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজে লুটিয়ে পড়লো সে,সিজদায় পড়ে আর উঠতে চাইলো না নুবা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে,যেনো চোখের পানি দিয়ে সবকিছু প্রকাশ করতে চাইছে নুবা,পরপর সময় নিয়ে নামাজ শেষে করে মোনাজাতে মনের সব দুঃখ কষ্ট প্রকাশ করলো,যেনো এবার আল্লাহ ছাড়া তার কোনো পথ নেই,মাফ চাইলো সে,আরো কত কি,,,
হাজেরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়ের কান্না শুনে আহাজারি করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”হ্যাঁ আল্লাহ কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছো আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে। রহম করো,দয়া করে ওর স্বামীকে ওর কাছে ফিরিয়ে দেও, বাচ্চাটাকে তার বাবা ফিরিয়ে দেও। মায়ের বুকে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেও।আরহাম কে সহিসালামত বাড়ি ফিরিয়ে দেও!”
পরি রান্না ঘড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেদিন তার বাবার কথা সে মনযোগ দিয়ে শুনেছিলো তাই সে ভেবেছে সুস্থ থাকবে সে,আর নাবিলের ধংস নিজে চোখে দেখবে তাই সে আগের মতো নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া শুরু করেছে,মুখ বুঝে সব সহ্য করতে শিখেছে তবে আফসোস চোখের পানি বাঁধ মানে না।
পরি রান্না ঘড়ে টুকটাক কাজ করছিলো নাজমা বেগম পাশ থেকে বলে উঠলো,
_”যাক ইদানিং নিজের খেয়াল রাখছো, অন্ততপক্ষে বুঝে গেছো সব মেনে নেওয়াই উত্তম।”
পরি মৃদু হেসে বললো
_” আপনার ছেলের ধংস দেখবো তাই নিজেকে একটু সুস্থ রাখার চেষ্টা করছি,না হলে কি করে দেখবো।”
নাজমা বেগম পরির কথায় হালকা হেসে বললেন
_”তোমার ইচ্ছে পূর্ন হোক।”
পরি,নজমা বেগমের কথায় একটু অবাক হলো,তবে এতটুকু টের পেলো নাজমা বেগমো ছেলেদের উপর অসন্তুষ্ট,না হলে একটা মা কখনোই এভাবে বলবে না।
নাজমা বেগম কিছু সময় চুপ থেকে বললেন
_”দেখো মা,সবার একটা সংসারের স্বপ্ন থাকে। তেমন তোমারো আছে তবে এখান থেকে বেড় হতে পারবে না তুমি,তাই বলছি যতদিন বেঁচে আছো বা আমার ছেলে বেঁচে আছে ততদিন তার মন যুগিয়ে চলো কারণ আসিয়াও কিন্তু ফেরাউনের স্ত্রী ছিলো। স্বামী যেমনি হোক না কেন সে তার ইমান ঠিক রেখেছিলো কখনোই স্বামীর খারাপ কাজ সমার্থন করেননি তাই বলছি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সংসার করো। তোমার জায়গায় তুমি ঠিক থাকো, তোমার স্বামী জানোয়ার হোক বা অমানুষ তবে তুমি তোমার জায়গায় ঠিক থাকো।”
কথাটুকু বলে নাজমা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেললেন,,পরি চুপ করে রইলো,,,নাজমা বেগম বলে উঠলেন
_” তোমার শশুরো এমন ছিলো তবে আমি আমার শাশুড়ির পুরো সাপোর্ট পেয়েছি। তোমার মতো না মানার পন করেছিলাম তবে বুঝতে পেরেছিলাম এই লোক ছাড়া গতি নেই করন মারার আগ পর্যন্ত আমার নিস্তার নেই তাই মেনে নিলাম। নিজের মতো সংসার গুছিয়ে নিলাম। যা বলতো মাথা পেতে নিতাম না হলে মারধর করতো। অবশ্য আমাকে দিয়ে কখনোই কোনো অনৈতিক কাজ করায়নি তাই তার কথা মেনে চলতাম, অতঃপর নাবিল পেটে আসলো।ও হওয়ার পর তোমার শশুর আমার প্রতি সদয় হলো। স্ত্রীর অধিকার পেলাম তার থেকে।প্রথমে দাসী ছিলাম তার পর যেনো স্ত্রী হলাম। হয়তোবা সে খারাপ তাও আমার ইচ্ছা ছিলো সবার মতো সংসার করার তাই করে গেলাম।ইশাকেও আমি এই কথাই বলেছি আর তোমাকেও বলছি মেনে নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় রাস্তা নেই,,যেখানেই যাবে নাবিলকেই পাবে!”
