প্রেমসুধা পর্ব ৬৫
সাইয়্যারা খান
গতরাত থেকে তৌসিফে’র সাথে পৌষ’র বনাবনি হয় নি। তৌসিফ রেগে বারান্দায় চলে গিয়েছিলো। পৌষ ভয়ে ভয়ে আর সাহস দেখিয়ে বারান্দায় যায় নি৷ তৌসিফ রেগে গেলে তার আচার-আচরণ বদলে যায়। পৌষ’র ক্ষেত্রে যথেষ্ট ধৈর্য সে দেখাচ্ছে। পৌষ বুঝে উঠতে পারে না রাগের কারণটা আসলে কি। শুধু মাত্র মিরা ভাবীর সাথে কথা বলায় এতটা রাগ? তৌসিফ তাকে শুরুর দিকেই না করেছিলো যাতে পৌষ এখানে কারো সাথে ততটা না মিশে যদিও এদের ভাইদের মাঝে অনেক মিল। মাঝে একবার শুনেছিলো মিরা ভাবী’কে তৌফিক তালুকদার যথেষ্ট ধমকেছেন৷ তৌহিদ তালুকদার বউয়ের হয়ে তখন বড় ভাইয়ের মুখে জীবনে প্রথম তর্ক করেছিলো অতঃপর কিছুটা হলেও তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মাঝে শুধু পৌষ’কে নিয়ে হওয়া ঝামেলায় আরেকটু নীরব ঝামেলা হয়েছিলো।
পৌষ’র মাথায় ততকিছু ঢুকে না। অপেক্ষা করতে করতে ওর চোখ লেগে আসে। তৌসিফ রাত বারোটার পর রুমে ঢুকে। লাইট অফ করে সোজা বিছানায় চলে যায়। বিয়ের এতগুলো মাসপর এই প্রথম পৌষ’কে কাছে টানে না তৌসিফ। নিজের গায়ে কম্বল নেয়ার সময় কিছুটা পৌষ’র উপর দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পরে। তার শরীর তখন রাগে কাঁপছিলো। কথা না শোনা মানুষের প্রতি তার ভিন্ন অনুভূতি জন্মায়। তৌসিফ প্রকাশ করতে পারে না। তার মাথা তখনও রাগে দপদপ করে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পৌষ সকালে আজ আগেই উঠেছে। নামাজ পড়ে নিজের মতো নাস্তা বানিয়েছে বুয়াদের সাহায্যে। ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে ও। তৌসিফ উঠছে না। পৌষ গরম পানি সহ বাথরুমে দিয়ে রাখলো৷ করার মতো শুধু রান্নাটাই আছে৷ তৌসিফ আজ দেড়ীতে উঠলো। তার মেজাজ কিছুটা হলেও ঠান্ডা আপাতত। কাল রাতে বারান্দায় গিয়ে ঠান্ডায় না দাঁড়ালে নিশ্চিত তার হাত উঠে যেতো। সে চায় না এটা হোক। কখনোই এমনটা না হোক।
ও উঠে যেতে যেতে পৌষ রুমে ঢুকে বিছানা গুছিয়ে নিলো। তৌসিফে’র কাপড় বের করে রাখতে রাখতে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে ওর। দুই পা পিছিয়ে যেতেই ঠান্ডা এক বুকে ধাক্কা খায় পেছন থেকে। চোখটা সাময়িক বন্ধ করে পুণরায় খুলে৷ তৌসিফ ওর বাম হাতের বাহু ধরে। পৌষ ঘুরে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে রাখে। তৌসিফ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
— মেডিসিন নিয়েছো?
পৌষ চুপ। তা দেখে তৌসিফে’র গলা ভারী হলো। বললো,
— জানি নাও নি। তাহলে কি করছিলে এতক্ষণ? মাথা ঘুরাচ্ছে আবারও? আবার হাসপাতালে ঘুরিয়ে আনব?
পৌষ’র হাতের তালু ঘেমে উঠে সাথে ঘামে ঠোঁটের উপরের অংশ। তৌসিফ তা দেখে। ডান হাত বাড়িয়ে মুছে দিয়ে বলে,
— বুয়াকে খাবার দিতে বলো।
নিচু স্বরে পৌষ জিজ্ঞেস করে,
— জিমে যাবেন না?
