প্রিয় বেগম সিজন ২ পর্ব ১৩
পুষ্পিতা প্রিমা
সকাল নাগাদ অপরূপা মহলে হাজির হলো। একটা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে। গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে দিল পয়সা দিয়ে। তারপর মহলে প্রবেশ করতেই সকলেই তাকে দেখে হতভম্ব। একেএকে হাজারও প্রশ্ন করে বসলো সবাই। অপরূপা নিজেও হতভম্ব। সে চিরকুট রেখে গিয়েছিল সবাই কি তা পায়নি?
সবার প্রশ্নের মুখে জানালো, সে একটা মসজিদের এক ইমাম সাহেবের কাছে গিয়েছিল। সন্দেহ হচ্ছিল শেহজাদের উপর জাদুটোনা করা হয়েছে তাই ওখানে গিয়ে কোরআনি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে গিয়েছিল। ইমাম সাহেব জানালেন দু-তিনদিন সময় লাগবে তাই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু তারমধ্যে সামাদ আর মুরাদের খপ্পরে পড়ে সে। কোনোমতে তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে বাঁচলে টিংটিংকে বাঁচাতে পারেনি। তারা সাথে করে টিংটিংকে নিয়ে গিয়েছে।
অনুপমা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে লম্বা একটা দম নিলেন। অপরূপা চুপটি করে মায়ের বুকে পড়ে থাকলো। ছোট করে বলল,
‘ আমি ঠিক আছি। ‘
অনুপমা তাকে ছাড়লো। কিছু বলল না। খোদেজা এসে তার মুখে হাত বুলিয়ে বললেন,
‘ টিংটিংকে কাশিম একটা লোকের কাছ থেকে কিনে নিয়ে এসেছে। সামাদ বোধহয় তাকে বিক্রি করে উল্টাপাল্টা কথা শিখিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঘটনা তো যা ঘটবার তা ঘটে গেছে। শেহজাদ তোমাকে খুঁজতে ইন্দিরাপুরে গিয়েছে। জাহাজের খবর আসেনি এখন অব্দি। ‘
শাহজাহান সাহেব বললেন, বউ ফিরে এসেছে। তাই আমাদের আনন্দিত হওয়া উচিত। শেহজাদ সাফায়াত সকলেই আত্নরক্ষা জানে। রূপা তুমি বিশ্রাম করো। ‘
অপরূপা একটা পানির বোতল, কিছু আরবিতে লেখা কাগজ খোদেজাকে দিয়ে বলল, কাগজটা ডুবিয়ে পানি খাওয়াতে হবে উনাকে। সুস্থ হয়ে যাবেন।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
খোদেজা তার কথায় স্মিত হেসে বলল, আমরা তার চিকিৎসা করেছি। ওর বাহুতে একটা তাবিজ পড়ানো ছিল। সেটা খুলে নিয়েছি। ও আগের চাইতে সুস্থ। চিন্তার কিছু নেই। ‘
হামিদা বলল, কি সাহসী মেয়ে! একা একা ওই জাদুকর দুটোর সাথে লড়াই করেছ? আমার তো ওদের দেখতেই ভয়ংকর লাগে। আর হ্যা তোমার পতিদেব এখন সুস্থ ঠিক কিন্তু বেগমকে না পেয়ে তো আরও অসুস্থ হয়ে উঠেছে। ‘
অপরূপা মলিন হাসলো। তারপর বলল,
‘ এগুলো রাখুন। ‘
অনুপমা জিজ্ঞেস করলো,
‘ আর কোথাও যেওনা মা। চারপাশে তোমার বিপদ। ‘
অপরূপা উনার দিকে কিয়ৎক্ষণ চেয়ে বলল,
‘ শেরহাম সুলতানের সাথে কথা আছে। ‘
খোদেজা তার হাত ধরে রাখলো।
‘ কোনো দরকার নেই। সে আবারও জাদুটোনা করে মুখের কথা বন্ধ করে দেবে। নিজেকে বিবাদে জড়িওনা যতদিন অব্দি শেহজাদ ফিরে আসে। ‘
অপরূপা বলল,
‘ নাহ। উনি কি চান আমাকে জানতে হবে। যা চেয়েছে সবই তো পেয়েছে। তাহলে কেন এখনো এসব বন্ধ করছে না? ‘
খোদেজা তার হাত ধরে বলল,
