Home প্রেমের ধূলিঝড় প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৪

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৪

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৪
ফিজা সিদ্দিকী

মোচড়ামুচড়ি করতে করতে এক পর্যায়ে রাগে গর্জে উঠে নন্দিতা দাঁত বসায় তুর্জয়ের উন্মুক্ত গলায়। তুর্জয় নন্দিতাকে ছাড়ার বদলে আরও করে পাকড়াও করে। বলে,
“আজ কোর্ট ক্যান্সেল। বউয়ের এমন জংলী বিল্লি রূপ রোজ রোজ দেখা মেলে নাকি! দেখা যখন মিলেছে বিড়াল মারার দায়িত্ব থেকে পালাই কীভাবে?”
“আপনি কেন এসেছেন এখানে?”
“বউয়ের টানে।”
“চলে যান আপনি। আমি একা থাকতে চাই।”

তুর্জয় ছোটো করে চুমু খায় নন্দিতার কপালে। এরপর নাকের ডগায়, দুই চোখে, থুতনিতে, গলায়। ঠোঁট বাদ রেখে কপাল থেকে সরলরেখা বরাবর চুমু খেয়ে মাথা তোলে। নন্দিতার দুইগালে হাতের আজলায় আগলে চোখে চোখ রেখে নরম কণ্ঠে বলে,
“তোমাকে ছাড়া আমার দমবন্ধ লাগে, জানো না? আর কতো পরীক্ষা নেবে আমার ভালোবাসার?”
গাল থেকে তুর্জয়ের হাত সরিয়ে ফেলে নন্দিতা। মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই তার থুতনি ধরে জোরপূর্বক নিজের দিকে ফেরায় তুর্জয়। নরম কণ্ঠে বলে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“তোমার উপর রাগটা আমার কোর্ট থেকে বের হওয়ার পরপরই কাজ করছিল। কিন্তু সেটা এতটা তীব্র ছিল না যে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেব তোমাকে। রাগ, ঝগড়া, মারামারি সব হোক, তবুও দূরত্ব না হোক। কিন্তু যে মুহূর্তে আমাদের মাঝে ঝামেলা চলছিল, আমি দেয়ালে একটা লেজার লাইট দেখতে পেয়েছি। আমি ছাড়া গোটা বাড়িতে একা একা কাটাও তুমি সারাদিন, এমন একটা পরিস্থিতিতে কীভাবে ওখানে একা রেখে দিই তোমাকে? কেউ আমাদের ফলো করছে নন্দিতা।”
কথাটুকু শেষ হতেই নন্দিতার দিকে তাকালো তুর্জয়। দুই চোখে তার পানি ভরা, কাঁপছে ঠোঁটও। মোচড়ামুচড়ি না করে শান্ত হয়েছে তার শরীর। তুর্জয় মুখ নামিয়ে আলতো করে চুমু খেল নন্দিতার ঠোঁটে। এরপর মুখ তুলে মোহগ্রস্ত কণ্ঠে বললো,

“দুটো দিনের পিপাসা মেটাবো আমি এখন। একদম নড়চড় করবে না। নাহলে, এই তৃষ্ণার্ত প্রেমিক সবকিছু ছেড়েছুড়ে সারাদিন সময় নিয়ে তার তৃষ্ণা নিবারণ করবে।”
কথাটুকু শেষ করে আবারও ডুব দিলো সে নন্দিতার ঠোঁটে। উন্মত্তের মতো তার পিপাসার্ত হৃদয়ের পিপাসা করতে উন্মুখ হয়ে পড়লো। নন্দিতাও বাধা দিলো না। শরমে সমান তালে খামচে ধরলো তুর্জয়ের মাথার পিছনের এলোমেলো চুল।
কোর্টের কার্যক্রম শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। নন্দিতার কথামতো পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়েই কোর্টে উপস্থিত হয়েছে আজ তুর্জয়। তবে শেষবেলায় নন্দিতার বলা কথাটুকু নিয়ে এখনো ভাবছে সে। তাকে বিদায় দেওয়ার সময় নন্দিতার ঠোঁটের কোণে ছিল ক্ষীণ হাসি। হাসতে হাসতেই বলেছিলো,

“মেলায় পুতুল নাচ হয় দেখেছেন?”
তুর্জয় হ্যা সূচক মাথা নাড়াতেই নন্দিতা খানিকটা এগিয়ে এসে নরম কণ্ঠে বললো,
“আজকে দিনটা আপনি আমার নামে লিখে দিতে পারবেন? ধরে নিন আপনি আজ মেলার সেই পুতুল, যার রশি থাকবে আমার হাতে। বিশ্বাস করুন, কালকের সকালটা সুন্দর করে দেব।”
তুর্জয় অবুঝের মতো মাথা নাড়ালেও কথাটা এখন ভাবাচ্ছে তাকে। কী এমন করতে চাইছে নন্দিতা? যেখানে নিজের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে নন্দিতার উপর।
বিচারক উপস্থিত হওয়ার পরপরই শুরু হয় কোর্টের জিজ্ঞাসাবাদের কর্মসূচি। এডভোকেট গাঙ্গুলি আচমকা বিচারকের উদ্দেশ্যে বলে উঠেন,