— সময় রেখেছো তুমি?
পৌষ মনেমনে কষ্ট পেলো। ও ভয়ে ডাকেনি। ভয় পাওয়াটাও তো অযথা না। তৌসিফ যে এখনও ফুলেফেঁপে আছে তা তার আচরণে স্পষ্ট। পৌষ কিছু বলার আগেই তৌসিফ ওর মাথায় হাত রাখে। আদরের ভঙ্গিতে মাথায় হাত বুলায় ঠিক যেন ছোট্ট এক বাচ্চা পৌষ। তৌসিফ পৌষ’র নতমুখী মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
— মিরা ভাবীর কাছ ঘেঁষো না পৌষরাত। তার পাশ ঘেঁষা মানে আমার কাছ ছাড়া হওয়া। আমি জানি তুমি আমার কাছ ঘেঁষা হয়ে থাকতে চাও। কি ভুল বললাম?
পৌষ মাথা নাড়ে।
— তাহলে খবরদার করে বলে দিলাম তার কাছে যাবে না৷ সে কিন্তু পীর বাবা মানে। কোন বিষেভরা বান তোমাকে দিবে তুমি টের পাবে না তখন দেখবে আমাকে ভালো লাগছে না। রাস্তার পাশে টোকাইদের ভালো লাগবে। তুমি তখন ঘর ছাড়তে চাইবে। আমি তখন বেঁধে রাখব তোমাকে। আমি তো বউ ছেড়ে দিব না৷ বুঝেছো আমার কথা?
পৌষ যেন এই মুহুর্তে সত্যিই অবাক বনে গেলো। মীরা’র মতো মানুষ জাদু বিদ্যায় বিশ্বাসী? এটাও হতে পারে? তৌসিফ ওর আশ্চর্য ভাব দেখে আড়ালে ফিচেল হাসলো। মীরা’র মতো মানুষদের স্বয়ং শয়তানও ভয় পাবে। এরা দেখতে, শুনতে বোকা হলেও এরা বিনা কারণেই অন্যের ঘর ভাঙতে শান্তি পায়৷ তৌফিক তালুকদারের বউ এর পর একমাত্র মীরাই আছে যে বুয়াদের দিয়ে দিয়ে সারা মহল্লা জাহির করিয়েছে যে তৌসিফ কাজের মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। খবরাখবর সবটা সে জানে। মীরা তাকে দেখলেই দুই মাইল দূরত্ব বজায় রাখে। এই বাড়ীতে পিয়াসীর সাথে ছিলো তার গভীর খাতির। তৌসিফ ভেবেছে, আর একবার পৌষ’র আশেপাশে মীরা’কে দেখলে পৌষ’র আগে মীরা’র মাথা ও ঠিক করে দিবে। স্বামী’র টাকায় টান ফেলতে তৌসিফে’র ঘন্টা খানিক সময় লাগবে। ডাইয়িং এর সাপ্লাই বন্ধ করতে আর কতক্ষণ? খারাপ তৌসিফ হতে চায় না। পরিস্থিতি তাকে দিয়ে খারাপ কাজ করিয়ে নেয়।
পৌষ খাবার সাজাচ্ছে। ওর মাথায় এখনও তৌসিফে’র কথা ঘুরছে। তৌসিফ এসেই বললো,
— বুয়া ডিম সিদ্ধ দিও একটা।
পৌষ ডিমের প্লেট এগিয়ে দিয়ে বললো,
— পোর্চ করেছি আজকে।
— আচ্ছা।
বলে পৌষ’কে বসায় ও। খেতে খেতে পৌষ বলে,
— আজ ভার্সিটি যেতে হবে। কাল থেকে পরীক্ষা।
— যাবে।
— না মানে…
— বলো। আমার সাথে কথা বলার সময় ফ্রীলি বলবে পৌষরাত৷ এত ভণিতার দরকার নেই।
পৌষ চোখ নামিয়ে ফেললো। ওর কেন জানি মনে হচ্ছে তৌসিফ এখনও রেগে। তবুও সাহস জুগিয়ে বললো,
— বেতন বাকি দুই মাসের। আমাকে যেই টাকা হাত খরচে দিয়েছিলেন তা তো আমি ওখানে শেষ করে ফেলেছি।
তৌসিফ একবার কপাল কুঁচকে তাকালো৷ যা কেনার তৌসিফ টাকা দিয়েছে। পৌষ’র খরচ হলো কখন? ও জিজ্ঞেস করলো না৷ শুধু বললো,
— ড্রয়ারে তো টাকা থাকে পৌষরাত। তোমার যা লাগবে খরচ করবে। আমাকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।
পৌষ চুপ করে মাথা নাড়লো। বুয়া ডিম সিদ্ধ আনতেই তৌসিফ তা পৌষ’কে দিলো। পৌষ’র এখন মোটেও ডিম খেতে মন চাইছে না কিন্তু তৌসিফে’র গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেও পারছে না। চুপচাপ গিলে খেয়ে নিলো ও।
— তুমি ভর্তা বাটছো কেন সোহা?
