প্রিয় রাগিনী পর্ব ৩
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রেডি হচ্ছে লামিয়া।
পরনে হালকা বেবি-পিংক কালারের কামিজ, হাতে কালো চিকন বেল্টের ঘড়ি। পিঠসমান চুলগুলো বেণী করা, সামনে দিয়ে লেয়ার-কাটা চুল চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
পিছন থেকে তায়েব, তায়েবা আর মাহির হা করে তাকিয়ে আছে।
আয়নায় তাকিয়ে লামিয়া বিরক্ত হয়ে পিছন ঘুরে বললো –
“নতুন দেখছিস আমাকে? এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”
তায়েবা গালে হাত দিয়ে হতাশ কণ্ঠে বললো –
“তুই আমাদের বোন হতেই পারিস না তুই মনে হয় পাল্টে গিয়েছিস।”
বিরক্ত লামিয়া হাতে থাকা চিরুনি ছুঁড়ে মারলো। ঠিক তখনই রুমে এলো হামিদা আর লামহা।
চিরুনি ছুঁড়তে দেখে হামিদা বলে উঠলো –
“এসব কি অভ্যাস? যখনই দেখি তখনই এটা-ওটা ছুঁড়ে মারিস। সমস্যা কি তোর?”
লামিয়া কোনো জবাব দিলো না। শুধু বিরক্ত মুখে মোবাইল হাতে নিলো।
হামিদা আবার বললো –
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“কোথায় যাচ্ছিস তোরা?”
বাঁকা হাসি দিয়ে লামিয়া উত্তর দিলো –
“তোর বিদেশি নাগরকে আনতে।”
বলে হেঁটে বেরিয়ে গেলো। তার পিছন পিছন তায়েব, তায়েবা আর মাহিরও চলে গেলো।
হামিদা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো লামিয়ার যাবার পথে।
লামহা বড় বোনের দিকে একবার তাকিয়ে বুকসেলফ থেকে একটা বই টেনে নিয়ে চুপচাপ বসে পড়লো।
বাসার বাইরে বেরিয়েই মাহির জিজ্ঞেস করলো –
“আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
লামিয়া ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে বললো –
“গেলেই দেখতে পারবি। আজ একটা বড় মিশনে যাচ্ছি। তায়েব আর মাহির, তোরা তোদের উড়োজাহাজ বের কর আর তায়েবা, আমার সাথে আয়।”
এ কথা বলে বাগানের ভেতরের ছোট্ট স্টোররুমে ঢুকে গেলো লামিয়া।
তায়েবাও তার পিছনে দৌড়ে গেলো।
এদিকে মাহির আর তায়েব দু’জন দু’জনের দিকে চেয়ে নিয়ে তাদের প্রাণপ্রিয় বাইক বের করলো।
কিছুক্ষণ পর স্টোররুম থেকে বের হলো লামিয়া আর তায়েবা।
লামিয়ার হাত দেখে মাহির আর তায়েব শুকনো ঢোক গিললো।
তারা হয়তো আন্দাজ করতে পেরেছে, কিছু একটা হতে যাচ্ছে।
তায়েবা চুপচাপ হয়ে ভাইদের দিকেই তাকিয়ে রইলো।
লামিয়া এবার মাহিরকে বললো –
“চল, এবার।”
কপাল কুঁচকে মাহির জিজ্ঞেস করলো –
“তুই কি করতে যাচ্ছিস জানতে পারি?”
লামিয়া মুচকি হেসে উত্তর দিলো –
“অনেক দিন হলো হকি খেলি না। চল আজ একটু হকি খেলে আসি।”
আর কোনো কথা না বলে মাহির আর তায়েব বাইক স্টার্ট দিলো।
তায়েবের বাইকে তায়েবা, আর মাহিরের বাইকে লামিয়া উঠে বসল।
দু’টো বাইক একসাথে ছুটে গেলো গন্তব্যের দিকে।
ইসলাম পরিবারের সমবয়সী কয়েকজন ভাইবোনের মধ্যে আলাদা দল তৈরি করেছে লামিয়া, মাহির, তায়েব আর তায়েবা।
গলায় গলায় ভাব তাদের। এরা চারজন মিলে একসাথে থাকলে পুরো বাড়িই কেঁপে ওঠে।
তাদের নিয়ে একটা কথা সবার মুখে মুখে –
“এই চারজনকে কেউ মেরেও ফেললেও, একজন আরেকজনের নামে কোনোদিন মুখ খুলবে না।”
একারণে তারা কতবার মার খেয়েছে, শাস্তি পেয়েছে – তার হিসেব নেই।
তবুও শিক্ষা হয়নি একটাও।
ভার্সিটির মারামারিতে লামিয়ার সাথে এরা তিনজনও ছিল।
কিন্তু লামিয়া দূরে চলে যাবার পর তিনজনের ভেতরে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
এবার লামিয়া ফিরে আসাতে চারজন আবার এক হলো।
আর তাদের একসাথে মানেই – পুরো ইসলাম বাড়ি কেঁপে ওঠার দিন শুরু হলো আবার।
বাইক এসে থামলো এক রেস্টুরেন্টে। তায়েব আর মাহির বাইক পার্ক করে এসে সবাই মিলে রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকলো।
লামিয়া কাকে যেন কল করে বললো—
“আমি যখন ভিতরে আসতে বলবো, তখন ভিতরে আসবি তোরা।”
বলে কল কেটে দিলো।
সামনের একটা টেবিলে গিয়ে সবাই বসলো। মাহির চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলো।
তায়েব বিরক্ত হয়ে বললো—
“এইখানে কি করতে এসেছি আমরা?”
