প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২১
উম্মে হাবিবা
~~~সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই সোহা টের পেল, রুদ্র তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। নড়ার কোনো উপায় নেই; একটু নড়াচড়া করতেই রুদ্রের ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমজড়িত ভারি কণ্ঠে সে সোহার কানে ফিসফিস করে বলে উঠল, “বউ, এভাবে নড়ছ কেন? প্লিজ, একটু ঘুমাতে দাও না।”
সোহা আড়ষ্ট হয়ে ফিসফিস করে বলল, “আপনি ঘুমাবেন তো ঘুমান, আমাকে ছাড়ছেন না কেন? প্লিজ ছেড়ে দিন।”
রুদ্র চোখ না খুলেই সোহার আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে ঘুমকাতুরে সুরে বলল,
“বউয়ের শরীরের উষ্ণতা ছেড়ে কি আর ঘুমানো যায়? সারা রাত তোমায় কাছে পাওয়ার জন্যই তো এভাবে আটকে রেখেছি। এখন যদি একটু শান্ত হয়ে না থাকো, তাহলে কিন্তু অন্য শাস্তি দেবো।”
কথাটা শুনে সোহা লজ্জা লাল হয়ে দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তড়িঘড়ি করে ফ্রেস হতে চলে গেল ওয়াশরুমে। কিছু সময় পর ফ্রেস হয়ে কামরায় ফিরে এসে সে দেখল রুদ্রও বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়েছে। সোহা দ্রুত নিজের নামাজটা সেরে নিল, আর রুদ্রও প্রাত্যহিক কাজ সেরে মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
নামাজ শেষ হওয়ার পর বেলকনিতে গিয়ে দেখলো,, চারপাশটা হালকা আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। পূব আকাশে সূর্যের লালছে আভা ছড়িয়ে পড়ছে।
সকালের স্নিগ্ধ ও মৃদুমন্দ বাতাস গায়ে মাখতে সোহা সোজা চলে গেল ছাদের ওপর। ছাঁদে পা রাখতেই সে অবাক হয়ে দেখল, এক কোণের দোলনায় চুপচাপ বসে আছে রৌদ। এত সকালে রৌদকে এভাবে একা ছাঁদে বসে থাকতে দেখে সোহার কৌতূহল হলো। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রৌদের পাশে বসল। মেয়েটার মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে, পুতুলের মতো মায়াবী মুখটা ফ্যাকাশে লাগছিল।
হঠাৎ পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে রৌদ চমকে মুখ ফেরাল। সোহাকে দেখেই সে মলিন একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল। সোহা আলতো হাতে রৌদের কাঁধ ছুঁয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“রৌদ? তুমি এত সকালে ছাঁদে কী করছো বলো তো? শরীর কি খারাপ লাগছে? মুখটা এমন শুকনো কেন ?”
রৌদ ম্লান হেসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ছোট গলায় বলল, “না ভাবি, তেমন কিছু না। এমনিই একটু সকালের বাতাস খেতে এলাম।”
সোহা একটু চিন্তিত সুরে বলল, “মিথ্যা বলছো না তো? তোমার চোখমুখ দেখে তো তা মনে হচ্ছে না। বলো না কী হয়েছে? কার ওপর অভিমান করে এভাবে লুকিয়ে আছো ?”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। ছাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতল হাওয়া দু’জনের চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সোহা একটু গম্ভীর অথচ কৌতূহলী কণ্ঠে বলে উঠল, “রৌদ… আমি জানি না আমার এটা জিজ্ঞেস করা উচিত কিনা,, তবে তুমি আমার বোনের মতো। তাই তোমাকে এটা জিজ্ঞেস করতেই পারি। তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?”
প্রশ্নটা শুনে রৌদ যেন পলকের জন্য ভীষণভাবে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার চোখের পলক দ্রুত কাঁপতে লাগল। সে আমতা আমতা করে নিচু গলায় বলল, “ভালোবাসলেও কী হবে ভাবি? সে তো আমাকে ভালোবাসে না… তার কাছে আমার কোনো মূল্যই নেই।”
সোহার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। সে একটু ঝুঁকে আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করল, “কে সে? কার কথা বলছো তুমি?”
