Home প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ পর্ব ৬৭

প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ পর্ব ৬৭

প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ পর্ব ৬৭
Afnan Lara

সবাইকে বিদায় জানিয়ে আহানা শান্ত মিলে গাবতলি পৌঁছালো
এবার লঞ্চ আসার অপেক্ষা,আহানা ছোটবেলায় একবার কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে লঞ্চে করে সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলো,অনেক বছর হয়ে যাওয়ায় লঞ্চে উঠার অনুভূতিটা নতুনই মনে হচ্ছে, শান্ত ব্যাগ হাতে নিয়ে রোবটের মতন দাঁড়িয়ে আছে শতে শতের মানুষের ভিড়ে,পাশেই আহানা চিমটি দিয়ে শান্তর জ্যাকেট ধরে আছে,কে জানি যদি হারিয়ে যাই,এত মানুষ জনমে দেখি নাই!
শান্তর পরনে ছিলো মেরুন কালারের একটা জ্যাকেট,চোখে ছিলো কমলা রঙের সানগ্লাস, আর আহানা কমলা রঙের একটা কোটা শাড়ী পরে আছে,চুলে খোঁপা করে সাদা রঙের গাজরা লাগিয়ে রেখেছে তাতে
তো এত এত মানুষের ভিড়ে তাদের দেখে মনে হচ্ছিলো একজোড়া উজ্জ্বল তারা
শত শত তারার ভিড়ে তারা শুকতারা আর সন্ধ্যাতারা হয়ে প্রোজ্জ্বলিত হয়ে আছে যেন
আহানা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লঞ্চ গুলোর ফাঁক দিয়ে চেয়ে দূরের পানিতে চলমান লঞ্চ গুলো দেখছে
কিরকম একটা শব্দ এই বাহনগুলোর,আহানার কেমন ভয় ভয় করে এমন শব্দ শুনলেই
লঞ্চ এসে পড়েছে ১৫মিনিটের মধ্যেই,শান্ত এক হাতে ব্যাগ নিয়ে আরেক হাতে আহানার হাত ধরে ওকে নিয়ে লঞ্চে ঢুকতেছে

আহানা এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে বললো”খোলামেলা জায়গা দেখে সিট নিয়েছেন তো?আমি কিন্তু ভিতরে বসবো না”
শান্ত পিছন ফিরে একবার তাকালো তারপর আবার হাঁটতে হাঁটতে বললো”ঠিক ধরেছো,আমি ভিতরের সিটই নিয়েছি”
কিন্তু কেন?
এত বাতাসে ঠাণ্ডা লেগে যাবে তার উপর পড়ে যাওয়ার চান্স থাকে
না প্লিস আমি বাইরে বসবো
সিটে ব্যাগ রেখে না হয় বারান্দা থেকে ঘুরিয়ে আনবো তোমাকে
আহানা মুখ গোমড়া করে বাধ্য হয়ে লঞ্চের ভেতরের সিটগুলোয় বসে আছে,শান্ত ওর পাশে বসে ফোনো গেমস খেলছে
সম্ভবত গেমসটার নাম”টিনি হোপ”
সেখানে একটা কিউট লিটল পটকার মতো বস্তু হচ্ছে নায়ক,সে উড়ে উড়ে,ঠেলে ঠেলে লাস্টে একটা গর্তে গিয়ে পড়ে খুশিতে ছলছল চোখে তাকায় থাকে,আহানা মনযোগ দিয়ে দেখলো,ভালোই লাগলো তবে বোরিং ও লাগলো
সব সেম,খালি ঠেলে ঠেলে সে গর্ত পর্যন্ত পোঁছায় আর কোনো কাজ নাই,গেমস হওয়া উচিত ইন্টারেস্টিং,রহস্যজনক,যেমন “ইসকেপ ডোর”ওগুলায় মাথা খাটিয়ে দরজা খুলতে হয়,আমার তো সেই গেমস ভাল্লাগে,আর এই মহাশয়কে দেখো,৫বছরের বাচ্চাদের গেমস খেলছে বসে বসে