‘ দোহাই লাগে। শেহজাদ নেই ও সাহস পেয়ে যাবে তোমাকে আঘাত করার। ওর মতো কাফের সব পারে। গলা টিপে মানুষ মারতেও দু’বার ভাবেনা সে। এমন করো না। রাগ সংবরণ করো। ধৈর্য ধরো। শেহজাদ ফিরুক। একটা না একটা মীমাংসা হবেই। ‘
অপরূপা গেল না। তটিনী চুপচাপ শুনলো কিছু বললো না। সোহিনী তাকে কিছু বলতে না দেখে আঁড়চোখে তাকিয়ে গটগট পায়ে হেঁটে চলে গেল সেখান থেকে।
সায়রা এসে অপরূপার কাঁধ ধরে নিয়ে যেতে যেতে ফিসফিস করে বলল,
‘ ভাইজান ফিরে এসে তোমাকে এমন বকুনি দেবেন। ‘
অপরূপা কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকালো। বলল,
‘ আমাকে? ‘
‘ হুম। ‘
অপরূপা ভাবনায় মজে গেল। সে কথাই বলবে না।
তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। হোক জাদুর বশবর্তী হয়ে, কষ্ট তো দিয়েছেই। শেহজাদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনতে লাগলো সে।
কুমুদিনীও মহলে ফিরে এল। তার মুখ হাত পা বেঁধে অতিথিশালায় ফেলে রেখেছিল শেরহাম।
তাকে দেখে অপরূপা ফোঁসফোঁস করে উঠতেই সে অপরূপার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদেকেঁদে জানালো ওরা তাকে ভয় দেখিয়েছে, কথামতো কাজ না করলে জানে মেরে ফেলবে বলে, সে কথা শুনতে চায়নি, সে নিজেই জাদুর বশীভূত হয়েছিল। অপরূপা সবটা শুনে তাকে ক্ষমা করে।
কিন্তু তটিনী তার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। তারমানে শেরহাম সুলতান তাকে বোকা বানাচ্ছে!
তার দুর্বলতা টের পেয়েই হয়তো তাকে বোকা বানিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সে। ছিঃ! কতটা নিকৃষ্ট। নিজের উপর নিজের রাগ লাগলো তার। শেষমেশ তাকেও বোকা বানিয়ে ছাড়লো এই চতুর শেরহাম সুলতান। যার গায়ে মিশে আছে শয়তানের রক্ত। অথচ কতখুশি হয়েছিল সে। মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব পাল্টে যাচ্ছে!!
অতিথি শালার দিকে হনহনিয়ে গেল সে। শেরহাম বিছানায় অস্ত্রসস্ত্রের মাঝে বসা ছিল।
তটিনী যেতেই চোখ তুলে তাকালো। হনহনিয়ে উঠে এসে বলল,
‘ বারবার বলেছি এখানে আসবি না। ‘
তটিনী সরোষে চেয়ে থেকে বলল,
‘ সত্যি করে বলো তুমি জাদুটোনা করেছ কিনা? সামেদ্দে মুরেদ্দেকে বেঁধে রেখেছে কেন? ‘
শেরহাম চোখ সরু করে বলল,
‘ আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে রাজী না। ‘
‘ আমাকে দিতে হবে। ‘
শেরহাম দাঁতে দাঁত চিবিয়ে এগিয়ে এসে হাত চেপে ধরে বলে,
‘ কেন? কে তুই? ‘
প্রশ্নের উপর তটিনীর টলটলে দিঘীর মতো চোখের জলে স্পষ্ট লেখা ছিল। শেরহাম বুঝেও বুঝলো না। ঘাড় ধরে বের করে দিল তটিনীকে।
তটিনী দরজায় মাথা ঠুকে দিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
‘ আমি নতুন জীবনের দিকে যাব আর তুমি যাবে মৃত্যুর দিকে। তাহলে কেন আমাকে জড়ালে? ‘
শেরহামের পা জোড়া থমকে গেল।
জ্ঞান ফেরার পর শেহজাদ সমুদ্রতটে বসা ছিল সাফায়াতের সাথে। চার্চের সেই ফাদার চার্চে ফিরে গিয়েছেন তার জ্ঞান ফেরার পর। সৈন্যদের উনার সাথে নিয়ে গেলেন।
