প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪১
জান্নাত নুসরাত
এতক্ষণ ধরে ভেন্যুতে থাকা রমরম ভাব হঠাৎ করে নিস্তেজ হয়ে গেল। মানুষের ভীর ভেন্যু হতে কমে গিয়ে একত্রে জমায়িত হলো স্টোর রুমের সামনে। এতক্ষণ যাবত ভেন্যু মানুষের কোলাহলে ভো ভো করলেও তা এখন নিস্তেজ, যেদিকে চোখে যায় সেদিকেই দু দু ফুলের বাহার আর খাবারের মো মো গন্ধ! আধারে নিম্নজ্জিত রাতটার মতোই সৈয়দ বাড়ির সকলের মুখে আধার লেপ্টেছে। কারোর মুখের দিকে চোখ তুলে তাকানো যাচ্ছে না, সবাই দাঁতে দাঁত চেপে ইরহামকে খেয়ে নিবে ভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে। সৌরভির গা তখনো মেঝেতে লেপ্টে থাকলেও ওড়না টেনে দিয়েছে কাজের জন্য আনা মহিলাগুলো। পান খাওয়া মুখ দিয়ে কিছু বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি শব্দ বের করছে সাথে তাদের মহামূল্যবান বক্তব্য দিচ্ছে,”পোলা মাইয়া একলগে একরুমে কী করে! মাইয়ার ও তো দোষ আছে, একটা একলা পোলার লগে একরুমে এক বাড়িতে ঢুকে কেমতে!
কথাটা বলেছে মর্জিনা। মর্জিনার কথা শেষ হতেই ইরহাম নিজের হয়ে শক্ত গলায় সাফাই গাইল,”ও আমার সাথে আসেনি, আগে এসেছিল..!
মর্জিনার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা মুন্নি বলে ওঠল,
“হো একলগে আহো নাই, কিন্তু তুমি যে ওরে ইশারা দিয়া আগে আনছো তা সবাই বুঝবার পারছে।
ইরহাম কিছু বলতে নিবে মর্জিনা আবার বলল,
“ভোলাভালা মাইয়া মানষে মনে করছিল কোনো কথা কইবা, কিন্তু তুমি যে আইন্দার ঘরে আইন্না ওর ইজ্জত লুটবা তার কথা কী জানত, যখন জানতে পারছে তখন নিশ্চয়ই জ্ঞান হারাইয়আ লুটাই পড়ছে।
ইরহাম কপালে ভাঁজ ফেলে কিছু বলতে নিবে মুন্নি বিশ্রী ভাষায় বলে ওঠল,”আমরা তো দেখি নাই মাইয়ার কী ক্ষয় ক্ষতি হইছে, আন্দাইর ঘরে একলা কুমার কুমারী মাইয়া পোলা ছিল, মাইয়া পোলা এখনো কুমার কুমারী কিনা তাতো কইবার পারতেছি না!
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
শোহেব সাহেব নাছির মঞ্জিলে প্রবেশ করতেই কথাগুলো সুরসুরিয়ে তার কানে ঢুকল। নিজের কান দুটোকে এমন কথা বিশ্বাস করাতে পারলেন না যে তার ছেলে একটা মেয়ের ইজ্জত লুটতে নেমেছিল। অত্যাধিক আশ্চার্যনিত হলেন! দিক বেদিক ভুলে থম মেরে সদর দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েকপল। এরপর বড় ভাইদের অপমানে লাল হওয়া মুখ দেখে নিজেকে আর থামাতে পারলেন না, শক্ত হাতে এসে গাল বরাবর বসিয়ে দিলেন জোরে একটা থাপ্পড়। আকস্মিক থাপ্পড়ের হামলায় হেলে পড়ল ইরহাম বাঁ-দিকে। নিজেকে ধাতস্ত করে উঠতে পারল না তার পূর্বেই শোহেব সাহেব দু-হাতে থাবা মেরে ইরহামের কলার চেপে ধরে রক্তচক্ষুতে তাকালেন, অস্বাভাবাবিক ক্রোধ নিয়ে চ্যাঁচালেন,
”তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি বেয়াদব! কুত্তার বাচ্চা এত কষ্ট করে বড় করার এই ফল দিলি তুই! শুয়েরর বাচ্চা…!”
পরপর আরেকটা পড়ল থাপ্পড় ডানগালে। ইরহাম নিজের গালে পড়া প্রথম থাপ্পড়ের শোক কাটাতে পারেনি তার পূর্বেই দ্বিতীয়িটা পড়েছে। অবাক দৃষ্টি তোলে সম্মুখে থাকা বাবাকে দেখল চুপচাপ। কয়েক সেকেন্ডের জন্য বাবা ছেলের চোখাচোখি হলো, তারপরই গালে আবারো প্রহার হলো, ইরহাম নিশ্চল চোখে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠল
”আমার দোষ নেই আব্বু, বিশ্বাস করো আমাকে!”
শোহেব সাহেব গর্জে উঠলেন,
“তোর দোষ নেই, তোর দোষ নেই, তাহলে এই মেয়ে এখানে কেন! অজ্ঞান কেন এই মেয়ে! বিশ্বাস, বিশ্বাস করব তোকে! কী দেখে তোকে বিশ্বাস করব।
শোহেব সাহেব চিত্ত-চেতনা হারিয়ে ছেলের গালে পরপর আরো কয়েকটা থাপ্পড় বসালেন। সোহেদ সদর দরজা দিয়ে আসতে আসতে চ্যাঁচালেন,”এত বড় ছেলের গায়ে হাত তুলছে কেন তুমি! আর একটা আঙুলের ছোঁয়া যেন স্পর্শ না করে ওকে!
