প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৬
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
দিন শেষে রাত, রাত শেষে আবার দিন—এইভাবেই সময় কেটে যাচ্ছে। যে যার কাজে ব্যস্ত।
আজ আকাশে বেশ চকচকে রোদ উঠেছে। মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই।
সময় সকাল প্রায় নয়টা ।
লামিয়া তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছে। আজ তার লাস্ট পরীক্ষা। তাই সাদা রঙের কামিজ আর জিন্স পরে দ্রুত রেডি হয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেটের দিকে আসতেই সামনে চোখে পড়লো রাশেদ আর আবরারকে। দু’জন দুই বাইকে বসে কী নিয়ে জানি গভীর আলাপে মগ্ন।
কয়েকদিন শুধু পড়াশোনার জন্য সারাদিন রাত রুমে থাকার কারণে কারো সাথেই তেমন দেখা হয়নি তার।
রাশেদ লামিয়াকে দেখে হেসে বললো
– যাক, অবশেষে তোকে পাওয়া গেলো! পরীক্ষা আছে আজ?
লামিয়া হেসে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানিয়ে রাশেদের দিকে হাত বাড়ালো।
রাশেদ তা বুঝতে পেরে হালকা হেসে মানিব্যাগ থেকে দু’শো টাকা বের করে হাতে ধরিয়ে দিলো।
লামিয়া টাকা ব্যাগে রেখে বললো
– এইবার ফটাফট আমাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে এসো প্লিজ, এমনিতেই লেট হয়ে গেছে।
রাশেদ ভ্রু কুঁচকে বললো
– আমি কাজে যাচ্ছি এখন, পারবো না। রিকশা ঠিক করে দিচ্ছি, চলে যা।
তা শুনে লামিয়ার মুখ ফুলে গেলো।
রাশেদ তা দেখে আবরারের দিকে তাকিয়ে বললো—
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– আবরার তুই তো ওই দিকেই যাবি। যাওয়ার সময় ওকে নামিয়ে দিয়ে যাস।
তৎক্ষণাৎ লামিয়া ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিলো
– আমি একাই যেতে পারবো!
আবরার বলল
– সমস্যা নেই, ওই রাস্তাতেই যাচ্ছি আমি। চাইলে আমার সাথে যেতে পারেন।
লেট হয়ে যাচ্ছে ভেবে আর কথা না বাড়িয়ে লামিয়া আবরারের বাইকে উঠে বললো
– তাড়াতাড়ি চলুন, লেট হয়ে যাচ্ছে।
আবরার মাথা নেড়ে বাইক স্টার্ট করলো
– শক্ত করে ধরে বসুন, না হলে পড়ে যাবেন, মিস।
ভ্রু কুঁচকে লামিয়া আবরারের কাঁধে হাত রাখতেই হঠাৎ পুরো শরীর কেঁপে উঠলো।
আবরারের মুখে এক অদৃশ্য হাঁসি ফুটে উঠলো, যা লামিয়ার চোখে ধরা পড়লো না।
পরক্ষণেই বাইক নিয়ে উধাও হয়ে গেলো সে।
এদিকে রাশেদ বাঁকা হাঁসি হেসে বাইক নিয়ে গেটের সামনে আসতেই চোখে পড়লো লাল রঙের কামিজ পরা এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ ছোট করে তাকাতেই চেনা গেলো—শারমিন। শারমিনকে দেখেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
অফিস যাওয়ার জন্যই দাঁড়িয়ে আছে শারমিন, সেটা রাশেদ ভালো করেই বুঝলো। বাইক থামিয়ে বললো
– উঠুন।
শারমিন অবাক হয়ে বললো
– আমি?
রাশেদ বিরক্ত হয়ে বললো
– তো এখানে আর কেউ আছে নাকি?
