প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৮
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
চারপাশে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছে সবাই। তাঁর উপর লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির এর গান শুনে কেউ আর হাসি থামাতে পারছে না।
লামহা মাথা নিচু করে মিটমিটে হাসছে। আবির ততক্ষণে নিচে থেকে পেটিকোট টেনে তুলে কোমড়ে ধরে রেখে অসহায় চোখে সবার দিকে তাকিয়ে আছে।
এটা কোনো কাজ হলো? সবার সামনে আজ মান সম্মান, ইজ্জত সব শেষ হয়ে গেলো।
” হা হা হা আগেই বলেছিলাম লুঙ্গি পরে আয় তাই সবসময় বলে বড়দের কথা কিছু টা হলেও শুনতে হয়।”
বলেই হেঁসে উঠলো সাফওয়ান।
” ভাগ্যিস ভায়ার পেটিকোটের নিচে নেংটু পেন্ট ছিলো নয়তো ভায়ার চুন্টু মুন্টু সবাই আজ দেখে ফেলতো।”
পাশ থেকে ইমন বলে উঠতেই সবাই আবার পেট ফেটে হেঁসে উঠলো।
আবির মুখ চুপসে তাকিয়ে রইলো সবার দিকে। বেশ লজ্জা লজ্জা লাগছে তাঁর।
আবিরের অবস্থা বুঝে সাফওয়ান হাঁসি থামিয়ে হালকা কেশে বললো ” হয়েছে এখন সবাই থামো গোসল শুরু করো। ভেজা অবস্থায় অনেক ঠান্ডা লাগছে আমার বউয়ের।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সাফওয়ান এর কথায় সবাই আবার গোসলের নিয়ম শুরু করলো। সবার যে যার মতো পানি ছিটাছিটি করতে ব্যাস্ত। একটু পরেই শুরু হবে কাঁদা পানি। তাই লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন আস্তে করে কেটে পড়লো। দ্রুত তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো নিয়ে ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটা বালতির মধ্যে রেখে হাতে গ্লাভস পরে পানিতে গোলাতে শুরু করলো।
আগেই তৈরি করা ছোট্ট ছোট্ট ফোলানো লাল নীল বেলুন গুলো ছোট্ট ছোট্ট বালতির মধ্যে নিয়ে মোট বারোটি বালতি হাতে নিয়ে বাগানে উপস্থিত হলো ছয়জন । তাঁদের দিকে কারোর নজর নেই। সবাই নিজেদের মতো রং খেলছে। লামিয়া চোখ ঘুরিয়ে মিলি দিকে তাকাতেই দেখলো মিলি হাতে রং সামনের দিকে দৌড়াচ্ছে। লামিয়া তা দেখে এক ভ্রু উঁচিয়ে সেদিকে তাকালো। মিলি দৌড়ে পিছন থেকে শুভ্র কে হঠাৎ মুখে রং মেখে দিতেই লামিয়া চোখ গুলো ছোট্ট ছোট্ট করে ফেললো।
হঠাৎ পিছন থেকে রং দিতেই শুভ্র পিছন ফিরে তাকাতেই মিলিকে দেখেই তাঁর রাগ বেরে গেলো। মিলি হাঁসি মুখে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। এই মেয়েটা কে যতোবার বলেছে দূরে থাকতে এই মেয়ে ততবার ই লেগে থাকে।
লামিয়া ঠোঁট গোল করে শিশ বাজাতে বাজাতে মাহির আর ইভান এর দিকে তাকালো। মাহির আর ইভান লামিয়ার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে মাহির লাল রঙের একটা বালতি আর ইভান হাতে কিছুটা গোলাপি রঙের রং হাতে তুলে দৌড় দিলো মিলির দিকে।
” বলেছি না দূরে দূরে থাকতে? শুনতে পাও না? এক কথা কতোবার বলতে হবে তোমাকে?” বেশ ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলো শুভ্র।
মিলি মুখ মলিন করে কিছু বলতে যাবে তাঁর আগেই ইভান দৌড়ে পিছন থেকে মিলির পুরো মুখে রং মাখিয়ে দিতেই মিলির পুরো মুখ কালো আর গোলাপী হয়ে উঠলো। মিলি চমকে পিছন ঘুরে তাকাতেই আচমকা মাহির এক বালতি পানি মিলির মাথায় ঢেলে দিতেই শুভ্র দ্রুত পিছন সরে দাঁড়ালো। মিলি হতবাক হয়ে তাকালো মাহির আর ইভানের দিকে। মাহির আর ইভান তা দেখে দাঁত কেলিয়ে বলে উঠলো হ্যাপি হোলি।
মিলি চিৎকার করে কিছু বলার আগেই নাকে বাজে স্মেল পেতেই মাথা নিচু করে নিজের কাঁধে কাছে মুখ নিতেই নাক মুখ খিচে নিলো।
” ওয়াককককক কি দিয়েছো আমার গাঁয়ে উপর?? ছিঃ এতো বাজে স্মেল কেনো আসছে?” বেশ চেঁচিয়ে বলে উঠলো মিলি।
” বেশি কিছু না সার দিয়েছি।” বলেই ঠোঁট চেপে হেঁসে উঠলো ইভান।
” সার মানে??”
” আরে সার , সার আপনার মাথায় তো চুল নেই তাই চুল গজানোর জন্য সার দিলাম এই আর কি। আর সব চেয়ে বড় কথা এটা আমাদের এখানের নিয়ম বিয়েতে যে মেয়ের মাথায় চুল ছোট্ট দেখবে তাঁর মাথায় এই গোবরের পানি ঢালা জানি দ্রুত এই পানি পেয়ে তাঁর চুল বড় হয়ে যায়।” বলেই দাঁত কেলিয়ে হাসলো মাহির।
” কীহহহ! গবর এর পানি মানে? তোমরা আমার গাঁয়ে গবরের পানি দিয়েছো??” বেশ চেঁচিয়ে উঠলো মিলি।
মাহির আর ইভান মিলির কথায় মাথা উপর নিচে নাড়ালো।
মিলি তা দেখে মাহির আর ইভান এর পিছনে তাকাতেই দেখলো লামিয়া, তায়েবা, তায়েব, ইমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। তা দেখে মিলির আরো রাগ উঠছে রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” তোমরা ইচ্ছে করে আমার উপর এসব নোংরা পানি দিয়েছো তাই না? তোমাদের আমি দেখে নিবো। এক একজন কে আমি দেখে নিবো।”
বলেই মুখে হাত দিলো তাঁর গা গুলিয়ে আসছে। এখানে এক মূহুর্তে থাকলে বমি করে দিবে সে। তাই দৌড়ে চলে গেলো সেখান থেকে। তিহা রং খেলছিলো মিলি কে এভাবে দৌড়াতে দেখে সেও মিলির পিছন পিছন দৌড়াতে লাগলো।
মিলি যেতেই লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা, ইভান, ইমন হো হো করে হেঁসে উঠলো।
শুভ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখে মিটমিটে হাসছে। লামিয়া যে এসব কেন করেছে তা শুভ্র বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। পিছন থেকে রাশেদ ডাক দিতেই শুভ্র লামিয়ার দিকে তাকিয়ে চলে গেলো রাশেদ এর সাথে।
” ভাই ওর মুখ টা দেখে বেশ মজা পেয়েছি আমি।” বলেই হেঁসে উঠলো তায়েব। তারপর লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো ” এখন তোর দ্বিতীয় প্ল্যান কী?”
