প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৪০
রোজ ও রুশা
আজ টানা দুই দিন হয়ে গেছে—রোজের কোনো খবর নেই। ফোন বন্ধ। মেসেজ সিন হচ্ছে না। অনলাইনে আসে না। যেন হঠাৎ করেই মেয়েটা গায়েব হয়ে গেছে।
রোজ তাদের বাসায় আসার পর থেকেই তার মামী তাকে ইচ্ছেমতো কথা শুনাচ্ছে।
কেন এসেছে, কতদিন থাকবে, কার জন্য এসেছে—একটার পর একটা খোঁচা।
“ এই বাসা, হোটেল না ? যখন ইচ্ছা আসবা, যখন ইচ্ছা থাকবা।মেয়ে মানুষ হয়ে আসা যাওয়া ভালো না। বছরে এক বার আসবে ঘন ঘন আসলে মানুষ বলবে বেলেল্লাপানা করছিস!তোর জন্য এখন আমাদেরও মানুষজনের কাছে কথা শুনতে হবে।
প্রথম দিন রোজ চুপ ছিল। দ্বিতীয় দিন সে নিজের রুম থেকেই বের হয় নি। জানালার পাশে বসে ছিল সারাক্ষণ। চোখ লাল। মুখ শুকনো।
বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিল… আবার রেখে দিচ্ছিল।
সে জানে সৃজন ফোন দিচ্ছে।
কিন্তু সে ফোন অন করার সাহস পাচ্ছে না। কারণ ভয় হচ্ছে…ফোন ধরলেই হয়তো কান্না করে ফেলবে। কিন্তু সে তো স্ট্রং মেয়ে। তার চোখের পানি সহজে কাওকে দেখাতে চায় না মেয়েটা। বাবা মায়ের কবর টা অব্দি জিয়ারত করতে পারে নি মামির বকবকে। মামা বাড়িতে নেই তাই বেশি বেশি বকছে মামি। এদিকে সৃজনের অবস্থাও ভালো না। ভার্সিটি থেকে এসে সে সরাসরি নিজের রুমে ঢুকে গেছে। দুই দিন ধরে ঠিকমতো খায় নি। কারো সাথে কথা বলে না।
রুমের পর্দা টানা । তার ফোনের কললিস্টে শুধু একটাই নাম—
” আমার ফুল ”
কিন্তু প্রতিবার একই কথা শোনা যায়—
The number you have called is currently switched off.
ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে মেরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে সৃজন। মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরে—
“ কেমন আছে ফুল আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে?
নাভান বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকলেও ভিতরে ভিতরে বন্ধুর জন্য চিন্তায় শেষ।
সারাদিন কাজ করেও মাঝেমধ্যে সৃজনের খবর নেয়।
হেরাকে দিয়ে রোজের খবর জানার চেষ্টা করে।
কিন্তু কোনো লাভ হয় না। আর এদিকে অধীর যেন পুরো গোয়েন্দা হয়ে গেছে। সে কাজল খানকে ফলো করছে কয়েকদিন ধরে। একটাই প্রশ্ন তার মাথায়—
“কেনো কাজল খান এখনো জাওয়াদ খানকে মেনে নিচ্ছে না?”
পুরনো মেসেজ, পুরনো ছবি, এমনকি তাদের আগের পরিচিত মানুষদের কাছ থেকেও তথ্য বের করার চেষ্টা করছে সে।
অন্যদিকে জাওয়াদ খানও বদলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কাজল খানের জীবন যেন দুই দিক থেকে আগুনে পুড়ছে।
একদিকে স্বামী বার বার কাছে আসছে। ফিরে পাওয়ার চেষ্ট করছে। কিন্তু সে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে শামসুলের হুমকি। প্রতিদিন নতুন নতুন ভয় দেখাচ্ছে সে।
“ তুমি যদি আবার জাওয়াদের কাছে ফিরো … তাহলে এমন কিছু করবো, জীবনেও শান্তি পাবি না। এসবের মাঝে কাজল খান মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। বিকেলের দিকে নাভান নিজের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। হালকা বাতাস বইছে। আকাশটা মেঘলা।
হঠাৎ সে তাকিয়ে দেখে পাশের ছাদে সৃজন দাঁড়িয়ে আছে। দুই দিন পর ছাদে উঠেছে ছেলেটা।
চোখের নিচে কালি।
মুখটা কেমন ফ্যাকাশে।
নাভান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ দেয়ালের ওপর উঠে দাঁড়ালো।
“কিরে প্রেমিক পুরুষ কি করছিস?