সৈন্যরা ফিরে এসে জানালো চার্চের পাশেই একটা বড়সড় খ্রিষ্ট মহলের দেখা মিলছে। সেখানে তারা আশ্রয় চাইতে পারে। শেহজাদ দেরী করলো না। আবেদন পাঠিয়ে দিল তাদের আশ্রয় এবং রূপনগরে ফেরার জন্য সাহায্য চায়।
সেই মহলের শাসনকর্তারা তাদের আবেদন মঞ্জুর করলেন। তাদের আশ্রয় দিলেন। তবে জানা গেল তারা খ্রিষ্টধর্মের। রূপনগরের সম্রাট পরিচয় পেয়ে তারা বেশ জাঁকজমক করে শেহজাদকে অভ্যর্থনা জানালো।
সকলেই তাকে সহজেই আপন করে নিল। যা শেহজাদের জন্য অতি আশ্চর্যের ছিল। মনে মনে সংশয়ও ছিল। খ্রিষ্ট মহলের প্রবেশও অত্যধিক সুন্দর ছিল যা সে কল্পনাও করেনি। তাদের আলাদা আলাদা শয়নকক্ষও দেয়া হলো। সাথে ভালো খাবার আর আরামদায়ক পোশাক। শেহজাদ খাওয়াদাওয়া সেড়ে ঘুমিয়ে পড়লো। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। যখন ঘুম ছুটলো তখন মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছে। সে নামাজ আদায়ের জন্য মহলের পেছনে সবুজ ঘাস আবৃত একটা জায়গায় চাদর বিছিয়ে নামাজ আদায় করে নিল।
শাসনকর্তার দুইজনের একজন এসে তাকে নামাজ আদায় করতে দেখে বলল,
‘ আমাদের বললে আমরা ব্যবস্থা করে দিতাম। ‘
শেহজাদ পেছনে দুহাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে জানালো, তার কোনো সমস্যা হয় না। দেশবিদেশ ঘুরতে গেলে তাকে এভাবেই নামাজ আদায় করতে হয়।
উনারা শেহজাদের সাথে কথা বলতে বলতে শেহজাদকে মহলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে গল্প করতে লাগলেন।
হঠাৎ চোখ গিয়ে পড়লো বারান্দায় একটা যুবতী মেয়ের দিকে। সাথেসাথেই চোখ সরিয়ে নিল সে। কিন্তু যুবতীর চোখদুটো তাকে নিবদ্ধ করে রেখেছে সেই কবে থেকে। কালো যিবিন আর মাথায় প্যাঁচানো বাদামি রঙের পাগড়ি পরিহিত সুকুমার পুরুষ তার হৃদয় উদ্বেলিত করেছে। তাকে দেখার পর হতে তার হৃদকম্পন কিছুতেই থামছেনা। তাকে দেখার জন্য সারা মহলে ছোটাছুটি করেছে তখন থেকে, কখন সেই মানবকে আবারও দেখতে পাবে।
যুবতীর পিতা তাকে দেখে ডাকলো, ‘ এমিলি এসো এদিকে। ‘
এমিলি ছুটে এল। বয়স বাইশ তেইশের কৌটায় হবে। অত্যাধিক রূপসী আর লাস্যময়ী। তার পিতা মেয়েটির সাথে শেহজাদের পরিচয় করিয়ে দিল।
‘ সে আমার কন্যা। এমিলি খ্রিস্ট। কন্যা ইনি হচ্ছেন রূপনগরের সম্রাট। শেহজাদ সুলতান।’,
এমিলি হেসে চোখ নিভিয়ে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল,
‘ আমরা আনন্দিত আপনাকে পেয়ে। ‘
শেহজাদ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলল,
‘ ধন্যবাদ। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া উনি এমন মানুষদের আশ্রয়ে রেখেছেন। ‘
এমিলি হাসলো। বলল,
‘ বাবা আমি তার সাথে আরও আলাপ করতে চাই।’
‘ হ্যা। কেন নয়। সম্রাট আপনি গল্প করুন। নৈশভোজের আয়োজন চলছে। ‘
এমিলি বলল,
‘ আপনি খানিকটা আমার বড় পিতার মতো দেখতে। ‘
‘ আপনার বড় পিতা কেমন? ‘
‘ আপনার মতো সুদর্শন। ওদিকে আসুন। আমার বাগান। আপনার পরিবারে কে কে আছে?