লামিয়া তার কানের পাশে চুল গুলো গুটিয়ে দিয়ে ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বললো—
“অপেক্ষা কর, তাহলেই বুঝবি।”
বলেই ওয়েটার ডাকলো—চারটা কোল্ড কফি।
তারপর টেবিলে হাত ঠুকতে ঠুকতে গেয়ে উঠলো—
“আমি যোওওজান একটা পোলা… বুড়ি বেডির কাছে আমার এক্স দিছে বিয়া…”
গান শুনে মাহির, তায়েব আর তায়েবা ভ্রু কুঁচকে তাকালো লামিয়ার দিকে।
তায়েবা বললো—
“বইন, তোর মাথা গেছে নাকি? গান গাইলে শুদ্ধ করে গা। উল্টো গাই কেনো গাইছিস?”
লামিয়া শয়তানি হাঁসি দিয়ে বললো—
“একটু পরেই বুঝবি আমি কেন উল্টো গাইতেছি।”
বলেই আবার গাইতে শুরু করলো—
“আমার মনের কথা কইবো আমি কার কাছে গিয়া…
বুড়া বেডির সাথে আমার এক্স দিছে বিয়া…”
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রেস্টুরেন্টে ঢুকলো পঁচিশ বছরের এক যুবক আর তার সাথে দেখে মনে হয় আটত্রিশ বছরের এক মোটকা মহিলা।
তাদের ঢুকতে দেখেই লামিয়া ফিসফিস করে বললো—
“চেহারা লুকা, তাড়াতাড়ি।”
মাহির, তায়েব, তায়েবা তাড়াহুড়ো করে মুখ আড়াল করলো।
মাহির নিচু গলায় বললো—
“কী হয়েছে?”
লামিয়া শুধু চোখের ইশারা করলো।
তিনজন একসাথে পাশ ফিরে তাকাতেই চোখ বড় বড় করে উঠলো।
তায়েবা হাঁ করে বললো—
“আরে এই সালা আবার নিজের আম্মারে নিয়া ডেটে আইছে নাকি?”
লামিয়া ঠোঁট টিপে হাঁসলো—
“উহু, এটা ওর মা না। এটা হলো ওর সুগার মাম্মা।”
তায়েব appena কফি খাচ্ছিলো, হাসতে গিয়ে সব কফি ছিটকে পড়লো তায়েবার গায়ে।
তায়েবা ধুম করে এক ঘুষি বসিয়ে দিলো তায়েবের পিঠে—
“হারামজাদা, আমার উপর ছিটালি কেনো? ”
মাহির দুই হাত তুলে বললো—
“ওই ওই, নিজেদের মধ্যে মারামারি করিস না তোরা। দেখতে দে, আসল নাটক ।”
সামনে থাকা যুবকটা আসলে লামিয়ার এক্স—হাবিব।
বিগত এক বছর লামিয়ার সাথে রিলেশন করেছিলো। কিন্তু হাবিব প্লেবয় হওয়ায়, সে যাকে দেখতো তাকেই পছন্দ করতো। এমনকি লামিয়ার পিঠ পিছনে লামিয়া প্রাণ প্রিয় বেষ্ট ফ্রেন্ডের সাথে ও রিলেশনে ছিলো। লামিয়া যখন এসব যেদিন জেনেছিলো সেদিনই তার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে এসব নিয়ে ভেজাল হয় , এমনকি মারা*মারির করেছিলো। তারপর সেদিন ই লামিয়ার সাথে হাবিবের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
তায়েব মোবাইল ক্যামেরা অন করে ফিসফিস করে বললো—
“আহা, এ কি প্রেম নাকি মা-ছেলের ভালোবাসা?”
মাহির করলো—
“প্রেম না ভাই, এইটা হলো মাদার কেয়ার প্যাকেজ।”
তায়েবা মুখ বাঁকিয়ে বললো—
“ছিঃ! এই আবা*লের মুখের রুচির ওষুধ খাওয়া লাগবো। আসলেই রুচির দূর্বিক্ষ।”
মাহির হেঁসে বললো—
“তুই বুঝতেছিস না। ওই সুগার মাম্মির কাছে টাকার খনি আছে মনে হয়। তাই হাবিব এতো লালা ঝরাইতেছে।”
তায়েব নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো—
“তাহলে তো এইটা কোনো সাধারণ কাপল না লা, এ হচ্ছে লায়লা আর প্রিন্স মামুন। কেস সাংঘাতিক!”
বলেই মুখ চেপে হাঁসলো।
মাহি লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, তোর কি কিছু প্ল্যান আছে?
