Home প্রেমসুধা প্রেমসুধা পর্ব ৭৩

প্রেমসুধা পর্ব ৭৩

প্রেমসুধা পর্ব ৭৩
সাইয়্যারা খান

সোহা-মেহেদীর মেয়ের আজ পৃথিবীতে আসার সপ্তাহ গড়ালো। আজ আকিকা দিয়ে নাম রাখা হবে। মেহেদী খাসি এনেছে। মেয়ের নাম রাখা হয়েছে মাকরুর। সোহা’র সাথে তার দুই দিন গড়াতেই মন কালো কেটেছে। সোহা ভেবেছিলো শাশুড়ী বুঝি মেয়ে দেখে রাগ। এতমাস শাশুড়ী থেকে মায়ের আদর পেয়ে মেয়ে হওয়াতে সেই আদরে ভাটা পরবে এমনটা ভেবেই সোহা প্রথমদিন মেহেদীকে উক্ত কথা বলেছিলো। দেখা গেলো শাশুড়ী মহা খুশি। সোহা বেয়াক্কল বনে গিয়েছিলো। সবটা জানিয়ে মেহেদী থেকে মাফও চেয়েছে। মেহেদী মুখ গোমড়া করে রেখেছিলো। তার সদ্য ভূমিষ্ট মেয়ে নিয়ে ওমন উক্তি তার মোটেও পছন্দ হয় নি। সোহা কথা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বামী তার রেগে নেই জানে, সে ফুলে আছে। সোহা ফুলা বেলুন ফাটাতে জানে।
মেহেদী, সোহা’কে অবাক করে দিয়ে ওদের বাড়ীতে এই প্রথম পা ফেললো তৌসিফ যার ডান হাতে ধরা পৌষ’র হাত। সাথেই মিনু। মেহেদী হা করে তাকিয়ে রইলো প্রথমে অতঃপর দ্রুত পদচারণ করে এগিয়ে এলো। হাসিমুখে সালাম জানাতেই তৌসিফ উত্তর নিয়ে বললো,

— ওকে বসাব। ফাঁকা জায়গা হবে?
ড্রয়িং রুমটায় মানুষ। নিজের মায়ের রুমে নিয়ে পৌষ’কে বসালো মেহেদী। সোহা এগিয়ে আসতেই পৌষ ওকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে,
— কেমন আছেন আপু?
সোহা চমকিত দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে রইলো অতঃপর নিজেও দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো। শক্ত করে। ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
পৌষ মুচকি হাসলো। তৌসিফ পৌষ’র পেছনে দুটো বালিশ দিয়ে আরামদায়ক করে দিতে দিতে মেহেদী’র মা শরবত হাতে এগিয়ে এলেন। পৌষ হাত বাড়িয়ে গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে গিলে নিলো। তৌসিফ বাচ্চাটাকে এসেছে থেকে কোলে নিয়ে বসে আছে। বাবুটাও একদম চুপ করে দেখছে ওকে। তৌসিফ ঠোঁট নেড়ে কথা চালালো তার সাথে। সাত দিনের ছোট্ট একটা জান। মেহেদী কি যে কি করবে বুঝতে পারছে না। বারবার ভাই ভাই করছে। তৌসিফ ওর সাথে বাইরে এসে বললো,
— এত ব্যাস্ত হচ্ছো কেন মেহেদী?
— ভাই…
— কি? মেয়ের বাবা থাকবে শান্ত। এত অশান্ত ভাব মানায় বলো? আসো দেখি কি হচ্ছে। কতদূর আগালো কাজ?
বলতে বলতে এগিয়ে গেলো তৌসিফ।
সোহা’র সাথে বেশ হাসিমুখে কথা বলছে পৌষ। এতে করে যেন সোহা’র ভেতরে খারাপ লাগা কাজ করলো। না পেরে পৌষ’র হাত চেপে ধরে ও। মুখে কিছু বলতে চায় তার আগেই চোখে হাসে পৌষ। ও যেন চোখের ইশারায়ই বলছে তৌসিফ আমার, আমি আপনাকে মাফ করে দিয়েছি।

