Home প্রেমপিপাসা প্রেমপিপাসা পর্ব ২৩

প্রেমপিপাসা পর্ব ২৩

প্রেমপিপাসা পর্ব ২৩
সুমাইয়া সুলতানা

” অরু’কে মেরে ফেলব আমি! ”
হ্যাভেনের অভিব্যক্তি, উত্তেজিত মূলক গমগমে চওড়া কন্ঠে ফোনের অপর প্রান্তের মানুষটার কোনো হেলদোল নেই। সে হাই তুলে ভ্রুক্ষেপহীন জবাব দিল,
” অল দ্য বেস্ট। ”
” মজা নিচ্ছিস? ”
” একদম না। ঘুম পাচ্ছে ইয়ার। ”
হ্যাভেন গর্জে উঠল। রাগান্বিত সুরে বলল,
” লাথি মেরে তোর ঘুম ছোটাবো। ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে অরু’কে কয়েকজন বখাটে ছেলেরা পথ রোধ করেছিল, অথচ আমাকে একটি বারের জন্য জানানোর প্রয়োজনবোধ করল না। রাগ লাগবে না বল? ”
” ভুলে গিয়েছে হয়তো। ”

ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে রাশভারী গলায় বলে ওঠে হ্যাভেন,
” তোর শা*উ**! ইচ্ছে করে বলেনি। ভালো করে চেনা আছে আমার। কি ভেবেছে, ও না বললে আমি জানতে পারবো না? যদি ভালোমন্দ কিছু হয়ে যেত, তখন? ”
ফোঁস করে ভারিক্কি শ্বাস টানল ফোন কলে থাকা অপর ব্যক্তি। অসহায় মুখভঙ্গিতে প্রত্যুত্তর করল তৎক্ষনাৎ,
” তোর বউয়ের রাগ আমার মতো নিষ্পাপ বাচ্চার উপর ঝাড়ছিস কেন ভাই? আমার কি দোষ? ”
” তো কাকে বলবো? ধানিলংকা’কে কিছু বলতে গেলেই গরম তেলে পেঁয়াজ কুঁচি ছাড়ার মতো ছ্যাৎ করে ওঠে। দেখি নিজে থেকে বলে কি না, না বললে ওকে যে কি করবো আমি নিজেও জানি না। ”
চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে হ্যাভেনের। হাত মুষ্টিবদ্ধ করল সহসা। ঘনঘন শ্বাস টানছে। ব্যক্তিটি সবটা শুনল। অতঃপর তিরিক্ষি মেজাজ সহিত বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” তোর বউ যা খুশি কর, আমাকে বলছিস কেন? এমনিতেই নিজের জ্বালায় বাঁচি না। ”
হ্যাভেন ভ্রু কুঁচকে ফেলল। রূঢ় সুরে জানতে চাইল,
” তোর আবার কি হলো? ”
” লিভ ইট। হৃদয় গঠিত ব্যাপার। ”
বলেই মানুষটা কল কেটে দিল। হ্যাভেন হ্যালো, হ্যালো করল বারকয়েক, বাট নো রেসপন্স! কিভাবে রেসপন্স আসবে? সে তো কল কেটে দিয়েছে। হ্যাভেন ফোনটা ছাদে ছুঁড়ে মারতে চেয়েও মারল না। কাছের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে একাকিত্ব কথা বলার দরুন ছাদে এসেছিল। এতে যেমন গোপনীয়তা বজায় থাকবে, আবার মন খুলে কথোপকথন চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
ছাদের এক সাইডে কিটকিট হাসির আওয়াজে সেদিকে দৃষ্টিপাত করল হ্যাভেন। সায়র দাঁড়িয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে, আর হাসছে। হ্যাভেন ভাবুক চিত্তে এগিয়ে যায়। এতক্ষণ সায়র’কে খেয়াল করেনি। কখন এসেছে জানা নেই। কাছাকাছি আসতেই শুনতে পেলো সায়রের ফিচেল স্বর,