রৌদ আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বিষণ্ণ গলায় বলল, “আছে কেউ একজন…
যাকে ছোঁয়া যায় না, শুধু দূর থেকে অনুভব করা যায়। ভালোবাসার মানুষগুলো কেন এমন হয়? তারা কাছে থেকেও অনেক দূরে থাকে, তাদের জীবনে আমাদের জন্য কোনো স্থান থাকে না। এই ভালোবাসার পরিণাম শুধু চোখের জল আর অন্তহীন কষ্ট ছাড়া আর কিছুই না…
যাকে ভালোবাসার অপরাধে রোজ তিলে তিলে মরতে হয়। সে এমন এক আকাশ, যার নাগাল আমি কখনো পাব না জেনেও তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সে আমার অন্তরের গভীরে বাস করে, অথচ আমার ভাগ্যে কেবল দূরত্ব আর অবহেলাটুকুই লেখা।”
রৌদের কণ্ঠে জমে থাকা অভিমান ও কষ্ট বুঝতে পেরে সোহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে সান্ত্বনার সুরে বলল, “পাগলি মেয়ে! তুমি এত নিশ্চিত করে কীভাবে বললে যে সে তোমাকে ভালোবাসে না? হয়তো সেও তোমাকে ভালোবাসে, শুধু তোমার মতো করে বলতে পারে না।”
রৌদ একটা শুকনো হাসি হাসল, যে হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল কেবল জমাট বাঁধা কষ্ট। সোহ বুঝতে পারল, এখন জোর করে রৌদের ভেতরের ক্ষত খুঁড়ে লাভ নেই; এটা ঠিক সময় নয়। তাই সে পরিবেশটা একটু হালকা করার জন্য মিষ্টি হেসে বলল বাদ দেও এসব কথা! চল, আজকে তোমাকে একটা স্পেশাল চা বানিয়ে খাওয়াই। অপরাজিতা চা খাবে?”
রৌদ ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, অপরাজিতা চা? এটা আবার কেমন চা ভাবি?
অপরাজিতা ফুলের চা।
ফুলের চা আবার খাওয়া যায় নাকি?
সোহা দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে বলল, “চললেই দেখতে পাবে। আসো আমার সাথে।”
এই বলে সোহা রৌদকে নিয়ে ছাদের এক পাশে থাকা নীল অপরাজিতা গাছটার কাছে গেল। সেখান থেকে তাজা কয়েকটা অপরাজিতা ফুল সাবধানে ছিঁড়ে হাতে নিয়ে তারা সোজা কিচেনে চলে গেল। সোহা নিপুণ হাতে চা বানাতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই কাপ গরম চা রৌদের হাতে তুলে দিল।
চায়ে চুমুক দিয়েই রৌদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে মুগ্ধ হয়ে বলে উঠল, “উফ! এটা কী বানালে ভাবি! চায়ে চুমুক দিলেই একটা অদ্ভুত সতেজতা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এতো দারুণ রিফ্রেশিং”।
সোহা মুচকি হেসে রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল, “এখনই এত মুগ্ধ হওয়ার কিছু নেই। আসল ম্যাজিক তো এখনো বাকি!”
রৌদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাজিক? আবার কেমন ম্যাজিক?”
সোহা প্লেট থেকে এক টুকরো লেবু তুলে নিয়ে রৌদের চায়ের কাপে চিপে রস মিশিয়ে দিল। লেবুর রস পড়তেই চোখের পলকে চায়ের গাঢ় নীল রঙটা বদলে গিয়ে সুন্দর এক ঝলমলে বেগুনি রঙ ধারণ করল। এটা দেখে রৌদ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল, “ওমা! এ তো সত্যিই জাদু! নীল চা ম্যাজিকের মতো বেগুনি হয়ে গেল!”
দুজনেই চা হাতে হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুমে এসে বসল। ঠিক তখনই বাড়ির মূল দরজা ঠেলে রুদ্র ভেতরে ঢুকল। এত সকালে সোহা আর রৌদকে একাসনে হাসিখুশি দেখতে পেয়ে রুদ্র কিছুটা অবাক হলো, তবে বোনের মুখে হাসি দেখে তার নিজের মনেও এক প্রশান্তির ছোঁয়া লাগল। সে জুতো খুলে সোজা তাদের কাছে এসে সোহার ঠিক পাশেই বসল।
হঠাৎ পাশে কারো ভারী উপস্থিত টের পেয়ে সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রুদ্র বসে আছে। সে মনে মনে ভাবল, এই লোকটা আবার কখন হাজির হলো!
