Home নোলকের নতুন শাড়ি নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৮

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৮

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৮
ইলোরা ফারদিন

“নোলক…! ” হতাশার কন্ঠে ডাক দিল হাসান
“বলো? টাকার ব্যবস্থা হলো? যাই হোক, সাত দিন সময় দিয়েছি তো। সাতদিনের মাঝে আমি আমার টাকা না পেলে এই সংসার ছাড়ব। আর ভুলেও ভেবোনা যে আমি ফাকা বুলি ছুড়ছি। আমার সত্যি এই সংসারের প্রতি আর টান নেই।” বলেই বাচ্চাদের খাবার খাওয়াতে লাগলো নোলক।
হাসানও আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। মাথায় এতো টাকার লোনের বোঝা, অন্যদিকে আবার নোলকের এই টাকা ফেরত দেওয়া…. কোথায় পাবে এখন সে টাকা? নতুন করে তো আর কেউ লোন দিবে না তাকে। বাধ্য হয়ে সে ছুটে গেল তার মায়ের কাছে।

“মা, আমাকে তিন লাখ টাকা দিবে?” নত মুখে বললো হাসান
হাসানের মুখে টাকার কথা শুনে অবাক হলেন ফরিদা বানু। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,” কেনো? এতো টাকা দিয়ে কি করবি?”
” মা, ছোটর ভার্সিটির খরচ, মিনুর খরচ এসব দিতে গিয়ে আমি নোলকের ব্যাবসার টাকা যেটা ও আমাকে ব্যংকে রাখতে দিয়েছিল, ওটা খরচ করে ফেলেছি। নোলক তা জানতে পেরেছে। এখন ও টাকাটা ফেরত চাচ্ছে। ”
” কেন ফেরত চাবে? ওর দেবর ননদের পেছনেই খরচ হয়েছে। এখানে ফেরতের কি আছে? কি ছোটলোক একটা মেয়ে। ওরে এই বাসায় বউ করে আনাই আমার উচিত হয় নি।” বিরক্তি কন্ঠে বলল ফরিদা বানু
” মা দয়া করে আমাকে দাও টাকাটা। নোলক না হলে আমাকে তালাক দিবে।”
” কি? এই মেয়ের এতো বড় সাহস? তোকে তালাকের হুমকি দেয়!
শুন, ওয় তালাক দেয়ার আগে তুই ওরে তালাক দিবি। দেখবি কয়দিন পর কুত্তাও মুতবো না ওর মুখে।”
হাসান অবাক হয়ে মায়ের কথা শুনলো। অবশ্য এটা তো নতুন না। বাধ্য হয়ে হাসান ওর মায়ের পা ধরলো, তারপর অনুনয় করে বলল,” মা জমি বিক্রির পাচ লাখ টাকা তো আমার পাওনা। ওটা দাও অন্তত। দয়া করো মা। আমার সংসারটা বাচাও।”

ফরিদা বানু এবার বলল,” তো আমি বলছিলাম তোরে যে তোর বউয়ের টাকা নে? মাতব্বরি করে কেন টাকা দিতে গেছিস। খুব তো বড় মুখ করে বাড়ি ছাড়ছিলি। আসলি কেন? আমি ডাকছি??
আর জমির টাকার কথা ভুলে যা। এক টাকাও দিতে পারব না।
আমার পর ওই টাকা আমার দুই মেয়ে পাবে। আমার সব ছেলে গুলা এক একটা নিমক হারা*ম, ওরা আমার ম*রার পর আমার মেয়ে গুলাকে যে লাথি মারবে, তা আমি জানি। তাই আমার কোনো কিছুর উপরে তোদের তিন ভাইয়ের আর কোনো অধিকার নাই। ‘
“আর আমি যে এতোগুলা বছর কুত্তার মতো পরিশ্রম করলাম, তোমাদের জন্য এতো এতো টাকা খরচ করলাম!” জিজ্ঞেস করল হাসান