” অঙ্কু জানটুস, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো। ”
” এই জানটুসটা কে রে? ”
হ্যাভেনের গুরুগম্ভীর ভয়েসে সায়র হকচকিয়ে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে নজর রাখল বড়ো ভাইয়ের রুষ্ট আদলে। অমনি চক্ষু জোড়া প্রসারিত হলো। শুষ্ক ঢোক গিলল নিমিষে। জিভ দ্বারা ঠোঁট ভিজিয়ে জোরপূর্বক হেসে জানায়,
” কেউ না ভাই। ফ্রেন্ড হয়, এমনি দুষ্টুমি করছিলাম। ”
হ্যাভেন সন্দীহান তীক্ষ্ণ চাহনি নিক্ষেপ করে ভরাট কন্ঠে শুধাল,
” বুঝলাম। কিন্তু তুই রাতের বেলা বরফ হাতে ছাদে কি করছিস? ”
সায়র থমথমে খায়। পরপর মেকি হাসল। ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে ঠোঁট উল্টে উত্তর দেয়,
” আর বলো না, রাত হলেই যৌবন ডিস্টার্ব করে!”

অরুর প্রতিদিনের জীবন যেনো এক ছায়াঘেরা অন্ধকার। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে সম্পর্ক বাঁধা পড়েছে, সেটাকে মেনে নিতে অরুর মন একদমই প্রস্তুত নয়। তবে এখন সে বারবার চেষ্টা করেছ মেনে নিতে এবং মানিয়ে নিতে। কিন্তু প্রতিবারই যেন এক অনুপ্রবেশকারী হয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে। তার অন্যতম কারণ, কিছু সুক্ষ্ম চিন্তাভাবনা আর দোটানা। অরু হ্যাভেনকে নিজের দেয়ালের বাইরে রাখতে চায় না, তার থেকে নিজের ক্ষতগুলো আড়াল করতে চায় না, প্রকাশ করতে চায়। হদয় থেকে চায়, কেউ ভালো না বাসুক, কেউ আপন না হোক, অন্তত একজন থাকুক যে অরুর কন্ঠস্বর শুনলেই বুঝতে পারবে ও ভালো নেই। যেভাবেই হোক বিয়ে হয়েছে। তাই সেই একজন স্বয়ং স্বামী কি হতে পারে না? কিন্তু হ্যাভেন গভীর জলের মাছ। না নিজেকে উন্মুক্ত করে, আর না তো অন্যকে উন্মুক্ততা দেখাতে দেয়! নিজের মর্জিতে সবটা করতে পছন্দ করে।

অরু কোনো গভীর ভাবনায় নিমগ্ন। বারান্দার রেলিংয়ে নিঃশব্দে হাত রাখে সে। চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের শূন্যতা। প্রশান্ত বাতাস তার কেশপাশে ক্ষীণ আন্দোলন সৃষ্টি করে, অথচ অন্তর্গত চিন্তার ভারে সে যেন অনুভূতিহীন। মস্তিষ্কের নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে দহনক্রিয়ায় লিপ্ত, চিন্তার ঘূর্ণাবর্তে চাপ সৃষ্টির ফলে স্নায়ুতে এক অদৃশ্য বিদ্যুৎপ্রবাহ প্রবাহিত হয়। সময়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণিকাগুলো যেন অরুর চেতনার প্রান্তসীমায় ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলছে। শিরা-উপশিরায় রক্তস্রোত স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে অবচেতনের অতল গহ্বরে প্রবাহিত হচ্ছে। জটিল ভাবনার নিগূঢ় ভারে স্নায়ুতে একপ্রকার বিষণ্ন অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে। চিন্তার অতল গভীরে নিমজ্জিত হয়ে সে নিজের অস্তিত্বের পরিধি নির্ণয়ের চেষ্টা করছে, তবে উত্তর অধরাই থেকে যাচ্ছে। একে একে সম্ভাব্য প্রশ্নগুলো মনের ক্যানভাসে আঁকা হতে লাগলো।

