Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৭

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৭

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৭
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

মাথা নিচু করে বসে চোখের পানি ফেলছে শারমিন। তার সামনে দাঁড়িয়ে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাশেদ। রুমের মধ্যে পিনপিনে নীরবতা, কারো মুখে কোনো কথা নেই।
ফ্ল্যাশব্যাক,
হাতের ব্যথা নিয়ে শুয়ে ছিলো শারমিন। হঠাৎ রাশেদ খাবার নিয়ে রুমে প্রবেশ করে দরজা লক করে দিলো। খাবারের প্লেটটা টেবিলে জোরে শব্দ করে রাখতেই ঘুম ভেঙে যায় শারমিনের। চোখ মেলে দেখে, রাশেদ চেয়ারে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

শারমিন তাড়াতাড়ি উঠে বসে চোখ মুছে আবার তাকালো। না, স্বপ্ন দেখছে না। রাশেদের চাহনিতে কোনো নড়াচড়া নেই, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে।
শারমিন আস্তে করে বললো – আপনি এতো রাতে আমার ঘরে কী করছেন?
রাশেদ চোখ সরিয়ে বললো – ফ্রেশ হয়ে আসুন, তারপর এই খাবার খেয়ে ওষুধ খাবেন।
শারমিন ভ্রু কুঁচকে বললো – খাবো না, নিয়ে যান খাবার।
– আমি যা বলেছি, সেটাই করবেন। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিন।
ঠিক তখনই রাশেদের ফোনে কল এলো। শারমিন ভ্রু কুঁচকালো, এতো রাতে কে কল করে?
রাশেদ পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেয়েলী কণ্ঠ ভেসে এলো। রাশেদ শারমিনের দিকে তাকিয়ে বললো – মিহি, একটু হোল্ড করো। তারপর শারমিনকে বললো – আমি যেন ফিরে এসে দেখি, খাবার শেষ করেছেন। বলেই দ্রুত বেরিয়ে গেলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

শারমিন কিছু বুঝলো না, তবে এতটুকু বোঝার বাকি রইলো না যে রাশেদ কোনো মেয়ের সাথে কথা বলছে। বুকটা ভারী হয়ে এলো, চোখে পানি জমলো। কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। খাবার সেভাবেই পড়ে রইলো।
কিছুক্ষণ পর রাশেদ ফিরে এসে দেখলো খাবার সেইভাবেই পড়ে আছে। শারমিন শুয়ে আছে। রেগে বিছানা থেকে টেনে শারমিনকে উঠালো।
শারমিন হাত ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিলো। অবাক হয়ে তাকালো রাশেদ। ফর্সা মুখ কান্নার কারণে লাল টকটকে, নাদুসনুদুস গালগুলো টমেটোর মতো। দেখেই রাশেদের হাসি পেলো, তবু হাসলো না। গম্ভীর মুখে বললো – খাবার শেষ করতে বলেছিলাম, করেননি কেন? এক কথা দ্বিতীয়বার রিপিট করতে আমার ভালো লাগে না।
শারমিন চুপচাপ বসে রইলো। রাশেদ হাত ধরে টেনে বিছানা থেকে নামালো।
শারমিন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। রাশেদ রেগে উঠলো – কি সমস্যা? ভালোভাবে বলছি, ভালো লাগছে না আপনার?

রাগে, অভিমানে শারমিন হঠাৎ বুকের ওপর ধাক্কা দিয়ে বললো – সমস্যা তো আপনি!
ভ্রু কুঁচকে রাশেদ বললো – আমি কী সমস্যা করেছি?
চোখ মুছে শান্ত স্বরে শারমিন বললো – কয়টা বাজে এখন?
– রাত প্রায় একটা। কেন?
রাগে শারমিন কলার চেপে ধরলো – তাহলে কে ওই মেয়ে? এতো রাতে আপনাকে কল করে কেন? এতো রাতে আপনাকে কেন দরকার তার?
রাশেদ শারমিনের হাত সরিয়ে শান্তভাবে বললো – সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে বাহিরের কেউ নাক গলাক, সেটা আমি পছন্দ করি না।
শারমিন অবাক হয়ে বললো – আমি বাহিরের কেউ?
– কোনো সন্দেহ আছে? – শুষ্ক কণ্ঠে উত্তর দিলো রাশেদ।
অভিমানে চোখে চোখ রেখে শারমিন বললো – সে কি বিশেষ কেউ, যার জন্য আমি বাহিরের মানুষ হয়ে গেছি?
– হবে হয়তো।

