প্রেমপিপাসা পর্ব ২১
সুমাইয়া সুলতানা
হালকা শীতল বাতাস মাঠের ওপরে স্লথ গতিতে বয়ে যাচ্ছে, যেন প্রকৃতি নিজে ধীর স্থিতিতে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সূর্যের সোনালি রশ্মি আকাশ থেকে মাটির প্রতি নিখুঁত ভাবে এসে পড়ছে, যেখানে একের পর এক গাছের শাখা-প্রশাখা, পাতার গাঁথা, আর মাটির কোণে কোণে তার ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে। আকাশ এক বিশাল নীলচে পটে মোড়া, যেখানে মেঘের সাদা ও নীলাভ কুঁড়ি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সূর্যের তাপের সাথে এক অদ্ভুত দোলাচলে। বাতাসে শীতলতার সাথে মাটির গন্ধ এবং দূরের গাছের ফুলের মিষ্টি সুবাস মিশে এক শান্তির অনুভূতি তৈরী করছে, যেন প্রকৃতি তার অশান্তি ও উত্তেজনা ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে পাখির গানের সুর ভেসে আসে, গাছের পাতা ঝিরঝির করে মৃদু সঙ্গীতের সুরে প্রতিধ্বনিত হয়। এত শান্ত, এত প্রশান্ত, মনে হচ্ছে সময়টাও থেমে গিয়েছে।
এই মনোরম পরিবেশে রাহাত মিষ্টি একে ওপরের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে। নিগূঢ় দৃষ্টিতে পলকহীন দেখে চলেছে দুই মানব-মানবী। রাহাত যখন ঠোঁটের গভীর নেশায় ডুব দিতে, অজান্তেই অল্প অল্প করে স্বীয় গরম ওষ্ঠপুট এগিয়ে নিচ্ছিল সম্মুখের যুবতীর নিকট, তক্ষুনি ফট করে উষ্ণ নিঃশ্বাসের তোপে চোখ খুলে মিষ্টি। মুহূর্তে নজরে নজর মিলন ঘটে দু’জনের। দৃষ্টি আর সময় স্থির হয়ে যায় সেখানেই। সূর্যের কিরণ তীর্যক ভাবে হানা দিচ্ছে তাদের গায়ে। সেই রশ্মি এসে ছড়িয়ে পরেছে মিষ্টির আরক্ত মুখশ্রীতে। সরু নাকের ডগায় ঘাম লেপ্টে রয়েছে। সূর্যের আলোর কারণে চিকচিক করছে সেই ঘামের ফোঁটাগুলো। আলগোছে রাহাত বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে মিষ্টির ঘাম টুকুন মুছে দিল। পুরুষালী উষ্ণ ছোঁয়ায় ঈষৎ কেঁপে উঠল নাজুক মেয়েটি। তারা যখন দিকবিদিক ভুলে চোখে চোখে ভাষাহীন প্রেমালিঙ্গণ করতে ব্যস্ত, হঠাৎ রাস্তার অদূরে বড়সড় একটা ট্রাক গাড়ির টায়ার ফাটার শব্দে ধ্যান ভাঙে তাদের। তৎক্ষনাৎ রাহাত ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ায়। মিষ্টি লজ্জায় পায়। ব্রীড়ানতায় আইঢাই করে বিমূঢ় হয় মুহূর্তে। অধর কামড়ে শুষ্ক ঢোক গিলে।
রাহাত নিজেও অস্বস্তিতে বুঁদ হলো। হালকা গলা খাঁকারি দিল। এদিক ওদিক নজর বুলিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” দেখে হাঁটতে পারো না? এক্ষুনি পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেতে। মচকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কমনসেন্সের অভাব হলে যা হয়! ”
মিষ্টি বারকয়েক পলক ঝাপটায়। পিটপিট করে তাকাল। রাহাতের ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলা কথায় ওর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে গোমড়া মুখে সিরিয়াস গলায় উত্তর দেয়,