মেহেদী’র গলা শুনে সোহা উঠে দাঁড়ালো। বললো,
— খেতে মন চাইছিলো।
— আশ্চর্য! তুমি কাউকে বলতে।
— কাকে?
মেহেদী ভাবুক হলো৷ আসলেই তো কাকে বলতো সোহা? মা তো ঝুঁকে কাজ করতে পারবে না। তার কোমড়ে সমস্যা। মেহেদী সোহা’কে ঠেলে সরিয়ে দিলো। নিজেই বসে হাত দিলো। সোহা চেয়ার টেনে বসেছে। ওর মুখে হাসি৷
প্রথম বার পাটায় হাত দিলে যা হয় আরকি। কিছুতেই পুতা ধরে রাখতে পারছে না মেহেদী। বহু কষ্টে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সে ভর্তা বানালো। শুটকি ভর্তা। সোহা’র মুখে লালা চলে এলো৷ পাতিল থেকে ভাত নিয়ে পাটায় দিয়ে বললো,
— এখান থেকে মেখে দিন। পাটায় অবশিষ্ট ভর্তার স্বাদই ভিন্ন।
মেহেদী হাসিমুখে ভাত মেখে লোকমা করে দিলো। সোহা বসে বসে তখন খাচ্ছে। দুপুরের সময় হয় নি তখনও। এমন সময় মেহেদী’র হাতে বসে বসে খাওয়ার দৃশ্যটা নেহাৎ সাধারণ নয়। পাশের বাড়ীর এক মহিলা দেখলেন সবটা জানালা দিয়ে। সোহা মেহেদী’কে জোর করতেই ও খেলো একটু। হাত মুখ ধুঁয়ে মেহেদী যাওয়ার আগে সোহা’র পেটে হাত দিয়ে কপালে চুমু খেলো৷ বললো,
— কষ্টদায়ক কোন কাজ করো না সোহা।
সোহা মাথা নাড়ে। ততক্ষণে ঐ মহিলা হাজির। এসেই মেহেদী’র মা’কে ডাকলেন৷ সোহা তখন রান্নায় মনোযোগ দিয়েছে। ওর শাশুড়ী আসা মাত্রই মহিলা বিভিন্ন ভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে জানিয়ে দিলো মেহেদী’কে দিয়ে কিভাবে সোহা খাটাচ্ছে। ওর শাশুড়ী অবাকই হলেন। মহিলা দেখলো তেমন প্রতিক্রিয়া নেই তাই বললেন,
— শুনো মেহেদী’র মা ছেলে শিক্ষিত। হাতে ধরে রাখো। এখনই বউয়ের গোলামি করে৷ দুই দিন পর বাচ্চা আসলে বউয়ের পা ধরে থাকব।
ওর শাশুড়ী মাথা নাড়লেন। সোহা’কে ডাকলেন। সোহা এতক্ষণ সবটা শুনেছে। ভেতরে রাগে ফুঁসেছে। এগিয়ে আসতেই ওর শাশুড়ী বললো,
— মা, যখন যা খেতে মন চাইবে আমাকে, তোমার শশুড়কে নাহলে মেহেদী’কে বলবে। আমার নাতি-নাতনির মুখ দিয়ে যাতে লালা না পরে।
মহিলার উৎসুক হওয়া মুখ চুপসে গেলো। সোহা’র ভীষণ হাসি পেলো। আহারে! বেচারী আগুন লাগাতে এসে আগুন জ্বালাতে পারলো না। বড়ই কষ্টের বিষয়।