শারমিনের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। কলার চেপে ধরে ভাঙা গলায় বললো – আপনি খারাপ মানুষ। আমার বিশ্বাস ভেঙেছেন। অনেক খারাপ! আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছেন। আমাকে ভালোবাসা শিখিয়ে অন্য কারোর হাত ধরেছেন। আমি আপনাকে কোনোদিন ক্ষমা করবো না।
রাশেদের ভেতরে রাগ জমলেও কন্ট্রোল করলো। ঠান্ডা গলায় বললো – কী করবেন না করবেন, পরে দেখা যাবে। বলেই শারমিনকে টেনে বিছানায় বসিয়ে খাবারের প্লেট সামনে দিয়ে বললো – খেয়ে নিন। তারপর ওষুধ খাবেন, আর হাতে মলম লাগাতে হবে।
শারমিন রাগে প্লেট ছুঁড়ে ফেলে দিলো – দরদ দেখাতে এসেছেন আমাকে? আপনার দরদ অন্য কোথাও দেখান। আমার দরকার নেই। নাটক আপনি খুব ভালো পারেন, তাই ওই মেয়ের জন্য রেখে দিন। চলে যান এখান থেকে, না হলে আমি…

কথা শেষ হওয়ার আগেই ঠাস করে একটা চড় বসলো তার গালে।
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেই রাশেদ রাগে তার গলা চেপে ধরলো – চলে না গেলে কী করবি? চিৎকার করবি? কর দেখি! তোর গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় কি না! অনেকক্ষণ ধরে আজেবাজে কথা শুনছি, এখন চিৎকার কর।
শারমিন ছটফট করতে লাগলো। রাশেদ আরো জোরে চেপে ধরলো। তারপর হঠাৎ থেমে গেলো। শারমিন ছটফটানি বন্ধ করে শান্তভাবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
অবাক হয়ে রাশেদ গলা ছেড়ে দিলো। শারমিন কাশতে লাগলো, চোখ মুখ লাল টুকটুকে। মনে হলো একটু ছোঁয়াতেই রক্ত গড়িয়ে পড়বে।

রাশেদ নিজের রাগ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু শারমিনের কথাগুলো তাকে অসহনীয় করে তুলেছিলো। চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো।
শারমিন ভাঙা গলায় বললো – ছাড়লেন কেন? মেরে ফেলতেন।
রাশেদ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। কিছু বললো না।
তারপর আবার হাত ধরে বিছানায় বসালো। হাঁটু গেড়ে পাশে বসে মলম লাগাতে গেলো। শারমিন হাত সরিয়ে নিলো।
রাগে রাশেদ আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
শারমিন মাথা নিচু করে বসে রইলো। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে টুপটাপ।

বর্তমান,
রাশেদ রেগে বললো – আমার রাগের কথা আপনি ভালো করেই জানেন। তাই আরেকটা থাপ্পড় খেতে না চাইলে চুপচাপ বসে থাকুন, নয়তো খুব খারাপ হবে।
বলেই শারমিনের হাত টেনে মলম লাগিয়ে দিলো। তারপর ফ্লোর পরিষ্কার করে গম্ভীর মুখে বললো – আমার সাথে আবার এমন জেদ দেখালে থাপ্পড়ে গাল লাল বানিয়ে দিবো।
কথা শেষ করেই বেরিয়ে গেলো।
মাথা নিচু করে বসে শারমিন অঝোরে কাঁদতে লাগলো। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। কারণ রাশেদ তার গায়ে হাত তুলেছে বলে নয়। তার কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে রাশেদের জীবনে তার কোনো মূল্য নেই, সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।
কান্না করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো শারমিন, সে নিজেও বুঝতে পারলো না।

ছাদের দোলনায় শুয়ে আছে রাশেদ। সকালের আলো চোখে লাগতেই চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো। পিটপিট করে তাকাতেই বুঝলো সকাল হয়ে গেছে। গত রাতেই শারমিনের রুম থেকে বের হয়ে ছাদে এসে বসেছিলো। কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিলো সেটা তার মনে নেই। রাতের ঘটনাগুলো মনে পড়তেই রাশেদের মুখ গম্ভীর হয়ে গেলো।
ছাদের ফ্লোরে চোখ পড়তেই দেখলো চারপাশে অর্ধেক পুরে যাওয়া সিগারেট ছড়িয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একে একে সেগুলো কুড়িয়ে নিতে লাগলো।
ঠিক তখনই পিছন থেকে কারো কন্ঠ ভেসে এলো,

– একটার পর একটা সিগারেট খেলে বুঝি কষ্ট কমে?
চমকে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো লামিয়া দাঁড়িয়ে আছে। হালকা হাঁসি দিয়ে রাশেদ বললো,
– কখন এসেছিস এখানে?
লামিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বললো,
– যখন তুমি ঘুম থেকে উঠেছো তখন।
রাশেদ আর কোনো কথা বললো না। সিগারেটগুলো তুলে নিজের পকেটে ভরে রাখলো, পরে বাইরে ফেলে দিবে।
– ভাইয়া।
– হু।

