প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪১
Drm Shohag
ইরফান স্তব্ধ চোখে মাইরার পানে চেয়ে রইল। প্রথমে কিছুটা রাগ হলেও মাইরাকে এভাবে কাঁদতে দেখে রাগ মিলিয়ে যায়। ঠিক যেমন জ্বলন্ত আগুনে পানি পড়লে নিমিষেই আগুন নিভে যায়, তেমনি মাইরার অশ্র কণায় ইরফানের রাগ মুহূর্তেই নিভে গেল। কেমন করে যেন তাকিয়ে রইল মাথা নিচু করে রাখা মাইরার পানে। বেডসাইড টেবিলের উপর ফোন বেজে ওঠে। ইরফান চুপ করে তাকিয়ে রইল মাইরার পানে। ফোন তুলল না। কল বাজতে বাজতে কেটে যায়। আবারও কল আসলে ইরফান এগিয়ে গিয়ে কল রিসিভ করে ছোট করে বলে,
“আসছি।”
এরপর চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে কাভার্ড থেকে একটা ব্লাক শার্ট বের করে। ব্লাক গ্যাবার্ডিন প্যান্টের উপর পাতলা ব্লাক শার্ট টি জড়িয়ে নিল। দু’হাতের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নেয়। এরপর হাতঘড়ি হাতে পরতে পরতে একবার মাইরার পানে তাকায়৷ তবে কিছু বলে না। ফোন পকেটে রেখে বেলকনিতে যেতে নিয়ে তার ঘরের ভেতর যে ঘরটা আছে সে ঘরের দরজার হাতল ধরে ঘোরালেই অবাক হয়। এই দরজা খোলা কেন? ভেতরে উঁকি দিলে মনে পড়ল এই ঘরের লাইট ফিউজ হয়েছে গতদিন। ঘাড় বাঁকিয়ে মাইরার দিকে তাকালো। কিছু ভাবলো হয়তো। ফোঁস করে বিরক্তির শ্বাস ফেলে দরজা লক করে দেয়। এরপর গটগট পায়ে বলকনিতে চলে যায়।
ইরফান বেলকনিতে গেলে মাইরা মাথা তুলে তাকায়। মেয়েটা অবাক হয় ভীষণ। সে যে এতোকিছু বললো, লোকটা তাকে কিছুই বললো না? বললেও কি, সে শুনতো না। ভালো লাগে না আর।
তাছাড়া সে যা বলেছে ভুল তো কিছু বলেনি। আবারও তার ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। বাম কাত হয়ে বা হাতের তালুতে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইরফান বেলকনির দরজা চাপিয়ে দেয়। রাতের অন্ধকারের মিটিমিটি বাতাস এসে গা ছুঁয়ে দেয়। ইরফান ছোট্ট একটা টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করলো। অন্ধকারের মাঝে অজানায় দৃষ্টি রেখে সিগারেটে আগুন ধরায়। গুণে গুণে তিনটে সিগারেট শেষ করে। এরপর ড্রয়ার থেকে (Hubba Bubba) চুইনগাম বের করে মুখে দেয়। সিগারেট এর গন্ধ দূর করার জন্য মূলত বেশ অনেকগুলো হুব্বা বুব্বা চুইনগাম কিনেছে ইরফান। কারণ অবশ্যই মাইরা সিগারেট এর গন্ধ সহ্য করতে পারে না বলে। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে বেশ কিছুক্ষণ চুইনগাম চিবায়। দৃষ্টি অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রকৃতির মাঝে। মুখাবয়বে চিরাচরিত গাম্ভীর্য। মুখজুড়ে ভাবনার ছাপ।
কিছুকক্ষণ পর মুখ গোল করে ফেলে দেয় চুইনগাম। এরপর ঘরের ভেতর প্রবেশ করে।
বেডের উপর নজর পড়লে দেখল মাইরা এদিক ফিরে শুয়ে চোখ বুঝে। ধীরে পায়ে এগিয়ে যায় মাইরার দিকে। মাইরার মাথার কাছে বসে। বাম পায়ের হাঁটু মেঝেতে ঠেকায়, ডান পা সামান্য উঁচু করে রাখে। বা হাতে মাইরার গালে হেলে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দেয়। মাইরা ঘুমের মাঝেই শব্দ করে শ্বাস ছাড়ে। কেঁদেকেটে মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। ইরফান মাইরার গালে হাত দিয়ে মাইরা ফোলা মুখপানে চেয়ে থাকে। সে আসলে বুঝতে পারছে না মাইরা কেন কাঁদলো। মাইরাকে ঘরে আটকে রেখে গিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কাজের চাপে একদম মাথায় ছিল না। মাথায় আসতেই একপ্রকার দৌড়ে এসেছে ঘরে। বাট সময়টা হয়তো বেশি ছিল। প্রায় দেড় ঘণ্টার কাছাকাছি। ইরফানের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘মেয়েটা কি ভয় পেয়ে এতো কাঁদলো?’
ইরফান বা হাতের বুড়ো আঙুলের সাহায্যে মাইরার চোখের কোণে লেগে থাকা এক ফোঁটা জমে থাকা জল কণা মুছে দিল। মাইরার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে নরম কণ্ঠে ডাকে,
“লিটল গার্ল?”
