Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৯ (২)

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৯ (২)

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৯ (২)
সাইদা মুন

ড্রয়িংরুমে সবাই উপস্থিত। তুহিন সাহেব নিজেই সবাইকে ডেকে জড়ো করেছেন। বিল্লাল সাহেবরাও একটু আগেই এসেছেন সবাইকে বিদায় জানাতে। তবে এসে তুহিন সাহেবের গম্ভীর মুখ দেখে কৌতূহলী হয়ে বসে পড়েছেন। কি বলতে চান তিনি, সেটাই শোনার অপেক্ষা। তালহা গাড়ি গ্যারেজে রেখে মাত্রই বাড়িতে ঢুকেছে। ঘরে এমন ভারী, নিস্তব্ধ পরিবেশ দেখে তার কপাল কুঁচকে গেল।
ঠিক তখনই তুহিন সাহেব ধীর গলায় বলে উঠলেন,

—সবাই যেহেতু উপস্থিত, আমার কিছু কথা বলার আছে।
তালহা ধীরে ধীরে সোফার দিকে এগিয়ে এলো। কোট খুলতেই মেহরীন এগিয়ে এসে সেটা হাতে নিল। তারপর আবার নীরবে পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। তালহা শার্টের উপরের বোতামটা খুলতে খুলতে বসে পড়ল। তার দৃষ্টি স্থির তুহিন সাহেবের দিকে। মানুষটাকে আজ ভীষণ অনুতপ্ত লাগছে। একবার মেহরীনের দিকে তাকিয়ে ইশারায় জানতে চাইল, কি হয়েছে? কিন্তু সে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে কিছুই জানে না।
তুহিন আহমেদ ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো বাটন ফোনটা বের করলেন। এটা প্রায় সতেরো-আঠারো বছর আগের মোবাইল। সেই যে কিনেছিলেন, তারপর আর বদলাননি। নষ্ট হলে ঠিক করিয়েছেন, তবুও নতুন ফোন নেননি। পরিবারের সবাই কতবার বলেছেন নতুন একটা মোবাইল নিতে, কিন্তু তিনি প্রতিবারই না করে দিয়েছেন।
ফোনটার দিকে তাচ্ছিল্যের চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন,
—আব্বা, এই মোবাইলটা কবে কিনেছিলাম মনে আছে?
আলী আহমেদ চশমাটা ঠিক করে শান্ত গলায় বললেন,
—আজ থেকে প্রায় আঠারো বছর আগে।
তুহিন সাহেব এবার মোবাইলে কিছু খুঁজতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর একটা ছবি বের করলেন। ছবিটা এই মোবাইলেই তোলা । তারপর সেটা বাবার দিকে এগিয়ে দিলেন। আলী আহমেদ কৌতূহল নিয়ে ফোনটা হাতে নিলেন। মনোযোগ দিয়ে ছবিটার দিকে তাকালেন। কিন্তু অস্পষ্ট ঝাপসা ছবিতে তিনি তেমন কিছুই বুঝলেন না। শুধু একটা বাস চোখে পড়ল।
তুহিন আহমেদ নিচু গলায় বললেন,

—আব্বা, এটা আমাদের সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট যাওয়ার বাস স্ট্যান্ড।
আলী আহমেদ এবার আরও ভালো করে তাকালেন,
—হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। কিন্তু এই ছবি?
তুহিন সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—এই ছবিটা সেদিনের, যেদিন তামান্নার বিয়ে ছিল। আমি সেদিন বাস স্ট্যান্ডে গিয়েছিলাম।
মুহূর্তেই ঘরের সবাই চমকে তাকাল তার দিকে। আরিফ আহমেদ বিস্ময়ে বললেন,
—হ্যাঁ, সেদিন তুই বাস স্ট্যান্ডে গিয়েছিলি তামান্নাকে খুঁজতে। কিন্তু তাকে খুঁজে পাসনি।
তুহিন সাহেব ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেললেন। ক্লান্ত শরীরটা সোফায় এলিয়ে দিয়ে আস্তে করে বললেন,
—না, আমি তামান্নাকে খুঁযে পেয়েছিলাম। এবং বাসেও তুলে দিয়েছিলাম।
মুহূর্তে যেন পুরো ঘরে বিস্ফোরণ ঘটল। সবাই হতভম্ব। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু চোখভরা অবিশ্বাস। আরিফ আহমেদ এক ঝটকায় উঠে এসে ভাইয়ের কলার চেপে ধরলেন। গর্জে উঠলেন,