লামিয়া বাঁকা হেঁসে বললো ” এক বিলাতি পোলা রে কালির পায়লা বানানোর প্ল্যান আছে।”
” তু…তু….তুই কী আবরার ভায়ের কথা বলছিস?” বেশ ভীত কন্ঠে বললো তায়েবা।
” ইয়েস! ওই বিলাতি ইঁদুরের কথাই বলছি। ”
” মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে তোর?”
” ওই ভদ্র বেডা রে কালা বানানোর জন্য মাথা খারাপ হওয়াটা কী খুব দরকার??”
” ভাই প্লিজ আমার ভয় করছে যদি কিছু বলে?”
” কি বলবে?? একটা বেলুন ওই ভদ্র বেডার মুখ বরাবর ছুঁড়ে মেরেই দৌড় দিবো।”
” তুই আসলেই পাগল হয়ে গিয়েছিস?? ওই বেলুনে কালা কালি রেখেছিস তুই।”
” উফফ আমি জানি তো।”
” তাহলে?”
” তাহলে কী? ওসব বাদ আমি যা বলি তাই করবি বুঝতে পেরেছিস??”
মাহির, তায়েব, তায়েবা, ইভান, ইমন ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়ালো। তা দেখে লামিয়া হেঁসে হেঁসে সব বুঝিয়ে দিতে লাগলো।
রং কাঁদা মাটি করে সবাই ভুত হয়ে গিয়েছে। সাফওয়ান, আরিফ, আবির, আয়না, লামহা আর হামিদার গোসল শেষ তাদের নিয়ে বাড়িতে দিয়ে এসেছে কয়েকজন। এদিকে সবাই প্ল্যান করলো পুকুরে আজ গোসল করবে। তাই সবাই নাচতে নাচতে হাঁটা ধরলো পুকুরের দিকে। রাশেদ, শুভ্র, লাবিব, জাহিদ, ফাহিম, সামির কথা বলতে বলতে তাঁরা ও পুকুরের দিকে হাঁটতে লাগলো।
শুভ্র কথার মাঝে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো লামিয়া বা তাদের দলের সদস্য কোথাও নেই তা দেখে কপালে ভাঁজ ফেললো।
” এই যে মিস্টার শুনছেন?”
হঠাৎ পিছন থেকে লামিয়ার কন্ঠ শুনে শুভ্র দ্রুত পিছন ফিরতেই ঠাস।।
সবাই হা করে তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে। শুভ্র চোখ মুখ বন্ধ করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ রাশেদ হো হো করে হেঁসে উঠতেই সবাই তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে হেঁসে উঠলো।
শুভ্র হাত দিয়ে চোখ মুছে শীতল দৃষ্টিতে তাকালো লামিয়ার দিকে।
” কী মিষ্টার?? আজকে আপনি ফর্সা হয়ে দেখান তো দেখি কীভাবে ফর্সা হতে পারেন আপনি।” বলেই বাঁকা হাসলো লামিয়া।
শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে হালকা হাসলো। লামিয়া তা দেখে ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো। শুভ্র তা দেখে এবার জোরে হেঁসে উঠলো। শুভ্রর হাসিতে চমকে উঠে আশ্চর্য চোখে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকলো শুভ্রর দিকে।
শুভ্র তা দেখে হুট করে লামিয়ার দিকে দৌড় দিতেই মাহির, তায়েব, তায়েবা, ইভান, ইমন ভয়ে চেঁচিয়ে উঠে দৌড়াতে দৌড়াতে বললো ” আল্লাহ গো আজরাইল আসতাছে পালা লামু। ”
তাঁদের কথায় লামিয়ার ধ্যান ভাংতেই দেখলো শুভ্র তার দিকে দৌড়ে আসছে। লামিয়া বড় বড় চোখ করে পালানোর জন্য দৌড় দিতেই শুভ্র লামিয়ার লম্বা চুলে বেণী ধরে ফেললো।
” এই এই বেডা ছাড়েন আমার চুল। বলেছি না হাতাহাতি করবেন না।” বেশ চেঁচিয়ে উঠলো লামিয়া।
” আপনি তো অতি ভদ্রমহিলা তো তাই আপনার সাথে হাতাহাতি করতে আমার হাত নিশপিশ করে। চলুন আজকে আমাকে আপনি সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে শরীরের সব কালি গুলো উঠিয়ে আমাকে গোসল করিয়ে দিবেন চলুন।”
” মাথা ঠিক আছে আপনার?? এসব কী বলছেন, আমি কেনো আপনাকে গোসল করিয়ে দিতে যাবো। ছাড়ুন আমার চুল।”
” ছাড়বো না কী করবেন আপনি?”
” দেখুন চুল ধরাটা আমার মোটেও পছন্দ নয়। দ্রুত চুল ছাড়ুন নয়তো আপনাকে আজ এই পুকুরে চুবিয়ে মারবো।”
শুভ্র হুট লামিয়া কে কাঁধে তুলে হাঁটতে হাঁটতে বললো ” চলুন দেখি কে কাকে পুকুরের চুবিয়ে মারে।”
” ফালতু লোক, নিচে নামান আমাকে। নয়তো আপনার কাঁধ কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবো। ”
” আপনি যে জংলি বিড়াল তা আমি জানি মিস মনে করাবেন না। আপনি আমার কাঁধে কামড় দিলে আমি কিন্তু সেই কামড় দ্বিগুন ভাবে ফিরিয়ে দিবো। ”
” দেখুন বদ্দো বেশি বেশি হচ্ছে ছাড়ুন আমাকে। বড় ভাই তুমি কিছু বলো তোমার বন্ধু কে।”
রাশেদ লামিয়ার কথা শুনেও না শোনার ভান করে সবাই কে বললো ” হয়েছে আর গোসল করতে হবে না সবাই উঠে আয়। ”
” কেনো রাশেদ ভাই আরো একটু থাকি না।” পানি থেকে শারমিন বলে উঠলো।
শারমিনের কথা মনে হলো রাশেদের কাছে ভালো লাগে নি তাই বেশ ধমকে উঠতেই। শারমিন চমকে দ্রুত পানি সবাই কে নিয়ে পানি থেকে উঠে হাটা শুরু করলো।
সবাই বাড়ির দিকে যেতেই শুভ্র লামিয়া কে কাঁধে নিয়ে পানিতে নামতেই লামিয়ার ভয়ে কলিজা শুকিয়ে আসলো। কারণ সে সাঁতার জানে না। যদি এই লোক সত্যি সত্যি পানিতে চুবিয়ে মারে তখন কি হবে??
ভেবেই লামিয়ার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। তবুও নিজেকে শক্ত রাখছে শুভ্রর সামনে।
শুভ্র মাঝে গিয়ে লামিয়া কে আচমকা ছুঁড়ে দিলো পানিতে। আচমকা এমন হওয়াতে লামিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ডুবে গেলো।
তা দেখে শুভ্র দ্রুত ডুব দিয়ে লামিয়া কে পানির নিচে থেকে উঠাতেই লামিয়া শুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে লাগলো। লামিয়ার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। তা দেখে শুভ্র ভ্রু নাচিয়ে বললো ” কী হলো মিস?? এই না আপনি আমাকে চুবিয়ে মারবেন এখন দেখছি আমাকে মারার আগে আপনার নিজের অবস্থাই খারাপ হয়ে গিয়েছে।”
লামিয়া জোড়ে জোড়ে শ্বাস ফেলছে। শুভ্রর কথা শুনে বেশ রাগ লাগছে তবে কিছু বলতে পারছে না।
শুভ্র লামিয়ার চেহারা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। লামিয়া তা দেখে রাগি চোখে তাকাতেই শুভ্র লামিয়ার গালে আচমকা চুমু দিয়ে বসলো। লামিয়া দাঁতে দাঁত চেপে বললো ” বলেছি না আমাকে স্পর্শ করবেন না।”
” বাহ্ রে আপনি নিজেই তো আমার গলা সাপের মতো পেঁচিয়ে রেখেছেন আর আমি একটা চুমু খেলেই দোষ?”