– যাকে এত ভালোবাসো তাকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেনো? কাছে টেনে নিচ্ছ না কেনো?
রাশেদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাঁসলো।
– তুই আমাকে এই প্রশ্ন করছিস? আচ্ছা আগে তুই বল, তুই কেনো তাকে টেনে নিচ্ছিস না তোর কাছে?
এই কথায় হোহো করে হাঁসতে লাগলো লামিয়া। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো রাশেদ। কিছুক্ষণ পরে হাঁসি থামিয়ে লামিয়া বললো,

– যাও এখন নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমি গাছে পানি দিবো।
রাশেদ বুঝলো লামিয়া এই বিষয়ে কথা বাড়াতে চায় না। তাই চুপচাপ চলে গেলো।
লামিয়া টিউবওয়েল থেকে পানি ভরে গাছে পানি দিতে দিতে বাগানের দিকে তাকালো। খালি গায়ে শুধু শর্টস পরে বাগানে পুশআপ করছে লাবিব। ওদিকে চোখ যেতেই লামিয়া শুকনো ঢোক গিললো। কিছুক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে সয়তানি হেঁসে হঠাৎ মগে করে পানি ভরে উপর থেকে লাবিবের গায়ে ঢেলে দিলো।
ঠাস করে পুরো পানি গিয়ে পড়লো লাবিবের উপর। মাথা তুলতেই মগ গিয়ে সোজা মুখে লাগলো। লামিয়া হো হো করে হেঁসে উঠলো। ভিজে চুপচুপে দাঁড়িয়ে রইলো লাবিব, চোখ মুখ শক্ত করে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। এই মেয়েকে কালকে মনে হলো কতো বড় হয়ে গিয়েছে কিন্তু এখনো সয়তানের হাড্ডি ই রয়ে গেছে। ভেবেই বিরক্ত হলো লাবিব।

ভেংচি কেটে লামিয়া নিজের রুমে চলে গেলো। লাবিব বিরক্ত মুখে পাশ থেকে টাওয়াল নিয়ে শরীর মুছতে মুছতে নিজের রুমে ঢুকলো।
টেবিল থেকে ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দেখলো – “মনিকা” নামে সেভ করা নাম্বার থেকে বিশটা মিসড কল।
লাবিব সঙ্গে সঙ্গেই কল ব্যাক করলো। ওপাশে কিছু শোনা গেলো না। লাবিব শান্ত গলায় বললো,
– তুমি তাহলে এসো, কালকে আমরা আমাদের বাসায় শিফট হবো। কোনো সমস্যা হবে না।
বলেই কল কেটে দিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।

নাস্তা শেষ করে সবাই যে যার কাজে বেরিয়ে গেলো। বসার ঘরে শুধু বাড়ির কর্ত্রীরা বসে আলাপ করছে—আর দু–একদিন পরেই খান পরিবারের সবাই তাদের বাড়িতে গিয়ে উঠবে, সেই নিয়েই আলোচনা। ঠিক তখনই হঠাৎ করেই কর্ণিং বেলের শব্দে তাদের কথা বন্ধ হলো।
রাশেদা বেগম দরজা খুলতেই চোখে পড়লো—সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুঠাম দেহের এক যুবক। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো সানগ্লাস। ভদ্র হাঁসি দিয়ে সালাম জানালো।
– কে তুমি? কাকে চাই?
রাশেদা বেগম প্রশ্ন করতেই যুবক মাথা নুইয়ে বললো,
– জি আন্টি, আমি জুনায়েদ আহমেদ। লাবিবের ছোটবেলার বন্ধু।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো চেনা কণ্ঠ,

– এসে গেছিস!
লাবিব দৌড়ে এসে জুনায়েদকে জড়িয়ে ধরলো।
– আয়, সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।
সবার সাথে পরিচয় পর্ব সেরে দুজনেই উপরে চলে গেলো। বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ায় লাবিব দারুণ খুশি। দরজা বন্ধ করে আড়মোড়া ভেঙে বসে বললো,
– বল তো, তোর খবর কী?
– এই তো, যা দেখছিস। – হেসে উত্তর দিলো জুনায়েদ।
– বিয়ে–সাদি করেছিস নাকি? – মজা করে জিজ্ঞেস করলো লাবিব।
– আরে না, কাজ করতে করতে দিন শেষ, আবার বিয়ে! – হাসলো জুনায়েদ। একটু থেমে তাকিয়ে বললো
– তোর ঝাসিকি রাণীটা কী এখনো আছে, নাকি বিদেশে গিয়ে বিদেশি মেম দেখে মন পাল্টে গেলো?
লাবিব মুচকি হাঁসি দিয়ে বললো,