– সৃজন চমকে উঠে। নাভান এক লাফে তাদের ছাদ থেকে সৃজনদের ছাদে চলে এলো। সৃজন বিরক্ত চোখে তাকাল।
“ তুই এভাবে লাফিয়ে এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে আসিস একদিন পড়ে মরবি।
নাভান কাঁধ ঝাঁকালো।
“ তার আগে তোর প্রেম কাহিনি শেষ করে যাবো।
সৃজন কিছু বলল না। নাভান তার পাশে এসে দাঁড়ালো।
“ কিরে… এখনো মন খারাপ?
সৃজন নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো।
“ ফোন দিয়েছিস আমার বোনকে?
“ হুম…
– খুব ধীরে উত্তর দিল সে।
“ কি বললো?
“ ফোন অফ।
কথাটা বলার সময় সৃজনের গলায় এমন ভাঙা শব্দ ছিল…যেটা শুনে নাভানেরও খারাপ লাগলো।
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
“ এত হাইপার হচ্ছিস কেনো? তুই যে এত মাথা মোটা তা এবার জানলাম। নিজের ভালোবাসার মানুষটা কোথায় থাকে তাও জানিস না!
সৃজন বিরক্ত হয়ে তাকালো।
“ মজা নিচ্ছিস?
“ না। বাস্তব বলছি।
“ আমি কি জানতাম এমন হবে?
“ ভালোবাসিস… অথচ তার বাসা কোথায় জানিস না। বাহ! প্রেমিক হিসেবে তোরে পুরস্কার দেওয়া উচিত।
সৃজন এবার রেলিং এ ঘুষি মারলো।
“ দোস্ত প্লিজ! মাথা গরম করিস না।
নাভান এবার সত্যিই সিরিয়াস হলো।
পকেট থেকে হাত বের করে ধীরে ধীরে সৃজনের কাঁধে রাখলো। তার মুখে সেই চিরচেনা দুষ্টু হাসিটা নেই, বরং অদ্ভুত এক শান্ত ভাব।
“রেডি হ।
সৃজন ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কেন?
নাভান একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
“রোজের বাসায় যাবো।”
কথাটা শুনেই সৃজন যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো।
“মানে?
নাভান ঠোঁট বাঁকিয়ে ছোট্ট হাসলো।
“ অনেক কষ্টে ঠিকানা বের করেছি।
সৃজন এবার পুরোপুরি তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।
চোখে-মুখে এমন উজ্জ্বলতা, যেন কেউ তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর খবরটা দিয়েছে।
“সত্যি?
নাভান বিরক্ত মুখ করে বললো–
“না মিথ্যা। এখানে দাঁড়িয়ে নাটক করছি।
“দোস্ত!
সৃজন এক ঝটকায় নাভানকে জড়িয়ে ধরতেই নাভান এমন মুখ করলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়টা তার সাথেই হয়েছে।
“হয়েছে হয়েছে! আর মেয়েদের মতো জড়িয়ে ধরতে হবে না। বিরক্ত লাগে এসব।
সৃজন হেসে বললো-
“হেরা বনু ধরলেও লাগবে?”
নাভান মুহূর্তে চুপ।
তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বললো-
“অসহ্য লাগবে।
সৃজন এবার ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপলো।
“কি বলতে চাচ্ছিস তুই? হেরাকে ভালোবাসিস না?
নাভান ছাদের রেলিং টাতে গিয়ে বসল।
যেন কথাগুলো তার গায়ে লাগছেই না।
“ ভালোবাসা-টালোবাসা আমার সাথে যায় না।
“দোস্ত, তোকে আমি চিনি।
“ হ্যাঁ তো?
“ কবে স্বীকার করবি তুই?”
নাভান এবার কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে বললো-
“ ভালোবাসা স্বীকার করার জিনিস না… উপলব্ধি করার বিষয়।”
“ তুই যা বুঝাস, তা ঠিকই আমরা উপলব্ধি করি।
নাভান এবার কথা ছুঁড়ে মারলো সৃজন এর দিকে-
“ তুই উপলব্ধি করে কি করবি? প্রেম করবি নাকি? আমি ছেলেতে আসক্ত নই।
সৃজন নিজেও রেলিংটাতে উঠে হেসে ফেললো –
“ কিসে আসক্ত? হেরাতে?