“আজ আমি এই কেসের এমন এক মুখ্য প্রমাণ পেশ করতে যাচ্ছি, যেখানে এডভোকেট তুর্জয় আহসান এবং তার এই কেসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা সবটুকু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেইসাথে এক কথার সকল যুক্তি তর্ককে মিথ্যা করে আদালতের সামনে প্রমাণ হয়ে যাবে এই কেসের একমাত্র আসামি এডভোকেট তুর্জয় আহসান। এবং আমি আদালতের কাছে অনুরোধ করব, তার লাইসেন্স ক্যান্সেল করে এমন একজন দুশ্চরিত্র লোকের থেকে আদালতকে মুক্ত করা হোক। যারা আইনের মধ্যে থেকে আইনের নামে শপথ করে, সমাজ এবং মানুষের মধ্যে নোংরা প্রভাব ফেলে।”

“অবজেকশন বিচারক সাহেব। বিচারকের সামনে বসে আমার বিপক্ষীয় দলের বন্ধু কিভাবে নিজেই বিচার শুনিয়ে দিতে পারেন? এটাতে কী তিনি বিচারককে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে অপমান করছেন না?”
বিচারক দিব্য গাঙ্গুলিকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“আপনি আপনার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন এডভোকেট গাঙ্গুলি। একজন সিনিয়র এডভোকেট হিসেবে আপনি অযথা কথা না বাড়িয়ে প্রমাণ পেশ করুন আদালতে।”
“আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।”
তুর্জয় তার নিজের আসনে বসে পড়তেই দিব্য টেবিল থেকে একটা মেডিকেল রিপোর্টার খাম হাতে নিয়ে এগিয়ে দেয় বিচারকের দিকে। তুর্জয়ের সাথে চোখাচোখি হতেই ক্রুর হাসে সে। অতঃপর বিচারকের দিকে মুখ করে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে ওঠে,

“আমার বিপক্ষীয় দলের বন্ধু নারী এবং মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, গোপনে তিনি ড্রাগসের ব্যবসার সাথেও জড়িত। শিকদারদের সাথে তার সম্পর্ক বেশ পুরোনো, সেই সুবাদে তাদের ব্যবসার আড়ালে তিনি নিজের ড্রাগসের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে তৎপর হলে শিকদারদের সাথে মনোমালিন্য হয় তার। আমার ক্লায়েন্ট যখন তার প্রস্তাবে রাজি হয়না তখন তিনি তাকে আইনি ঝামেলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন। এছাড়া তার নিজের মুখের স্বীকারোক্তি আমি কোর্টের সামনে পেশ করতে চাই, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে আমার ক্লায়েন্টকে হুমকি দেন। বলেন, আজ পর্যন্ত কোনো কেস হেরে যাওয়ার রেকর্ড তার নেই।

আর তিনি আমার ক্লায়েন্টকে একদম বরবাদ করে দেবেন। এছাড়াও, তার নারী আসক্ত এবং মাদকাসক্ত হওয়ার প্রমাণও আমি আদালতের সামনে পেশ করেছি। ওখানে কয়েকটা ছবি আছ, যেখানে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে এডভোকেট তুর্জয় আহসান নেশায় বুঁদ হয়ে বিভিন্ন নারীর সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ। তার কুকর্মের আরও একটা প্রমান হলো, তিনি এইডস আসক্ত। তার রিপোর্টও আমি পেশ করেছি আদালতের সামনে। এইডস রোগ যেন তেন সাধারণ রোগ নয়, এটা আমরা সবাই জানি বিচারক সাহেব। তাই আমার আদালতের কাছে অনুরোধ, আমার ক্লায়েন্টকে বিনা অপরাধে এতখানি হেনস্থা করার শাস্তি হিসেবে তার বিরুদ্ধে যথাযথ স্টেপ নেওয়া হোক। এমন লোক আমাদের আইন ব্যবস্থার জন্য বিপদজনক।”

ঘটনার আকস্মিকতায় পুরোপুরি তাজ্জব বনে যায় তুর্জয়। তার পায়ের তলায় পড়ে থাকা বাঁচাখোচা মাটিটুকুও যেন সরে যায় মুহূর্তের মাঝে। তবুও নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে দূর্বল কণ্ঠে বলে ওঠে,
“এসব মিথ্যা। সবটা সাজানো নাটক, বিচারক সাহেব। আমাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হচ্ছে।”
“আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে?”