লামিয়া মাথা নাড়াল, মানে আছে। মাহি বলল, তাহলে বইন, ছাড়িস না, আমরা তোর সাথে আছি।
কিছুক্ষণ পর হাবিব মহিলাটির হাত ধরে কিস করতে লাগল। তায়েব চোখ-মুখ খিচকে বলল, ইয়াক্ক, ছিঃ, আমার বমি আসছে।
মাহি বমির মতো মুখ করে বলল, ওরে, ওইটা ওর বাম হাত। দেখ, গু লেগে আছে।
তায়েবা বলল, আমার পেট গুলিয়ে আসছে।
লামিয়া হাসতে হাসতে বলল, পিকচার এখনো বাকি আছে।
মাহি, তায়েব, তায়েবা লামিয়ার দিকে তাকাল। লামিয়া ইশারা করল, সবাই চোখ বড় বড় করে তাকালো। হাবিব মহিলাকে কিস করছে।
ঠিক তখনই একদল ছেলেরা রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করল।
তায়েব কানে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, আমি বিশ্বাস করি না, আমি বিশ্বাস করি না, আমি বিশ্বাস করি না।
লামিয়া টেবিল থাপ্পড় দিয়ে গান ধরল, মাহি, তায়েব ও তায়েবা তাল মিলিয়ে ধরল—
প্রেমের সমাধি ভেঙে,
মনের শিকল ছেঁড়ে পাখি উড়ে যায়।
এই চিৎকারে হাবিব আর মহিলাটি ভয় পেয়ে সামনে তাকাল। তাদের ঘিরে একদল ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘিরে থাকা ছেলেদের মধ্যে একজন ছেলে হাবিবের কলার ধরে বলল, এইসব নোংরামি করিস না। বলেই হাবিবের নাক বরাবর ঘুষি মারল।
মহিলাটি বলল, এই ছেলে ছাড়ো, নাহলে খুব খারাপ হবে।
হাবিবকে ঘুষি মারা ছেলেটি মহিলার দিকে তাকিয়ে বলল, কি করবি তুই?
মহিলাটি বলল, এই ছেলে আমার সঙ্গে তোরকারি করতে লজ্জা করছে না, বেয়াদব, তোমার বড় আমি। ম্যানার্স শিখো নেই নাকি? অভদ্র ছেলে।
পিছন থেকে লামিয়া বলল, নিজের ছেলের সমান এক ছেলেকে কিস করতে লজ্জা করে নি, তখন আপনার ভদ্রতা কোথায় ছিলো?
সবার দৃষ্টি লামিয়ার দিকে পড়ল। হাবিব চমকে উঠল।
মহিলাটি লামিয়ার কাছে বলল, তুমি কে?
লামিয়া আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে বলল, আমি দর্শক, এতোক্ষণ আপনাদের চুম্মা চাটি দেখতেছিলাম।
হাবিব রেগে তেড়ে গেল। লামিয়ার চুলে হাত দিতে গিয়েই লামিয়া হাবিবের হাত ধরে মেইন পয়েন্টে লাথি মারল। হাবিব ব্যথায় মাটিতে পড়ল। তারপর যে হাত দিয়ে লামিয়ার চুল ধরতে গিয়েছিলো সেই হাতে হকি দিয়ে জোরে বারি মারতেই হাবিব চিৎকার করে উঠলো।
ঠিক তখনই চারটি মেয়ে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করল। মেয়েগুলো জোট বেঁধে ইচ্ছে মতো মারতে লাগলো হাবিবকে।
মহিলাটি ভয় পেয়ে পালাতে নিলেই, তায়েব, তায়েবা আর মাহির মহিলাটিকে আটকে ফেলে।
লামিয়া মহিলাটির দিকে এগিয়ে বলল – আপনার নাম কি আম্মা?
মহিলাটি ভয় পেয়ে বলল – আ আকলিমা।
লামিয়া বলল – বিয়ে হয়েছে?
মহিলাটি বলল – হ্যাঁ, কিন্তু স্বামী চলে গেছে।
লামিয়া দাঁত বের করে হাসল। পাশে থাকা ছেলেকে বলল – নিলয় , কাজী ডাকো, ওদের বিয়ে করে দাও। তারপর নিজের বাড়িতে গিয়ে চুম্মা চাটি করবে, বাইরে পরিবেশ অন্তত নষ্ট করতে আসবে না।
হাবিব বলল – কীসের বিয়ে, আমি বিয়ে করব না।
লামিয়া অবাক হওয়ার অভিনয় করল। তারপর বললো – কেনো?
হাবিব বিরক্ত হয়ে বলল, – এই বুড়ি কে বিয়ে করব ভাবলে কি করে?
আকলিমা বেগম এইবার ক্ষেপে গিয়ে রেগে হাবিবের কলার চেপে বলল – কি বললি আমি বুড়ি? তুই না বলেছিলি আমাকে ভালোবাসিস, বিয়ে করবি?
