প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৬
রাজিয়া রহমান
সকাল থেকে আকাশে কালো মেঘের দল বাসা বাঁধছে।কোনো অচেনা সংকেতের অপেক্ষায় থিম মেরে ছিলো।সন্ধ্যায় বাহিরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। বৈশাখ মাস আসতে এখনো ৫/৬ দিন দেরি।এর মধ্যেই প্রকৃতি তার রুদ্র রূপ নিয়েছে।
ইরা বের হতে গিয়ে দেখলো প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো ইরা।পথ বেশি না কিন্তু ভিজে জবজবে হয়ে যাবে ইরা।ইরার ভাবনার মধ্যেই রাফি ছুটে এলো। রাফি কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইরা এক দৌড় দিলো বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।
এইটুকু পথ যেতেই ইরা ভিজে গেলো।
বাসার দরজা খোলা।ইরা ভেতরে পা দিয়ে দেখে সাগর ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছে।
পরিস্থিতি কি এখনো আগের মতো আছে!
সাগরের রুমের দরজা বন্ধ দেখে ইরা বুঝে গেলো উপমা এখনো দরজা খোলে নি।
বিকেলের ব্যাপারটা এখনো মিটে নি।
শারমিন বিকেলে সত্যি সত্যি একটা বড় হিজাব গায়ে দিয়ে তৈরি হয়ে এসেছিলো বাহিরে যাওয়ার জন্য।উপমা শারমিনকে আসতে দেখে রেগে গিয়ে রুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়।এতো জোরে শব্দ হয়ন্যে ইরা ও শুনতে পায়।তখনই ইরা কান থেকে ইয়ারফোন খোলে এবং বুঝতে পারে কি হয়ে গেছে এখানে।ইরা মা’য়ের রুমের দিকে তাকায়। শারমিন আজকে নিজের রুমে ঢুকে বসে আছে।
সবসময় ইরার সাথেই শোয়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইরা নিজের রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসে।ঘন দুধের চা বানায় দুই কাপ।এক কাপ এনে সাগরের সামনে রাখে।
সাগর ইরার দিকে তাকায়। ভাইয়ের দুই চোখে রাজ্যের অস্থিরতা। ইরার কেমন মায়া লাগে।
“আগামীকাল অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ভাবীকে নিয়ে ঘুরে এসো ভাইয়া।সব কথা মা’কে জানানোর তো দরকার নেই। মা’কে বলতে ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছো।জানো ই তো মা ঝামেলা করবে।”
“আমি বলার আগেই তো উপমা ফট করে বলে বসে মা’কে।আমার অসহ্য লাগছে।সংসারের এসব ঝামেলা আর ভালো লাগে না।’”
“খামোখা মেজাজ খারাপ করে লাভ নেই। ভাবীর সময়টা যেমন এখন তার উপর তুমি মেজাজ দেখাতে পারবে না। নরম হয়ে কথা বলতে হবে। তোমার বেবির ক্ষতি হবে কিন্তু।”
“তাই বলে ও এখনো দরজা বন্ধ করে রাখবে?”
“ডাকো আবার। নরম গলায় কথা বলবে কিন্তু।”
সাগর উঠে গিয়ে দরজায় নক করে আবার। বোনের কথা মতো নরম গলায় বলে, “উপমা, প্লিজ দরজা খোলো।রাতের খাবারের সময় হয়েছে কিন্তু। এরকম জেদ করো না প্লিজ।”
উপমা জবাব না দিয়ে ফোন হাতে নিলো।ভাইকে কল দিবে।কল দিয়ে বলবে সাগর আর সাগরের মা দুজনকেই যাতে থানায় নিয়ে একটু কড়কে দেয়।তাহলে বুড়ির শিক্ষা হবে।
কল রিসিভ হতেই উপমা আগেই বলতে শুরু করে দিলো সবকিছু।
কল রিসিভ করেছে উপমার ভাবী জান্নাত।জান্নাতের মেজাজ খারাপ ভীষণ। সকালে কথা ছিলো শফিক তাদের নিয়ে জান্নাতের বাবার বাসায় যাবে।ইমার্জেন্সি কাজ পড়ায় সকালেই বের হয়ে গেলো শফিক। দুপুরে ফিরতেই বড় ননদ রুমা কল করে ডেকে নিয়ে গেলো।মাগরিবের পর রুমার বাসা থেকে ফিরেছে শফিক। অথচ জান্নাতের বয়স্ক মা অসুস্থ বলেই দেখতে যাওয়ার কথা ছিলো।জান্নাতের উত্তপ্ত মেজাজে উপমার কথাগুলো আগুনে ঘি ঢালার মতো।
ক্ষিপ্ত হয়ে জান্নাত বললো, “তোমাদের বোনদের কী আর কোনো কাজ নেই সারাক্ষণ ভাইয়ের কাছে কল করা ছাড়া? দুনিয়ায় কী একা তোমাদের ভাই পুলিশ নাকি তোমরাই একমাত্র কুয়ারার বোন?পাদে কাশে ভাইকে কেনো কল করো!