পরি মাথা নিচু করে মৃদু কন্ঠে বললো
_”এই সব আমাকে বলছেন কেন?”
_” তোমার ভালোর জন্য।”
পরি কিছু একটা বুঝতে পেরে হেসে বললো
_”ও তাহলে আপনি আমাকে বাচ্চা নিতে বলছেন। আপনার মাথা খারাপ আমি এই অমানুষের সন্তান নিজের পেটে ধরবো, অসম্ভব।”
নাজমা বেগম মৃদু হেসে বললো
_”শুতে পারলে পেটে ধরতে সমস্যা কি,, এমন তো নয় নিজেকে বাঁচাতে পেরেছো।সবিতো শেষ এখন এই সব বললেও বোকামি।”
ইশা চুলা থেকে ভাত নামিয়ে বললো
_”কয়টা দিন যেতে দেন মা।প্রথম প্রথম আমারো এমনি মনে হতো।এখন মেয়ে ছাড়া চোখে দেখি না, কারণ সন্তান তো সন্তানি ,মা হলে ঠিকি বুঝবে।”
পরি তাচ্ছিল্য করে হেসে বললো
_” কখনোই না,, আমার কোনো সংসার করার ইচ্ছা নেই রা না ওই অমানুষ টার কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার।”
বলেই পরি রান্না ঘড় থেকে বেড় হয়ে গেলো,,নাজমা বেগম ইশাকে মৃদু কন্ঠে বললেন
_”বাকি কাজ আমি আর বুয়া (কাজের মহিলা)করে নিবো, তুমি যেএ নীরাকে চোখে চোখে রাখো,, নাহিয়ান আবার চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিবে।”
ইশা মাথা ঝুঁকিয়ে বললো
_”আচ্ছা”
নুবা দুপুরের নামাজ শেষে করে,আলমারি থেকে আরহামের জামা কাপড় বেড় করে হাতাচ্ছে।চোখ দুটো ছলছল করছে তার,বুক ফেটে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেড় হচ্ছে। লোকটা কোথায় গেলো। এখনো কি ফিরবে না।নুবা আরহামের শার্ট টা বুকে জরিয়ে নিলো ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে ভাঙ্গা কন্ঠে বললো
_”কোথায় আপনি,এভাবে কেন পুড়াচ্ছেন ?একটু দায়া মায়া করুন, please ফিরে আসুন আরহাম। এরকম কেনো করছেন?”
আহাজারি করতে লাগলো নুবা , শরীর ভেঙ্গে আসলো তার।নুবা বুঝতে পারছে না কি করলে ফিরে আসবে আরহাম।
নুবার কান্নার ভিতরে আমিনা বেগম আয়রাকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো।নুবা তাকে দেখেই চোখের পানি মুছে আরহামের ড্রেস আলমারিতে রেখে দিলো ।আমিনা বেগম এগিয়ে এসে মৃদু কন্ঠে বললো
_”নিচে এসে দুপুরের খাবারটা খেএ নে।”
নুবা ভাঙ্গা কন্ঠে বললো,
_”ইচ্ছা হচ্ছে না, তুমি যাও আমি পড়ে খেএ নিবো।”
আমিনা বেগম কাতর কন্ঠে বললেন
_” নুবা, এরকম করলে দিন চলবে?”
নুবা এগিয়ে এসে আয়রাকে কোলে তুলে নিয়ে বললো
_”চাচা কি কোনো খোঁজ পেয়েছেন।”
কষ্টে আমিনা বেগমের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো। চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_”এখনো খোঁজ নিচ্ছে।”
নুবা আয়রাকে বুকে জরিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে বললো
_”এভাবে কি করে চলবে চাচি,আমি তো বউ হওয়ার আগেই বিধবা হয়ে গেলাম।উনি কেনো এমন করছে।যদি উনার কিছু হয়,,,,,”
নুবা আর কিছু বলতে পারলো না।গলা ভেঙ্গে আসছে তার।আমিনা বেগম নুবার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
_”কিচ্ছু হয়নি,দেখবি হুট করেই চলে এসেছে।”
নুবা নাক টেনে বললো
_”এমন যদি না হয় তবে আমি কি করবো।এভাবে লক্ষ্য ব্যতিত অপেক্ষা করা যায় তুমিই বলো?”