হাবিব বলল – তোকে ভালোবাসি নি, ভালোবেসেছি তোর টাকা কে, ভেবেছিলাম কয়েকদিন তোর টাকা পয়সা মেরে চলে যাবো।
মহিলাটি রেগে হাবিবকে উদ্ধম মাদ্ধম দিলো। বেচারা এমনেই মার খেয়ে পুরো আধমরা হয়ে গেছে।
কিন্তু লামিয়া, মাহি, তায়েব, তায়েবা চেয়ারে বসে কোল্ড কফি খাচ্ছে। তারা ভালোই এনজয় করছে।
মাহি বললো – উফফ, পপকর্ন হলে সিনেমাটা আরো জমে উঠতো।
তায়েব বলল – বইন আয় তোরে, এক চুমু দেই, অনেকদিন পর লাইফ শো দেখলাম।
আকলিমা বেগম হাবিবকে ইচ্ছে মতো মারতে লাগল।
তারপর লামিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো – তোমার কাজী ডাকো আমি ওরে এই মুহূর্তে বিয়া করমু।
লামিয়া বলল, যথা আজ্ঞা আম্মাজান।
লামিয়া নিলয়ের দিকে তাকাতেই,
নিলয় কাজীকে ডেকে নিয়ে আসলো।
কাজী হাবিবের অবস্থা দেখে ভয়ে ঢোক গিললো।
লামিয়া তা দেখে বললো – ভয় নেই কাজী সাহেব আপনে বিয়ে পড়ানো শুরু করলো।
হাবিবকে কবুল বলতে বললে , হাবিব বলবে না বলে জেদ ধরলো। আকলিমা বেগম তার মোটা হাত দিয়ে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো হাবিবের গালে। কাজী সাহেব ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠলো।
আকলিমা বেগম হাবিবের দিকে তেড়ে যেতেই, হাবিব কান্নায় ভেঙে বলে উঠলো – ও আম্মা গো আর মারবেন আমি কবুল বলতাছি।
হাবিব ভয়ে কবুল বললো। সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো।
বিয়ে শেষে লামিয়া হাবিবের কাছে গিয়ে কনগ্রাচুলেট করতেই হাবিব বলল, এসব তোমার কাজ তাই না, আমি তোমাকে দেখে নিবো।
লামিয়া মুচকি হেসে বলল, আমাকে না দেখে আজ আয়নায় নিজেকে দেখে নিস, আর যদি বেঁচে থাকলে দেখা করেছিস।
বলেই দাঁত কেলিয়ে পিছনে গেলো।
মাহির, তায়েব, তায়েবা লামিয়ার সঙ্গে সানগ্লাস পড়ে স্টাইল করে। চারজন একে একে কাঁধে হাত রাখল।
লামিয়া গান ধরল, মাহির, তায়েব, তায়েবা একসাথে বলল—
আমি যোজন একটা পোলা, বুড়ি বেডির কাছে আমার এক্স দিছে বিয়া।
গান গাইতে গাইতে চারজন রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে চলে গেল।
রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে লামিয়া সবাইকে বাসায় ফেরার জন্য তাড়া দিলো। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। মাহির আর তায়েব তাড়াতাড়ি বাইক বের করল। লামিয়া আর তায়েবা দ্রুত উঠে বাইকে চেপে স্টার্ট দিল। তারা দ্রুত বাড়ির দিকে এগিয়ে চলো।
সন্ধ্যায় সবাই হলরুমে বসে গল্প করছিল। ঠিক তখনই মাহির, তায়েব, তায়েবা আর লামিয়া ভয়ে ভয়ে ঢুকল।
হামিদ সাহেব ভুরু কুঁচকে বললেন – কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?
চারজনেই একসাথে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল – এইতো, একটু ঘুরাঘুরি করছিলাম।
হামিদ সাহেব সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন – একটু পর আমরা এয়ারপোর্টে যাবো। তাই আমরা তোমাদের কাউকে নিয়ে যাবো।
লামিয়া ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল – এয়ারপোর্টে কেন?
আনিসুল সাহেব হেসে বললেন – আরে, খান পরিবারের সবাই আসছে আজ। তাদের আনতেই যাচ্ছি।
লামিয়া কিছুক্ষণ ভেবে বলল – আমি যাচ্ছি না। চাইলে এদের কাউকে নিয়ে যান বড় চাচা। বলেই মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে গেল।
বেচারা বাকি তিনজন ফাঁদে পড়ল। তায়েব মুখ কাঁচুমাচু করে বলল – বড় চাচা, আমার পড়াশোনার চাপ ভীষণ। তাই যাওয়া সম্ভব না। মাহির আর তায়েবাকে নিয়ে যান। বলেই সে উধাও।
এবার সবাই তাকাল তায়েবার দিকে। তায়েবা ঢোক গিলে বলল – আমি আসলে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু গাড়িতে উঠলেই বমি করি। পরে যদি আপনাদের ভাসিয়ে দিই, সেটা তো খারাপ হবে। তাই মাহিরকে নিয়েই যান। বলে সেও উধাও।
এবার সব চোখ মাহিরের দিকে।
হামিদ সাহেব বললেন – তোমার কোনো অজুহাত আছে?
মাহির হালকা বোকা হেসে বলল – না চাচা, আমি যাবো।
মনে মনে গজরাতে লাগল – হারামির দল, আমাকে ফাঁসিয়ে সব পালিয়ে গেলি! আমারো দিন আসবো।
কিছুক্ষণ পর হামিদ, আনিসুল আর মাহির এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হল। গাড়িতে বসতেই মাহির দোতলার বারান্দায় তাকিয়ে দেখল, তায়েব, তায়েবা আর লামিয়া দাঁত বের করে হাসছে। মাহির মুখ বাঁকিয়ে গাড়িতে বসল, আর ওরা হো হো করে হেসে উঠল।
গাড়ি বের হতেই লামিয়া বাকিদের নিজের রুমে যেতে বললো।
রুমে এসে লামিয়া দেখল, হামিদা মন খারাপ করে চুপচাপ বসে আছে, আর লামহা বই পড়ছে।
হামিদাকে দেখে লামিয়া খোঁচা মেরে গান ধরল –
“তোর কুন কুন জায়গায় ব্যাথা গো বান্ধবী ললিতা”
হামিদা বিরক্ত হয়ে তাকাল। আর লামিয়া দাঁত কেলালে ঠাস করে এক থাপ্পড় দিল ওর পিঠে।
লামিয়া কপাল কুঁচকে বলল – মারলি কেন বড় আপা?
হামিদা রাগী গলায় বলল – তোকে কতবার বলেছি, এইসব বাজে গান গাইবি না। বিশ্রী লাগে শুনতে।
এবার লামিয়া মজা করে লামহার হাতে লাথি মারল। লামহা বই নামিয়ে চোখ ছোট করে তাকাল, তারপর মুহূর্তেই লাফিয়ে এসে চুল ধরে টেনে ধরল।
লামিয়া চেঁচিয়ে উঠল – লামহার বাচ্চা, চুল ছাড়! না হলে খবর আছে!
হামিদা তাড়াহুড়ো করে বলল – লামহা লামিয়ার চুল ছাড়!