” পেঁচিয়ে কী আর সাধে রেখেছি?? দ্রুত তুলুন আমাকে এই পানি থেকে। ”
” কেনো ভয় পাচ্ছেন ?”
” ভয় আর আমি? উঁহু এই লামিয়া ভয় পায় না।”
” তাহলে ছেঁড়ে দেই।” বলেই শুভ্র লামিয়ার কোমড় ছাড়তেই লামিয়া চেঁচিয়ে উঠলো
” এই নাআআ, ছাড়বেন না প্লিজ আমি সাঁতার কাটতে জানি না।” বলেই শুভ্র কে পেঁচিয়ে ধরলো আবার।
শুভ্র মুচকি হেসে লামিয়ার কোমড় জড়িয়ে ধরে তাকালো লামিয়ার দিকে। হলুদ রঙের ভেজা জামা গাঁয়ের সাথে লেপ্টে আছে, ঠোঁট জোড়া হালকা কাঁপছে, কাজলে লেপ্টে আছে চোখ দুটো, সেই চোখ দুটোর দৃষ্টি তাঁর উপর ই পরে আছে। শুভ্রর লামিয়ার কোমড় থেকে হাত সরিয়ে লামিয়ার চুলের বেণী করা কালো ফিতার দিকে হাত বাড়িয়ে এক টানে চুলের ফিতা খুলে বেণী গুলো খুলে দিতেই লামিয়ার কোমড় সমান চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পিঠে পড়লো।
লামিয়া বেশ বিরক্ত হলো শুভ্রর এমন কাজে। বিরক্ত হয়ে কিছু বলার আগেই শুভ্র বাঁকা হেঁসে লামিয়ার কোমড় চেপে লামিয়া কে নিয়েই পানির নিচে ডুব দিলো। আচমকা তাঁকে নায়ে ডুব দেওয়াতে লামিয়া শুভ্রর হাত আঁকড়ে ধরে নিঃশ্বাস বন্ধ করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। প্রায় পাঁচ সেকেন্ড পর উপরে তুলতেই লামিয়া জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে নিতে রাগি দৃষ্টিতে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো ” আপনি আসলেই একটা ফালতু লোক। আপনাকে আমি দে…..।”
আর বলতে পারলো না শুভ্র তার আগেই আবার তাঁকে নিয়ে ডুব দিলো। প্রায় তিন চার বার ডুব দেওয়ার পর লামিয়া কিছু টা অবাক হলো। অবাক হয়ে তাকালো শুভ্রর দিকে। শুভ্র লামিয়ার চেহারা দেখে হাসছে দেখে লামিয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকালো তাঁর দিকে।
ছোট্ট থেকেই লামিয়া সাঁতার কাটতে পারে না। পানিকে ভীষণ ভয় পায় সে। ছোট্ট বেলায় শুভ্র, লাবিব, জাহিদ, ফাহিম, রাশেদ, আরিফ, সাফওয়ান, আবির খেলার শেষে প্রায় সময় পুকুরে গোসল করতো। তাঁদের দেখা দেখি লামিয়া ও গোসল করতে চাইতো পুকুরে তবে সে সাঁতার জানে না দেখে শুভ্র তাঁকে পানিতে নামতে দিতো না। এই নিয়ে বেশ কান্না কাটি করার পর শুভ্র বাধ্য হয়ে লামিয়া কে নামাতো পানিতে। কিন্তু পানিতে যতোক্ষণ থাকতো ততক্ষণ শুভ্রর গলা জড়িয়ে রাখতো। তাঁতে শুভ্র বিরক্ত হয়ে লামিয়া কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ঠিক এমন ভাবেই ডুব দিতো । লামিয়া কান্না কাটি চিৎকার করলেও ছাড়তো না। বেশ কয়েকবার ডুব দেওয়ার পর যতক্ষণ লামিয়ার চোখ মুখ লাল না হতো ততক্ষণ শুভ্র তাঁকে পানিতে চুবাতেই থাকতো। যখন লামিয়ার চোখ মুখ লাল হয়ে যেতো তখন শুভ্র তা দেখে হাসতো আর লামিয়া মুখ ফুলিয়ে কান্না করতো।
আজ ও তাই হচ্ছে। লামিয়া ভেবে পাচ্ছে না, একটা মানুষের সাথে এতোটা মিল কীভাবে হয়। লামিয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে শুভ্রর হাসি।
” কে আপনি?” বেশ শীতল গলায় শুভ্র কে প্রশ্ন করে বসলো লামিয়া।
লামিয়ার প্রশ্নে শুভ্র হাঁসি থামিয়ে লামিয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। শুভ্রর এমন চাহনি তে লামিয়া চমকে উঠলো। তা শুভ্র বুঝতে পেরে লামিয়ার কপালে লেপ্টানো ভেজা চুল গুলো সরিয়ে দিয়ে ধীর কন্ঠে বললো ” আমি আবরার, আপনার বড় ভাইয়ের বন্ধু।”
” কিন্তু আমার কেনো মনে হচ্ছে আপনি অন্য কেউ।”
” অন্য কেউ বলতে কী বোঝাতে চাইছেন?”
” শু শু শুভ্র ভাই?”
লামিয়ার মুখ থেকে শুভ্র ভাই ডাক শুনতে পেয়ে শুভ্র মনে মনে হাসলো। তারপর ঠিক আগের ন্যায়ে বললো
” শুভ্র ভাই টা কে মিস??”
লামিয়া চুপচাপ তাকিয়ে আছে শুভ্রর দিকে কোনো কথা না বলে। তা দেখে শুভ্র আবার বললো ” শুভ্র কী হয় আপনার বিশেষ কেউ??”