অরুর কানে বাজছে হ্যাভেনের বলা বিগত কিছু বাক্যবহর,
” ত্রিশ টা বছর ধরে সিঙ্গেল কমিটির সভাপতি হয়ে থাকতে থাকতে আমার তাগড়া যৌবন টা কেমন নেতিয়ে পড়ছিল। আর ভার্জিন স্বামী পেয়েছো! ”
লোকটা নিজেকে সিঙ্গেল দাবি কেন করল? কথার ধরণ আর নিগূঢ় চাউনিতে একবারও মনে হয়নি মিথ্যা বলছিল। মনে হয়েছে সবটা সত্যি। যার বিয়ে হয়েছে, চোখের সামনে পাঁচ বছরের তরতাজা একটা ছটফটে ছেলে রয়েছে, সে সিঙ্গেল হয় কিভাবে? আর বিয়ের দ্বিতীয় দিন নিজেকে ভার্জিন বলেছিল! তারমানে হ্যাভেন বিবাহিত না? কিন্তু লোকটাতো এটাও বলেছিল, পূর্বে বিয়ে করা সত্ত্বেও পিউর ভার্জিন স্বামী পেয়েছো! এর অর্থ আগে বিয়ে করেছে আরেকটা? এখন আবার বলছে এ পর্যন্ত সে সিঙ্গেল?

ওহ, শীট! মিলছে না, কোনো হিসাব মিলছে না। সবটা এলোমেলো লাগছে। যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আর ভাবতে পারছে না অরু। সমস্ত কিছু একটা গোলকধাঁধা। সবকিছু ধোঁয়াশা। তবে অরু’কে কেন ধোঁয়াশায় রেখেছে? এতে কি লাভ? বজ্জাত লোকটার এ কেমন রহস্য? কে উদ্ভোদন করতে পারবে এই রহস্যময় পুরুষের আসল সত্যি? কার কাছে যাবে অরু? কে ওকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে? যদি কেউ জেনেও থাকে, সে কি বলতে রাজি হবে?

গভীর রাত্রি। এ সময়ে রাতের পরিবেশ এক রহস্যময় নিঃসঙ্গতায় আচ্ছন্ন। চারপাশে এক অস্বাভাবিক স্তব্ধতা। চাঁদের ফ্যাকাসে আলো নিস্তেজ ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, আর বাতাসে মৃদু এক ঠাণ্ডা ঠোঁটের মতো শীতলতা ভেসে আসছে। গাছের পাতাগুলো যেন নিজস্ব অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে। পাতাগুলোর তীক্ষ্ণ কোণগুলো সেগুলোর অতি সূক্ষ্ম খাঁজের মধ্যে আটকা পড়েছে। বাতাসের সাথে আকাশ থেকে এক নিঃশব্দ গর্জন কেমন ভেসে আসে, মনে হয় সুবিশাল আকাশ এক গভীর রহস্যের প্রতীক্ষায়। বাগানের ফুলগুলো তাদের সুবাসের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে এক নিথর অবস্থায় স্থির হয়ে আছে, পাপড়ির কোমলতা কোনো রূপকথার বিরতি হিসেবে থেমে আছে।

গাছের শাখাগুলো তীক্ষ্ণ ভাবে হালকা ঝিরঝির আওয়াজে কাঁপছে, তাদের চূড়াগুলো পৃথিবী থেকে বহু দূরে এক অদৃশ্য আকর্ষণে ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে কোথাও একটা পাখির ডাকা কানের মধ্যে এক অস্বস্তিকর গড়গড় করে ঢুকে পড়ছে, আর স্বপ্নের মাঝখানে টুকরো টুকরো বিভ্রান্তি। সদূরে টলমলে পুকুরের জল একটুও নড়ছে না, তার উপর চাঁদের প্রতিবিম্ব এমনকি বাতাসের প্রতিটি দোলা পর্যন্ত অনুপ্রবিষ্ট হচ্ছে, যেন কিছুই স্পর্শ করতে পারছে না। সারা বাগান এক কাল্পনিক অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, এবং সব কিছু এক অদ্ভুত ভাবে নীরব, এক গভীর শূন্যতায় আটকা পড়েছে।