নাভান এবার এমনভাবে তাকালো যেন সামনে মানুষ না, জাতীয় শত্রু দাঁড়িয়ে আছে।
“হোয়াট নন্সেস!
সৃজন হো হো করে হেসে উঠলো।
“ আচ্ছা তাই নাকি? তাহলে হেরা নিলয় এর সাথে ঘুরলে তোর মুখ বাংলার পাঁচ কেন হয়ে যায়?”
“ কারণ মেয়েটা বিপদ।
“ওহ! মেয়েটা বিপদ, না মেয়েটার প্রেমে পড়ে তুই বিপদে?
“ সৃজন…”
“ হুম?”
“ আর একটা কথা বলবি, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো।”
“দেখেছিস? রাগ উঠলেই হেরার ভাই এর মোড অন হয়ে যায়!
নাভান এবার সত্যিই উঠে দাঁড়ালো।
সৃজন সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করলো।
“ আচ্ছা আচ্ছা থামলাম! আগে রোজের কাছে চল। পরে তোর প্রেম কাহিনী শুনবো।
ভালোবাসা…
চার অক্ষরের ছোট্ট একটা শব্দ। অথচ এই শব্দের ভেতরই লুকিয়ে আছে হাজারটা অনুভূতির যুদ্ধ।
এমন এক অনুভূতি—যে মানুষকে বদলে দিতে পারে।
ভীষণ রাগী মানুষটাকে শান্ত করে দেয়, আবার শান্ত মানুষটার বুকেও ঝড় তুলতে পারে।
ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে, আবার সেই মানুষটার থেকেই দূরে সরে যেতে বাধ্য করে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—ভালোবাসা কখনও মুখে প্রকাশ পায় না, কিন্তু চোখ ঠিকই বলে দেয়… “আমি তোমাকেই চাই।”
সবাই তখন রোজের বাসায় যাওয়ার জন্য রেডি।
একেকজন একেক বাইক নিয়ে এসেছে। পুরো গ্রুপটার মধ্যে উৎসব উৎসব ভাব।
হেরা আর রুশা জাওয়াদ খানকে বলে বাসা থেকে বের হয়। রুশা আজ হালকা বেবি পিংক কামিজ পরেছে। আর হেরা বরাবরের মতো নিজের স্টাইলে।
ব্ল্যাক স্কার্ট, সাদা থ্রি-কোয়ার্টার টি-শার্ট, গলায় কালো ওড়না পেঁচানো। লম্বা চুলগুলো ছোট করে বাঁধা হলেও চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছাড়িয়ে গেছে।
মুখে একফোঁটা মেকআপ নেই, তবুও মেয়েটাকে দেখলেই চোখ আটকে যায়।
সৃজনের বাইকের পিছনে বসেছে ঝিনুক।
অধীরের পিছনে রুশা। তুষার মাঝপথে জয়েন করবে—সেটাও ঠিক করা।
সবাই এমন ভাব করছে যেন ভীষণ তাড়া আছে।
এক এক করে বাইক স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেলো সবাই।
হেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো রাস্তা ফাঁকা।
সে হা করে তাকিয়ে রইলো।
“এ… এটা কি হলো!?
তার কণ্ঠে বিরক্তি আর অবিশ্বাস দুটোই স্পষ্ট।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে ভারী, শান্ত একটা গলা—
“সমস্যা কোথায়?
হেরা ঘুরে তাকাতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায়। **নাভান**
কালো ঝকঝকে একটা বাইকের উপর হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। বাইকটা এতটাই সুন্দর যে রাস্তার আলো পড়তেই চকচক করছে। পুরো ব্ল্যাক থিম।
দেখেই বোঝা যায় ভয়ংকর দামি।
কিন্তু বাইকের থেকেও ভয়ংকর ছিল ছেলেটা নিজে।
ব্ল্যাক ফরমাল প্যান্ট। হালকা অ্যাশ শার্ট।
শার্টের হাতা ফোল্ড করা। হাতে সিলভার ঘড়ি।
চুলগুলো হালকা এলোমেলো। আর সেই চোখ…
যে চোখে তাকালে মনে হয় মানুষ ডুবে যাবে।
হেরা কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলো।
অদ্ভুতভাবে বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়ে গেছে।
তারপরই নিজের মনকে গালি দিলো।
“ কি সব ভাবছিস হেরা!?