” আমার সেন্স আছে। শুধু দরকারের সময় কাজ করে না। ”
রাহাত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। অত্যাধিক লজিকল্যাস কথায় ভড়কালো অল্পস্বল্প। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলো। ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রাশভারী গলায় শুধাল,
” ঠিক, দরকারের সময় তোমার সেন্স কাজ করা বন্ধ করে দেয়। তার প্রুফ চক্ষু সম্মুখে। ”
মিষ্টি তব্দা খেলো। বুঝতে না পেরে তুরন্ত ছটফটে স্বরে জানতে চাইল,
” কোথায় প্রুফ? কিসের প্রুফ? ”
রাহাতের সাবলীল স্বীকারোক্তি,
” ক্লাস চলছে আর তুমি এখনো এখানে! ”
মিষ্টির মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটলো না। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। রাহাত অবাক হলো ভীষণ। কিছুটা রাগ মিশ্রিত গলায় বলল,
” ক্লাস করবে না? ”
মিষ্টি উদাসীন ভাবে জানায়,
” ক্লাস করে কি হবে? ভবিষ্যতের জামাই পাত্তা দিচ্ছে না। ”
রাহাত সরু নেত্রে তাকাল একপল। অতঃপর শাসনের ন্যায় আওয়াজ তুলল ভরাট কন্ঠে,
” পরীক্ষায় ডাব্বা মারলে তোমার ভবিষ্যৎ জামাই আরো বেশি পাত্তা দিবে না। সো ফোকাস অন ইয়োর স্টাডিজ। ”
মিষ্টি চোখ বড়ো করে চঞ্চল কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
” ভালো রেজাল্ট করলে পাত্তা দিবে সে? ”
রাহাত ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল। ভাবলেশহীন ভাবে গমগমে গলায় বলল,
” দিতেও পারে। ”
মিষ্টি আচানক লাফিয়ে উঠে। হাত তালি দেয় স্বীয় করতলে। রাহাত চোয়াল শক্ত করে সজোরে ধমকে উঠলো,
” এটা ভার্সিটি, তোমার মাথায় রাখা উচিত। ”
মিষ্টি ঠোঁট এলিয়ে সহসা জিভ কাটল। মেকি হেসে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে ওঠে,
” জামাই কবে পাত্তা দিবে আপনি জানেন? ”
রাহাত বিরক্ত ভঙ্গিতে কটাক্ষ করে জবাব দেয়,
” তোমার যা ব্রেইন আর তুমি যা খামখেয়ালী মেয়ে! এরকম করলে কক্ষনো সে পাত্তা দিবে না।”
মিষ্টি ঘোর বিরোধিতা করে। ভাব নিয়ে জানালো,
” হুহ! আমি ভালো স্টুডেন্ট। ”
” তাই নাকি? ”
” অবশ্যই। ”
” বলো তো ডগ অর্থ কি? ”
” কুত্তা। ”
” হয়নি। ”
” কেন হবে না? ”
” রং অ্যানসার। ”
” রাইট টা বলুন? ”
” কুকুর। ”
মিষ্টি মুখ বাঁকায়। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। আঙুল উঁচু করে দাম্ভিক সমেত বলল,
” কে বলেছে হয়নি? আপনি বাংলায় বলেছেন কুকুর, আর আমি হিন্দিতে বলেছি কুত্তা। একই, বুঝেছেন? ”
রাহাতের চাহনি বিহ্বলিত নয়। দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত আবেগ। মুখমণ্ডল জুড়ে লেপ্টে রয়েছে মুগ্ধতা। মিষ্টির নাক কুঁচকে, ঠোঁট চোখা করে, হাত নেড়ে নেড়ে বলা বাক্যে মনের কোণে শিহরন জাগ্রত হলো। গ্রীবা অন্যদিকে বাঁকিয়ে একপেশে হাসল। পরক্ষণেই চটে যাওয়া রমণীর দিকে তীর্যক ভাবে চেয়ে চওড়া গলায় বলল,