রুদ্র সোহার দিকে না তাকিয়ে সরাসরি রৌদের দিকে ফিরল। তার চোখের চাহনিতে বড় ভাইয়ের স্নেহ আর কিছুটা আলতো উদ্বেগ মিশে ছিল। সে গম্ভীর অথচ আদুরে গলায় রৌদকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার ছোট পাখি? সকাল সকাল দেখি ভাবির সাথে বেশ জমিয়ে আড্ডা হচ্ছে। শরীর এখন কেমন আছে? কাল থেকে তোমাকে বেশ চুপচাপ দেখছি।”
রৌদ চায়ে চুমুক দিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ভাইয়া জানো? ভাবি আজ আমাকে নিজের হাতে অপরাজিতা চা বানিয়ে খাইয়েছে। কি যে অপূর্ব আর রিফ্রেশিং সেটার স্বাদ! তুমি কখনো খেয়েছ?”
রুদ্র এক ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “তাই নাকি? দেখি কেমন চা বানিয়েছে তোমার ভাবি!” এই বলে সে সোহার ঠিক সামনে রাখা চায়ের কাপটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে এক চুমুক দিল। তারপর তৃপ্তির সুরে বলল, “হুম, আসলেই বেশ চমৎকার।”
সোহা একটু অস্বস্তি আর লজ্জা নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আরে ওটা তো আমার কাপ! আপনি ওটা খেলেন কেন? আমি আপনার জন্য আলাদা বানিয়ে দিচ্ছি।”
রুদ্র নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাপটা ধরে রেখে বলল, “কেন? এটাতে কী এমন সমস্যা হয়েছে? চা তো তোমার হাতেই তৈরি।”
রৌদ মুচকি হেসে মনে মনে বুঝল, ভাই আর ভাবির মাঝে ব্যক্তিগত সময় কাটানো দরকার। সে চালাকি করে নিজের কাপটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং বলল, “আচ্ছা ভাইয়া, আমার নিজের রুমে একটু কাজ আছে, আমি গেলাম।” এই বলে সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে হাসিমুখে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
রৌদ চলে যেতেই সোহা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “চা-য়ের কাপটা তো আমাকে দিন, আমি আপনার জন্য নতুন করে বানিয়ে আনি।”
রুদ্র নির্বিকার গলায় বলল, “লাগবে না, এই চায়েই আমার তৃষ্ণা মিটে গেছে।”
”আচ্ছা, না লাগলে আমার চা আমাকে ফেরত দিন, এভাবে কেড়ে নিলেন কেন?”
রুদ্র বাঁকা হাসল, “কেন দেবো? তুমি নিজে বানিয়েছ আর আমি একটু খেতে পারব না?”
মানি কী আজব তো! নিজে জন্য তো বানিয়ে আনতে দিবেন না, আবার আমার খাওয়া কাপ থেকেও খেয়ে নেবেন! দেখুন তো, এদিক থেকে তো আমি খেয়েছি!”
রুদ্র একটু ঝুঁকে পড়ে চোখ টিপে বলল, “তাই তো বলি, চা এত সুস্বাদু আর মিষ্টি কেন লাগে!”
সোহা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “মানে কী?”
বলেই আর সময় দিল না—রুদ্র এক টানে সোহার নরম কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে একদম নিজের কাছাকাছি টেনে নিল। সোহার কানের লতিতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে অত্যন্ত গভীর, পুরুষালি কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“এত মানে খুঁজতে যেও না তো, বউ! মাঝেমধ্যে বিনা কারণেও কিছু ভালোবেসে ফেলতে হয়।” সোহার ঘাড়ের কাছে তার নিঃশ্বাসের ছোঁয়া লাগতেই সোহার সারা শরীর দিয়ে একটা বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল, সে ভয়ে ও লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল।
রুদ্র মৃদু হাসতে হাসতে সোহার হাত ছেড়ে দিয়ে হালকা পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
ওদিকে রুনিয়া মেহতাব রান্নাঘরের দিকে আসার সময় ড্রয়িংরুমে সোহার অবস্থা দেখলেন। সোহা তখনো একদৃষ্টিতে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে কেমন যেন বোকার মতো বসে আছে, তার গাল দুটো লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে আছে। রুনিয়া মেহতাব স্নেহের হাসিমুখে সোহার কাছে এগিয়ে এসে আলতো হাতে ডাকলেন, ” সোহা মা? এতো সকালে এখানে এভাবে চুপ করে বসে আছো কেন? শরীর ঠিক আছে তো?”