শুভ্রর কথার পৃষ্ঠে লামিয়া আর কোনো কথা বললো না। শুভ্র তা দেখে চুপচাপ লামিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
শুভ্র লামিয়ার কোমড় থেকে হাত সরিয়ে নিজের ভেজা চুল গুলো ঝাড়া দিয়ে বললো ” মিস সাপের মতো গলা পেঁচিয়ে ধরুন আবার আপনাকে পারে দিয়ে আসি।”
লামিয়া আগের ন্যায়ে কোনো প্রকার কথা না বলে শুভ্রর গলা পেঁচিয়ে ধরতেই শুভ্র সাঁতরে পারে এসে লামিয়া কে উঠিয়ে দিয়ে নিজে উঠে গেলো পানি থেকে।
পানি থেকে উঠে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে পিছন ঘুরতেই দেখলো লামিয়া ধৈই ধৈই করে হেঁটে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। তা দেখে শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সেও হাঁটতে লাগলো।
সময়টা দুপুর একটা বেজে চল্লিশ মিনিট।
লাল ফিতা দিয়ে গেট ধরে রেখেছে মেয়ে পক্ষের মানুষ।
তবে এখনো ছেলের বাড়ির কেউ আসে নি। তবুও তাঁরা আগে আগে গেটে দাঁড়াবে। বলা তো যায় না কখন টুস করে বর যাত্রী ঢুকে পড়ে বলবে গেট ধরা হয়নি তাই এসে পড়েছি, আর গেটের টাকা চাইতে গেলে বলবে গেট ই ধরো নাই তাহলে কীসের টাকা?? তাই লামিয়া আগেভাগেই সবাইকে গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে দিয়েছে। আজকে সব মেয়েরা সাদা লেহেঙ্গা পড়েছে আর ছেলেরা সাদা শার্ট ইন করে কালো পেন্ট আর উপরে কালো ব্লেজার। আয়না, লামহা আর হামিদাকে পড়ানো হয়েছে মেরুন রঙের ভারি লেহেঙ্গা। তবে তাঁরা এখনো পার্লার থেকে আসে নি। রাশেদ , লাবিব আর শুভ্র তাঁরা রেডি হয়ে গিয়েছে তাদের আনার জন্য।
আয়নার সামনে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া। তাঁর পাশেই তায়েবা দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছে আর আড়চোখে তাকাচ্ছে তাঁর দিকে। একটু আগে লতিফা বেগম এর হাতে দু ঘা পিঠে পড়েছে তাঁর। লতিফা বেগম এর দিয়ে যাওয়া লেহেঙ্গা সে পড়বে না তাও সাদা রঙের জামা। লেহেঙ্গা যে পুরোপুরি সাদা তাও নয়, সাদার মধ্যে গোল্ডেন এর কাজ আছে লেহেঙ্গা তে। তবুও লামিয়া সাদা রঙের কিছু পড়বে না। এই নিয়ে বেশ কথা কাটাকাটি হয়েছে মা মেয়ের মধ্যে। লতিফা বেগম লামিয়া কে রাজি করাতে না পেরে পিঠে দু ঘা বসিয়ে বকতে বকতে চলে গিয়েছে নিজের কাজে।
সে থেকে লামিয়া মুখ ফুলিয়ে আছে। তা দেখে তায়েবা মিটমিটে হাসছে। লামিয়া বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে আলমারি খুলে নিজের পড়ার মতো জামা খুঁজতে লাগলো। তায়েবা তা চুপচাপ দেখছে আর চুল বাঁধছে।
বেশ কিছুক্ষণ আলমারিতে চিরুনি অভিযান চালিয়ে নিজের পছন্দ মতো জামা খুঁজে পেতেই গজ দাঁত বের করে হাঁসি দিয়ে জামা নিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গেলো। তায়েবা বাঁকা চোখে তা দেখে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।
লামিয়া বাথরুম থেকে বের হতেই তায়েবা আবার বাঁকা চোখে লামিয়ার দিকে তাকাতেই তায়েবা চোখ ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে ফেললো।
লামিয়া তা দেখে মুখ বাঁকিয়ে কাঁধ দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে আয়নার দিকে তাকালো। তায়েবা হা করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। লামিয়া একটা স্কাই ব্লু রঙের সারারা পড়েছে জামার গলায় হাতায় গোল্ডেন এর পাথরের কাজ করা। তায়েবা তা দেখে মুখ ফুলিয়ে বললো ” তুই আগে কেনো বলিস নি এইটা পড়বি?”
” আমিও জানতাম না যে আমি এই জামা পড়বো। আর তুই তো জানিস এই সারারা ফারারা আমার অতোটাও পছন্দের না।”
” তবে পড়েছিস কেনো?”
” হাতের কাছে পেয়েছি তাই।”
” কী শখ করে দুজনের জন্য সেম ড্রেস কিনেছিলাম কিন্তু তুই এই জামা ছুঁয়েও দেখিস নি বলেছিলি এই রং তোর গাঁয়ে মানাবে না, কিন্তু আজকে দেখ কী সুন্দর লাগছে তোকে এই রঙে।”
” ওও তাই নাকি?”
” হ্যাঁ!”
” তুই চাইলে তুই ও পরে আসতে পারিস তোর ড্রেস। সবাই যেহেতু সাদার মধ্যে গোল্ডেন পড়ছে। আমরা তাহলে স্কাই ব্লু এর মধ্যে গোল্ডেন পরি একটু ইউনিক থাকি কি বলিস?”
লামিয়ার কথায় তায়েবার চোখ চকচক করে জ্বলে উঠলো। তাই আর কিছু না বলে দ্রুত হাঁটা ধরলো জামা পড়তে নিজের রুমে দিকে।
লামিয়া তায়েবার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেঁসে চুল আঁচড়াতে লাগলো।
” এতোক্ষণ লাগে তোদের? আর এসব কি লাগিয়েছিস মুখে?” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো রাশেদ।
রাশেদ এর কথা শুনে আয়না, লামহা, হামিদা, ছবি, শারমিন, হাফসা, ফারিয়া, মনিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো রাশেদের দিকে। রাশেদ এর এমন কথা তাদের মোটেও পছন্দ হয়নি। তাই শারমিন গলা খাঁকারিয়ে বলে উঠলো
” এইগুলো কে মেকআপ বলে। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে কোনোদিন দেখেননি মেকআপ তাই এই কথা টা বললেন।”
শারমিনের কথা শুনে রাশেদ ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো ” না সত্যি দেখি নি আপনাদের এমন অখাদ্য মার্কা মেকআপ। এক একটাকে দেখে মনে হচ্ছে জঙ্গল থেকে পিশাচিনি বের হয়ে আসছে। তোদের চেহারার নকশা পাল্টিয়ে ফেলেছে। আর তোকে দেখতে শিমুল গাছের পেত্নী লাগছে বিলিভ মি।”
রাশেদ এর কথায় মেয়েরা সব জ্বলে উঠলো তেলে বেগুনে। শারমিন কে এক্সট্রা করে শিমুল গাছের পেত্নী বলায় শারমিন বেশ ক্ষেপে গেলো।
” আপনি আমাকে শিমুল গাছের পেত্নী বলতে পারলেন রাশেদ ভাই??” বলেই হামিদাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বললো ” আমাকে কী শিমুল গাছের পেত্নী লাগছে তোরাই বল তো?”
মেয়েরা সবাই মাথা নাড়িয়ে বললো মোটেই না।
রাশেদ শারমিনের মুখ থেকে আবার ভাই ডাক শুনে ইচ্ছে করছে নিজের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। এই মেয়েকে কতোবার বলবে যে তাঁকে ভাই বলে সম্বোধন না করতে তারপর ও এই মেয়ে বারবার তাকে ভাই বলে সম্বোধন করে যাচ্ছে। রাশে দুঃখে রাশেদ মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই দেখলো শুভ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে।
” এই এই সর সব সর সাইড দে, আমার হৃদয়ের ছবি কোথায় রে?? দেখতে পাচ্ছি না কেনো তাকে??”