কিন্তু কে শোনে কার কথা! লামহা আরও জোরে টেনে ধরল, আর লামিয়াও পাল্টা চুল ধরে টান দিল। শুরু হলো ‘চুল ছিঁড়াছিঁড়ি কম্পিটিশন’।
হামিদা ছাড়াতে গিয়ে নিজেও কয়েকটা মার খেলো।
এদিকে হট্টগোল শুনে তায়েব আর তায়েবা ছুটে এল। দৃশ্য দেখে তায়েব নিচে দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজ থেকে মজো আর চিপস নিয়ে ফিরে এল, আরাম করে বিছানায় বসে খেতে শুরু করল।
তায়েবা আবার ক্যামেরা অন করে ভিডিও বানাতে লাগল।
মেঝেতে গড়াগড়ি খেয়ে লামিয়া আর লামহা মারামারি করছে। পাশে হামিদা চেষ্টা করছে থামাতে, কিন্তু ব্যর্থ। তায়েব এক হাতে চিপস খাচ্ছে, আরেক হাতে চিৎকার করছে –
“জিতবে কে লামিয়া, হারবে কে লামহা!” বলতে লাগলো।
ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে আজমেরী বেগম বাঁশি ফুঁ দিতে দিতে ঢুকলেন। দেখে মনে হলো, উনি যেন খেলার রেফারি।
হামিদা হতাশ হয়ে তাকাল চারপাশে – একজন ভিডিও করছে, একজন উসকাচ্ছে, একজন বাঁশি বাজাচ্ছে!
এত হট্টগোল শুনে লতিফা বেগম ছুটে এলেন। দরজার পিছন থেকে ঝাটা বের করে দুই বোনকে ধুপধাপ পেটাতে লাগলেন। এক মুহূর্তের জন্য মারামারি থেমে গেল। কিন্তু ঝাটার বারি খেয়ে দুজন আবার চুল টানাটানি শুরু করল।
রেগে গিয়ে লতিফা বেগম এবার জোরে বারি মারলেন। জোড়ে বারি খেয়ে লামিয়া আর লামহা দুজন দুইদিকে পালিয়ে গেল। লতিফা বেগমও তাদের পিছু নিলেন।
পিছনে আজমেরী বেগম বাঁশি বাজাতে বাজাতে দৌড়াচ্ছেন। তায়েবা ক্যামেরা হাতে ভিডিও করছে। তায়েব মজো খেতে খেতে চিল্লাচ্ছে –
“উফ মেজোমা, আরো দুই ঘা দাও! তাহলেই শোটা হিট হবে!”
পালাতে পালাতে লামিয়া চেঁচিয়ে উঠল – তায়েবের বাচ্চা! হাতের কাছে তোকে পেয়ে নেই শুধু।
পাশ থেকে রাশেদা, মনিরা আর তাহমিনা বেগম হেসে কুটিকুটি। অনেক দিন পর এমন লাইভ রিয়েলিটি শো দেখছে তারা।
শেষমেশ লতিফা বেগম হাঁপিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। তখন আজমেরী বেগম বাঁশি বাজিয়ে ঘোষণা করলেন –
“মেজো বউ আউট! এই খেলার বিজয়ী লামিয়া আর লামহা!”
তালি দিলো তায়েব, তায়েবা আর হামিদা।
লতিফা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন – আম্মা, আপনিও কি বাচ্চা নাকি!
আজমেরী বেগম মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলেন।
বাকিরা হেসে হেসে নিজেদের রুমে চলে গেলো
এয়ারপোর্টে পৌঁছে খান পরিবারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন হামিদ সাহেব, আনিসুল সাহেব আর মাহির। কিছুক্ষণ পরেই আনিসুল সাহেব সামনে তাকিয়ে শফিউর খানকে দেখতে পেলেন।
তিনি এগিয়ে যেতেই শফিউর খান জড়িয়ে ধরে বললেন – কেমন আছিস?
আনিসুল সাহেব হেসে বললেন – ভালো আছি, তুই কেমন আছিস?
– ভালো আছি। তবে তোকে এত বুড়ো লাগছে কেন?
আনিসুল হেসে বললেন – আরে ভাই, বয়স তো আর কম হলো না। বুড়ো হবোই।
– ঠিক বলেছিস, বললেন শফিউর।
এরপর তিনি হামিদ সাহেবের সাথে কুশল বিনিময় করলেন। একে একে পুরো খান পরিবারের সবাই এসে দাঁড়াল। সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় হতে লাগল।
আনিসুল সাহেব চারদিকে তাকিয়ে বললেন – আরে, সাফওয়ান, আবির, লাবিব, জাহিদ, ফাহিম কই?
শফিউর সাহেব বললেন – এই তো ছিলো এইখানেই। চল, গাড়ির কাছে যাই। ওরা আসবে ওইখানে।
মাহির তখন এক কোণে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ মাথায় চাটি মারল। ঘুরে তাকাতেই চোখ কপালে – সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছয় ফুট লম্বা, সুঠামদেহী এক যুবক। গায়ে কাঁচা হলুদের মতো উজ্জ্বল রং, চোখের মণি গভীর কালো, ভাঁজহীন সাদা শার্ট আর পরিপাটি প্যান্টে ব্যাক্তিত্ব আরও উজ্জ্বল।
মাহিরের এমন তাকানো দেখে যুবকটি আবার মাথায় চাটি মারল। মাহির মাথা চেপে বলল – আহ, লাবিব ভাইয়া, মারছো কেন?