শোহেব সাহেব এসব কথা কানেই তুললেন-না। আবারো হাত শূন্যে তুললেন ছেলেকে মারার জন্য, সাথে চিৎকার করেরগালি দিচ্ছেন। ভদ্রলোকের গালির আওয়াজে মহিলাদের গলার আওয়াজ চাপা পড়ছে। ইরহাম টু শব্দটি করল না, স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল নিজ জায়গায়, নিজের হয়ে সাফাই ও গাইল না।
সোহেদ সাহেব ভাইকে টেনে নিয়ে গেলেন দূরে। তখনো শোহেব সাহেব চ্যাঁচাচ্ছেন,
”তোর কোন আশা পূরণ করিনি আমি, বল কোন আশা পূরণ করিনি, জবান ফুটে বলার আগেই সব এনে হাজির করেছি তোর সামনে আর তুই কী করলি কুলাঙ্গারের বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা, একবার এসে বলতি বিয়ে করবি, এই মেয়েকে তোর পছন্দ এনে দিতাম না তোকে, আমার মান-সম্মান এই করে ডুবালি কেন! আমি মানুষকে নিজের মুখ দেখাব কী করে!”
হেলাল সাহবে তখনো শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এক পা দু-পা করে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন ইরহামের সামনে। জবাবদিহিতার মতো করে শুধালেন,
”এসব সত্য ইরহাম? তোমার উপর ওঠা সকল অভিযোগ কতটা সত্যতা বহণ করে, আমি তোমার কাছে শুনতে চাই!”
ইরহাম নির্লিপ্ত! পুরুষালি চোখগুলোর সাদা অংশে রক্ত জমেছে। কিৎকাল সামনে দাঁড়ানো উৎফুল্ল হয়ে ওঠা জনতার পানে তাকাল, যারা নাটক দেখতে ভীর বাঁধছে, আরো জমা হচ্ছে স্টোর রুমের সম্মুখে। এরপর দেখল শক্ত মুখে তাকিয়ে থাকা রক্ত শূন্য ফ্যাকাসে মা চাচির মুখ-চোখ। কানে ভাসল বাবার চিৎকার, যিনি অবিরত গালি দিচ্ছেন ছেলেকে। চোখের কোটর ঘোরাতেই চোখাচোখি হলো নাছির সাহেবের সাথে, তিনি ইশারা দিলেন যতটুকু সত্য ততটুকু বলতে, উনি বিশ্বাস করে ওকে, ভরসা দিয়ে চোখের পাতা ফেললেন। ইরহাম সবটুকু অবলোকন করা শেষে হাপরের ন্যায় টেনে শ্বাস ফেলল। অপমানে রক্তিম হয়ে ওঠা বড় চাচার মুখটা দেখে চোখ বন্ধ করে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল, এরপর নিরুদ্বেগ কন্ঠে বলে ওঠল,
”যা শুনেছেন যা দেখেছেন সবই সত্য….”
ইরহামের কথা শেষ হলো না তার আগেই হেলাল সাহেব গালে চড় বসালেন। আবারো থাপ্পড় বসাতে যাবেন নুসরাত দৌড়ে এসে এক ধাক্কায় দু-পা দূরে সরিয়ে দিল ইরহামকে। চোখ দুটো বড় বড় করে শাসাল,
”আমার ভাইয়ের গায়ে হাত তুলবেন না,মুখ দিয়ে কথা বলুন!”
শেষের কথাটুকু চ্যাঁচিয়ে বের হলো মেয়েটার মুখ থেকে। হেলাল সাহেবের চোখের তারায় অদৃশ্য রক্ত ভেসে উঠেছে। নিজেও চ্যাঁচালেন,”তুই বলি দিবি আমায় আমি কী করব!
“যদি প্রয়োজন পড়ে অবশ্যই বলে দিব! ”
পাশ থেকে মর্জিনার সাথীদের মধ্যে একজনের তাচ্ছিল্য করে করা মন্তব্য শোনা গেল,
”এই মেয়ে একে তো বেদ্দপ, তার উপর করছে এখন গলাবাজি, দেখবেন কোনদিন লাঙ্গের… ”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আরশ চোখ রাঙিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারী করতে যাবে নুসরাত কর্কশ কন্ঠে বলল,
”এইইই চুপপ..! তোমাদের ভ্যা ভ্যা শুনতে আমি ইচ্ছুক নই!”
হেলাল সাহেব আর কোনো শব্দ ব্যয় করলেন না, চুপচাপ গিয়ে বসলেন বরফের মতো হয়ে যাওয়া নিজাম শিকদারের সামনে। ঝর্ণা বেগম দাঁতের পাটি চেপে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। এই ছেলেকে ধরে পিষে ফেলতে পারলে মনে শান্তি পেতেন, কিন্তু তার চিন্তায় জল ঢেলে দিয়ে নুসরাত, আহান, মমো,এমনকি ভারী গ্রাউন পরিহিত ইসরাত এসে দাঁড়াল ইরহামের সামনে। বাড়ির সবার উদ্দেশ্যে ইসরাত রগরগে আওয়াজে বলে ওঠে,”ওকে কিছু বলতে হলে আগে তোমাদের আমাদের ভেদ করতে হবে।
কলঙ্ক আর পুরুষ শব্দ দুটি যেন একে অপরের বিপত্নীক শব্দ, এই দুটো শব্দ একে অপরকে স্পর্শ করতে পারে না কিন্তু নারী আর কলঙ্ক দুটি শব্দ যেন একে অপরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে, এই শব্দটি শুধু নারী সমাজের জন্য প্রযোজ্য। ইরহামের উপর নিজেদের তোপ খাটাতে না পারলেও অবলা সৌরভিকে নিজেদের কাছে একা পেল তারা। নিজাম শিকদার যখন থেকে নাছির মঞ্জিলে এসেছেন তখন থেকেই নিশ্চুপ। আরমান নিজেও চুপচাপ, জলস্রোতের তরঙ্গের ন্যায় ঠান্ডা। বোনকে জ্ঞানহীন মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে একবার তাকিয়েছিল সেদিকে,তারপর আর ফিরেও তাকায়নি। মহিলারা তখনো ফিসফিস করে নিজেদের বিশ্রী ভাষার মন্তব্য জাহির করছেন। সৈয়দ বাড়ির কর্তীরা ও আজ নিজেদের মুখ দিয়ে টু শব্দটি করলেন না।। অনেকক্ষণ কাটার পর সকলে দেনামোনা করলেন কিছু একটা বলতে। মর্জিনা বয়স্ক হওয়ার ধরুন সবার উদ্দেশ্যে একটা প্রস্তাব রাখল,”দেখুন, কুমার কুমারী ছেলে মেয়েরা ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়েছে, ইসলামের শরিয়ত মতে মাটিতে পুঁতে একশত বেত্রাঘাত, এখন তো মেয়ে ছেলেকে এমনে বেত্রাঘাত করা যায় না, আবার দু-বাড়ির সম্মানের ও বিষয়, তাছাড়া আমি আপনাদের বাড়িতে কাজ করি অনেক বছর যাবত, অনেকদিনের চেনা জানা তাই একটা প্রস্তাব রাখব, প্রস্তাবটা গ্রহণ করলে দুই পরিবারের সম্মানহানি হবে না।
মর্জিনা কথা শেষ হতেই নিজাম শিকদার শান্ত মুখ তুলে তাকালেন৷ তার সূক্ষ্ম ঠোঁট জোড়া যেন অদৃশ্যভাবে তাচ্ছিল্য করে হাসছে। ঠোঁট দিয়ে নির্ঘত হলো একটা শব্দ,
”সম্মানহানি…তা তো হয়েই গেছে কখন!”