“ওটা তোর দায়িত্ব। এখন যা তো বাপ। এতো কাইচাল ভালো লাগে না।” নির্বিকার ভাবে উত্তর দিল ফরিদা বানু
হাসান এবার মিতুর দিকে চেয়ে বলল,” তুইও কি চুপ থাকবি মিতু?”
” দেখো ভাইয়া,ওই টাকা আমার আর আপুর। ওটার দিকে নজর দিবে না। আর তোমাকে কি আমরা বলেছিলাম ভাবির টাকা চুরি করতে।
আর ভাবিরও বুঝি না। সামান্য টাকার জন্য স্বামীকে তালাক দিতে চায়। কি বেয়াদব। শুনো ভাইয়া, তোমার জন্যই ভাবি এতো বাড় বেড়েছে। সেদিন আমি যেয়ে তাকে এতো বুঝালাম, তবু বুঝলো না।
তুমি বরং ভাবিকে তালাক দেও। আমিও দেখব স্বামী ছাড়া কেম্নে থাকে সে। সমাজে ডিভোর্সি নারীদের মানুষ প*তিতার সাথে তুলনা করে বুঝলে? অবশ্য ভাবি ওই শাস্তিরই যোগ্য। আমাদের সুখী সংসারে আগুন লাগিয়ে নিজে সুখ করতে চেয়েছিল।
ভাইয়া তুমি ছেড়ে দেও উনাকে। ওর চেয়ে হাজার গুণ সুন্দরী মেয়ের সাথে বিয়ে দিব তোমার। কি বলো মা?”

” হ্যারে, মিতু ঠিকিই বলছে। ওর অহংকার এবার আমি ভাঙবো। ডিভোর্সটা খালি হতে দে। পুরো পাড়ায় যদি ওর নামে বদনাম না ছড়াইছি, আমার নামও ফরিদা বানু না।” হাসতে হাসতে বলল ফরিদা বানু
হাসান কিছুই আর বলল না, শুধু উদাস দৃষ্টিতে মা আর বোনের দিকে তাকিয়েই রইলো। তারপর চুপচাপ বেরিয়ে গেল।
হাসান বেরিয়ে যেতেই মিতু যেয়ে মাকে বলল,” কি বুঝলে মা? ভাইয়া কি ভাবিকে তালাক দিবে?”
” সে জানি না আমি। না দিলে নাই। আর ভাল্লাগে না এদের নিয়ে ভাবতে। তুই যা, তোর না কলেজ আছে। যা তো। কতগুলা নিমকহা*রাম জন্ম দিছি। সব গুলা বউয়ের পিছন ধরে ঘুরে। এগ্লা মরলেও আর যায়ে আসে না।”
মায়ের তিক্ত বাণিতে মিতু অবাক হলো! মায়েরাও কি কখনো সন্তানের মৃত্যু কামনা করতে পারে? মিতু তো চেয়েছিল তার ভাইটা ফিরে আসুক। কারণ মা তার কলেজে পড়ার টাকা দিতে রাজি হচ্ছিল না। বিয়ের সম্বন্ধ খুজছিল। তাই তো ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক করেছিল। ভাবিকে নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। উলটো ভাবির সাথে তালাক হলে তারই ভালো। বড় ভাই তখন শুধু তার পেছনেই খরচ করবে। বউ বাচ্চার বোঝা টানতে হবে না বড়
চায়ের দোকানে বিমর্ষ চিত্তে বসে আছে হাসান। বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। অনেক বেশি অসহায় বোধ হচ্ছে তার। কানে খালি বাজছে মিতুর বলা কথা, সে নাকি নোলকের টাকা চুরি করেছে। সত্যিই তো। এই একটা বছর কম কষ্ট করে নি নোলক। তার পরিশ্রমের টাকা ছিল ওগুলো। কিন্তু সে আবারও ওই একি ভুল করলো। নিজের মা ভাই বোনদের কথা ভাবতে যেয়ে নিজের স্ত্রী সন্তানের হক মারলো।

জানে কোনো লাভ হবে না, তবু হাসান শেষমেশ রতনকে ফোন দিল। তারপর হতাশ কন্ঠে রতনকে সব খুলে বলল।
সব শুনে রতন তাচ্ছিল্য হাসলো, তারপর বলল,” তুমি হচ্ছো একটা বলদ ভাইয়া। খারাপ মনে করো না। কিন্তু এটাই সত্যি। আমাদের মায়ের আসল রূপ আমি দশম শ্রেণিতে থাকাকালীনই টের পেয়ে গিয়েছিলাম।
তুমি তখন বাসায় একমাত্র রোজগার করতে। তোমার টাকায় সংসার চলতো। অথচ বাবার জমানো টাকা ব্যংকে ছিল। জমি ছিল। মা চাইলেই সে টাকায় তোমাকে পড়াশুনা করাতে পারতো। কিন্তু মা তা না করে তোমাকে কাজে ঢুকিয়ে দিলেন। তোমার টাকায় সংসার চলতে লাগলো, আমাদের পড়াশুনাও।
যখন তুমি প্রাপ্ত বয়স্ক হলে, তোমার বিয়ের অনেক প্রস্তাব আসতো। কিন্তু মা সবাইকে ফিরিয়ে দিত। কারণ মায়ের ভয় ছিল বিয়ে করে তুমি বউ নিয়ে আলাদা হয়ে যাবে। তাই মা ইচ্ছে করে তোমাকে বিয়ে দিল না।
কিন্তু এই দিক থেকে আমি বিণু মিনু সাকিব, আমরা কিন্তু বেশ স্বার্থপর ছিলাম। নিজেদের ভাগটা ইনিয়ে বিনিয়ে ঠিকি বুঝে নিতাম।