শেহজাদ তার পেছনে শ্লথগতিতে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
‘ আম্মা আব্বা বোন..
তাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে এমিলি বাগানের ফুল ছিঁড়ে নিল। শেহজাদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ আমার বাগানের ফুল কখনো ছেঁড়া হয় না। শুধু আজ ছিঁড়লাম। ‘
শেহজাদ অপ্রস্তুত হলো। বলল,
‘ আমি ফুল পছন্দ করিনা। ‘
এমিলি আবারও হাসলো। বলল,
‘ সত্যি? ফুলের মতো মানুষ ফুল পছন্দ করে না? অবিশ্বাস্য! ‘
শেহজাদ কাষ্ঠ হাসলো। তন্মধ্যেই সাফায়াত এসে এমিলির সাথে শেহজাদকে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালো। বেচারি রূপা এই দৃশ্য দেখলে ভাইজানের কপালে বেশ দুঃখ ছিল। সাফায়াত আসতেই শেহজাদ এগিয়ে গিয়ে বলল,
‘ ঘুম ভালো হয়েছে?’
‘ জ্বি ভাইজান। ‘
‘ কাছাকাছি জাহাজ না আসা অব্দি আমাদের এখানে থাকতে হবে সাফায়াত। আর কোনো উপায় নেই। আমি জানিনা রূপা কোথায় আছে। তার চিন্তা আমাকে শান্তি দিচ্ছে না। আমাকে এত অবিশ্বাস কি করে করলো সে?’
‘ চিন্তা করবেন না। আল্লাহ আছেন। ‘
‘ হ্যা তিনিই ভরসা। ‘
এমিলি ফুলগুলো সাফায়াতকে দিয়ে বলল,
‘ আপনার বন্ধুর জন্য নিয়েছিলাম। উনি নাকি ফুল পছন্দ করেন না। ‘
সাফায়াত ফুলগুলো ধরে দাঁড়িয়ে থাকলো। এমিলি যেতেই শেহজাদ সাফায়াতের বোকাবোকা চেহারার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেই সাফায়াত বলল,
‘ ভাইজান! ‘
শেহজাদ দরাজ গলায় হেসে উঠে তার পিঠ চাপড়ে বলল,
‘ বাদ দাও। কাশীমকে নজর রাখতে বলো জাহাজ এলেই যেন খবর দেয়। ‘
এমিলি চার্চে গেল প্রার্থনা করার জন্য। বহুদিন পর তাকে চার্চে দেখে চার্চের ফাদার অবাক হলেন। জানতে চাইলেন কারণ কি।
এমিলি সহাস্যে বলে উঠে,
‘ ফাদার আমি মনে মনে যেমন পুরুষ খুঁজছিলাম। তেমন একজনকে পেয়ে গিয়েছি। ‘
ফাদার হয়ত আন্দাজ করতে পারলেন। মহল আঙিনায় এমিলির পিতাদের সাথে হেঁটে হেঁটে গল্পে মগ্ন শেহজাদের দিকে তাকিয়ে বলল।
‘ সে? ‘
‘ হ্যা। আমার তাকে চাই। ‘
‘ কিন্তু তার ধর্ম আলাদা। সে মুসলিম সন্তান। পরহেজগার বান্দা। তোমাকে সে গ্রহণ করবে না। ‘