সোহাদের থেকে বিদায় নিয়ে তৌসিফ পৌষ’কে নিয়ে বেরিয়েছে। পৌষ’র বের হওয়া হয় না অনেকদিন। আজ তাকে ঘুমাচ্ছে তৌসিফ। এর অবশ্য আরেকটা কারণ আছে। এই মাসের পর থেকে পৌষ’কে বের করবে না ও। ইদানীং এত সুন্দর দেখায় পৌষটাকে। রুপ যেন তার খয়ে খয়ে পরে। চুলগুলোর ঘনত্ব বাড়ছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তার সৌন্দর্য। তৌসিফ যে কি কষ্টে নিজেকে সামলায় তা কেবল সে নিজে জানে। বউটা নিজের রুপ দিয়ে তাকে ঘায়েল করে ছাড়ছে। তৌসিফকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। শুধুমাত্র বউকে ভালোবাসে বলে সে চুপচাপ সয়ে যায়। রা করে না।
পৌষ তৌসিফে’র কাঁধে মাথা দিয়ে রেখেছে। তৌসিফে’র এক হাত ওর পেটে। পৌষ জিজ্ঞেস করলো,
— আমরা কোথায় যাচ্ছি?
— আমার এক ফ্রেন্ডের বিবাহ বার্ষিক।
— আমার ভালো লাগে না।
— কি?
— আপনার ওই বুইড়া বুইড়া বন্ধু।

পৌষ মুখ ভেংচি কাটলো। তৌসিফ মৃদু হাসলো। তখনই ফোন এলো বাড়ীতে তায়েফা এসেছে। এসেছে থেকে নিজের শশুর বাড়ী গিয়েছিলো আগে। তৌসিফ ফোন দিতেই এক দফা ঝেড়েছিলো তায়েফা। বাড়ীতে এসে নিশ্চিত আরেকদফা ঝাড়বে।
গাড়ি থামতেই তৌসিফ বউ নিয়ে নামলো। বন্ধুদের সাথে কুশলাদি করেই আগে পৌষ’কে নিয়ে বসালো। অসমবয়সী দম্পতিদের সুন্দর মুহুর্তে বাকিরা যোগ দিলো। সবাই তাদের অভিনন্দন জানাচ্ছে৷ পৌষ যেন লজ্জায় মা’রা যাবে। বয়সে এত বড় বড় মানুষ এভাবে খোলামেলা জিজ্ঞেস করলে কেমন লাগে?
তৌসিফ একটু সাইডে যেতেই পৌষ তারাতাড়ি কল লাগালো। তৌসিফ ভ্রু কুঁচকে তাকালো পেছনে। বুঝে গেলো পৌষ’র চোখের ইশারা। এত ছোট মেয়ে অথচ তৌসিফ’কে চোখে শাসাচ্ছে যাতে উলটো পাল্টা না গিলে সে। তৌসিফ মাথা নাড়ে ভদ্র মতো। গতবারেরও ইচ্ছে করে সে খায় নি ওসব।
পৌষ’র হাত নিশপিশ করছে। দামড়া মহিলাগুলো তাকে নানাবিধ পরামর্শ দিচ্ছে। যার কোনটাই পৌষ’র ভালো লাগছে না৷ একজন বললো,

— যেই রুপ খুলেছে তোমার। তৌসিফ তো লাড্ডু হয়ে যাচ্ছে। বেচারা কতই না কষ্টে আছে। তুমি কিন্তু মাঝেমধ্যে ধরা দিও। পুরুষ মানুষ বলে কথা!
আরেকজন যেন বেশ অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ। সে বললো,
— ইনার পরিও না এখন পৌষ। তৌসিফ’কে বলে ম্যাটার্নিটির পোশাক পরিও। ইনার পরা এই সময় ক্ষতিকর।
এমন নানান কথা তারা বলে যাচ্ছে যা পৌষ’র ভালো লাগছে না। ও দেখলো তৌসিফ এদিকেই আসছে। হাতে ফলের প্লেট। সবার মাঝখানে নিজে বসে বললো,
— স্পেস দাও ওকে।
একে একে সবাই যেতেই দম ছাড়ে পৌষ। তৌসিফ ওর মুখে আপেল দিতেই পৌষ বললো,
— ক্ষুধা লেগেছে।
— এটা খাও।
— এটা খেলে ক্ষুধা যাবে না তো।
— আচ্ছা, আমি দেখছি।