মাইরা সাড়া দিল না। একটু নড়েচড়ে ঘুমের ঘোরে ডান হাত ঠাস করে সামনের দিকে ফেলে। ফলস্বরূপ তার হাতটা ইরফানের কাঁধের উপর এসে পড়ে। ইরফান আড়চোখে তাকালো তার ঘাড়ের উপর রাখা মাইরার হাতখানার দিকে। ডান হাত বাড়িয়ে তার কাঁধে থাকা হাতটা হাতের মুঠোয় নিল। এরপর মাইরার হাতের উল্টো পিঠে ছোট করে একটা চুমু খায়। আবারও মৃদুস্বরে ডাকে,
“লিটল গার্ল?”
মাইরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়নি। একটু চোখ লেগেছিল। ইরফানের এটুকু ডাকে, স্পর্শে মেয়েটার ঘুম ছুটে যায়। তবে চোখ খুলে তাকায় না। এই লোকের সাথে তো সে জীবনেও কথা বলবে না। প্রশ্নই আসে না। ইরফান তীক্ষ্ণ চোখে মাইরার বন্ধ চোখের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“আই নো, তুমি জেগে আছো।”
মাইরা ঢোক গিলল। বন্ধ চোখেই ইরফানের হাতের মুঠো থেকে নিজের হাত ছাড়াতে চায়। ইরফান ছাড়লো না মাইরার হাত। বা হাতে মাইরার গাল আলতো হাতে স্লাইড করতে করতে বলে,
“অপেন ইওর আইস।”
মাইরা শুনলো না ইরফানের কথা। কেন শুনবে এই লোকের কথা? তার ভালো তো দেখতেই পারেনা এই লোক। তাকে কাঁদাতে যা যা করতে হয় সবই করে। গাঁট হয়ে পড়ে রইল ঘুমের ভান ধরে।
ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“চোখ খুলবে নাকি আমি কিছু করব?”
মাইরার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফুটে ওঠে। কি করবে এই লোক? ইরফানের হাতে থাকা তার হাতটা আবারও মোচড়ায়, ছুটাতে চায়। ইরফান তীক্ষ্ণ চোখে মাইরার দিকে চেয়ে হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে। মাইরা ব্যর্থ হয়ে চুপ হয়ে যায়। তবে চোখ খোলে না। ইরফান মাইরার বুড়ো আঙুল তার মুখে পুড়ে নেয়। মাইরা কিছু বোঝার আগেই ইরফান মাইরার বুড়ো আঙুলের মাঝ বরাবর দাঁত বসায়। মাইরা তড়াক করে চোখ মেলে তাকায়। ইরফানের মুখে তার হাতের আঙুল দেখে চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে ওঠে। বা হাতে ইরফানের ডান গালে হাত দিয়ে ঠেলে বলে,
“অ’স’ভ্য লোক আমার আঙুল ভেঙে গেল। ছাড়ুন।”
ইরফান মাইরার দিকে চেয়ে আঙুলে বসানো দাঁত শিথীল করল। তবে মুখ থেকে আঙুল বের করল না, সাথে শক্তহাতে মাইরার হাত চেপে মাইরার দিকে চেয়ে রইল। মাইরা ইরফানের গলায় কয়েকটা খামচি দেয় হাত ছাড়া পাবার আশায়। ইরফান ভাবলেশহীন। কি একটা অবস্থা! মেয়েটা মিনমিন করে বলে,
“আমার হাত ছাড়ুন।”
ইরফানের দেহের যেমন কোনো নড়চড় নেই, তেমনি দৃষ্টির নড়চড় নেই।
ইরফানকে একদম তার মুখের সামনে দেখে কেমন অস্বস্তি হলো মাইরার, তবে একটু আগেই যে সে ইরফানকে অনেকগুলো শক্ত কথা শুনিয়েছে, সেগুলো ভেবেই ঢোক গিলল। চোখজুড়ে ভীতি দেখা দিল। তাকে লোকটা এখন কি করবে? এই আঙুল ভেঙে দেয়ার পণ করেছে নাকি?
তার ভাবনার মাঝেই ইরফান খুবই আলতোভাবে মাইরার আঙুল মুখ থেকে বের করে ফেলে। হাত ছেড়ে দেয়। মাইরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আঙুল টা উল্টেপাল্টে দেখল। ইশ দাঁত বসিয়ে দিয়েছে। ইরফানের দিকে তাকিয়ে রেগে বলে, “রা’ক্ষ”স একটা।”
ইরফান তার বা হাত মাইরার দিকে এগিয়ে নিলে মাইরা ভয় পায়। ইরফান বা হাতের বুড়ো আঙুল দ্বারা মাইরার ঠোঁটের নিচে চিবুকের নিচের অংশে জমে থাকা ঘাম মুছে দেয় খুব মনোযোগের সহিত। এরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে মাইরার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে, “ওকে।”
মাইরা অদ্ভুদভাবে তাকায় ইরফানের দিকে। ওকে মানে? ও এই লোককে রা’ক্ষ’স বলল, আর ইনি বলছে ‘ওকে?’ এই লোক পা’গ’ল টা’গ’ল হয়েছে নাকি!