মায়ের ডাকে সোহার হুশ ফিরল। সে চমকে গিয়ে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “আহ… মা! আপনি? মানে… উনি কোথায়?”
রুনিয়া মেহতাব ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “উনি কই মানে? কাকে খুঁজচ্ছো তুমি?”
প্রশ্নটা শুনেই সোহার খেয়াল হলো সে মুখ ফসকে কী বলে ফেলেছে। সে তাড়াতাড়ি নিজের ভুল ঢাকতে কথা ঘুরিয়ে থতোমতো খেয়ে বলল, “না মানে… বলছি চলুন মা, আপনাকে কিচেনে কাজে সাহায্য করি।”
এরপর দুজনে মিলে হাসিমুখে নাস্তার আয়োজন করতে লাগল। কিছু সময় পর বাড়ির সবাই একে একে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল এবং একসাথে মিলে নাস্তা পর্ব শেষ করল।
নাস্তা খাওয়ার পর রুদ্র নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছানোর জন্য নিজের রুমে গেল, আর সোহা গত দুদিন আগে থেকে যে রুমে ছিল সেদিকে গেল, কারণ তার বেশ কিছু দরকারি জিনিসপত্র ও কাপড়চোপড় সেখানেই গোছানো ছিল।
দুজনেই নিজেদের মতো তৈরি হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল। ঠিক তখনই রৌদও নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এল। সবার উপস্থিতি দেখে রুনিয়া মেহতাব ড্রয়িংরুমের সোফায় বসতে বসতে বললেন, “সবাই একটু দাঁড়াও তো বাবা। তোমাদের দাদুমণি কিছু একটা বলবেন।”
আদিবা ও সেখানে উপস্থিত,, সবার জটলা দেখে বৃদ্ধ আশরাফ মেহতাব গম্ভীর অথচ খুশির সুরে বলে উঠলেন, “শুন সবাই। সামনের মাসে আমার আপন ছোট ভাইয়ের নাতনির জমজমাট বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ের বেশ কিছুদিন আগেই আমাদের সেখানে সপরিবারে উপস্থিত থাকতে বলেছে। আমরা সবাই মিলে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি।”
দাদুর মুখে গ্রামের বাড়ির বিয়ের কথা শুনে রৌদ আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাত তালি দিয়ে বলে উঠল, “ইশ! কত দিন হয়ে গেল গ্রামের কোনো বিয়ে দেখি না! কী যে আনন্দ হবে এবার!”
রুদ্র কদম ফেলতে ফেলতে বিরক্ত মুখে বলল, “দাদু, প্লিজ আমাকে এই ঝামেলা থেকে বাদ দাও। আমি যেতে পারব না। এমনিতেই আমার অনেক কাজ জমে আছে। কলেজ, অফিস, এসব একা সামলে আমার পক্ষে এত দূরে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না।”
আশরাফ মেহতাব একটু ধমকের সুরে বললেন, “তোমার বাবা তো অফিস সামলানোর জন্যই আছে। তুমি কিছুদিন ছুটি নিলে এমন কিছু দোষ হয়ে যাবে না!”
রুদ্র নাছোড়বান্দা হয়ে বলল, “না দাদু, আমি যাবো না। এগুলোতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই।”
দাদু একটু ভেবেচিন্তে দুষ্টুমিভরা হাসিমুখে বললেন, “আচ্ছা, তুমি না হয় গেলে না। কিন্তু আমাদের নতুন বউমা সোহা দাদুভাই কিন্তু অবশ্যই যাবে!”