হেলাল সাহেব কথা বললেন না। শোহেব সাহেব শুধালেন,”কী প্রস্তাব?
“ছেলে মেয়ে দুটোর বিয়ে পরিয়ে দিন!
নাটক দেখতে আসা সকলে মর্জিনার কথায় সহমত পোষণ করল। বাড়ির মহিলারা দ্বি-মত পোষণ করার পূর্বেই শোহেব সাহেব নিজের রায় রাখলেন
”আমি রাজী আছি! আমার ছেলের ভুলের মাশুল কেন অন্যের বাড়ির মেয়ে দিবে, আমি এই বিয়েতে রাজী!”
আরমান দাদার পানে তাকাল। নিজাম শিকদার সোফায় বসা অবস্থায় ভঙ্গুর কন্ঠে বললেন,”আমি রাজী!
রাত দশটা বাজছে তখন ঘড়ির কাটায় টিকটিক করে। সৌরভির যখন জ্ঞান ফিরল তখন তার চারপাশে মানুষ কিলবিল করছে। সকলের দৃষ্টি তার দিকে। ভরা মজলিশে নিজের কাছে নিজেকে সৌরভির অপরাধী ঠেকল। অচল মস্তিষ্কে চাপ দিল কী হয়েছে তা মনে করার জন্য, একে তো মনে পড়ল না কিছুই, তার মধ্যে অতর্কিত হামলা হলো তার নাজুক হাতে। মুন্নি একহাতে টান মেরে তুলে বিছানায় বসাতে বসাতে নিজের কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,
”উইঠা বসো মাইয়া, অনেকক্ষণ হুঁশ হারাই ছিলা, ইমাম আনিতে যাইতাছে, মাথায় ঘোমটা টানো। ”
সৌরভি কপালে ভাঁজ ফেলল। শূণ্য মস্তিষ্কে এসে হাজারটা প্রশ্ন ধরা দিল, ইমাম আসবে কেন, ঘোমটাই বা টানবে কেন! চোখে প্রশ্নেত্মক ভঙ্গি ফুটিয়ে তুলে শুধাল,
”ইমাম আসবে কেন?”
সৌরভির প্রশ্নে কাজের মহিলাগুলো পান খাওয়া দাঁত বের করে খিটখিট করে হেসে উঠল। মুন্নির পাশেরজন বলে ওঠল,
”লাঙ্গের লগে তোমার বিয়ে পড়াইবার লগে আহে..! নটি বেটি বুঝবার পারে না ইমাম আহে কেন!”
সৌরভি চোখের আকার প্রকট হলো। বিস্ময় নিয়ে দেখল সবার বিশ্রী দাঁত কেলিয়ে হাসা মুখগুলো। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকেও সৌরভি ঠান্ডা মাথায় জানতে চাইল,
“কীসের বিয়ে?”
মর্জিনা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ তোমার আর সৈয়দ বাড়ির পোলার বিয়ে!”
কথা শেষে সৌরভির মাথায় ওড়না টেনে দিতে যাবে সৌরভি হাত চেপে ধরল তার। চোখ মুখে অগাধ অবিশ্বাস চড়ে বসল। জিজ্ঞেস করল,
“কোন ছেলে?”
মুন্নি ঘোমটা টেনে দিতে দিতে বলল,
“যার সাথে রুমে ঢুকছিলা নষ্টামি করতে,ইরহাম না কী যেন, ওর সাথে। ”
মুন্নির কথা শেষ হতেই সৌরভি লাফিয়ে প্রায় উঠে দাঁড়াল। বলল,
”বিয়ে করব না আমি!”
মুন্নির সাথে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলারা বিশ্রী শব্দে হেসে উঠল। রসিয়ে রসিয়ে বলল,
”লাঙ্গের লগে এক রুমে ঢুকবার পারো, বিয়ে করবার কেন পারবা না!”
সৌরভির মুখ শক্ত হয়ে উঠল। অগাধ রাগ নিয়ে শুধাল,
”লাঙ্গ কে? কার সাথে আমি রুমে ঢুকেছি?”
সৌরভির করা প্রশ্ন যেন মজাদার ছিল, সকলেই হিহি করে হেসে উঠল। বলল,
”কেন ওই পোলা, যার লগে রুমে দরজার ছিটকিনি লাগাই ছিলা..!”