মুখে বিরক্তি এনে বললো—
“ অসভ্য বেটা… মেয়েদের মতো সেজে এসেছে।
নাভান ভ্রু কুঁচকালো। তারা দিয়ে বললো।
” তুমি কি যাবে?
হেরা বিরক্ত হয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।
“ আমি আপনার বাইকে উঠবো না।
“কে বলছে উঠতে?
“ তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
“ রেখে গেলে পরে আবার কাঁদবে না তো?
“ আমি!?
“ হুম।
হেরা রাগে ফুঁসতে লাগলো। এই ছেলেটা তাকে এমনভাবে জ্বালায় কেন? সব সময় ফালতু বকে।
কিন্তু সত্যিটা হলো—
নাভান ছাড়া আর কারো সাথে সে এত স্বাভাবিকভাবে ঝগড়া করতে পারে না। নাভান এবার হেলমেটটা সামনে বাড়িয়ে দিলো।
“উঠো জলদি ।
“ না।
“ মিসাইল গার্ল
“ বলেছি না উঠবো না।”
“ আচ্ছা ঠিক আছে, থাকো । আমি চলে যাচ্ছি।”
নাভান সত্যিই বাইক স্টার্ট দিলো।
হেরা দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে দৌড়ে এসে বললো—
“এই এই দাঁড়ান!”
নাভানের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটলো। মুখে গম্ভীর ভাব রেখে বলে।
“ কি হলো? উঠবে তুমি। আমি এখানে দাঁড়িয়ে তোমার রুপ দেখবো নাকি।
“ উফফ! অসহ্য মানুষ একটা।
বির বির করে রাগী মুখে বাইকের পিছনে উঠে বসলো হেরা। ঠোঁট ফুলিয়ে এমনভাবে বসেছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজটা সে এখন করছে। অথচ বুকের ভেতরটা তার অদ্ভুতভাবে কাঁপছে।
সবাই এরই মধ্যে চলে গেছে।
রুশা তো সুযোগ পেতেই ফুরুৎ করে উধাও।
এখন নাভান যদি চলে যায়… তাহলে সত্যিই আর যাওয়া হবে না।
কালো হেলমেটের আড়ালে নাভানের মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু কণ্ঠটা শোনা যাচ্ছে— ভারী, গম্ভীর, ঠান্ডা।
সেদিন যেভাবে ধমক দিয়েছিল… এখনও সেটা মনে পড়লেই হেরার বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
তাই আজ আর তর্ক করলো না।
চুপচাপ বসে রইলো। এই প্রথম সে নাভানের বাইকে উঠেছে।
চারপাশে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে।
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো এক একটা ঝাপসা হলুদ বৃত্ত হয়ে জ্বলছে। দূরে কোথাও আজানের শব্দ ভেসে আসছে।
হেরা অনুভব করলো—তার বুকের ভেতরটা অস্বাভাবিকভাবে উঠানামা করছে। সে নিজেকেই বুঝতে পারে না। এই মানুষটাকে সে কখনো ঘৃণা করেছে। অহংকারী ভেবেছে। রাগী ভেবেছে।
নিষ্ঠুর ভেবেছে।
কিন্তু তারপরও…
লোকটা বারবার এসে সব হিসাব গুলিয়ে দেয়।
কারও জন্য এত কিছু করা কি অভিনয় হতে পারে?
যে ঠিকানা কেউ বের করতে পারেনি… নাভান বের করেছে। যে মানুষ নিজের রাগের আড়ালে কাউকে আগলে রাখে… সে কি পুরোপুরি খারাপ হয়?