—তুহিন! কিসব বলছিস তুই? তুই না বাড়ি ফিরে বলেছিলি তুই তামান্নাকে খুঁজে এসেছিস, কিন্তু বাস স্ট্যান্ডে কোনো খোঁজ পাসনি। তোর কথাতেই তো সেদিন আমি আর তামান্নার খোঁজে সেদিক যাইনি।
তাহসান দ্রুত এগিয়ে এসে আরিফ আহমেদকে ছাড়িয়ে আনল,
—আব্বু, এখানে ছোটরাও উপস্থিত। ঠান্ডা মাথায় কথা বলাই ভালো।
আরিফ সাহেব ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিলেন। পিছিয়ে গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়লেন। তার চোখ এখন মেঝের দিকে স্থির। বুকভরা হতাশার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। একবার বাবার দিকে তাকালেন। আলী আহমেদ অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ছোট ছেলের দিকে। আর মা, তিনি আঁচলে মুখ চেপে কান্নাভেজা চোখে শুধু ছেলের দিকেই তাকিয়ে আছেন।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকার পর আলী আহমেদ মুখ খুললেন। তার কণ্ঠে ছিল গভীর ক্লান্তি আর ভাঙা বিশ্বাসের ভার,
—এটাকে কি বিশ্বাসঘাতকতা বলব?
তুহিন আহমেদ মাথাটা আরও নিচু করে ফেললেন। ভাঙা গলায় বললেন,
—যা বলবে তাই মাথা পেতে নেব।
তিতলি বেগম এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে ভাইয়ের উদ্দেশে বলতে লাগলেন,

—তার মানে তুই সব জানতিস? তুই তামান্নার ঠিকানা জানতিস?
তুহিন আহমেদ ধীরে মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” বলতেই রাগে ফেঁটে পড়লেন তিতলি বেগম। চেচিয়ে উঠলেন,
—তাহলে এত বছর তুই মিথ্যা বললি কেন? কেন বলেছিস তুই তামান্নার কোনো খোঁজ পাচ্ছিস না? তবে কি তুই খোঁজই করিসনি? সব মিথ্যা ছিল?
তুহিন আহমেদ নীরব রইলেন। আর সেই নীরবতাই যেন সম্মতি দিল। আরিফ আহমেদ নিরাশ কণ্ঠে ভাইয়ের দিকে তাকালেন,
—তাহলে আমার ছোট ভাই, যাকে আমি নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করতাম, সে বছরের পর বছর আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছে? আমাকে মিথ্যা বলে এসেছে?
তুহিন সাহেব তখনও একইভাবে বসে আছেন। মাথা নিচু। উপস্থিত সবাই চুপচাপ। তাহিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন। অন্যদিকে তালহার মামিরা সালেহা বেগমকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। মেয়ে হারানোর ব্যথা আবারও তাজা হয়ে যে।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে অবশেষে তুহিন সাহেব মুখ খুললেন,
—আব্বা, আপনি না অনেকবার বলতেন এই মোবাইলটা বদলাতে। নতুন মোবাইল কিনতে। কিন্তু আমি শুনতাম না। কেন আপনার কথা শুনতাম না, সেই উত্তর পেয়েছেন আজ?
আলী আহমেদ ধীরস্বরে বললেন,

—না।
তুহিন সাহেব একটা তপ্ত শ্বাস ফেললেন। তারপর মোবাইলটা বুক পকেটে রাখলেন। নিচু স্বরে বললেন,
—যেই বাসের ছবিটা দেখিয়েছি, সেই বাসেই আমার বোন ছিল। তার শেষ স্মৃতি হিসেবে এই ছবিটাই বেঁচে আছে আমার কাছে। যখনই বোনটার মুখ মনে পড়ত, ঝটপট এই ছবিটা বের করতাম। সঙ্গে সঙ্গে মনে রাগ চলে আসত। তখন আর কষ্ট লাগত না, রাগ লাগত। বোন হারানোর কষ্টটা চাপা দিতেই এই মোবাইলটা আগলে রেখেছি। বোনের প্রতি রাগ আর অভিমান জন্মাতে এই মোবাইল আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।
তার কথা শুনে সকলের চোখেমুখে বিস্ময় আর প্রশ্ন জমে উঠল। কথাগুলো যেন কারও কাছেই পুরোপুরি বোধগম্য হচ্ছে না। তিনি কি বলতে চাইছেন? কেন নিজেকে এত বছর ধরে জোর করে রাগে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? আরিফ আহমেদ এবার রাগে ধমকে উঠলেন,