মাইরার ভাবনার মাঝেই ইরফান মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কি ভয় পেয়েছিলে? আই মিন পাশের রুমে গিয়ে কিছু দেখে ভ’য় পেয়েছ?”
মাইরা অবাক হয়ে তাকায় ইরফানের দিকে। সে কি ভাবছে আর এই লোক কি বলছে। তবে ইরফানের কথায় অবাক হলো। ওই ঘরে এমন কি আছে যে সে ভ’য় পাবে? তার খুব মন খা’রা’প ছিল বলে বেড থেকেই নামেনি। অন্যসময় হলে ঠিকই গিয়ে দেখত ওই ঘরে কি আছে। অতঃপর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ওই ঘরে কি আছে?”
ইরফান ভ্রু কোঁচকালো। মাইরার কথার ধরনে বুঝলো মাইরা ওই ঘরে যায়নি। মাইরার মুখপানে চেয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে, “নাথিং।”
মাইরা কৌতুহলী চোখে প্রশ্ন করে, “তাহলে ভ’য় পাওয়ার কথা বললেন কেন?”
ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
“কজ, ইউ আর আ স্টুপিট গার্ল।”
মাইরা বিরক্ত হলো। কিছু বলল না।
ইরফান চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কাঁদছিলে কেন?”
মাইরা পিটপিট করে ইরফানের দিকে তাকিয়ে থাকে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। তাকে ঘরে বন্দী করে রেখে এখন এসে বলছে সে কেন কেঁদেছে। চোখ নামিয়ে বলে,
“আপনার মতো পা’ষা’ণ লোক যার জীবনে আছে, সে না কাঁদলেই বরং জিজ্ঞেস করবেন, কেন কাঁদলো না।”
ইরফান বিরক্ত হলো। ধমকে বলে, “স্টুপিট গার্ল কেন কাঁদলে বলো।”
মাইরা রেগে তাকায়। আবার তাকে ধমকাধমকি করতে এসেছে। এই লোকটা আসলেই খা’রা’প। ইরফান চোখ বুজে শ্বাস নেয়। নিজেকে সামলে আবারও নরম সুরে জিজ্ঞেস করে,
“কাঁদলে কেন? টেল মি।”
মাইরা অবাক হয়। এই লোককে তার গিরগিটির চেয়েও ভ’য়া’নক লাগে। সেকেন্ডে সেকেন্ডে রঙ বদলায়। পিটপিট করে চেয়ে থাকে কিছু সময় ইরফানের দিকে।
ইরফান উত্তরের আশায় মাইরার পানে শান্ত চোখে চেয়ে আছে। মাইরা ঢোক গিলে বলে,
“আপনিই তো আমাকে ঘরে আটকে রেখে গেলেন।”
ইরফান সাথে সাথেই অশান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“আর রাখবো না।”
মাইরা অদ্ভুদভাবে তাকায় ইরফানের দিকে। ইরফান মাইরাকে চুপ থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে কণ্ঠে বিরক্তি ঢেলে আবারও জিজ্ঞেস করে,
“কান্নার কারণ কি? আমাকে রাগাচ্ছো কেন? এক কোয়শ্চন কতবার করব?”
মাইরা চোখ নামিয়ে নেয়। মৃদুস্বরে বলে,
“আমার ছোট ভাই আমার কোলে উঠতে চেয়েছিল, আপনার জন্যই তো তাকে কোলে নিতে পারিনি। আটকে রেখেছিলেন কেন?”
ইরফান বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“এজন্য কেঁদেছ?”
মাইরা চোখ তুলে তাকায় ইরফানের দিকে। কণ্ঠে ঝাঁঝ ঢেলে বলে,
“তো আর কি জন্য কাঁদবো? সবাই কি আপনার মতো নির্দয়? সব মানুষ জা’হা’ন্না’মে গেলেও তো আপনার কোনো যায় আসে না। হার্টলেস লোক।”
ইরফান অদ্ভুদভাবে তাকায় মাইরার পানে। মাইরার ডান হাত তার মুঠোয় নিয়ে মাইরার হাতের উল্টো পিঠে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে আলতো হাতে স্লাইড করতে করতে মাইরার চোখের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“তুমি বড় হবে না স্টুপিট গার্ল?”
মাইরা তার হাত মোচড়াতে মোচড়াতে মুখ বাঁকিয়ে বলে, “আমি যথেষ্ট বড়।”
ইরফান মাথা নিচু করে ঠোঁট বাঁকিয়ে সূক্ষ্ম হাসলো। এরপর মাইরাকে ছেড়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে গম্ভীর গলায় বলে,
“বড়রা যাকে তাকে হার্টলেস বলে না।”
মাইরা ইরফানের দিকে তাকালো না। উল্টো ঘুরে শুয়ে চোখ বুজে নেয়।
ইরফান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,
“ওয়েট, তোমার ভাইকে এনে দিচ্ছি।”
মাইরা তড়িঘড়ি করে শোয়া থেকে উঠে বসে। মনে হচ্ছে তার ভাই পাশের রুমে। এই লোক তার ভাইকে আনতে যাচ্ছে। অবাক হয়ে বলে,
“কোথায় যাচ্ছেন? ওরা সবাই গ্রামে চলে গিয়েছে।”
মাইরার কথা শুনে ইরফান অবাক হলো।
বিড়বিড় করে, “ওহ শীট!”