হেরা চোখ নামিয়ে ফেলে।
সমস্যা হচ্ছে—
নাভানকে যত বুঝতে চায়, ততই সে আরো জটিল হয়ে ওঠে। হয়তো মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এটাই—
তারা ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়।
আর একবার কেউ অভ্যাস হয়ে গেলে…
তাকে ঘৃণা করাটাও কঠিন হয়ে যায়।
হেরা বিরক্তিতে নিজের কপাল কুঁচকালো।
” না! এভাবে ভাবা ঠিক না। মানুষকে শুধু বন্ধুদের জন্য ভালো হলেই হবে না। সবাইকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে জানতে হয়। অহংকার থাকা যাবে না।
রাগ দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
কিন্তু মনের ভেতর অন্য এক কণ্ঠ ফিসফিস করে উঠলো—
“ তবুও… লোকটা আলাদা।
হেরা তাড়াতাড়ি মাথা ঝাঁকালো।
নিজের চিন্তাকেই ভয় লাগছে তার।
ওদিকে নাভান বাইকের সামনে বসে সব অনুভব করছে। হেরার প্রতিটা নড়াচড়া। প্রতিটা নিঃশ্বাস।
এমনকি তার নীরবতাটাও।
আজ সে অদ্ভুত শান্ত।
মুখে কিছু বলছে না।
কারণ কিছু অনুভূতি শব্দে নষ্ট হয়ে যায়।
নাভানের বহুদিনের ইচ্ছে ছিল—
একদিন হেরাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে।
তাই আজ নিজের সবচেয়ে প্রিয় বাইকটা বের করেছে সে।
এই বাইকটা শুধু একটা বাইক না।
তার জীবনের প্রথম হালাল ইনকামের স্মৃতি।
প্রথম স্বপ্ন পূরণের অনুভূতি।
অনেক না বলা রাতের সাক্ষী।
আর আজ সেই বাইকে বসে আছে হেরা।
ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন ভারী হয়ে উঠলো নাভানের।
হেরা খুব সাবধানে বসেছিল।
বাইকের একদম শেষ মাথায়।
যেন ইচ্ছে করেই দূরত্ব রেখে চলতে চায়।
নাভানের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটলো।
তারপর ইচ্ছে করেই বাইকটা একটু স্পিডে স্টার্ট দিলো।
“আআআ—!
চমকে উঠলো হেরা।
পরের মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে ভয় পেয়ে শক্ত করে নাভানের শার্ট আঁকড়ে ধরলো।
সময়টা যেন হঠাৎ থেমে গেল। নাভানের বুকের ভেতর কেমন বিদ্যুৎ খেলে গেল। মেয়েটার নরম আঙুলগুলো কাপড়ে চেপে আছে। তবুও সেই স্পর্শ যেন সরাসরি তার হৃদয়ে গিয়ে লাগছে। অদ্ভুত। অসহ্য সুন্দর। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
হেলমেটের আড়ালে চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড সেই অনুভূতিটা গোপনে উপভোগ করলো নাভান।
এতদিন ধরে সে শুধু দূর থেকে দেখেছে মেয়েটাকে।
রাগতে দেখেছে। চিৎকার করতে দেখেছে। ঝগড়া করতে দেখেছে।
কিন্তু আজ—
প্রথমবার হেরা নিজে থেকে তাকে আঁকড়ে ধরেছে।
ভয় পেয়ে হলেও। তবুও ধরেছে।
এই ছোট্ট ব্যাপারটাই নাভানের বুকের ভেতর অদ্ভুত অন্ধকার সুখ ছড়িয়ে দিলো।
যেন বহুদিনের ক্ষুধার্ত একটা অনুভূতি হঠাৎ খাবার পেয়েছে। হেরা বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নিলো। কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে তার।
“ ইচ্ছে করে করছেন!?
নাভান স্বাভাবিক গলায় বললো—
“ কি?
“ স্পিড বাড়িয়েছেন!”
“আমি তো কিছুই করি নি ।
“ মিথ্যুক।
নাভান আয়নায় তাকালো।
আর তাকিয়েই কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে গেল।
হেরা ঠোঁট ফুলিয়ে বসে আছে।
চোখে বিরক্তি। বাতাসে এলোমেলো চুলগুলো মুখে এসে লাগছে। সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় মেয়েটাকে অবাস্তব সুন্দর লাগছে।
নাভানের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন অন্ধকার নরম একটা অনুভূতি জমলো।
এই মেয়েটাকে সে ভয়ংকরভাবে নিজের কাছে চাইতে শুরু করেছে। এতটাই যে মাঝে মাঝে নিজেকেই ভয় লাগে।
কারণ ভালোবাসা যখন গভীর হয়…
তখন সেটা মানুষকে কোমল না, ভয়ংকর করে দেয়।
হেরা ধীরে ধীরে আবার সিট আঁকড়ে ধরলো।
চারপাশে ঠান্ডা বাতাস।
রাস্তার আলো দ্রুত পেছনে ফেলে বাইক এগিয়ে যাচ্ছে।
তাদের মাঝখানে নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতাও আজ শব্দের চেয়ে বেশি জোরে কথা বলছে।
হঠাৎ নাভান নিচু গলায় বললো—
“ভয় পাচ্ছো, মিসাইল গার্ল?