—কিসব ফালতু কথা বলছিস তুই? আগে উত্তর দে। সেদিন তুই কেন তামান্নাকে যেতে দিলি? এত দূর কেন আমার বোনটাকে একা ছেড়ে দিলি?
তুহিন আহমেদ কপাল কুঁচকে তাকালেন ভাইয়ের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—তোমার বোন? তোমার চিন্তা হচ্ছে? আমারও তো বোন ছিল। আমারও তো চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু আমরা একজন, দুজন, এমনকি পুরো পরিবার মিলে যার চিন্তায় পাগল ছিলাম, সে কি একবারও আমাদের চিন্তা করেছিল?
—মানে?
—মানে খুব সহজ। সেদিন আমাদের সেই তামান্না, যে পরিবার ছাড়া এক দিনও থাকতে পারত না। সে সেই পরিবারটাই ত্যাগ করেছিল সামান্য একটা ছেলের জন্য।
কথাটা বলেই থামলেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখের কোণে জমে থাকা কষ্টটা লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে আবার বলতে লাগলেন,

—সেদিন যখন শুনলাম তামান্না বাড়িতে নেই, তখন এক মুহূর্তও দেরি করিনি। সোজা বাসস্ট্যান্ডে চলে গিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল, মেহরীনের বাবার সাথেই সে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। আর তাদের যাওয়ার পথও একটাই, সেই বাসস্ট্যান্ড। আমি শুধু একটা উদ্দেশ্য নিয়েই গিয়েছিলাম, বোনটাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনব। গিয়ে সত্যিই তাদের দুজনকেই পেলাম। আমি তাড়াহুড়ো করে তামান্নার কাছে যেতেই সে আমাকে দেখামাত্রই ছেলেটার পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। যেন আমি তার ভাই না, ভয়ংকর কেউ। মুহূর্তটাতে আমি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে উঠেছিল। তবুও নিজেকে সামলে তাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম। বলেছিলাম, চল বাড়ি ফিরে যাই। পাগলামি করিস না। তুই যদি সত্যিই ওকে চাস, তাহলে আব্বার সাথে কথা বলে আমি নিজে তোদের বিয়ের ব্যবস্থা করব। আগে বাড়ি চল। কিন্তু সে আমার একটা কথাও বিশ্বাস করল না। সে ভেবেছিল আমি মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছি।

সে সরাসরি মানা করে দিয়েছিল। ওই প্রথম তামান্নার চোখে আমার প্রতি অবিশ্বাস দেখেছিলাম। যে মেয়েটা ছোট থেকে আমাদের অন্ধের মতো বিশ্বাস করত, সেই মেয়েটা কিনা সেদিন একটা বাইরের ছেলের জন্য নিজের ভাইয়ের কথাকে মিথ্যে ভেবেছিল। শুধু তাই নয়, সে আমার হাত তার মাথায় ঠেকিয়ে কসমও কাটাল, আমি যেন তাদের পথের বাধা না হই। বাধা দিলে নাকি আমি তার মরা মুখ দেখব। বিশ্বাস করবেন না আব্বা, আমি তখন পুরোপুরি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গিয়েছিলাম। কি বলব, কি করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শুধু হতবাক হয়ে নিজের বোনটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সে আমার ভালোবাসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল? সে তো জানত তাকে কতটা ভালোবাসি তার ক্ষতি হোক কল্পনাতেও ভাবতে পারিনা। তাই জন্যই নিজের কসম কাটাল? তাও আমি আমি তাকে বলেছিলাম, তুই চলে গেলে আব্বা, আম্মা, আপা, বড় ভাই সবাই অনেক কষ্ট পাবে।