দাদুর মুখে সোহার নাম শুনতেই সোহার মনটা খুশিতে নেচে উঠল। সে জীবনে কখনো গ্রামের কোনো পারিবারিক বিয়ে দেখেনি, তাই যাওয়ার নাম শুনেই তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
পক্ষান্তরে রুদ্রের মুখের অবস্থা মুহূর্তেই চুপসে গেল। সে মনে মনে ভাবল, এ মেয়ে যদি গ্রামে চলে যায়, তবে সে একা একা এই শহরে কী করবে?
কিন্তু মুখে বললো,, দাদু সোহা কিভাবে যাবে সোহার তো ফাইনাল পরীক্ষা, এর মধ্যে দুই দিন আগে তো নোটিশ দিয়েছে!
তোমরা বরং ঘুরে এসো।
সোহা আড়ালে রুদ্রের মুখটা কালো হয়ে যাওয়া দেখে মনে মনে বেশ মজা পেল। সে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে ভেংচি কেটে দাদুকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দাদু, আমার পরীক্ষা তো আগামী মাসের দুই তারিখেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগামী মাসে তোমরা ঠিক কত তারিখে রওনা দিচ্ছ?”
দাদু রুদ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে,, খিকখিক করে হেসে বলে উঠলেন, “তাহলে তো আর কোনো বাধাই রইল না! পরীক্ষা শেষ তো ঝামেলা শেষ। আমরা দুই কি তিন তারিখ সকালেই রওনা দেবো।”
রৌদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল, “বাব্বা, অনেক দেরি হয়ে গেল! আমার কলেজ যেতে হবে, আমি এখন বের হলাম।” সোহাও তার সাথে সায় দিয়ে বলল যে তারও বের হওয়া দরকার। রৌদ আর সোহা একসাথে বাড়ির গেটের দিকে এগোতে লাগল।
রৌদ নিজের মতো পায়ে হেঁটে কলেজের দিকে রওনা দিল, কারণ তার কলেজটা বাসা থেকে খুব একটা দূরে ছিল না। এদিকে সোহা যখন গেট পেরিয়ে একটু সামনে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে রুদ্র এসে তার হাত শক্ত করে খপ করে ধরে ফেলল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সোহাকে টেনে নিজের গাড়ির সামনে এনে জোর করে সামনের সিটে বসিয়ে দরজা লক করে দিল।
সোহা ভেতর থেকে কাঁচ নামিয়ে রেগে গিয়ে বলল, “আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো? সবসময় এভাবে মানুষের হাত ধরে টানাটানি করেন কেন?”
ড্রাইভিং সিটে এসে বসে রুদ্র শান্ত গলায় বলল, “বউ আমার,,
নিজের বউকে টানব না তো কার বউকে টানব?”
সোহা মনে মনে বিরক্তি প্রকাশ করে ভাবল, এই লোকটা ইদানিং বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে, কথায় কথায় ‘বউ বউ’ করা কি তার স্বভাব হয়ে গেছে নাকি! কই আগে তো এমন ছিলো না।
গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে রুদ্র একটু গলা ঝেড়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, একটা কথা বলো তো? একটু আগে দাদুর সাথে কথা বলার সময় তুমি ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য এত সহজে রাজি হলে কেন?”
সোহা নাক উঁচু করে অহংকারী সুরে বলল, “আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই রাজি হয়েছি। আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে কেন?”
রুদ্র কড়া গলায় বলল, “তুমি কোথাও যাচ্ছো না।”
সোহা চোখ গোল গোল করে অবাক হয়ে বলল, “আশ্চর্য! আমি যাব কি যাব না সেটা আমার ব্যাপার। আপনার এতে সমস্যা কোথায়?”
রুদ্র আর কোনো উত্তর দিল না, শুধু শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি সামনের দিকে ছোটাল। সোহা রেগে মুখ ফিরিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, গাড়িটা আজ আর প্রতিদিনের মতো কলেজের গেটের একটু দূরে গিয়ে থামল না। সোহা বারবার গাড়ি থামাতে বললেও রুদ্র এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে উড়িয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত গাড়িটা সোজা এসে থামল কলেজের ভেতরের সুরক্ষিত পার্কিং এরিয়ায়।
সোহা গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করতে করতে রাগে ফেটে পড়ে বলল, “মাথা কি একদম খারাপ হয়ে গেছে আপনার? এখানে কেন গাড়ি আনলেন? ওই বাইরে নামিয়ে দিলেই তো পারতেন!”