“আমি কারোর সাথে রুমে ঢুকে ছিটকিনি লাগাইনি!”
মুন্নি সৌরভকে বিছানায় বসাল শক্ত হাতের চাপে। ক্যাটকেটে কন্ঠে বলে,
”মা গী বেটি বলে কী! ”
আরেকজন বলল,
“ এ তো দেখি ঘোমটার নিচে খেমটার নাচ।”
সৌরভি বিস্ময়, বিমূর্ত, বিমূঢ় নেত্রে দেখল মহিলাগুলোর ব্যবহার। যখন ধীরে ধীরে ঘটনা গুলো জোড়া দিল তখন বুঝল ওদের ইশারা কোনদিকে, না চাইতেও ঠোঁটে বিতৃষ্ণাপূর্ণ হাসির মেলা বসল।
এরপর মহিলাগুলোর কথা যতো শুনল ততো বেশি অবাক হলো, তাকে অবাক করে দিচ্ছে তার সামনে দাঁড়ানো মহিলারা, তাদের কথা দ্বারা! তার ঠোঁটে নিছক হাসি খেলা করল না চাইতেও। মেয়ে মানুষ মেয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হয় এটার মধ্যে কোনো ভুল নেই, আজ নিজে ভিক্টিম হয়ে তার প্রমাণ পেল সে। সৌরভি বসা বিছানা থেকে ওঠে দাঁড়ায়। মুন্নির হাত নিজের গা থেকে ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে শক্ত কন্ঠে বলে ওঠে
”এই বিয়ে করব না।”
মহিলারা যেন শুনেনি, একই যুগে বলে ওঠল,
“কী, কী! ”
সৌরভির পুরো রুম কাঁপিয়ে চ্যাঁচাল,
“এই বিয়ে আমি করব না, শুনেছেন আপনারা, এই বিয়ে আমি করব না!”
মুন্নি নিজের স্বাস্থ্য বিশিষ্ট শরীর নিয়ে এগিয়ে আসলো। বলল,
” কেন করবা না বিয়া? লাঙ্গের লগে এক রুমে ঢুইকা শুইতে পারো, আর বিয়া করতে পারবা না কেন?”
সৌরভির কানে বিশ্রী শব্দটা প্রবেশ করতেই দাঁতে দাঁত চাপল! নিজের জায়গায় অটল থেকে চূড়ান্ত রাগী কন্ঠে বলল
”আপনার মতো পেয়েছেন, অন্যের জামাইয়ের সাথে যেখানে সেখানে শুয়ে পড়ব, সবাইকে নিজের মতো ভাববেন না।”
কথা শেষ হতেই মুন্নির খশখশে হাতের দাবাং মার্কা এক থাপ্পড় পড়ল সৌরভির গালে। ছিমছাম গরনের মেয়েটার শুভ্র গালে ফুটে উঠল থাপ্পড়ের জোরে রক্তের স্ফূলিঙ্গ! মুখ দিয়ে না চাইতেও শব্দ নিসৃত হলো ’ভাইয়া..!’ বলে
না কেউই আসলো না তাকে বাঁচাতে। অপরিচিত মানুষের ভীরে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সৌরভি। থাপ্পড়ের জোরে গালে চিনচিন ব্যথা হচ্ছে, এক হাত গালে রেখে তখনো অবিচল কন্ঠে চ্যাঁচাল,
”বিয়ে করব না আমি। বুঝতে পারছেন আপনারা! বিয়ে করব না আমিইইই!”
মুন্নি কানেই তুলল না কথাগুলো। টেনে নিয়ে বসাল বিছানায়, শক্ত হাতে মাথা থেকে পড়ে যাওয়া ঘোমটাখানা আবারো টেনে দিতে দিতে বলল,
”নষ্টামি করবার পারবই, বিয়ে করবার পারবি না কেন! বিয়ে করবি তুই, আইজ, আর এক্ষন!”
সৌরভি নিজের ১৯ বছরের জীবনে এতটা অসহায় বোধ করেনি যতটা আজ অনুভব করছে। কোথায় তার ভাই, কোথায় তার দাদা, কোথায় নুসরাত, কোথায় সবাই! আপন বলতে কেউই নেই আশেপাশে! অক্ষিকোটরের ভেতরে টলটল করল পানি। মুন্নিকে ধাক্কা মেরে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসলো রুমের বাহিরে৷ দম আটকে দৌরে নিচে নামতে নামতে ডাকল,
”দাদা..!
নিজাম শিকদারের কানে নাতনীর গলার আওয়াজ পৌঁছালেও চুপ করে রইলেন। নিজের কাঁপা হাতগুলো চেপে ধরলেন নির্বিকার মুখে হাঁটুতে। সৌরভির পাগলের মতো দৌড়ে এসে দাঁড়াল নিচে দাদার সামনে। সেখানে শুধু উপস্থিত সোসাইটির বুজোরগেরা! চশমার আড়াল হতে কুঁচকানো চোখ বেরিয়ে আসলো তাদের, আর নিবিষ্ট হলো সামনে দাঁড়ানো সৌরভির উপর। সে সেসবের তোয়াক্কা করল না, ভাঙা গলায় চ্যাঁচাল,”দাদা আমি বিয়ে করব না।
নিজাম শিকদার চোখ তুলে তাকালেন না। বললেন শুধু,”বিয়ে করে নাও!
সৌরভি চ্যাঁচাল,
“তুমি আমাকে এভাবে শাস্তি দিতে পারো না দাদা..! আমার থেকে মুখ ফিরিও না, আমি বিয়ে করব না। আমাকে বিশ্বাস করো, আমি কিছুই করিনি! রাগ করেছ আমার সাথে তোমার কথা শুনিনি বলে, আর কখনো তোমার কথা অগ্রাহ্য করব না, দাদু প্লিজ বাড়ি চলো, এখানে আমার দম আটকে আসছে, আমি মরে যাব!”