লাবিব হেসে বলল – এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
– এমনিই, তোমাকে দেখছিলাম, উত্তর দিল মাহির।
পিছন থেকে সাফওয়ান এগিয়ে এসে বলল – আরে, মাহির বাবু যে! দেখ তো, আবির কতো বড় হয়ে গেছে।
আবির হেসে জড়িয়ে ধরল মাহিরকে – বাপরে! আমাদের সমান হয়ে গেছিস।
মাহির মুখ ফুলিয়ে বলল – তোমরা কি বলতে চাইছো আমি এখনও ছোট্টই আছি?
লাবিব মজা করে বলল – ছোট হোস বা বড়, আমাদের আগে বিয়ে করলে কিন্তু তোর খবর আছে।
মাহির চোখ ছোট করে তাকাল, দেখে লাবিব কেশে উঠল। তারপর বলল – চল সবাই, বাকিরা অপেক্ষা করছে।
এক এক করে তিনটা গাড়ি বের হলো এয়ারপোর্ট থেকে। প্রথম গাড়িতে উঠলেন সাবরিনা, শফিউর, লুবনা, আমির, হালিমা, জায়েদ, আনিসুল আর হামিদ। দ্বিতীয় গাড়িতে শারমিন, হাফসা, ফারিয়া, ফিরোজা আর শফিকুল। তৃতীয় গাড়িতে সাফওয়ান, আবির, লাবিব, মাহির, জাহিদ আর ফাহিম।
বাসার পথে সবাই ক্লান্ত। সাফওয়ান গাড়ি চালাচ্ছিল। এদিকে মাহির ফোনে মেসেজ আসতেই সে পকেট থেকে মোবাইল বের করে WhatsApp খুলল। দেখল – তায়েবা একটা ভিডিও পাঠিয়েছে। কৌতূহল নিয়ে ওপেন করতেই শোনা গেল হট্টগোলের আওয়াজ। চোখ বড় করে দেখল – লামিয়া আর লামহার কাণ্ড!
ভিডিওর শব্দে লাবিব বিরক্ত হয়ে বলল – আরে, টোটো কোম্পানি অফ কর, মাথা ধরছে।
মাহির সাউন্ড কমিয়ে হেসে উঠল।
সাফওয়ান কৌতূহলী হয়ে বলল – এমন কি দেখছিস যে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিস?
– আর বলো না ভাইয়া, কমেডি শো! অনেক দিন পর এমন কিছু দেখলাম, উত্তর দিল মাহির।
আবির উৎসাহী হয়ে বলল – কই, আমরাও দেখি।
মাহির ফোনটা এগিয়ে ধরতেই আবির বিস্ময়ে বলল – এরা কারা? এইভাবে মারামারি করছে কেন?
– যেটা হলুদ জামা, সেটা লামহা। আর গোলাপি জামা, সেটা লামিয়া, হেসে বলল মাহির।
লামিয়ার নাম শুনে লাবিব এক ঝটকায় ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও দেখতে শুরু করল। বাকিরা চোখ বাঁকা করে তাকাল, কিন্তু লাবিবের খেয়াল নেই। সে ব্যস্ত ভিডিওতে। অনেক চেষ্টা করেও লামিয়ার মুখ স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে আস্তে করে বললো– অসভ্য বড় বোনকে কি কেউ এভাবে মারে নাকি!
এ কথা বলে সামনে তাকাতেই দেখল সবাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখছে। লাবিব বিরক্ত হয়ে বলল – এইভাবে তাকাচ্ছো কেন? চেহারায় কি কোনো লাভবাইট দেখা যাচ্ছে নাকি? বলেই জানালার দিকে তাকাল। বাকিরা মুখ চেপে হাসতে লাগল।
মাহির আফসোস করে বলল – ইস, আমি এখানে এসেছি বলে সব মিস করে দিলাম।
আবির বলল – প্রতিদিনই কি এমন হয় নাকি?
– আগে হতো, কিন্তু পাঁচ মাস ধরে হয়নি।
– কেন?
– কারণ লামিয়া পাঁচ মাস ওর নানা বাড়ি ছিল, উত্তর দিল মাহির।
ফাহিম জিজ্ঞেস করল – কেন?
মাহির লামিয়ার রিলেশনের অংশ বাদ দিয়ে অন্যসব ব্যাখ্যা দিল। সবাই মিলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
গাড়িতে টুকটাক গল্প চলতে লাগল।
এদিকে রাত তখন প্রায় বারোটা। বাড়ির ভেতর কয়েকজন বাদে সবাই ঘুমিয়ে আছে। ছাদে বসে তারা দেখছিল রাশেদ, সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে। হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনে নিচে তাকাল। দেখল, প্রথম গাড়ি থেকে নেমে আসছেন বাবা-চাচারা আর শফিউর খানের পরিবার।
দ্বিতীয় গাড়ি থেকে নামল এক রমণী। কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, চুল ঝুটি করা, ঠোঁটে হালকা হাসি। তাকে দেখে রাশেদের মুখ এক মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হলো। হালকা হাসল, তারপর চোখ-মুখ শক্ত করে সিগারেট মাটিতে পিষে নিজের ঘরে চলে গেল।
খান পরিবারের সবাই ইসলাম বাড়িতে প্রবেশ করতেই লতিফা, রাশেদা, মনিরা আর তাহমিনা বেগম দৌড়ে সাবরিনা, হালিমা, লুবনা আর ফিরোজাকে জড়িয়ে ধরলেন। খুশিতে চারদিক ভরে উঠল।
সাফওয়ান, আবির, লাবিব, জাহিদ আর ফাহিম এসে সবাইকে সালাম জানাল, কুশল বিনিময় হলো।
শফিউর সাহেব হেসে বললেন – তোদের ছেলে-মেয়েরা কই?