– সে আজও আমার হৃদয়ে আছে। সে ব্যাতীত অন্য কোন মেয়ের দিকে লাবিব চোখ তুলে তাকায় না।
আর সে ছাড়া অন্য কোনো নারীর জায়গা দেই নি আমার হৃদয়ে।
– বাহ্! আমাদের লাবিব তো প্রেমে পুরো দেওয়ানা! – মজা করে বললো জুনায়েদ। – তো, বিয়ে কবে করবি?
– সে যেদিন আবার আমার সামনে আসবে।
– যদি না আসে তখন?
– জানি না। – হালকা গম্ভীর স্বরে বললো লাবিব।
– এখন তোর কথা বল, কাউকে পছন্দ করিস নাকি?
– পছন্দ করি বললে কম হবে। আমি তার প্রেমে পুরো উল্টে গেছি। ঘুমালেও শুধু ওর মুখ দেখি।
– মেয়ের নাম কী? কোথায় থাকে?
– কিছুই জানি না। একদিন ভার্সিটিতে দেখেছিলাম। তারপর যত খুঁজেছি, পাইনি… – কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো জুনায়েদের।
লাবিব বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বললো,
– মন খারাপ করিস না। ভাগ্য চাইলে অবশ্যই পাবি।
দুজনেই টুকটাক আড্ডায় মেতে উঠলো।

এদিকে, এক ঘন্টা ধরে তায়েব বাথরুমে বসে আছে। বাইরে দাঁড়িয়ে মাহির, তায়েবা আর লামিয়া হইচই করছে, কিন্তু তবুও সে বের হচ্ছে না।
উপায় না পেয়ে লামিয়া নিজের রুম থেকে কিছু একটা নিয়ে এলো। কিচেন থেকে লাইটার হাতে নিয়ে ফিরতেই মাহির আর তায়েবা তার চেহারা দেখে বুঝে গেলো কী হতে যাচ্ছে। তারা সয়তানি হাঁসি দিয়ে সরে দাঁড়ালো।
চেয়ারে উঠে লামিয়া বোম জ্বালিয়ে বাথরুমের ফাঁক দিয়ে ছুঁড়ে দিলো। ঠাস করে আওয়াজ হতেই ভেতর থেকে তায়েব চেঁচিয়ে উঠলো,

– আমি বের হয়ে তোদের কী হাল করি শুধু দেখিস!
হাঁসি চেপে মাহির, তায়েবা আর লামিয়া বললো,
– তাড়াতাড়ি বের হ, অপেক্ষায় আছি!
হাঁসি–ঠাট্টা করতে করতে তারা নিচে নামলো। হঠাৎ লাবিবের ঘর থেকে অট্টহাসির শব্দ শুনে দাঁড়ালো। লামিয়ার চোখ চকচক করে উঠলো। দ্রুত রুম থেকে বোমের প্যাকেট এনে মাহিরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
– আমার সহ্য হয় না বেশি হাঁসি।
মাহির আতঙ্কিত স্বরে বললো,

– পাগল নাকি? লাবিব ভাই রেগে গেলে আমাদের খবর আছে!
কিন্তু লামিয়া পাত্তা দিলো না। সরাসরি বাগানে গিয়ে লাবিবের জানালার দিকে বোম ছুঁড়তে লাগলো।
ঠাস ঠাস শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠলো। ভেতরে জুনায়েদ চমকে বললো,
– কিরে ভাই, এই বাড়িতে যুদ্ধ শুরু হলো নাকি?এমন করে বোম নিক্ষেপ করছে কে?
লাবিব জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো—লামিয়া একের পর এক বোম ছুঁড়ছে।
চোখ লাল হয়ে উঠলো লাবিবের। পাশে পড়ে থাকা মোটা বাঁশের কঞ্চি হাতে তুলে নিলো।
– কী রে ভাই, লাঠি দিয়ে কী করবি? – জিজ্ঞেস করলো জুনায়েদ।
– গরু পিটাবো।
– গরুও আছে এ বাড়িতে?
– শুধু গরু না, ছাগল, গাধা, ভেড়াও আছে। – দাঁত চেপে বললো লাবিব।
দুজনেই বাগানের দিকে এগিয়ে যেতেই, জুনায়েদের কল আসলো। তাকে এখনি যেতে হবে তাই লাবিবের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলো।

এদিকে তিনজন বান্দর–লামিয়া, মাহির আর তায়েবা হাঁসতে হাঁসতে পিঠে হাত দিচ্ছে। ঠিক তখনই পেছন ফিরে তায়েবা দেখলো লাবিব দাঁড়িয়ে আছে কঞ্চি হাতে। আতঙ্কে মাহির কে হাত দিয়ে পিঠে থাপ্পড় দিতেই লাবিব কে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। লাবিব সরে যেতে ইশারা করতেই দুজন দ্রুত সরে গেলো।
লামিয়া টেরই পেলো না। হঠাৎ পিছন থেকে কঞ্চির জোরে বারি খেলো। ব্যথায় চোখ মুখ বুজে পিছন ফিরতেই দেখলো রাগে ফুঁসতে থাকা লাবিব। এত জোরে মারলো যে পিঠ কেটে জামা ভিজে গেছে রক্তে। কিন্তু সেটা কেউ খেয়াল করলো না।