আহানা এবার তার ডান পাশে তাকালো,একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা বসে আছেন,চোখে চশমা পরা তবে পরনে সেলোয়ার কামিজ,মাথায় ওড়না পেঁচানো,বেশ ভদ্রমহিলা তিনি,চুপ করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন,মাঝে মাঝে বলছেন কিরে তোরা আসবি কখন?আমাকে তো নেস নাই আমি নাকি কেঁপে পানিতে পড়ে যাব,ঠিক করিসনি আমাকে না নিয়ে
আহানা বুঝতে পারলো মহিলাটির পরিবার বারান্দা দিয়ে পানি দেখতে গেছে সাথে করে তাকে নেয়নি হয়ত তিনি পড়ে যাবেন এই ভয়ে
ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক কারণ এমন দূর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে,
যাই হোক ৫/৬মিনিট ধরে মহিলাটির চেঁচামেচির পর তার পরিবার আসলো
একটি মেয়ে সাথে তার জমজ দুটি ছেলে,বয়স ৫/৬বছর হবে
আহানা তাদের দিকে চেয়ে আছে এক দৃষ্টিতে,কি সুন্দর বাচ্চাগুলা,তবে বাচ্চাগুলোর সাথে মেয়েটির চেহারার সাথে মানালো না একটুও,কি হয় সে বাচ্চাদের?

মেয়েটা বয়স্ক মহিলাটির পাশে বসতেই আহানা বললো”এক্সকিউজ মি বাচ্চাগুলা কি আপনার? তাহলে কিছু প্রশ্ন করতাম,জমজ বেবি নিয়ে”
মেয়েটি কিছুটা চমকালো এমন প্রশ্ন শুনে তারপর বললো “হুম,,এরা আমার বাচ্চা”
ওহহ
আহানা আর কিছু বললো না
আহানা আর কোনো কথা বলছে না দেখে মেয়েটি ফের বললো”পিয়াশ তিয়াশ বাবারা যাও তোমাদের পাপার কাছে”
মায়ের কথা মতন বাচ্চাগুলা সিট থেকে নেমে বারান্দার দিকে ছুটলো,মেয়েটি শুকনো মুখ করে আহানার দিকে চেয়ে বললো”আপনার ঐ প্রশ্নের কারন আমি বুঝতে পেরেছি,আসলে ওরা আমার বাচ্চা না,আমি ওদের একটা অনাথ আশ্রম থেকে দত্তক নিয়েছিলাম,আমি কোনোদিন মা হতে পারবো না বলে
তবে মনে যত খুঁত ছিলো এদের পেয়ে সব ভুলে গেছি,আমি এখন সুখী,আরও সুখী আমার এমন একজন স্বামীকে পেয়ে যে কিনা আমার অক্ষমতা জেনেও আমার পাশে আছেন আজও

আহানা মুচকি হেসে বললো”আলহামদুলিল্লাহ”
শান্ত গেমস খেলা রেখে আহানার হাত ধরে এক টান দিয়ে বললো”কি হয়েছে?”
একটা প্রশ্ন করি?
জি করেন
আমি যদি কোনোদিন মা না হতে পারি?
এক গবেষনায় দেখা গেছে অধিক ঝাঁঝ আলা মেয়েদের একটা নয় ২টা করে বাচ্চা হয়,সো আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তোমার বেবি হবে
উফফফ,মজা করবেন না!সিরিয়াসলি উত্তর দেন না
বাচ্চাই জীবনের সব কিছু না আহানা!সো ডোন্ট ওয়ারি
শান্তর কথা শুনে আহানা খুশি হবে নাকি মন খারাপ করে থাকবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না
শান্ত সিটে হেলান দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে কারণ বিকালে রওনা হয়েছে তারা আর এখন বাজে সন্ধ্যা ৭টা
আহানা যখন দেখলো শান্ত ঘুমাচ্ছে সে আস্তে করে উঠলো বারান্দাটা ঘুরে আসবে বলে কিন্তু আফসোস কিসের যেন টান খেয়ে সে এক কদমের বেশি ফেলতে পারেনি সামনে
তাই পিছন ফিরে চেয়ে দেখলো তার হলুদ রঙের শাড়ীটার আঁচল শান্তর হাতে গিট্টু দেওয়া
আজব তো!
গিট্টু দিলো কখন?আর কেনোই বা দিলো?