কিন্তু সে বলেছিল, ওকে না পেলে আমিও কষ্ট পাব। তারপর একের পর এক তর্ক করেই গেল আমার সাথে। শুধু ওই ছেলেটার হাত ধরে চলে যাওয়ার জন্য। শেষে আমি ভয় দেখাতে বলেছিলাম, ওর সাথে গেলে পরিবার হারাবি। তবে সেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল, পরিবারের সাথে থাকলেও তো পরিবার হারাব। তার চেয়ে ওর সাথে গিয়েই পরিবার হারালে ক্ষতি কী?
থেমে গেলেন তুহিন সাহেব। কাঁপা হাতে চোখটা মুছে নিয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। একটানা কথা বলতে বলতে যেন দম আটকে আসছিল তার। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী কষ্টগুলো শব্দ হয়ে বেরোতে গিয়েই বারবার গলায় এসে থেমে যাচ্ছিল। মাথা তুলে আবার কিছু বলবেন, ঠিক তখনই রাফা এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে দাঁড়াল বাবার সামনে। মেয়েটার চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে। এতক্ষণ বাবার কান্না দেখে সে নিজেকে সামলাতে পারেনি। চোখের কোণে জমে থাকা পানি বারবার মুছে ফেললেও তা থামছে না। আজ প্রথমবারের মতো সে তার বাবাকে কাঁদতে দেখছে। তার বাবার বুকের ভেতর কতটা কষ্ট চাপা ছিল তা সে জানত না। যে মানুষটাকে সবসময় শক্ত, কঠিন আর স্থির দেখেছে, আজ সেই মানুষটাকেই ভেঙে পড়তে দেখছে সে।
তুহিন সাহেব ধীরে ধীরে পানিটা খেলেন। মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মুঁচকি এক হাসি দিলেন। নিজেকে শক্ত করে নিলেন। মেয়েকে পাশে বসাতেই রাফা বাবাকে জড়িয়ে ধরল। মেয়েকে সেভাবেই আগলে রেখে তারপর আবারও বলতে শুরু করলেন,

— কথাটা শুনে আমি একদম নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি যেখানে আমার পরিচিত কেউ নেই। খুব একা লাগছিল নিজেকে। সামনে আমার বোন দাঁড়িয়ে থাকলেও কেমন অপরিচিত লাগছিল, আমার তামান্নাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এমন লাগছিল। তবে এভাবে তো ফেলে আসতে পারিনা অনেক বোঝালাম তাকে। নিজের সঙ্গে আনতে চাইলাম। না পারতে যখন বাড়িতে কল দিতে যাব তখন সে একপ্রকার হুমকি দিল যদি কাউকে কিছু বলি তাহলে সে আত্মহত্যা করবে। আমি চুপ হয়ে গিয়েছিলাম তখন সে আবারও শেষবারের মতো আমার হাতটা নিজের মাথায় ধরল। বলেছিল, ভাই আমার গা ছুয়ে বলো তুমি কাউকে কিছু বলবে না। আমি দুই-তিন বছর পর আবার ফিরে আসব। তখন সবার রাগ ভাঙাব। কিন্তু ততদিন তুমি চুপ থাকবে। না হলে সত্যিই আমার মরা মুখ দেখবে। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তার দিকে। একটা মানুষ কিভাবে এক নিমিষেই নিজের পরিবার, নিজের ঘর, নিজের আপনজন, যাদের ছাড়া সে এক মিনিট কল্পনা করতে পারত না তাদের ছেড়ে সবকিছু ছেড়ে অন্য কারও হাত ধরে চলে গেল। অভিমান জমল মনে। আমার বোনটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল? আমি আটকাতে এও বলেছিলাম, যদি তুই আমাদের ছেড়ে চলে যাস তাহলে আর জীবনেও নিজেকে আমার বোন বলে পরিচয় দিবি না, আমি আর তোর মুখও দেখব না কোনোদিন। তাও সে চলেগিয়েছিল। যাওয়ার আগে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ভাইয়া আমি জানি তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো, আমি ফিরে এসে তোমার রাগ ভাঙাব। চলেগিয়েছিল আমার কথা একবারও ভাবল না।

না আমাদের কথা ভাবল। আর সেই অভিমান থেকে আস্তে আস্তে রাগ তৈরি হলো। মনে রাগ জমতে লাগল কার খোঁজ নিব যে কিনা আমাদের কথা চিন্তা করেনি তার? রাগ থেকে আস্তে আস্তে জেদ বাড়ল। মনে মনে জেদ জন্মাল তার কথা অনুযায়ী সে যখন আসবে আমি তার সাথে টু শব্দ ও করব না। সেই জেদ মনে গেঁথে রেখে দিলাম। এতদিন বসে ছিলাম কখন সে আসবে আর আমি তার উপর নিজের রাগটা দেখাব। আমার রাগ না ভাঙানো অব্দি আমার অভিমান না ভাঙানো অব্দি আমি আমার কথামত ফিরেও চাইব না তার দিকে। দেখ সত্যি ফিরে চাইনি পাষানের মতো। কথামতো বোনের মুখটাও আর দেখা হয়নি।
কাঁদছেন সালেহা বেগম। বারবার কাঁপা গলায় বলছেন,