এরপর মাইরার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “কখন গিয়েছে?”
মাইরা অবাক হয়ে তাকায়। এই লোক জানেনা তার মা, ভাই কখন গিয়েছে? তাকে ঘরে আটকে রেখে সে বাইরে ছিল। এখন তাকেই এসে জিজ্ঞেস করছে তার ভাইয়েরা কখন গিয়েছে। রেগে বলে,
“আপনি আমাকে বন্দী করে রেখে গিয়েছিলেন বুঝলেন? মনে পড়েছে আপনার? আমি কি জ্যোতিষি যে ঘরে বসেই বাইরের খবর পাবো?”
মাইরার প্রতিটি ত্যাড়া কথায় ইরফান রেগে তাকায় মাইরার দিকে। শক্ত গলায় বলে,
“স্টুপিট গার্ল, রাগিয়ো না আমাকে।”
মাইরা রেগে বলে,
“আপনার জন্য আমার ভাইটা কেঁদেকেটে চলে গিয়েছে গ্রামে। আমার মায়ের সাথেও দেখা করতে পারিনি। এবার বুঝেছেন তো আপনি কত খা’রা’প লোক! এখন আমাকে এসে রাগাতে না করছেন। কে রাগাতে গিয়েছে আপনাকে? আমি তো আপনার সাথে কথাই বলবো না।”
কথাগুলো রেগে বললেও মেয়েটার চোখজোড়া ভিজে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে ইতিমধ্যে।
ইরফান মাইরার দিকে ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে থাকে। মাইরা ইরফানকে শান্ত দেখে অবাক হয়। তার কথায় এই লোকটার উপর প্রভাব ফেলছে না মনে হচ্ছে। ইরফান এগিয়ে এসে মাইরার পাশে দাঁড়ায়। এরপর দু’হাতে মাইরার গাল মুছে দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“ডোন্ট ক্রাই। স্যরি!”
মাইরা পিটপিট করে ভেজা চোখে ইরফানের দিকে চেয়ে থাকে। অবাক হয় ভীষণ। এই লোক অনুতপ্তও হয়? এর আগেও ক্ষেত্রবিশেষে স্যরি বলেছে মাইরাকে। তার মনে আছে। কিন্তুু এই লোকটার সাথে তো এসব ব্যবহার যায় না। প্রতিবারের মতো এবারেও জিজ্ঞেস করে ফেলে, “আপনি আমাকে স্যরি বললেন?”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে বলে, “নো।”
মাইরা মুখ বাঁকায়। বিড়বিড় করে, “মিথ্যুক একটা।”
যাকে এতোক্ষণ শত্রু ভাবলো, চারটে আফসোসও করল এই লোকটা তার স্বামী হওয়ায়, মায়ের উপর অভিমান বৃদ্ধি হলো,, ইরফানকে ঠাণ্ডা দেখে সব রাগ ভুলে আবদার করে বসে,
“আমাকে ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাবেন?”
মাইরার কণ্ঠ ভেজা। ইরফান মাইরার মুখপানে চেয়ে থাকে। কপালে পড়ে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে ছোট করে করে বলে,
“যাবো।”
কথাটা বলে মাইরার গাল থেকে হাত সরিয়ে হাতঘড়িতে একবার সময় দেখল ৯ টা ৫৬।
এরপর মাইরার হিজাব নিয়ে মাইরার মাথায় দু’বার পেঁচিয়ে মাথা ঢেকে দেয়। মাইরা বিরক্ত হয়ে বলে,
“কি করছেন?”
ইরফান বসা থেকে দাঁড়িয়ে বলে,
“ইনায়া চলে যাচ্ছে। এসো।”
ইনায়ার যাওয়ার কথা শুনে মাইরা দ্রুত বেড থেকে নেমে দাঁড়ায়। রাতে এখনো না খাওয়া, সাথে এতোক্ষণ কান্নার ফলে শরীরটা উইক লাগছে।দাঁড়ানোর সাথে সাথে মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল। চারপাশ অন্ধকার লাগলো কিছু সময়ের জন্য। পাশেই ইরফানকে পেয়ে দু’হাতে ইরফানের হাত আঁকড়ে ধরে। ইরফান মাইরার কাঁধে হাত রেখে চিন্তিত কণ্ঠে বলে,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড? আর ইউ ওকে?”
মাইরা কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে তাকায়। ইরফানকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ায়। এরপর মৃদুস্বরে বলে,
“কিছু না।”
কথাটা বলে মাথার হিজাব দিয়ে ভালোভাবে মাথা সহ নিজেকে ঢেকে নিল। এরপর এগিয়ে যেতে নিলে ইরফান মাইরার হাত টেনে ধরে। মাইরা বিরক্ত হয়ে বলে,
“আপনি কি এখন আমাকে ইনায়া আপুর সাথেও দেখা করতে দিবেন না?”
