প্রেমসুধা পর্ব ২৩
সাইয়্যারা খান
ভোর কেটেছে সেই কখন। বাইরে পাখির কিচিরমিচির শুনা যাচ্ছে। তালুকদার বাড়ী আধুনিক ভাবে তৈরী করা হলেও এর চারপাশে প্রকৃতির সমারোহ। চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য এটা ঘিরে। সম্মুখে থাকা ঘাটটা যেন গ্রামীণ এক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলে। এই ঘাট’কে ঘিরে রয়েছে বিরাট ইতিহাস। তৌসিফের এক ফুপি’কে নাকি খারাপ কিছু এখানে মে-রে ফেলে রেখেছিলো। তার তখন ছোট্ট ছয় মাসের বাচ্চা।
সেই বাচ্চার কাঁথা ধুতে এসেছিলো সে ঘাটে সন্ধ্যার সময়। ফিরে আর আসা হয়নি তার। তার দেহে কোন ক্ষয় দেখা যায় নি শুধু গালে পাঁচ আঙুলের থাপ্পড়ের দাগ ছিলো। এটা যে অশুভ কিছু ছিলো তা বুঝতে কারো সমস্যা হয় নি। এই ঘটনা অবশ্য অনেক পুরাতন তবে সেই থেকে এই ঘাটকে ঘিরে এলাকার মানুষের নানান জল্পনা কল্পনা। এখন যদিও একটা পন্ডের মতো এটা। পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি। সাইডে একটা নৌকা ও বাঁধা। তৌসিফ এখানে মাছের পোনা ছাড়িয়েছে। প্রায় সময় মাছ তুলে ও। শখের তার কমতি নেই।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঘাটের উপর বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছটা উঁকি দিয়ে আছে। সেখানেই বসা ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। নিজেদের স্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে তারা। চারদিকে মৃদু বাতাস যেন আজ প্রকৃতিকে আরো চাঙ্গা করে তুলছে।
তৌসিফের বুকে ভেজা পৌষ। জ্বর ছাড়তেই ঘেমে অস্থির ও। তৌসিফের বুকে থাকাতে তৌসিফ ও ভিজে উঠেছে। মৃদু শব্দে গুঙিয়ে উঠলো পৌষ,
— উমমম। ব্যথা।
তৌসিফ প্রথমে বুঝলো না। পরক্ষণেই খেয়াল হলো ওর বুকে কেউ। চোখ মেলতেই দেখলো পৌষ। সবার আগে ই ওর হাত পৌঁছালো পৌষ’র কপালে। দেখলো ভেজা কপাল। জ্বর ছেড়েছে। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট বের হলো,
— আলহামদুলিল্লাহ।
ঘুমের রেশ তার এখনও কাটে নি। টেনে চোখ খুলে বললো,
— কেমন লাগছে হানি?
পৌষ চোখ বুজে আছে। এখনও নেতিয়ে আছে তৌসিফের বুকে। ঘড়ির দিকে তাকালো তৌসিফ। সকাল নয়টা। উঠা উচিত। পৌষ’কে খাওয়াতে হবে। মেডিসিন দিতে হবে। আজ মর্নিং ওয়াক টা মিস গেলো। জিমটাও মিস গেলো। তৌসিফ ভেবে নিলো যেকোনো ভাবেই হোক না কেন এক ঘন্টা জিম করতেই হবে। একদিন না করলেই মনে হয় মাসল গুলো হয়তো চুপসে গেলো। চিন্তায় ঘুম হয় না। বডি ফিটনেস নিয়ে সে খুবই সচেতন। বিগত ছয় বছর ধরে একই ওজন ধরে রাখাটা মুখের কথা না। এক কেজি ও এদিক ওদিক হতে দেয় না ও। এই যে বিয়ের পর থেকে ওর রুটিনে উলোট পালোট করেছে পৌষ তাতে ও তৌসিফের সমস্যা হয় নি। ট্রেইনারকে দিয়ে এক্সট্রা জিম করে নিয়েছে ও। দুই দিন হলো ইয়োগা ধরেছে। এতে শরীর বুড়িয়ে যায় না। হাহ্ কতই না তোরজোর এই শরীর ফিট রাখার জন্য।
ফোঁস করে শ্বাস ফেললো তৌসিফ। আস্তে ধীরে পৌষ’কে নিয়ে ই উঠে বসলো। পৌষ’র চুলগুলো একত্রে করে সাইড থেকে একটা বড় ক্লিপ দিয়ে আটকে গালে হাত দিয়ে নরম স্বরে বললো,
— হানি,একটু উঠতে হবে।
— পরে উঠি?