‘ আমি কিছু জানিনা। আমার তাকে চাই। তার চলে যাওয়ার সময় হওয়ার পূর্বে আমি তাকে চাই। কিছু একটা করুন।’
ফাদার বেশ সময় নিয়ে ভাবলেন। শেহজাদের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি বুলিয়ে ধীরকন্ঠে বললেন,
‘ প্রস্তাব পাঠাও তার কাছে। তোমার পিতামাতাকে বলো। ‘
এমিলি ভীষণ খুশি হয়ে ঘন্টা বাজিয়ে দৌড় দিল।
মহলে প্রবেশের সময় শেহজাদের মুখোমুখি হতেই লজ্জা পেয়ে পুনরায় দৌড় লাগালো।
এমিলির পিতা হেসে বলল, ‘ আমার প্রিয় কন্যা। ‘
শেহজাদ স্মিত হাসলো।
শেহজাদ মহল পরিদর্শন করতে এমিলির পিতার সাথে বেরিয়েছে। পুরো মহলটি অসম্ভব সুশোভিত। প্রতিটি কক্ষে ছবি বড়সড় তৈলচিত্র তাদের পূর্ব পুরুষদের। শেহজাদ সাথে সাফায়াতও আছে। গল্প করতে করতে তৈলচিত্রগুলোতে চোখ বুলাতেই সাফয়াত হঠাৎ থমকে গেল। আঙুল তাক করে বলল,
‘ ভাইজান ওই বাচ্চাটির তৈলচিত্র দেখুন। ‘
শেহজাদ সেদিকে দৃষ্টি মেলে তাকালো। ললাটের ভাঁজ গভীর হলো। চেয়ে রইলো সেই তৈলচিত্রটার দিকে। যেখানে মা বাবার সাথে একটা বাচ্চা ছেলে রয়েছে। রূপনগরে তার কক্ষেও দাদাজানের পাশে ঠিক এমন একটা বাচ্চার তৈলচিত্র আছে। শেহজাদ বলল,
‘ কে উনারা? ‘
এমিলির পিতা জানালেন,
‘ উনি আমার ভাই আর ভাইবধূ সাথে ভাইপো ইউভান। ‘
শেহজাদ ফের জানতে চাইলো।
‘কোথায় উনারা? ‘
‘ ভাইজান মারা গিয়েছেন। ‘
‘ আর মহিলা আর উনার বাচ্চা?
‘ ইউভান ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়েছিল সমুদ্রপথে। তার মা আমাদের সাথে আছে। ‘
শেহজাদ তৈলচিত্রটি দেখতে থাকে মনোযোগ দিয়ে। যেই পুরুষটি দাঁড়িয়ে আছে তৈলচিত্রে সেই লোকটির গালের দাঁড়ির প্যাঁচটা শেহজাদের গালেও বিদ্যমান। গলা শুকিয়ে এল শেহজাদের।
সাফায়াত বিস্মিত হয়ে বলল,
‘ ভাইজান বাচ্চাটি তো আপনার মতো। ‘
এমিলির পিতা কপাল ভাঁজ করে তাকায়। চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠে। কি বলছে এরা?
শেহজাদ কপাল ভাঁজ করে বলল,
‘ হতেই পারে। অবিশ্বাস্য কিছু নয়। এভাবে বলার কি আছে? জনাব আমি ইউভানের আম্মার সাথে দেখা করতে পারি?