আহানা আবারও ফেরত এসে গিট্টু খোলায় মনযোগ দিয়েছে,শান্ত ততক্ষণে জেগে ড্যাবড্যাব করে কিছুক্ষন চেয়ে থেকে বললো”কোথায় পালাচ্ছিলা?”
আপনি আগে বলেন আমার আঁচল বেঁধে রেখেছিলেন কেন?
কারণ তোমার স্বভাবের সাথে আমি খুব ভালোমতন পরিচিত,তুমি যখন দেখবা আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তখনি তোমার মাথায় ভূত চাপবে বারান্দায় গিয়ে নদী উপভোগ করার
তো?আমার বর তো আমাকে ঘুরাতে নেয় নাই,গেমস খেলে ঘুমাচ্ছিলো সে তাই বলেই তো চোরের মত যেতে হচ্ছিলো আমাকে
ওকে চলেন,আপনাকে নদী দেখিয়ে আনি সাথে একটু চুবিয়েও আনি
চুবাবেন আমাকে?
হু
শান্ত আহানাকে নিয়ে করিডোর পেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো,দূর দূরান্তে নৌকা,স্টিমার,লঞ্চ নজরে আসে শুধু
পানির ঢেউয়ে সেসব দুলে যাচ্ছে,পানি এসে বাড়ি খাচ্ছে বারবার
আহানার মন চাইলো একটু ছুঁয়ে দেখার কিন্তু পারলো না তার উপর পাশে শান্ত দাঁড়িয়ে এক হাত তার পকেটে রেখেছে আরেক হাত দিয়ে আহানার কুনুই ধরে রেখেছে যাতে ভুলেও না পড়ে যায় সে

দূরে একদম শেষ প্রান্তে লাল লাল হয়ে আছে,যেন অগ্নিশিখা তবে সেটা অগ্নিশিখা নয়,আশেপাশের লাইটের আলো একসাথে হয়ে এমন দেখাচ্ছে,আহানা প্রানভরে পরিবেশটা উপভোগ করছে,আশেপাশে দুএকজন মানুষ ও আছে তবে তারা একটু দূরে,কেউ ফোনে কথা বলছে,কেউ ছবি তুলছে,কেউ বাইরের দিকে চেয়ে আছে
আহানা মুচকি হেসে দূরের একটা লঞ্চের দিকে তাকানোর সময় গালে খোঁচা দাড়ির স্পর্শ পেয়ে চমকে পাশে তাকিয়ে দেখতে পেলো তার বর চোরের মতন বিহেভ করে একবার এদিক তাকাচ্ছে তো আরেকবার ওদিক তাকাচ্ছে
আহানার বুঝতে বাকি নেই সবেমাত্র তার বর তার গালে চুমু দিয়ে দিয়েছে এরকম পাবলিক প্লেসে
আহানা এদিক ওদিক তাকিয়ে আশেপাশের মানুষদের অবস্থা চেক করলো, সবাই সবার কাজ নিয়ে ব্যস্ত
আহানা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দুম করে শান্তর ঘাড়ে একটা কিল বসিয়ে বললো”আর সময় পান না তাই না?”
না পাই না,তাই তো এখন দিয়ে দিলাম
চলুন ভেতরে যাই,খিধা লাগছে,কি খাব?
মা রিপাকে দিয়ে খাবার প্যাক করে দিয়েছে,চলো সেটা খাবো

ঝিনাইদহের বেপারিপাড়ায় এসে দুজনে এবার একটা রিকসা নিয়েছে,শান্তর মামা রিকসাটা পাঠিয়েছেন শান্তদের জন্য
রিকসায় বসে আহানা শান্তর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে,সারারাত সিটে বসে ঠিকমত ঘুম হয়নি তার
শান্ত মন দিয়ে তার নানুরবাড়ি যাওয়ার পথটা দেখতে ব্যস্ত
কতটা বদলে গেছে সব
২বছর আগে লাস্ট এসেছিলো শান্ত এখানে,দুবছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে এখানকার
নানুবাড়ির কাছাকাছি এসে পড়ায় শান্ত আহানাকে ডেকে তুলে বললো”ঠিক হয়ে বসতে,বাড়ির কাছে এসে গেছে তারা”
আহানা চোখ ডলে মাথায় ঘোমটা টেনে নিলো,একটা সাইডওয়ালের বিরাট বাড়ি নজরে আসছে,উপরে টিন,সামনে লম্বাতে চিকন মাটির রাস্তা,তার দুপাশে তালগাছ,তালগাছগুলোর গোড়ায় সাদা রঙ করে রাখায় দেখতে বেশ লাগছে
আহানা তো অবাক এত সুন্দর বাড়ি আর পথ দেখে,বাড়িটার সামনে কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে
আহানা রিকসা থেকে নেমে শান্তর জন্য অপেক্ষা করলো,শান্ত ব্যাগটা হাতে নিয়ে বললো”চলো”
আহানা ওর সাথে সাথে চললো,বাড়ির সামনে শান্তর নানু,নানা,মামা মামি আর তাদের ছেলেমেয়েরা একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন
আহানা গিয়ে সবার আগে নানু আর নানাকে সালাম করলো তারপর মামা মামিকে,উনাদের সকলের মুখে হাসি,অনেক খুশি হয়েছেন তারা শান্ত আর আহানাকে পেয়ে
নানু আহানার থুতনি ধরে টেনে বললেন”কিরে শান্ত,এটা সেই মেয়েটা না যে আমার চুনের কৌটা খালি করতো সবসময়?”