আনিসুল সাহেব বললেন – রাত হয়ে গেছে, সবাই ঘুমাচ্ছে। কাল সকালে দেখা হবে। আপাতত রুমে গিয়ে বিশ্রাম কর।
শফিউর মাথা নাড়লেন। হামিদ সাহেব তাঁর স্ত্রী আর ভাবিদের উদ্দেশে বললেন – তোমরা ওদের রুম দেখিয়ে দাও। সবাই সবার রুমে চলে গেল।
লতিফা বেগম খাবারের কথা বললেন, কিন্তু সবাই ক্লান্ত, তাই সেদিন আর কেউ খেল না। ফ্রেশ হয়ে সবাই যার যার রুমে শুয়ে পড়ল।
অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটছে চারদিকে। পাখিরা কিচিরমিচির করে গান গাইছে।
তালুকদার নিবাসের দেওয়ালের উপর ভর দিয়ে ইসলাম বাড়ির দিকে উঁকি দিচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ বছরের এক বৃদ্ধ – মতিন তালুকদার। মাথার চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু তার দুষ্টুমি করার মেজাজ একটুও যায়নি।
ইসলাম বাড়ির দ্বিতীয় তলার বারান্দায় গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে যোগব্যায়াম করছিলেন আজমেরী বেগম। হঠাৎ চোখ পড়তেই দেখলেন তালুকদারের বাড়ি থেকে মতিন উঁকি মারছে। চোখ ছোট করে তিনি চিৎকার দিয়ে বললেন – আইজকো আমি ইউরে মজা দেখামু মতিইন্না! দাড়াইছ ইউ, আমি অক্কুনি আইতাছি। মাই বাড়িতে উকি পুকি দেওয়া, আজ তোকে দেখাইমু এই আজমেরী হোয়াট!
বলেই তিনি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন। হাতে নিলেন কেঁঠি, মাটি থেকে একটা ইটের টুকরো তুলে কেঁঠিতে গেঁথে সোজা তাক করলেন মতিনের মাথার দিকে। ঠাস করে ছুঁড়ে মারতেই ইটের টুকরো গিয়ে সোজা কপালে লাগল।
মতিন চিৎকার করে উঠলেন – ওরে ময়না! কই তুই? ওই বুড়ি আমার মাথা দুই ভাগ করে দিলো রে!
স্বামীর চিৎকার শুনে ময়না বেগম ছুটে এসে দেখলেন স্বামী মাথা চেপে ধরে কাঁদছেন। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলেন আজমেরী বেগম কেঁঠি ঘুরাতে ঘুরাতে দাঁত কেলাচ্ছেন। মুহূর্তেই বুঝে গেলেন কী ঘটেছে, আর শুরু হলো যেন একপ্রকার বিশ্বযুদ্ধ!
বাড়ির বাইরে এত চিল্লাচিল্লি শুনে লাবিবের আড়মোড়া ভাঙল। বিরক্ত হয়ে ঘড়ি দেখল – মাত্র ছ’টা বাজে। আরও বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কিছু বুঝতে পারল না। দরজা খুলে নিচে নামতেই দেখল, সাফওয়ান আর আবিরও বেরিয়ে এসেছে।
লাবিব বলল – বাইরে কিসের চেঁচামেচি হচ্ছে?
সাফওয়ান বলল – জানি না, চল দেখে আসি।
তিনজন একসাথে বের হয়ে গেল।
এদিকে ময়না বেগম কোমরে আঁচল গুঁজে সামনে এগিয়ে বললেন – ইসফুপিথ!
আজমেরীও এক পা এগিয়ে বললেন – লনসেন!
ময়না বেগম রেগে উঠলেন – ইডিয়ট, ওই বেডি, তুই আমার জামাইরে ইট ছুড়সস কেন?
আজমেরী চেঁচিয়ে উঠলেন – ওই বেডি, তোর জামাই আমার বাড়িতে উকি পুকি মারে কেন?
ময়না বেগম চেঁচিয়ে বললেন – ওই বুড়ি, তুই কারে বেডি কস?
আজমেরী আরও ক্ষেপে উঠলেন – বুড়ি মানে? তুই বুড়ি, তোর চোদ্দগুষ্টি বুড়ি!
ময়না বেগম জবাব দিলেন – আমার গুষ্টি নিয়া একটা কথাও কবি না!
আজমেরী হেসে বললেন – একশোবার বলমু, হাজারবার বলমু – তোর গুষ্টি বুড়ি, তোর গুষ্টি বুড়ি, তোর চোদ্দগুষ্টি বুড়ি!
তাদের এমন উল্টাপাল্টা ইংরেজি শুনে লাবিব, আবির আর সাফওয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। পিছন থেকে দৌড়ে এল ফাহিম, জাহিদ, ফারিয়া, হাফসা, শারমিন, মাহির, রাশেদ আর আরিফ।
মাহির, রাশেদ আর আরিফ বাগানের চেয়ারে বসে চুপচাপ শো উপভোগ করছে। খান বাড়ির ছেলে-মেয়েরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তায়েব দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলল – মাহির, শো শেষ?