শারমিন মাথা নেড়ে ‘না’ জানালো।
রাশেদ আবার বললো
– তাহলে আপনাকেই বলছি।
শারমিন মিনমিন করে বললো
– আমি একাই যেতে পারবো।
রাশেদ এইবার রেগে গিয়ে বললো
– ওকে ফাইন। কিন্তু এক মিনিট লেট হলে কেবিনে ঢুকতে দেবো না, মনে রাখবেন আপনি আমার এসিস্ট্যান্ট।
বলেই বাইক চালিয়ে দিলো। শারমিন তাড়াহুড়ো করে চিৎকার করলো
– আরে দাঁড়ান! যাবো আমি। নিয়ে চলুন।
রাশেদ থামলো। শারমিন উঠে বসলো, মনে মনে তাকে গালাগাল দিতে দিতে।
রাশেদ বাইক জোরে টান দিতেই শারমিন প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো, সামলে নিতে গিয়ে রাশেদের পিঠে ধাক্কা খেলো।
রাশেদ বিরক্ত স্বরে বললো
– শক্ত করে ধরে বসতে পারেন না? পড়ে মুখের নকশা বদলালে তো বলবেন আমি ইচ্ছে করে ফেলেছি।
শারমিন মুখ কালো করে চুপচাপ ধরলো।
রাশেদ হালকা হাঁসি দিয়ে রওনা দিলো অফিসের পথে।
এদিকে ভার্সিটির গেটের সামনে এসে আবরার বাইক থামালো। লামিয়া দ্রুত নেমে যাচ্ছিলো, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক এলো
– পাখি!
বিরক্ত হয়ে লামিয়া পিছনে তাকাতেই দেখলো মাসুদ রানা।
আবরার ভ্রু কুঁচকে তাকালো মাসুদের দিকে।
মাসুদ দৌড়ে এসে লামিয়ার সামনে দাঁড়ালো। লামিয়া একটু পিছিয়ে গিয়ে প্রায় আবরারের সাথে ধাক্কা খেলো।
কোনো পাত্তা না দিয়ে রাগি চোখে মাসুদের দিকে তাকালো।
মাসুদ বললো
– এই ছেলে কে? আর ওর বাইকে তুমি কী করছো?
আবরার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো
– আপনাকে উত্তর দিতে বাধ্য নই।
লামিয়ার তেতো কথায় মাসুদ মন খারাপ হলো।
– আমার বুকে অনেক ব্যথা, পাখি – বিষণ্ণ গলায় বললো মাসুদ।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো
– আপনার বুকে ব্যথা আমাকে কেনো বলছেন?
– কারণ, বুকে ব্যথার ওষুধ যে তুমি।
এইবার লামিয়ার রাগ চরমে উঠলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো
– আমার ফালতু কথা বলার সময় নেই। রাস্তা ছাড়ুন, আমার পরীক্ষা আছে।
বলেই পা বাড়াতেই মাসুদ পথ আটকালো।
নিজের চুলে হাত বুলিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বললো
– দেখো লামিয়া পাখি, তোমার জন্যই আমি আমার নুডুলসের মতো চুলগুলো স্ট্রেইট করে এনেছি।
লামিয়া ঠোঁট কামড়ে রাগ সামলে বললো
– চুল স্ট্রেইট করলে কী হবে, যেখানে চরিত্রটা আপনার নুডুলসের মতো প্যাঁচানো।
সরুন সামনে থেকে, যত্তসব ফালতু!
বলেই দৌড়ে ক্লাসরুমে চলে গেলো।
মাসুদ হা করে তাকিয়ে রইলো।
আবরার হালকা হেসে বললো—
– ভালোবাসেন?
– হ ভাই, প্রচুর… কিন্তু মেয়ে পাত্তাই দেয় না। তবে আপনি কী হন ওর?