ভালো লাগে না। একদম ই ভালো লাগে না তৌসিফের। তার বউ তো এমন না। এত অসহায় কণ্ঠ তো তার বউয়ের না। তাও কি না পরে উঠার অনুরোধ করে? সে তো বসে বসে তৌসিফকে নাচানোর মেয়ে। এমন নাচ নাচায় মাঝেমধ্যে তো তৌসিফের মনে হয় ও একটা বান্দর যাকে ডুগডুগি বাজিয়ে নাচায় পৌষ। এতে অবশ্য মন খারাপ হয় না ওর। এমন একটা চঞ্চলা প্রাণের ই অভাব তার জীবনে।
পৌষ’কে কোলে তুলে নিলে তৌসিফ। একেবারে ওয়াশরুম নামিয়ে দিতেই হয়তো হঠাৎ মাথা ঘুরালো পৌষ’র। সাপোর্ট হিসেবে পেছন থেকে ধরলো তৌসিফ। মাথাটা নিজের কাঁধে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— বেশি খারাপ লাগছে?
— উহু।
— এভাবেই থাকো। আমি ফ্রেশ করাচ্ছি।
ব্রাশ থেকে নিয়ে মুখ ধোঁয়ানো পুরোটাই করলো তৌসিফ। ঘেমে ভিজে যাওয়াতে ভেজা টাওয়াল দিয়ে পৌষ’র ঘাড়,গলা মুছিয়ে ফ্রকটা পাল্টে দিলো। এবারেও লং কোন প্যান্ট তৌসিফ দেয় নি। শুধু ধীরে বললো,
— পি করবে?
— হু।
তৌসিফ বেরিয়ে এলো। দরজা লক করতে নিলেই গমগমে স্বরে তৌসিফ বললো,
— আমি দাঁড়িয়েছি। লক করতে হবে না। তোমার পাহারাদার আছে না।
বেশি না হয়তো দুই মিনিট গেলো এরমধ্যে ই পাঁচবার ডাক দিলো তৌসিফ,
— হানি? হানি খুলব? হানি আসব?
এমনি সময় চাঙ্গা থাকতে ওর চৌদ্দ গুষ্টির নাম ভুলিয়ে দিতো পৌষ তবে শরীরে শক্তি না থাকায় আপাতত চুপ রইলো। এই দফায় তৌসিফ ঢুকেই পরলো। পৌষ তখন হাত ধুচ্ছিলো। ওকে নিয়ে ই বের হলো তৌসিফ। সোফায় বসিয়ে জোরে বুয়াকে ডাকলো। বুয়া আসতেই তৌসিফ গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— বেড শিট চেঞ্জ করো। আর হ্যাঁ লাইট কালারের চাদর বিছাবে।
মাথা নেড়ে বুয়া চলে যেতেই তৌসিফ পৌষ’র কাছে বসলো। থুতনিতে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে বললো,
— কি খাবে আমার তোতাপাখি?
— কিছু না।
— খেতে তো হবে হানি। তোমার তো পাসতা পছন্দ।
— ভালো লাগছে না।
কাঁদো কাঁদো গলায় বললো পৌষ। তৌসিফ বুঝলো। বললো,
— খেলেই তোমাকে চেক আপে নিব হানি। হুট করে কেন জ্বর এলো?
কথায় আছে রশি জ্বলে গেলেও বল নিভে না। পৌষ’র তাই হলো। কাঁপা কাঁপা চোয়ালে দাঁত খিঁচিয়ে বললো,
— আপনার শয়তান ভাই উল্লুকের মতো হাত দিয়ে থাপ্পড় মে’রেছে আমাকে তাই জ্বর এসেছে।
তৌসিফ তারাতাড়ি বউকে শান্ত করতে চাইলো। মাথায় হাত বুলালো। বুয়া ততক্ষণে এসে চাদর পাল্টে নাস্তা ও দিয়ে গেলো। তৌসিফ পৌষ’র মুখে তুলে খাওয়ালো। তিন চার চামচ খেয়ে পৌষ আর খাবে না। না মানে না ই। এই না কে আর হ্যাঁ তে পরিবর্তন করা গেলো না। সেই এঁটো থেকেই তৌসিফ খেয়ে নিলো। পৌষ’কে ঔষধ খায়িয়ে চুলগুলো কাটা ছাড়িয়ে আঁচড়ে দিলো সুন্দর করে। এত সুন্দর বড় বড় লম্বা চুল। অনেকদিন হলো ঘ্রাণ নেয়া হয় না। নাক মুখ ডুবালো তৌসিফ। বড্ড নেশালো লাগে তার এই ঘ্রাণ। আচমকা পেছন থেকে পৌষ’র কোমড় জড়িয়ে ধরলো তৌসিফ। কাঁধে মুখ ডুবিয়ে অনায়াসে তা ঘঁষে বললো,
— কবে যে মেনে নিবে আমাকে তুমি?