_”কষ্ট তো আমারো হচ্ছে রে নুবা।ছেলেটা কোথায় গেলো? তুই শান্ত থাক, বাচ্চাটা তো তোর আশায় একটু সুস্থ আছে। তুই নিজেকে শক্ত রাখ।”
আরো ঘন্টা খানিক কেটে গেলো।নুবা কল করলো আরহামকে তবে রিসিভ করলো না।নুবা আবারো কল দিয়ে বিরবির করে বললো
_”দয়া করে আমার উপর একটু রহম করুন আয়রার পাপা। ফোনটা ধরুন।”
কিন্তু ধরলো না সে।নুবার বুক ভেঙ্গে আসলো। ফুঁপিয়ে উঠলো সে।মনের ভিতরে একটা কথা ঘুরতে লাগলো তার “আচ্ছা সে কি কারো সাথে ব্যস্ত,যদি কোনো মেয়ে হয়?”
এতটুকু ভাবতেই নুবার পুরো দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেলো । বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বিছানার চাদর খামচে ধরলো নুবা। দাঁতে দাঁত চেপে বললো
_”এতোটা অসহ্য লাগছে কেনো? আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আয়রার পাপা। ফিরে আসুন।”
সন্ধ্যার আযান দিচ্ছে,হাজেরার সাথে তার রুমে বসে আছে নুবা,পাশে আয়রাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে নুবা হাতে মোবাইল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে বুকটা কষ্টে ফেটে যাচ্ছে তার।একটু আগে অনলাইনে এক্টিভ দেখাচ্ছিলো নুবা অনেক গুলো মেসেজ দিয়েছে এর কিছু সময় পর ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে।কল যাচ্ছে না,এই নিয়ে নুবা আরো কান্না কাটি করছে।
বাড়ির সবার অবস্থা শোচনীয় ।কারো ধারান নেই কি হচ্ছে যেনো মির্জা বাড়ির উপর কারো নজর পড়ে গেছে আশ্চর্য।
দিন পেরিয়ে সপ্তাহ হলো, সপ্তাহ গড়িয়ে মাসও প্রায় শেষের পথে। প্রতিটি ভোরে নুবার মনে হতো, হয়তো আজই আরহাম ফিরে আসবে। সন্ধ্যা নামলেই সে অজান্তেই দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত, সামান্য কোনো শব্দ হলেই বুকের ভেতর আশার আলো জ্বলে উঠত। কিন্তু প্রতিবারই সেই আশার প্রদীপ নিভে যেত ।আরহাম সেই যে গেল, তারপর আর ফিরে এল না,আজ প্রায় মাসখানেক হয়ে গেছে।কবে ফিরবে সে,সেই অপেক্ষা বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ খনে খনে মরছে।
নুবা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে পাতলা খেচুরি আয়রার মুখে তুলে দিলো। বুকের দুধের সাথে সাথে হালকা পাতলা জিনিস মুখে দেওয়া হচ্ছে।আয়রা বসতে শিখেছে ।
আয়রার মুখ মেখে গেছে ,বসে বসে হাতে খেলান নিয়ে খেলছে। আয়রার দুটো দাঁত উঠেছে নিচে সামনের দিকে।এখনো স্পস্ট না তবে বোঝা যায়,হাসলে সুন্দর লাগে।মুখ দিয়ে শব্দ উচ্চারণ করে সে,”বাবা,দাদা, মামা” আরো কত কি, হয়তোবা শব্দের অর্থ বুঝে না তবে মুখ চলতেই থাকে।এখনো খাচ্ছে আর খেলনা মুখে দিয়ে মুখ দিয়ে শব্দ করছে।
নুবা ক্লান্ত হাতে আয়রার মুখ থেকে খেলান সরিয়ে দিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো
_”মুখে দেয় না মা পঁচা জিনিস।”