তৌসিফ বলায় এক ঘন্টা পরের খাবার আগেই সার্ভ করা হলো। তৌসিফ দেখলো রোস্ট দিয়ে পৌষ খাচ্ছে। অন্য কিছু দিলেও ধরছে না। ওর নাকি এটা মজা লেগেছে। অবাক করা বিষয় তিন পিস খেয়েও ও রোস্টই খাবে। তৌসিফ আনিয়ে দিতেই পৌষ অসহায় চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,
— আমার না লজ্জা লাগছে।
তৌসিফ এক ভ্রু উঁচু করে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
— এত খাচ্ছি যে। মন ভরে না আবার পেটও ভরে না।

ওর চোখে লজ্জা। তৌসিফ বুঝে গেলো মুড সুইং হচ্ছে। ও পৌষ’র গাল টেনে দিয়ে ফিসফিস করে বললো,
— এদের জামাই-বউকে লাখ টাকার একটা পারফিউম আর স্বর্ণের রিং দিয়েছি গিফট। উসুল করো হানি। রোস্ট দিয়ে হলেও উসুল করতে হবে। আমরা চারজন মিলে সবটুকু উসুল করব।
সরাসরি টিটকারি মা’রলো নাকি পৌষ’কেই পৌষ’র ভাষায় সান্ত্বনা দেয়া হলো তা বুঝে এলো না। পৌষ রোস্টে কামড় দিলো। তৌসিফ মৃদু হাসলো। তার জানটার নাকি এত ভালো লেগেছে।
তৌসিফ বন্ধুকে ডেকে বললো,
— রোস্ট প্যাক করে দে।
— এখানে তো প্যাক করার নিয়ম নেই দোস্ত।
তৌসিফ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
— পলিথিন নেই? পলিথিনে করেই দে।

রাত সাড়ে তিনটা। রোস্ট গরম করে এনেছে তৌসিফ। বন্ধু বহু কষ্টে প্যাক করিয়ে পাঠিয়েছে। তৌসিফ ঐ শেফের নাম্বার নিয়েছে। গরম ভাত দিয়ে রোস্ট খাচ্ছে পৌষ। মাঝে তৌসিফ’কে খায়িয়ে দিচ্ছে। ওর কাছে যেন অমৃত লাগছে এই রোস্ট। এক প্লেট ভরে ভাত খেয়ে ঢেকুর তুলে বললো,
— কাল আবার খাব। আছে?
তৌসিফ হেসে ফেলে। বলে উঠে,
— মুরগীরও ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটাতে কষ্ট হয় হানি। একদিনে ছয়টা রোস্ট খেয়েছো।
পৌষ তেঁতে উঠলো। বললো,
— একা খাই? আপনার দুই পেটুক খায় না? তিনজন দুই পিস করে ছয় পিস খেয়েছি। আপনি আমাকে খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছেন।
প্রথম দিকে রেগে গেলেও শেষের দিকে কেঁদে ফেললো। তৌসিফ হতভম্ব। আধ রাতে বউ কাঁদছে। তৌসিফ নাকি তাকে খাওয়া নিয়ে কথা শুনায়? প্লেট রেখে বউকে বুকে জড়ালো আগে। কপালে চোখে মুখে চুমু দিয়ে শান্ত করলো। বউ এখন কিটকিট করে হাসছে। ভাবা যায়, রাগ, কান্না, হাসি একসাথে। তার পৌষরাত দিয়েই সম্ভব।