তুর্জয় যেন হকচকিয়ে যায়। এই আক্রমণের জন্য তো প্রস্তুত ছিল না সে। তবুও কন্ঠ খানিকটা পরিষ্কার করে সে বলে,
“বিগত দিনের অভিযোগের বেশ কিছু প্রমাণ আমার কাছে আছে বিচারক সাহেব। আমার ব্যাংক স্টেটমেন্টের অর্ধেক অংশ দেখানো হয়েছিল আদালতে বেশ কৌশল করে। এটা হলো আর পুরোটা। যেখানে পরিকল্পিতভাবে সেই টাকার অংকটা আমার ব্যাংকে পাঠানো তো হয়, আবার একইভাবে সেটা ফেরতও চলে যায়। আমাকে যদি এই টাকাটা দেওয়ায় হতো, তবে ফেরত গেল কেন? আমার বিপক্ষীয় বন্ধু কী সেই কথার উত্তর দিতে পারবেন?”

“বিচারক সাহেব, আমি যদি মেনেও নিই সবটুকু ভূয়া আর মিথ্যা, তবুও এডভোকেট তুর্জয় আহসানের শরীরে বাসা বেঁধে থাকা এইডস রোগ নিয়ে আর মেয়েলী কেলেঙ্কারি নিয়ে তিনি কী বলবেন? এর কোনো উত্তর আছে তার আছে? নাকি এখন উনি বলবেন, এই ভাইরাস উড়ে এসে তার শরীরে ঢুকে পড়েছে, তিনি একদম ইনোসেন্ট।”
কোর্টের শান্ত পরিবেশ আচমকা অশান্ত হয়ে পড়ল। চারিদিক থেকে শোনা গেল সকলের হাসির কলতান। বিচারক সবাইকে চুপ করার নির্দেশ দিলেন। সকলের সামনে নিজের সম্মান নিয়ে টানাটানি আর নিতে পারল না তুর্জয়। তাকে এভাবে ব্যাক্তিগত আক্রমণ করা হবে, দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি সে। টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসটা হাতে উঠিয়ে একঢোকে শেষ করলেন তিনি। অতঃপর ধপাস করে বসে পড়লেন চেয়ারে। ঠিক এই সময়ই তুর্জয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এডভোকেট গাঙ্গুলি বলে ওঠেন,

” এডভোকেট আহসানের নীরবতা বলে দিচ্ছে অভিযোগ কোনো অংশে মিথ্যা নয়। তিনি রীতিমত এসব পাপ কাজের সাথে জড়িত। এতদিন পর্যন্ত আদালত তার প্রমাণ পায়নি, আর আজ যখন সেসব আমাদের চোখে সামনে, আমি আপনার কাছে আর্জি করবো এর উপযুক্ত শাস্তির জন্য।”
“অবজেকশন ইওর অনার! কারোর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে তাকে অভিযুক্ত প্রমাণ করার বড্ডো বেশি তাড়া এডভোকেট দিব্য গাঙ্গুলির।”
“আপনি একজন বহিরাগত হয়ে কোর্টের বিচার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।”

বিচারকের কথা শুনে সামনে এগিয়ে এলো নন্দিতা। ধবধবে সাদা শাড়ির উপর ব্ল্যাক কোর্টটা গৌরবে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। বিচারকের সামনে মাথা নত করে তাকে সম্মান জানিয়ে অত্যন্ত আত্মঅহমিকার সাথে কোয়েকজোড়া কাগজ পেশ করে সে বিচারকের সামনে। অতঃপর আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে ওঠে,
“আমি এই কেসের অ্যাসিসটেন্ট এডভোকেট। এডভোকেট তুর্জয় আহসানের ফেভারে, তার অসুস্থতায় আমি তার হয়ে এই কেসটা কন্টিনিউ করতে চাই। এক্ষেত্রে আমার সিনিয়র স্যার এডভোকেট তুর্জয় আহসান আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। এখন যদি আপনি অনুমতি দেন, আমি আমার কার্যক্রম শুরু করতে পারি।”
বিচারক তার হাতে থাকা কাগজে নজর বোলালো। নন্দিতার আইন পাশ করা এবং লাইসেন্স সার্টিফিকেট আছে সেখানে। এ গ্রেডে পাশ করা বেশ ভালো মানের একজন ছাত্রী হলেও কোর্টে প্র্যাকটিস তার নেই। তাই খানিকটা সন্দিহান কণ্ঠে তিনি নন্দিতাকে বললেন,

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৩

“আপনি এই কেসটা হ্যান্ডেল করতে পারবেন, শিওর? যথেষ্ট জটিল এই কারবাহি।”
নন্দিতা ক্ষীণ হেসে বললো,
“সত্যকে প্রমাণ করতে এতো কারচুপি করতে হয়না বিচারক সাহেব। সত্য তার রাস্তা নিজেই খুঁজে নেয়। এছাড়া যেটুকু আইনি জ্ঞ্যান আমার আছে, সেটুকু দিয়ে আমি আমার সবটুকু চেষ্টা চালাবো অপরাধী শাস্তি না পেলেও কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন শাস্তি না পায়।”

প্রেমের ধূলিঝড় পর্ব ৪৫