আয়রা এঁটো মুখে হাসলো,নুবার প্রান জুরিয়ে গেলো,মুখে পানি দিলো আয়রার। খাওয়ার থেকে অর্ধেক ফুস ফুস করে ফেলে দিলো সে।
নুবা মুচকি হেসে গায়ের ওরনা দিয়ে মুখ মুছে দিলো তার পরপর আবারো খেচুরি মুখে দিতেই জিভ দিয়ে ঠেলে ফেলে দিলো আয়রা। কিচ্ছু খেতে চায় না,ঠেলে ফেলে দেয়।বেশির ভাগ কান্না করে যখন মুড ভালো থাকে তখন একটু খায় তার মন মর্জি যখন ইচ্ছা তখন খায়।
বারবরা মুখ দিয়ে শব্দ বেড় করে খাবার ঠেলে ফেলে দিলো আয়রা।নুবা আবারো মুখে পুরে দিয়ে বললো
_”ফেলে না মা, পঁচা মেয়ে।”
আয়রা চোখ ছোটো ছোটো করে হাসলো তবে খেলো না নুবা এবার একটু ধমকে উঠে বললো
_”ফেলতে না করেছি। শুধু বুকের দুধ দিয়ে পেট ভরবে তোর হুম। কিছু খেতে চায় না সবসময় ফাজলামি। এরকম বেয়াদবি করলে একদম মাইর দিবো পঁচা মেয়ে।”
নুবার কুঁচকানো মুখ আর ধমক শুনে আয়রা বুঝতে পারলো তাকে বকা হচ্ছে।তার পর আর কি এ্যাঁ এ্যাঁ করে কান্না শুরু করে দিলো
নুবা চেঁচিয়ে উঠে বললো
_”চুপ ,,সব বুঝিস এটা বুঝিস না খেতে হবে,না খেলে কি ভাবে চলবে। একদম কাদবি না বলে দিচ্ছি না হলে দাঁত দুটো ভেঙ্গে ফেলবো।”
হাত থেকে খেলনা ফেলে আয়রা চোখ মুখ খিচে কাঁদতে লাগলো।এখন যত সময় পর্যন্ত নুবা বুকে টেনে না নিবে তত সময় পর্যন্ত এভাবেই কাঁদতে থাকবে।
নুবা ভুরু কুঁচকে বললো
_”চুপ করতে বলেছি?”
হাজেরা এবার একটু রেগে পাশ থেকে বলে উঠলো
_”ধমকাচ্ছিস কেন।এভাবে বাচ্চা পালবি, ধৈর্য ধরে খাওয়াতে পারিস না।এভাবে বসে খায় ওরা,কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে এ তা বলে খাওয়াতে হয়। বাচ্চা পালা এতোই সহজ?”
নুবা এবার বিরক্ত হয়ে দুঃখ কষ্টে বললো
_”তাহলে তুমিই খাওয়াও,এতো অশান্তি ভালো লাগে না।”
বলেই নুবা ডাইনিং টেবিলে থেকে উঠে গেলো,ইশিতা মৃদু কন্ঠে বললো
_”ওর হয়তোবা ভালো লাগছে না আন্টি,বুঝতেই পারছেন ওর ভিতরে কি চলছে।তাই হয়তোবা ধৈর্য ধরতে পারছে না।”
হাজেরা চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে হাত ধুয়ে এগিয়ে গেলো,আয়রাকে কোলে তুলে ঠান্ডা করে এক হাত দিয়ে খাবার হাতে তুলে নিলো হেঁটে হেঁটে,এ তা বলে খাওয়াতে লাগলো তাকে,আয়রা নানির আদর পেয়ে একটু একটু করে খেতে লাগলো।
কিছু সময় পরে রাগ পড়ে গেলে নুবা নিজেই ছুটে আসলো মেয়েকে দেখতে।তবে ছোট্ট পাকা আয়রা নুবাকে দেখেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো,নানির সাথে ভাব জমালো সে।
নুবা আস্তে করে পাশে যেএ বসলো হালকা কেশে গলা ছেঁড়ে আদুরে কন্ঠে বললো
_”আরু, আম্মুর উপর রাগ করেছো, আচ্ছা ঠিক আছে আর বকবো না। আম্মু খুব পঁচা তাই না, আচ্ছা ঠিক আছে sorry ।”
বলেই আয়রা হাত বাড়িয়ে দিলো,মায়ের আদুরে আদুরে হাসি মাখা চেহারা দেখে আয়রা ছোট্ট দুটো দাঁত বেড় করে খিলখিল করে হেসে উঠলো।নুবা হাত বাড়িতে আয়ারকে বুকে টেনে নিলো,শ খানিক চুমু খেএ চাঁপা কন্ঠে বললো
_’পাকা বুড়িটা আমার,সব বুঝে।”