ধীরে ধীরে মায়ের বয়স বাড়লো। বাসার কাজ করতে তার সমস্যা হতো। তাই বাধ্য হয়ে রাজি হল তোমার বিয়ে দিতে। দেখে শুনে অল্প বয়সী সাধারণ ঘরের মেয়েকে নিয়ে আসলো ছেলের বউ করে। তারপর থেকে নোলক ভাবি হয়ে গেল আমাদের নতুন চাকর।
আমার পড়াশুনা শেষে যখন চাকরির কথা উঠলো, আমি ইচ্ছে করে জমি বিক্রি করিয়ে নিজেএ ভাগ বুঝে ওই টাকায় বড় চাকরি নিলাম। বিনুও ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের ভাগটা নিয়ে নিল। সাকিব অবশ্য আগেই চালাকি করে ওর ভাগের টাকা টা ফুশলিয়ে নিয়ে খোকন কাকার দোকানটা কিনে নিয়েছে। মা জানে দোকানটা মায়ের নামে। কিন্তু সাকিব আর আমি জানি দোকানটা সাকিবের নামে। সাকিবকে অবশ্য বুদ্ধিটা আমিই দিয়েছিলাম। তোমাকে কিছু বলি নি, কারণ জানতাম তুমি যায়ে সব মাকে বলে দিবে। আর তুমি বোকার মতো নিজের ভাগের টাকা মায়ের কাছে রেখে দিল। কি হলো শেষে? দেখলে তো!
মা ভেবেছিল আমাকেও তোমার মতো কলুর বলদ বানাবে। নিজে রাজরানী হয়ে থাকবে। আমার জন্যও ভাবির মতো গো বেচারা বউ আনবে।

কিন্তু আমি তা হতে দেই নি। আমি নিজের পছন্দের মেয়ে বিয়ে করে এখন সুখে সংসার করছি। আর আমার স্ত্রীর বাবা পুলিশ হওয়ায় মা ওকে কিছু বলার সাহসও পায় নি।
সত্যি বলতে ভাইয়া মা আসলে চান না তার ছেলেরা বউকে নিয়ে সুখে থাকুক। সে চায় যে সব ছেলে কামাই করে তার হাতে দিবে, আর ছেলের বউরা তার আর তার মেয়েদের গোলামি করবে।
যাই হোক ভাইয়া। দূঃখিত তোমাকে আমি সাহায্য করতে পারব না। একটা প্রবাদ আছে জানো তো,” কুত্তার লেজ কখনো সোজা হয় না।” আর তুমি হচ্ছো সেই কুত্তার লেজ। যেই মেয়েটা তোমার সংসারে সাতটা বছর গাধার মতো খাটলো, সেই মেয়েটার কষ্টের টাকা তুমি চুরি করলে। এই শাস্তিটা তোমার প্রাপ্য ভাইয়া।” বলেই ফোনটা কেটে দিল রতন

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৭

তীব্র রোদের মাঝে রাস্তায় হাটছে হাসান। চোখে তার পানি। অনুশোচনার পানি। নিজেকে ঘেন্না হচ্ছে তার। কি করবে সে! কোথা থেকে টাকা আনবে। তবে কি তার আর নোলকের সংসারটা টিকবে না? নোলক তাকে ছেড়ে দিবে!!! ছেড়ে দেওয়াই উচিত! তার মতো কাপুরুষের সাথে কেই বা সংসার করবে। তার সাথে সংসার করার মানে নিজের জীবনটা নষ্ট করা।
হুট করেই একটি অনিয়ন্ত্রিত ট্রাক ধেয়ে আসলো হাসানের দিক। তারপর?

নোলকের নতুন শাড়ি পর্ব ৯