আবরার হেসে বাইক স্টার্ট দিলো, কিছু না বলেই চলে গেলো।
মাসুদ বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে বললো
– সালা, কিছু না বলেই চলে গেলো।
বিছানার উপর নগ্ন হয়ে অচেতন ভঙ্গিতে পড়ে আছে এক মেয়ে। সামনেই সোফায় পা ছড়িয়ে বসে আছে কায়সার। কোমরে শুধু একটা টাওয়েল জড়ানো, হাতে অর্ধেক খালি হুইস্কির বোতল। বাদামি চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে। ছবির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকা করে গুনগুন করলো—
— কী যাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে।
এক চুমুক হুইস্কি গিলে শুকনো ঢোক নামিয়ে আবার বিড়বিড় করে উঠলো—
— ব্রাউনি, আমার কী যাদু করেছো তুমি? তোমাকে দেখার পর তোমাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হচ্ছে আমার। এত মেয়েদের দিয়েও শান্তি পাচ্ছি না। নিজেকে শান্ত করতে তোমাকে আমার বদ্দ প্রয়োজন বুলবুলি।
বলে একবার বিছানায় পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে চোখ বুলিয়ে আবার ফোন হাতে শক্ত করে ধরে রেখেই নিহিড়কে কল করে আদেশ দিলো—
— এটাকে নিয়ে যাও এখান থেকে।
তারপর হুইস্কির বোতল টেবিলে রেখে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে লামহা। সাদা ফ্রেমের চশমাটা নাকের উপর ঠিক করে হাতে ধরা লিস্ট থেকে একে একে বই খুঁজে নিচ্ছে। প্রায় সব সংগ্রহ শেষ, শুধু বাকি লিষ্টে লামিয়ার লেখা হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টি বিলাস । দোকানের কোণায় খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে বইটা হাতে পেলো।
মোট বিশটা বই নিয়ে বিল মিটিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে লামহা। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ালো এক অচেনা ছেলে।
— রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছো বুঝি? ছেলেটি মুচকি হেসে বললো।
লামহা কিছু না বলে স্থির চোখে তার দিকে তাকালো। ছেলেটি তার হাতে বইয়ের স্তূপ দেখে এগিয়ে এসে নিতে গেলো, কিন্তু লামহা সাথে সাথে থামিয়ে দিলো।
— আমাকে দাও, আমি নিয়ে দিচ্ছি। এত বই নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কষ্ট হবে তোমার।
লামহার চোখে আগের মতোই শান্ত দৃষ্টি, গলায় দৃঢ় স্বর
— আমি কি একবারও বলেছি আমার কষ্ট হচ্ছে? বা একবারও বলেছি সাহায্য চাই? তাহলে আগ বাড়িয়ে কেনো আসছেন?
ছেলেটি হতভম্ব হয়ে কিছু বলার আগেই রাস্তার ওপার থেকে বাজলো কর্কশ হর্ন। লামহা তাকিয়ে দেখলো—গাড়ির ভেতর থেকে আবির রাগে লালচে চোখে তাকিয়ে আছে।
ছোট্ট চোখ কুঁচকে তাকাল লামহা, কিন্তু আবির ইতিমধ্যেই গাড়ি থেকে নেমে এসেছে। এক ঝটকায় লামহার হাত ধরে, অন্য হাতে বইগুলো নিয়ে রাস্তা পার করিয়ে গাড়ির ভেতর বসিয়ে দিলো। কোনো কথা না বলে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি ফুল স্পিডে ছুটতে লাগলো।
লামহা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। চুপচাপ বসে কেবল তাকিয়ে রইল আবিরের দিকে।
ওদিকে আকাশে কালো মেঘ জমেছে। পরীক্ষা ভালো হওয়ায় আজ লামিয়ার মন ভীষণ খুশি। ভাবলো, বৃষ্টি হলে ভিজে ভিজেই বাড়ি ফিরবে।
ক্লাস থেকে বেরিয়েই দেখলো ঝুম বৃষ্টি। আনন্দে চোখ চকচক করে উঠলো তার। গেট পেরিয়ে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় নেমে এলো। চারদিক অঝোরে ভিজছে, কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’হাত ছড়িয়ে দিলো লামিয়া। বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিলো তার সারা শরীর। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলে গেলো।
বৃষ্টি তখনো ঝমঝমিয়ে পড়ছে। চারদিক অন্ধকারে ঢেকে গেছে। লামিয়া ভিজে একাকার, ঠোঁটে বিরবির করে উঠলো
— শুভ্র ভাই
হঠাৎ সামনের রাস্তা চিরে এক বাইক এসে দাঁড়ালো তার পিছনে। লামিয়া চমকে পিছন ফিরতেই হকচকিয়ে গেলো। হা করে তাকিয়ে আছে আবরারের দিকে।
সাদা শার্ট ভিজে গিয়ে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। চুল ভিজে কপালে আটকে, গোলাপি ঠোঁট গুলো কাঁপছে হালকা। চোখ দুটোতে রাগের ঝিলিক। লামিয়া পলক ফেললো টিপটিপ করে।
আবরার বাইক থেকে নেমে গম্ভীর গলায় দাঁড়িয়ে বললো
— এই বৃষ্টির মধ্যে সাদা জামা পরাটা কি খুব জরুরি ছিল আপনার?