ইরফান মাইরার কথার উত্তর করল না। ঝট করে মাইরাকে কোলে তুলে নেয়। মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে। রেগে বলে,
“হায় আল্লাহ! নামান আমায়। আমি হাঁটতে পারবো। দয়া করে নামান। বাইরে অনেক মানুষ আছে।”
ইরফান বিরক্ত হলো। ধমকে বলে,
“সাট আপ।”
মাইরা চুপসে যায়। ইরফান গটগট পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। ইরফানের কাজিনসহ বিয়ে বাড়ির সবাই ইরফানদের ড্রয়িং স্পেসে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফানের কোলে মাইরাকে দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। শুদ্ধ তার কাজিনদের মাঝ থেকে কনফিউজড হয়ে বলে,
“বিয়েটা যেন কার হচ্ছে?”
শুদ্ধর কথায় সবাই হেসে ফেলে। ইরফান মাইরাকে নিয়ে নিচে নেমে আসে। মাইরার ল’জ্জা’য় হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
ইরফান এক সাইডে মাইরাকে দাঁড় করিয়ে দেয়। মাইরা সাথে সাথে ইরফানের থেকে কয়েক হাত দূরে সরে দাঁড়ায়। ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকায় মাইরার দিকে। সবাই যে তাদের দিকে চেয়ে আছে সে খেয়াল নেই এই ছেলের। মাইরা তার থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো, সেই খেয়ালে ইরফান। এগিয়ে গিয়ে মাইরার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
“স্টুপিট কি প্রবলেম?”
মাইরা কিছু বলল না। অ’স’হ্য লোক একটা। তারেক নেওয়াজ এগিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে বলে,
“মাইরা আম্মু তুমি কি অসুস্থ?”
মাইরা ঢোক গিলল। সবাই সোফা, চেয়ার দখল করে বসেছে। আবার অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। মাইরা সবাইকে তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ নামিয়ে অস্বস্তিতে ঘিরে মিনমিন করে উত্তর দেয়,
“না বাবা।”
তারেক নেওয়াজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় গিয়ে বসলেন। শুদ্ধ ইরফানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আবার বিয়ে করবি ভাই?”
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকায় শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ আফসোসের সুরে বলে,
“তুই ল’জ্জা পাওয়ার পাত্র নয়, ভুল করে যদি পেয়ে যাস, তবে আমায় বলে ফেল। আমি সব ব্যবস্থা করব, পাক্কা।”
ইরফান বিরক্ত চোখে তাকায়। মাইরা তীব্র অস্বস্তিতে এখান থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য দু’পা এগোলে ইরফান মাইরার হাতের কব্জি ধরে টেনে বলে,
“এক পা নড়লে পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”
শুদ্ধ হেসে আফসোসের সুরে বলে,
“আজ আমার বউ নেই বলে কোলে তুলতে পারছি না, তার হাত টেনে ধরতে পারছি না, পা ভাঙার হুমকি দিতে পারছি না, এসব দুঃখ আর সহ্য করা যাচ্ছে না। আমার কত দুঃখ একবার ভাবো মাইরা।”
মাইরা শুদ্ধর কথা শুনে মাথা নিচু করে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে। এতো অস্বস্তি হচ্ছে তার, বলে বোঝানো যাবে না। সব এই লোকটার জন্য। বন্ধুগুলোও কেমন যেন।
শুদ্ধ আর কিছু বললো না। মিটিমিটি হেসে ফাইজের কাছে যাওয়ার জন্য এগোয়।
ইরফানদের গেইটের সামনে ইনায়াকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। মেয়েটা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদছে। রুমা নেওয়াজ ইনায়ার মুখে ছোট ছোট চুমু আঁকে। নিজেকে সামলে গালে হাত দিয়ে বলে,
“তোর নতুন বাবা মায়ের খেয়াল রাখবি কিন্তুু কেমন? লক্ষী মেয়ে হয়ে থাকবি।”
ইনায়া মাথা নিচু কেঁদে বিড়বিড়িয়ে বলে,
“আম্মু আমি এখানে আরও কয়েকদিন থাকি?”
রুমা নেওয়াজ মেয়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলেন,
“ফাইজ দাঁড়িয়ে আছে। তোর শ্বাশুড়ি তোকে ঘরে তোলার জন্য বসে আছে। সবাইকে অপেক্ষা করিয়ে এখানে কয়দিন থাকবি?”
ইনায়া তার মাকে জড়িয়ে ধরল। ফাইজ অসহায় চোখে ইনায়ার দিকে চেয়ে আছে। তার লিটল কুইনের এভাবে কান্না তার একদম ভালো লাগছে না। ফাইজ তার থেকে একটু দূরে দাঁড়ানো শুদ্ধকে টেনে ফিসফিসিয়ে বলে,
“তোর বোন এতো কাঁদছে কেন? আমি তো বেঁচে আছি। স্বামী মরলেও মানুষ এতো কাঁদে না।”
শুদ্ধ ফাইজের কান টেনে ধরে। ফাইজ কটমট দৃষ্টিতে তাকায় শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধর হাত টেনে নামিয়ে দেয় তার কান থেকে। রেগে বলে,
“কান টানছিস কেন বেয়া’দব?”