হেরা গলা শক্ত করে বললো—
“ না।
“ তাহলে হাত কাঁপছে কেন?
হেরা থমকে গেল।
তার বুকের ভেতরটা ধপধপ করছে।
নাভান কি বুঝে ফেলেছে?
সে কি টের পাচ্ছে—
এই মুহূর্তে হেরা নিজের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? হেরা মুখ ঘুরিয়ে নিচু গলায় বললো—
“বাতাস লাগছে তাই।”
নাভান আস্তে হেসে ফেললো।
সেই হাসিটা শান্ত।
কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর গভীর কিছু লুকানো।
“ ওহ আচ্ছা…”
তারপর আর কেউ কথা বললো না।
শুধু রাত বাড়তে লাগলো।
রাস্তা ফাঁকা হতে লাগলো।
আর দুইটা মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের অনুভূতির আরো কাছে চলে যেতে লাগলো।
কারণ তারা দুজনেই জানতো—
হাত কাঁপার কারণ বাতাস না।
কারণটা হলো—
তাদের হৃদয় আজ বিপজ্জনকভাবে একে অপরের খুব কাছে চলে এসেছে।
বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ করেই নাভান বাইকের স্পিড কমিয়ে রাস্তার একপাশে একটা বিলাশ বহুল ওয়ার্কশপের সামনে দাঁড় করালো বাইকটা।
বাইক থামার সঙ্গে সঙ্গেই ভিতর থেকে একটা পাতলা গড়নের ছেলে দৌড়ে বেরিয়ে এলো। বয়স বেশি না। চোখে-মুখে চঞ্চলতা।
নাভানকে দেখেই ছেলেটার মুখে বিশাল হাসি ফুটে উঠলো-
“আসসালামু ভাইজান!”
তারপর হেরার দিকে তাকিয়ে আরো বড় হাসি দিয়ে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম ভাবিজান!
হেরা থমকে গেল।
ভাবিজান?
মুহূর্তেই তার চোখ গোল হয়ে গেল। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই নাভান একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেলমেট খুলে ছেলেটার হাতে দিয়ে দিল।
“অলাইকুমুস সালাম। নে এটা রাখ।
ছেলেটা হেলমেট হাতে নিয়ে একবার হেরার দিকে তাকালো, তারপর আবার নাভানের দিকে। তার চোখেমুখে দুষ্টু হাসি।
“ ভাই, ভাবিরে নিয়া ভিতরে আসেন না। চা, কফি খাইয়া যান।
নাভান মুচকি হেসে ছেলেটার মাথায় হালকা চাপড় দিল। চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
“নাহ রে বিচ্ছু, আরেকদিন। তোর ভাবি এমনি আমার বাইকের পিছনে বসে বিরক্ত হয়ে আছে।
বিচ্ছু সঙ্গে সঙ্গে মুখ হাঁ করলো।
“ কি কন ভাই! মাইয়ারা তো আপনের বাইকে উঠার লাইগা পাগল থাকে! আর ভাবি বিরক্ত?
হেরা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
কথাগুলো শুনে কেন যেন বুকের ভিতর অদ্ভুত কাঁপুনি উঠছে।
বিচ্ছু থামলো না।
সে হেরার দিকে তাকিয়ে আন্তরিক গলায় বললো–
“ ভাই, ভাবি কিন্তু মাশাআল্লাহ… আপনে যেমন কইছিলেন তার থেইকা হাজার গুণ সুন্দরী। এক্কেরে এডভোকেট খালাম্মার মতো সুন্দরী।
তারপর গম্ভীর ভঙ্গিতে নাভানকে বললো-
“ আপনে ভাবিরে বিরক্ত কইরেন না। তাইলে ভাবি আর বিরক্ত হইবো না।
কথা শেষ করেই ছেলেটা হেসে দৌড় দিল।
যে গতিতে এসেছিল ঠিক সেই গতিতেই উধাও।
হেরা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে সামনে তাকালো।
আর তাকিয়েই আবার ধাক্কা খেল।
নাভান তখন বাইকের আয়নায় নিজের চুল ঠিক করছে। আজকে চুলগুলো অন্য দিনের চেয়ে বেশি সিলকি আর এলোমেলো লাগছে। কপালের উপর পড়ে থাকা কিছু চুল বাতাসে উড়ছে। শার্টের হাতা গোটানো।
হেরা না চাইতেও তাকিয়ে রইলো।
” আচ্ছা… লোকটা কি নতুন হেয়ার কাট করেছে?