নিজাম শিকদার চুপ রইলেন নাতনীর আহাজারিতে! সৌরভি ভাইয়ের হাঁটু কাছে বসে গে ফুপিয়ে উঠল। বলল,
”প্লিজ ভাইয়া, চলো আমরা বাড়ি চলে যাই, আমি বিয়ে করব না ভাইয়া, দয়া করে আমায় বিশ্বাস করো, আমি, আমি কিছুই করিনি, সব দোষ দেওয়া হচ্ছে আমাকে, ভাইয়া বিশ্বাস করো আমাকে!”
আরমান উঠে দাঁড়াল। রক্ত জবার ন্যায় চোখ দুটো দিয়ে অসহায়, ভঙ্গুর, চোখে পানি লেপ্টানো বোনকে দেখল৷ গালে হাতের পাঁচ আঙুলের চিহ্ন দেখে নিল মায়ামায়া চোখে। তবুও উচ্চারণ করল,
”বিয়ে করে নে সৌরভি, সুখে থাকবি!”
এরপর কী হলো, সৌরভি নিজের চোখ টলটলে পানি ছেড়ে দিল। এক গাল বেয়ে টুপ করে চোখের জল পড়ল। চোখ তুলে চক্ষু দর্পণে ভাসল ইরহামের সুদর্শন মুখ, তখন সকল ক্ষোভ গিয়ে পড়ল তার উপর। একদলা থুতু ছিটকে বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। অস্বাভাবিক কন্ঠে চ্যাঁচাল,
”লম্পট, জানোয়ার, শুয়োর, কুত্তা, আল্লাহ এর হিসেব নিবে তোর কাছ থেকে শয়তান! ইবলিশ তোর ধ্বংস হবে! তোর ধ্বংস নিশ্চিত!*
সৌরভিকে দু-জন মহিলা এসে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল। নিজাম শিকদার চোখ থাকতেও অন্দহের মতো ব্যবহার করলেন, আরমান নিশ্চুপ, বোনকে অসহায় হয়ে চ্যাঁচাতে দেখেও! তখনো সৌরভি চ্যাঁচাচ্ছে,
”তুই বললি না কেন ওখানে কিছু হয়নি, তুই কেন বললি না, তুই কেন চুপ হয়ে বসে থাকলি, লুচ্চা, বদমাস, ইতর, অভিশাপ লাগবে আমার, এক মজলুম এর অভিশাপ লাগবে তোর গায়ে, তোর ধ্বংস নিশ্চিত! ”
সৌরভিকে যখন দো-তলায় তোলা হলো তখন কেঁদে উঠল সে শব্দ করে। চ্যাঁচিয়ে ডাকল,
”আব্বু..! ”
টুপ করে আরেক ফোটা জল গাল গড়িয়ে পড়ল। অস্তিমিত রবির ন্যায় রক্তিম চেহারা ঘুরিয়ে তাকাল সাহায্যের আশায়। নেই কেউ নেই! আসছে না কেউ তাকে বাঁচাতে! ভঙ্গুর গলায় নিঃসৃত হলো,
”আমার আব্বু থাকলে আজ আমাকে এখানে ফেলে রাখত না ভাইয়া, আমাকে বিশ্বাস করত, তোমরা সবাই পর, তোমরা আজ আমায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলে, তোমরা দু-জন কেউ না আমার! তোমরা দু-জন স্বার্থপর।”
আরমান উঠতে নিল নিজাম শিকদার তার হাঁটু চেপে ধরলেন শক্ত হাতে, নিচের দিকে ঝুঁকে যাওয়া চোখে ইশারায় বোঝালেন, না।
সৌরভিকে খাটে বসানো হলো। জোর করে গালের মাড়ি চেপে ধরে মুন্নি, শক্ত হাতে ঠোঁট লাল রঙে রাঙাতে যাবে হাত থামল তার। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরতেই নুসরাতের রাগী রাগী চেহারা অবলোকন হলো! মুন্নি ভ্রু উপরে তুলে জানতে চাইল,”হাত ধরছ কেন মাইয়া?
নুসরাত নির্বিকার চিত্তে বলে ওঠল,
‘“হাত সরান ওর গাল হতে!”
“কেন ওর ঠোঁট রাঙাবো না?
মুন্নি তিরিক্ষি মেজাজে কথাটা বলে ওঠল। নুসরাত মুন্নির ভারী হাতটা গাল থেকে সরিয়ে দিয়ে দেখল লাল বর্ণ ধারণ করা চেহারা। জিজ্ঞেস করল,
”কে মেরেছে? ”
পুরো রুমের ফিসফিস করে চলা কথাবার্তা থেমে গেল নিমেষে। নুসরাত আবারো চ্যাঁচাল,
”ওর গায়ে হাত তুলেছে কে? কোন সাহসে ওকে থাপ্পড় মেরেছ? কে এই সাহস দিয়েছে?”
মর্জিনা নুসরাতের চ্যাঁচানো তে বিরক্ত হয়ে বলে ওঠল,
“মেয়ে তুমি ভারী বেদ্দপ, চেচামেচি করতাছ কেন? তাছাড়া কথা শুনতেছিল না তাই মেরেছে? এতে চ্যাঁচানোর কী আছে! ”
“এইই চুপপ, লেকচার ঝাড়তে বলিনি আমাকে, যা করতে আসছ তা করো, আমাদের বাড়ির বিষয়ে একদম নাক গলাবা না! ”
মন্টুর স্ত্রী সাজনা বেগম বললে,
“তো এই মেয়ে বিয়ে করবে না, বিয়ে করবে না বলে চ্যাঁচাচ্ছিল, থাপ্পড় না মারলে তো মুখ বন্ধ করছিল না!”
“চ্যাঁচাবে, আর বেশি করে চ্যাঁচাবে, ভুলে যেও না ও আমাদের বাড়ির বউ, সৈয়দ বাড়ির বউ ও, সম্মান দিয়ে কথা বলো, এই ব্যবহার যেন ওর সাথে না দেখি!”