বাড়ির বাগানে থমথমে পরিবেশ নিমিষেই ভারী হয়ে উঠল অরু এবং টুটুলের আসমান কাঁপানে বাজখাঁই চিৎকারে। দুজন মুখোশ পড়া লোক টুটুল’কে নিয়ে যেতে চাইছে, তাই অরু তাদের যতটা পারছে আটকানোর চেষ্টা করছে এবং সমান তালে চেঁচাচ্ছে। এক প্রকার ধস্তাধস্তি জাবরদস্তি শুরু হয়ে গিয়েছে তাদের মধ্যে। দুজন দাগড়া পুরুষের সঙ্গে একা মেয়ে হয়ে পেরে উঠা চারটি খানিক কথা না! অবশেষে না পেরে হাঁটু দ্বারা একজন পুরুষের অন্ডকোষে আঘাত করে। এতে টুটুল’কে ধরে রাখা হাত শিথিল হয়। অরু তৎক্ষনাৎ ঝাড়া মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলো।

টুটুল বল খেলছিল। খেলার এক ফাঁকে জানালা দিয়ে বল নিচে পড়ে যায়। কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল। অরু’কে বললে মুহূর্তে তাকে নিয়ে বাগানে আসে বল খুঁজতে। তক্ষুনি কোথা থেকে দুজন লোক এসে টুটুলের মুখ চেপে নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। অরু দারোয়ান’কে ডাকলে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তাকিয়ে দেখল, দারোয়ান চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে। হয়তো তাকে কিছু শুকিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়েছে, নয়তো এতবার ডাকার পরও কেন শুনতে পেলো না?
লোক দুজন পুনরায় ওদের নিকট এগিয়ে আসতে উদ্যত হয়, পরক্ষণেই খেয়াল করে দেখল, হ্যাভেন এদিকে আসছে। ফটাফট তারকাঁটা বিশিষ্ট রাউন্ড দেওয়া দেয়াল টপকে চলে যায়। হাতে রাবারের তৈরী ভারী চামড়ার গ্লাভস ছিল বলে, তারকাঁটা করতল বিদীর্ণ করতে সক্ষম হয়নি। অনায়াসে মই বেয়ে দেয়াল টপকে যেতে পেরেছে লোক দুজন।

হ্যাভেন যখন সায়রের সঙ্গে ছাদে দাঁড়িয়ে কথা বলায় ব্যস্ত, অরুর চিৎকার প্রথমে কর্ণকুহরে না পৌঁছালেও কিয়ৎক্ষণ পর আকস্মিক নজর পড়ল বাগানে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তড়িৎ গতিতে একটি গাড়ি ওদের বাড়ির সামনে থেমে, হুড়মুড়িয়ে দুজন লোক বাগানে ঢুকছে। হ্যাভেন ভাবতে পারেনি, এই সময় অরু টুটুল বাগানে রয়েছে। অকস্মাৎ ছায়াগুলোর হাতাহাতি দেখে, অরুর ওড়না নজরে আসতেই তড়িঘড়ি করে ছাঁদ হতে নেমে আসে।