” বুঝেছি। নাউ, গো টু ইয়োর ক্লাসরুম। ”
কথার ইতি টেনে রাহাত পিছু ফিরে হাঁটা ধরল। কয়েক কদম এগিয়ে অকস্মাৎ বাড়ন্ত পা যুগল স্থির করল। পরপর ঘাড় ঘুরায়। প্রকৃতির মতো হুটহাট নিমিষে বদলে গেল অভিব্যক্তি। মিষ্টি ঔৎসুক হয়ে তাকিয়ে। অচিরেই মেয়েটার পানে গভীর দৃষ্টিপাত করে ধাতস্থ গলায় জিজ্ঞেস করল রাহাত,
” হৃদয়ে কারো জন্য সত্যিকারের অনুভূতি রয়েছে? ”
নিরুদ্বেগ হয়ে ঠোঁট উল্টালো মিষ্টি। নির্দ্বিধায় জানালো,
” আছে। ”
রাহাত চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানল। শান্ত নয়নে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকল কিয়ৎপরিমাণ। পরপর ভণিতা ছাড়া সাবলীল কঠোর গলায় অঢেল উত্তর দিল,
” একপাক্ষিক সুপ্ত অনুভূতি হৃদয়ে লালন করা বোকামি মিস মিষ্টি। মরীচিকা বোঝো? আমি সেটাই। আমার পিছে ঘুরঘুর করে লাভ নেই। সময় আছে শুধরে যাও। তুমি যেটা চাইছো, সেটা সম্ভব নয়। অতিরিক্ত যন্ত্রণা পাওয়ার আগে ফিরে যাও নিজস্ব জায়গায়। নয়তো না পাওয়ার তীব্র কষ্ট ভোগ করতে হবে। ”
আকস্মিক একেবারে ছুড়ে মারা একটা বাক্য, যা কামানের গোলার মতো এসে আঘাত করল মিষ্টি’কে। নিমিষে ভেঙে খানখান হয়ে গেল অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য উপভোগ করা আনন্দ। অচিরেই হারিয়ে ফেলল মনের জোর। বিলুপ্ত হলো ঠোঁটের ঝরঝরে প্রানবন্ত চমৎকার হাসি। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। পল্লব কিঞ্চিৎ নড়লো। বক্ষঃস্থল কেঁপে ওঠে পাষাণ যুবকের ধারালো বাক্যবাণে। চলে যাচ্ছিল, নিজ গন্তব্যে প্রস্থান করতো। কি দরকার ছিল পিছু ফিরে আচমকা এসব কথা বলার? এখন যে মিষ্টির হৃদয়ে প্রচন্ড বিদীর্ণ সুক্ষ্ম ব্যথা দিয়েছে, তার কি হবে? নিঃশ্বাস মনে হয় আটকে গিয়েছে!
রাহাত নিস্প্রভ দৃষ্টিতে ভগ্নহৃদয়ের, টলমটলে চাহনির মিষ্টির কাতর মুখাবয়ব দেখল। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলো না। সে এক পাথর, নিষ্প্রাণ, অনুভূতিহীন মানব। মিষ্টি যখনই কাছ ঘেঁষতে চায়, সে দূরে সরে যায়। ঠান্ডা দৃষ্টি, বিরক্তি মাখানো স্বর, কথার ছলে অনাহুত করে দেওয়া শ্লেষ! ব্যবহার দ্বারা বুঝিয়ে দেয় মিষ্টির অস্তিত্বই তার জন্য এক যন্ত্রণা। কিন্তু মিষ্টির হৃদয়ে রাহাত অবিচ্ছেদ্য এক নাম, এক ধ্রুব সত্য।
মিষ্টি জানে, ভালোবাসার মর্যাদা সব হৃদয়ে একরকম হয় না। তবু তার হৃদয় বড্ড বোকা। রাহাতের প্রতিটি নির্লিপ্ততা, প্রতিটি উপেক্ষা ওর ভেতরে ঝড় তোলে। একান্ত চাওয়া ছিল একটু স্নেহ, একটু উষ্ণতা। অথচ সে পায় শুধু শীতলতা, রূঢ়তা, অন্তহীন অবহেলা।
মিষ্টি’কে একপ্রকার অবজ্ঞা করে রাহাত আপন ছন্দে নিজস্ব পথ ধরেছে। এদিকে তখন থেকে স্থির দাঁড়িয়ে আছে মিষ্টি। ব্যাকুল হৃদয় বেদনার ক্ষতে জর্জরিত। চোখে মুখে অস্তিত্বহীন ব্যথার সুপ্ত অবয়ব। জলে টইটম্বুর নয়ন জোড়া মেলে নির্দয় যুবকের উপর নিবদ্ধ।