মাহির হেসে বলল – না, কেবল শুরু। তাড়াতাড়ি আয়।
তায়েবের সঙ্গে সঙ্গে এল হামিদা, লামহা আর তায়েবা। সবাই আড়মোড়া ভেঙে চেয়ারে বসে গেল। তায়েবা আবার মোবাইলের ক্যামেরা অন করে ভিডিও করতে শুরু করল।
সাফওয়ান হামিদার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল।
লামহা চশমা নাকের ডগায় বসিয়ে হাতে বই চেপে ধরে ঝগড়া দেখছে। তাকে যে কেউ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে, সেটা তার খেয়াল নেই।
চিল্লাচিল্লিতে বিরক্ত হয়ে লামিয়া বিছানা ছেড়ে বারান্দায় এল। রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসে বুঝার চেষ্টা করছে কি হয়েছে।
হঠাৎ ময়না বেগম চেঁচিয়ে বললেন – ওই বুড়ি, ওই সেটাপ আই ভেরি ডেঞ্জার কামিং কামিং!
আজমেরীও পাল্টা চেঁচিয়ে উঠলেন – ওই বুড়ি, ইউ সেটাপ গেট আউট, নট বেম্বুকাম!
ময়না রেগে গেলেন – আই সেইং টু ডু কাম!
আজমেরী চোখ ছোট করে বললেন – তুই কি ইংরেজি কস, কিছুই তো বুঝি না!
ময়না জবাব দিলেন – পারবি কেমনে? তুই তো নেকাপড়া পারস নে! বুঝবি কেমবে?
আজমেরী মুখ বাঁকিয়ে বললেন – ওরে আমার চাদবদনী রে!
ময়না মুখ বাঁকিয়ে বললেন – ওরে আমার নাক ফুলুনি রে!
এমন সময় লামিয়া জোরে সিটি বাজাল। সবাই তাকাল তার দিকে। লামিয়া হেসে বলল – দাদী, তোমরা ঝগড়া চালিয়ে যাও। যে হারবে, তারে আমি একটা শান্তনা পুরস্কার দিব। যে জিতবে তার জন্য কোনো পুরস্কার নাই।
আজমেরী অবাক হয়ে বললেন – কেন?
লামিয়া দাঁত কেলিয়ে বলল – যে জিতবে সে তো এলাকার রানী হবে, তার পুরস্কারের দরকার কি!
খুশিতে আজমেরী লাফাতে শুরু করলেন – তাইলে হাঁটাহাঁটি লড়াই হক কি লো ময়না?
ময়না বললেন – জিতবো তো আমিই!
দুজন আবার ঝগড়া শুরু করলেন।
ইসলাম বাড়ির ছেলে-মেয়েরা দারুণ মজা নিচ্ছে। মাহির নিচ থেকে একটা জুসের বোতল ছুঁড়ে দিল লামিয়ার দিকে। লামিয়া কেজ করে নিয়ে ঢকঢক করে খেতে লাগল। লাবিব লামিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু লামিয়ার খেয়াল নেই।
সাফওয়ান রাশেদের কাঁধে হাত রেখে বলল – রাশেদ, ওনাদের থামাও।
রাশেদ হেসে বলল – যা হচ্ছে দেখতে থাক। বলেই আরও চেয়ার এগিয়ে দিল। খান বাড়ির ছেলেমেয়েরাও বসে গেল। শারমিন এসে রাশেদের পাশে বসল, রাশেদের খেয়াল হলো না।
এদিকে ঝগড়া আরও বাড়ছে।
ময়না বেগম চেঁচিয়ে বললেন – তুই জ্বলতাহে!
আজমেরী বললেন – মি জ্বলতাহে? ইউ জ্বলতাহে, ইউ!
ময়নার মা চেঁচালেন – ইউ মারতাহে, মারতাহে!
আজমেরী হঠাৎ বললেন – আল্লা ওর উপর ঠাডা ফালাও, আগুন ফালাও, আর উপর বোল্লার কামড়ও দাও!
ময়না বেগম ভীষণ বোল্লার ভয় পান। এই কথা শুনেই আঁতকে উঠলেন। শাড়ি তুলে লাফাতে লাফাতে চেঁচাতে লাগলেন – আল্লাগো, আমার শরীর জ্বইল্লা গেলো, বোল্লা কামড় দিলো, আমারে বাঁচাও!
আজমেরী হেসে বললেন – এই যে, বোল্লা তোর পিছনে, তোর সামনে!
ময়না আরও লাফাতে লাগলেন।
এমন সময় লামিয়া কোমড়ে উড়না পেঁচিয়ে।
এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হলো। তারপর ঠাস করে ময়নার উপর ঢেলে দিল। ময়না অবাক হয়ে তাকাল।
লামিয়া হেসে বলল – বলেছিলাম না, যে হারবে তার জন্য শান্তনা পুরস্কার! এই নাও দাদী, তোমার পুরস্কার। আর আজকের বিজয়ী হলো আমাদের সকলের প্রিয় আজমেরী বেগম!
মাহির সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল – জনতার নাম?
তায়েব, তায়েবা, লামহা একসাথে উত্তর দিল – আজমেরী!
মাহির আবার বলল – এলাকার রানী?
সবাই একসাথে – আজমেরী!
প্রিয় রাগিনী পর্ব ২
লামিয়া হাত তুলে বলল – আমার রানী, তোমার রানী –
তারা একসাথে স্লোগান দিল – আজমেরী বেগম! আজমেরী বেগম!
লামিয়া আবার স্লোগান ধরল – আজমেরী বেগমের কিছু হলে?
সবাই একসাথে চিৎকার করল – জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে!
চিৎকারে চারদিক কেঁপে উঠল। হামিদা, রাশেদ আর আরিফ বসে বসে হেসে কুটিপাটি হয়ে গেল।
আর খান বাড়ির ছেলে মেয়েরা সবাই হা করে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।