সাজনা বেগমকে মুন্নির সাথের জন কানাঘুষা করে বলে ওঠল,“এই মেয়েও দেখবেন কোনদিন লাঙ্গের সাথে ভাইগা যাইব!”
নুসরাত শুনে ফেলল কথাটা। পরণের এমারেল্ড গ্রিন কালার গ্রাউন চেপে ধরল হাত দিয়ে। বলে ওঠল,
”নিজের মেয়ের মতো ভাবো আমায়!”
নুসরাত ভ্রু যুগলের মধ্যিখানে ভাঁজ ফেলল সামান্য। আবারো নিস্প্রভ কন্ঠে বলল,
”লাঙ্গের সাথে ভেগে যাব! হ্যাঁ, একশো বার ভাগব, আমার বাপের খেয়ে ভাগব, তোমার কোনো সমস্যা, সমস্যা হলে বলো, উচ্চমানের মলম কিনে দিব, লাগালে জ্বালা কমে যাব।”
সৌরভি ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠল। নুসরাতের কাপড়ের এক কোণো চেপে ধরে ফুপিয়ে ওঠে বলে,
”আমি বিয়ে করব না, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, দয়া করে আমায় এখান থেকে বের কর! আমি কিছু করিনি, ওখানে কী হয়েছে আমি জানি না, তুই আমাকে বিশ্বাস করিস না, দয়া করে এখান থেকে বের কর আমায়।”
নুসরাত একহাত রাখল সৌরভির মাথায়, ভরসা দিয়ে বলল,
”আমি বিশ্বাস করি তোকে!
পুরো রুমে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফোন বের করে কল দিল ইসরাতকে। রগরগে গলায় বলল,
”এই তুই আয় আমার রুমে, আমি একটু বের হচ্ছি, মসজিদে যাব।
সৌরভি আঁতকে উঠল। টলটল চোখে তাকাতেই নুসরাত নিচের দিকে ঝুঁকে এসে কানের কাছে ফিসফিস করে স্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল,
”আজ আমি যদি চ্যাঁচাই তাহলে তুই বেঁচে যাবি এখান থেকে সৌরভি, কিন্তু যখন রাস্তায় হাঁটবি নষ্ট মেয়ে বলে তোর দিকে আঙুল উঠবে, ইরহামের দিকে আঙুল উঠবে না! তুই নারী তোর এই বিষয়টা ভুলে গেলে চলবে না, তোর সবথেকে বড় শত্রু তোর মতো ওই মহিলারা, এরা বিষ গুলে দিবে তোর জীবনে, বড় বোন হিসেবে বলছি বিয়ে করে নে! আমি নুসরাত নাছির তোকে কথা দিচ্ছি সুখে থাকবি তুই, কোনো কিছুর কমতি থাকবে না। বিয়ে করে নে, রাজী হয়ে যায় সৌরভি, চ্যাঁচিয়ে লাভ হবে না!”
এরপর সৌরভি আর চিৎকার করল না বিয়ে করব না বলে, নিশ্চুপ জল তরঙ্গের ন্যায় হয়ে গেল। বিছানায় গা ছেড়ে দিয়ে বসে রইল। ঠোঁটে বিরাজ করল জীবনের প্রতি নিছক তাচ্ছিল্যের হাসি, চোখের তারায় কিছু একটা, সময় কাটল, আশপাশে বসে থাকা মানুষ তখনো অপেক্ষারত পরিবর্তী নাটক দেখার জন্য। এসে দলবেঁধে বসছে সৌরভির সামনে। সৌরভি মানুষগুলোকে দেখল না, সে দেখল খাটিয়া আনতে যাওয়া হচ্ছে তার জন্য, আর সেই খাটিয়া না চাইতেও জীবনের পরিহাসে কবুল করতে হবে তাকে। সে তো চায়নি তার জীবনে ওই ইতর লোকটা আসুক, সে তো ঠিকভাবে ওই ছেলেটার মুখটা পর্যন্ত পরিদর্শন করত না ঘৃণ্ণার প্রহারে, জীবন কী হাস্যকর তাই না, সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যক্তিটিকে তার তকদিরে লিখা হয়েছে আর আজ সে সেই ব্যক্তিটিকে কবুল করতে চলেছে। সৌরভি মৃত মানুষের মতো পলকহীন তাকিয়ে রইল দেয়াল ঘড়ির পানে।
ইসরাত মেয়েটার মায়াময় চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকল চুপচাপ! চেহারার লাভণ্য যেন কান্নার জৌলুস্যে বেড়ে গেছে! নির্বাক সে নিয়তির এই পরিহাসে, কী অদ্ভুত ঘটনা, কে জানত আজ এই দিনে এভাবে তাদের দু-জনের বিয়ের ঘন্টা বেজে যাবে।
আরশ নিজের গা থেকে ধূসর বর্ণের স্যুট ছাড়াতে ছাড়াতে ফিরে দেখল পেছনে দাঁড়ানো নুসরাতকে। গায়ে কালো লেদার জ্যাকেট জড়ানো তার, চুলগুলো পনিটেল করে বাঁধা! বারবার তাড়া দিয়ে বলছে তাড়াতাড়ি আসতে। আরশ নিজের গলার টাই টেনে ঢিলে করে নিয়ে এগিয়ে গেল। পরণের কাপড় খুলতে খুলতে এসে দাঁড়াল নুসরাতের সামনে। নুসরাত দরজার সম্মুখে দাঁড়ানো, অপেক্ষা করছে আরশের কাপড় চেঞ্জ করা শেষ হওয়ার! যখন দেখল কাপড় চেঞ্জ না করে লোকটা তার সামনে চুপচাপ এসে দাঁড়িয়েছে তখন ভ্রু যুগল আপনা-আপনি উপর উঠে গেল। ভেসে আসলো অস্পষ্ট কন্ঠস্বর,
”কাপড় চেঞ্জ করে আসুন তাড়াতাড়ি! ”
আরশ দরজা চেপে ধরে নিচের দিকে ঝুঁকে আসলো। নুসরাত দু-পা পেছনে সরে যেতেই আরশ দরজা টেনে ধড়াম করে মুখের উপর লক করে দিল৷ নুসরাত হাতের গুচ্ছি এর ঘড়িতে চোখ বোলাল, দশটা চল্লিশ বাজছে টিকটিক করে। তার মনে প্রশ্ন দানা বাঁধল, আজকের রাতটা একটু বেশিই লম্বা নয়-কি! নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে দেখল আরশ এখনো আসেনি। দরাজ গলায় ডাকল,”এই যে শুনছেন…
আরশ ক্যালভিন ক্লাইনের বক্সার পরতে পরতে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল,
”আমাকে বলছেন? ”
“হ্যাঁ! আর কত মিনিট লাগবে আপনার?