বলতে বলতে শুভ্র আর রাশেদ কে সাইডে ধাক্কা দিয়ে মেয়েদের সামনে দাঁড়ালো লাবিব। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সবাইকে একরকম লাগছে তা দেখছ ভ্রু কুঁচকে খুঁজতে লাগলো ছবিকে। ছবি ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে তাঁর পাশে তা লাবিব খেয়াল করে নি। সবাই তা দেখে মুচকি হাসছে। বেচারা লাবিব একে তো লামিয়া আর ছবি কে গুলিয়ে ফেলে, কালকে পর্যন্ত দুজন ছিলো । তবু ও কালকে দুজন এক রকম শাড়ি পরায় ছবি ভেবে লামিয়া কে জড়িয়ে ধরে ছিলো। এই নিয়ে শুভ্র আজ সকালে তাঁকে বেশ শাসিয়েছে। তবে আজ তো সবাই এক সাজ দিয়েছে আজ যদি ছবি ভেবে মনিকা কে জড়িয়ে ধরে তাহলে আজকে ছবি তাকে মেরেই ফেলবে। ভেবে ভয়ে ঢোক গিললো লাবিব।
আশেপাশে তাকিয়ে পাশ ফিরতেই লাবিব চিৎকার করে ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। তা দেখে ছবি আরো কটমট দৃষ্টিতে তাকালো লাবিব এর দিকে। সবাই তা দেখে উচ্চ স্বরে হেঁসে উঠলো। লাবিব অসহায় চোখে ছবির দিকে তাকিয়ে বললো ” কোথায় ছিলি জান? আর এইভাবে কেউ তাকায়? আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
বলেই অসহায় চোখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বললো ” জান তোকে আজ সাদা পরী লাগছে উফফফ নজর জানি না লাগে। ইচ্ছে করছে খেয়ে ফেলি। ” বলেই বাঁকা চোখ তাকালো ছবির দিকে।
ছবি লাবিব এর কথা শুনে রাগ ভুলে মাথা নিচু লজ্জা মিশ্রিত হাঁসি দিয়ে পিছন ঘুরে গাড়িতে গিয়ে দ্রুত বসলো। লাবিব এর কথা শুনে সে বেশ লজ্জা পাচ্ছে।
লাবিব ছবি কে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। এখন যদি এ কথা না বলতো তাহলে এই রাগ ভাঙাতে তার উপর দিয়ে বেশ ধকল যেতো।
রাশেদ এইবার দ্রুত সবাইকে তাড়া দিয়ে গাড়িতে বসতে বললো। রাশেদ এর কথা শুনে সব মেয়েরা গাড়িতে উঠে বসতেই লাবিব, রাশেদ, শুভ্র গিয়ে গাড়িতে বসে রওনা দিলো বাড়ির দিকে।
।
তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন হাতে বেশ কিছু জিনিস নিয়ে উপস্থিত হলো লামিয়ার রুমের দরজার সামনে। দরজা নক করতেই লামিয়া বলে উঠলো ” ভেতরে আসো।” বলতেই তাঁরা ভেতরে প্রবেশ করতেই হা করে দাঁড়িয়ে গেলো।
তায়েবা আর লামিয়া এক রকম ড্রেস আর এক রকম সাজে সজ্জিত হয়ে আছে। দুজনেই স্কাই ব্লু রঙের সারারা পরে, চুলগুলো মাঝখানে সিঁথি করে কার্লি করেছে , চোখে সাদা কাজল , ঠোঁটে রেড চেরি লিপস্টিক, দুজনের ই এক হাতে গোল্ডেন এর ঘড়ি আরেক হাতে স্কাই ব্লু রঙের পাথরের দুটো করে চুড়ি। চুড়ি গুলো তায়েবার আর ঘড়ি লামিয়ার তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। পায়ে গোল্ডেন এর চকচকে পায়েল পড়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে স্বর্ণ দিয়ে বাঁধাই করা। অবশ্য এই পায়েল গুলো তায়েবার তবে তায়েবা আর লামিয়া যা কিনে সবসময় দুটো করে কিনে। কখন কোথায় প্রয়োজনে পড়ে যায় ঠিক আছে নাকি। তাই সবসময় কিনে রাখে।
মাহির, তায়েব, ইভান, ইমন সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে লামিয়া চুল আজকে বেণী করা নেই, চুলগুলো খোলা দেখে আরো একবার টাস্কি খেলো। কারণ তাঁর খোলা চুল দেখের সৌভাগ্য কারোর হয়নি তেমন। মাঝে মধ্যে দেখে গেলেও তেমন ভাবে কেউ দেখতে পারে না।
মাহির রা এভাবে হা করে তাকিয়ে আছে দেখে তায়েবা মুখ বাঁকিয়ে লামিয়া কে বললো ” এই তাড়াতাড়ি কালো কাজল টা দে, কানের নিচে একটা টিকা দিয়ে নেই। ”
” হঠাৎ তোর কানের নিচে টিকা দিতে মনে চাইলো কেনো?”
” দেখছিস না চারটা গরু কীভাবে তাকিয়ে আছে। না ভাই রিস্ক নেওয়া যাবে না পড়ে যদি নজর লেগে যায়।”
তায়েবার কথা শুনে লামিয়া পিছন ঘুরে মাহিরদের দিকে তাকাতেই পাশ থেকে একটা লিপস্টিক তাদের দিকে ছুঁড়ে মেরে বললো ” নাক দিয়ে কি আমাদের হিংগ্গুল বের হচ্ছে যে এভাবে তাকিয়ে আছিস?”
লামিয়ার কথায় সবাই হেসে উঠলো।
” হিংগ্গুল কী রে বাপ?” মাহির হেঁসে বলতে বলতে হাতে থাকা বক্স খাটে রেখে বসলো।
” ইউ মিন সিংগ্গুল??” পাশ থেকে বললো তায়েব।
” উহু সর্দি হবে।” তায়েব এর কথায় ইমন বলে উঠলো।
” কিসের হিংগ্গুল, কীসের সিংগ্গুল আর কিসের সর্দি?? খাঁটি বাংলায় বল না বস্টি। ” বলেই বেশ চুল গুলো বেশ ভাব নিয়ে হাত দিয়ে ব্রাশ করলো ইভান।
” এই তোরা কী অফ যাবি?? কি সব খাচ্চরদের সাথে বসবাস করি রে ভাই।” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো তায়েবা।
তায়েবার কথা শুনে লামিয়া, মাহির, তায়েব, ইভান, ইমন মুখ বাঁকিয়ে এক সাথে বলে উঠলো ” ওরে আমার পরিষ্কার ওয়ালী।”
তায়েবা তা শুনে ও না শোনার ভান করে বললো ” এখন প্ল্যান অনুযায়ি কাজ করবি নাকি? আর তোরা সব এনেছিস??”