আজকে একেবারে সিনেমার নায়কদের মতো লাগছে কেন? না না… নায়ক না। একদম রাজপুত্রের মতো। প্রিন্স প্রিন্স…”
অজান্তেই কথাটা মনে আসতেই নিজের উপরই বিরক্ত হলো হেরা। তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল।
অন্যদিকে নাভান কিছুই বুঝলো না।
এই মেয়ে এতক্ষণ ধরে একটার পর একটা কথা বলছিল, এখন হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে কেন?
নাভান বাইক স্টার্ট দিয়ে গম্ভীর গলায় বললো–
“ আমায় ধরে বসো। সবাই অনেক দূরে চলে গেছে। ধরতে হবে।
হেরা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে বললো-
“ আপনি চালান। আমি ধরেছি।
“ পরে পরে যাবা।
“ আমি তো ধরেই আছি।
নাভান একচোখা হাসি দিল।
“ কাঁধে ধরলে হবে না। কোমর জড়িয়ে ধরো।
হেরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করলো।
“বেশি হচ্ছে না মিস্টার শেহতাজ খান নাভান? স্বামীর অধিকার খাটাচ্ছেন নাকি?
নাভান এবার ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকালো। চোখে সেই ভয়ংকর শান্ত দৃষ্টি।
“ খাটাতেই পারি। বিয়ে যেহেতু করেছি।
হেরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো–
“ ওইটা নামে বিয়ে। নাম কাটা কাটি করলে সব শেষ।
নাভান এবার একটু ঝুঁকে এলো।
তার কণ্ঠটা আরো নিচু হয়ে গেল।
“ কাটার জন্য হাত লাগে। যদি হাতই না থাকে আপনার?
হেরা ভ্রু তুলে তাকালো।
“হাত সহ আমি আস্ত থাকবো।
“ এত কনফিডেন্স?
“ হুম।
“ এত সাহস আমার মুখের উপর তর্ক করার?”
হেরা এবার মুচকি হাসলো।
তার চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
“ আমার সাহস বরাবরই বেশি।
নাভান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটার এই জেদ, এই চোখে চোখ রেখে কথা বলা… কেন যেন তার ভীষণ ভালো লাগে।
তারপর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে বললো–
“ওকে… এখন আত্মাটা হাতে নিয়ে রাখেন। দেখি সাহস কতখানি।
হেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
নাভান আচমকা বাইকের গিয়ার বাড়িয়ে দিল।
মুহূর্তের মধ্যে স্পিড একশো ছুঁইছুঁই।
চারপাশের বাতাস শোঁ শোঁ শব্দে কেটে যাচ্ছে। রাস্তার লাইটগুলো ঝাপসা হয়ে পিছনে ছুটছে।
হেরার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো।
সে শক্ত হয়ে বসে রইলো।
একটু এদিক-ওদিক হলেই শেষ!
নাভান টের পেল হেরা নিজেকে সামলে বসে আছে।
সে ইচ্ছে করেই আরো একটু স্পিড বাড়ালো।
আর ঠিক তখনই—
হেরা ভয় পেয়ে ঝট করে নাভানকে জড়িয়ে ধরলো।
দুই হাত দিয়ে শক্ত করে তার পেট আঁকড়ে ধরেছে। মুখ গুঁজে দিয়েছে তার পিঠে। চোখ শক্ত করে বন্ধ।
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৩৯
“অসভ্য! অহংকারী! গিটার ওয়ালা!”
বাইক চালাচ্ছেন নাকি আমার রূহ শরীর থেকে আলাদা করার ট্রাই করছেন ?
” সাহস না অনেক তোমার! পূর্বপুরুষদের সাথেও দেখা করে আসো একটু? তারা তোমায় ভালো বুদ্ধি দিবে। আর কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা শিখিয়ে দিবে।
“ আমার ভয় করছে… স্পিড কমান!
হেরার কাঁপা কণ্ঠে রাগ আর ভয় মিশে আছে।
নাভানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো।