ভার্সিটির সীমানা ত্যাগ করার সময় রাহাত ফের বিনাবাক্যে সেদিকে চাইল একপল। ওর প্রকট চাহনি ভাষাহীন শূন্য। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভঙ্গুর সত্তাটাকে অতিক্রম করতে করতে নরম স্বরে বলল,
” সরি মিস মিষ্টি। কখনো হাসতে ভুলো না। হাসলে তোমায় দারুণ লাগে। ”
সকাল থেকে অরুর পেটে দানাপানি পড়েনি। হ্যাভেন হোটেলে ব্রেকফাস্ট করানোর প্রস্তাব দিলেও, অরু বিমুখ হয়েছিল। তখন ক্ষুধা অতটা দগদগে ছিল না। কিন্তু এখন? এখন মনে হচ্ছে ক্ষুধার আগুনে পাকস্থলী পুড়ছে, অন্ত্র গলে গিয়েছে, এবং পেটের ভেতর ক্ষুব্ধ ইঁদুরের দল ছুটোছুটি করছে এক অন্তহীন বিদ্রোহে।
সময়টা লাঞ্চ টাইম। যদিও ভার্সিটির পরবর্তী ক্লাস বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবুও শরীরের এই রকম অবসন্নতা সহ্য করা দুরূহ। পরবর্তী ক্লাস করার ইচ্ছে নেই। মিষ্টির হাত ধরে বেরিয়ে এলো ক্যাম্পাস থেকে। উদ্দেশ্য লাঞ্চ করে বাড়িতে ফিরবে। পরবর্তী ক্লাসগুলো করবে না। ভার্সিটির কাছাকাছি পনেরো-বিশ মিনিট দূরত্বের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টের কথা মনে পড়ল। হেঁটে যাওয়া মুশকিল! শরীর সায় দিচ্ছে না। চারপাশে গাড়ি খুঁজল, পেলো না। হাঁটা শুরু করল উদ্দেশ্য অনুযায়ী। কিছুদূর যেতেই একটা খালি রিকশা গাড়ি পেয়ে চোখ দুটো চকচক করে উঠল অরুর। তৎক্ষনাৎ উঠে বসলো মিষ্টি’কে সাথে নিয়ে। নামকরা জায়গা। কর্পোরেট, উচ্চবিত্তদের আনাগোনা লেগেই থাকে। মার্বেলের চকচকে মেঝে, ঝুলন্ত ঝাড়বাতির স্বর্ণাভ আভা, সুগন্ধি মেশানো বাতাস, সব মিলিয়ে এক প্রাচুর্যের রাজ্য যেন।
রেস্টুরেন্টে পৌঁছে ভেতরে পা রাখতেই প্রশান্তির এক অনুভূতি হলো। গুমোট ক্ষুধা সাময়িকভাবে ভুলে গেল। একপাশে মখমলের নরম সোফা, অন্যদিকে কাচঘেরা এলাকা, সেখানে বসলে শহরের ব্যস্ত রাস্তা দেখা যায়। হালকা স্যাক্সোফোন মিউজিক বাজছে পটভূমিতে, যার তাল মিশে যাচ্ছে পরিবেশের বিলাসী আবেশের সঙ্গে।
অরু আর মিষ্টি একটা কোণার টেবিলে বসলো। ওয়েটার এগিয়ে এলো। জানতে চাইল বিনম্র সহিত,
” অর্ডার প্লিজ, ম্যাম? ”
অরুর ক্ষুধার জ্বালা ততক্ষণে দিগুণ হয়ে উঠেছে। মেন্যুতে চোখ বুলিয়ে বলল,
” বিফ স্টেক, গ্রিলড চিজ স্যান্ডউইচ, মাশরুম স্যুপ, গার্লিক ব্রেড, আর এক গ্লাস কোল্ড কফি।”
ওয়েটার মুচকি হেসে মাথা নেড়ে চলে গেল। সে যেতেই মিষ্টি প্রাণহীন আলতো হাসল। বিরস মুখে জিজ্ঞেস করলো,
” এত খাবি? ”
অরুর ফটাফট জবাব,
” খিদে পেয়েছে, প্রচণ্ড। তুই আছিস না? ”
” আমি কি রাক্ষস? এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ”
” একদিন খেলে কোনো সমস্যা নেই। ”
মিষ্টি ওয়েটার’কে ডেকে একটা চিকেন গ্রিল আর অরেঞ্জ জুস নিলো। অরু ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
” খাবার নাকি বেশি অর্ডার করে ফেলেছি, এখন চিকেন আনতে বললি কেন? ”
মিষ্টি তপ্ত শ্বাস টেনে জানায়,
” তোর জন্য। ”