আবরারের কথায় লামিয়ার হুশ ফিরলো। সত্যিই তো, আজ সে সাদা চুড়িদার পরেছিল। তাড়াতাড়ি উড়না টেনে শরীর ঢাকলো। আবরার রেগে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
— এইভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? আমি কি জানতাম নাকি আজ বৃষ্টি হবে? সকালে তো রোদ উঠেছিলো! ভ্রু কুঁচকে বললো লামিয়া।
আবরারের চোখে তখনো দাউদাউ রাগ।
লামিয়া অস্থির গলায় বললো
— আরে আবারো এইভাবে রেগে তাকিয়ে আছেন কেনো? মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে গিলে ফেলবেন! আর আপনি এখানে কেনো?
আবরার কিছু বলার আগেই
ঠাসস!
একটা গুলি সোজা তাদের পাশ ঘেঁষে চলে গেলো।
আবরার মুহূর্তে লামিয়াকে বুকে টেনে নিলো। হঠাৎ গুলির শব্দে লামিয়া চমকে উঠলো। আবরার ঘুরে দেখলো—চার পাঁচজন কালো পোশাকধারী লোক ঘিরে রেখেছে তাদের । আবরার একবার লামিয়ার দিকে তাকিয়ে তারপর আবার আশেপাশে তাকালো। চোখে মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু ভয়টা নিজের জন্য নয় লামিয়ার জন্য।
লামিয়া তার বুকে মুখ লুকিয়ে বললো
— উফফ! কোন সালা সিনেমার শুটিং করছে এখানে? দেখতে দিন!
চারপাশে কালো পোশাকের লোক দেখে আবার প্রশ্ন ছুঁড়লো
— “এই যে মিস্টার বিড়ালের আব্বা, এরা কারা? কোথা থেকে এলো এরা? কোনো সিনেমার শুটিং হচ্ছে নাকি?
আবরার দাঁত চেপে উত্তর দিল
– জী না , আপনার বিয়ের শানাই বাজাতে এসেছে তারা। এখন নাচুন আপনি।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে ঘাড় উঁচিয়ে বললো—
— শানাই তো দেখতে পারছি না, আর শানাই বাজাচ্ছে ও না। তাহলে নাচবো কীভাবে?
পকেট থেকে অস্ত্র বের করতে গিয়ে আবরার থেমে গেলো। বিরক্ত স্বরে বললো—
— বদ্দ বেশি বকরবকর করছেন আপনি! চুপ থাকবেন?