লাবিব আরো একটা বারি দিতেই লামিয়া দৌড় দিলো।
লাবিব পিছন থেকে লামিয়া কে ধরে হাত মুচড়ে ধরতেই লামিয়া ব্যাথায় কুঁকড়িয়ে উঠলো।
লামিয়া উপায় না পেয়ে হাত ছাড়িয়ে লাবিবের হাত কামড়ে ধরলো
তায়েবা, মাহির হতভম্ব!
তখনই আবির, সাফওয়ান, হামিদা, লামহা, শারমিন, আরিফ, হাফসা আর ফারিয়া দৌড়ে এলো। দৃশ্য দেখে সবাই থমকে গেলো।
লাবিব লামিয়াকে মারতে এগোতেই আবির আর সাফওয়ান বাধা দিলো।

– অনেক হয়েছে! ছোট্ট মানুষ একটা ভুল করেছে, তুই বড় হয়েও কেন সবসময় ওর পেছনে লেগে থাকিস?
তায়েবা হঠাৎ চিৎকার করলো,
– লামিয়ার পিঠ থেকে রক্ত পড়ছে!
সবাই তাকিয়ে অবাক। লাবিবের রাগ উড়ে গেলো লামিয়ার পিঠে রক্ত দেখে হতবাক হয়ে গেলো। এত জোরে মারতে চায়নি সে। কিন্তু লামিয়া কিছু না বলে সোজা ভেতরে চলে গেলো।
বাকি সবাই মিলে লাবিবকে রুমে নিয়ে এলো। লাবিবের দিকে তাকিয়ে আবির মজা করে বললো,
– সাফওয়ান গাড়ি বের কর, ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
সাফওয়ান মিটমিট করে হেসে বললো – হায় হায় কী বলিস, তাহলে তাড়াতাড়ি চল। লাবিব তাড়াতাড়ি উঠ।
লাবিব রেগে সাফওয়ান আর আবিরের দিকে তাকালো।
তা দেখে আবির বললো – না মানে কামড়ের ইনফেকশন হতে পারে।
লাবিব বিরক্ত হয়ে তাকালো।
– আমার সাথে মজা করছো?
সবাই হেসে উঠলো।
শেষমেষ আবির মলম লাগিয়ে দিলো। একে একে সবাই চলে গেলো।
লাবিব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষত দেখলো। দাঁত চেপে বললো,
– জংলি বিড়াল একটা।
বিরক্ত হয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো।

– তুই জানিস লাবিবের হাতে কতো বড় ক্ষত হয়েছে? এইভাবে কেউ কামড়ায় কাউকে? কপাট রাগ দেখিয়ে বললো।
– বড় আপা, তুই আমার বোন হয়ে ওই জলহস্তীর পক্ষ নিয়ে কথা বলছিস? বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
– না, আমি কারোর পক্ষ নিয়ে কথা বলছি না।
– তাহলে এতো কথা বলছিস কেনো?
-ওরা আমাদের অতিথি, কালকেই চলে যাবে। আর তুই লাবিবের সাথে সবসময় লেগে থাকিস। অতিথিদের সাথে এমন আচরণ করা উচিত নয়।
– বড় আপা, তুই আমার রুম থেকে বের হয়ে যা। তোর এসব জ্ঞান আমার কাছে বিরক্ত লাগছে।
নিচ থেকে লতিফা বেগম ডাক দিলেন – হামিদা! হামিদা লামিয়ার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো।
লাল রঙের পাঞ্জাবি, সাদা লুঙ্গি, মাথায় টুপি, মুখ ভর্তি পান চিবুতে চিবুতে দাঁত বের করে হাঁসি দিয়ে কথা বলছে লোকটি। বয়স প্রায় ৪৫–৫০ হবে।

– তোমার কি একটাই মাইয়া নি? – লোকটি বললো।
– না না, আমার তিনটা মেয়ে। – লতিফা বেগম জবাব দিলেন।
– তাইলে একটারে ডাকলা কেনো? তিনটারেই ডাকো দেখি।
লতিফা বেগম কিছু না বলে লামিয়া আর লামহাকে ডাকলেন।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে রুম থেকে বের হয়ে হল রুমের দিকে গেলো, সাথে লামহা। সামনে হামিদা মাথা নিচু করে হাঁটছিলো।