এমিলির পিতা সন্দিগ্ধ চোখে চেয়ে আদেশ দিলেন যাতে ইউভানের মাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
অন্দরমহল হতে একটা পৌঢ় মহিলা ধীরপায়ে হেঁটে প্রবেশ করলো সেই কামরায়। শেহজাদ ফের অবাক হলো মহিলাটিকে দেখে। সাদা ময়লা শাড়িতে মহিলাটিকে ভীষণ নম্র মনে হলো তার। মাথার চুল, বাদামী সাদা, চেহারায় অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট। অতি লাবণ্যময়ী তারপরও। চোখদুটোতে মায়া উপচে পড়ছে। কামরায় প্রবেশ করে তারদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। ভদ্রলোক বলেন
‘ ইনি মরিয়ম খ্রিষ্ট। আমার বড়ভাই ইউশাম খ্রিষ্ট আর মরিয়ম খ্রিস্টের সন্তান ইউভান খ্রিষ্ট। ‘
শেহজাদ দেখেছিল উনাকে মহলে আসার পর। তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন আড়ালে দাঁড়িয়ে মুখে কাপড় গুঁজে । চোখে চোখ পড়ার পর মিষ্টি করে হেসেছিলেন। তারপর মমতাময়ী চোখে অপলক চেয়ে ছিলেন। যেন তৃষ্ণা মিটছেনা দেখেও। শেহজাদ ভেবেছিল উনি এখানকার কাজের লোক! কিন্তু তা তো নয়। কিন্তু উনি এই বেশে কেন?
শেহজাদ হাঁসফাঁস করতে থাকে। তারপর হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়।
সাফায়াত তার পেছন পেছন ছুটে বলল,
‘ ভাইজান দাঁড়ান। ‘
শেহজাদ কথা শুনলো না। তার কামরায় গিয়ে বসে থাকলো। সে খ্রিষ্টান পরিবারে জন্মেছিল!
সাফায়াত এসে পাশে বসে। বলে,
‘ ভাইজান কি ভাবছেন? আমি যেটা ভাবছি সেটা হলে তো। ‘
শেহজাদ তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,
‘ ওই চার্চটাতে চলো। ফাদারের সাথে কথা বলব। সবকিছু সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। ‘
‘ যদি আপনি ইউভান হন তাহলে মরিয়ম খ্রিষ্ট আপনার মা। উনার অবস্থা দেখেছেন? মনে হচ্ছে অনেক অযত্ন করা হয়। উনার সাথে আপনার চোখের মিল আছে খানিকটা। আমি নিশ্চিত উনিই আপনার মা। আর মামু তো বললো দাদাজান আপনাকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে এনেছিলেন। সবগুলো বিষয় ভেবে দেখুন। ‘
‘ চলো ফাদারের কাছে যাই। বসে থাকা যাবেনা। ‘
দুজনেই ফাদারের কাছে যেতেই ফাদার তাদের বিচলিত দেখে হেসে বলেন,
‘ আমার বিশ্বাস ছিল তুমি আমার কাছে আসবে। ‘
শেহজাদ ইতস্ততভাবে বলে,
‘ উনাদের সন্তানকে আর খুঁজেননি? ‘
‘ অনেক খুঁজেছে কিন্তু তার পায়নি। দস্যুরা তার মা বাবাকে আঘাত করে বাচ্চা নিয়ে পালিয়েছিল। ‘
‘ আর সেই বাচ্চাকে দস্যুদের হাত থেকে উদ্ধার করেছিল রূপনগরের সম্রাট সলিমুল্লাহ সুলতান। ‘
ফাদার হেসে বলেন,
‘ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সেই সন্তান এখন আমার সামনে বসে আছে। ‘
শেহজাদ দ্বিগুণ অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে,
‘ কি করে নিশ্চিত হলেন? ‘
তুমি যখন অজ্ঞান হয়ে তোমার ভাইয়ের কোলে পড়েছিলে তখন তোমার বক্ষ উন্মুক্ত ছিল। ছোট্ট ইউভানের নামকরণ করেছিলাম আমি তাই তার বুকের এই জন্মচিহ্ন আমার স্পষ্ট মনে ছিল যেটি তোমার বক্ষে এখনো আছে। শেহজাদ বুকের পাশে হাত রেখে স্তব্ধ চোখে চেয়ে রইলো। ফাদার বললেন,
‘ তোমরা মাকে মুক্ত করো এই একাকিত্ব থেকে। সে ভীষণ কষ্ট দিনযাপন করছে। ‘
শেহজাদ ফিরে আসে মহলে। ফাদার খবর পাঠানোর সাথে সাথে মহলে একপ্রকার হৈচৈ পড়ে যায়। এমিলির পিতা আর চাচা শেহজাদকে অস্বীকার করতে চায়। এখন আবার তাকে সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে!
