প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯১
সাইয়্যারা খান
পরীক্ষার হলে পৌষ। বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছিলো তৌসিফ আর তুহিন। গাড়িতে দুই ভাই বেশিক্ষণ টিকতে পারে নি। বিল্ডিং এর সামনে এসে এদিক ওদিক পায়চারি করছে। তুহিনের ফোনটা বারবার রিং হচ্ছে। একটু সাইড হয়ে কল রিসিভ হতেই ওপাশ থেকেই পলকের কণ্ঠস্বর শোনা গেলো,
“তুহিন, কোথায় তুমি?”
“বাইরে আছি।”
“সেটা আমিও জানি।”
“তাহলে কল দিয়েছো কেন?”
“বুঝো না তুমি? এমন কেন করছো আমার সাথে? বাসায় এসো।”
“কাজে আছি আমি।”
“ভাইয়ের বউকে পাহারা দেওয়া তোমার কাজ না।”
“আমার কাজ তোমাকে শিখাতে হবে না।”
“দেখো তুহিন, আমার এখন একদমই ভালো লাগছে না। তুমি বাসায় এসো। মেঝ ভাইয়া আছে পৌষকে দেখতে।”
“আমি কখন বললাম, মেঝ ভাইয়া নেই?”
পলক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“প্লিজ, কাম টু মি তুহিন।”
“আমি ব্যাস্ত।”
তুহিনের কণ্ঠে ঝড়ে পড়া হেলামি। পলক বুঝলো। এবারে নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়েই বললো,
“এত কিসের দরদ ওর প্রতি? ঘরে বউ নেই তোমার? আমার কিন্তু একদম সহ্য হচ্ছে না তুহিন। আমি কিন্তু..”
পলক শেষ করতে পারলো না কথা। তুহিন খুব জোড়ালো কণ্ঠে বললো,
“কি? তুমি কিন্তু কি? তুমি তোমার আদরের সৎ বোন পিয়াসীকে দিয়ে মেঝ ভাইয়ার সংসার ভাঙবে? এতই সোজা পলক? তুমি কি ভেবেছো পৌষ এতই পা’গল? তোমার বোনের চেষ্টায় ওর সংসার ভাঙবে? বোকার রাজ্যে আছো, ওখানেই থাকো। আমি তোমাকে ভালোবেসে যেই পাপ করেছি, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে এ জীবনটা না বিলিয়ে দিতে হয়।”
কল কেটে দিলো তুহিন। পলক থ হয়ে গেলো। তুহিন জেনে গিয়েছে। এ-র মানে এতদিন জেনেও চুপ ছিলো। পিয়াসী কি তবে সব বলে দিয়েছে তুহিনকে? পলক ঘামতে লাগলো। ওর মনে হলো সংসারটা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তুহিন যেহেতু সব জানে এরমানে তৌসিফও জানে। তৌসিফ, হ্যাঁ তৌসিফ তো ছাড়বে না পলককে। পলক যেন দিশেহারা হয়ে গেলো। ওর আশেপাশে চেপে আসছে ক্রমাগত। পলকের শ্বাস আটকে আসছে। ঘামছে দরদরিয়ে।
আদিত্যের সাথে বেরিয়ে এসেছে পৌষ। এই যে আদিত্য এতবার বললো ওর হাত ধরতে পৌষ রাজি না। ওর একই কথা, পৌষ কি অক্ষম নাকি? আদিত্য এদিক ওদিক তাকিয়ে রাস্তা দেখে। সামান্য ইটের টুকরো থাকলেও যেন ক্ষতি। তৌসিফ ওদের আসতে দেখেই দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। পৌষের হাত ধরে ধীরে ধীরে বাইরে এনে আগে বসালো। পেটে হাত চেপে বসলো পৌষ। তৌসিফ পানির বোতলটার মুখ খুলে দিলো। পৌষের মুখের সামনে ধরতেই পৌষ ঢকঢক করে পানি পান করলো। আধ বোতলের বেশি একবারে গিলে নিতেই তৌসিফের মুখে চিন্তার ভাজ দেখা মিললো। তার এখন সবেতেই সন্দেহ। পৌষের একবারে পানি খাওয়া নিয়েও তার মুখে চিন্তার ভাজ স্পষ্ট। পৌষ একটু হাঁপাচ্ছে। তুহিন এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। এসেই আদিত্যকে উদ্দেশ্য করে ধমক দিলো,
“গরমে এখানে বসিয়েছিস কেন? গাড়িতে তুল।”
“মেঝ চাচ্চুই তো বসিয়েছে।”
তুহিন ভাইয়ের দিকে তাকালো। দেখলো চোখে মুখে বিস্তর চিন্তা৷ তুহিন পৌষের সামনে এসে বললো,
“উঠে এসো। এসো, গাড়িতে বসে জিরিয়ে নিও।”
তৌসিফ শ্বাস নিলো কতক্ষণ। পৌষের হাত ধরে উঠালো। পৌষ এতক্ষণে মুখ খুললো,
“ক্ষুধা লেগেছে।”
তৌসিফের টনক নড়লো। পৌষকে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
“কি খাবে আমার তোতাপাখি?”