শান্ত দাঁত কেলিয়ে বললো”ঠিক ধরেছো,এই সেই ধানিলংকা”
বেশ করেছিস এরে বউ করে
কেন?তোমার যে চুন নষ্ট করতো তোমার কি ওর প্রতি রাগ নেই?
নাহ রে কিসের রাগ,ওরে আমি সেসময়ে বকাবকি করতাম ঠিকই তবে ওরে আমি আদরও করতাম,কারণ ও আদর করার মতই ছিলো,ছোটবেলায় গালদুটো টমেটোর মতন ছিল ওর
আহানা লজ্জায় নিচের দিকে চেয়ে আছে
শান্ত হেসে বললো”এখন মনে হয় টমেটো শুকিয়ে চেরি হয়ে গেছে কি বলো?”
সবাই একসাথে হেসে দিলো,আহানা রাগে ফুলে শান্তর দিকে তাকালো একবার
একবার একা পাই এই কথা বলার শাস্তি দেবো!!
নানু আহানার হাত ধরে বাসার ভেতর নিয়ে চললেন
বাসার ভেতরে ঢুকলেই যে রুমটা পড়ে সেটাতে সোফা আর একটা খাট,নানু সোজা আহানাকে নিয়ে ভেতরের রুমে একটাতে নিয়ে আসলেন
সেখানে একটা খাট আর একটা টেবিল,রুমটা শান্তর মামাতো ভাই রিফাতের,এখন মেহমানের জন্য খালি করা হয়েছে
শান্ত গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়,সে অনেক টায়ার্ড
আহানা ওকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মামি এসে বললেন”আহানা মা একটু এদিকে আসো”

আহানা মুখ ঘুরিয়ে ঘোমটা টানতে টানতে সেদিকে চললো,মামি ওর হাতে একটা ট্রে ধরিয়ে দিয়ে বললেন”তোমার বরকে নিয়ে খেয়ে নাও এগুলা তারপর একটু রেস্ট নাও,কেমন?”
আহানা মাথা নাড়িয়ে আবার রুমের দিকে চললো
শান্ত কোলবালিশ জড়িয়ে আরেকদিকে ফিরে শুয়ে আছে
আহানা ওর পিঠে একটা কিল বসিয়ে বললো”নিন,নাস্তা খেয়ে উদ্ধার করেন আমায়”
এরকম জোরে কিল মারো কেন?কি করছি?
আমার গাল শুকিয়ে টমেটো থেকে চেরি হয়ে গেছে?দাঁত ভেঙ্গে হাতে ধরিয়ে দেবো আপনার,স্টুপিড!
ওহ সেটা মনে রাখছো এখনও?একটা কথা কি জানো?টমেটোর চেয়ে চেরির দাম বেশি এবং টমেটো থাকে তরকারিতে আর চেরি থাকে কেকের মাঝখানে

প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ পর্ব ৬৬

হইছে হইছে,নিন চা নাস্তা করেন
আহানা শান্তর পাশে বসে গপাগপ খাবার শেষ করে আবার ছুটলো বাহিরের দিকে
এই আহানা দাঁড়াও
কিছে?
নতুন বউ এরকম ডাকা ছাড়া বের হয় না মনে হয়
আপনাকে এই কথা কে বলেছে?নতুন বউকে ডাকলে সে আসবে এমনি আসবে না এটা আবার কেমন কথা!আমি তো না ডাকলেও যাব

প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ শেষ পর্ব