তায়েফা এখানে থাকছে আজ দুই মাস। সাত মাস শেষের দিকে পৌষ’র। ইদানীং বেশ ঝামেলা হচ্ছে তার। তায়েফা থাকাতে বেশ উপকার হয়েছিলো তৌসিফে’র৷ তবে আজ ওকে যেতে হবে শশুর বাড়ী। শাশুড়ী নাকি পা ভেঙেছে। তৌসিফের মনে হচ্ছে ও মাঝ সমুদ্রে পড়েছে। তায়েফা অবশ্য যাওয়ার আগে তৌসিফ’কে হাজার বার বললো সে শিঘ্রই আসবে। পৌষ সেই থেকে কাঁদছে। তার ভালো লাগে না ইদানীং। তায়েফা ওর মাথা হাতড়ে ঘুম পাড়িয়ে গেলো। তৌসিফ ফোনে কথা বললো ডাক্তারের সাথে। পৌষ কান্নাকাটি করছে অতিরিক্ত। এরমধ্যে ভয়ে হাত-পা খিঁচে যায় ওর। মাঝেমধ্যে তৌসিফে’র গা শীতল হয়ে আসে। বিনা কারণে আধ রাতে উঠে কাঁদবে। তৌসিফে’র মনে হয় এর থেকে চুপ করা পৌষ ভালো। এমন কাঁদলে তৌসিফে’র দম আটকে আসে। বুকে জ্বালা হয়।
ডাক্তার সান্ত্বনা দিলো তৌসিফ’কে। ফোন রাখতেই শুনলো ঘুমের মধ্যে ব্যথায় গুঙিয়ে কাঁদছে পৌষ। তৌসিফ তারাতাড়ি ওর গালে চাপড় দিয়ে ডাকলো। ভয়ের চোটে এত জোরেই চাপড় দিলো যে পৌষ ঝট করে চোখ খুলে অ্যা অ্যা করে কেঁদে ফেললো। উঠতে চাইলো তবে পারলো না। পিঠের নিচে তৌসিফ হাত দিয়ে তুললেই উঠে বসে পেটে হাত দিলো। তৌসিফে’র চোখ লাল হয়ে আসছে ক্রমশ। পেটে নিজের হাত রাখলো। বাচ্চা দুটো ক্রমাগত নড়াচড়া করে যাচ্ছে। দাঁত খিঁচে পৌষ চুল টেনে ধরলো৷ তৌসিফ পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। মাথাটা বুকে নিয়ে বলে,

— কমে যাবে।
— অনেক ব্যথা।
— হ্যাঁ জান। আর কিছু দিন।
— বমি পাচ্ছে।

প্রেমসুধা পর্ব ৭২

সারা প্রেগন্যান্সি জুড়ে প্রথম দিকে বমি ছিলো একটু আর এখন এই শেষ সময়ে এসে অতিরিক্ত বমি হচ্ছে ওর।
বমি করে ক্লান্ত পৌষ বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে বসেছে। তার পা ব্যথা করছে। তৌসিফ শক্ত হাতে নরম করে টিপে দিচ্ছে। ওর ভেতর যেন কেউ খুবলে খাচ্ছে। বারবার আফসোস হচ্ছে কেন মা নেই। আজ পৌষ বা ওর মা থাকলে তো এমন হতো না৷ তারা তো বুঝতো কি করতে হবে। টিশার্টের হাতায় চোখ ডলে তৌসিফ। পৌষ গুঙিয়ে কাঁদে।
পরণে ঢোলাঢুলা পোশাকটা হাঁটু পর্যন্ত তুলে তৌসিফ মলম লাগালো হাঁটুতে। জয়েন্টে ব্যথা নাকি। পৌষ ঘুমালো বেশ সময় নিয়ে। তৌসিফ চোখ ডলে ওকে ঢাকলো। পেটের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলো কতক্ষণ। এত বড় পেট হয় তার জানা ছিলো না৷ ছোট্ট পৌষ’র বিশাল ফুলে উঠা পেট। তৌসিফের ভয় হয়। তার হাত-পা জমে যায়।
ওযু করে নামাজে দাঁড়িয়ে এবার কেঁদে উঠলো তৌসিফ। তার সত্যিই ভয় হচ্ছে। এমন ভয় আগে হয় নি।

প্রেমসুধা পর্ব ৭৪