আয়রা এই সুযোগে মায়ের সাথে ভাব জমাতে চাইলো,বুকে মুখ ঘষলো সে যেনো এখনি sorry হিসাবে তাকে বুকের দুধ দিতে হবে।নুবা ঠোঁট হেলিয়ে হেসে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললো
_”সব বাহানা দুদু খাওয়ার নাটকবাজ পচা মেয়ে।”
বলতে বলতে নুবা বুকের দুধ দিলো আয়রাকে,হাজেরা বেগম চাঁপা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন
_” তাহলে তোরা বস,আমি যেএ দেখে আসি তোর চাচি কি করছে। ”
নুবা মাথা ঝুঁকিয়ে বললো
_”যাও।”
আমিনা বেগম অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন,সাথে রুম থেকে বেড় হোন না তিনি।ছেলের সোখে পাগল হয়ে গেছেন তিনি।নুবা ভিতর থেকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে তবে আয়রার জন্য শুধু কোনো মতে নিজেকে ঠিক রাখছে কারণ তার চুপসে যাওয়া মুখ দেখলে আয়রাও কেমন নিরাশ হয়ে পড়ে। তাই নুবা অপেক্ষা করছে, নিজেকে বোঝাচ্ছে আরহাম আসবে,সময় হলেই চলে আসবে,এই করতে করতে মাস খানিক পর হয়েছে। ভেবেই নুবা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিজের কান্না আটকালো।
নুবা পুরো নীরব হয়ে গেছে,চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে তার। শুধু অপেক্ষা করছে ।বিছানাটা ফাঁকা লাগছে,হাজেরা পাশে শুয়ে আছে তবু সব খালি খালি লাগছে।কখনো নুবা আয়রাকে নিয়ে হাজেরার সাথে তার রুমে ঘুমায় আবার কখনো হাজেরা এসে এখানে ঘুমায়,হাজেরা এই অবস্থায় তার মেয়েকে একা ছাড়েনি। যখন যেখানে রাত হয় সেখানেই ঘুমায়।
এখন আর কেউ নুবাকে অদুরে কন্ঠে ডাকে না,কেউ তাকে জরিয়ে ধরে বুকে আগলে নেয় না,মাথায় চুমু খেএ পিঠে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়ায় না।কেউ একটু পা ব্যাথা হয়ে গেলে কোলে নিয়ে ঘুরে না।সেই অসভ্য মানুষটা নেই মানে নুবার অর্ধ জীবন শেষ।
নুবা বিছানা থেকে উঠে আশে পাশে তাকালো,বুকটা খালি খালি লাগছে। ঘুম আসে না তার, চোখের নিচে কালি পড়ে গেলে,আরহামের পছন্দের ফুলো গাল দুটো চুপসে গেছে, শুকিয়ে গেছে নুবার মিনি হাতি,মিনি হাতি থেকে যেনো মশা হয়ে গেছে। হাস্যকর হলেও এটাই সত্য নুবা ভেঙ্গে পড়েছে। আরহাম কোথায় গেলো, বেঁচে আছে না মরে গেছে।নাকি কোনো বিপদ হয়েছে কে জানে।
নুবা বিছানা থেকে উঠে নামাজের পাটি নিয়ে বসলো,বুক ফেটে দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেড় হয়ে আসলো তার,সে শুধু ভাবছে যাতে তার স্বামী সুস্থ থাকে,যেখানেই থাকুক সুস্থ থাকুক।
নীরব উন্মাদনা পর্ব ১০০
অনেকটাই রাত ইশিতা বিছানায় এসে শুতে শুতে বললো
_” তোমার ভাইয়ের কি খবর?”
আরাফ মৃদু কন্ঠে বললো
_”কাল পুলিশ স্টেশনে যেতে হবে।”
_”কেনো,কোনো খবর পেয়েছে।”
আরাফ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ইশিতার মুখের দিকে মলিন চোখে তাকালো।
হারুন মির্জা রুমে প্রবেশ করতে আমিনা বেগম উঠে বসলেন,কাতর কন্ঠে বললেন
_ ” কোনো খবর পেলেন।”