শুদ্ধ মেকি হেসে বলে,
“তুই শুধু ভুলে যাস। তাই কান টেনে বলছি। এবার আর ভুলবি না।”
“কি?”
শুদ্ধ সিরিয়াস কণ্ঠে বলে,
“তুই যে বলেছিলি আমার বোনকে বিয়ে করে ওকে সিন্দুকে ভরে রাখবি। আমি ইনায়াকে সাথে নিয়ে গিয়ে সেই সিন্দুক অর্ডার দিয়েছিলাম, বুঝলি? ও তো জেনে গিয়েছে, তুই ওকে নিয়ে গিয়ে সিন্দুকে ভরে রাখবি। এ বাড়ি আর আসতে দিবি না। তাই বেচারী জন্মের কান্না কাঁদছে। আহারে আমারও দুঃখ হচ্ছে ইনায়াটার জন্য। বলছি মাঝে মাঝে একটু বাইরের আলো বাতাসে ঘুরিয়ে আবার সিন্দুকে ভরে রাখিস।”
ফাইজ তব্দা খেয়ে চেয়ে আছে শুদ্ধর দিকে। একে ঠিক কি করা উচিৎ? রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আসলেই ওকে সিন্দুকে ভরে রাখব, তোদের মতো ব্রিটিশদের হাওয়া আমার বউয়ের গায়ে কিছুতেই লাগতে দিব না আমি।”
শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে সামনে এগোতে এগোতে বলে,
“দাঁড়া ইনায়াকে মনে করিয়ে দিয়ে আসি।”
ফাইজ শুদ্ধর হাত টেনে ধরে। একে দিয়ে বিশ্বাস নেই। বিরক্ত হয়ে বলল,
“এ ভাই তুই গিয়ে ঘুমা তো। আমায় রেহাই দে আজকে অন্তত।”
শুদ্ধ চরম মন খা’রা’পের ভান করে দু’হাত মাথায় তুলে বলে,
“কি বলছিস? আমি তোর বা’স’র ঘরে ঢুকব না?”
ফাইজ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। নাহ এর সাথে কথা বলে মেজাজ গরম ছাড়া আর কিছুই হবে না।
তারেক নেওয়াজ ঝাপসা চোখজোড়া আড়াল করে ইনায়ার কাছে আসলেন। ইনায়ার হাত তার মুঠোয় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ফাইজের সামনে দাঁড়ালেন। ফাইজ ইনায়ার থেকে চোখ সরিয়ে তার শ্বশুরের দিকে তাকায়। তারেক নেওয়াজ ইনায়ার হাত ফাইজের হাতের উপর রেখে মৃদুস্বরে বলেন,
“আমার রাজকন্যা কে তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি বাবা, তাকে আগলে রেখ।”
ফাইজ ইনায়ার হাতখানা শক্ত করে ধরল। এটা তার লিটল কুইন। কত অপেক্ষার ফল তার লিটল কুইন। তাকে আগলে রাখবে না? মৃদু হেসে বলে,
“অবশ্যই বাবা।”
তারেক নেওয়াজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইনায়ার হাত ছেড়ে ভেতরে চলে যায়। চোখের কোণে পানি। মেয়েকে বিদায় দিতে এতো দুঃখ কখনো বুঝতে পারেননি।
ইনায়া মাথা নিচু করে নিরবে চোখের পানি ফেলে। ফাইজ ফিসফিসিয়ে বলে,
“লিটল কুইন তোমাকে কোলে নিচ্ছি, ওকে?”
ইনায়া দ্রুত মাথা তুলে ফাইজের দিকে তাকায়। ফাইজ তার সদ্য বিবাহিত বউটার কান্নামাখা মুখ দেখে অসহায় মুখ করে তাকালো। ইনায়া মিনমিন করে বলে,
“আমি হেঁটে যেতে পারব।”
ফাইজ ইনায়ার কথা মেনে নিল। এমনিতেই খুব কেঁদেছে। চুপ করে ইনায়ার ডান হাত তার বা হাতের মুঠোয় নিয়ে সামনে তাদের দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ির দিকে যায়। ফাইজ তার গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির ডোর খুলে দেয়।
ইরফান বা হাতে মাইরার হাত ধরে রেখেছে। ডান হাতে ইনায়ার মাথায় হাত রেখে বলে,
“ফাইজ তোকে কিছু বললে আমাকে সাথে সাথে কল করে জানাবি, ওকে?”
ইনায়া ইরফানের দিকে তাকালো। মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ইরফান মৃদুস্বরে বলে,
“ডোন্ট ক্রাই। পৌঁছে কল করবি।”
ইনায়া তার ভাইকে জড়িয়ে ধরল। ইরফান একটু অবাক হলো। তার থেকে সাধারণত সবাই দূরত্ব রেখেই চলে। আজ হঠাৎ ইনায়াকে তার সাথে এতোটা সহজ হতে দেখে ভীষণ অবাক হয়। ডান হাত ইনায়ার মাথায় উপর রাখে। কিছু বলে না।
কিছুক্ষণ পর ইনায়া ইরফানকে ছেড়ে দু’হাতে চোখমুখ মুছে মাইরার দু’হাত ধরে বলে,
“মাইরা আমার সাথে চলো প্লিজ!”