হ্যাভেন দৌড়ে ছুটে এসে স্ত্রী সন্তানকে জাপটে জড়িয়ে করল। বুক কাঁপছে সবেগে। চোখে এক অজানা ভয়, এক অদম্য আতঙ্ক। একটু হলে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল, পৃথিবীটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল। সে নিজের পিছু ফিরে, অন্ধকারের দিকে তাকাল। সন্ত্রস্ত মন, থরথর করা হাত মনে হচ্ছিল, সময় আজ প্রতিকূল ধ্বংসাত্মক হতে হতে অনুকূলে ফিরে এসেছে। নিগূঢ় দৃষ্টিতে, জীবনের সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ একত্রিত হয়ে গিয়েছে। হাতের মধ্যে ছোট্ট শরীরটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছ। সমস্ত অনিশ্চয়তা, আশঙ্কা এবং ঝুঁকি একমাত্র এই মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাবে। শরীরটা ধুঁকছে, বুকের ভেতর কেঁপে ওঠা বীভৎস শব্দ সারা শরীরে ধ্বনিত হচ্ছে। হৃৎপিণ্ডের চাপ বাড়ছে, শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় এক হয়ে গিয়েছে, আবার একটুখানি থেমে গিয়ে আবার গতি পায়। সে নিজেই এক ভারী, কঠিন শব্দ হয়ে যাচ্ছে, যেটি প্রতিটি মুহূর্তে সৃষ্টির শক্তি এবং ভয়ের সম্মিলন। মাংসপেশিগুলো শক্ত হয়ে খুলে উঠেছে, অস্থিরতার মধ্যে সে আর কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু অরু টুটুল’কে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরায় কেবল এক দারুণ শান্তি অনুভূত হলো। সারা শরীরের রক্ত সঞ্চালিত হতে লাগলো এক অদ্ভুত স্থিরতা নিয়ে। এতক্ষণ ধৈর্য্য, এত কষ্ট, এত দীর্ঘশ্বাসের পর একটু লম্বা শ্বাস টানল।

অরু আলগোছে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। পল্লব ঝাপটিয়ে চাইল ভীতিগ্রস্ত হ্যাভেনের মুখবিবরে। ভালো মতো অবলোকন করার পূর্বে শুনতে পেলো হ্যাভেনের পুরুষালী গমগমে আওয়াজ,
” এক্ষুনি টুটুল’কে নিয়ে ভেতরে যাও। ”
অরু মুখ বাঁকায়। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” আশ্চর্য! কি হয়েছে জানতে চাইবেন না? ”
হ্যাভেন চোখ বুজে রাগ সংবরণ করার চেষ্টা চালাল। কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
” জানার ইচ্ছে হলে নিজেই জিজ্ঞেস করতাম। এত রাতে টুটুল’কে নিয়ে বাগানে এসেছ কেন? ”
হ্যাভেন’কে জড়িয়ে কাঁপতে থাকা টুটুল মৃদুস্বরে উত্তর দিল,
” আব্বু, আমার বল নিচে পড়ে গিয়েছিল। সেজন্য বল নিতে এসেছিলাম। ”
হ্যাভেন শান্ত কন্ঠে শুধায়,

” বল সকালে নিলে হতো না? ”
টুটুল নিশ্চুপ রইল। অরুর উদ্দেশ্যে ধমকে উঠল হ্যাভেন,
” দ্রুত বাড়িতে যাও। ”
অরুও ঝাঁজ সমেত ত্যাড়ামি করে বলে,
” না গেলে কি করবেন? ”
হ্যাভেন ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। পরক্ষণেই শয়তানি হাসল। টুটুলের নাকমুখ সহ নিজের পেটের সঙ্গে চেপে ধরে অরুর কানের নিকট ঝুঁকল। আলতো ভাবে কারনে লতিতে কামড় বসিয়ে, ফিচেল গলায় ফিসফিস করে নীরব হুমকি জানালো,