শেহজাদকে নানানরকম অহেতুক প্রশ্ন করে বিষয়টা ধামাচাপা দিতে চান উনারা। মরিয়মকে নিয়ে আসে এক কাজের লোক। এমিলির পিতা খানিকটা রুষ্ট কন্ঠে বলে,
‘ অস্বীকার করো সে তোমার পুত্র ইউভান।’
মহিলা কেমন যেন ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। শেহজাদের দিকে মায়ামায়া চোখে চেয়ে রইলেন। শেহজাদ এগিয়ে গিয়ে বললেন,
‘ আমার সাথে আসুন। ‘
ব’লেই মরিয়মের হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগলো। এমিলির পিতা ও চাচা পেছন পেছন ছুটে বলে,
‘ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন উনাকে? অদ্ভুত তো! আশ্রয় দিয়েছি তাই এমন খেসারত দিচ্ছেন!
শেহজাদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ধমকে বলে,
‘ সব কটাকে দেখে নেব আমি। ‘
সকলেই চুপ হয়ে যায়। মরিয়মকে নিয়ে ফাদারের কাছে যায় শেহজাদ। মরিয়ম কান্না চোখে শেহজাদের দিকে এখনো চেয়ে আছে। ফাদার বললেন,
‘ একে চিনতে পেরেছ মরিয়ম? ‘
মরিয়ম দু’পাশে মাথা নেড়ে বলে,
‘ চেনা মনে হয় কিন্তু চিনিনা। কি বলছে সে? ‘
শেহজাদ বুকের পাশ উন্মুক্ত করে দেখায় উনাকে। মরিয়মের চোখদুটো বড়সড় আকার ধারণ করে। চেয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ দুটো জলে ভর্তি হয়ে গাল বেয়ে গড়াতে থাকে টেরও পাননা উনি। এই ছেলেটাই কোলের সেই হারিয়ে যাওয়া সন্তান! তাই তার আগমনের পর বারবার তাকে লুকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিলো!
উনি কাঁদতে থাকেন। তারপর চলে যেতে থাকেন। শেহজাদ ডাক দেয়,
‘ দাঁড়ান। আমার কথা শুনুন। মা! ‘
মরিয়ম থমকালেও পিছু ফেরেনা। লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে যায় কাঁদতে কাঁদতে।
শেহজাদ মহলে ফিরে এসে মরিয়মের খোঁজ করে। কাজের মেয়েটি মরিয়মের কক্ষে নিয়ে যায় শেহজাদকে। মরিয়ম শোয়া ছিল। শেহজাদকে দেখে তার কান্নার গতি বেড়ে যায় আরও। শেহজাদ কাছে যেতেই উনি ঝাপটে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ আমার ইউভান। এত বছর কেন মায়ের খোঁজ করোনি? আঠাশ বছর পর তোমার মায়ের কথা মনে পড়লো। ‘
শেহজাদ চুপ করে থাকে। জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলায়। এই মা তা দশমাস দশদিন গর্ভে ধারণ করে জন্ম দিয়েছে। তার কষ্ট সে দূর করে দেবে। মরিয়ম কাঁদতে থাকে। শেহজাদ তাকে শান্ত করে । মা ছেলের গল্পেসল্পে কেটে যায় অনেকগুলো মুহূর্ত। দীর্ঘ আঠাশ বছরের অপেক্ষার কষ্ট যেন আজ ম্লান হয়ে গেল সন্তানের মুখদর্শনে। আহা কি শুভ্র পবিত্র হয়েছে তার চেহারা। আজ সে পরহেজগার মুসলিম সন্তান। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ছেলের বুকে পড়ে থাকলেন উনি।
সন্ধ্যা নাগাদ তার কাছে এমিলিকে বিবাহের প্রস্তাব আসে। সাফায়াত তার কামরায় এসে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ে। হাসির চোটে বলে,
‘ ভাগ্যিস রূপা এসব শুনছেনা। সে তো কেয়ামত ঘটিয়ে দিত ভাইজান। ‘
শেহজাদ ভাবলো,
‘ মোটেও না। রূপা তো তাকে ভালোবাসেনা। ভালোবাসলে অত অবিশ্বাস করতে পারে মানুষ?’