অরু বিস্মিত হলো। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবুক চিত্তে স্থুল ভরাট স্বরে বলল,
” আমি বলেছি চিকেন খাবো? ”
” বলিস নি, আমি নিজে থেকেই দিলাম। বেশিরভাগ তুই অর্ডার করিস। ভাবলাম আমি কিছু একটা অর্ডার করি। ”
অরু ফিক করে হেসে ফেলল। মিষ্টির মাথায় গাট্টি মেরে চাপা স্বরে আওড়াল,
” গাঁধি! ”
মিষ্টির ঠোঁটে হাসি নেই। মুখখানা চুপসে আছে। থমথমে হয়ে নিশ্চুপ বসে। অরুর ভালো লাগলো না। উড়নচণ্ডী মিষ্টি’কে এমন নির্লিপ্ত, নির্বিকার মানায় না। রুষ্ট গলায় বলে ওঠে,
” ওই? কি হয়েছে তোর? ”
মিষ্টি হকচকিয়ে যায়। ঈষৎ ঘাবড়ে গেল। উচাটন শরীর নিয়ে প্রত্যুত্তর করে,
” কি হবে? ”
” মনমরা হয়ে আছিস কেন? ”
” কিছু না। ”
” বললেই হলো? ফার্স্ট ক্লাস মিস দিয়েছিস। সেকেন্ড ক্লাসের সময় ফিরে এসেও গোমড়া মুখে থেকেছিস। পুরো ক্লাসে অমনোযোগী ছিলি। কোনো বিষয়ে টেনশনে আছিস? ভাইয়া কিছু বলেছে? এনি প্রবলেম? ”
মিষ্টি জোর করে হাসার চেষ্টা করল। ব্যাকুল হয়ে হতাশ কন্ঠে বলল,
” নো প্রবলেম। নাথিং সিরিয়াস। ”
এরইমধ্যে ওয়েটার খাবার দিয়ে যায়। খাবার দেখে অরুর খিদে পূর্বের তুলনায় আরও বেড়ে গিয়েছে। ফটাফট চিকেনে কামড় বসায়। পরপর স্যুপের বাটি হাতে তুলে নিলো। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার মানুষের ন্যায় খাবার খাওয়া চলছে তার, কিন্তু মিষ্টি তেমন কিছু খাচ্ছে না। অল্প একটু চিকেন খেয়েছে, আর অরেঞ্জ জুস। যতটুকু সম্ভব হয়েছে অরু পেট ভরে খেয়েছে। ক্ষুধা বেশিপরিমাণ ছিল। খাবার অপচয় হয়েছে বেশ কিছুটা। পানি খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল নিমিষে। টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নেয়। কয়েক মিনিট বিশ্রামের আশায় পৃষ্ঠদেশ এলিয়ে দিল চেয়ারে। অরু বসে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তির মধ্যে, তবে সেটি মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেল এক অদ্ভুত দৃশ্যপট নজরে ভেসে উঠতেই। হঠাৎ চক্ষু সম্মুখে অপ্রত্যাশিত মুখাবয়ব দেখে, পলকেই অনুভূতির অগ্নি স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে গেল রক্তকণিকায়।
ওদের লাইনের সরাসরি সামনের বাম পাশের টেবিলেই বসে আছে হ্যাভেন। মাঝখানে পর্দা টাঙানো। ফ্যানের বাতাসের দাপটে পর্দার ফাঁক গলিয়ে দেখা যাচ্ছে চিরচেনা মুখ। পাশের চেয়ারে একদম কাছাকাছি এক সুন্দরী রমণী বসে। অরু তাকে চেনে না। কখনো দেখেনি। দুজন হাসাহাসি করে কথা বলছে আর খাবার খাচ্ছে। কথা বলার মাঝে মেয়েটি হ্যাভেনের ব্রাশ করা চুলের মধ্যে ছোট একটা ময়লার টুকরো দেখে, সেটা হাতে সরিয়ে দিল। এতে হ্যাভেন আপ্লূত হয়। ওদের হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা এবং মেয়েটির এমন কাজে অরুর পিত্তি জ্বলে উঠল। রগে রগে আগুন ছড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটির হাসিতে, ভঙ্গিতে, চোখের