” ডিসিশন চেঞ্জ করলাম। নো টাইমিং! সময়ের মায়রে বাপ! এখন থেকে যখন মুড আসবে তখনই বিনা নোটিশে রোমান্স শুরু করে দেবো। তাতে তোমার সম্মতি থাকুক বা না থাকুক। প্রি-পেয়ার ইয়োরসেল্ফ ইন অ্যাডভান্স অরু পাখি। মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কুইকলি বাড়িতে যাও। নয়তো এই খোলামেলা বাগানকে আমি হানিমুন স্পট বানিয়ে ছাড়ব। ”
অরু চমকে উঠল। অক্ষিপট বড়ো করে তাকায়। কাচুমাচু হয়ে ঘনঘন পলক ঝাপটায়। বিস্মিত হলো ক্ষণে। শুষ্ক ঢোক গিলে আশেপাশে নজর বোলালো। কেউ শুনলে কি ভাববে? অরু মিয়িয়ে এলো। মাথা নেড়ে টুটুলের হাত ধরে চলে গেল। এই লোকের বিশ্বাস নেই, যদি সত্যি সত্যি এখানেই? ছ্যাহ!

হ্যাভেনের রাগ সুনামির মতো, যেটি সমস্ত কিছু গ্রাস করতে চায়। শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা গরম হয়ে উঠল, মনে হচ্ছিল, ভেতরে কোনো আগুন জ্বলছে, যা তার সমস্ত শক্তি এবং মনের একদম গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে। চক্ষু জোড়া লাল রক্তের ছাপ, ঠোঁট কামড়ানো। শ্বাসপ্রশ্বাস বড়ো হতে লাগলো, প্রতিটি শ্বাসের সাথে তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে, কিন্তু সে থেমে থাকল না। বুক চিড়ে নৈঃশব্দ্যে বেরিয়ে এলো এক ভয়ানক গর্জন, মনে হচ্ছে কোনো বীভৎস প্রাণী মুখ খুলেছে। শব্দগুলো বেড়িয়ে আসছিল যেন মাটির গভীর থেকে, এক শক্তিশালী ঝড়ের মতো। হ্যাভেনের পায়ের তলায় মাটি দুলে উঠছে, রাগের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। চোখের সামনে যেকোনো কিছুকে সে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, পৃথিবীটা হ্যাভেনের রাগের আগুনে সেকেন্ডের মধ্যে পুড়ে যাচ্ছে। রাগ শুধু শাবক গর্জন ছিল না, ভেতরের অন্ধকার আর ভয়ঙ্কর শক্তি এক ভয়াবহ আছড়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। মুখে ক্রুদ্ধ শব্দগুলো বেরিয়ে আসছিল একসাথে, যেন কোনো এক অচেনা জ্বালায় ফুঁসে উঠছে। যতটুকু নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল তা শেষ! আর সহ্য করতে পারছে না।

অরু দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে যাওয়ার পর, হ্যাভেন তৎক্ষনাৎ বন্ধুকে কল করল। সে ফোন রিসিভ করতেই তাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সজোরে কর্কশ কন্ঠে হড়বড়িয়ে আদেশ ছুড়ল,
” আমার বাড়ির মেইন রাস্তা ব্লক কর। একটা গাড়ি যাচ্ছে আটকা। ”
বন্ধু ঘুমে কপোকাত। টানা কয়েকদিন রাত জেগেছে, তারউপর অল্পস্বল্প টেনশন, সবমিলিয়ে মাথা প্রচন্ড ভার ভার লাগছে। হ্যাভেনের বারংবার ফোন কলে বিরক্তিতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। রুষ্ট গলায় কটমট করে ওঠে,
” প্রবলেম কি তোর? বাড়িতে অমন ফুলের মতো কিউট একটা বউ থাকতে রাতবিরেতে আমাকে ডিস্টার্ব কেন করছিস? কিছুক্ষণ আগে না কথা বললাম? আবার কি হয়েছে? অরু রুম থেকে বের করে দিয়েছে? দেওয়ারই কথা। যা করেছে একদম ঠিক কাজ করেছে। আমি অরুর সাথে আছি। তোর মতো মিচকে শয়তানকে পাশে রেখে ঘুমানো জাস্ট ইম্পসিবল! ”