লামিয়া ঠোঁট চেপে চুপ হতেই নাকে পুরুষালি ঘ্রাণ এল। হঠাৎ খেয়াল করলো—সে আবরারের বুকের সাথে লেপ্টে আছে। চোখ বড় করে ছিটকে সরে দাঁড়ালো।
— প্লিজ এলার্জির ওষুধ দিন! আপনার গায়ে এতক্ষণ লেগে ছিলাম, দেখুন শরীরে চুলকাচ্ছে! আমার আবার ছেলেদের দেখলেই এলার্জি হয় তার উপর আপনার সাথে এতোক্ষণ লেগে ছিলাম।
আবরার হাসবে নাকি ধমক দেবে বুঝতে পারলো না।
এমন সময় কালো পোশাকের একজন বিশ্রী হাসি দিয়ে বললো
— মা*লডা বেশ কড়া! এইটাকে মে*রে মা*ল টাকে নিয়ে যাই চল আজ রাতে মজা হবে।
কথা কানে আসতেই লামিয়া ঠোঁটে বাঁকা হাসি দিলো। ব্যাগ থেকে কম্পাস বের করে ঝড়ের গতিতে লোকটার বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো।
আবরার অবাক হলো না। সে আগের থেকেই জানে, রেগে গেলে লামিয়া খু*ন করতেও পারে।
লোকটা লুটিয়ে পড়তেই বাকিরা এগিয়ে এলো। আবরার এক ঝটকায় লামিয়াকে বাইকে বসিয়ে দিলো। বাইক স্টার্ট করে ঝড়ের গতিতে ছুটে গেলো।
পিছন থেকে দুটো গাড়ি ধাওয়া করছে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে।
— আমরা কোথায় যাচ্ছি? চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো লামিয়া।
— জাহান্নামের চৌরাস্তায়।
— আমি যাবো না!
— যেতে না চাইলে ও যেতে হবে।
— কেনো? আর এরা কারা?
ঠিক তখনই ঠাসস! আরেকটা গুলি ছুটে এলো। ভয়ে ঝাপটে ধরলো আবরারকে।
লামিয়ার স্পর্শে আবরারের পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। বাইকের গতি তিনশোর কাছাকাছি। বাতাস শো শো করে কানে বাজছে।
লামিয়া শক্ত করে আঁকড়ে আছে আবরারকে। ভিজে চুপচুপে শরীর কাঁপছে তার। আবরার বুঝছে, তবুও কিছু করতে পারছে না। বরং লামিয়ার স্পর্শে তার নিজের শরীর গরম হয়ে উঠছে।
হঠাৎ আবরারের শরীর গরম হওয়ায় চমকে কাঁপা গলায় লামিয়া বললো
— একি! আপনার শরীর এমন গরম কেনো?
আবরার মিনমিন করে বললো
— শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করছে শরীর গরম কেনো।
লামিয়া জোরে চিৎকার করলো—
— কী বললেন? শুনতে পাইনি!
আবরার ও লামিয়ার মতো করে বললো—
— হট বয় তো, সবসময় হট থাকি আর শরীর ও হট থাকে। চাইলে আপনি এই হট বয়ের হটনেসে গরম হয়ে হতে পারেন।
ভ্রু কুঁচকে ভ্যাংচি কাটলো লামিয়া। কাঁধ থেকে হাত সরাতেই প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি আবার আঁকড়ে ধরলো আবরারকে।
পিছনে তাকিয়ে দেখলো—গাড়িগুলো এখনো ধাওয়া করছে।
ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে চারপাশ অন্ধকার, রাস্তা পিচ্ছিল। হঠাৎ করেই আবরার বাইকটা সজোরে ঘুরিয়ে এক জঙ্গলের ভেতর ঢুকিয়ে দিলো।
লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
— মিস্টার! জঙ্গলে কেনো এসেছেন আপনি?
আবরার ও চেঁচিয়ে উত্তর দিলো
— আপনাকে নিয়ে জঙ্গলে মঙ্গল করতে এসেছি।
লামিয়া রেগে গম্ভীর গলায় বললো
— আমি সিরিয়াস কথা বলছি।
— আমি ও সিরিয়াস, মিস।
একটু চুপ করে থেকে লামিয়া আবার বললো
— এই যে মিস্টার, শুনছেন? আমার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে।
জঙ্গলের রাস্তা ফেলে বাইক মেইন রোডে তুলে আবরার বিরক্ত স্বরে বললো
— আমার মাথাটা এতোক্ষণ চিবিয়ে খেয়েও আপনার পেট ভরলো না?
