প্রিয় রাগিনী পর্ব ২২
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
সমস্ত কাজ শেষ করে দুপুরে বাড়ির কর্তিরা ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসছে।
এর মাঝেই খবর এলো খান বাড়ি থেকে।
সবাই তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে গেলো খান বাড়ি।
অফিস থেকেও তাড়াতাড়ি করে বাড়ির কর্তারা ফিরে এসেছে।
খান বাড়ি আর ইসলাম বাড়ির সবাই অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।
তাদের বিশ্বাস হচ্ছে না এ তারা সত্যিই দেখছে তো?
পিছনে হামিদা, সাফওয়ান, মাহির, তায়েব, তায়েবা, লামিয়া, লাবিব, জাহিদ, আরিফ, রাশেদ, শারমিন, হাফসা, ফারিয়া সবাই মিটমিট করে হাসছে।
আর সবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে লামহা আর আবির।
– আমি লামহা কে ভালোবাসি তাই বিয়ে করে ফেলেছি।
বেশ নিচু স্বরে বললো আবির।
– তুমি ওকে কবে থেকে ভালোবাসো?
বেশ গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলেন আমির সাহেব।
– সেই ছোট্ট বেলা থেকে ভালোবাসি বাবা।
আবির শান্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো।
আমির সাহেব গম্ভীর গলায় বললো
– ভালোবাসো, সেটা বেশ ভালো কথা। কিন্তু আমাদের একবার জানালে না কেনো? আর এমন কী হয়েছে যে তোমরা বিয়ে করেছো?
আবির মাথা তুলে সবার দিকে তাকালো। তারপর শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভিজিয়ে ধীরে বললো
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– বাবা, ও এত পাওয়ার ওয়ালা চশমা পড়েও আমার ভালোবাসা দেখতে পায়নি। তাই বিয়ে করে ফেলেছি।
ছেলের এমন কথা শুনে আমির সাহেব ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন
– বিয়ে করার পরও যদি তোমার ভালোবাসা না দেখে, তখন কী করবে?
আবির হেঁসে বললো
– এখন থেকে আমার কাছে থাকবে, বাবা। রাতে একবার, দিনে একবার আমার ভালোবাসা খাওয়াবো ওকে। তখন দেখবেন, চশমা ছাড়াই আমার ভালোবাসা দেখতে পাবে।
ছেলের এমন বেহায়া কথায় আমির সাহেব বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর মাথা নিচু করে থাকা লামহার দিকে চেয়ে বললেন
– মা, ও কি তোমাকে কোনোভাবে জোর করেছে এই বিয়ের জন্য?
লামহা ধীরে মাথা তুলে তাকালো সবার দিকে। তারপর মাথা নাড়িয়ে বললো না।
তারপর আবিরের চোখে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো হামিদ সাহেবের দিকে।
তারপর তাঁর হাত ধরে মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বললো
– বাবা, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আমি না বলেই বিয়ে করে ফেলেছি, তুমি আমাকে মাফ করে দিও।
বাবা, তুমি একদিন বলেছিলে যে মানুষটা তোকে সত্যি ভালোবাসবে, তার সাথেই তোকে বিয়ে দিবো।
তারপর আবিরের দিকে আঙুল তুলে বললো
– দেখো বাবা, এই মানুষটা আমাকে ভালোবাসে। হ্যাঁ বাবা, এই মানুষটা ছোটবেলা থেকেই আমাকে ভালোবাসে। কোনোদিন মুখে বলেনি, সবসময় চেপে রেখেছে নিজের ভেতরে। আমি সব বুঝতাম, তবুও না-বোঝার ভান করতাম।
তবে আজ যখন সে বললো আমাকে ভালোবাসে, আমি ওকে বলেছিলাম প্রমাণ দিতে। আর সে সেই প্রমাণ দিয়েছে আমাকে বিয়ে করে।
এখনকার দিনে তো মানুষ বিয়ের আশ্বাস দিয়ে পালিয়ে যায়, কিন্তু এই মানুষটা বিয়ে করে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।
বাবা, আমি অনেক ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভুল হয়েছে শুধু একটাই তোমাদের কাউকে না জানিয়ে করেছি।এখন তুমি আমাকে যে শাস্তি দেবে, আমি সেটা মাথা পেতে নেবো বাবা।
লামহার কথা শুনে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
হামিদ সাহেব এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
– ছেলে হয়ে নিজের মা কে কীভাবে শাস্তি দিই বলো তো?