চাহনিতে রয়েছে এক স্নিগ্ধতা। পড়নে ওয়েস্টার্ন ড্রেস। নিঃসন্দেহে রমণীটি অরুর থেকে শতগুণ সাদা সুন্দর। গায়ের চামড়া মুলার মতো বাহ্যিক সৌন্দর্যের অধিকারী। মুখমন্ডলের অবকাঠামো মারাত্মক সুন্দর। চুলগুলো সোনালি রঙের। যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঠাঁই পেয়েছে কাঁধ পর্যন্ত। চুলে মিনি সাইজের দুটি ডল ক্লিপ লাগানো। হাসিতে যেন মুক্ত ঝরছে। চকচকে সাদা দন্তপাটি।
হ্যাভেন হাসছে। গা জ্বালানো হাসি। গভীর, আন্তরিক, সুরেলা, যেন সেই মেয়েটির বলা প্রতিটি বাক্য তাকে মোহিত করে দিচ্ছে। তাদের কথোপকথন অরুর কানে আসছে না, কিন্তু দৃশ্যের ভাষা এতটাই স্পষ্ট যে, শব্দের প্রয়োজন নেই। অরুর দেহ-মনে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এ মুহূর্তে পেটে ক্ষুধা থাকলে হারিয়ে যেত এক অসহনীয় তাপে। মনের ভেতর আগ্নেয়গিরির লাভা ফুলে উঠছে, যেন বিস্ফোরিত হতে চায়, কিন্তু চারপাশের পরিবেশ বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অরু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে কপাল কুঁচকে ভাবনায় বিভোর। হ্যাভেন অফিস রেখে মেয়েটার সঙ্গে এখানে কি করছে? লাঞ্চ অফিসে বসে করে সর্বদা, অরু সেটাই জানে। তাহলে? মেয়েটার সাথে এত হেসে হেসে কথা বলার কি আছে? অরুর সামনে এই হাসি তখন কোথায় লুকিয়ে থাকে? বউ ছাড়া পর নারীর সামনে এত হাসা, স্বীয় নারীর বিশেষত্ব রইল কোথায়? এই অন্তরঙ্গতা কি কেবল সৌজন্য, না কি এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক তপ্ত প্রবাহ?
অরু মুখ ঘুরিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে। পরপর তাচ্ছিল্য হাসল। হ্যাভেনের চরিত্রে সমস্যা আছে, এটা তো জানা কথা। যা খুশি করুক, যেখানে খুশি যাক, তাতে ওর কি? ও কেন এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবে? জবরদস্তি বিষয়টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার বৃথা চেষ্টা চালাল। বরাবরই ব্যর্থ হলো অরু। না চাইতেও বেহায়া নজর ওদের দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে প্রশ্নের ঝড় উঠেছে। একসঙ্গে অভিমান, রাগ, কষ্ট, এবং ঘৃণার এক জটিল সাইক্লোন বইতে লাগলো মনের মধ্যে। হ্যাভেন এখনও খেয়াল করেনি অরু’কে। হয়তো দেখলে সাফাই দিতে চাইবে। সংযত হবে, হয়তো হবে না।
সহ্যশক্তির সীমা লঙ্ঘন হচ্ছে। এক মুহূর্ত দেরি করল না। বিল পরিশোধ করে মিষ্টি’কে নিয়ে রেস্টুরেন্টে হতে তুরন্ত বেড়িয়ে পড়ল অরু। মিষ্টি নিজস্ব যাত্রা পথের চলন্ত বাস গাড়ি পেয়ে, সেটায় উঠে পড়ে। সে চলে যেতেই অরু পুনরায় রিকশা গাড়ি ভাড়া করে নিলো। জাহান্নামে যাক, হ্যাভেনের দামী গাড়ি আর তার ড্রাইভার! শয়তান লোকের গাড়ি দিয়ে যাতায়াত করবে না ও।