আরশ কালো রঙের লেদার জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে রুম থেকে বের হতে হতে বলে ওঠে,
” থারটি সেকেন্ড!”
আরশ রুমের নব খুলে বের হয়ে চুলগুলো পেছনে ব্যাকব্রাশ করল। ঘাড় ছুঁইছুঁই চুলগুলো পেছনের দিকে গিয়ে আবারো কপালে এসে নিজেদের জায়গা করে নিল। কড়া কুস্তুরীর সুভাস তখন চারিদিকে মো মো করছে। নুসরাত আরশের থেকে গণে গণে দু-হাত সরে দাঁড়িয়ে থেকেও কুস্তুরীর ঘ্রাণ পেল। নুসরাত হাঁটতে হাঁটতে শুধাল,
”পারফিউমের ভেতর গোসল করে এসেছেন?”
আরশ কপালে ভাঁজ ফেলল। নিজের গা থেকে বের হওয়া কুস্তুরীর গন্ধটুকু নিজেও তখনো উপলব্ধি করতে পারেনি। গা শুঁকে নিয়ে শুধাল,
“না তো, আমি গত দু-দিন যাবত কোনো প্রকার পারফিউম-ই ব্যবহার করিনি।”
নুসরাত কিছু বলতে নিবে আরশ নুসরাতের মাথা নিজের হাত দিয়ে টেনে ধরল, নিজের সন্নিকটে মাথাটা এনে বুকের কাছে চেপে ধরে বলল,
”দেখো কোনো পারফিউম এর গন্ধ নেই।”
নুসরাত নিজের মাথা আরশের থেকে দূরে সরিয়ে নিল। বলল,
“বুঝেছি, আপনার থেকে প্রাকৃতিক সুভাস বের হচ্ছে। এবার পা চালিয়ে চলুন!”
আরশ পোর্চে এসে সৈয়দ বাড়ির গ্যারেজের দিকে পা বাড়াতেই নুসরাত চ্যাঁচাল,
”ওদিকে কই?”
আরশ ভ্রু উচিয়ে বলল,
“গাড়ি আনতে!”
নুসরাত অবাক কন্ঠে শুধাল,
“গাড়ি দিয়ে কী করবেন?”
“গাড়ি আমাদের ঘাড়ে চড়ে ইমামকে আনতে যাবে। ”
নুসরাত বেয়াক্কলের মতো বলে ওঠল,
“এমা গাড়ির চারটা চাকা থাকতে আপনার আমার ঘাড়ে চড়বে কেন!”
“ গাড়ির শখ উঠেছে, মিসেস স্টুপিড নুসরাত নাছিরের ঘাড়ে চড়ার।”
নুসরাত নাক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। বলল,
“শুনুন আরশ ভাই…
আরশ নুসরাতকে কেটে দিয়ে শুধাল,
“আমাকে বলছ?”
নুসরাত তেতো কন্ঠে বলল,
“না আপনার পেছনে দাঁড়ানো আপনার প্রেমিকাকে বলছি!”
আরশ কিছু বলতে নিবে নুসরাত দরাজ গলায় বলল,
“এক মিনিট আরশ ভাই, কথা বলবেন না, আমাকে বলতে দিন।”
আরশ স্থির হয়ে দাঁড়াল। ইশারা করে বলতে বলল। নুসরাত ধীরে সুস্থে বুঝিয়ে বলল,
”আমাদের কথা বললেই ঝগড়া হয়, তাহলে উচিত না দু-ঘন্টা আমাদের কোনো কথা না বলা..!”
আরশ দু-হাত বুকে আড়াআড়ি বেঁধে নুসরাতের শোনার মতো করে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
”ঝগড়া তো করিস তুই, আমি কী টু শব্দ করি?”
নুসরাত অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে নিজের দিকে আঙুল তুলল। ভ্রু উপরে তুলে প্রশ্নাতীত কন্ঠে বলল,”আমি, আমি করি ঝগড়া!”
“অবশ্যই তুই করিস ঝগড়া, আমি তো মুখ থেকে শব্দ বের করিনা।”
নুসরাত দু-হাত উপরে তুলে দোয়া করল,
“ আল্লাহ এই লোক যদি সত্যি কথা বলে তাহলে এই লোককে তুলে নাও, আর মিথ্যে বললেও তুলে নাও, এমন বড় ভাইয়ের আমার প্রয়োজন নেই।”
আরশ চ্যাত করে উঠল। হিসহিসিয়ে কিছু বলতে নিবে নুসরাত বলল,
“”আপনি না ঝগড়া করেন না?”
আরশ অতি কষ্টে নিজেরমুখ বন্ধ করল। নুসরাত হাসি হাসি মুখ করে বলল,
”হাসুন, হাসুন..!”
আরশ না চাইতেও হাসল ঠোঁট টেনে সামান্য। নুসরাত আরশের গাল দুটো টেনে দিতে দিতে বলল,
”দ্যাটস মাই বয়..!”