মাইরা কিছু বলার আগেই ইরফান আর ফাইজ একসাথে বলে ওঠে, “নো,, নাআআ।”
মাইরা আর ইনায়া অবাক হয়ে একবার ইরফানের দিকে তাকায় আরেকবার ফাইজের দিকে।
ফাইজ মনে মনে বিড়বিড় করে, ‘এই শুদ্ধ প্রো ম্যাক্স আজ তার বাড়ি গেলে, আজকের রাতটা একদম রসাতলে যাবে, অসম্ভব।’
ইরফান ভাবলেশহীন। তবে ফাইজ, ইনায়া আর মাইরার দৃষ্টি দেখে ভরকে যায়। হায় হায়! সে কি করে ফেলল! মেহমানকে মুখের উপর না করে দিয়েছে। কত বড় কেলেঙ্কারি করে ফেলেছে। পাশ থেকে শুদ্ধ এতোক্ষণ নিজেকে দমিয়ে রাখলেও এবার শব্দ করে হেসে দেয়।
ফাইজ রেগে তাকায় শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ এগিয়ে এসে মাইরার দিকে তাকিয়ে বলে,
“সিসিটিভি আমাকে আর তোমাকে সবাই ভ’য় পায় বুঝলে?”
শুদ্ধর মুখে সিসিটিভি শুনে সবাই অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকায়। শুদ্ধ সবার দৃষ্টিতে মেকি হেসে কথা ঘুরিয়ে ডান হাত দেখিয়ে বলে,
“মাইরা তোমাকে কি যে সুন্দর লাগছে!”
ইরফান রেগে তাকায় শুদ্ধর দিকে। শুদ্ধ মিটিমিটি হেসে ইরফানের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,
“ফাইজের কাজিনরা কি মুগ্ধ চাহনী নিয়ে মেয়েদের দিকে তাকাতে পারে বল! আমি তো তাদের চাহনীতে ক্রাশ খেয়ে যাচ্ছি।”
ইরফান আর মাইরা ফাইজের কাজিনদের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়া ফাইজ, মাইরা ইরফানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। শুদ্ধর কথায় ইরফান সামনে তাকায়। তাদের থেকে সামান্য ডান দিকে ফাইজের সব কাজিন দাঁড়ানো। যাদের দৃষ্টি মাইরার উপর। ইরফানের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। কিছু বলতে গিয়েও ইনায়ার দিকে তাকিয়ে জিভ গুটিয়ে নেয়। শুদ্ধ ইরফানের দিকে চেয়ে মনে মনে হাসছে। বেচারা চিবাতেও পারছে না, গিলতেও পারছে না, এমন হয়েছে।
ইরফান মাইরাকে টেনে পিছন দিকে নিয়ে ইরফান মাইরার সামনে দাঁড়ায়। মাইরা পিছন থেকে বলে,
“আপনি আমার সামনে দাঁড়াচ্ছেন কেন?”
ইরফান পিছু ফিরে শক্ত গলায় বলে,
“সাট আপ। একটা কথা বললে থা’প্প’ড় দিয়ে সব দাঁত ফেলব।”
মাইরা বিরক্ত হয়। এই লোকটার মাথায় কখন কোন ভূত চাপে, এটা একমাত্র এই লোক আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
ইরফান রেগে ফাইজকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ওদের যেতে বল।”
ফাইজ ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কাদের?”
শুদ্ধ হেসে বলে,
“শেয়ালদের।”
ফাইজ এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলে,
“কোথায় শেয়াল?”
“তোর কাজিনরা। অন্যের মুরগি ধরতে চাইছে। বুঝিস না?”
ফাইজ পিছু ফিরে তার কাজিনদের দেখে ইরফানের দিকে তাকায়। বুঝতে পেরে মুখ লুকিয়ে একটু হাসে।
উল্টো ঘুরে তার কাজিনদের উদ্দেশ্যে বলে,
“গাড়িতে ওঠ যা। এখানে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াবি না।”
ফাইজের কাজিনরা সবাই ফাইজের ছোট। কেউ বড় ভাইয়ের কথা অমান্য করল না। সবাই মেনে নিল। পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়িতে গিয়ে উঠে পড়ে সবাই। একটি ছেলে বারবার পিছু ফিরে তাকিয়ে মাইরাকে খোঁজে বোধয়। ইরফান ছেলেটার দিকে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বিড়বিড় করে, ‘বাস্টার্ড, আই উইল কি’ল ইউ।’
ফাইজ, ইনায়া গাড়িতে উঠে পড়ে। ইনায়া গাড়ির জানালা দিয়ে তার ভাই আর মাইরার দিকে তাকায়। মাইরা মলিন হেসে বা হাত নাড়িয়ে বলে, “সাবধানে যেও আপু।”
ইনায়া চোখ নামিয়ে নিল। চোখ থেকে টুপটুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ে। ফাইজ ইনায়াকে আবারও কাঁদতে দেখে মৃদুস্বরে বলে,
“লিটল কুইন, প্লিজ কান্না অফ কর। এভাবে আর ভালো লাগছে না আমার।”
শুদ্ধ ইনায়ার পাশের জানালায় একটু ঝুঁকে দুঃখ দুঃখ মুখ করে বলে,
“হ্যাঁ লিটল কুইন, তুমি কান্না করলে ফাইজের বুক ফেটে যায়, কেঁদো না লিটল কুইন।”
ফাইজ রেগে তাকায় শুদ্ধর দিকে। দাঁত কটমট করে বলে,
“বে’য়া’দ’ব যাবি এখান থেকে?’