বেয়াদবের মতো আবার নিজের জামাই,শাশুড়ীর নামে বিচার দাও যে লজ্জা করে না?এই লাংয়ের ভাত আজীবন খাইবা আবার তার নামেই সারাদিন বিচার সভা বসাও!
আমার জীবনটা জাহান্নাম করে দিছো তোমরা ভাই বোনরা মিলে।”
উপমা চমকে উঠে। ভাবীর সাথে সম্পর্ক শীতল তাদের।এতো মাখামাখি নেই।
শফিক ওয়াশরুমে ছিলো।জান্নাতের চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলো।ছুটে এসে জান্নাতের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে দেখে উপমা কল করেছে।
শফিক হ্যালো বলতেই উপমা ঝরঝর করে কেঁদে উঠে।
“ভাবীর যে আমাদের নিয়ে এতো সমস্যা আগে কেনো জানাও নি?কখনো তোমাদের কল করবো না আর।মরে গেলেও না।কোনোদিন ওই বাসায় যাবো না।আব্বা আম্মা বেঁচে আছে এখনই তোমার বউ এরকম ব্যবহার করছে আব্বা আম্মা মরে গেলে তো মনে হয় আমাদের সাথে আইনিপদক্ষেপ নিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তোমার বউ।আমার ও তো ননদ আছে,আমরা কি এরকম ব্যবহার করি?মাথায় তুলে রাখি।আমার ননদ তো আমাদের ঘাড়ে চেপে বসে আছে।অথচ আমরা দুই বোন বিবাহিত তবুও তোমার বউ আমাদের সহ্য করতে পারে না।”
শফিক জোর গলায় বললো, “ওর বাপের কী তোরা কল করলে?১০০ বার কল দিবি তোরা।তোদের ভাই আমি। তোদের অধিকার আগে।”
জান্নাত নিজেকে সামলাতে পারলো না।শফিকের হাত থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলে।
শফিক জান্নাতকে ধাক্কা দেয়। দেয়ালে লেগে জান্নাতের মাথা ফুলে যায়।
উপমা রুমাকে কল করে। কল করে সবটা জানায়।
রুমা বললো, “আমি কালকেই আম্মার কাছে গিয়ে সব বলে আসবো আর ওই ছোটলোকের বাচ্চারেও কয়েকটা কথা শুনিয়ে আসবো।”
প্রিয় ইরাবতী পর্ব ৫
উপমার শান্তি লাগে।বাহিরে সাগর দরজা নক করছে।সাগরের গলার স্বর নরম থেকে গরম হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। ইরা ভাইয়ের হাত ধরে রেখেছে যাতে ঠান্ডা মাথায় ভাবীকে ডাকে।
সাগর আর নিজেকে সামলাতে পারে না।
দরজায় জোরে জোরে লাথি দিতে থাকে।
সাগরের গলার স্বর ক্রুদ্ধ শোনায়।
ইরার আতংকিত লাগে খুব।মা কেনো এরকম করে!
ভাবী কেনো এতো জেদ করে!
কেউ-ই একটু নমনীয় হয় না।কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না,বুঝতে চায় না।
ইরার মনে হয় সে একটা নরকে আছে।কবে যে এই নরক থেকে মুক্তি পাবে!