“জানি না কিন্তু খাব।”
“আচ্ছা, আসো আমি দেখছি।”
গাড়িতে বসিয়ে এসিটা অন করে দিলো তৌসিফ। আদিত্য ওদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“নুডলস আনি৷ এই সময়ে ক্যান্টিনে রান্না করে। ফ্রেশ পাব।”
তুহিন নাকচ করলো,
” না না, কেমন না কেমন হয়।”
পৌষ জোর দিলো,
“না। খাব। অনেক ক্ষুধা লেগেছে আমার।”
তৌসিফ আদিত্যকে আনতে বললো। আদিত্য দৌড়ে গিয়েছে। পৌষ পানির বোতল আবার হাতে তুললো। তৌসিফ ওর মাথায় হাত রেখে বললো,
“এত পানি খেও না। আদিত্য আসছে তো।”
তুহিন সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বললো,
“অ্যাঁই, পৌষ? খারাপ লাগছে?”
পৌষ মাথাটা এলিয়ে দিলো। তৌসিফের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে না দিতেই তৌসিফের বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। তাড়াতাড়ি এসে পৌষের মাথাটা বুকে জড়িয়ে নিতেই তুহিন ভয় পেয়ে গেলো। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ওর কি খারাপ লাগছে?”
“বুঝতে পারছি না।”
তৌসিফ যেন কেঁদে দিবে দিবে ভাব। পৌষ ওকে শক্ত করে ধরে রাখলো। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে রইলো কিছুক্ষণ অতঃপর শান্ত হলো ধীরে ধীরে। তৌসিফ কাঁপা কাঁপা হাত ওর মাথায় বুলালো। একটু ধাতস্থ হয়ে পৌষ বললো,
“এখন ঠিক আছি।”
“পুরোপুরি ঠিক?”
“হ্যাঁ।”
“পৌষরাত?”
“অ্যাঁই! কাঁদবেন নাকি?”
পৌষ ওকে ছেড়ে দিলো। পেটের ভেতর খুব নড়চড় হচ্ছিলো। সেই নড়চড়েই ব্যথা উঠেছিলো। পৌষ বরাবরই শক্ত ধাঁচের। সামান্যতে ভেঙে পড়ার মেয়ে সে নয়। ব্যথা লুকাতে লুকাতে এখন ব্যথা প্রকাশেও ভীষণ অবহেলা তার। তৌসিফ ওর পেটে হাত বুলিয়ে দিলো। বললো নরম স্বরে,
“ব্যথা এখনও আছে?”
“না।”
“পুষি দেখো।”
নুডলস ওর মুখের সামনে নিয়ে এসেছে আদিত্য। গাড়ির পেছনে বসা তৌসিফ পৌষকে নিয়ে। তুহিন ড্রাইভিং সিটে বসতেই আদিত্য ওর পাশে বসলো। পৌষ মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে নুডলস। খুব সাধারণ ভাবে রান্না করা তবে পৌষের অমৃত লাগছে। তুহিন পেছনে না ঘুরেই জিজ্ঞেস করলো,
“গাড়ি স্টার্ট দিব?”
মুখে থাকা নুডলস টেনে নিলো পৌষ। শুধু শব্দ করলো,
“হুঁ।”
গাড়ি চলতে চলতেই পৌষের খাওয়া শেষ। তৌসিফ টিস্যু দিয়ে ওর মুখ মুছালো। এই তো মিনিট দুই গেলো ওমনিই পৌষ জানালা দিয়ে এদিক ওদিক তাকিতুকি শুরু করেছে। তুহিন সামনে বসেই ঠাট্টা স্বরে বললো,
“ইঁদুরের মতো চুঁইচুঁই করছো কেন?”
পৌষ উত্তর দিলো না। ভীষণ মায়া নিয়ে তাকালো তৌসিফের দিকে। তৌসিফের এক হাত পৌষের বাড়ন্ত পেটের নিচে। সামান্য ঝাকিটুকুর ব্যথাও তৌসিফ যেন লাগতে দিবে না ওর পৌষরাতের গায়ে। পৌষের তাকানো দেখে তৌসিফ এক ভ্রুঁ তুলে বললো,
“দাবিটা কি?”
“রাখা হবে নাকি যে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে?”
“বলেই দেখা হোক।”
“তাহলে চা আনানো হোক।”
“অসময়ে চা!”
“আমি কি অসময়ে চা চাই নাকি? পেটের জন চাইছে।”
“আমার দাঁত না ওঠা দুধেরও তো বাচ্চা না সে কি না চাইবে চা?”
“জিজ্ঞেস করুন!”
তৌসিফ মিছেমিছি কথা বললো। এসব তার স্বভাবের বাইরে অথচ নিরদ্বিধায় সে পেটের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করলো,
“কুটুপাখি কি চা খাবে?”
মুখ তুলে শয়তানি হাসলো তৌসিফ। বললো,
“খাবে না বললো।”
সাথে সাথেই এতক্ষণ আদর আদর কথা বলা পৌষের মনমেজাজ বিগড়ে গেলো। তেঁতে উঠলো সে,
“*লের চা খেতে চেয়েছি। দুনিয়ার কৈফিয়ত দিতে হয়। খাব না৷ যাব না হাসপাতালে। তুহিন ভাইয়া! গাড়ি ঘুরান। করব না আলট্রা!”