—কেন এমন করলি? একবার কেন বললি না আমার মেয়েটার কথা? আমি শেষবারের মতো আমার মেয়েটাকে বুকে জড়াতে পারিনি। বুকে কত কষ্ট নিয়ে ছিলাম, তুই তো সব দেখেছিস। তাহলে কেন একটা বার বললি না?
পরিবেশটা ভারী হয়ে আছে। তিতলি বেগম আর সালেহা বেগম দুজনেই তুহিন আহমেদকে একের পর এক কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। আর তুহিন আহমেদ মাথা নিচু করে সব শুনে যাচ্ছেন। প্রতিটা কথাই তার বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছে। তবু কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। এই নীরবতাই তার স্বীকারোক্তি, যে সে দোষ করেছে।
এভাবেই বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। সকলের রাগ আর অভিমান বাড়তে দেখে অবশেষে তালহা পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে এলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
—আম্মু, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন মামাকে এসব বলে কি লাভ আছে? উনিও তো কষ্ট পেয়েছিলেন। সেই কষ্ট থেকেই এমন করেছেন। বুকে এক পাহাড়সম কষ্ট নিয়ে এতদিন চুপ ছিলেন তিনি। সেই চুপ থাকাটা এত সহজ মনে হচ্ছে তোমাদের? সব জেনেশুনে চুপ থাকাও অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
একটু থেমে আবার বলল,

—তাছাড়া বোনের জন্যই তো চুপ ছিলেন। খালামনিই তো ছোট মামার ভালোবাসার ফায়দা নিয়েছিলেন। উনি জানতেন, তার কোনো ক্ষতি তার ভাই চাইবে না। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন। তাহলে এখানে শুধু মামার দোষটা কোথায়?
তার কথায় চারপাশটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ কিছু বলল না। তালহা ধীরে ধীরে সবার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
—আর না, এখানে শুধু খালামনিরও দোষ। দোষ যদি থেকে থাকে, তাহলে সেটা তোমাদের সবার ছিল।
তিতলি বেগম অবাক হয়ে বললেন,
—কি বলছিস তুই?
তালহা গভীর শ্বাস ফেলল। তারপর শান্ত অথচ ভারী কণ্ঠে বলল,

—হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। তোমরা সবাই মেয়ের ভালো চেয়েছিলে, কিন্তু কখনো জানতে চাওনি মেয়েটা আসলে কোথায় ভালো থাকবে। খালামনি কাউকে ভালোবেসেছিল, কোনো পাপ তো করেনি। নানা ভাইয়ের তো যথেষ্ট অর্থ-সম্পত্তি ছিল। যদি সত্যিই মেয়ের সুখ নিয়ে এত চিন্তা থাকত, যদি সত্যিই মনে হতো খালু উনাকে ভালো রাখতে পারবেন না, তাহলে মেয়ের পছন্দের মানুষটার জন্য একটা ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেই পারতেন। তাহলে মেয়েটাও নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিয়েই ভালো থাকতে পারত। কিন্তু তা না করে তোমরা কি করলে? একটা ভালো চাকরিওয়ালা ছেলের কাছে বিয়ে দিতে চেয়েছিলে। কারণ তোমাদের কাছে মেয়ের সুখের চেয়ে সমাজের চোখে ভালো পাত্রটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কি ঠিক বলছি তো?
আলী আহমেদ মাথা নিচু করে ফেললেন। কথাগুলো শুনতে তিতা লাগছিল, কিন্তু অস্বীকার করার উপায় ছিল না। সত্যিই তিনি শুধু মেয়ের ভালো থাকার কথাই ভাবেননি, নিজের পরিবারের সম্মান আর সামাজিক অবস্থানের দিকটাও ভেবেছিলেন। গ্রামে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত একজন মানুষ। তাই সেইমতো চেয়েছিলেন, মেয়েকেও এমন এক পরিবারে দিতে যেখানে তাদের সঙ্গে সবকিছু মানানসই হবে। তার মনে হয়েছিল, প্রতিষ্ঠিত আর সম্ভ্রান্ত পরিবারেই হয়তো মেয়ের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে।