রুদ্র নির্বিকার গলায় বলল, “নামো।”
”আশ্চর্য! এখন কলেজের সবাই আমাদের একসাথে দেখবে, তারা কী ভাববে বলুন তো?”
রুদ্র একটু ঝুঁকে সোহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “যে যা ভাবার ভাবুকগে, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তুমি আমার বৈধ স্ত্রী, অন্য দশটা মানুষ কী ভাবল আর না ভাবল, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর কি কোনো সময় আছে আমার?”
সোহা বুঝতে পারল এই একগুঁড়ে মানুষের সাথে কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। রাগে গজরাতে গজরাতে সে দরজা খুলে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে পার্কিংয়ের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী কলেজের গম্ভীর রাগী একগুঁয়ে স্যারের গাড়ি থেকে সোহাকে নামতে দেখে হতবাক হয়ে তাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
এত মানুষের কৌতূহলী ও পঙ্কিল দৃষ্টি দেখে সোহা ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, কোনোমতে মাথা নিচু করে দ্রুত পায়ে হেটে সোজা ক্লাসরুমের দিকে দৌড় দিল।
ক্লাসে ঢোকার আগেই করিডোরে তার সাথে দেখা হয়ে গেল রাইসার। রাইসা কোত্থেকে যেন হুট করে এসে সোহার ঘাড়ে হাত রাখল এবং দুজনে একসাথে ধপ করে ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে পড়ল।
বসার সাথে সাথেই রাইসা মুচকি হেসে চটজলদি কনুই দিয়ে সোহার পাঁজরে একটা হালকা গুঁতো মেরে ফিসফিস করে বলল, “কিরে সোহা! আজ ব্যাপার কী বল তো? দুলাভাই স্যার তো একদম হিরোর মতো নিজের গাড়িতে করে সোজা কলেজের পার্কিংয়ের ভেতর নিয়ে এসে তোকে নামিয়ে দিয়ে গেল! ব্যাপার কী রে সিস? আজকাল তো দেখি জল অনেক দূর গড়াচ্ছে!”
সোহা লজ্জায় লাল হয়ে লজ্জিত গলায় বলল, “দূর পাগলি! ওসব কিচ্ছু না। আমি তো নিষেধ করেছিলাম, কিন্তু ওই জেদি লোকটা শুনলই না!”
রাইসা চোখ টিপে মুচকি হেসে বলল, “আহা রে! নিষেধ নাকি আবার! তা বল তো দোস্ত, ঘরের ভেতর স্যার তোকে ঠিক কেমন চোখে দেখে? অত গম্ভীর মানুষটা কি তোর সাথে কখনো রোমান্টিক কোনো কথা বলে নাকি শুধু হোমওয়ার্ক চেক করে?”
সোহার মনে পড়ে গেল কালকে রাত আর সকালের ঘটনাটা। তার গাল দুটো আপনাআপনি লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চুপ কর তো রাইসা! অত আজগুবি কথা বলিস না তো।”
রাইসা সোহার লাল হয়ে ওঠা গাল দেখে খিকখিক করে হেসে উঠে বলল, “আহা রে! গাল দেখলে তো মনে হচ্ছে পাকা টমেটো! কিরে, বল না একটু শুনি!”