অরুর অন্তরে এক অনির্বচনীয় বিরস বিষাদ দহন হয়ে উঠল। হৃদয়ের দাহ্যতন্তুতে একসঙ্গে রাগ, দুঃখ, হতাশা ও উৎকণ্ঠার অগ্নিসংযোগ ঘটলো। চোখের পলকে অনুভূতিগুলো এক অদৃশ্য দহনযন্ত্রের মতো তাকে গ্রাস করল। বিবমিষা মিশ্রিত বিরক্তি আর হৃদয়গ্রাহী শূন্যতা ওর অস্তিত্বকে এমনভাবে বিদ্ধ করল, যেন চেতনার সমস্ত কোষ সংবেদনশীল ক্ষতস্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। মুখবিবরের তীক্ষ্ণতা তখন অসহ্য হয়ে উঠছিল। অরুর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। দাঁত একে অপরকে চূর্ণ করতে উদ্যত হলো, অথচ ঠোঁটের কোণে নীরব বিষ জমা হতে লাগলো। জিহ্বার স্পন্দন অবরুদ্ধ হয়ে গেল, কণ্ঠনালীতে একরাশ দগ্ধ বিষাদ গুঁজে বসেছে, যা বের হতে পারছে না, আবার গিলে ফেলারও উপায় নেই। গলবিলের তন্ত্রীগুলো অস্ফুট চিৎকারের জন্য ফড়ফড় করলেও, মুখের কোণে জমাট বাঁধা অভিব্যক্তির কঠিনতায় তা ফুটে উঠতে পারলো না।
অরু বারবার মন, মস্তিষ্কের ভেতর চাপ প্রয়োগ করল। নীরবে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাবে। ও কেন ভাবতে যাবে এসব আজাইরা ভাবনা? হাহ! অরু পাত্তা দিবে না অদৃশ্য ভাঙাচোরা লেইম সম্পর্ককে! পরমুহূর্তে কঠোর দ্বিধাহীন ভাবে বেঈমানী করে বসলো উৎকন্ঠিত বক্ষঃস্থল। সে মানতে নারাজ। অরু’কে রীতিমতো কড়া ভাবে শাসাচ্ছে, যত যাইহোক হ্যাভেন তোর হাসব্যান্ড। অন্য নারীর প্রতি আকর্ষিত হতে দিচ্ছিস কেন? তাকে আঁচলে বাঁধতে পারিস না কেমন মেরুদণ্ডহীন ওয়াইফ তুই?
অরু চোখ খিঁচে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে। শিরায় শিরায় প্রচুর যন্ত্রণা হচ্ছে। নীল রগ ফুলে টান টান হয়ে গিয়েছে। মন, মস্তিষ্কের সঙ্গে যুদ্ধ করে সর্বশেষ অজান্তেই বাধ্য হয়ে বশিভূত হৃদয়হীনের কথা শুনল। মুখশ্রী কাঠিন্য রূপ ধারণ করল সহসা। দাঁতে দাঁত পিষে কিড়মিড় করে উঠে। একা একা স্বীয় অভিযোগ সাজিয়ে বিস্ময়াপন্ন ভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
প্রেমপিপাসা পর্ব ২০
” আমাকে মিথ্যা বলা? আজ আসুক বাড়িতে, বজ্জাত লোকের একদিন আর আমার যতদিন লাগে। শালার জামাই, স্বামীর অধিকার দিতে চাইলে ফিরিয়ে দেয়। ভদ্রলোক মহান ব্যক্তিদের মতো ভাষণ শুরু করে বলে, আমার চোখে ভালোবাসা দেখতে পেলে বিনিময়ে ভালোবাসা ফেরত দিবে। এদিকে চুপিচুপি আমার দৃষ্টির অগোচরে অন্য মেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে? বিয়ের পর আমাকে কোথাও ঘুরতে নেয়নি। লাঞ্চ কিংবা ডিনার করতে অফার করেনি। তা কেন করবে? সকালেই তো বলল ঘরের বউ থেকে বাইরের মেয়ে নাকি হট বেশি! অসহ্যকর লোক! বাড়িতে বউ রেখে বাইরের মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। অথচ বাড়িতে আমার সামনে ভালো মানুষ সাজে! চরিত্রহীন একটা। আর ওই সাদা বেড়াল মেয়ের খবর আছে। ওর চুল কুঁচিকুঁচি করে কেটে আমি শাক রান্না করে খাবো। নির্লজ্জ মেয়ে মানুষ। পরের জামাইর দিকে নজর দেয়! বিবাহিত ছেলে, ঘরে বউ থাকা সত্ত্বেও তার কাছ ঘেঁষে কিভাবে? শাঁকচুন্নি মহিলা! ”