ভার্সিটির বেতন দিয়ে পৌষ হেমন্তকে ফোন দিলো। জানালো একটু এদিকে আসতে। হেমন্ত আজ ব্যস্ত। পৌষ জোর দিলো না। হেমন্ত একটু হেসে বললো,
— জৈষ্ঠ্যমাসকে পাঠাচ্ছি দাঁড়া।
পৌষ ঠোঁট উল্টে আচ্ছা বলে। ও কেন জানি এখনও সাহস পায় না ভাই বোনদের নিজের বাসায় নিতে। তৌসিফও আগ বাড়িয়ে কখনো বলে না৷ একবার ইনি, মিনি’কে শুধু নিয়ে এলো। ঐ বাসায় কারো সাথে ফোনে কথা বললে যদিও কিছু বলে না কিন্তু যেতে দিতে চায় না। পৌষ একা একা হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় এলো। বাইকে তখন কিছু ছেলেপেলে। একজন ইশারায় পৌষ’কে দেখালো। পৌষ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো ছেলেটা সেই ছেলেটা যাকে পৌষ মাস কয়েক আগে টুনটুনিতে মে’রেছিলো। আহা, কি শর্টটাই না মে’রেছিলো পৌষ।
ছেলেগুলো ভয়ে পালালো একপ্রকার। পৌষ গর্ববোধ করলো অথচ বুঝলো না তৌসিফ তালুকদার এদের ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। স্পেশাল ট্রিটমেন্ট।
জৈষ্ঠ্য আসতে দেড়ী হওয়ায় পৌষ কল লাগালো। তখনই দেখলো রোডের অপরপাশে চৈত্র আর জৈষ্ঠ্য একসাথে আসছে। সাথে পিহা। পৌষ’র গাল চওড়া হলো। গলায় জড়তা সৃষ্টি হলো। তার কলিজা গুলো আসছে। পৌষ হাত নেড়ে ওদের ডাকা মাত্র হাতে টান অনুভব করে। তাকাতেই চমকায়। মীরা দাঁড়িয়ে। পৌষ’র ঘাম ছুটার জোগাড়। তৌসিফ এবার তাকে জানে মে’রে দিবে। পৌষ তারাতাড়ি হাত ছাড়ালো। পালাতে চাইলো কিন্তু তার আগেই অদ্ভুত ভাবে হেসে মীরা বলে গেলো,
প্রেমসুধা পর্ব ৬৪
— পিয়াসী’কে বাচ্চা না হওয়ার জন্য তৌসিফ ছেড়েছিলো। তোমাকেও ছেড়ে দিবে পৌষ। এই কথা আমি যাতে তোমাকে না জানাই এরজন্যই আমার থেকে দূরে থাকতে বলে। তোমার নিশ্চিত সমস্যা আছে পৌষ তাই এখনও তৌসিফ বাবা ডাক শুনতে পায় নি। ও তোমাকে ছেড়ে দিবে।
পৌষ’র কানে আর ঢুকলো না। মীরা গাড়িতে উঠে চলে গেলো। এদিকে রাস্তায় ঢলে পড়ে পৌষ। পড়ার ঠিক আগ মুহুর্তে পেছন থেকে হেমন্ত ধরে ফেললো। সামনে থেকে তখন ভাই-বোন গুলো ছুটে আসছে। পৌষ হাত বাড়ালো। ইনি, মিনি কোথা থেকে ওর বুকে চলে এলো। পৌষ ঝাপসা দেখলো ওর সবগুলো ভাই-বোন এসেছে। নিশ্চিত পৌষ’কে চমকাতে তাদের এই আগমন৷
ওর মুখ দিয়ে অস্পষ্ট বের হলো,
— তৌসিফ।