হ্যাভেন তেতে উঠে। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড়িয়ে বলে,
” বাজে বকিস না! হা*রা** বাচ্চারা আমার বাড়িতে এসে হাঙ্গামা বাঁধানোর চেষ্টা করেছে। কত বড়ো সাহস খা*ন** পোলার আমার কলিজা গায়ে হাত বাড়ানোর দুঃসাহস দেখায়! ”
এক লাফে শোয়া হতে বসে পড়ল হ্যাভেনের বন্ধু। হাত দ্বারা চোখ কচলে জড়োসড়ো হলো। মুখবিবর বদলে গেল মুহূর্তে। সিরিয়াস ভঙ্গিতে ধ্রুব গলায় প্রশ্ন করে,
” কি হয়েছে খুলে বল। ”
” খুলে বলার সময় নেই। ফাস্ট ইয়ার, গাড়ি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আগে আটকা। ”
” রিলাক্স ম্যান, ডোন্ট ওয়ারি। তোর সাথে কথা বলার মাঝেই টিমের লোকদের ইনফর্ম করে দিয়েছি। ”
” গোডাউনে নিয়ে আয় দুজনকে। ”
সে ঠাণ্ডা ধ্রুব গলায় বলে উঠলো,
” চুপ শালা, মাথা ঠান্ডা কর। স্যার জানলে জবাবদিহি করতে হবে। ”
তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ল হ্যাভেন। ঘোর বিরোধিতা জানায়,

” স্যারের হাতে পড়লে আইনের আন্ডারে করে দেবে। সেটা আমি হতে দেবো না, নেভার! ওর কলিজা ওজন করে দেখতে চাই। অনেক দিন ধরে তরতাজা রক্তের গন্ধ শুকি না। তাছাড়া, ওদের থেকে অনেক প্রশ্নের যথাযথ উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। মেইন কালপ্রিট শু*য়ো** বাচ্চা লোক ভাড়া করে বাড়িতে আসার পথে আমার অরু পাখির উপর হামলা করেছিল। আ’ম ড্যাম শিওর, এটা ওই নরখাদকের কাজ। শুধু হাতেনাতে ধরব বলে নিশ্চুপ আছি। নয়তো যেভেবে জন্ম নিয়েছে সেভাবে ঢুকিয়ে দিয়ে আসতাম বা*ই**। ”
” দোস্ত রিলাক্স। হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামী।”
হ্যাভেন জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলো, ফোঁস করে তা পবনে ছাড়ল। নিগূঢ় চাউনিতে অজ্ঞান হয়ে বসে থাকা দারোয়ানের দিকে চাইল একপল। অতঃপর বাঁকা হাসল। বলল সবেগে,

” হ্যাভেন ঝোঁকের বশে ডিসিশন নেয় না। ম্যানেজ পারবো, যা বললাম কর। এদিকে আমার বউ তো আরও এক কাঠি উপরে। ধানিলংকা অন্য সময় হরিণের মতো লাফালাফি করতে পারে, কাজের সময় পারে না। ”
বন্ধু শব্দ করে হো হো করে হাসল। হ্যাভেনের বউ নিয়ে ওর কাছে অভিযোগ করা নতুন কিছু না, বরং এটা রোজকার নিয়ম। ওর অবশ্য ভালোই লাগে। ঠান্ডা কন্ঠে বোঝানোর স্বরূপ বলল,
” অরুর প্রতি রাগ দেখাস না। অ্যাটাকের কথা জানায়নি বলে তোর রাগ লাগছে, তাই তো? ব্যাপার না, স্বাভাবিক আচরণ। তুই যা খারুশ মার্কা, বেচারি তোকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। সব কথাবার্তা তোর সাথে শেয়ার করতে দ্বিধাগ্রস্ত সে। সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যাবে। ”

প্রেমপিপাসা পর্ব ২২

ভেতরে যেতে যেতে হ্যাভেন চনমনে গলায় বলে,
” রাখছি। চারপাশে শীতলতা ছেয়ে গিয়েছে। মন আমার বউ বউ করছে। ”

প্রেমপিপাসা পর্ব ২৪