তায়েবার কথায় তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন মাথা নাড়াতেই। লামিয়া তায়েবা হিহি করে হেঁসে উঠলো।
চারপাশে বর আসছে বর আসছে বলতে বলতে হৈচৈ শুরু হয়েছে।
হামিদা, লামহা, আয়না কে নিয়ে ততক্ষণে বাড়িতে নিয়ে এসে রুমে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে বউয়ের সাজে।
আরিফ হলুদের দিন থেকেই খান বাড়িতে থাকে আনিসুল সাহেব তাঁকে কড়া গলায় বলেছেন বিয়ের আগ পর্যন্ত আয়নার সামনে জানি তাঁকে না দেখা যায়।
এই কথায় বেচারা সেদিন কষ্টে ইসলাম বাড়ির ছেড়েছে।
আরিফ, আবির আর সাফওয়ান আজ সাদা রঙের শেরওয়ানী পড়েছে। দেখতে তাদের রাজপুত্রের মতো লাগছে তিনজন কে। তাঁদের সামনেই দাঁড় করানো তিনটি সাদা রঙের ঘোড়ায় । আর পিছনে তিনটি পালকি।
আয়না এই বাড়িতে থাকলেও হামিদা আর লামহার মতোই তাকে পালকিতে উঠানো হবে। তাঁর কোনো দিক দিয়ে যেনো কোনো কমতি না থাকে সেটা সর্বদা খেয়াল রাখছে আনিসুল সাহেব।
আরিফ, আবির, সাফওয়ান ঘোড়ায় চরে উঠতেই। শারমিন, হাফসা, ফারিয়া ঘোড়ার সামনে দাঁড়ালো। তখনই সাউন্ড বক্সে গান বেজে উঠতেই তাঁরা নেচে উঠলো
~ Chote chote bhaiyon ke bade bhaiya
Ajj banenge kisi ke saiyaa
Dhol nagaade baje shahnaiyaan
Jhoom ke aayi mangal ghadiyaa
নাচ শেষ হতেই সবাই ইসলাম বাড়ির দিকে রওনা হলো।
এদিকে ইসলাম বাড়ির গেটের সামনে আজমেরী বেগম দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন তাঁরা সবাই ছোটাছুটি করছে তাদের কাজ নিয়ে।
বর এসেছে শুনে রুম থেকে বেরিয়ে কথা বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো শুভ্র আর রাশেদ ।
লামিয়া হল রুমে একবার এদিক ছুটছে তো আবার সেদিক। হঠাৎ শুভ্র সামনে তাকিয়ে লামিয়া কে দেখে রাশেদ এর সাথে কথা বাদ দিয়ে থমকে গেলো। নিজ অজান্তেই তাঁর হাত বুকের কাছে চলে গেলো। শুভ্রর দাঁড়িয়ে যাওয়া দেখে রাশেদ পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র বুকে হাত রেখে লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। রাশেদ হেঁসে এক সিঁড়ি উপরে উঠে শুভ্র কে মজা করে কাঁধে হালকা থাপ্পড় মারতেই শুভ্র ধুপ ধাপ করে গড়িয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলো। রাশেদ তা দেখে আঁতকে উঠে গিয়ে দ্রুত নিচে নেমে ধরলো।
হঠাৎ কিছু পড়ার শব্দ পেতেই লামিয়া, তায়েবা, তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন পিছন ঘুরে তাকাতেই হতবাক হয়ে গেলো। দ্রুত তায়েব আর মাহির গিয়ে শুভ্র কে তুলে উঠালো। লামিয়া কপালে তিন ভাঁজ ফেলে শুভ্রর সামনে এসে দাঁড়ালো। শুভ্র যে পরে গিয়েছে সেদিকে তাঁর কোনো খেয়াল নেই সে লামিয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।
লামিয়া কিছু বলার আগেই পিছন থেকে একজন লামিয়া কে ডেকে উঠলো ” লামিয়া তাড়াতাড়ি আয় গেটের ওইখানে গ্যাঞ্জাম হচ্ছে। ”
লামিয়া তা শুনে দ্রুত মিষ্টি আর শরবতের ট্রে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো। তাঁর পিছন পিছন তায়েবাও।
” শুভ্র ভাই আপনি ঠিক আছেন??”
বেশ চিন্তিত হয়ে জিগ্যেস করলো তায়েব।
” তোদের বোন আমাকে কোনোদিন ঠিক থাকতে দিয়েছে?” লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললো শুভ্র।
শুভ্রর কথা শুনে সবাই হেঁসে উঠলো। ইমন পাশ থেকে হাসতে হাসতে বললো ” প্রেমে মরা জ্বলে ডুবে না। ”
বলেই হাসতে হাসতে শুভ্র কে নিয়ে চললো সবাই গেটের কাছে।
” ডুন্ট আনডাসটেন আবিরু, নো মোনি নো হোনি।”
বলেই চোখের কালো চশমা ঠিক করলো আজমেরী বেগম।
” আরে দাদী ওইটা হবে নো মানি নো হানি।”
ফিসফিস করে আজমেরী বেগমের কানে কানে বললো লামিয়া।
” আরে ছেমরী ওই একই একই।”
বলেই আবিরের দিকে তাকালো আজমেরী বেগম।
” দেখো দাদী মোট দশ হাজার টাকা দিবো তা ছাড়া আর একটা টাকাও দিতে পারবো না। ” সামনে থেকে আবির বললো।
” ওই ছেমড়া স্টুপিট, পিপটি হাওজেন মোনি না দিলে আমার লামহু রে নিবার দিতাম না তোরে। ”
” ওওহো দাদী ফিফটি থাউজেন্ড হবে।” এবার পাশ থেকে ফিসফিস করে বললো তায়েবা।
” চুপ এতো বেশি কথা কস ক্যান? আমারে কইবার দে।”
তায়েবা কে বেশ ধমকে বলেই সামনের দাঁত টা হাত দিয়ে নাড়ালো। সেদিন শক্ত পেয়ারা চিবোতে যেয়ে তাঁর দাঁত নড়ে গিয়েছিলো। আজ কয়েকদিন ধরে এই দাঁতটা অনেক নড়াচড়া করছে। এখন অবস্থা বেশ খারাপ যখন তখন উঠে যেতে পারে। ভেবেই বেশ বিরক্ত হলো আজমেরী বেগম। এসব এখন সাইডে রেখে আবার আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো ” হেই বয় ঢেল মি পিপটি হাওজেন মোনি দিবি নাকি খান বাড়ি তোরে পাঠায় দিমু কোনডা?”
পাশ থেকে আরিফ বললো ” দাদী আমি তো তোমাদের দলে আমাকে অন্তত ভেতরে যেতে দাও।”
” তুই চুপ থাক।” বেশ ধমকে উঠলো আরিফ কে।
আরিফ দাদীর ধমক শুনে থতমত মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হলো আবির আর আজমেরী বেগম এর সাথে।
হঠাৎ আবির কিছু একটা ভেবে বললো ” ঠিক আছে দাদী তোমাকে তোমার ফিফটি থাউজেন্ড টাকাই দিবো তবে ফিফটি থাউজেন্ড বানান টা করো আগে তারপর।
আজমেরী বেগম খুশি হয়ে বলতে যাবে তাঁর আগেই লামিয়া বলে উঠলো ” এখানে বানান আসলো কোথা থেকে? এতো কেচাল বাদ দিয়ে ভাই টাকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করুন নয়তো আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যান। মেয়ে আমরা এমন হার কিপটা ছেলের কাছে বিয়ে দিবো না।”
” দশ হাজার টাকার বেশি এক টাকাও দিবো না। কি করবি কর। ”
লামিয়া কিছু বলার আগে আজমেরী বেগম লামিয়া কে ধমকে চুপ করিয়ে বললো ” নো পবলিম আমি বানান করতাছি দাঁড়া।”
লামিয়া, তায়েবা হাজার মানা করার পর ও আজমেরী বেগম তা শুনলো না।
” পয় রশিকার পি পয় রশিকার পি টয় রশিকার টি= পিপিটি, হ আকার হা , ও কার ও , জ একার জে, ন বলতেই জিহ্বা দিয়ে দাঁতে ঠেলা দিতেই আজমেরী বেগম চেঁচিয়ে উঠলো ” আমাগোওওও” বলেই মুখ চেপে ধরলো।
আজমেরী বেগম এর চেঁচানো শুনে সবাই চমকে তাঁর দিকে তাকালো। আজমেরী বেগম মুখে দাঁত চেপে কেঁদে উঠলো ” মাই টুট ইজ বাইরে কামিং। ওও মাই গড মাই মাওত দিয়ে বিলিডিং কামিং। ” বলেই ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে উঠলো।
আজমেরী বেগম দাঁত হাতে নিয়ে সবার সামনে ধরতেই সবাই হতবাক হয়ে তাকালো। হঠাৎ লাবিব হো হো করে হেঁসে বললো ” দাদী তুমি তো ফিফটি থাউজেন্ড বানান করে গিয়ে তোমার দাঁত ভেঙে ফেলেছো, হা হা হা।”
লাবিব এর কথায় আবির ও হেঁসে বললো ” আগে শুনেছি যে কঠিন শব্দ বলতে গেলে নাকি দাঁত ভেঙে যায়। আর আজকে নিজ চোখে দেখলাম সহজ একটা বানান করতে গিয়ে দাঁত ই ফেলে দিয়েছে। ওয়াহহহহ।”
সবাই হাসছে দেখে লামিয়া বেশ বিরক্ত হয়ে বললো
” আগেই বারণ করেছিলাম না আমরা?? এখন ভালো হয়েছে না ইজ্জতের চাটনি হয়ে গিয়েছে।”
আজমেরী বেগম হুহু করে কাঁদতে কাঁদতে আবির কে বললো ” হু এক মাঘে শীত যায় না মানড ইট।”
বলেই চলে গেলো বাড়ির ভেতর।
তা দেখে পাত্র পক্ষ সবাই হেঁসে উঠলো। লামিয়া আর তায়েবা দাঁড়ালো এবার সামনে। তাঁদের দেখে সাফওয়ান আবিরের কানে ফিসফিস করে বললো ” ভাই টর্নেডো আর সাইক্লোন কিন্তু আমাদের সামনে দাঁড়ানো একটু হিসাব করে কথা বলিস। ”
” আরে বাদ দে এদেরকে ফুঁ মেরে সরিয়ে দিতে এই আবিরের এক সেকেন্ড ও সময় লাগবে না।” বেশ ভাব নিয়ে বললো আবির।
” আবির ভাই পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে দিন এতো ভেজাল না করে।” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
” এহহ টাকা কী গাছের মোয়া নাকি? যে চেয়ে বসলি আর গাছ থেকে পেড়ে দিয়ে দিলাম।”
” এতো সব আমরা বুঝি না আপনি দিবেন কি না ওইটা বলুন।”
” দশ হাজার দিবো বলেছি তো তাঁর চেয়ে এক টাকা ও বাড়াবো না।”
” সত্যি তো?”