লামিয়া চোখ বড় বড় করে রেগে বললো
—আমি আপনার মাথা চিবিয়েছি মানে? এই কী কথা!
আবরার ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিলো
— একটা মানুষ এতো বাঁচাল হয় কীভাবে? প্লিজ একটু থামুন। আপনার জন্য বিরিয়ানি অর্ডার করছি।
লামিয়া খুশি হয়ে উজ্জ্বল চোখে বললো
— সত্যি?
আবরার কিছু না বলে পেছনের দিকে তাকিয়ে বললো
— গাড়ি কী এখনো দেখা যাচ্ছে?
লামিয়া পিছনে তাকিয়ে দেখলো, গাড়ি আর নেই। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো
— না, আর নেই।
আবরার বাইক আরও জোরে টান দিলো। লামিয়া চিৎকার করে উঠলো
— আরেএএ থামুন! আপনার কী দুই নম্বর পেয়েছে নাকি?
ভ্রু কুঁচকে আবরার চেঁচিয়ে বললো—
— দুই নম্বর কী?
লামিয়া কপাল চাপড়ে বললো—
— আররে আপনার কী হাগা পেয়েছে নাকি যে এইভাবে এতো জোরে বাইক চালাচ্ছেন? পিছনে তো কেউ নেই, আস্তে চালান। আমার ভীষণ শীত করছে।
এ কথা শুনেই আবরার হঠাৎ ব্রেক করলো।
তাল সামলাতে না পেরে লামিয়া সোজা আবরারের পিঠে গিয়ে ধাক্কা খেলো। ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হলো। ব্যথায় ঠোঁট চেপে ধরে ককিয়ে উঠলো—
— উফফ! কোন সিমেন্টের খাবার খান যে এতো শক্ত আপনার শরীর?
আবরার বাইক থেকে নেমে পিছনে ঘুরে তাকালো। ঠোঁটে হাত চেপে আছে দেখে গম্ভীর গলায় বললো—
— এইভাবে মুখে হাত দিয়ে আছেন কেনো?
লামিয়া রাগে গর্জে উঠলো
— বডিবিল্ডার সিমেন্টের সাথে বাড়ি খেয়ে খুশি হয়ে ঠোঁট চেপে আছি।
আবরার কোনো কথা না বলে সামনে এগিয়ে গেলো। লামিয়া বিরক্ত মুখে কাঁপতে কাঁপতে পিছু নিলো।
হঠাৎ একটা পুরনো, জরাজীর্ণ বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো আবরার।
লামিয়া বড় বড় চোখ করে বললো—
— এই ভুতের বাড়িতে কেনো এসেছেন? চলুন আমরা বাড়ি যাই। এখানে আসলেন কেনো?
আবরার পকেট থেকে চাবি বের করতে করতে শান্ত স্বরে বললো—
— সম্ভব নয়। আজকের রাত এখানেই কাটাতে হবে। বাইকের তেল শেষ। এই বৃষ্টির মধ্যে কারো হেল্প পাওয়া যাবে না।
বিরক্ত মুখে লামিয়া গজগজ করে বললো—
— তাই বলে এই ভুতের বাড়ি? আর আপনি কার না কার বাড়ির তালা খুলছেন কেনো?
আবরার কোনো জবাব দিলো না। তালা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো।
বাইরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো লামিয়া।
আবরার লাইট জ্বালাতে জ্বালাতে মুচকি হেসে বললো
— ভাবছি নিমন্ত্রণ পত্র ছাপাবো।
লামিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো—
— কেনো?