লামহা মাথা তুলে ছলছল চোখে বাবার দিকে তাকালো।
হামিদ সাহেব হালকা হেসে ফেললেন।
তিনি জানে তাঁর তিন মেয়ে তিন রকম।
বড় মেয়ে বেশ নরম স্বভাবের, মেজো টা গম্ভীর, আর ছোট টা চঞ্চল।
কিন্তু লামহা শক্ত মনের মেয়ে। কষ্ট পেলেও চোখের পানি ফেলে না।
আজ সেই মেয়ের চোখে জল দেখলেন তিনি।
হামিদ সাহেব আমির সাহেবের দিকে তাকালেন।
আমির সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন
– আমার তো কোনো মেয়ে নেই, হামিদ ভাই। আমি চাই আমার মেয়ের শূন্যতা তোমার মেয়ে পূরণ করুক।
তুমি আমার ছেলের বউ না, তুমি আমার মেয়ে। আমি চাই তুমি সারাজীবন এই খান পরিবারের মেয়ে হয়ে থাকো। আর হ্যাঁ, এই বিয়ে নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই।
সবাই একসাথে হেসে উঠলো।
হামিদ সাহেবও মুচকি হাসলেন।
– আমারও কোনো আপত্তি নেই,। বললেন হামিদ সাহেব।
আমির সাহেব এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন।
– আজ থেকে কিন্তু তুমি আমার বিয়াই সাহেব হয়ে গেলাম । বলেই হেসে উঠলেন।
শফিউর খান পাশে থেকে বললেন
– আমি চাই ইসলাম বাড়ির দুই মেয়েকে বেশ ধুমধাম করে নিয়ে আসবো আমাদের বাড়ি।
সামনের সপ্তাহেই বিয়ের তারিখ ঠিক করা হোক। বাড়ির লক্ষ্মী দের আর দেরি করানো ঠিক হবে না।
আনিসুল সাহেব বন্ধুর কথায় সম্মতি জানালেন।
সবাই মিলে সামনের সপ্তাহে বিয়ের তারিখ ঠিক করলো।
লামহাকে নিয়ে ইসলাম বাড়ির সবাই খান বাড়ি থেকে বের হতেই
আবির ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো
– আমার বউকে ও নিয়ে যাবেন??
আমির সাহেব বললেন
– হ্যাঁ, বিয়ের আগ পর্যন্ত লামহা ওদের বাড়িতেই থাকবে।
আবির গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো
– কেনো? আমার বউ আজ আমার সঙ্গে থাকবে। আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারবো না।
আর সবচেয়ে বড় কথা আজ আমাদের ফার্স্ট নাইট, মানে বাসর আজ! তাহলে লামহা ওদের বাড়িতে থাকবে কেনো?
ছেলের এমন বেহায়া কথা শুনে আমির সাহেব হতভম্ব।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
বাড়ির ছোটরা মিটমিটিয়ে হাসছে।
লামহা রাগি চোখ করে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে।
আমির সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন
– বড়রা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই হবে।
বলেই চলে গেলেন।
ইসলাম বাড়ির সবাই নিজেদের বাড়ির পথে রওনা হলো।
তা দেখে আবির মুখ ভোঁতা করে নিজের রুমে চলে গেলো।
রাত প্রায় গভীর। বাড়ির সকলে ঘুমে কাঁদা। হঠাৎ কিছুর শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো লামিয়ার। চোখ খুলে আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো শব্দটা কোথা থেকে আসছে।
বিছানা থেকে উঠে এক পা দুই পা বাড়িয়ে রুমের দরজা খুলতেই কালো হুডি পড়া কেউ তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো। হঠাৎ এমন হওয়ায় লামিয়া তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেলো। কালো হুডি পরা মানুষটা আচমকা লামিয়ার গলা টিপে ধরতেই লামিয়া ছটফট করে উঠলো। অন্ধকার আর মুখ ঢাকার কারণে হুডি পড়া মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছিল না শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। হুডি পরা মানুষটা তার পকেট হাতিয়ে ধারালো ছুরি বের করে লামিয়ার গলায় ধরে এক টান দিতেই গলা থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে পড়লো।
— লামিয়া……
ঘুম থেকে বেশ চিৎকার করে উঠলো শুভ্র।
পাশে থেকে রাশেদ ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বললো
— কি হয়েছে শুভ্র?