তার প্রত্যাখান শুনে এমিলি ক্ষেপে উঠে। আজ পর্যন্ত কারো সাহস হয়নি তাকে ফেরানোর। সে যা চেয়েছে তা নিজের করে নিয়েছে। আর সে তো ভুল কাউকে চেয়ে বসেনি। ইউভানকে চেয়েছে যে তার বড়পিতার ছেলে। সে কোনদিক দিয়ে কম?
উন্মাদের মতো ছুটে গেল শেহজাদের কক্ষে। শেহজাদ মা বাবা, আর তার তৈলচিত্রটি মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো। এই পিতাকে সে কখনোই আর দেখবে না এই জীবদ্দশায়। মাতাকে পেয়েছে। উনাকে সাথে নিয়ে যাবে। একা রাখবে না। তৈলচিত্রটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, একসময় দেখে কামরার দরজা খুলে প্রবেশ করেছে এমিলি। গায়ে প্রশস্ত গলার ইয়েলেক ( ব্লাউজ), কোমর ঘাগড়া। বক্ষ বিভীজিকা আর নাভিপদ্ম উন্মুক্ত। শেহজাদ দৃষ্টি সরিয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বেরিয়ে যাও আমার কক্ষ হতে।
এমিলি ধপ করে দরজা বন্ধ করে এগিয়ে এসে বলে,
‘ কেন আমাকে বিবাহ করবে না ইউভান? ‘
‘ আমি ইউভান নয়। যাও এখান থেকে। আমার গায়ে ময়লা মাখতে এসো না। দূর হও। ‘
এমিলি তার কাঁধে হাত দিয়ে চেপে বলে,
‘ তাকাও আমার দিকে। তোমাকে বিবাহ করতেই হবে। কি কমতি আছে আমার মধ্যে? ‘
‘ আমি বিবাহিত আগেই বলেছি। তোমাকে যেতে বলেছি। আঘাত করতে বাধ্য করো না। ‘
এমিলি তার পিঠ আঁকড়ে ধরে মাথা রেখে বলে,
‘ বিবাহ করো নয়ত আমার সাথে মিলিত হও। আমি তোমাকে চাইছি। আমি এভাবে কাউকে চাইনি। আমাকে ফেরাবে না ইউভান। ‘
শেহজাদ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে,
‘আমি সেই ইউভান নয় যে তোমার কথায় সায় দেবে। দূর হও আমার সামনে থেকে। ‘
এমিলি এগিয়ে এসে খামচে ধরে তার বুকের যিবিন ছিঁড়ে ফেলতেই জন্মদাগটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এমিলি তা ছুঁয়ে বলে উঠে, ‘ তুমি সত্যিই ইউভান। আমাকে সঙ্গ দাও। ‘
শেহজাদ চোখ বন্ধ করে নিয়ে বলে,
‘ খোদার কসম আমি তোমাকে আঘাত করব। ‘
প্রিয় বেগম সিজন ২ পর্ব ১২
এমিলি তার বুক ঝাপটে জড়িয়ে ধরে এলোপাতাড়ি চুমু খেতেই শেহজাদ সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা প্রয়োগ করে গর্জন করে তলোয়ার দিয়ে হাতে আঘাত করতেই এমিলি চিৎকার দিয়ে মেঝেতে শায়িত হয়। শেহজাদ দরজা খুলতেই মরিয়মকে দেখতে পায়। আরও অনেকে। মরিয়ম জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে ইউভান? এমিলি চিৎকার দিল কেন? ‘
শেহজাদ চিবুক শক্ত করে রক্তাক্ত তলোয়ার ছুঁড়ে মেরে বলে এমিলির পিতার উদ্দেশ্যে বলে,
‘ আপনাদের মেয়ের ঘাড়ে শয়তান বসেছে। তাকে সাবধান করুন আর জানিয়ে দিন পরনারী আমার কাছে বিষাক্ত কাঁটার ন্যায়। ‘