শুদ্ধ হেসে আবারও বলে,
“ফাইজের লিটল কুইন কান্না অফ কর গো।”
ফাইজ রেগে মাথার পাগরি খুলে হাতে রেখেছিল, সেটা জানালা দিয়ে শুদ্ধর দিকে ছুঁড়ে দেয়। শুদ্ধ কেচ ধরে বলে,
“কবুল বলে রাস্তার মাঝেই একটা একটা করে খুলে ছোঁড়াছুড়ি করছিস? ছ্যা ছ্যা ছ্যা! একটু ধৈর্য ধর। তোর লিটল কুইন তো উড়ে যাচ্ছে না সোনা।”
ফাইজ হতাশ। এই বেয়া’দব এর জন্য তার জীবনে সুখ আসতে পারে না। ভাগ্যিস এ যাচ্ছে না, নয়তো তার বা’স’র ঘরে সত্যিই এই বে’য়া’দব ঢুকে বসে থাকতো। সামনে তাকিয়ে বলে,
“রাহাত গাড়ি স্টার্ট দাও।”
ফাইজদের গাড়ি স্টার্ট দিলে একে একে ছয়টা মাইক্রো স্টার্ট দেয়। শুদ্ধ আর এখানে দাঁড়ালো না। মুহূর্তেই গম্ভীর মুখাবয়বে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। কপালে চিন্তার ভাঁজ। সাথে কিছুটা রাগ, কিছু একটা ভাবতেই রাগটা যেন তড়তড় করে বাড়লো। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল।
ফারাহ জানালার পাশে বসে শুদ্ধর দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে রইল। তার মনে অভিমান জমেছে। ছেলেপক্ষ হয়ে তাদের সাথে আসলো, অথচ গেল না কেন? এখানে ওই সামিয়া মেয়েটা আছে, আর আজকেই শুদ্ধকে এখানে থাকতে হলো? তাদের গাড়ি এগিয়ে যায়, শুদ্ধ চোখের আড়াল হয়, সাথে ফারাহ’র চোখ থেকে টুপ করে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
.
ইরফান মাইরার হাত ধরে রাস্তা থেকে বাড়ির সীমানায় প্রবেশ করে। মাইরা নিঃশব্দে ইরফানের পাশে হাঁটে। ইরফান তাদের বাড়ির ভেতর না গিয়ে হাঁটার মোড় ঘুরিয় তাদের গ্যারেজে প্রবেশ করল। মাইরা ভ্রু কোঁচকালো। ইরফান তার গাড়ির দরজা খুলে মাইরার উদ্দেশ্যে বলে,
“ওঠো, ফাস্ট।”
মাইরা অবাক হয়ে বলে,
“এতো রাতে কোথায় যাবেন?”
ইরফান হাতঘড়িতে আরেকবার টাইম দেখে। ১০:৩০। মাইরাকে কোলে তুলে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসিয়ে দেয়। মাইরা চেঁচিয়ে ওঠে,
“আরে আমাকে কই নিয়ে যাচ্ছেন?”
ইরফান চুপচাপ মাইরার সিট বেল্ট লাগিয়ে সে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। এরপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ঘোরায়। মাইরা ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,
প্রণয়ের অমল কাব্য পর্ব ৪০ (২)
“কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?”
ইরফান গম্ভীর গলায় বলে,
“তোমার ভাইয়ের বাড়ি।”
মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তারা তো গ্রামে গিয়েছে।”
ইরফান তাদের বাড়ির মেইন গেইট থেকে বেরিয়ে হঠাৎ-ই গাড়ির স্পিড বাড়ায়। অতঃপর মৃদুস্বরে বলে,
“তুমিও সেখানেই যাচ্ছো, স্টুপিট।”
মাইরা চোখ বড় বড় করে তাকায়। বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
“আপনি পা’গ’ল? এখন তো অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।”
“সো হোয়াট?”
মাইরা মাথায় হাত দিয়ে বলে,
“আপনাদের বাড়িতে কত মেহমান। আমরা এভাবে এতো রাতে গ্রামে গেলে সবাই কি বলবে?”
ইরফান ঘাড় বাঁকিয়ে একবার মাইরার পানে তাকায় শীতল দৃষ্টিতে। এরপর সামনে তাকিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরায় আর গম্ভীর গলায় বলে,
“আই ডোন্ট কেয়ার।”