— আপনাকে ঘরে প্রবেশ করানোর জন্য ।
গম্ভীর মুখে ভেতরে ঢুকতেই চোখ বড় হয়ে গেলো লামিয়ার।
— এই বাড়িতে কেউ থাকে না, কিন্তু ভিতরে এতো চকচকে কেনো? আর ফার্নিচার সব এতো ঝকঝকে! কার বাড়ি এটা?
আবরার দরজাটা বন্ধ করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। লামিয়া দৌড়ে পিছু নিলো।
আবরার এক বিশাল রুমে ঢুকলো। সাথে সাথে লামিয়াও ঢুকে হা করে তাকিয়ে রইলো
— এটা রুম? এতো বড়? কিন্তু সবকিছু কালো রঙের কেনো?
আবরার আলমারি খুলে জামা বের করছিলো। হঠাৎ লামিয়া বললো
— এই যে শুনুন…
চমকে তাকালো আবরার।
তারপর গম্ভীর গলায় বললো – এইভাবে ডাকবেন না।
লামিয়া চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো
— এটা কার বাড়ি?
আবরার ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিলো
— আমার।
লামিয়া চোখ ছোট করে বললো
— আপনি তো বলেছিলেন, এই দেশে আপনার কোনো বাড়িঘর নেই?
আবরার শীতল স্বরে উত্তর দিলো
— হ্যাঁ, পরিবার নেই। কিন্তু বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি অনেক আছে। একা থাকলে ঘর ফাঁকা লাগে। তাই রাশেদ আপনাদের বাসায় আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো।
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো লামিয়া। কিছুক্ষণ পর গম্ভীর গলায় বললো
— আচ্ছা, ওই লোকগুলো কারা ছিল? আমাদের ধাওয়া করে কেনো গুলি চালালো?
আবরার সাদা শার্ট বের করে খাটে রাখলো। ধীরে ধীরে বললো
— আমাকে মারতে এসেছিল।
লামিয়া চমকে উঠলো
— আপনাকে মারতে? মানে? বুঝতে পারলাম না।
— এতো বুঝতে হবে না আপনার। ভেজা জামা বদলে এই শার্ট আর ট্রাউজার পড়ুন।
লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো—
— আমি আর শার্ট? নিজের ঘরেই পড়ি না, এখন আপনার সামনে পড়বো? মাথা খারাপ হয়েছে আপনার?
আবরারের দৃষ্টি নিচ থেকে উপর পর্যন্ত গিয়ে থামলো লামিয়ার কাঁপতে থাকা শরীরে। ভেজা জামায় শীতে কাঁপুনি থামছে না।
আবরার কে তাকিয়ে থাকতে দেখে লামিয়া তাড়াতাড়ি উড়না দিয়ে নিজেকে আরও জড়িয়ে নিলো।
আবরার চোখ সরিয়ে নিয়ে শান্ত স্বরে বললো—
— আমার কাছে মেয়েদের জামা নেই। এখন চাইলে ভেজা জামায় ঠান্ডায় মরুন, অথবা এটা পড়ুন নয়তো ড্রেস ছাড়া থাকুন। আমার সমস্যা নেই।
এ কথা বলে টাওয়াল নিয়ে চুল মুছতে মুছতে পাশের ঘরে চলে গেলো।
লামিয়া চোখ বড় করে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে রইলো।
— কী বলে গেলো লোকটা? আমি ভেবেছিলাম ভালো মানুষ… আসলে তো মোটেও সুবিধার না।
হঠাৎ—
প্রিয় রাগিনী পর্ব ১৫
— হাঁচি!
দিলো লামিয়া। ভিজে জামার ঠাণ্ডায় কাঁপতে লাগলো।
শেষমেশ বিরক্ত মুখে বললো—
— এইসব ভেবে লাভ নেই, জামা না বদলালে ঠাণ্ডা লেগেই মরবো।
অবশেষে শার্ট-ট্রাউজার হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে হাঁটলো।