— কোন দিন ও না।
— অপেক্ষা করতে জানি আমি।
— উমম।
— হামমম।
মুখ তুলে চুলগুলো সুন্দর করে বাঁধলো তৌসিফ। একবার বউকে দেখলো হেড টু টোস। এই প্রথম হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ফ্রক পরা দেখেছে ওকে তৌসিফ। বাচ্চা ই লাগে।
আচমকা বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তৌসিফ বিরক্ত হলো। তৌফিকের গলা শুনা যাচ্ছে। তৌসিফ পৌষ’কে বসিয়ে নিজে গেলো বাইরে। তৌসিফ’কে দেখেই যেন ফুঁসে উঠলো তৌফিক। চেঁচিয়ে উঠে বললো,
— কোন সাহসে তুই আমার এত ক্ষতি করলি?
না বুঝার মতো মুখ করে তৌসিফ বললো,
— কি হয়েছে?
বলেই মিনুকে বললো,
— বুয়াকে কফি দিতে বল।
ভাইয়ের এমন গা ছাড়া ভাব মেনে নিতে পারলো না তৌফিক। দাঁত পিষে বললো,
— ডিল ক্যান্সেল করলি কেন? কাল আমার একটা জাহাজ ও বন্দরে ঢুকে নি। কেন?
— আমি কি জানি? আজব কথা বলেন ভাই। প্রজেক্ট লাভবান মনে হলো না তাই ক্যান্সেল আর জাহাজ যা আমার নামে আছে তা ই বন্দরে ঢুকেছে। লিগ্যাল ব্যাপার স্যাপার ইউ নো।
তৌসিফ একটু থেমে বললো,
— সকাল সকাল এসেছেন। নাস্তা করে যান। ঘরে গেলেই ভাবী আবার মাথা খাবে আপনার তার থেকে এখান থেকে ই খেয়ে যান।
তৌফিক যা বুঝার বুঝলো। বউয়ের কথায় কান দিয়ে গতকাল পৌষ’কে চড় মা’রার ফলাফল ই যে এটা তা বুঝা হয়ে গেলো ওর। কোনমতে দাঁত চেপে চলে গেল নিজের ফ্লাটে। তৌসিফ স্পষ্ট শুনলো ভাবীকে ঝাড়ছে বড় ভাই। তৌসিফ ব্যাঙ্গ করে বললো,
— গুড।
গাড়িতে করে পৌষ’কে নিয়ে বের হলো তৌসিফ। হসপিটালে নিয়ে জোর করে টেস্ট করাবে এখন ও। মাথা থেকে পা সব। পৌষ রাগে, দুঃখে কেঁদেই ফেললো এবার। কোন পা’গলের পাল্লায় পরলো এটা ও। এত না করলেও শুনলো না। ইউরিন টেস্টের টেস্ট টিউব দেখেই বিচক্ষণ ভঙ্গিতে তৌসিফ বলে উঠলো,
— তোমার মনে হচ্ছে বিলিরুবিন কম।
লজ্জায় ম’রে যেতে মন চাইলো পৌষ’র। নার্স গুলো হেসে উঠলো। তৌসিফের তাতে আসে ও না যায় ও না। মনে মনে গালি দিলো পৌষ,
— শা’লা ধান্দাবাজ। শরীরটা ভালো হোক তোকে যে কি করব তা আমিও জানি না।
আল্ট্রা করাতে গিয়ে ঝামেলা বাঝলো। পাকনামি করে আগে ইউরিন টেস্ট করিয়ে এখন বোতলের পর বোতল পানি গিলালো ওকে তৌসিফ। হায় কি কপাল! তৌসিফের সাথে আজ পেরে উঠলো না পৌষ। ফুল বডি চেকআপ করিয়ে যেই না ব্লাড নিবে ওমনিই তিড়িংবিড়িং শুরু করলো পৌষ। সে কি কান্ড! তৌসিফ আহত হলো। তার গলায়, গালে খামচি লাগলো দুটো। নার্স দু’জন মিলে ধরলো কোনমতে। পৌষ চিৎকার করে উঠলো,
প্রেমসুধা পর্ব ২২
— ছাড় আমাকে। ছাড় বলছি। দিব না র*ক্ত। আমার শরীরে র*ক্ত নেই। ওরে কুত্তা ছাড় আমাকে। হেমু ভাইইই, বাঁচাও। ছাড় আমাকে, ঐ ব্যাটার শরীর ভরা র’ক্ত। ওনার থেকে নে।
ডক্টর বড়ই বেকায়দায় পরলো। তৌসিফ দমে নি। ওর বউকে একদম সুস্থ চাই। যে কোন মূল্যে চাই। মৃত্যুকে বড়ই ভয় পায় সে। মা’কে এক অবহেলার কারণে ই হারিয়েছে ওরা। পৌষ’কে হারানো যাবে না। কিছুতেই না।