কিন্তু সেই ভাবনার ভিড়েই হয়তো তিনি একবারও বুঝতে পারেননি, একটা মেয়ের সত্যিকারের শান্তি শুধু অর্থ, বংশ কিংবা সামাজিক মর্যাদায় না। কখনো কখনো সেটা লুকিয়ে থাকে তার পছন্দের মানুষটার মাঝেই।
এমন আমাদের সমাজেও অনেক পরিবার আছে। যারা সত্যিই মেয়ের ভালো চায়, কিন্তু সেই ভালোটা কেমন, সেটা বেশিরভাগ সময় নিজেরাই ঠিক করে নেন। তারা নিরাপত্তা, অর্থ, সামাজিক অবস্থান এসবকে সুখের মাপকাঠি ভাবেন। অথচ যে মানুষটার জীবন, তার মনের শান্তি, ভালোবাসা, স্বস্তি কোথায় সেটা জানতেও চায় না। ছেলে-মেয়ের মতামতের গুরুত্ব দিতে ভুলে যায় তারা।
তালহা নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
—যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। এসব ভেবে আর নিজেদের দোষী ভেবো না। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো। অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে খালামনিকে তো আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
সে চলে যেতেই তুহিন আহমেদ বাবার পায়ের কাছে গিয়ে বসলেন। মাথা নিচু করে বললেন,
—আব্বা, আমারে মাফ করে দেন। আমি আমার বোনের থেকে নিজের রাগ-জেদটাকে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। যার জন্য আজ এই অবস্থা।
আলী আহমেদ আস্তে করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন,

—তালহা কি বলে গেল শুনিসনি? যা হয়ে গেছে তা হয়ে গেছে। সেসব নিয়ে আর ভাবিস না। আল্লাহর কাছে মাফ চা, রাগ-জেদ কমিয়ে আন। আল্লাহ নরম মনের আর ক্ষমাশীল মানুষদের বেশি পছন্দ করেন।
বলেই তিনি উঠে চলে গেলেন। একে একে সবাই উঠে গেল। তুহিন আহমেদ মেহরীনকে কিছু বলার আগেই সে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
—মামা, কি হয়েছিল সব ভুলে যান। আমি শুধু আপনার একটু ভালোবাসা চাই। আমাকে বাকিদের মতো একটু ভালোবাসলেই হবে। আমার একটুও রাগ নেই আপনার উপর, একটুও নেই।
তুহিন আহমেদ হালকা হাসলেন। এই প্রথমবার মেহরীনকে নিজের মেয়ের মতো বুকে টেনে নিলেন। যেন বহু বছরের জমে থাকা দূরত্বটা এক মুহূর্তেই গলে গেল। তিনি তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—আল্লাহ যেন তোর ভবিষ্যৎটা ফুলের মতো সুন্দর করে তুলে। অনেক সুখী হবি মা তুই।
কথাগুলো শুনে মেহরীনের চোখ ভিজে উঠল। কিছু সম্পর্ক রক্তের হয়, যেখানে নিজেকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে হয়। সেই সম্পর্কগুলোই মেহরীন ফিরে পেয়েছে। তারপর তুহিন সাহেব ও চলে গেলেন। আস্তে আস্তে ড্রয়িংরুম ফাঁকা হয়ে গেল। রয়ে গেল শুধু একটু আগের থমথমে পরিবেশ।

আসলে রাগ আর জেদ, দুটোই মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু যখন এগুলো ভালোবাসার চেয়েও বড় হয়ে যায়, তখন ধীরে ধীরে সম্পর্ককে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়। রাগের মুহূর্তে মানুষ এমন কিছু কথা বলে ফেলে, যা হয়তো সে মন থেকে বলতে চায় না। কিন্তু একটা জিনিস কি জানেন? কথার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মানুষের মুখ থেকে একবার বের হয়ে গেলে সেটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। আমি তো রাগের মাথায় বলেছি, এই বাক্যটা কখনোই সেই কথা মুছে দিতে পারে না। কিছু শব্দ মানুষের আত্মসম্মান আর বিশ্বাসে এমন দাগ ফেলে যায়, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, রাগ আর জেদ কখনো একদিনে সম্পর্ক ভাঙে না। এগুলো ধীরে ধীরে, কথা কমিয়ে দেয়, অভিমান জমায়, ভুল বোঝাবুঝি বাড়ায়, আর যত্নকে ক্লান্ত করে দেয়। এভাবেজ সম্পর্কের শেষটা সাধারণত চিৎকার দিয়ে নয়, নীরবতা দিয়ে হয়।
ঠিক যেমন তুহিন সাহেব নিজের রাগ আর জেদ নিয়ে অটল ছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন, কখন তামান্না বেগম এসে ভাইয়ের মান ভাঙাবেন। আর সেই অপেক্ষার ফাঁকেই ধীরে ধীরে তাদের একসময়কার মাধুর্যপূর্ণ ভাই-বোনের সম্পর্কটা তিক্ততায় ভরে উঠল। কেউ কাউকে হারাতে চায়নি, অথচ শেষমেশ হারিয়ে গেল সম্পর্কটাই।