– এইভাবে কচ্ছপের গতিতে হাঁটছিস কেনো? – লামিয়া বললো।
– তোরা দুজন মাথায় মোড়া দিয়ে আয় সুন্দর মতো। – হামিদা আদেশ করলো।
সাথে সাথে লামহা ওড়না মাথায় দিয়ে নিলো, কিন্তু লামিয়া ভ্রু কুঁচকে মোড়া না দিয়েই সোজা হল রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। হামিদা-লামহা হতাশ চোখে চাওয়া-চাওয়ি করে পিছন পিছন গেলো।
সাফওয়ান আর আবির এই মাত্র বাহিরের থেকে এলো।
হল রুমে ঢুকে দেখলো সবাই বসে আছে। বাড়ির কর্তারা বাদে। ভদ্রলোকটিকে দেখে সাফওয়ান ভ্রু কুঁচকালো। লাবিব কফি নিতে এসেছিলো, এমন সবার গোল হয়ে বসা দেখে এগিয়ে গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো—

– কী হয়েছে মা? সবাই এভাবে বসে আছে কেনো?
লুবনা বেগম খুশি হয়ে বললেন – ওদের তিন বোনের জন্য সমন্ধ এসেছে।
লাবিব ছোট্ট চোখ করে সিঁড়ির দিকে তাকালো। দেখলো, লামিয়া ধেই-ধেই করে নেমে আসছে, পিছনে হামিদা আর লামহা চুপচাপ। লাবিব লামিয়ার মুখ দেখেই বুঝলো কিছু একটা হবে। বিরক্ত হয়ে চোখ ঘুরিয়ে আবির-সাফওয়ানের দিকে তাকালো। সাফওয়ানের মুখ অন্ধকারে ঢেকে গেছে। তা দেখে লাবিবের হাঁসি পাচ্ছিলো, ঠোঁট চেপে হাঁসি আটকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
সিঁড়ি থেকে নেমেই সোফায় ধপ করে বসলো লামিয়া। ভদ্রলোক কপাল কুঁচকে তাকাতেই লামিয়া চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে তার দিকে তাকালো।

পাশ থেকে লতিফা বেগম ধমকে উঠলেন – লামিয়া! এটা কোন অসভ্যতা? সুন্দর করে বসো।
লামিয়া চুপচাপ ঢেলান দিয়ে বসে রইলো। টেবিল থেকে আপেলের টুকরো নিয়ে চিবাতে লাগলো। লতিফা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে হামিদা কে দেখিয়ে বললেন – এটা আমার বড় মেয়ে। তারপর লামহার দিকে ইশারা করে – এটা মেজো। তারপর লামিয়ার দিকে – আর এটা ছোট।
ভদ্রলোক হামিদা আর লামহার দিকে তাকিয়ে বললেন – মাশাআল্লাহ, দুইজন অনেক সুন্দর। ওগো লেইগা ভালো ঘরের পোলা আছে, দুই ভাই, পোলারা বিদেশে থাকে। বিয়ার পর বিদেশে নিয়ে যাবো।
সাফওয়ান আর আবিরের মুখ অন্ধকারে ঢেকে গেলো। হামিদা-লামহা চুপচাপ লামিয়ার দিকে তাকালো। লামিয়া তাদের চোখের ভাষা বুঝে খিলখিল করে হেসে উঠলো।

ভদ্রলোক চমকে বললেন – এই মাইয়া, তুমি হাসো কেনো?
টেবিল থেকে আরেকটা আপেল তুলে চিবাতে চিবাতে লামিয়া বললো – যতো তাড়াতাড়ি আপদ বিদায় করবেন, ততই ভালো।
ভদ্রলোক লতিফা বেগমকে বললেন – তোমার এই মাইয়ার লেইগ্গাও পোলা আছে।
তা শুনে লামিয়া লাফিয়ে উঠলো। লাবিব হালকা হাঁসলো। মাহির, তায়েব, তায়েবা মুখ কুঁচকে রইলো।
ভদ্রলোক আবার বললেন – যেহেতু ও কালা, তাই ওর লেইগ্গা কালা পোলা আছে একটা। মেলা বড় লোক, কিন্তু গায়ের রং কালা।আগে একটা বউ আছিলো গেছে গা। এমনিতেই তোর ছোট মাইয়ার আদব নাই, তার উপর কালা। ওইডা পোলারে বিয়া করলে সুখে থাকবো।
লতিফা বেগম আড়চোখে তাকালেন লামিয়ার দিকে। লামিয়া শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো লোকটার দিকে। তারপর চোখ ঘুরিয়ে মাহির-তায়েব-তায়েবাকে ইশারা করলো। তারা বুঝে নিলো। লাবিব সবই দেখলো কিন্তু চুপ করে রইলো।
আচমকা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো লামিয়া। ভদ্রলোক ভয় পেয়ে গেলো।

– আরে ভয় পাবেন না, আপনি এতো ভালো তিনটা সমন্ধ এনেছেন। একটু মিষ্টি মুখ না করলে হয়? – হেঁসে বললো লামিয়া।
মাহির পিছন থেকে শরবত এনে দিলো। লামিয়া শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিতেই লোকটা নাক সিটকালো। মুহূর্তে মাহির ইশারা পেয়ে লোকটাকে চেপে ধরলো। তায়েব এসে করল্লার শরবত ভরে সব ঢেলে দিলো তার গলায়। ভদ্রলোক ছটফট করতে লাগলো। সবাই ভয়ে গেলো। লতিফা বেগম ছুটে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিলো আর লামিয়া-মাহির-তায়েবকে ধমক দিলেন।

ভদ্রলোক কাশতে কাশতে বললো – অসভ্য মাইয়া! তোরে কোনোদিন কোনো ভালো পোলা বিয়া করবো না। তোর যেই চেহারা, ওই চেহারা কোনো পোলাই নিবে না। বলেই কাশতে কাশতে বেরিয়ে গেলো।
বাড়ির বাইরে আসতেই উপর থেকে এক বালতি আলকাতরা ঢেলে দিলো কেউ। লোকটা ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠলো। পিছন থেকে সাফওয়ান, আবির, হামিদা, লামহা, মাহির, তায়েব, লাবিব সবাই মুখ চেপে হাঁসলো।
লামিয়া শান্ত চোখে বললো – আজ আলকাতরা দিলাম, দ্বিতীয়বার বাড়ির আশেপাশে দেখলে এসিড দেবো।
লোকটা ভয়ে বললো – আমার ভুল হইছে, আমি আর আহুম না এই বাইতে! অসভ্য মাইয়া ছিলা বলেই পালিয়ে গেলো।
লতিফা বেগম রেগে লামিয়ার গালে থাপ্পড় মারলেন। সবাই অবাক।

– তোর এসব ফালতু কাজে আমি খুব বিরক্ত। আমি আর পারছি না। বিরক্ত আমি। – রেগে বললেন লতিফা বেগম।
পাশ থেকে রাশেদা বেগম বললেন – মেয়েটার দোষ নাই। কিসব কথা শুনিয়ে গেলো লোকটা।
লতিফা বেগম চিৎকার করে উঠলেন – ঠিকই তো বলেছে লোকটা। কে বিয়ে করবে ওকে? না আছে রূপ, না আছে আদব। চোখের সামনে থেকে সরে যা। তোকে জন্ম দেওয়াটাই পাপ হয়েছে আমার! বলেই চলে গেলো।
লামিয়া বাঁকা হাঁসি হাঁসলো। হামিদা-লামহা তার হাত ধরতে গেলো, লামিয়া হাত ঝাড়া দিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। লাবিব চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। সাদা জামায় এখনো পিঠের রক্ত শুকিয়ে দাগ হয়ে আছে।
চারদিকে পিনপিন নীরবতা। দুপুর থেকে বাড়ির কেউ আর হেঁসে কথা বলেনি। যেনো শববাহী নীরবতা নেমে গেছে পুরো বাড়িতে।

দিন কেটে রাত নামলো, তবুও কেউ লামিয়ার টিকিটা পর্যন্ত খুঁজে পেলো না।
রাতে খাবার টেবিলে বসে আছে সবাই—লামিয়া বাদে। চারপাশে পিনপিনে নীরবতা। বাড়ির কর্তারা তাকিয়ে দেখলো, মাহির, তায়েব আর তায়েবা মাথা নিচু করে বসে আছে।
হামিদ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন – তোমরা এখানে, কিন্তু তোমাদের সর্দার কোথায়?
কেউ কোনো উত্তর দিলো না। সবাই মাথা নিচু করে বসে রইল।
হামিদ সাহেব এবার হামিদার দিকে তাকালেন। – হামিদা, কি হয়েছে আম্মা? কোনো সমস্যা হয়েছে? আর লামিয়া কোথায়?

হামিদা মাথা তুলে বাবার দিকে তাকালো। এক নজরে বোঝা গেলো কিছু একটা ঘটেছে।
চুপচাপ খাবার ছেড়ে উঠে লামিয়ার রুমের দিকে গেলেন হামিদ সাহেব।
সবাই তাকিয়ে রইল, কিন্তু কেউ কিছু বললো না।
রুমের দরজায় হালকা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেলো। ভেতরটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালিয়ে দেখলেন, কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে লামিয়া।
ভ্রু কুঁচকে সামনে গিয়ে কয়েকবার ডাক দিলেন – লামিয়া…
কোনো সাড়া নেই। কাঁথা সরাতেই দেখা গেলো, গালে হাত রেখে ঘুমিয়ে আছে।
গালে হাত দিতেই চমকে উঠলেন। শরীর গরম—জ্বর এসেছে।
হালকা ধাক্কা দিতেই পিটপিট করে চোখ খুললো লামিয়া। হালকা হাসি দিয়ে বললো – বাবা, তুমি কখন এলে?

– তোমার জ্বর এসেছে কিভাবে? আর সারাদিন না খেয়ে আছো কেনো? আসো, চলো খাবার খাবে।
– খিদে নেই বাবা।
– আমার অনেক খিদে লেগেছে। তুমি যদি না খাও, আমিও খাবো না। তোমার সাথে একসাথে সবাই খাবো। নিচে সবাই বসে আছে, এসো।
বাবার কথা ফেলতে পারলো না লামিয়া। আস্তে ধীরে বাবার হাত ধরে হাঁটতে লাগলো।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় বাবা-মেয়েকে দেখে সবার মুখে হাসি ফুটলো।
চেয়ারে বসতেই ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললো লামিয়া। সেটা দেখে লাবিব বুঝলো, কিন্তু কিছু বললো না।
লতিফা বেগম খাবার বেরে দিতে লাগলেন।
হামিদ সাহেব বললেন – লতিফা, খাওয়া শেষে ওকে একটা জ্বরের ওষুধ দিও। অনেক জ্বর এসেছে।
জ্বরের কথা শুনে লতিফার সব রাগ গায়েব। কপালে হাত রেখে বললেন – কীভাবে জ্বর এলো, বলিসনি কেনো?
লাবিব, তায়েব, তায়েবা, সাফওয়ান, হামিদা, লামহা আর আবির—সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো কেনো জ্বর এসেছে।
লাবিব অপরাধী চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে। কিন্তু লামিয়া ফিরেও দেখলো না।
খাওয়া শেষে সবাই যার যার রুমে চলে গেলো।

সকাল ৯টা ৩০ মিনিট।
নাস্তা শেষে ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য রেডি হলো লামহা। বোরখা পরে, হিজাব পরে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক তখনই সামনে গাড়ি নিয়ে দাঁড়ালো আবির।
চশমা ঠিক করে চোখ কুঁচকে তাকালো লামহা।
গ্লাস নামিয়ে আবির বললো – ভার্সিটিতে যাচ্ছিস? চল, আমি নামিয়ে দেই।
কিছু ভেবে রাজি হলো লামহা। গাড়িতে বসে ব্যাগ থেকে বই বের করে মুখ গুজে রাখলো।
আবির আড় চোখে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বললো – সারাদিন বইয়ে মুখ ডুবিয়ে রাখিস। এত কি পড়িস তুই?
শান্ত চোখে একবার আবিরের দিকে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মন দিলো লামহা।

আবির বিরক্ত হয়ে গাড়ি ঘুরালো উল্টো পথে।
চমকে উঠে লামহা বললো – আরে, এটা তো ভার্সিটির রাস্তা না!
কোনো উত্তর দিলো না আবির, চালিয়ে যেতে লাগলো।
ভয় পেয়ে লামহা বললো – গাড়ি থামান।
একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে গাড়ি থামালো আবির। চারপাশে কোনো মানুষ নেই।
আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে লামহা বললো – এটা কোথায় নিয়ে এসেছেন? আমাকে ভার্সিটিতে দিয়ে আসুন, প্লিজ।
চোখে চোখ রাখলো আবির। লামহার অস্থিরতা বাড়লো। শুকনো ঢোক গিলে বললো – আবির ভাই, এভাবে তাকাবেন না, আমার ভয় করছে।

আবিরের বেশ হাসি পাচ্ছিলো, কিন্তু থামিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
– এই নিরিবিলি জায়গায় আমরা কী করতে এসেছি?
– তুই আমার কথা শুনিস না। তাই ভেবেছি, তোকে এখানেই মে*রে নদীতে ভাসিয়ে দিবো।
অসহায় চোখে তাকালো লামহা। এবার হেসে উঠলো আবির।
– হাসছেন কেনো?
– তোর চেহারা দেখে ভীষণ হাসি পাচ্ছে।
মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল লামহা। মুচকি হাসলো আবির। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো

– আমাকে মিস করেছিলি?
শান্ত কথায় চমকে তাকালো লামহা।
– আপনাকে মিস কেনো করবো?
– মানে একবারও মনে পড়েনি আমার কথা?
– উঁহু।
চুপ করে তাকিয়ে রইল আবির। কিছুক্ষণ পর বললো – কাউকে ভালোবাসিস? কোনো রিলেশনে গিয়েছিলি? বা আছিস কোনো রিলেশনে?
চোখে চোখ রেখে লামহা বললো – হ্যাঁ, একজন আছে। তাকে আমি অনেক ভালোবাসি।
কথাটা শুনে শ্বাস নিতে ভুললো আবির। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা।
ঠোঁটে জোড় করে হাসি টেনে বললো – ওহ

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৬

বলেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।
যাকে এত বছর ভালোবেসে এসেছে, যার জন্য অপেক্ষা করেছে—সে নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসে। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো আবিরের। কান্না চেপে রেখে গাড়ি ঘুরালো ভার্সিটির দিকে।
লামহা আবিরের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বইয়ে মুখ গুঁজে বসে রইল লামহা।
কেউ আর কথা বললো না।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৮