” কী?”
” এই যে আপনি এক টাকাও বাড়াবেন না?”
” হ্যাঁ এক টাকাও বাড়াবো না এখন রাজি থাকলে বল।”
লামিয়া, তায়েবা পিছনে ঘুরে তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন এর দিকে তাকাতেই তাঁরা চোখ দিয়ে কিছু ইশারা করতেই লামিয়া আর তায়েবা হেঁসে দশ হাজার টাকায় রাজি হয়ে গেলো। তা দেখে সবাই অবাক হলো।
সাফওয়ান আবিরের কানে ফিসফিস করে বললো
” দেখ ভাই হঠাৎ রাজি হয়ে গিয়েছে আমার কিন্তু ওদের সুবিধার ঠেকছে না জানিস তো এরা ডাকাত আর ডাকাতরা পরে সুযোগ বুঝে কোপ মেরে সব লুটিয়ে নিয়ে যেতে পারে।”
” আরে ভাই চিন্তা করিস না আমি আছি তো। ”
বলেই পকেট থেকে টাকা বের করে লামিয়ার হাতে দিতেই লামিয়া নিয়ে নিলো। তারপর পাশ থেকে কাঁচি দিতেই আবির, সাফওয়ান, আরিফ ফিতা কেটে ভিতরে প্রবেশ করলো।
খাওয়া দাওয়া সবার পর্ব শেষ হতেই কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করলো। বিয়ের পর্ব শেষ হতেই বর আর কনে দের ছবি তোলার জন্য স্টেজে নেওয়া হলো।
সবাই গ্রুপ ছবি তুলবে তাই সবাই মিলে গ্রুপ ছবি তুলে নিলো। দশ হাজার টাকা পাওয়ার পর ইসলাম বাড়ির ডাকাত দল বেশ চুপচাপ আছে। পরিবেশ বেশ ঠান্ডা এতে বেশ সন্দেহ হচ্ছে সাফওয়ান এর। এরা হচ্ছে টর্নেডো কখন কোথা থেকে ঝড় শুরু হয়ে যাবে তাঁর কোনো ঠিক নেই।
বেশ নিয়ম কানুন মেনে বিয়ের পর্ব শেষ হলো। এবার বিদায়ের পালা। হামিদা, লামহা সবাই কে ধরে কান্না করছে। আয়না চুপচাপ দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে চোখের পানি ফেলছে। তাঁর ও ভীষণ খারাপ লাগছে। আজ তাঁর বাবা যদি তাঁকে আর আরিফ কে মেনে নিতো তাহলে হয়তো আজকে সে ও এভাবে কান্না করতো।
লামিয়া, তায়েব, তায়েবা, মাহির, ইভান, ইমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলাচ্ছে।
তা দেখে লাবিব ভ্রু কুঁচকে বললো ” তোদের বোন পরের বাড়িতে চলে যাবে তোদের তো একটু কান্না করার দরকার তাই না?”
তাঁরা ছয়জন লাবিব এর মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর একজন আরেকজনের দিকে তাকালো। হঠাৎ হু হু করে মরা কান্না জুড়ে দিলো
” ওওওও ভাইরেএএএএএ, ওওওওও বোইনরেএএ, তোরা কোথায়য়য়য় গেলি আমার মাআআআআ গোওওও” লামিয়া থামতেই লামিয়ার গলা জড়িয়ে তায়েবা বলে উঠলো ” বোইনের বিয়া হোইয়া গেলো আমাগোও কেনো হয়না আমার মা গোওও”
তায়েবা থামতেই মাহির ইভানের গলা জড়িয়ে ধরে বললো ” বাড়ির পাশেই বিয়া করছে তাও আবার কান্দা লাগে আমার মা গোও।।”
তাঁদের এমন কান্না দেখে সবাই হা করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। লাবিব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। কথাটা বলেও বিপদে পড়ে গেলো হুদাই সে পাগল দের ক্ষেপিয়ে দিয়েছে ।
হঠাৎ তায়েব চিৎকার উঠলো ” ওরেএএএ আমার হাগা শেষ হইলে আগে হুচায় দিতো হামিদা আপায় এখন তা করবো কেডা আমার মাআআ গোওও।”
তায়েব এর কথায় লামিয়া, তায়েবা, মাহির বেশ বিরক্ত হলো। এই ছেলে কথায় কথায় হাগা গু তুলে নিয়ে আসে সব জায়গায়।
বেশ হাসি কান্না কাটিতে বিদায় শেষ হলো। হামিদা, লামহা আর আয়না পালকিত উঠতেই লামিয়া, তায়েবা, তায়েব, মাহির, ইভান, ইমন সুর তুলে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো করতে করতে গেয়ে উঠলো
~ কবুতর যা যা যা,
কবুতর যা যা যা,
হুস হুস হুস।
তাঁদের গান শুনে সবাই হেঁসে উঠলো। হামিদা চোখ মুছে লামিয়া আর তায়েবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো পালকির দরজার থেকে।
বাড়ির সামনে শশুর বাড়ি থাকলেও মন যে তাদের ভীষণ ভাবে পুরছে সবার জন্য।
সবাই কে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো তাঁরা খান বাড়ি।
রাশেদা, তাহমিনা, মনিরা, লতিফা বেগম চোখ মুছে বাড়িতে চলে গেলেন। লামিয়া, পিছন ঘুরে মা চাচিদের যাওয়ার দিকে তাকালো। এখন বাড়িতে মরা কান্না শুরু করে দিবে তা সে ভালো করেই জানে।
রাত প্রায় বারোটা।
সাফওয়ান এর রুম পুরো ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।
সেখানে বড় ঘোমটা টেনে বসে আছে হামিদা।
খট করে দরজা খুলতেই হামিদা নড়েচড়ে উঠলো। দরজা খুলে সাফওয়ান প্রবেশ করে হামিদা কে দেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে এগিয়ে এসে খাটে বসলো।
আস্তে করে হামিদার ঘোমটা সরিয়ে দিয়ে কপালের মাঝ বরাবর গভীর চুম্বন একে দিয়ে বললো ” অবশেষে তোকে নিজের করে পেয়ে গেলাম। জানিস কতো গুলো বছর এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম আমি?”