তৌসিফ থতমত খেয়ে গেলো। বউ তার হঠাৎ রেগে গেলো কেন? তৌসিফের মুখরা দেখেই তুহিন সামনে তাকিয়েই বললো,
“চিল মেঝ ভাইয়া। ইটস দ্যা ব্লাডি মুড সুইং!”
“একদম চাপা ভেঙে দিব। ড্রাইভারগিড়ি ছুটিয়ে দিব।”
পৌষ খেঁকিয়ে উঠলো। আদিত্য ভেজা বিড়ালের মতো চুপচাপ বসে আছে। কিছু বললেই মুশকিল দেখা দিবে।
হসপিটালের ওয়েটিং জোনে বসা চারজন। পৌষ চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। বেশ খোশমেজাজে আছে সে। তৌসিফের মুখের সামনে কাপ নিয়ে একবার সাধলো,
“এক চুমুক খাবেন?”
“তুমি খাও।”
“কুটুস বলছে ওর বাবাকেও খেতে।”
তৌসিফ মাথা নেড়ে চুমুক দিলো। পৌষ নিজের কাপ ফিরিয়ে নিলো। বললো,
“বউ বললো খেলেন না৷ বাচ্চা বলতেই খেয়ে নিলেন৷ খুব দুঃখ পেলাম।”
তৌসিফ ভেবেই নিলো তার বউয়ের মুড সুইং হচ্ছে। পৌষরাত নামটা ডাকতেই ওরা উঠে দাঁড়ালো। এসেছে মিনিট পাঁচ হবে। সিরিয়াল দেওয়া লাগে নি। মিরপুরের এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারটা তৌসিফের। ভেতরে ঢুকলো শুধু মাত্র তৌসিফ আর পৌষ। ডক্টর মিতা পৌষকে দেখেই হাসলেন। হালহকিকত জিজ্ঞেস করে প্রেশার মাপতে মাপতে বললেন,
“শরীর কেমন পৌষ?”
“ভালো, আলহামদুলিল্লাহ।”
“রাতে ঘুম হয়?”
“পুরোপুরি না।”
“ঘুমাতে হবে পর্যাপ্ত পরিমাণে। খাওয়া দাওয়া করছো তো ঠিকঠাক?”
“হ্যাঁ। আমি তো খুব খাচ্ছি।”
“তাই নাকি? এটা তো খুব ভালো কথা। প্রেশার একদম নরমাল আছে। চলো আমরা আলট্রা করে ফেলি।”
তৌসিফ মাঝে বলে উঠলো,
“প্রেশার গত সপ্তাহে ডাউন ছিলো।”
“আমি দেখছি তৌসিফ। তুমি শান্ত থাকো।”
ডক্টর মিতা তৌসিফ তালুকদার নিয়ে খুবই বিরক্ত। মাঝেমধ্যে খুব হাসি পায় তার। তৌসিফ মুখ লটকে নিলো তবে ঠিট হয়ে বললো,
“আমি কিন্তু সাথে যাব।”
“বাবু দেখবে?”
তৌসিফ মাথা নাড়ে। দু’জন আলট্রা রুমে যেতেই পৌষকে শোয়ালো বেডে। নার্স এসেছে একজন সাথে। পেটে আলট্রাসাউন্ডজেল লাগাতেই তৌসিফ পৌষের একটা হাত ধরলো। হাতটা খুব শক্ত করে ধরে রাখলো। পৌষের ভেতরেও অস্থির লাগছে তবে তা প্রকাশ করছে না। তৌসিফ হাতটা ধরায় সাহস পাচ্ছে একটু।
ডক্টর ট্রান্সডিউসার পৌষের পেটে ঘুরালো যা উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সীর শব্দ তরঙ্গ পাঠালো। মনিটরে তখনও তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ তৌসিফ খেয়াল করলো এসির ঠান্ডায়ও ঘেমে যাচ্ছে ও৷ পৌষ মুখ খিঁচে আছে। হঠাৎ, একদম হঠাৎ ডক্টর মিতার কণ্ঠ শোনা গেলো,
“এই দেখো!”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯০
দুজনেই তাকালো মনিটরে৷ কিছু বুঝার আগেই ডক্টর মিতার উচ্ছাস শোনা গেলো,
“ও মাই গড! ইটস অ্যা টুইন প্রেগন্যান্সি। লুক, এই যে। দেখছো। ওরা দু’জন।”
হ্যাঁ, স্ক্রিনে ওরা দুজনেই দেখছে দুটো অস্তিত্ব। স্পষ্ট দুটো অস্তিত্ব। তৌসিফ তো পৌষের সানিধ্যে আসার পর থেকেই গলতে শুরু করেছে, এই মূহুর্তে সে আর টিকতে পারলো না। চোখের পানি ছেড়ে দিলো। পৌষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেখানে। তার পেটের ভেতর দুটো কুট্টুস কবে এলো?