তখনি ক্লাসের অনেক ছেলে মেয়ে এসে দাঁড়ায় সোহার সামনে।
একজন তো জিজ্ঞেস করেই বসে,, সোহা রুদ্র স্যার তোমার কি হয়,, আজ এক সাথে আসলে দেখলাম।
রাইসা বলতেই নিচ্ছিলো তবে তার আগেই সোহা তকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই বলে,,
আসলে রুদ্র স্যার আমাদের রিলেটিভ তাই, হঠাৎ রাস্তা দেখা হয়ে যাওয়া আর কি।
ওহ তাই বলো,, তা কেমন আত্মীয় স্যার তোমাদের।
উনি আমার ঠিক তখনই গলার কাছে কথা আটকে গেল।
কারণ রুদ্র স্যার ক্লাসে প্রবেশ করেছেন।
সবাই দ্রুত নিজের সিটে বসে পড়ে।
ক্লাস শেষ হওয়াপর
রুদ্র বেরিয়ে চলে যায়,, করিডরে রাফিন এর সাথে দেখা কারণ এখন তার ক্লাস। রুদ্রের দিকে তাকিয়ে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে রুদ্র কে কিছু বলবে তার আগেই রুদ্র গটগট পায়ে হেঁটে চলে যায়।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর দুই বান্ধবী একসাথে ক্লাস থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে ক্যান্টিনের দিকে হাঁটছিল।সোহা আর রাইসা ক্যান্টিনে গিয়ে একটা কোণের ফাঁকা টেবিলে মুখোমুখি বসল। তাদের পরীক্ষার ফাঁকে খাওয়ার জন্য কিছু স্ন্যাক্স অর্ডার করা হলো। ঠিক তখনই কলেজের তিন-চারজন অহংকারী ও বখাটে টাইপের সিনিয়র মেয়ে সোহার টেবিলের সামনে এসে হুট করে হাজির হলো।
মেয়েগুলোর দলের মূল চালিকাশক্তি রুদ্রের অন্ধ ভক্ত এক সিনিয়র ছাত্রী সোহার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বাঁকা সুরে বলল, “ওমা! এ যে আমাদের প্রিয় জুনিয়র ! কী ব্যাপার? আজকাল তো দেখছি কলেজের অন্দরে একেবারে রানি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ! বল তো, রুদ্র স্যারের সাথে তোর আসলে কী সম্পর্ক? কোন জাদুবলে তুই স্যারের ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে কলেজে আসছিস আজ”?
সোহা তখন একটা স্যান্ডউইচ হাতে নিয়ে সবেমাত্র মুখে দেবে ভাবছিল। মেয়েটার এমন বাজে ও কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে সে শান্ত অথচ শক্ত গলায় বলল, “আমি কার গাড়িতে এলাম বা কার সাথে আমার কী সম্পর্ক, সেটা আপনাদের জানানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা আমি বোধ করছি না। এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। দয়া করে আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাবেন না।”
সোহার মুখে এমন মুখের ওপর জবাব শুনে মেয়েটা প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করল। তার অহংকারে যেন সরাসরি আঘাত লাগল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রাগন্বিত হয়ে হঠাৎ করেই সোহার হাত থেকে স্যান্ডউইচটা কেড়ে নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল।
এই আকস্মিক অভদ্র আচরণে সোহা ভেতরে ভেতরে ভীষণ রেগে গেল। তার মাথাতেও রক্ত চড়ে বসল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না; টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের গ্লাস থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি সজোরে ওই মেয়ের মুখের ওপর ছুড়ে মারল।
পানির ঝাপটায় মেয়েটার পুরো মুখ ও চুল ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। সে তখন উন্মাদিনীর মতো রাগে ফুঁসতে লাগল এবং চিৎকার করে উঠল, “তোর এত বড় সাহস! তুই আমার গায়ে জল ছুড়লি? আজ তোকে দেখে নেব!”
বলেই সে হিংস্র জন্তুর মতো সোহার মাথার হিজাব ধরে টানতে শুরু করল। সোহাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী ছিল না; সেও সমান তেজে মেয়েটার লম্বা চুলগুলো খপ করে খামচে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে ক্যান্টিনের ভেতরে তুলকালাম কাণ্ড বেধে গেল। চারপাশের ছাত্রছাত্রীরা হৈচৈ করে তাদের চারপাশ ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কেউ কেউ তো ভিডিও করা শুরু করেছে।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ক্যান্টিনের এক আতঙ্কিত ছাত্র দ্রুত দৌড়ে গিয়ে স্টাফ রুম থেকে রুদ্র স্যারকে ডেকে নিয়ে এল।
প্রিয় বেলিফুল পর্ব ২০
ক্যান্টিনের দরজায় রুদ্রের দীর্ঘ ছায়া পড়তেই পুরো ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। রুদ্র গম্ভীর ও বরফশীতল দৃষ্টিতে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল, “এখানে কী হচ্ছে এসব? এ কী তামাশা চলছে?”
বন্ধ করো বলছি!”