হামিদা মাথা নিচু করে রেখেছে। তাঁর বেশ লজ্জা লাগছে। সেও তো আজকের দিনটার জন্য কতো অপেক্ষায় ছিলো যদি এই লোকটা জানতো ।
সাফওয়ান হামিদা লজ্জা পাচ্ছে দেখে হামিদার ঠোঁটে চুমু দিতেই হামিদা থামিয়ে দিয়ে পাশ থেকে দুধের গ্লাস টা সাফওয়ান এর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো ” চাচি বলেছে এটা খেতে। ”
সাফওয়ান কোনো রকম প্রশ্ন ছাড়াই দুধ খেয়ে নিতেই হঠাৎ খাটের নিচ থেকে কেউ গেয়ে উঠলো
~ কইতে আমার শরম লাগে প্রেম আগুনে পুইড়া ছাই সান্ডে মান্ডে ক্লোজ কইরা, দিতে একখান মানুষ চাই ভাই রে ভাই।
হঠাৎ খাটের নিচ থেকে গানের গলা শুনে পেয়েই হামিদা আর সাফওয়ান চমকে উঠলো।
সাফওয়ান দ্রুত খাটের নিচে উঁকি মারতেই
” আসসালামুয়ালাইকুম দুলাভাই। ” বলে উঠলো তায়েব।
” তোরা দুজনে এখানে কি করছিস?” বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো সাফওয়ান।
খাটের নিচ থেকে মাহির আর তায়েব বেরিয়ে আসে বললো ” বড় আপা রে নিতে আসছি।”
” মানে? কোথায় নিবি আর তোরা এখানে কেনো? জানিস না আজকে আমাদের বা….।”
সাফওয়ান আর বলতে পারলো না হঠাৎ পেট চেপে ধরে ফেললো।
তা দেখে তায়েব আর মাহির হো হো করে হেসে উঠলো।
” হ ভাই আপনাদের বাসর ঘর হওয়ার কথা তবে হবে না কারণ আপনি এখন বাথরুমে দৌড়াবেন।”
মাহিরের বলতে দেরি সাফওয়ান এর বাথরুমে দৌড় দিতে দেরি হলো না।
বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে চেঁচিয়ে বললো ” আবিরের বাচ্চা তোকে আগেই বলেছিলাম এরা টর্নেডো এদের সাথে পাঙ্গা নিস না। তোর জন্য আমার বাসর করতে পারলাম না। যদি বেঁচে থাকি কসম তোকে আমি জিন্দা পুঁতে ফেলবো। ” বলেই বাথরুমে বসে গেলো।
হামিদা বেশ অবাক হয়ে মাহির আর তায়েব কে জিজ্ঞেস করতেই মাহির আর তায়েব হাসতে হাসতে বলতে লাগলো।
আবিরের রুমে বসে আছে লামহা। আবির প্রবেশ করতেই লামহা হাত পা গুটিয়ে নিতেই আবির তা দেখে পাশ থেকে একটা গোলাপ মুখে তুলে নাচতে নাচতে গেয়ে উঠলো
~ তুমি ভয় কেনো পাও,
প্রাণ সজনী আমায় দেখিয়া
তোমায় প্রেম সোহাগে রাখবো আমার বুকে জড়াইয়া।
বলেই লামহার কাছে এগিয়ে আসতেই সামনে থাকা দুধের গ্লাস টা নিয়ে ঝটপট সম্পূর্ণ দুধ টুকু খেয়ে নিলো।
তারপর হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে লামহার ঘোমটা খুলে বললো ” মাশাআল্লাহ আমার ঘরের চাঁদ এসেছে।” বলেই ঠোঁটে চুমু খেতে নিতেই পেটে হাত চেপে বললো ” ও বাবাগো।” বলেই উঠে দাঁড়ালো।
লামহা চমকে উঠলো ” কি হয়েছে আপনার?”
” জানি না তবে পেট মুচড়ে উঠলো।”
বলতেই রুম কাঁপিয়ে ঠাস করে পাদ দিয়ে উঠলো। মূহুর্তেই পুরো রুম দূর গন্ধে ভরে গেলো। লামহা নাক চেপে আবিরের থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো।
” ইয়াককক কুত্তা মরা খাইছেন নাকি গন্ধে পুরো রুম ভরে গিয়েছে। ” বলেই পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো লামিয়া আর তায়েবা।
আবির আর লামহা অবাক হয়ে তাকালো তাদের দিকে।
” দূর দূর দূর দেখ পেন্টে হেগে দিয়েছে।” বলেই তায়েবা দৌড়ে দরজা খুলে দিতেই তায়েব, মাহির হামিদা কে নিয়ে প্রবেশ করলো। আবির হতবাক হয়ে তাকালো কিন্তু বেশিক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। দৌড়ে বাথরুমে যেতেই তায়েব দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো। আবির পেটে হাত চেপে দরজা ধাক্কিয়ে বললো ” তায়েব এর বাচ্চা তাড়াতাড়ি দরজা খোল”
তায়েব বাথরুমের ভিতর থেকে জবাব দিলো ” আরেএ ভাই আসছিলাম মূত্র বিসর্জন দিতে এখন দেখি বাম দিয়ে গুত্র বিসর্জন হয়ে গিয়েছে। ”
আবির আর কিছু না বলে দৌড়ে চলে গেলো বাহিরের বাথরুমে।
আবির যেতেই তায়েব বেরিয়ে আসতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
লামহা কিছু বুঝতে পারছে না হচ্ছে টা কী তাই লামিয়া হাসতে হাসতে বললো ” গেট ধরার সময় তোদের জামাইরা কাছে আমরা পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়েছিলাম দেয় নি। সেহেতু সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠে নি তাই আঙ্গুল বাঁকিয়েছি। দুধের সাথে জামাল গোটা মিশিয়ে দিয়েছিলাম।
লামহা আর হামিদা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চুপচাপ বসে থাকলো বিছানায়।
এদিকে লামিয়া রা হাসা হাসি করছে । রাশেদ, শুভ্র আর খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা ও এসে উপস্থিত হলো। তদের থেকে সব শুনে সবাই হাসছে।
ওদিকে সাফওয়ান আর অবিরের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে বাথরুমে দৌড়াতে দৌড়াতে। তা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে ডাকাতের দল ।
হঠাৎ তয়েব সবার উদ্দেশ্য বললো ” তোমরা যদি চাও তাহলে এই সুন্দর মুহূর্ত টা আর সুন্দর করতে চাই আমার একখানা গান তোমাদের সামনে পেশ করে।”
সবাই সাঁই দিতেই তয়েব সুর তুলে গান ধরলো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩৭
~ পায়খানা লাগছে আমার
কার বাথরুমে যাবো
আমার বাথরুম আছে পাঁচটা
কোনটা সবচেয়ে বেশি ভালো
ড্রয়িং রুমে আব্বা বইসা টিভি
দেখতাছে, আমার বাথরুম আছে পাঁচটা কোনটা সবচেয়ে বেশি ভালো।