বাড়ির বাহিরে রাখা বাইকে কে সামনে বসবে আর কে পেছনে বসবে সেই নিয়ে এক চোট ঝগড়া হলো দু-জনের। নুসরাত বলল,
”আমার বাইক তাই আমার চালানো যুথসই বেশি।”
আরশ বলল,
“আমি বয়সে বড়, তাই আমার চালানো বেশি ভালো হবে।”
নুসরাত কোমরে হাত রেখে আরশকে বোঝানোর চেষ্টা করল,
” আমি বাইক চালালে দু-মিনিটে আপনি ডেস্টিনেশন পৌঁছান আর না পৌঁছান আপনার রুহ ইনশাআল্লাহ আল্লাহর বাড়ি পৌঁছে যাবেন। ”
আরশ বলে ওঠল,
“আমিও বাইক চালালে তুই একদম বিনা টিকেটে তোর শ্বশুর বাড়ি পৌঁছে যাবি।”
নুসরাত চ্যাঁচাল,
“আরশ ভাইইইইইই…
“নুসরাত নাছিরররর…”
“বাইক আমার!
“বউটা আমার!”
নুসরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ চোখ গুলো পিটপিট করে বলল,
“আমি বাইক চালালে আপনি বুঝতেই পারবেন না, এটা বাইক নাকি উড়োজাহাজ।”
আরশ হেলমেট মাথায় পরে নিয়ে বলে ওঠল,
“আমি বাইক চালালে তুই বুঝবি এটা বাইক, এবার চুপচাপ পেছনে উঠে বস!”
নুসরাত হেলেদুলে হেলমেট পরতে নিবে আরশ শক্ত হাতে পরিয়ে দিল তা। আদেশ করল,
” ঝটপট পেছনে উঠে বস, এগারোটা বেজে গেছে।”
নুসরাত আরশের কাঁধে হাত রেখে উঠে বসতে বসতে বলল,
”সব দোষ আপনার!”
এগারোটা সাতচল্লিশ মিনিটে ইমাম সাহেবের বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে পৌঁছাল তারা। টিনের গেটে শক্ত হাতে আরশ থাপ্পড় দিয়ে গমগমে স্বরে ডাকল,
”ইমাম সাহেব আছেন..!”
নুসরাত আরশকে ঠেলে নিজে জায়গা করে নিল। শুধাল,”এভাবে ডাকে কেউ..?”
আরশ পালটা প্রশ্ন করল,
“তাহলে কীভাবে ডাকে?”
নুসরাত গলা খাঁকারি দিয়ে পরিস্কার করে নিল। তেরছা চোখে আরশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিয়ে ডাকল,
” এইইইইই…. ইমাম সাব, বাড়িতে আছেন?”
আরশ নুসরাতের আকস্মিক চেচামেচিতে বিরক্ত হলো, চোখ মুখে তা স্পষ্ট ফুটে উঠল! দন্তপাটি চেপে বলল,
”আস্তে..!”
নুসরাত এসব কানেই তুলল না, এক নাগাড়ে ডাকল,
“ও ইমাম সাব, কই গেলেন? আসছেন না কেন? পায়খানা করতে গেছেন?
আরশ দাঁতে দাঁত চেপে সাবধান করে বলে,
“নুসরাত স্টপ দিজ ফাকিং ননসেন্স শিট..!
নুসরাত মুখ বন্ধ করে দাঁড়াল। আরশ গম্ভীর গলায় ডাকল,“মসজিদের ইমাম আছেন বাড়িতে..?
ইমাম সাহেব বাড়ি থেকে বের হলেন, ঘুম ঘুম চোখে। অন্ধকার চিড়ে দেখা মিলল দুটো মুখের। ভদ্রলোক বুঝতে পারলেন না এদের এত রাতে আসার কারণ, ভ্রু কুঞ্চিত করে জানতে চাইলেন,
”পালিয়ে আসছ নাকি বিয়া করার জন্য?”
নুসরাত দু-পাশে মাথা নাড়াল। ইমাম সাহেব নিজের চওড়া কপালে ভাঁজ ফেললেন। জানতে চাইলেন,
”তাহলে কেন আসছ? ”
নুসরাত নির্বিকার মুখ বানিয়ে বলল,
“চলেন, বিয়ে পড়াতে হবে।”
ইমাম সাহেব আধারে নিমনজ্জিত রাত দেখলেন আকাশ পানে তাকিয়ে। হিমেল বাতাস বইছে প্রকৃতিতে। তা দেখে নিয়ে, দ্বিমত পোষণ করলেন যেতে,
“এত রাতে কাচা ঘুম রেখে যাব! না যাব না! অন্য কেউরে নিয়া যাও! বৃষ্টি হবেও মনে হচ্ছে আজ রাতে, আগামীকাল বিয়া পড়ানোর হলে এসে বলিও, আমি আসব বিয়ে পড়াতে।”
ভদ্রলোকের কথায় মাথায় বজ্রপাতের মতো হলো নুসরাতের। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে রুঢ় গলায় শিওর হতে জিজ্ঞেস করল,
“যাবেন না আপনি বিয়ে পড়াতে?”
ইমাম সাহেব রগরগে কন্ঠে স্পষ্ট বললেন,
“না!
আরশ চিন্তিত কন্ঠে বিড়বিড় করে,
“তাহলে এখন কী হবে?”
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৪০ (৩)
নুসরাত হে হে করে হেসে ওঠে আরশের কথার প্রতিত্তোরে বলে,“কী হবে আর, ইমাম সাবকে তুলে নিয়ে যেতে হবে,আরশ ভাই বাইকের পেছনে দড়ি আছে নিয়ে আসেন তো!
ইমাম সাহেব কপালে ভাঁজ ফেলে জানতে চাইলেন,
“দড়ি দিয়ে কী করবে?
নুসরাত নির্লিপ্ত কন্ঠে উত্তর দিল,
“আপনারে বাইকের পেছনে বাইন্দা নিয়া যামু..!