শুভ্রর শরীর ঘেমে অবস্থাটা খারাপ। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। শুকনো গলায় ঢোক গিললো অনেক কষ্টে। রাশেদ পাশে থেকে পানি নিয়ে শুভ্র কে দিতেই শুভ্র দ্রুত পানি পান করলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ভোর চারটা বাজে। রাশেদ শুভ্রের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো
— খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস?
শুভ্র মাথা নাড়িয়ে বললো
— হ্যাঁ।
রাশেদ শুভ্রর মুখ দেখে বুঝতে পারলো তার বোনকে নিয়ে কিছু দেখেছে। তাই শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে বললো
— দেখ আসবি একটু?
শুভ্র রাশেদের দিকে চোখ তুলে তাকালো। তা দেখে রাশেদ হেসে বললো
— যা দেখে আয়, মনের অস্থিরতা কমবে।
শুভ্র আর কিছু না বলে টেবিলের ড্রয়ার থেকে এক্সট্রা চাবি আর একটা মলম নিয়ে দ্রুত দরজা খুলে রওনা দিলো লামিয়ার রুমের দিকে।
লামিয়ার রুমের দরজার সামনে এসে আস্তে করে লক খুলে ভিতরে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে দিলো। রুম পুরো অন্ধকার, বাইরে থেকে ভোরের হালকা আলো আসছে। লামিয়া কোলবালিশ ধরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। রুমে পিনপিন নিরবতা। শুভ্র ধীর পায়ে লামিয়ার পাশে বসে দেখলো এলোমেলো চুলগুলো মুখে এসে পড়ছে। শুভ্র আলতো হাতে চুলগুলো সরিয়ে দিতেই লামিয়া নড়েচড়ে উঠে কোল বালিশটা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। শুভ্র তা দেখে হাত সরিয়ে হিংসা চোখে কোলবালিশের দিকে তাকালো
কত বড় সাহস এই কোলবালিশের, তার ব্যক্তিগত জিনিসের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। এই কোলবালিশের একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বলেই লামিয়ার দিকে তাকালো। “আমার ঘুম হারাম করে দেখো কী সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে।”
হঠাৎ চোখ গেলো তার গালে সকালের থাপ্পড়ের কারণে গালটায় কালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে এখনো। তা দেখে বুক ভার হয়ে গেলো শুভ্রর। লামিয়ার গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে গালে চুমু এঁকে লামিয়ার ঠোঁটের কাঁটা জায়গায় আংগুল বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বললো
— আমি মারবো, আবার আমি আদর করবো। আমি ব্যথা দেব, আবার সেই ব্যথায় আমিই মলম লাগিয়ে দেব। আমি ভালোবাসবো, আবার আমি দূরে সরিয়ে দেব। আমাকে ঘৃণা করবি কর, যা শাস্তি দিতে চাস দিবি আমি মাথা পেতে নিবো দিলওয়ালি। কিন্তু মৃত্যু ছাড়া আমার থেকে তোকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কেউ না, যে তোর দিকে হাত বাড়াতে চাইবে সেই হাত আমি টুকরো টুকরো করে দিবো।
বলেই পকেট থেকে মলম বের করে মালিশ করে দিলো। তারপর কপালে ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে মাথায় হাত বুলাতে লাগলো। সামনে তাকাতেই দেখলো দেয়ালে তার নতুন গিটার ঝুলানো। পাশে বড় করে ঝুলানো একটা ছবির ফ্রেম সেখানে ,
লাল টুকটুকে একটা ফ্রোক পরা, ছোট ছোট চুলে দুটো ঝুঁটি করা, সামনে ছোট্ট ছোট্ট দুটো দাঁত কেলিয়ে হেসে আছে এক মেয়ে তার পাশে কালো রঙের শার্ট পড়ে কপাল কুঁচকে ছোট একটি ছেলে তাকিয়ে আছে মেয়েটির দিকে। তা দেখে শুভ্র হালকা হেসে লামিয়ার দিকে তাকালো। ছোট্ট বেলায় কত্তো গোলুমুলু ছিলো আর এখন কেমন শুকিয়ে গেছে। দুষ্টু মেয়েটা এখনো দুষ্টু আছে, শুধু রাগটা একটু বেশি হয়ে গেছে।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২১
শুভ্র মুগ্ধ নয়নে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। বুকের ভেতর অস্থিরতা যেনো একটু কমে আসছে তার। আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর মাথা নিচু করে কপালে আরো একটা চুমু এঁকে, আস্তে করে কোল বালিশটা সরিয়ে নিয়ে তার হাতে তুলে দরজা লক করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।