আলী আহমেদ সপরিবারে মাত্রই রওনা দিয়েছেন। সিকদার পরিবারের সবাই বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মাত্রই বিদায় জানিয়েছে তাদের। গাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল। সবাই চুপচাপ তাকিয়ে রইল সেদিকে। যেন গাড়িটার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির প্রাণচাঞ্চল্যটাও চলে গেল। গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই একে একে সবাই ভেতরে চলে যেতে লাগল। সবার মনই ভারী। এতদিন একসঙ্গে থাকা, হাসিঠাট্টা, গল্প, ছোট ছোট মুহূর্ত, সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন জমে উঠেছিল। সময়গুলোও ভালোই কাটছিল। এখন চলে যাওয়ায় বাড়িটা অদ্ভুতভাবে ফাঁকা হয়ে উঠল। হঠাৎ করেই বাড়িটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগতে শুরু করল যেন।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুধু তালহা আর মেহরীন। মেহরীনের চোখ ছলছল করছে। যাওয়ার আগে সবাই তাকে কত আদর, কত ভালোবাসা দিয়ে গেল। এতগুলো আপন মানুষ একসঙ্গে পেল আবার চলেও যাচ্ছে। তাই বুকের ভেতরটা হঠাৎ খালি খালি লাগছে তার। তালহা তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
—কি হয়েছে? কাঁদছো কেন? সবাই-ই তো এখন তোমাকে ভালোবাসে, খুশি না বুঝি এতে?
মেহরীন রাস্তা থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল তালহার দিকে। ধীরে ধীরে তার এক হাত জড়িয়ে ধরল। তারপর মাথাটা তালহার বাহুতে ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—ধন্যবাদ।
তালহার ভ্রু কুঁচকে এলো,
—কেন?
মেহরীন হালকা হাসল। চোখের কোণে জমে থাকা জলটা চিকচিক করে উঠল,
—আপনি না থাকলে এত এত আপনজন, এত ভালোবাসা কখনো পেতাম না। সেদিন যদি আপনি না আসতেন, হয়তো আমার অস্তিত্বটাই থাকত না।
তালহা মেহরীনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
—আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করো। তিনি সেদিন তোমার কাছে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। উনার জন্যই আজ এত আপনজন পেয়েছো। আমি তো শুধু একটা মাধ্যম ছিলাম মাত্র।
মেহরীন নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তার চোখজোড়া এবার একটু শান্ত লাগছে। হঠাৎ তালহা মুচকি হেসে তার গাল টিপে দিল। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে রাগী চোখে তাকাল। কিন্তু সেই চোখের রাগও বেশিক্ষণ টিকল না। তালহার হাসি দেখে সেও অল্প হেসে ফেলল।
তারপর দুজনেই ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে যেতে লাগল। সন্ধ্যার নরম বাতাস দুজনকেই স্পর্শ করে যাচ্ছে। যেতে যেতে মেহরীন বলল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৯

—আমাদের ছোট্ট সংসার কবে হবে?
তালহা দুষ্টু হেসে বলল,
—আমার সঙ্গে থাকার খুব তাড়া বুঝি।
—তো কার সাথে থাকব শুনি?
—খুব শীগগিরই নিয়ে আসব আমার বুকে। তারপর আর কখনো দূরে যেতে দিব না।
এভাবেই নানান অনুভূতি প্রকাশ করতে করতে দুজন এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের ছায়া দুটোও পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে। গভীর এক নিশ্চিত সম্পর্কের দিকে, যেখানে ভালোবাসার সঙ্গে মিশে আছে শান্তি, নিরাপত্তা আর একটুখানি ঘর পাওয়ার অনুভূতি।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭০